হোম বই নিয়ে পাণ্ডুলিপি পাঠ : সোহেল হাসান গালিবের ‘ফুঁ’

পাণ্ডুলিপি পাঠ : সোহেল হাসান গালিবের ‘ফুঁ’

পাণ্ডুলিপি পাঠ : সোহেল হাসান গালিবের ‘ফুঁ’
492
0

পাঠ-অভিজ্ঞতা

সুমন রহমান

আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সোহেল হাসান গালিবের যে প্রকাশিতব্য বই, তার সম্পর্কে, সেই পাণ্ডুলিপি-পাঠের অভিজ্ঞতা জানানোর জন্যে। গালিব তো বিখ্যাত কবি। তার সম্পর্কে বলাটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আমি তার কবিতা পছন্দও করি। তো, পাণ্ডুলিপি আমাকে যখন পাঠানো হলো, আমি বেশ কয়েকবার পড়েছি, আজকে আসতে আসতেও পড়লাম। পড়ে যেটা মনে হলো, গালিব এখানে খুব ‘অনুচ্চাভিলাষী’, শব্দটা ঠিক হয় কিনা জানি না। তাকে অনুচ্চাভিলাষী মনে হলো এই জন্য যে, নামটা ‘ফুঁ’। আমি চিন্তা করলাম, এখন তো আমরা বইপত্র লিখি, লিখে চিন্তা করি যে, এই পুরস্কার সেই পুরস্কার নানাবিধ পুরস্কার আছে, যেখানে গুরুগম্ভীর বিচারকরা বসে থাকেন। তারা যখন একটা বই পাবেন, যেটার নাম হচ্ছে ‘ফুঁ’, ঐ বইকে তারা তো সহজে পুরস্কার দিতে চাইবেন না। ভাব-গাম্ভীর্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয় যে, গালিবের এই কবিতার টোনের মধ্যে, কবিতার এই পাণ্ডুলিপির মধ্যে এরকম একটা খুব হালকা ব্যাপার তিনি সযত্নে তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। যে কারণে তিনি নাম দিয়েছেন ‘ফুঁ’। এটা আমাদের বিদ্যমান পয়ারে রচিত যে সাহিত্যরুচি তার সঙ্গে খুব একটা যায় না। কবিতাগুলো পড়লেও এরকম টের পাওয়া যায়। তিনি বলছেন যে,’ নিশ্চিত যে শব্দ ছাড়াই কবিতা লেখা যায়, কিন্তু আমি তা পারি না’। যে কারণে নানাবিধ শব্দ তাকে ব্যবহার করতে হয়। শব্দ-ব্যবহারে গালিবকে যেভাবে আমরা চিনি, গালিবের বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ আপনারা পড়েছেন, গালিবকে আপনারা হয়তো বলবেন তিনি চিরায়তবাদী বা ক্লাসিসিস্ট; গালিব এই ধরনের ধারণাকে ভাঙবার চেষ্টা করেছেন এই বইতে, আমার যেটা মনে হলো।

