হোম বই নিয়ে প্রাণভরা শুধু যে বন্দেগি

প্রাণভরা শুধু যে বন্দেগি

প্রাণভরা শুধু যে বন্দেগি
759
0

একজন দুর্দান্ত কলামিস্ট যখন উদ্‌ভ্রান্ত পাখির মতো অচিন সুরে ফানাফিল্লা হয়ে যাওয়া একজন কবির কথা বলেন, তখন প্রশ্ন জাগে, এই কবি কি তিনি নিজেই? নাকি অন্য কেউ? অথবা, তিনি কি তারই ভেতরে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো বসে থাকা সহস্র যুগের কোনো এক প্রাচীন এক কবিসত্তা?

বলছিলাম বর্তমান সময়ের একজন জনপ্রিয় কলামিস্ট ফারুক ওয়াসিফ এবং তার কবিতাগ্রন্থ তমোহা পাথর-এর কথা।

গ্রন্থটির পাঠ-পরিক্রমার শুরুতেই অদ্ভুত এক আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়ে যায়, যখন তিনি বলেন, ‘আমি এক লোক/ আমার থেকেও ফেরারি অনেক পাখি’, আর অনুভূত হতে থাকে কেমন যেন এক গহিন সাগরের খরস্রোতা টান, যেখানে টিকে থাকা কঠিনই নয়, কিছুটা দুরূহ। নিমেষেই দেখা মেলে ‘রোদ থেকে সোনা, দেখা থেকে রূপ, জল থেকে রূপা’। শব্দের ঝনঝনি কিংবা অপূর্ব চিত্রকল্প কিংবা কিছুই না অথবা নিছক ‘সোনামাছি’। এই সোনামাছির পুঞ্জাক্ষির জাদুতে ‘অন্ধ কেউ স্বপ্ন দেখে—দেখার পরপারে’। কেমন যেন একটা মেঠো পথে খালি পায়ে এক ‘আরশের রাতে উড়ে যান উড়ালের দম ভ’রি’। তিনি ঠিকই জানেন ‘যাহা নাই, তা দেয়ার নাম প্রেম’, আর তাই বলেন—

অন্ধকারে আসি এক অন্ধকার ঢেউ,
অন্ধের আঙুল ধরো আরও অন্ধ কেউ।

যেহেতু কবি ফারুক ওয়াসিফ আমার পরিচিত তাই তার কবিতাগ্রন্থ পাঠের সময় সবচেয়ে কঠিন যে চ্যালেঞ্জটির সামনে পড়তে হয়, সেটি হলো কবিকে সবার আগে অচেনা করে ফেলা। কারণ নির্মোহ বিশ্লেষণ ও পাঠের ক্ষেত্রে যদিও কোনো কোনো সময় ব্যক্তিকবিকে চিনলে তার কবিতা উপলব্ধি করা সহজ হয় কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কবিতার নিগূঢ় তত্ত্ব এবং নিখাদ ভাবনার জগতে নিজের মতো করে পরিভ্রমণের বিচ্যুতি ঘটে। তা আরও বেশি উপলব্ধ হলো একজন কবিবন্ধুর সাথে ফারুক ওয়াসিফের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে। কারণ ব্যক্তি ফারুক ওয়াসিফের কলাম তাকে এতটাই আবিষ্ট করে ফেলেছে যে, সে ফারুক ওয়াসিফের কলাম ছাড়া কিছুই পড়ে না, পড়তেও চায় না।


