হোম বই নিয়ে পাণ্ডুলিপি পাঠ : সাখাওয়াত টিপুর ‘রাজার কঙ্কাল’

পাণ্ডুলিপি পাঠ : সাখাওয়াত টিপুর ‘রাজার কঙ্কাল’

পাণ্ডুলিপি পাঠ : সাখাওয়াত টিপুর ‘রাজার কঙ্কাল’
1.46K
0

রাজার কঙ্কাল : ‘ঊনমানুষের সবিশেষ’

কুদরত-ই-হুদা

সাখাওয়াত টিপু বাংলাদেশের সাহিত্যের নব্বইয়ের দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি। রাজার কঙ্কাল তাঁর ২০২০ সালের বইমেলায় প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ। এটি রাজার খাসলত উদোম করার বই। রাজার কঙ্কাল ঢাকার ‘লিচু চোষা বুদ্ধিজীবীদের’ পাপমোচনের বই। তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের সাখাওয়াত টিপু নিজেই তাঁর কাব্যগ্রন্থে বলেছেন ‘লিচু চোষা বুদ্ধিজীবী’। কারণ, ‘কত রক্ত ঝরে কত প্রাণ ঝরে তবু/বুদ্ধিজীবীদের দেখাই যায় না একদম/লিচু খায়। ঠাকুর বাড়িতে জল খায়।’ শুধু তাই নয়, ‘বুদ্ধিজীবীরা কেবল গ্রীবা লুকিয়ে রাখেন।/উটপাখিসম দুপা। মাথা গোল, তুলতুলে।/ঢিলাঢালা ঘাড়। দলা ময়দার মতো হাড়।/রবীন্দ্র গায়িকা দেখলে দুইপাটি হাসেন।/কোমল কোমল সাহিত্য ভালোবাসেন।’ রাজার কঙ্কালে সাখাওয়াত টিপু কবি হয়ে প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর কাজ করেছেন। ঘুরিয়েও বলা যায়, তিনি প্রকৃত বুদ্ধিজীবী হয়ে কবির কাজ করেছেন। ঢাকার মেঘ-পাখি-ফুল-নদী-তুমি-আমি আর ব্যক্তিগত মর্বিডিটির কাব্যধারা আর চিন্তাধারার গালে দারুণ এক চপেটাঘাত ‘রাজার কঙ্কাল’। কাব্যগ্রন্থটি সাখাওয়াত টিপুর স্বদেশপ্রেমের এক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু। মূক যারা, নতশির যারা, ফান্দে পড়া বগা যারা—এই কাব্যের অধিকাংশ কবিতায় তাদের জন্য কবির বাষ্পাকুল মনের দীর্ঘশ্বাস প্রবাহিত হয়েছে। আবার একই সাথে ‘রাজার কঙ্কাল’ বিপ্লবী মনের বিস্ফোরণও বটে। এই কাব্যের গর্ভ বাংলামুলুক কিন্তু অভিযাত্রা বিশ্বব্যবস্থার দিকে। কাব্যের প্রেরণা লোকাল কিন্তু প্রকাশ আর ফিল্টা চিরায়ত স্বভাবের।