একটু আগে যিনি আলোচনা করলেন, সুমন সাজ্জাদ, তিনি জাকির জাফরানের কবিতা নিয়ে বলেছেন, ওখানে আমি একটা উদ্ধৃতি দেখলাম, ইনবক্স, পাসওয়ার্ড, সোস্যাল মিডিয়া ইত্যাদি নানাবিধ অনুষঙ্গ আসছে। গালিবের কবিতাতেও আমরা এরকম প্রচুর অনুষঙ্গ দেখব। এটা খুব ইন্টারেস্টিং একটা টাইম, এই জন্য যে, আমরা যারা তিরিশ থেকে আশি-নব্বই পর্যন্ত পয়ার-শাসিত কাব্যরুচি দ্বারা নির্মিত কবি, তাদের সামনে হঠাৎ যখন স্যোশাল মিডিয়া চলে আসল, এই স্যোশাল মিডিয়াকে আত্মস্থ করার একটা বিষম যাতনা কিন্তু তারা বোধ করতে লাগলেন, আমরা সবাই বোধ করতে লাগলাম। এবং নানাভাবে নানাজনের কবিতায় আমরা কিন্তু এই স্যোশাল মিডিয়াকে আবিষ্কার করি। এই আবিষ্কার করার প্রক্রিয়ায় আমি খুব অস্বস্তি বোধ করি এজন্য যে, আমার যেটা মনে হয়, এগজ্যাক্টলি গালিবের কবিতায় সেটা পেয়েছি বলব না, সব মিলিয়ে আমার যেটা মনে হয় যে, হঠাৎ করে একটা পয়ারের মধ্য দিয়ে ‘পাসওয়ার্ড’ এবং পাসওয়ার্ড শব্দটাকেও চার মাত্রায় এনে ঠিক পয়ারের ফর্মে, সনেটের ফর্মে ঢুকিয়ে দিয়ে… আমি বলতে চাচ্ছি যে, স্যোশাল মিডিয়ার যে ভাষা সেই ভাষার মধ্যে আমরা ঢুকে না গিয়ে আবহমান কবিতার যে ভাষা তার মধ্যে স্যোশাল মিডিয়াকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসার চেষ্টা আমরা দেখছি এখানে। মে বি এটা একটা প্রক্রিয়ার অংশ। মে বি আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কোনো কোনো কবিকে ভিন্ন ভিন্ন চেষ্টা করতে দেখব। কিন্তু এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল, একটা সময়ের, যে, আমরা শিখছি। আমরা একটা নতুন ভাষাভঙ্গিমা শিখছি। সেই নতুন ভাষাভঙ্গিমাটা হাইব্রিড হবে সেটাই স্বাভাবিক। ফলে এই রকম একটা মেলবন্ধন আমরা এই সময়ের কবিদের মধ্যে দেখতে পাই।

এবং আরও একটা জিনিশ, যেটি গালিবের কবিতায় আমি আবিষ্কার করি, এটাকে আমি কী বলব বুঝতে পারি না, এটাকে কন্ট্রাডিকশন বলা যায় কিনা, মানে তিনি একটা কন্ট্রাডিকশকে প্রায়শই হাজির করার চেষ্টা করেন। যেমন ধরা যাক, তিনি বলছেন যে, ‘পর্নোচিত্র-পরিচালকের হজযাত্রা নিয়ে গল্প শুরু হলো সবে’। পর্নোচিত্র-পরিচালক এবং তার হজযাত্রা—নিশ্চয়ই পর্নোচিত্র-পরিচালক হজ করতেই পারেন। এরকম আরও একটা জায়গা আমি বলি, না হলে মনে হবে যে আমি একটা দৃষ্টান্ত দিয়েই কোনো ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছি। একটা জায়গা আছে, তিনি বলছেন যে, ‘অর্শ-গেজ-ভগন্দর নিরাময়বার্তা তুলে দিয়ে/ নালায়েক মানুষের হাতে/ কখনো রতিসুখের গতিপথ হয়তোবা নিজেকেই বাতলাতে/ বাতলাতে, ইসলামি চটিবই লিখে চলি স্বপ্নে’। একদিকে অর্শ-গেজ-ভগন্দর নিরাময়বার্তা, সেই চটিবই, একই সঙ্গে ইসলামি চটিবই। এটা খুব মজার একটা বিষয় যে, গালিব কিন্তু কোনো ভ্যালু-জাজমেন্ট করছেন না। আমার যেটি পছন্দের যে, গালিবের মধ্যে একটা ভ্যালু-জাজমেন্ট তৈরি হচ্ছে কোথাও, কিন্তু গালিব যেহেতু খুবই বাঁকা কবি, তিনি ভ্যালু-জাজমেন্টে যাচ্ছেন না। আমরা যদি একটু ডিসকার্সিভ জায়গায় যেতে চাই যে, একটা ক্যাপিটালিস্ট সোসাইটিতে যেভাবে জিনিশগুলি আসলে সম্পাদিত হয়, পাশাপাশি, দুটো কন্ট্রাডিকশন, কিন্তু মিলেমিশে থাকে। অর্থাৎ আমার চিন্তার মধ্যে কন্ট্রাডিকশন, কিন্তু আমি খুব অবলীলায়, স্বচ্ছন্দে এবং সুখে আমরা দুটোকে লালন করছি। গালিব সেটিকে হাজির করছেন। নৈতিকতার প্রশ্নে আমরা যারা সাবেকি, আমি গালিবকে সাবেকি নৈতিকতার দলের লোকই মনে করি, ফলে গালিব খুব সার্টল একটা প্রশ্ন রেখে যান। আমি ভাবি, আরও পরের যারা কবি, তারা এরকম একটা অবস্থা বা সিচুয়েশনকে যদি হাজির করতে চান, তারা কিভাবে করতে পারেন। তারা এখনও করেছেন কিনা আমি জানি না, তবে একই রকমের ভাবনা আমরা ফেসবুক স্ট্যাটাসে পাই। সেখানে আমরা দেখি যে, তারা অনেক বেশি ভ্যালু-ফ্রি, কিছু আসে যায় না। এই যে ‘অর্শগেজ চটিবই, ইসলামি চটিবই’ ভাই-ভাই, তাদের কাছে এটা কোনোরকম বোঝাপড়া ছাড়াই ভাই-ভাই। আর গালিবের কাছে হয়তো একটা বোঝাপড়ায় গিয়ে ভাই-ভাই হতে হয় আর কি। পার্থক্যটা এখানে।

