হোম বই নিয়ে বই থেকে : কবিতার গাইড বই

বই থেকে : কবিতার গাইড বই

বই থেকে : কবিতার গাইড বই
445
0

১.
আমরা সাধারণত বাংলাদেশে কথ্য ভাষায় ‘জল’ বলি না, অথচ আমাদের কবিতায় ‘পানি’ শব্দের ব্যবহার কম। এটা দোষের কিছু নয়। কথ্যরূপ আর শিল্পরূপের মধ্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। ‘জল’ শব্দটি যেহেতু বাংলার, ফলে যে-কেউ নানা দৈনন্দিন ব্যাবহারিক কাজে ব্যবহার করতেই পারেন সিটি করপোরেশনকে টাকাপয়সা না দিয়েই। যে-কেউ ‘জলত্যাগ’ করে পানিও ব্যবহার করতে পারেন। কোনো সমস্যা হয় না। অবজারভেশনটা অন্য জায়গায়, এইখানে নয়। অনেক শব্দ আছে, যা ঐতিহাসিক বা পৌনঃপুনিকভাবে কাব্যসুন্দর। জলতরঙ্গের সৌন্দর্য পানির ঢেউ থেকে বেশি। কালো যমুনার জল পদ্মার পানির মতো এত আবহমান নয়, এত কালোও নয়। কিন্তু গঙ্গা! বহু ব্যবহারে, গঙ্গা বা যমুনা, অগণন যুগের পর যুগ কবিতায় কতক শব্দ ব্যবহৃত হতে হতে আপনিই শিল্প-সুন্দর-শব্দ হয়ে ওঠে। প্রতিনিয়ত ব্যবহারে ব্যবহারে শব্দ ক্লিশে হয় না সব সময়, তা উজ্জ্বলও হয়ে ওঠে। শব্দের শিল্প-সৌন্দর্য এভাবেই গড়ে ওঠে। ফলে কবিতায় নির্বাচিত আকারে শিল্প-সুন্দর শব্দ ব্যবহার করে লিখতে থাকলে তার একটা এসথেটিক্যাল ভ্যালু তৈরি হয়। সহজেই যে-কোনো লেখাকে কবিতার মতো দেখতে একটা রূপ দেওয়া যায়। এ সমস্ত ব্যবহার করে আনায়াসেই কবিতার মতো কবিতা লিখে ফেলা যায়। কবিতার মতো দেখতে কবিতা-ফিউশন তৈরি করা সহজ একটা ব্যাপার। যত দিন যাবে শিল্পিত শব্দের সংখ্যা বাড়বে এবং কবিতার মতো লেখনীর সম্ভাবনা ও সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এই শিল্প-সুন্দর শব্দের কম্বিনেশন, পারম্যুটেশনে তৈরি করা মাঝারি মাপের কিছু লেখাপত্র তৈরি করে সর্বদা। এ রকমভাবে লিখিত হয় কবির অভ্যাসে লিখিত কবিতা। এই মাঝারি কবিতার মতো দেখতে লেখনীর চাহিদা পাঠকের তরফ থেকে কম নয়। এমন লেখাপত্রের আবেদন আছে সমাজে। চাহিদা, উপযোগ ছাড়া কিছু তো আর তৈরি হয় না দেশ, কাল, পাত্রে। এই সব মাঝারি মানের লেখালেখিরও একটা গন্তব্য থাকে। শিল্পিত-শব্দ-সৌন্দর্য দিয়ে কবিতার নিয়তে কিছু একটা সহজেই লিখে ফেলা যায়। তবে মহৎ কবিতা কাব্যসুন্দর শব্দের অধিক কিছু।

২.
মহৎ কবিদের কিছু বাজওয়ার্ড থাকে। কিছু শব্দের কয়েনেজ তাদের মুখচ্ছবি দেখা যায়। এই বাজওয়ার্ড বা কয়েনেজগুলো অন্য কবি তার কবিতায় ব্যবহৃত হলে ক্লিশে লাগে। যেমন জীবনানন্দের বা উৎপলের বহু শব্দ আপনি ব্যবহার করতে পারবেন না নিজের কবিতায়। এই শব্দগুলোর মধ্যে ব্ল্যাক ডার্কফোর্স আছে। অন্য কবির কয়েনেজ নিজের কবিতায় ব্যবহার করলে তা মমির অভিশাপের মতো ধ্বংস করে দেবে আপনার কবিতার কাব্যশক্তি। পিরামিডের পাথরে অভিশাপ থাকে। সচেতন লেখক এই ম্যাজিকগুলোকে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলেন। সেটাই নতুন শিল্প গড়ার থামস রুল।