‘রাজার কঙ্কাল’ কাব্যগ্রন্থে একজন কবির সাধারণ মানুষকে নিয়ে দরদি উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে। এই সাধারণ ‘ঊনমানুষের সবিশেষ’ কবি লক্ষ করেছেন ‘বুনো সফেদ সাতচল্লিশ’ থেকে। অথবা এই দেখার নির্দিষ্ট কালসীমা নেই, চিরকালই এর কালসীমা। নির্দিষ্ট দেশকাল ও ঘটনা উসিলা মাত্র। অধিকাংশ কবিতায় মানুষের প্রতি কবির এমন একটা প্রগাঢ় দরদ আর মায়া ফুটে উঠেছে যে, তা দেশকাল ঘটনার বেড়া ভেঙে ক্লাসিকের মহিমা অর্জন করেছে। ধরা যাক ‘১৯৪৭’ কবিতাটির কথা। কবিতাটিতে কবি তুলে এনেছেন দেশভাগের ফলে ভিটেমাটি ছাড়া হওয়া সাধারণ মানুষের বেদনাকে। কিন্তু ভিটেমাটিচ্যুত সাধারণ মানুষের আবেগের প্রতি টিপুর নিষ্ঠা এত গভীরভাবে ধরা পড়েছে যে, কবিতাটি সাতচল্লিশের নির্দিষ্ট ঘটনা থেকে মুক্ত হয়ে চিরায়তের ব্যঞ্জনা তুলেছে। দেখা যাক কবিতাটির কিছু অংশ—‘এমন গোত্রের দাদা আজ/কাঁটাতার সীমানা ভেদেই/যায় কই বাংলার মায় গো/ভিটে ফেলে একাকী যায় গো!’ কবির এই হাহাকার রাজনীতির বলি হওয়া পৃথিবীর তাবৎ মানুষের হাহাকারকে কোলাকুলি করেছে। এভাবে রাজার কঙ্কাল কাব্যের বিচিত্র কবিতায় রাষ্ট্রীয় রাজনীতির ফাঁদে পড়া, ‘ঘুঘুদের ফাঁদে’ পড়া, অসহায় ‘বোবা মানুষ’দের জন্য টিপুর কবি-হৃদয় প্রায়শ আর্দ্র হয়ে উঠেছে। কারণ, তিনি লক্ষ করেছেন, সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত লাশ হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রের ফাঁদে পড়ে। এই ফাঁদ কি খালি বাংলাদেশ রাষ্ট্রে পাতা! তা তো বটেই। আবার এও সত্য যে, এসব নিরীহ নিরপরাধ লাশদের স্বদেশ নাই সারা পৃথিবীতে। এজন্য টিপুর বলতে হয়, ‘লাশের নাম কি তবে অজানা স্বদেশ’। আবার বাংলাদেশের লাশদের সম্পর্কে লেখেন, ‘রাষ্ট্রই মৃত্যুর ফাঁদ সাবাশ বাংলাদেশ!’ বোঝা গেল, আপাতদৃষ্টিতে মানুষের অসহায় লাশ হবার ফাঁদ বাংলাদেশ বললেও বৃহত্তর দৃষ্টিতে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় যেকোনো ‘রাষ্ট্রই মৃত্যুফাঁদ’। কারণ আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় পণ্যের আর পুঁজির অবাধ প্রবাহে পৃথিবীর কোনো দেশই আর নিজ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সারা পৃথিবীর মানুষই অসহায় আর দেশহীন। টিপুর ভাষায়—‘হায় দেশ ভেসে যাচ্ছে দূর/কোনো দেশের বাহিরে ঢের/বাজারে বাজারে আসে পরদেশ!’ ফলে টিপু দেখতে পান ‘রাষ্ট্রের মৃত্যু’। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায়, রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষ যখন থাকবে না তখন থাকবে শুধু পশু। কবির ভাষায়, ‘একদিন নিজ লাশ দেখে টাসকি খাবেন/আমলা পুলিশ অবসর নেয়া অধ্যাপক!/একদিন মানুষের কথা বন্ধ হবে মধ্যরাতে/আকাশে পেঁচারা, ঘেউ ঘেউ করবে কুকুর!/একদিন রাজপথ শেয়ালেরই দখলে যাবে/দেখিলাম স্বপ্নে, কাক কাকেরই গোস্ত খাবে!’ মানুষের আর রাষ্ট্রের এই মৃত্যুবিষয়ক দৃষ্টি কবির এক গভীর দার্শনিক প্রত্যয়েরই প্রকাশ বলে মনে করি। এভাবে ‘রাজার কঙ্কাল’ কাব্যগ্রন্থ ‘ফাঁদে পড়া’ মানুষের বর্তমান আর ভবিতব্য নিয়ে সাখাওয়াত টিপুর উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় মেদুর হয়ে আছে।