এরকম কিছু বিষয় এই বইতে পেয়ে আমি অনেক ভাবনার খোরাক পেয়েছি। যেটি আমার কাছে খুব জরুরি মনে হয় কবিতার ক্ষেত্রে, কবিতা আমি যখন পড়ি। সেটি হচ্ছে যে, কবিতা আমাকে কী দেবে? মানে কবিতা আমি কিভাবে পড়ব সেটা নিয়ে আমার কিছু ভাবনা গালিবের বই পড়তে পড়তে এসেছে। গালিবকে আমি ধন্যবাদ দিব যে, এই চিন্তাগুলো আমি জড়ো করতে পেরেছি এই বইটা পড়ে। প্রথমত, কবিতা যে ভোকাবুলারি হাজির করবে, সেখান থেকে আমি অবশ্যই একটা সমাজ ও একটা সময়কে শনাক্ত করতে চাইব। এবং কবি যে শব্দ-বন্ধ এবং মুহূর্ত নির্বাচন করবেন, সেখান থেকে আমি কবির এবং কবিতার রাজনীতি বুঝতে চেষ্টা করব। আর অন্যসব ফর্মেটিভ ইস্যু যেগুলো আছে—উপমা-উৎপ্রেক্ষা, ভাষার ব্যবহার— সেগুলো তো আছেই, সেগুলো নিয়ে নিশ্চয়ই আমরা অনেক কথা বলতে পারব। কিন্তু এর বাইরে যেটি—’রস’ বলেছেন সুমন সাজ্জাদ—রস বা সৌন্দর্য—আমি মনে করি যে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যতই তার রাজনীতি, সমাজনীতি বা অন্য অনেক অনুষঙ্গ—আইডেন্টিটি ইডিওলোজি—সেগুলো আপনি হাজির করুন না কেন, আমরা যেটা দেখব কবিতায় সেটা হচ্ছে যে, এসব কিছু যে সুতায় আপনি সেলাই করেছেন সে সুতাটি আসলে সৌন্দর্যের সুতা কিনা। সে সুতাটি আমাকে আসলে কতখানি আকৃষ্ট করছে। তারপরে হচ্ছে আপনি কত মহত্তর প্রসঙ্গ নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন, তার হিশাব না হয় আমরা পরে করব। গালিব আসলে তার বইয়ে যেটি করতে পেরেছেন সেটি হচ্ছে যে, সেই সুতাটি তিনি আমাদের দিতে পেরেছেন, যে সুতাটি সৌন্দর্যের, একান্তভাবেই। আমি জাস্ট একটি কবিতা আপনাদের একটু পড়ে শোনাই। ব্যক্তিগতভাবে আমি কবিতা খুব বেশি মনে রাখতে পারি না। কোনো কোন কবির হয়তো দুটো-তিনটা কবিতা, একটা-দুটো কবিতা আমি সারা জীবন ধরেই মনে রাখি। এই বই থেকে অন্তত একটা কবিতা আমি জীবনভর মনে রাখতে পারব। সেই কবিতাটি আপনাদের সাথে আমি একটু শেয়ার করতে চাই। কবিতাটার নাম হচ্ছে ‘ভুল’ :