আপনার ছেলেবেলাটা দেখে নিন, স্মৃতির মধ্যে হানা দিন, নিজেকে জানুন। তারপর আসুন আপনার বড়োবেলায়।


মহৎ কবির নিজস্ব বারকোড সাঁটা বাজওয়ার্ডগুলো বহুদিন চলমান কবিতায় ব্যবহৃত না হতে হতে কোনো এক জেনারেশনে গিয়ে শিল্পিত-শব্দ-সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলতে পারে। জীবনানন্দের বেতফল অন্য কবির কবিতায় কেউই দেখতে চাইবে না। ফলে প্রতিষ্ঠিত কয়েনেজগুলোর একরকম মৃত্যুই ঘটে মহৎ কবিদের হাতে। তারা একে গিল্টি করে নেয় নিজের নামে। এগুলো পরবর্তী প্রজন্মের কেউ আর হাত দিতে সাহস পায় না। এটাই কি তবে পয়েটিক ডিকশনের ফাঁদ? অব্যবহৃত হতে হতে একদিন এই শব্দগুলো অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে। যত দিন না সেই মহৎ কবির শিল্প ধ্বংস হচ্ছে তত দিন এই শব্দরা বন্দি, আয়ুপ্রাপ্ত। ধসের পর তারা হয়তো আবার জেগে উঠবে কোনো একদিন।

৩.
নিউরো-লিংগুয়েসটিক প্রোগ্রামিংয়ের [এনএলপি] মতে, আমরা যখন পড়ি তখন সেই লেখার ইন্টারপিটিশন আসলে তিনভাবে হয় মানুষের মনে। পঠিত বিষয় আপনি বিষয়টা দেখছেন বা শুনতে পাবেন বা আপনি অনুভব করবেন। হাওয়া শব্দের বিপরীতে আপনি দেখবেন পাতার ঝড় উঠেছে বা শোঁ শোঁ শব্দ ভেসে যাচ্ছে নির্জন ঘর বা মনে হতেই পারে ত্বকের ওপর বয়ে গেল তরঙ্গের খেলা। পাঠকের জীবনের অভিজ্ঞতা, তার গড়ে ওঠা রুচি ঠিক করে দেয় তিনি কিভাবে লেখাটা পড়ে আত্মস্থ করবেন। কানে, চোখে, না মগজে তিনি লেখাটা উপলব্ধি করবেন তা একটা নিয়তিনির্ভর বিষয়ের মতো মনে হতে পারে। নিয়তি আপনার র‌্যানডম অভিজ্ঞতার নির্যাস। বহু কিছুর মানবিক সমাবেশ। নিয়তিনির্ভর বলছি কেননা লেখা ইন্টারপিটিশন করার পদ্ধতি পাঠক স্বেচ্ছায় নির্বাচন করতে পারে না। এখানে পাঠকের তেমন কিছু করার নেই। লেখাটাকে ইমেজ হিসেবে দেখবে, নাকি শব্দের মতো লেখাটা তার কানে বাজবে, নাকি তিনি অনুভব করবেন—এসবই তার ছোটবেলার স্মৃতি, পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষের কোর মেমরি গড়ে ওঠে নানারকম অভিজ্ঞতা দিয়ে। সেই কোর মেমরি তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন ছোটবেলায় যাদের আনন্দের স্মৃতি বেশি তারা বড়োবেলায় সুখী মানুষ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি লাভ করে। সেজন্য আমাদের পাঠকরা তাদের ছোটবেলায় কী পড়েছেন কবিতার নামে তা একটু দেখে নেওয়া দরকার। শিশুপাঠ্যের অধিকাংশ কবিতাই [ছড়া হলো কবিতার প্রবেশদ্বার] প্রথমত নীতি শিক্ষার কঠোর, গল্পে মজারু এবং শেষতক বর্ণ গন্ধে রঙিন এবং অন্ত্যমিলের দোলায় দুলদুল। এই হলো আমাদের পাঠকের কোর মেমরি, শিশুস্মৃতি। একবার চোখ বন্ধ করুন আমার পাঠক। আপনার ছেলেবেলাটা দেখে নিন, স্মৃতির মধ্যে হানা দিন, নিজেকে জানুন। তারপর আসুন আপনার বড়োবেলায়।

