হোম বই নিয়ে পাঠশেষে : পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প

পাঠশেষে : পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প

পাঠশেষে : পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প
736
0

‘সাহিত্যের প্রধান কাজ হলো, ব্যক্তির সম্ভাবনাগুলো খুঁজে খুঁজে বের করা। ব্যক্তির সেই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে বিদ্যমান থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। মার্ক টোয়েন যে কারণে বলছেন, ‘Fiction is obliged to stick to possibilities, Truth isn’t.’ যদি সম্ভাবনা থেকেই আধুনিক সাহিত্যের সৃষ্টি হয়, তাহলে সাহিত্য আর জীবনের হুবহু দর্পণ থাকে না। অর্থাৎ অ্যারিস্টটলের ‘আর্ট ইজ ইমিটেশন অব লাইফ’ কথাটার আধুনিক ব্যাখ্যা দাঁড়ায়, অস্কার ওয়াইল্ড যেমনটি বলছেন, ‘Literature (art) always anticipates life. It does not copy it, but molds it to its purpose.’ অর্থাৎ সাহিত্য বস্তুগত বাস্তবতার নিরিখেই একটা নিজস্ব বায়বীয় বাস্তবতা সৃষ্টি করে। জীবন যেমন এখানে নির্মিতির অংশ হয়ে ওঠে, তেমন নির্মিতি হয়ে ওঠে জীবনের অংশ। জীবন ও নির্মিতির এই মিথস্ক্রিয়াকে তুলে ধরতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছিলেন, ‘পোস্টমাস্টারটি আমাদের বজরায় এসে বসে থাকত। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।’


রবীন্দ্রনাথের গল্প যেমন জানার পরও পড়ি, পাঠশেষে পুনরায় পড়ি, মোজাফ্‌ফরের ‘বিশ্বগল্প’ সম্পর্কেও তেমন কিছু বলা চলে।


উল্লেখিত অংশটুকু মোজাফ্‌ফর হোসেনের ৪৪৮ পৃষ্ঠার পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প বইটির একটি পৃষ্ঠার তিনটি অনুচ্ছেদের একটি। অথচ এ কয়েকটি বাক্যেই কী সুন্দরভাবেই-না ব্যক্ত হয়েছে আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কিত বক্তব্যগুলো! এমন অজস্র সম্ভারে পরিপূর্ণ এই বইটি নিয়ে আলোচনা করতে যাওয়াটা তাই কিছুটা ভয়েরই বটে; অস্পষ্টতা থেকে যাবার ভয়। কেবল তো পাঠ নয়, বিশ্লেষণও। ছোটগল্পের শিল্প ও রূপান্তর নিয়ে এমন সুগ্রন্থিত গ্রন্থ অন্তত আমার হাতে পড়ে নি এর আগে।

রবীন্দ্রনাথের গল্প যেমন জানার পরও পড়ি, পাঠশেষে পুনরায় পড়ি, মোজাফ্‌ফরের ‘বিশ্বগল্প’ সম্পর্কেও তেমন কিছু বলা চলে। আলোচ্য বইটিতে সন্নিবেশিত বেশ কিছু লেখা, বিশেষ করে ‘বিশ্ব পর্ব’ ও ‘তুল্যপাঠ’ পর্বের লেখাগুলো,  আমি এর আগেই তার বিশ্বসাহিত্যের বহুমাত্রিক পাঠ ও বিশ্বসাহিত্যের কথা বইয়ে পড়েছি। তারপরও পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প হাতে করে সে-লেখাগুলো পুনরায় পড়ার লোভ সামলাতে পারি নি। কেননা সাহিত্যতত্ত্বগুলিকে গল্পের মতো করে বলে গেছেন তিনি। যা থেকে চোখ সরানো সত্যিই মুশকিল। যেন উড়ুউড়ু মনও বশ্যতা স্বীকার করে নেয় অবলীলায়।

বইটি খুললেই চোখে পড়ে ফ্ল্যাপের কথাগুলো, ‘ছোটগল্পের উৎসমূল থেকে আধুনিক এবং উত্তরাধুনিক হয়ে ওঠার জার্নিটা উঠে এসেছে মূল টেক্সটসহ পাঠে-বিশ্লেষণে। এই ধরনের বই বিদেশে কিছু থাকলেও বাংলাদেশে এই প্রথম। ছোটগল্পের একাডেমিক পাঠের পাশাপাশি গল্পকারদের আত্ম-উপলব্ধির জন্য বইটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে। সাহিত্য-সমালোচকদের পাশাপাশি সাহিত্যের রসাস্বাদনে পাঠকমাত্রই বইটি পড়ে উপকৃত হবেন।… একজন গল্পকারকে ভালো করে জানতে হলে তার লেখার প্রবণতা, গল্পবিষয়ক ভাবনা ও গল্পপাঠ অপরিহার্য। এখানে সেভাবেই কন্টেন্ট সাজানো হয়েছে। তবে বইটির মূল উদ্দেশ্য কোনো বিশেষ গল্পকারকে বা গল্পকে পাঠ করা নয়, ছোটগল্পকে জানা—এর নানা চেহারা ও রূপের বহুতল অন্বেষণ করা।’