একটা বিষণ্ন কদম গাছ।
গাছের গায়ে আঁচড় দিয়ে কেউ
লিখে গেছে ‘জুই’।

যেন ভুল বানানে ফুলের ভুল নামকরণ।

ঐ নামের গভীর ক্ষত বেয়ে আজ নামছে
বৃষ্টির নরম শীতল ফোঁটা।

দূরে আমি দাঁড়িয়ে আছি
পকেটে চন্দ্রবিন্দু নিয়ে। দাঁড়িয়ে আছি
সমস্ত জীবন।

তো, আমার কাছে মনে হয়েছে যে, কবিতা এরকমই। এটাই কবিতা। আপনি যদি আমাকে ব্যাখ্যা করতে বলেন, আমি তো ব্যাখ্যা করতে পারব না। গালিবকেও যদি ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, ব্যাখ্যা করতে গেলেই নষ্ট হয়ে যাবে। এটা এমন একটি চিত্র, যেটা আসলে এই ফর্মেই বেস্ট এক্সপ্রেস্‌ড। এর চেয়ে আর কোনো ফর্ম নাই যে, এই ধারণাটিকে আমি এক্সপ্রেস করতে পারি। ফলে আমি ভেবে রেখেছি যে, এই কবিতাটি কেবল আবৃত্তি করেই আপনাদের ওপর ছেড়ে দিয়ে যাব, আমি ব্যাখ্যা করার সাহস করব না, কারণ সেটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। সেটা আমার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হবে, কবিতার জন্য তো বটেই। তো, আমি মনে করি যে, একটা বইতে এরকম একটি-দুটি কবিতা থাকাই যথেষ্ট। আর বাদবাকি কবিতা, যেগুলো গালিব লিখেছেন, সেগুলোও ভালো কবিতা। সেগুলো থেকে আপনারা অনেক ইন্টারেস্টিং জিনিশ পাবেন। তিনি অনেক মস্করা করার চেষ্টা করেছেন। কিছু কিছু মস্করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণই মনে হয়। যেমন তিনি একটি কবিতা লিখেছেন, ক্যাসিনো-কসম, সেটি হচ্ছে :

গুটিকয় মদের বোতল আর মাগি নিয়ে যদি কোনোদিন
এই দেশ থেকে ভাগি, একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা
অন্তত লাগিয়ে যাব।

তুলসীতলায় গিয়ে সাঁঝবেলা ডাক দিব : মালু, মালু…
সেহেরিতে তেহারি খাওয়াব, শূকরের মাংস দিয়ে আলু।

পালাব সমুদ্রপথে, তুর্কিনাচ নেচে, দরিয়ার ঘূর্ণিপটে—
ডোবাব পাপের বোঝা পুণ্যঢেউ তুফান-সংকটে।