যে-কোনো লেখা পড়ার সময় আপনি লেখাটাকে আসলে কিভাবে আত্মস্থ করেন ভেবে দেখুন। আপনি যা পড়েন তা কি আপনি দেখতে পান? নাকি শব্দগুলো কানের কাছে কথা বলে? আমার হিসাবে আমাদের যে শিশুশিক্ষা সিলেবাস সেই হিসাবে আপনার অধিকাংশ লেখা দেখতে পারার কথা। লেখার শব্দগুলো আপনার সামনে তার প্রকৃত রূপ নিয়ে জেগে ওঠে। ‘বটগাছ’ বললে আপনার স্মৃতিতে থাকা উজ্জ্বল বটগাছটি মগজের মাটি ভেদ করে দাঁড়িয়ে যায় চোখের সামনে। আমাদের অধিকাংশ পাঠকের ইমেজ সিস্টেম খুব সচল শিশুশিক্ষার প্রকরণের কারণে। তারপর সেই বটগাছের একটা মোর‌্যাল মানে দাঁড় করাতে চাই আমরা। লেখার ভেতর একটা গল্প ও নীতি শিক্ষামূলক ব্যাপার থাকলে আমাদের আরো ভালো লাগে। কবিতা বলতে ছড়ার মতো অন্ত্যমিল থাকা চাই। বোদ্ধাদের কথা অবশ্য আলাদা এবং তাদের আলাদাই রাখলাম। ব্যক্তিগত পঠন-পাঠন ও সচেতনতা দিয়ে তারা বদলে নিয়েছেন তাদের অবচেতন। তবে অধিকাংশ যারা ঘরে প্রবেশ না করে শুধু ঘরের দরজা দেখেছে তাদের কাছে দরজা মানেই ঘর। অন্ত্যমিল, ছন্দ মানেই কবিতার পূর্বশর্ত।

প্রাথমিক কবিতার জ্ঞানটা জানা জরুরি এই সময়ের কবিতার প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন তা বোঝার জন্য। অধিকাংশ শিশুশিক্ষার সিলেবাস যেহেতু মোটামুটি এক সেহেতু আমাদের জনরুচিও সো ফার একই কবিতা বিষয়ে। কবিতা নামক যে হাতি তা আমরা সবাই মিলে একই রকম দেখি। সেই কারণে কবিতায় ইমেজ থাকলে আমরা সহজে দেখি ও আমাদের ভালো লাগে। যে কবিতায় গল্প থাকে, এবং সেই গল্পের আলোকে একটা পজিটিভ নৈতিক সমাপ্তি থাকে সেই কবিতা আমাদের পাঠক ভালোবাসে ও সহজে মনে রাখরত পারে। এটাই এ জাতির কবিতার স্পিরিট। এ কারণে জীবনানন্দের ইমেজ যত পাঠক সহজেই নিতে পারে, বুঝতে পারে, দেখতে পারে, তার অনুভূতির তীক্ষ্ণ জায়গা ছোঁয়ার সক্ষমতা কত জন পাঠকের আছে। আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো মননশীল কজনই-বা আছে অবশেষ সমাজে। জীবনানন্দ কি তবে পাঠকনন্দিত ইমেজ এবং গল্পের কারণে?

দেহের অন্যান্য প্রত্যঙ্গের চেয়ে চোখের ক্ষমতা বেশি। হয়তো সেই কারণে জীবনানন্দের ইমেজ আমাদের ভালো লাগে। কবিতায় ইমেজ পেলেই তা আমরা দেখতে সক্ষম হই। কারণ তার কবিতা দেখা যায়, গল্পটা শোনা যায়। বনলতা সেন, সমারূঢ়, আট বছর আগের একদিন, কমলালেবু ইত্যাদির মধ্যে গল্পের একটা চরিত্র পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের কবিতা বাংলা ভাষার ঈশপ, নীতি শিক্ষায় ভরা। কবি লালন ভাবুক, দিকনির্দেশক। নীতিশিক্ষা, গল্প, দৃশ্য সৃষ্টির প্রবণতা বাংলা কবিতার নেতিবাচক কোনো বিষয় না। এটাই আমাদের কবিতার ইতিহাস, আবহমানতা, ট্রেন্ড। তবে বিষয়গুলো চিহ্নিত করা জরুরি। কবি হিসেবে আপনি কী লিখতে চান সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হিসাব। আবহমান বাংলা কবিতা লিখতে চাইলে শিক্ষা, ছবি আর গল্পের মধ্যে থাকুন। বড়ো কবির কাতারে আপনার স্থান হবে। আর যদি ভাবেন নতুন কিছু লিখতে চান, তাহলে আপনাকে ভাবতে হবে আরো কিছু, এর বাইরে।


