হোম বই নিয়ে নিখোঁজ মানুষেরা : বীভৎস বাংলার অনুপম মানচিত্র

নিখোঁজ মানুষেরা : বীভৎস বাংলার অনুপম মানচিত্র

নিখোঁজ মানুষেরা : বীভৎস বাংলার অনুপম মানচিত্র
778
0

যেভাবে শুরু হয় একটি গল্প


শাহবাগে উত্তাল গণজাগরণ মঞ্চে থেকে থেকে অভ্যস্ত ইউসুফ নামের এক যুবক ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে প্রেমিকার ঘরে ফিরবার আহ্বান উপেক্ষা করে শাহবাগে থেকে যায়, কিন্তু সে রাতেই মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের মুসল্লিদের ওপর অপারেশন ফ্ল্যাশলাইট চলাকালে বিপদে পড়া এক গ্রামসর্ম্পকিত চাচা আব্দুর রহমান আর গ্রামের বন্ধু ইসমাঈলকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে গুলিবিদ্ধ হয়—এই ঘটনাটি আমার কাছে একটি বিস্ময়; কেননা এটি একটি নির্মম বাস্তবতা; আর বাস্তবতাকে তুলে ধরা যথেষ্ট সাহস আর সততার প্রয়োজন, যা এখন ব্যক্তির ভেতর প্রায় শূন্যের কোটায়। এই সত্য প্রত্যেক বস্তুতে ব্যক্তিতে পরিবারে সমাজে রাষ্ট্রে সমান বিরাজমান—সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুটি চরিত্র কিংবা রেখা পরস্পর তারা সম্পর্কযুক্ত।


গল্প উপন্যাস পড়ে আসা কিংবা লিখে আসা, আমরা কেউ কি কখনো এমন সাহসের বয়ান পড়ে উঠেছি যা সম্পূর্ণ স্বপ্নের ভেতর ঘটে? 


আমাদের অজানা নয় যে শাহবাগ আর মতিঝিল স্থান দুটি অবস্থানগত দিক থেকে যতটুকু দূরত্ব বোঝায়, এর চে বেশি দূরত্ব নির্দেশ করে যখন দুটি শব্দ দুটি পৃথক পৃথক মতবাদ বা দলের নামের সাথে জড়িত হয়ে যায়; তবু সেই বিপরীতমুখী দুটি চরিত্র বিশ্বাসে বিরোধী হলেও বন্ধনের টানে একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল—এই জিনিসটাই আমরা কামনা করি আমাদের যাপিত জীবনে; এর বিপরীত হলে কী ঘটতে পারে তা আমাদের অজানা নয়। গল্পটি এখান থেকেই শুরু—এরপর শুধু সময়।