আর ক’পৃষ্ঠা উল্টালেই যখন চোখ পড়ে সূচীপত্রে, তখন বিস্ময়ে বড়ো বড়োই হয়ে ওঠে চোখ দুটো। এই যেমন, ‘ছোটগল্পে বিশ্বযুদ্ধের কথক হেমিংওয়ে’ প্রবন্ধটির পরপরই এসেছে : গল্প ও গল্পপাঠ—বৃষ্টিদিনে বেড়াল; সহায়ক গল্প—এক সৈনিকের বাড়ি ফেরা; অতিরিক্ত পাঠ—’অ্যা ক্লিন, ওয়েল লাইটেড প্লেইস’ গল্পের অনুবাদ পাঠ; হেমিংওয়ের দৃষ্টিভঙ্গি : একটা যথার্থ বাক্য।

কেবল হেমিংওয়েকে নিয়েই নয়, এমন আলোচনা করা হয়েছে বিশ্বসাহিত্যের অমর সব স্রষ্টা জেমস জয়েস, কেট শপা, নাইপল, হারুকি মুরাকামি, রোয়ল্ড ডাল, অ্যাডগার অ্যালান পো, হুয়ান রুলফো, জেরোম ওয়াইডম্যানসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে। যা আমাদের নিয়ে যায় বিশ্বসাহিত্যের স্বর্ণকমলে। আর ‘বাংলাদেশ পর্বে’ আলোচিত হয়েছেন সৈয়দ হক, হাসান আজিজুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আবদুশ শাকুর, হুমায়ূন আহমেদ এবং শহীদুল জহির। ‘তুল্যপাঠ’ পর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পোস্টমাস্টার’ এবং মারজরি কিনান রলিংসয়ের ‘আ মাদার ইন ম্যানভিল’ গল্প দুটির মধ্যকার সাযুজ্য বড়োই চমৎকার করে সামনে এনেছেন তিনি, যা রীতিমতো চমকে দেয়। পাশাপাশি ‘সহায়ক পাঠে’ নিজের গল্প ‘ছুঁয়ে দেখা জীবনে’ উত্তরাধুনিকতা  মেটান্যারেটিভ ও মেটাফিকশনের প্রয়োগ এবং ‘বাঁশিওয়ালা মজ্জেল’ গল্পটিকে নমুনা হিশেবে নিয়ে ছোটগল্পে নির্মিতি ও বাস্তবতার দিকগুলো ব্যাখ্যা করেছেন মোজাফ্‌ফর। সেইসঙ্গে গল্পবিষয়ক আড্ডাটি বাড়তি পাওয়া পাঠকের। এখানেই বলে রাখি, টীকা পর্বের ‘সাহিত্যতত্ত্ব (Literary Theory) ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ এবং ‘সাহিত্য-অলঙ্কার (Literary Device) ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ অংশে যে বিষয়গুলো পুনরালোচিত হয়েছে, সেগুলো আরেকটু পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, যেটির প্রয়োজনও ছিল।

পাঠশেষে মনে হয়েছে, পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প বইটির উল্লেখযোগ্য স্বাতন্ত্র্য হচ্ছে প্রতিটি গল্প নিয়ে প্রাবন্ধিকের ‘গল্পপাঠ’ এবং গল্প বা লেখালেখি নিয়ে সংশ্লিষ্ট লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজন। মূল টেক্সটের আগে-পরে গল্পের ব্যবচ্ছেদ নতুন নতুন পাঠ উন্মোচন করে পাঠকের সামনে। লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিও সহযোগিতা করে তার গল্পের গভীরে যেতে। হুমায়ূন আহমেদের লেখা নিয়ে বলতে গিয়ে আমরা অনেকেই কপাল কুঁচকাই। অথচ তার গল্পের সমৃদ্ধ অধ্যায়টি অজানা থেকে গেছে অনেকেরই। সেটিকে সামনে এনেছেন মোজাফ্‌ফর। সুযোগ করে দিয়েছেন হুমায়ূনের ‘সংসার’ গল্পটি পড়ার, যে অনন্য গল্পটি এর আগে পড়ি নি আমি। আলোচ্য বইটি পড়তে গিয়ে, আমার মতো করে অনেক পাঠকেরই, এমন কিছু অভিজ্ঞতা হবার কথা।