আসলে নিজের নামে জীবনানন্দ বা উৎপল বা জয় বা বিনয়ের কবিতাটাই লিখতে থাকি আমরা।


আমি সবার জন্য কমন শিক্ষাব্যবস্থার বিপক্ষে। সবাই, সব শিশু একই বই পড়বে কেন? তারা নতুন চিন্তা ছবি কিভাবে দেখবে? নানা শিক্ষাব্যবস্থার মানুষের জন্য সমান অধিকার ও সুযোগ তৈরি করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সেই রাষ্ট্রের কর্তব্য রাষ্ট্রকে না বুঝিয়ে একরকম শিক্ষাব্যবস্থা একটা অবান্তর ব্যবস্থা যে-কোনো দেশের জন্য। ইংরেজি মিডিয়াম, মাদরাসা-শিক্ষাব্যবস্থা বহাল থাক। সমাজে চিন্তা ও চিন্তা ইন্টারপিটিশন করার বৈচিত্র্য জরুরি। লক্ষ করে দেখবেন, মাদরাসাফেরত কবিদের লেখা ও জেনারেল লাইনে পড়া লেখকদের লেখার মধ্যে বিস্তর তফাত। কারণ কী? শিশুশিক্ষা ছাড়া আবার কী!

৪.
কয়েনেজ বা বাজওর্য়াড একটা সামগ্রিক বিষয়। কয়েনেজ শুধু বিশেষ কিছু শব্দ দিয়েই গড়ে ওঠে না। নানাভাবে তার ব্যাপ্তি। কয়েনেজ একাধিক শব্দের মিলনে গড়ে ওঠা শব্দগুচ্ছ বা কোনো ইমেজ, হতে পারে ক্ষেত্রবিশেষে অপূর্ণ পূর্ণ বাক্য। যে সমস্ত শব্দের ইঙ্গিত লেখকের লেখাকে আলাদা করে ফেলে অপরের লেখা থেকে, তা-ই কয়েনেজ, বাজওয়ার্ড। জীবনানন্দের ক্ষেত্রে যেমন উটের গ্রীবা বা বেতফল হলো বাজওয়ার্ড। একইভাবে উৎপলের জন্য বিশেষ ইমজে বা শব্দ কয়েনেজ না হয়ে তার লেখার সিনট্যাক্সই হয়ে ওঠে কয়েনেজ। কবির সিগনেচার বললে হয়তো আরো সহজ হয় বুঝতে। কবির সিগনেচার হীরকখণ্ডের মতো চির উজ্জ্বল অন্ধকারেও দেখা যায়। যারা কবিতায় এই সিগনেচার তৈরি করতে পারেন তারাই মহৎ কবি। ফলে মহৎ কবিরা তাদের কবিতা, শব্দ, ভাষা ভঙ্গি পুনরুৎপাদনের সব রাস্তাই বন্ধ করে দেন। পরবর্তী প্রজন্ম তার তৈরি করা ডিকশনটাকে এড়িয়ে যায়। ফলে মহৎ কবিরা অনুগামীহীন, নিঃসঙ্গ। কবিতার মধ্যে বড়ো কবিরা দুটো জিনিস ব্যবহার করেন। এক, তাদের সিগনেচার; দুই, শিল্প-সুন্দর-শব্দ বা শব্দহীরক। সিগনেচার কবির নিজস্ব। শব্দহীরক গড়ে ওঠে কবিতার ইতিহাসের ধারাবাহিকতায়। সিগনেচার-বদ্ধ কবির ডিকশন দ্বারা, শব্দহীরক উন্মুক্ত যৌথ চেতনার দ্বারা। কবিতায় কবির সিগনেচার অতিরিক্ত, প্রবল হয়ে উঠলে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগটা ব্যাহত হতে পারে। শুধু শিল্পিত করে তুলতে গেলে কবিতাকে তামেটাফিজিক্সের খোরো খাতা হয়ে উঠতে পারে। কবিকে এ দুইয়ের সামঞ্জস্য বিধান করতে হয়।