সময়ের আলেখ্য কিংবা উপন্যাসের পটভূমি


নিখোঁজ মানুষেরা উপন্যাসটিতে যা ধরা আছে, তা সময়। একটি সময়কে ধরতে চেয়েছেন ঔপন্যাসিক, একটি থমথমে সময়কে, যে সময় ইব্রাহিম মাস্টারের মতো সমাজসেবক জনদরদী প্রতিবাদী মানুষকে—যে কি না বিপুল জনগণের সত্যিকারের ভালোবাসায় সিক্ত—১৫ টি গর্জে ওঠা অস্ত্রের মুখে দাঁড় করায়; যে সময় কারণহীন অন্ধবিশ্বাসে যত্রতত্র বোমা হয়ে সাধারণ জনগণের শান্তিপূর্ণ জীবনকে থমকে দেয়, সিনেমা হলে বিনোদনে মেতে ওঠা প্রণয়ীযুগলকে করে স্থবির; লেখক চেয়েছেন একটি ভয়ানক দাঁতাল সময়কে ধরতে, যে সময় নিষ্পাপ কিশোরকে গণধোলাইয়ে পিষে ছিন্নভিন্ন করে, ক্ষ্যান্ত হয় সাধারণ রাস্তার পাগলীকে পিটিয়ে হত্যা করে; যে ভণ্ড প্রতারক সময় প্রেমিক সেজে হেলেন আর ময়ূরজানের মতো হাজারো সরলমনা যুবতীকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাম থেকে শহরে নিয়ে এসে বিক্রি করে দেয় দালালদের হাতে; যে বখাটে মাদকসেবক সময় শকুন্তলার মতো সংস্কৃতিমনা একাকী চলতে ফিরতে থাকা নারীকে উত্যক্ত করে তার স্বাভাবিক জীবন বিপদসঙ্কুল করে তোলে, ঠেলে দেয় আত্মহত্যার দিকে; লেখক চেয়েছেন একটি সময়কে ধরতে, যে পুলিশসময় যে কাউকে যেকোনো মুহূর্তে গুম করে, ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলে, তাদেরকে আর ফেরত দেয় না; লেখক চেয়েছেন একটি মুখোশ পরা সময়কে ধরতে, যে মদপায়ী বহুগামী সময় নিশাতের মতো প্রতিষ্ঠিত নারীর স্বামী হয়ে অধিকারের দাবি তোলায় মাথায় গুলি করে, বিকৃত রুচির ধারক হয়ে স্ত্রীকে রেখে শালীকে, শালীকে রেখে কাজের মেয়েকে নিয়ে শুয়ে পড়ে লাল বিছানায় লাল ব্রা পেন্টির রক্তরং লালের ভেতর; যে কুলাঙ্গার নিমকহারাম সময় নিজের অন্নদাতাকে নিজের শিক্ষককে হত্যা করে জননী আর লোকজনের তিরস্কার সহ্য করতে না পেরে অনুতাপে দগ্ধ হতে হতে জেলখানার ভেতর গলায় গামছা দিয়ে ঝুলে পড়ে; একটি অসুস্থ উন্মত্ত সময়, যেটি পুলিশ হয়ে কোনো কিশোরকে হাতকড়া পরিয়ে ছেড়ে দেয় জনগণের হাতে আর জনগণ হয়ে মারধর করতে করতে মেরে ফেলে, অথবা পায়ুপথে গ্যাসের নল ঢুকিয়ে ছেড়ে দেয় যতক্ষণ না সে অভিযোগহীন হয়ে পড়ে; একটি কুকুর সময়, যেটা ডাস্টবিনে পড়ে থাকা পলিথিনের ভেতরকার শিশুকে নিয়ে কামড়াকামড়ি করে; একটি ক্ষমতাধর সময় চেয়ারম্যান হয়ে ছেলেকে বেঁধে রেখে তার চোখের সামনে মাকে বলাৎকার করে—এইভাবে এমন পোড়া-দগ্ধ উন্মাতাল সময় চিহ্নিত হয় এই উপন্যাসটিতে।

তবে দগদগে ঘা এক সময় শুকিয়েও যায়, যদি দুরারোগ্য ক্যান্সার না হয়; আশার কথা এই—ক্যান্সারও এখন আর দুরারোগ্য নয়—বরং যথাসময়ে চিকিৎসা শুরু করলে আরোগ্য নিশ্চিত। অতএব এই নষ্ট সময়টাকে ভালো করা চাই আর তার জন্য যে চিকিৎসা প্রয়োজন তা প্রস্তুত; তবে তা গ্রহণ করবার মানসিকতা আবশ্যক।


সাইকোলজিক্যাল রিয়েলিজম অথবা আত্মশক্তির পরিচয়


কী সেই ওষুধ, তা বলার আগেই স্বীকার করে নেব যে উপন্যাসটিকে যথার্থ মূল্যায়ন করবার যোগ্যতা আমার নেই এবং এটির ব্যাপারে কিঞ্চিত আলোচনা করার জন্য যে ভাষাজ্ঞানের প্রয়োজন তাও আমার আয়ত্তের বাইরে। তবে এ কথাও বলা যাবে না যে আমি হিরা চিনতে ভুল করেছি; কিংবা একেবারেই অজ্ঞ নির্বোধ। বরং আমার অবস্থাটা ওই জহুরির মতো যে আসল আর নকলের পার্থক্য বুঝে উঠেছে, এবং তাতে যে পরিশ্রম আর যত্ন দিয়ে ঔজ্জ্বল্য আর সৌন্দর্য আনতে হয় তা মোটামুটি জানা হয়ে গেছে; তবে নবীন হবার ফলে কাস্টমার দ্বিধায় থাকে যে ঠিকমত বস্তুটি গড়ে তুলতে পারবে কি না; তখন তাদের তারুণ্যের জীবনীশক্তির কথা স্মরণে আনা উচিত যে এমন কিছুই নেই যা চাইলে এরা সফল হবে না—এই ভরসা নিয়েই আলোচনাটি করতে বসা।