এবার ফেরা যাক সাখাওয়াত টিপুর স্বদেশ-ভাবনায়। নিজের রাষ্ট্র নিয়ে ভাবনার কথা বলতে গিয়ে টিপু তেমন কোনো রাখঢাক রাখেন নি। টিপু এই ধরনের কবিতায় যথার্থ কবির কাজটিই করেছেন। কারণ, কবি তো তাঁর কমিউনিটির বহুমানুষের অব্যক্ত কণ্ঠস্বরের অনুবাদক। কবি তো সত্যদ্রষ্টা ঋষি এবং একই সাথে অকুতোভয়। টিপু ‘রাজার কঙ্কাল’-এ এই ভূমিকাটি পালন করেছেন। লক্ষ করা যাক কিছু চরণ—‘আমাদের মাথার উপরে কোনো ছাদ নাই/আমাদের গোলাঘরে কোনো অর্থ নাই/আমাদের ইতিহাস খেয়ে গেছে উঁইপোকা/আমাদের শিক্ষা ঝুলে আছে ফাঁসের রজ্জুতে/আমাদের উন্নয়ন কিছু লোকের ডেরায়/আমরা কেমন দেশে আছি আব্বাজান?’ অথবা লক্ষ করা যাক এইসব চরণ, যেখানে এক ধর্ষিতা নারীকে ‘নিহত কবিতা’ নাম দিয়েই বলছেন—‘নিথর পায়ের ফাঁকে/আইন ঘুমোচ্ছে ঢের/জানে কি তুমি ঘাসের?/কপাল মুছলে তবে/থাকে টকটকে লাল/আর স্বাধীনতা ডোবে!’ এই উচ্চারণ কেবল একজন স্বাধীনসত্তার কবির পক্ষেই সম্ভব। কবি তো তিনি যিনি সমাজের আর দশজনের মতো সুবিধাবাদের প্রকোষ্ঠে ঢোকেন না। চলেন না তেলপানির মতো নিম্নগামী হয়ে। উজানের পথই যথার্থ কবির পথ। কবি কি কেবল কবিতা করবেন! নাকি বলবেন, ‘এবার ফিরাও মোরে সংসারের তীরে’। ‘রাজার কঙ্কাল’ টিপুর সংসারের তীরে ফেরার কাব্য। জাতির অব্যক্ত ভাষা অনুবাদের কাব্য।

সাখাওয়াত টিপু তাঁর ‘রাজার কঙ্কাল’ কাব্যে বিচিত্র ধরনের কবিতাকে স্থান দিলেও এটি মূলত রাষ্ট্র ও তার মানুষের আন্তঃসম্পর্ক বোঝার কাব্য। একটু হালকা মেজাজের অথচ গভীর বিষণ্নতার চাদরে ঢাকা একটা কবিতার কয়েক লাইন লক্ষ করা যাক—‘কোনো কিছু মজা নাই রে, মোমিন!/জিহ্বায় পিত্তের তেতো ওঠে রে, মোমিন!/সংবিধান পড়ে হাসি পায় রে, মোমিন!’ বোঝাই যাচ্ছে এই কবিতার কথক এক অসহায় তরুণ। কবিতায় হয়তো সে মৃত। অথবা মৃতের হয়ে কথা বলা জীবিত কেউ। খুবই সংগত প্রশ্ন ওঠে, এই তরুণের সংবিধান পড়ে হাসি পায় কেন! শোনা যাক—‘দিন অন্তে হায়, প্রতি রাতে মরে যাই/খুব ভোরে লাশ হয়ে ভূমধ্যসাগরে ভাসি/অচেনা ভাষার ভিনদেশে কবরে ঘুমাই!’ একই প্রতিধ্বনি আছে এখানেও—‘এত লাশ লইয়া কোথায় যামু আম্মাজান?/এই সংবিধান লইয়া কি করমু আম্মাজান?/ওই কালা বর্ণমালা ছাই হয়া আছে, মাগো/যেন বিধানের পাতাগুলা বিধবার সাদা শাড়ি/যেন স্তব্ধ কাফনের সাদা কাপড়ের স্তূপ!’ এভাবে ‘রাজার কঙ্কাল’ কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় টিপু দেশের সংবিধানের বিধানের সাথে সাধারণ মানুষের আন্তঃসম্পর্ক ঝালাই দিয়ে দেখতে চেয়েছেন। এই অর্থে এটি মূলত একটি রাজনৈতিক কবিতার বই।

কিন্তু টিপুর কবিতা কি কেবল অসহায়তায় আর অভিযোগে শেষ? না, একেবারেই নয়। টিপু রাষ্ট্রের খাসলতের বদল চান। এই চাওয়াকে তিনি মায়ের বরাতে বলেছেন এভাবে—‘মা থাকলে আজ বলতেন:/যা তুই মিছিলে/ওড় তুই শঙ্খচিলে/যদি না পারিস রাষ্ট্র বদলাতে/সত্যি সত্যি হয়ে থাক লাশ!’ এতক্ষণে তবে সাখাওয়াত টিপুর থলির বিড়াল বেরিয়ে এল। তবে কি টিপু এই কাব্যে যে-রাজনীতির কথা বললেন তা ‘রাষ্ট্র বদলানোর’ রাজনীতি! মানে বিপ্লবী রাজনীতি! তাই হবে হয়তো। এই রাজনীতির কথা বলেই কি তবে টিপু কবি হিসেবে ‘দেয়ালে দেয়ালে ম্যুরালের মতো মিথ হয়ে’ থাকতে চান! আমরা বলি তথাস্তু।