সিগনেচার কাব্যে যত বেশি ব্যবহার করা যায় ততই কবিতা দীর্ঘায়ু পায়। কবিতার অমরত্ব নেই। কেননা সে সজীব প্রাণ। জন্মায়, মরে যায়, আবার জন্মায়।

বহু কবি আছেন যাদের কবিতায় বাজওয়ার্ড, কয়েনেজ বা সিগনেচার কম। চিরন্তন বহু শব্দহীরক আছে তাদের কবিতায়। এই সকল কবিতার সহজ মূর্ততাই প্রাণ। চাঁদ, হাওয়া, বৃষ্টি, ফুল এসব ছাড়া কবিতা লিখেছে কে? যেমন ধরেন, বিনয় মজুমদারের চাঁদ অভিনব, জয় গোস্বামীর চাঁদ বিস্ময়কর। এভাবে বহু ব্যবহৃত শব্দের অর্থ ও সৌন্দর্যের নতুন নতুন বিকাশ, উদ্ভাসন হয় বড়ো কবিদের লেখায় ভিন্নভাবে। কবিতায় চাঁদ তো একটা ক্লিশে, ব্যবহারে ব্যবহারে জীর্ণ। তবু কেমন ভিন্ন অনুভব নিয়ে উদ্ভাসিত হয় তারা মহৎ কবির হাতে। শুধু শব্দ, পদ্ধতি, কৌশল দিয়ে কবিতায় আলাদা হওয়া যায় না। আবহমান শব্দহীরক দিয়ে যখন নতুন অপডেটেড জীবনের ভার্শনটা পাঠ করা যায় তখনই নতুন ভাষার জন্ম হয়, নতুন সিগনেচারের আভাস মেলে। কবিতার ডিকশন মানে সব সময় ভিন্নতা নয়। পুরাতন শব্দের নতুন মানে দেওয়ার সক্ষমতাই হলো নতুন কবিতা।

৫.
মহৎ কবির সৃষ্ট কয়েনেজের ফাঁদে আটকে যেতে দেখা যায় অনেক নবিশ কবিকে। লিখতে গেলে উৎপল, জীবনানন্দের আবিষ্কৃত শব্দ বা তাদের লিখন-ভঙ্গিমা, তাদের সময়, পাঠ্যাভাস অশরীরীর মতো লেখার মধ্যে ঢুকে পড়ে, তারপর লেখাটিকে ক্ষণ-আয়ু আর লেখককে শক্তিহীন জীবন দিয়ে চলে যায়। সোজা কথায়, অপরের প্রভাব থেকে মুক্তির উপায় কী? আমরা কেন অপরকে দিয়ে প্রভাবিত হই এই প্রশ্নের উত্তরই এর সমাধান।

কারণ আমরা সবাই ভালো লিখতে চাই। চাওয়াটা যৌক্তিক। কবিতা বা শিল্প করতে এসে আপনার ভালো লিখতে বা আঁকার তাগিদ, আশা থাকা স্বাভাবিক। সমাজ আপনাকে শ্রেষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত ও শিক্ষা দেয়। এখন সমকালীন সমাজে ভালোর স্ট্যান্ডার্ড কেমন? কোন বিষয়গুলো সমাজ স্বীকৃত? কবিতা লিখতে এসেই আপনি সমাজ গৃহীত কবিতার একটা মান পাবেন। কয়েনেজগুলো আর সিগনেচারগুলোই হলো কবিতা পরিমিতির স্কেল, ছাঁচ। সেই ছাঁচের ভেতরেই আমরা লিখে ফেলতে চাই নিজের কবিতাটি। কিন্তু আসলে নিজের নামে জীবনানন্দ বা উৎপল বা জয় বা বিনয়ের কবিতাটাই লিখতে থাকি আমরা। আমাদের জীবনের যে হিরো, আমরা যা হতে চাই প্রবলভাবে তাই আমাদের ‘আমি’ হতে দেয় না। ভালো লিখতে চাওয়ার চাপ আমাদের পথভ্রষ্ট করে। নতুন কবিতা লেখার প্রথম শর্তই রিস্ক নেওয়া, ট্র্যাডিশনাল ট্রেন্ডি কবিতা না লিখতে শেখা। খারাপ কবিতা লেখার মতো সাহস ক’জনের আছে! জীবনানন্দ তার সমকালের সবচেয়ে খারাপ কবিতাটাই লিখেছে সেই কালের বাংলা কবিতা মাপে। হিরো হত্যার মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন কবিতার ভিলেনের যাত্রা। ভালো কবিতার প্রত্যাশা ত্যাগ করুন, লিখে যান। না হলে নাই। এই সাহস না থাকলে নতুন কবিতা লিখতে আসার দরকার কী!