এই যে এতকাল, প্রায় ৫০০০ বছর ধরে, গল্প উপন্যাস পড়ে আসা কিংবা লিখে আসা, আমরা কেউ কি কখনো এমন সাহসের বয়ান পড়ে উঠেছি যা সম্পূর্ণ স্বপ্নের ভেতর ঘটে? পেছন ফিরে তাকালে হয়তো খুঁজে পেলেও পেতে পারি এমন দুয়েকটি রচনা যেটিতে অংশত স্বপ্নের বয়ান রয়েছে; মনে পড়লেও পড়তে পারে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্প ‘জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল’ যা অনেকখানি স্বপ্নের ভেতর, কিংবা অখ্যাত কুখ্যাত বিখ্যাত নানা জনের লেখায় স্বপ্নের বয়ান কিছুটা, কোনো এক প্যারায়; তবে সেটা সম্পূর্ণ নয়—আংশিক।

এই যে স্বপ্নের ভেতর গল্পের বর্ণনা পুরোপুরি গ্রহণ না করা, কিংবা আংশিক গ্রহণ করা, অথবা একেবারেই না করা—এ নিয়ে কি কোনো রকম ভাবনা আমাদেরকে তাড়না করে? আমাদের কি একবারের জন্যও মনে আসে নি যে এমন একটি রচনা আমরা পড়ে উঠব যেটি পুরোপুরি স্বপ্নের ভেতর ঘটবে? এর সবচে বড় কারণ হতে পারে: এটি শুধু কঠিনই না; বরং এটি একটি অসম্ভব প্রস্তাব। কিংবা এটিই সবচে সহজ ব্যাপার; কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে একটি দুরন্ত ঘোড়াকে ছেড়ে দেওয়া যতটা সহজ তাকে আবার বাগে আনাটা ঠিক তার উল্টো। অর্থাৎ সেখানে এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতে হবে যা পাঠককে নিশ্চিন্ত করতে সক্ষম এবং তার গ্রহণযোগ্যতা হতে হবে অবশ্যই পরীক্ষিত ও সম্ভাবনাময়; কেননা, এর দৈর্ঘ্য আর বিস্তৃতি বারবার মনে করিয়ে দিতে পারে যে একজন মানুষ এত দীর্ঘ সময় কী করে স্বপ্নগ্রস্ত থাকতে পারে।


নিখোঁজ মানুষেরা উপন্যাসটিতে নতুন আবিষ্কারের ব্যাপারটি ঘটেছে, সম্পূর্ণ উপন্যাস স্বপ্নের ভেতর বর্ণিত : একটি নতুন ফর্ম আবিষ্কার


অথচ ধ্রুপদি বা ক্লাসিক্যাল সাহিত্য যারা করেন কিংবা নিরীক্ষাপ্রবণ লেখক যারা—সে যে ভাষারই হোক—তারা সবসময় এই ব্রত নিয়েই লিখতে বসেন যে এমন কিছু তিনি আবিষ্কার করে উঠবেন যা এর আগে কেউ করে নি; যদিও তা করতে করতেই এক জীবন পার হয়ে যায়, কেউ পারেন সেই অনাবিষ্কৃত বস্তুটিকে আবিষ্কার করতে যা তার জন্য অপেক্ষা করেছিল, কিংবা পারেন না কেউ সারা জীবনে। উদাহরণ টেনে বলতে গেলে আমরা দূরের একজন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কথা স্মরণ করতে পারি যিনি জাদুবাস্তবতার জন্য বিখ্যাত; কিংবা আমাদের বাংলা ভাষার কাছের একজন প্রেমেন্দ্র মিত্রের কথা স্মরণ করতে পারি যিনি ভবিষ্যৎ কাল দিয়ে গল্প বলে খুলে দিয়ে গেছেন একটি নতুন দিগন্ত।