‘রাজার কঙ্কাল’-এ রাজনীতি কিভাবে শিল্প হয়ে উঠেছে, কবিতা হয়ে উঠেছে, সেই নন্দনতাত্ত্বিক কেমিস্ট্রির প্রসঙ্গ ভিন্ন আলোচনার জন্য তুলে রেখে একটু বাংলাদেশের কবিতার একটা বিশেষ প্রসঙ্গে কথা বলা যাক। বাংলাদেশের সাহিত্যে উচ্চৈঃস্বরের কবিতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সূত্রপাত হয় মূলত আশির দশকে। তারা কবিতাকে রাজনৈতিক শ্লোগান আর উচ্চৈঃস্বর থেকে মুক্ত করতে চাইলেন। নতুন কবিরা কবিতাকে কবিতায় ফেরানোর ঘোষণা দিলেন। কবিতাকে নিয়ে গেলেন ব্যক্তির মনোতলের গহিন গভীর প্রদেশে। বাংলাদেশের কবিতার বি-রাজনীতিকরণের সেই শুরু। তাঁরা মনে করলেন, বাংলাদেশের কবিতা কলংকমুক্ত হলো, রাহুমুক্ত হলো। কিন্তু বাংলাদেশের কবিতায় এর ফল হলো সুদূরপ্রসারী। কবিতা সাধারণ মানুষের নাগাল থেকে সরে চলে গেল শুধু কবিদের মধ্যে। পাঠকের দায়মুক্তি ঘটল কবিতা পাঠ থেকে। আর একই সাথে কবিদেরও রাজনৈতিক দায়মুক্তি ঘটল। ফলে, কবিতার পাঠক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমলো। এক সময় বাংলাদেশের সাহিত্য বলতে বোঝানো হতো মূলত কবিতাকে। আর এখন পাঠক সরে গেল অন্য জায়গায়। আফসোস! তবে স্বীকার্য যে, আশির দশকের কবিরা বাংলাদেশের কবিতায় নতুন স্বাদ-গন্ধ যুক্ত করেছেন।

কিন্তু ভেবে দেখা দরকার রাজনৈতিক শ্লোগান বা রাজনৈতিক উচ্চরব মাত্রই কি অকবিতা! মনে হয় না। কবি সাখাওয়াত টিপুর ‘রাজার কঙ্কাল’ পড়ে মনে হলো রাজনৈতিক কবিতা বলে আলাদা কোনো বর্গ করা অপ্রয়োজনীয়। সবই কবিতা। কবিতা যাকেই বিষয়বস্তু করে তুলুক না কেন, আসল প্রশ্ন কবিতা হয়ে ওঠা না-ওঠার মধ্যে নিহিত। মনে পড়ছে বিদ্যাসাগর অনূদিত ‘শকুন্তলা’র কথা। সেখানে শকুন্তলার কোমল ও সুন্দর শরীরে গাছের বাকল পরা দেখে রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলার বাবার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘মহর্ষি অতি অবিবেচক! এমন শরীরে কেমন করিয়া বল্কল পরাইয়াছেন!’ পরমুহূর্তে রাজা শকুন্তলার অপরিমেয় রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বলেছেন, ‘রূপ যাহাদের স্বভাবতই সুন্দর, কি না তাহাদের অলংকারের কাজ করে!’ অর্থাৎ রূপের আতিশয্যে বাকলই কিনা শকুন্তলার অলংকার হয়ে উঠেছে! কবিতা করে তোলার শক্তি থাকলে রাজনীতি কেন, কী না কবিতা হয়ে উঠতে পারে!


পাণ্ডুলিপি থেকে কয়েকটি কবিতা


মায়ের কবিতা

কেনো চোখ মুদে আসে ঝাপসা আকাশে
ভিজতে ভিজতে বৃষ্টিতেই অশ্রু মিশে যায়
কেউ যদি দেখে আজ এমনি এমনি কাঁদি
তবে কেনো আমি নিজেকে লুকিয়ে কাঁদি?

আজ অকারণে মায়ের মুখের দিকে তাকালাম
আজ যে কন্যার চোখে চোখ রাখতে অক্ষম!
ভয়ে তার ফর্সা কপাল নিয়ত কাঁপছিল
কালো ভ্রূ কুঁচকে যাচ্ছিল বিষণ্ন ক্রোধে
দাঁত কড়কড় করছিল পৃথিবী ভাঙবে বলে
বললাম: মা গো, লড়াই করতে শেখো!

মেয়েটি বলল: বাবা কেনো মেয়ে হয়ে জন্মালাম?
বললাম: মারে তুই না হলে আমি কি করে আসতাম?