সব মিলে গত দশ বছরে ছোটগল্প নিয়ে আমার যে পাঠ ও অনুধ্যান তারই সমস্ত নির্যাস হিশেবে, এই গ্রন্থখানি আলোর মুখ দেখছে।


‘ছোটগল্পে বিশ্বযুদ্ধের কথক হেমিংওয়ে’ প্রবন্ধে এই ওয়ার প্রোডাক্টের গল্প সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ আলোচনার পর প্রাবন্ধিক যখন সমীকরণ টানেন এভাবে—চরিত্রদের ভেতর বোঝাপড়ার অভাব, যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা, সকলের মাঝে থেকেও একাকিত্ব বোধ করা হেমিংওয়ের প্রায় সব গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তখন তার সাহিত্যবোধকে শ্রদ্ধা না-জানিয়ে উপায় থাকে না পাঠকের। সরল ভাষায় এভাবেই নিজের পাঠবিভা ছড়িয়েছেন মোজাফ্‌ফর তার পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্পর প্রতিটি প্রবন্ধে।

আরেকটি উদাহরণ হিশেবে ‘ছোটগল্পের নিভৃতপথে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত’র এ অংশটুকু উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘ষাটের দশকে একই সঙ্গে শুরু করলেন জ্যোতিপ্রকাশ ও হাসান। একজন বেছে নিলেন ব্যক্তি তো অন্যজন সমগ্র। একজন অনুসরণ করলেন কাফকা তো অন্যজন তলস্তয়। তবে জ্যোতিপ্রকাশ কাফকার মতো এক্টিভ নন; প্যাসিভ। ভীষণ প্যাসিভ। এবং জয়েসের মতো আত্মমগ্ন। তার বেশিরভাগ গল্পই ‘অন্তর্ভাষণ (interior monologue) এবং ‘স্বগতোক্তি’ (soliloque)-এর ভেতর দিয়ে শুরু হয়। খুব দরকার না পড়লে তিনি চরিত্রের দ্বারস্থ হন না।… জ্যোতিপ্রকাশ এভাবেই উপভোগ করেন নিজের বেঁচে থাকাকে। তিনি জ্যাকের (এজ ইউ লাইক ইট, শেক্সপিয়র) মতো মেলানকলি লাভার। কিটসের মতো স্কেপিস্ট। আবার এলিয়টের মতো রিয়েলিস্টও। তার গল্পের সত্তাটা ‘গুড অ্যান্ড ব্যাড’-এর না, ‘স্কেপিজম অ্যান্ড রিয়েলিজম’-এর।’

বইয়ের মুখবন্ধে মোজাফ্‌ফর বলছেন, ‘ছোটগল্প আমার সাহিত্যচর্চার মূলক্ষেত্র। গত দশ বছর ধরে ছোটগল্প লেখার পাশাপাশি ভালো লাগা থেকে গল্প অনুবাদ যেমন করেছি, তেমন পছন্দের গল্পকার বা গল্প ধরে আলোচনাও করেছি। এ ধরনের একটি বই করব ভেবে গত কয়েক বছরে আরও গুছিয়ে কিছু লিখেছি, চর্চা করেছি সাহিত্যের তত্ত্ব, কাঠামো ও নির্মিতি নিয়ে। সব মিলে গত দশ বছরে ছোটগল্প নিয়ে আমার যে পাঠ ও অনুধ্যান তারই সমস্ত নির্যাস হিশেবে, এই গ্রন্থখানি আলোর মুখ দেখছে।’

আর যখন আলোর মুখ দেখল, আলোকিত করল আশপাশ, তখন আমরা দেখলাম বইটি মূলত আমাদের জন্যেই লেখা। পাঠকদের প্রয়োজনেই এতটা সময় ও শ্রম ব্যয় করেছেন মোজাফ্‌ফর। সন্তোষজনক পাঠশেষে এ কথাই বলব আমি। বহুল প্রচারণা কামনা করছি এই অমূল্য ও অনবদ্য গ্রন্থটির।


[পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প—মোজাফ্‌ফর হোসেন—পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড—প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৯—প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ—মুদ্রিত মূল্য : ৭৫০ টাকা মাত্র।]

মুহিম মনির

২০শে জ্যৈষ্ঠ [৩ জুন] নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

লেখাপড়া : এমবিবিএস [পঞ্চম বর্ষ]; এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ, দিনাজপুর।

লেখালেখি : শৈশবে লেখালেখির হাতেখড়ি হলেও বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা, লিটলম্যাগ আর ওয়েবম্যাগে নিয়মিত লিখছেন ১৪২৪ বঙ্গাব্দের শুরু থেকে। কথাসাহিত্য তার সাহিত্যচর্চার মূলক্ষেত্র।

ই-মেইল : muhimmonir@gmail.com