নিখোঁজ মানুষেরা উপন্যাসটিতে নতুন আবিষ্কারের ব্যাপারটি ঘটেছে, সম্পূর্ণ উপন্যাস স্বপ্নের ভেতর বর্ণিত: একটি নতুন ফর্ম আবিষ্কার, যেটি লেখক রায়হান রাইনকে একটি বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে, যা তাকে বহুকাল স্মরণ করতে বাধ্য করবে, সবিশেষ বাংলা সাহিত্যের মর্যাদাকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে উঁচু করে তুলে ধরবে।

দেখা নেয়া যাক কী সেই আবিষ্কার যা উপন্যাসটিকে আলোচিত করেছে এবং লেখককে বিশিষ্ট। প্রচলিত রিয়েলিজম আর ম্যাজিক রিয়েলিজমের গল্প আমরা অনেক পড়েছি, এবার আমরা এমন কিছু পড়ে উঠব যেটিকে সংজ্ঞায়িত করতে আমাদের আলাদা আলোচনার প্রয়োজন (এটা সাধারণ পাঠকের কাজ নয়, আবার সে ভয়ও নেই যে পাঠকরা পড়তে পারবে না, বরং এটি এমন সাবলীল বয়ান আর গদ্যভঙ্গি এতটাই সুখকর যে বইয়ের যেকোনো পাতা পড়তে পড়তে মনে হতে পারে, গল্প পড়ছি, না কবিতা); কেননা আমরা যে দুটি ধারায় গল্প লিখতে বা পড়তে অভ্যস্ত—এটি সেরকম কিছু নয়; বরং ভিন্ন কিছু। তবে সেটা কী?

তাহলে প্রথমে এর ধরনটা জেনে নেয়া যাক। গুলিবিদ্ধ ইউসুফ লাশের স্তূপের ভেতর পড়ে থেকে স্বপ্ন দেখে কিংবা অবচেতনে তার করোটিতে কিছু দৃশ্যের অবতারণা হয়, যার ভেতর সে শনাক্ত করতে পারে কিছু মানুষ যাদের সাথে জীবনের কোনো এক সময় পরিচিত হয়েছিল: ময়ূরজান, যে নিজেও বহুদিন আগে খুন হয়, নিশাত বহুদিন আগে যে গুম হয় কিংবা আরো অনেকে যারা কোনো না কোনো কারণে নিখোঁজ কিংবা খুন হয়েছিল, আর তাদের স্মৃতি রয়ে যায় তার করোটিতে; কিছু স্থান যেগুলোতে বিচরণ করেছিল, কিংবা একটা সময় যে সময়টাতে সে পৃথিবীতে যাপন করেছে—সে এবং তারা এখন ভুতের মতো শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরে ঘুরে মানুষের কর্মকাণ্ড দেখে, দেখে একটি সময়ের অতিক্রমণ, যে কিভাবে সে নিজের বার্ধক্যের রোগাক্রান্ত ক্ষয়িষ্ণু দেহের ক্ষতস্থানের পুঁজ এই পৃথিবীর ওপর ফেলে ফেলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে আস্তে ধীরে হাঁপাতে হাঁপাতে পার হচ্ছে; দেখে এই শহরের অবস্থা যে কিভাবে সেটা দ্রুত ধাবমান উন্নয়নের ঘোড়ায় চড়ে আকাশমুখী, কিভাবে এর সকল উন্নতি অবদমনের রূপ পাচ্ছে। অথচ সে মরে নি, কিন্তু মৃত্যুর অনুভব তাকে স্পর্শ করেছে; ইউসুফ ভাবে সে এখন মৃত; কিন্তু এই প্রশ্নও তার মনে জাগে—সত্যি সে মৃত কি না, তাহলে কি আর সে কোনো দিনই ফিরতে পারবে না এই স্বাভাবিক জীবনে?