ফারুক ওয়াসিফকে যখন সবাই বলেন কলামিস্ট, কবি, আমি তখন বলি কনফার্মিস্ট, সাধক।


তাই সিদ্ধান্ত নিই কবিকে অচেনা করে গ্রন্থটি পুনরায় পাঠের। আর তখনই যেন পেয়ে গেলাম এমনই এক কবিকে যিনি অবলীলায় বলেন ‘চাঁদ এক কীর্তিনাশা’। এই অচেনা কবির কবিতার পরতে পরতে খুঁজে পেতে থাকি অন্যরকম কিছু শব্দের ঝংকার, অনন্য চিত্রকল্প। যেমন ‘আকাশমরা ছায়া, সন্ধ্যাদেশ, শ্বাসাঘাত, হরিৎ বাতাস, আঁধার ঝলক, সন্ধ্যাবাড়ি, নিবু নিবু ট্রেন, বিষপাখা ঝড়, ঘুমের বিমান, চন্দ্রদীঘলিয়া, শুদ্ধতম হাড়, চন্দ্রতোয়া আলো’। শব্দ নিয়ে খেলা যেন তার কাছে ছেলেখেলা। যেমন ‘জলে নাই আর জলের সিনান, নিবু নিবু কুয়াশার কপি, রক্তনেকড়ে মন, বুক ক্ষয়ে ক্ষয়ে হাঁটে’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

ফারুক ওয়াসিফকে যখন সবাই বলেন কলামিস্ট, কবি, আমি তখন বলি কনফার্মিস্ট, সাধক। কারণ তার দেখার চোখ ভিন্ন। সমাজকে তিনি তৃতীয় চোখে দেখেন, অন্তর-চক্ষু দিয়ে বিশ্লেষণ করেন, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে ছড়িয়ে দেন তার বিচ্ছুরণ। তাই সাধারণ চোখ যখন দেখেন রিফিউজি ক্যাম্প, তিনি সেখানে দেখেন ‘রোহিঙ্গা পাহাড়’। যখন ‘ভোরবোলা বয়ে যায় স্নেহের বাতাস’ তারও গহিনে তিনি উপলব্ধি করে বলেন : ‘তবুও দুঃখতোয়া বৃষ্টি লাগে গায়’। তার এই দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা একজন পাঠককে ভাবিয়ে তুলবে, শিখিয়ে দিবে কিভাবে দেখতে হয়, বুঝিয়ে দিবে কিভাবে বুঝতে হয়।

ব্যক্তিকবির দর্শন তার কাব্যিকতায় বিন্যাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তমোহা পাথর গ্রন্থটি। চমকপ্রদ বর্ণনায় মনে হয় তিনি চট করে বলে ফেলেন নিজের কথাগুলো। শব্দের ব্যবহারে তাই তিনি সর্বদা স্বাধীন। একেবারের প্রাত্যহিক ব্যবহৃত শব্দ থেকে শুরু করে প্রমিত বাংলা কিংবা ভিনদেশি বিশেষত আররি/ ফার্সি শব্দের ব্যবহার চোখে পাড়ার মতো। অবলীলায় তিনি কবিতায় হাতের তুড়িতে বসিয়ে দিয়েছেন ‘চিক্কুর’-এর মতো এমন একটি শব্দ, সাধারণ দৃষ্টিতে যে শব্দটির কোনো কব্যিক মান ভাবাও দুষ্কর। একইভাবে তিনি ব্যবহার করেছেন ‘দিগ্‌দারী’র মতো শব্দও।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজও বাংলার অর্ধ-শিক্ষিত সেক্যুলার, বলা ভালো সিউডো-সেক্যুলার, এই মর্মে জ্ঞান দিতে চায়, কিভাবে আপনি সর্বজনীন লেখক হবেন। তাদের দাবি হলো, আপনার লেখায় কোনো ধর্মীয় অনুষঙ্গ মায় ধর্মীয় কোনো শব্দ থাকতে পারবে না। থাকলে আপনি গোষ্ঠীলেখক বা সাম্প্রদায়িক লেখক হয়ে যাবেন। ভাষাকে ধর্মী শব্দের ‘আছর’ থেকে মুক্ত করাই আপানার লেখক-জীবনের এমনকি জাতীয় জীবনের একমাত্র সংগ্রাম। (বাদ-মাগরিব, মক্কা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড, সোহেল হাসান গালিব)


একজন স্বাধীন কবিসত্তার খোঁজ মেলে তমোহা পাথর গ্রন্থের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়।