এই যে মালু এবং আলু, মাগি থেকে ভাগি—এই অন্ত্যমিল মধ্যমিল দিয়ে তিনি একটি মস্করা করেছেন এবং আমাদের যে দেশভাগের অভিজ্ঞতা, বিগত পঞ্চাশ-ষাট বছরের নানাবিধ অভিজ্ঞতা, তার মধ্যে এই কবিতাটিকে দাঁড় করালে কিন্তু খুব বিপদের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমি এটিকে খুব ইতিবাচকভাবে দেখি এই জন্যে যে, অনেক হয়েছে, এই ট্রমা—আজকেই কার যেন বক্তৃতা শুনছিলাম, ‘দেশভাগের ট্রমা’—উই হার্ড এনাফ অব ইট। ট্রমা নিয়ে কতরকমের বই, গল্প! এখন এই দেশভাগ, হিন্দু-মুসলমান, সংখ্যালঘু ইত্যাদি নানাবিধ সুন্দর সুন্দর শব্দবন্ধ আমরা বের করেছি—খুব সতর্কতার সাথে যার মাধ্যমে আমাদের প্রকাশ করতে হবে, একটু এদিক-সেদিক হলে আপনি সাম্প্রদায়িক, আপনি অমুক, আপনি তমুক; এই বিপদের যে একটা বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, গালিব, আমার মনে হয় যে, এতে একটু বিরক্ত হয়েছেন, হয়ে চিন্তা করলেন যে, আচ্ছা সরাসরি একটু লিখে দেখি কেমন হয়। এই যে মালু বা সেহেরিতে তেহারি খাওয়াব শূকরের মাংস দিয়ে—এরকম কিছু আলাভোলাভাবে, মানে গালিবের ভঙ্গিটা খুব মজার, গালিব কিন্তু খুব সিরিয়াসলি এগুলা লেখেন না। যদি কোনো কারণে তাকে কোনো হিন্দু বা মুসলমান জঙ্গি তাকে আটকায়, তিনি বলবেন, আমি তো ভাই মস্করা করেছি। এবং ভঙ্গিটার মধ্যে একটা মস্করা আছে। ফলে এরকম মস্করার ভঙ্গিতে পুরো ডিসকোর্সটা নিয়ে তিনি আসলে খেলার চেষ্টা করেছেন। আরও বিশ বছর আগে এইসব বিষয় নিয়ে ব্লগে আমরা যখন ঐ ন্যারেটিভ থেকে বেরোবার চেষ্টা করতাম, প্রচুর লোক ছিল যারা প্রুফ রিড করতেন, ভয়ঙ্কর—আপনি তো এটা বলেছেন, আপনি তো ফরহাদ মজহারের দালাল, আপনি এটা বলেছেন, আপনি তো আসলে একটা হিন্দু রাজাকার। এরকম নানাবিধ শব্দ কিন্তু তখন প্রচলিত ছিল। গালিবও নিশ্চয়ই এগুলো তার প্রথম জীবনে শুনে থাকবেন। সে কারণেই হয়তো তিনি এই জায়গায় এসেছেন যে, এভাবে বলা যায় কিনা।

আমি আর দুএকটা কথা বলে শেষ করব। প্রথমত, এই বইটি বেরুচ্ছে, এই বইটি আপনারা পড়বেন। আমি অত্যন্ত দুঃখিত, এই অনুষ্ঠানের একটা রিচুয়াল ছিল যে বক্তব্যের একটা সারাংশ লিখতে হয় পরস্পরের জন্য, সবাই লিখেছেন; আমার কপালই এত খারাপ, লিখবার সময়ই করতে পারি নাই প্রথমত, দ্বিতীয়ত হচ্ছে যে, কিছু অস্বস্তি আমার ছিল এই পাণ্ডুলিপি নিয়ে এবং আমার নিজের কবিতা লেখার ব্যাপারে আমার নানাবিধ চিন্তাভাবনা নিয়ে। নানান কারণে আমার মনে হলো যে, এখন আমি যা লিখব সেটা ঠিক লিখব কিনা, সেটা আমার প্রতি আমার সুবিচার হবে কিনা বা গালিবের প্রতি আমার সুবিচার হবে কিনা। সে কারণেই লিখতে আমি খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য পাই নাই।…

তিনি অনেক দূর যাবেন, তিনি অনেক বড় কবি, নিশ্চয় এখনই অনেক বড় কবি। কালক্রমে আমরা বাংলা সাহিত্যের যে সংক্ষিপ্ত তালিকা, অতি সংক্ষিপ্ত তালিকা, সেখানেও আমরা গালিবকে আবিষ্কার করব। তার বইয়ের জন্য অগ্রিম শুভকামনা থাকল। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।

[বক্তৃতার অনুলিপি, সংক্ষেপিত]