কিন্তু আমাদের মনে হতে পারে এরা ভুত; কেননা প্রেতের মতো এরা শহরময় ঘুরে বেড়ায়, যাতায়াত তাদের ঘরে বাইরে সর্বত্র, কিন্তু সেটা স্বাভাবিক মানুষের মতো নয়; বরং আমরা কাল্পনিক ভুতপ্রেতের বেলায় যেরকমটা অনুমান করে থাকি ইচ্ছাশক্তির সাহয্যে কোনো বস্তু: হাত পা কিংবা পাখা ইত্যাদির মাধ্যম ছাড়াই যেতে পারে যেখানে খুশি সেখানে; অথচ এরা কোনো অর্থেই ভুত না। আবার মনে হতে পারে যে এরা কোনো ব্যক্তির স্মৃতিতে গড়া, যে নিজে স্বপ্ন হয়েও আরেকজনের স্বপ্ন দেখে; কিন্তু স্মৃতি হবার সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ; ঠিক স্মৃতিও যে না তাও বলা যাবে না, কেননা, স্বপ্ন যদিও সম্পূর্ণ নতুন কোনো কিছু হতে পারে, তবে তা অতীতের অভিজ্ঞতার হাত ধরেই; অর্থাৎ স্মৃতির সাহায্য অনিবার্য। তাহলে এরা কারা কীই-বা এরা, কেন এরা? এই প্রশ্নগুলো লেখককেও করতে দেখা যায়। তার মানে কি তিনি নিজেও নিশ্চিত নন যে এরা আসলে কারা? না, সেরকম কিছুও নয়; কেননা এর উত্তর তিনি দিয়েছেন—‘কোথা থেকে জীবন এসেছে, তা না জেনেই যেমন মানুষ বেঁচে থাকে’ তেমনি তারা কার স্বপ্ন বা কী তারা ‘তা না জেনেই নিজেদের ছেড়ে দিয়েছে স্বপ্নের হাতে’।

এখানে স্বপ্ন বাস্তবতার ওপর খবরদারি করে; কিন্তু সেই বাস্তবতাও ঠিক বাস্তবতা না; আবার অলৌকিক জাদুবাস্তবতাও না। বলা যেতে পারে দুইয়ের মিশেল; কিংবা কোনোটাই না—বস্তুত ভিন্ন কিছু। সেই ভিন্ন কিছুটার একটা নাম থাকা দরকার, তাই তার নাম দেয়া যেতে পারে স্বপ্নবাস্তবতা অথবা সাইকোলজিক্যাল রিয়েলিজম।


চিকিৎসা কিংবা উত্তরণ


সমাধান হবে সমস্যার ধরন অনুযায়ী। হালকা কিছু হলে তা সাধারণ ওষুধ সেবনেই সারানো যেতে পারে। কিন্তু রোগ গুরুতর হলে অস্ত্রপাচার আবশ্যক। এই নষ্ট সমাজটাকে জাতে তুলতে গেলে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন, এর শুশ্রূষার জন্য দরকার ব্যাপক পরিচর্যা, নিরলস সেবা। এটা করতে গেলে সমাজের খুব কাছে থাকতে হবে, স্পর্শ গায়ে মাখতে হবে। তারপরই না নিজের ফর্মুলা প্রয়োগ করে তাদের সুস্থ করে তোলা। যেটা ইউসুফ আর ময়ূরজান করতে চায়; অথবা ইউসুফ আর নিশাত: কাজলের গর্ভে জন্ম নিয়ে তাদের পাশে থাকা।


পশ্চিমের সুন্দরবন আর দক্ষিণের সমুদ্র, আর থাকে কী! বাংলাদেশের এই মানচিত্র খুব কৌশলে ওঠে আসে উপন্যাসটিতে।