নতুন কবিতার শর্তই হলো সচেতনতা প্রকাশ। সমকাল লেখা থাকে তাতে।


জীবনানন্দ তো ইউরোপীয় কবিতার স্ট্যান্ডার্ডে কবিতা লিখেছেন বাংলায়। এই কবিতা ইংরেজিতে লেখা হলে তা হতো সেই ভাষার অ্যাভারেজ স্ট্যান্ডার্ড বোধ হয়। ইংরেজি কবিতার আবহমানতার আলোকে জীবনানন্দ ও টিএস এলিয়টকে পাশাপাশি দাঁড় করানো যাবে? উৎপল আর র‌্যাঁবো, কে বেশি উজ্জ্বল কবিতার ইতিহাসে? এই সমস্ত অবান্তর তুলনা আমি তা মানি। তার পরও আমরা ব্যথার সুখের পরিমাপ নিতে চাই, ব্যথার তীব্রতা মাপতে চাই। মানবিক চেতনার গাণিতিক মাপ হয় না। সে নির্ভর করে বহু ফ্যাক্টের ওপর। আমরা তুলনা না করলেও তাদের ফ্যাক্টরগুলো, তীক্ষ্ণতার মাপ নিতে পারি বিশ্বসাহিত্যের আলোকে। তা দোষের কিছু হবে না। মানবেন্দ্রিয় চেতনার দৃশ্যাবলি জীবনানন্দই প্রথম লিখেছেন বাংলা কবিতায়। বাংলায় ফরাসি কবিতার জন্মদাতা গুরু ও পিতা উৎপল। এটা কি দোষের কিছু? না, এটা দোষের কিছু নয়। শিল্প মৌলিক কোনো বিষয় নয়। ফলে ইউরোপীয় কবিদের সরাসরি অনুকরণ করে বা না করে জীবনানন্দ ও উৎপল তাদের কাছ থেকে ইন্সপাইরেশন নিয়ে রচনা করেছেন বাংলা কবিতা। এই কাজের ফাস্ট হ্যান্ড কপিয়ার হলেন তারা। কিন্তু জীবনবাবু ও উৎপল শিক্ষায় শিক্ষিতরা তাদের মতো লিখলে যা দাঁড়ায় তা হলো নকলের নকল। যোদ্ধা জাহাঙ্গীরের ‘জাঙ্গিয়া’ না পরার মতো ব্যাপার হয়ে যায়।

যার কাছে আপনি বারবার পরাজিত হন, সেই বিজয়ী মানুষটাই আপনি হতে চান। যে সর্বশক্তিশালী মানুষটাকে আপনি ঘৃণা করেন, দিন শেষে আপনি সেই লোকটাই হতে চান অবচেতনে। ঘৃণা শেষ পর্যন্ত ঘৃণাই শেখায়। জৈবসত্য হলো মানুষ এমনই। তাই খুব সচেতনভাবে আপনি যা এড়াতে চান, অবচেতনে সেই আপনাকে ঘোরগ্রস্ত লেখার টেবিলে সাহস জোগাবে। এর নামই ইন্সপাইরেশন। আপনি ঠিক সে না, তবে তার মতো ভালো লেখাটাই লিখতে চান, তার মতো হতে চান শিল্পে। এই অবচেতনকে এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো আরো সচেতন থাকা। অপরের কাছ থেকে ভালো লেখা শিখে ভালো লেখা লিখতে গেলে শুরু হয় সংকটের। লেখা শিখতে হয় নিজের কাছ থেকে। ইন্সপাইরেশনকে সচেতনভাবে ব্যবহার করতে হয়।

নতুন কবিতার শর্তই হলো সচেতনতা প্রকাশ। সমকাল লেখা থাকে তাতে।

মৃদুল মাহবুব

জন্ম ৯ অ‌ক্টোবর ১৯৮৪। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি করেন একটি বহুজা‌তিক কোম্পা‌নিতে।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
জল‌প্রিজমের গান [কবিয়াল, কলকাতা ২০১০]
কা‌ছিমের গ্রাম [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৫]
উনমানুষের ভাষা [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৭]

ই-মেইল : mridulmahbub@gmail.com