কবি ফারুক ওয়াসিফের তমোহা পাথর কবিতাগ্রন্থের পাতায় পাতায় রয়েছে এইরূপ সিউডো-সেক্যুলার পাবলিক যারা ধর্মীয় শব্দ ব্যবহারে কুণ্ঠাবোধ করেন কিংবা অন্য কোনো অর্থ খুঁজে পান না কিংবা নিতে চান না, তাদের জন্য দৃষ্টান্ত। কারণ, এই গ্রন্থে চিরায়ত বাঙলার রূপ বর্ণনায় কবি যেমন বলেছেন : ‘দূর এক সন্ধ্যাদেশ থেকে আমি আসি, সেখানে বরষা আসে—কুয়াশাও হয় খুব, বাতাসের স্ক্রলে জমা কথিত ভাষার গান, দাহকালে ফাটে গাছ, কান্নাবামি করে মাটি’ অথবা ‘কল্পনায় থাকে দেশ, ভাষা তার পরকাল আর কিছুই নাই’, তেমনই অবলীলায় বলে যান, ‘ক্রন্দন বকুল ঝরাতে ঝরাতে মেরাজে যাচ্ছেন নবী’ অথবা, ‘অন্ধকারে মিলছে দুটি হাতে, এক মোনাজাত, বিজোড়ে বিজোড়ে মিলেছে একই আয়াত’। একইভাবে বলে যান ‘মোরগ-মাথায় চড়া, লাল নিধি এক আউলিয়া’। আবার একই কবিতায় তিনি বলতে দ্বিধা করেন নি—‘বদনাম হে বদনাম হে, কুমকুম হই রাধিকার’।

একজন স্বাধীন কবিসত্তার খোঁজ মেলে তমোহা পাথর গ্রন্থের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়। যেমন এক আসমানের পর আরেক আসমান, সম্পূর্ণ ভিন্ন কিন্তু অচেনা নয়। মনে হয় কোথায় যেন দেখেছি।

কিন্তু এতসব চেনা জানার মধ্যে কিছু কিছু কবিতার পাড়ে এসে ধাক্কা খেতে হয়। যখন শুনি কবি বলেন, ‘ধরো যদি আমি, আত্মহত্যা করি তোমার ভেতর’ অথবা, ‘আমি তার কাঁধ ধরে কাঁদি’ কিংবা ‘সাগরে ডোবার আগে, বুকভরা জল নিয়ে, কত কী যে আকুলতা করে নদী’।

আবার কোনো কোনো স্থানে এসে মনে হয় যেন একটা ঝিরিঝিরি বাতাস কানের পাশ দিয়ে চলে গেছে একটি স্নিগ্ধ নদীর অববাহিকায়, এক নীরব চলনে, যেমন—

যে-স্মৃতিরা আজ কবরের মাঠ/ হাসি যেন তার সমাধিফলক।

রক্তনেকড়ে মন/ চাঁদ উঠবে কখন/ জোছনায় আজ অচিন তরাস/ পেছনে ফেলেছে বুকচেরা শ্বাস

আবার এই স্নিগ্ধতার মাঝে কবি বলে ফেলেন তার বেদনা, যার সমস্ত কিছু শুষে নেয় হাজরে আসওয়াদ নামের এক তমোহা পাথর। যেমন :

নিজ দেশে নির্বাসিত আমরা কিছু লোক/ এক চোখে জ্বালা আর অন্য চোখে শোক…

সেই থেকে দেয়ালে দেয়ালে খুঁজছি আমারই গুম হওয়ার সংবাদ

সেসব রাতে ওরাই মরে/ হাওরে এবং ক্রসফায়ারে

আমারই প্রেত আজ আকাকেই খাক/ আয়নার ধ্বংসফেনায় আয়না ভেসে যাক

কাঁদনের সুর চিরকাল এক গ্রামীণ উপমা

কবির ভেতরে বয়ে চলা শব্দমালায় স্বপ্রণোদিতভাবে ঘটে যাওয়া অন্ত্যমিলগুলোর পাশে পাশে কিছু কিছু স্থানে এসে মনে হয় আরোপিত, যার কারণে কোনো কোনো স্থানে কবিতার সৌন্দর্য হানি ঘটেছে বলে মনে হয়েছে, যেমন :