আবার রোগের ধরন যখন ইমার্জেন্সি, তখন তাকে ওটিতে পাঠিয়ে দিতে হয়, সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন না নিলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়, যেটা আর কখনোই ভালো হবার নয়। কিংবা অস্ত্র ছাড়া বিপ্লব অসম্ভব, তাই সে তখন বৈধ; কেননা বৃহৎ স্বার্থে ক্ষুদ্র কিছুর জলাঞ্জলি প্রশংসনীয়। আর তাই ময়ূরজানের মেয়ে কাজলকে যখন দুর্বৃত্তরা তুলে নিয়ে যায় আর মারুফ তাকে বাঁচাতে রামদা হাতে তুলে নেয় তখন তা আমরাও সমর্থন না করে পারি না।


এখানে যা ছিল অজানা


০১. জন্ম : ভুলে যাওয়া আগের জন্মের সবকিছু। ঢুকে পড়া দুঃস্বপ্নে, যাকে সবাই বলে বাস্তব।

০২. মৃত্যু : স্বপ্নের বাস্তবায়ন না হওয়া।

০৩. প্রেম : কিছুই গোপন না করে, কোনো রাখঢাক না রেখে, নিজেকে একেবারে খালি করে ভেতরকার সব কথা বাইরে এনে নিজের সত্তাকে একদম নগ্ন করে ফেলা। এটাই একমাত্র পথ কারও কাছে পৌঁছাবার। শব্দই একমাত্র সিঁড়ি, যা ধরে যাওয়া যায় অন্যের কাছে।

০৪. জীবনবোধ : ‘পথের পাশের ঘাসের ভেতর একটা ক্ষুদ্র তৃণ, পায়ের নিচে এই লেপ্টে যায় কি সেই ছিঁড়ে যায়, চোখেই পড়ে না কারও, তবু একদিন দেখা গেল এক ফোঁটা চোখের তারার মতো ফুল ফুটাইছে, কে পায়ে পিষল কি ছিঁড়ে নিল, কিছুই যায় আসে না তার। তার কাজ সে কইরা যাইতেছে। কী নির্বিকার আর কী অবিচল! এটাই বোধকরি জীবনের সমারোহ—বেঁচে থাকার কোরাস!’

০৫. অভিব্যক্তি : এখানে একজনের কথায় উচ্ছ্বসিত হয় আরেকজন, একজনের স্পর্শে বিদ্যুচ্চমক ঘটে অন্যজনের শরীরে। আবার সবার উপস্থিতি প্রত্যেকের ভেতর জন্ম দেয় উচ্ছ্বাস।

০৬. হত্যার কারণ : হত্যার কারণগুলো বেশির ভাগ সময় থাকে ঘটনার বাইরে—হত্যাকারীর নিজেরই ভেতর। হয়তো হত্যাকারী নিজেই কারণ, কিংবা কারণটা সে বানিয়েছে। আর নিহতকে কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে, সেটা যেন হত্যারই বৈধতা খোঁজা। এতে গভীর পরিতাপ জন্মায় নিহতের মনে।


চলো না হারাই


আমাদের অভিজ্ঞতা বলে বাংলাদেশের সমতলভূমির মানচিত্র প্রায় অভিন্ন—এখানে নদী বাংলা মায়ের রুপালি শাদা শাড়ি, সবুজ ফসলের মাঠ এখানে দিগন্তছোঁয়া, এখানে গ্রামগুলো নানা বয়সী শিশু যেন দাড়িয়াবান্দা খেলায় রত—গ্রামকে গ্রামের সাথে বদল করা যাবে, থানাকে থানার সাথে আর জেলাকে জেলার সাথে—যতটুকু পার্থক্য সেটা আলাদা করে ভাবিয়ে তোলে না বা চোখ ঘুরিয়ে দিতে অপারগ। বাকি থাকে পুবের পাহাড়, পশ্চিমের সুন্দরবন আর দক্ষিণের সমুদ্র, আর থাকে কী! বাংলাদেশের এই মানচিত্র খুব কৌশলে ওঠে আসে উপন্যাসটিতে।

হুসাইন হানিফ

কথাসাহিত্যিক। জন্ম ২ জানুয়ারি, ১৯৯৯; সারিয়াকান্দি, বগুড়া।

ই-মেইল : hossainhanif57@gmail.com