পাণ্ডুলিপি থেকে কয়েকটি কবিতা


ফুঁ

নিশ্চিত যে, শব্দ ছাড়াই কবিতা লেখা যায়। কিন্তু আমি তা পারি না।
আমি যা পারি না, সেও অবলীল পৃথিবীতে ঘটে।
যেমন কারুর বউ নিয়ে ভেগে যাওয়া। এই পৃথিবী এমনই।
ভেগে যাওয়া থেকে ভাগ-বসানোর কথা মনে হয় বটে।
খুনও তো সম্ভব রক্তপাত বিনা। সূর্যাস্তের আগে
অনেক অনেক দিন পর আজ বৃষ্টিতে দুচোখ ধুয়ে, দেখি
একটি আঁচলে আঁকা ফুল ঝরে পড়ছে ধীরে, নিঃশব্দে
দূরে বসে থাকা ফড়িঙের ফুঁয়ে।


মার্বেল

ছোট্ট একটা মার্বেল হলেই সবচেয়ে ভালো হতো,
ভালো হতো তোমার সম্মতিটুকু পেলে :

গড়িয়ে গড়িয়ে এসে নামতাম ঐ
নির্জন নাভিতে।

উড়ন্ত পাতার ফাঁকে আকাশের ঈষন্নীল দৃষ্টি
একেবারে ঝলসে দিয়ে
যেভাবে বনের প্রান্তে ফোটে ঘাসফুল—

শরীরে আলোর বিচ্ছুরণ নিয়ে
তাক লাগাতাম একদিন
পৃথিবীর ধূর্ত সব ক্যামেরাকে।

আদিগন্ত বাসনার বিকিরণ শুধু
এ মর্মর জীবনের থেকে :

তুমিও কি জ্বলে উঠতে না
মর্মের গভীরে তার আলতো ছোঁয়া লেগে?


রোডম্যাপ

ধুলুণ্ঠিত ভাস্কর্যের দিকে দূর থেকে তাকালেই
বিপ্লবীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা গান বেজে ওঠে।
পরিত্যক্ত পথের ওপর বসে সে গানের সূত্রে
নিখিলের রোডম্যাপ শর্ষে ক্ষেতে ছুড়ে ফেলা যায়?

তোমার স্পর্ধিত নিতম্বের ভার শুধু একবার
কোলে তুলে, দব ও দামামা যেন, বাজাতে বাজাতে
যে হারিয়ে গেল ধীরে—তার কথাও ভুলি নি আমি।
এখানে বনের মধ্যে গাছে গাছে স্মৃতি দোল খায়।

অজানা রাশির মান বের করে আনি সূত্র মেনে
বীজগণিতের পৃষ্ঠা যখন বাতাসে ওলটায়…


ভাগ্যরেখা

বাঘবন্দি খেলায় হয়েছি বাক্যবন্দি, সব চিন্তা
তথৈবচ। মেঘডম্বরু দিনেই হারালো বর্ষাতি।
নিয়েছ তুমিও জব্দ ক’রে কোন কালোজাদুবাক্সে
আমার লেখনী যত। ছিল নৈঃশব্দ্যের স্বরলিপি
রচনার দায়। দুটি হাতের তালুতে চেয়ে দেখি
ধনুকের রেখা; সুরশল্য নেই। কী করে বোঝাব
বিরাট দুঃস্বপ্ন এ জীবন—সমস্ত বলার পরও
রয়ে যাবে শিশুদের ভাবনার মতন অব্যক্ত।


পরম

পৃথিবীর ছোট্ট জানালার পাশ থেকে সরে এসে
ফেসবুকে তুমি লগ-ইন হও। ছড়াও টুইটারে
অস্ফুট আলাপ। যেন একবার আড়ি পাতলেই
আমর্ম উচ্ছ্বাসে কেঁপে উঠি। যেন শুধু একবার
তাতে উঁকি মারলেই আমার গহন পাসোয়ার্ড
নিমেষে চালান হয়ে যায়। আমি সবার অজান্তে
ধরা খেতে চাই। ঢুকে বসে আছি অন্তর্জালে। কবে
তুমি সব অ্যাকাউন্ট এসে হ্যাক করে নেবে, ভাই!