অরুন্ধতী, স্বতী আর তমা;
আমার আঙুল মাটি হয়ে ঝরে
পুড়ে শুধু ঝামা


যিনি অবচেতন মনে সহসাই হয়ে যান অচিন সুরে ফানাফিল্লা।


আবার যখন দেখি কবি নিজেই বলছেন, ‘রংমিস্ত্রি আনো, মুছে দাও স্মৃতির লেপন/ শোচনার সোনাসুচে অন্ধ করো চোখ।/ চুনকালি করে দাও শব্দ, চিহ্ন, অক্ষর, সুরত’। তখন মনে হয় এই ক্ষেত্রে কবির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, কারণ একজন কবি দিনশেষে তার আত্মতৃপ্তির জন্য সৃষ্টির মহানন্দে মেতে থাকেন।

ফারুক ওয়াসিফের কাব্যিকতায় জীবনানন্দীয় নির্যাসের কাছাকাছি এসে সম্পূর্ণ নিজস্ব ঢঙে বাঁক নিয়ে আপন গন্তব্যে চলে গিয়েছে বলে মনে হয়। যেমন—

কমল যোনির কোঁয়া ফেটে যদি আমি/ জন্মাই আবার এক—নির্বাক পাথর/
তাতে যদি লেখা থাকে সুরবহ কোন গান,
….
এ জন্মে তোমায় চিনে নিয়েছি,/ সে জন্মে তুমি করো পাঠ—/
এ জীবন করো পুনারায় বিরচণ

ইঙ্গিতময়তায় সিদ্ধহস্ত কবি ইশারায় বলে গেছেন অনেক কিছু। যেমন : ‘গ্রামের দিকে যাবে। অসুখের মাঠে ছিটানো ধান কত খুঁটে খুঁটে খাব। লিখে আর কী কাজ—দয়ালের?’ অথবা, ‘এ নদীতে জ্বলবে কি জোনাকিরা আর?’

তমোহা পাথর যেন কবির এক আরাধনার নাম, সুফিসত্তায় যেখানে তিনি নিতান্তই নিরীহ একজন, চতুর্থ আসমানে করেন বসবাস। অজস্র অভিযোগ অনুযোগের ভেতর যার ধ্যনে আর জ্ঞানে কবিতার হালচাষ, ফসল ফলিয়ে যিনি প্রতি সুবাহ-সন্ধ্যায় দু’হাত তুলে মোনাজাতে বলেন : ‘ইবাদত নাই গো আমার, প্রাণভরা শুধু যে বন্দেগি, দুষ্কালে ফুটেছি হেন চোখ, আসমানে খুঁড়ছি খরা নদী’। নিঃসন্দেহে তাই আমার সেই বন্ধুটিকে বললাম, তমোহা পাথর গ্রন্থটি কলামিস্ট ফারুক ওয়াসিফের নয়, এটি যেন অন্য কোনো এক সাধক কবি ফারুক ওয়াসিফের হৃদয়ের ফুলবাগানের গোলাপজল, আতরের নির্যাস; যিনি অবচেতন মনে সহসাই হয়ে যান অচিন সুরে ফানাফিল্লা।

মোক্তার হোসেন

জন্ম ৬ এপ্রিল ১৯৮২, লক্ষ্মীপুর। স্নাতকোত্তর, মৎস্যবিদ্যা, ঢাকা কলেজ। পেশা : চাকুরি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
একটি লাল ঘুড়ি এবং আমি [জেব্রাক্রসিং, ২০১৭]
মহুয়া মাতাল হলে [বেহুলা বাংলা, ২০১৭]

ছড়া—
মগজবিহীন গাধার দল [তিউড়ি প্রকাশন, ২০১৭]
ধুর শালা কস কী [অগ্রদূত অ্যান্ড কোং, ২০১৯]

গল্প—
আইসিইউ বেড নম্বর নাইন [বেহুলা বাংলা, ২০১৮]

শিশুসাহিত্য—
রোদবৃষ্টির মিষ্টি ছড়া (ছড়া) [টাপুর টুপুর, ২০১৮]

ই-মেইল : hossain.mokthar@gmail.com