মৃত্যুর পরের রাতে

মা থাকলে আজ বলতেন :
নে কিছু অর্থ নে, উচ্ছন্নে যা
যা তুই কবি হ
যা তুই ছবি হ
দেয়ালে দেয়ালে ম্যুরালের মতো
মিথ হয়ে থাক!

মা থাকলে আজ বলতেন :
যা তুই মিছিলে
ওড় তুই শঙ্খচিলে
যদি না পারিস রাষ্ট্র বদলাতে
সত্যি সত্যি হয়ে থাক লাশ!

মা নাই এখন
ছিল কি কখনো
সে কথা বলল না কেউ খবরে
মা দেখি কাঁদছে আপন কবরে।


ঈগল কাহিনী!

খুন হয়ে গেছি খুব নিরবতায়, ঋতু-নৈঃশব্দ্যে
কোথাও কোনো বিবর্ণ পাতাও নড়ছে না তাই
বাতাস যে বৈবে তারও কোনো আশঙ্কা নাই
তেলাপোকাও আজ কেবলি বকছে দেদারছে
কেনো আমি বেঁচে আছি ধরাতলে শীর্ষাকাশে!

হিংসার দেশে বেঁচে থাকা মানে আপনি ঈগল
নাক দেখলেই বোঝা যায় তার শিকার পদ্ধতি
কখনো সে উড়তে উড়তে করে না শিকার!

ঘৃণাদের দেশে বেঁচে থাকা মানে আপনি বাতাস
ঝাউ বনে শনশন, শাল বনে ভেসে যাওয়া লাশ
অথচ একাই যাবে কেউ আর দেখবে না হাহুতাস

সে কারো প্রতিদ্বন্দ্বী না, এমনকি ধূলিকণাও না
তবুও ঘায়েল করা হবে ধারালো শাবলে, শানে
আপনার কান ফেটে যাবে সেইসব নিষ্ঠুর গানে।

মৃত্যুর পরও ঈগল হয়ে আমি থাকবো আকাশে
আমার নৈঃশব্দ্যের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাসে মুখে
যেন তারাটির পর মৃদুলস্য তারাটিও ক্রুর হাসে!


ময়নার দিকে যাচ্ছে লালফৌজ

বড় অসময়ে কাক ডাকলে নগরে
অহোরহো কোকিলে বেদনা করে!
শহর তোমাকে ছেড়ে যাবেই বা কই?
সেই স্মৃতিটুকু ঠুকরে খাবে কি কেউ?

কালো ধানগাছে বসে আছে ফিঙে
বিষণ্ন ফড়িং ভাসছে দখিনা বাতাসে
আজ সে শিকার করবে না কোনো
ভাবছে শুধুই ময়নার দিকে চেয়ে।

চুম্বন দিবস আজ, তোমাকে দেবে কি কিছু!
নিশ্চয়ই তুমি পাখি সেজে আছো একদম।
দিকে দিকে লালফৌজ নামছে শহরে-গ্রামে
কালো পাখিরা বদলে যাচ্ছে মানুষের নামে!


হাইডেগারের ছুরি

বন্তুর এমন দাম নাই যেন ভাব হয়ে বসে থাকে
সবকিছু কিছু ছেড়ে দিয়ে যেন দুনিয়ার সবভাষা
হীন কুণ্ডলী পাকিয়ে গুম হচ্ছে অচেনা কোথায়!

ভাষা মাত্রই মৌন একদম চুপচাপ খুনির মতন
কখন সামনে আর কখন পেছনে বলাই বাহুল্য
এই যে ঘাতক বর্ণমালা লালাভায় ফুটছে গলায়!

এমন করুণ আজ ডাকাতের পাশে ডাকাতিনী
তবুও কেউ তো কারো ভাষা কেনো যে বোঝে না
বাড়ির ভেতর হাড়ি আর জানালার বাইরে দরোজা!

মৃত পাখি সামনে রেখেই বসেছে রুগ্‌ণ যুদ্ধবাজ
তারও কোনো ভাষা নেই যেন এক অদ্ভুত সময়
নিখিলের দিকে যারা যায় তারাও ফিরছে না!

মাঝে মাঝে ভয়ে কুঁকড়ে কাঁদছে শহরের কবুতর
অচেনা ভয়ের পর, অ-মৃতদের ভাষা বোঝা ভার
যেন তাবৎ বেকুব দার্শনিক তজবির মতো নিরক্ষর!

সব ভাষা বাড়ি ফেরে, কেবলিই বাঙালা ফেরে না
ফিরলেও ভাষা থাকে না, সে আরেক আজব ঘটনা
যা ঘটে তা তো ভাষায়, কেনো তার যে অর্থ হয় না!