হোম বই নিয়ে থমকে রয়েছে অনেক প্রকার নদী

থমকে রয়েছে অনেক প্রকার নদী

থমকে রয়েছে অনেক প্রকার নদী
2.84K
0

সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি মাসুদ খানের দস্তখত হলো—তাঁর কবিতাগুলো সংঘটিত। তাঁর কবিতার আনখে ছড়িয়ে আছে এর অমোঘ বিশিষ্টতা। ‘তটস্থ প্রাণছটফট কিন্তু সুশীলিত পালিশ-করা’ [সভ্যতা, নদীকূলে করি বাস] বিন্যাস; যা কিনা সমকালীন পৃথিবীর গতি-প্রযুক্তি-ব্যবস্থা চরিত্রেরই প্রতিফলন। আশির দশকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের পরিবর্তন সূচনার উৎসারণ থেকে উঠে এসেছে মাসুদ খানের কবিতার এই নির্মাণরূপ। এই কলাপ্রবৃত্তি তাঁকে উন্নীত করেছে কবিতার নতুন বাস্তবতায়। বাংলা কবিতাকে দিয়েছে নতুন ভাষার ঘর।


মাসুদ খানের কবিতা সে-সময় বাংলাদেশের নিজস্ব বিপন্ন কোমলতার সাথে বিজ্ঞানের অপ্রতিরোধ্য নির্মমতাকে আত্মস্থ করে নির্মাণ করেছে নতুন কাব্যভাষা। 


মাসুদ খান বিকশিত হন আশির দশকে। এই সময়টা নির্দিষ্ট করে বাংলাদেশের কবিতার একটি বিশেষ ক্রান্তিকাল। সেই সময়ের গেরস্তি বলতে ছিল বিগত দশকের রোমন্থন। কাঠামো-হারা কবিতার উদ্ভ্রান্ত কীর্তন। রাষ্ট্রকাঠামোতে শাসক-গোষ্ঠীর মধ্যে অধৈর্য হিংসার পাশাপাশি চলছে বিদেশি রাষ্ট্রের পরামর্শে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা অর্থাৎ ‘গণতন্ত্র’ সৃষ্টির বৈঠক। অবাধ বহির্বাণিজ্যের সূত্রে দেশে ঢুকে পড়ছে অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের ব্যবস্থাপনা। টুপিওয়ালা ইমাম সাহেবের জগতের মধ্যে হঠাৎ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে নদীশাসন ও ব্রিজ কনস্ট্রাকশনের কোরিয়ান হোন্দাই ক্রেন। কোমলতার সঙ্গে অজ্ঞানের শান্তি দুমড়ে চলতে থাকে জটিল যন্ত্রপাতি, দাঁতাল সব গাড়ি আর ফর্সা পা-ওয়ালা বিদেশি ইঞ্জিনিয়াররা। ধানখেতের আল সিমেন্টে স্থায়িত্ব পায়, কিন্তু অজ্ঞাত থেকে যায় সব কিছুই। এমনই এক রাহস্যিক আগন্তুক-বিকাশে পাড়ায় পাড়ায় হুলুস্থূল কাল হলো আশির দশক।

মাসুদ খানের কবিতা সে-সময় বাংলাদেশের নিজস্ব বিপন্ন কোমলতার সাথে বিজ্ঞানের অপ্রতিরোধ্য নির্মমতাকে আত্মস্থ করে নির্মাণ করেছে নতুন কাব্যভাষা। ‘ডানাভাঙা উত্থানরহিত কত ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র রাষ্ট্র’ ‘অপরিষ্কার কিছু কুচকাওয়াজসমেত’ ‘গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে স্ফুটমান আর সদ্যফোটা কত-না বর্ণাঢ্য ধর্মরাজি’র [বৃষ্টি-২] বাংলাদেশে মাসুদ খান চেষ্টা করেন ‘অবিরাম পলায়নপর,/ অসহায়, ঠান্ডা যত বাক্যে বাক্যে অর্থ আরোপের/ উষ্ণতা আরোপের’ আর ‘কথাগুলি সংগঠিত করবার’ [বৃষ্টি-৩]। আমরা লক্ষ করি, বহুদিন পর বাংলা কবিতার গায়ে নতুন পরিধেয়।

২০০১ সালে প্রকাশিত নদীকূলে করি বাস কবিতাগ্রন্থের ‘বৃষ্টি’ নামের কবিতাগুলো অথবা ‘নিদ্রা’সমষ্টিতে রয়েছে সেই শিল্পার্ত সময়ের ধারণা। ‘বহুদিন পর আবার প্রেমের কবিতা’য়—

আকাশে আকাশে মেলে রাখা তার কী ব্যাপক কর্মাচার,
একটির পর একটি গ্রহ আর জ্বালানি-জংশন সব
অতর্কিতে নিভিয়ে নিভিয়ে প্রবাহিত হন তিনি।

এবং সময়ের রগ-রেশায় লক্ষ্য করেন—

আন্তঃভৌবনিক তথ্যজালিকায় আচম্বিতে লেগে গেছে জট।
[একটি ছুটির দুপুর]।

‘নিদ্রা-২’ কবিতার ভেতর কবি—‘নিদ্রায় দ্রবীভূত/ একটি পল্লির উপকণ্ঠে’ এসে দাঁড়ান।

অধিবাসীদের ঘন নিদ্রিত শরীর থেকে কত-কত প্রাণ
বের হয়ে প্রবল জ্যোৎস্নার মধ্যে এখন বিচরমান এই আশেপাশে।
প্রাণদের কী যে হালকা-হালকা ঘ্রাণ!
কোথায় কোথায় তারা ঘোরে ছোট ভালুকের মতো

অধিবাসীদের এই স্বপ্ন দেখার রাতে কবি একা বিচরমান—

এ-সময় হঠাৎ কাউকে জাগানো কি সমীচীন হবে?
এতগুলো বিচরণমগ্ন প্রাণ একসঙ্গে এত দ্রুত
কী করে প্রবেশ করবে তবে শরীরে শরীরে!
যদি কোনো একটা প্রাণকে বহির্গত
রেখেই জেগে ওঠে কোনো ঘুমন্ত শরীর!
প্রাণপালিনীর খুব দুঃখ হবে তাতে।

‘প্রাণপালিনী’র এই দুঃখের ভেতর মাসুদ খানের কবিতা জেগে থাকে। তাঁর কবিতার ভেতরে ক্রমশ সৃষ্টি হতে থাকে এক অধিবিদ্যার স্বদেশ।


তিনি আমাদের বলে দেন, মানুষের কোনো ইতিহাস হয় না। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় বিভ্রমের নাম ইতিহাস।


চলৎ সময়টা কেবল বদ্বীপ পাড়ার নয়, গোটা ভুবন-সমাজেরই এক মহাক্রান্তি কাল। নূহের প্লাবনের মতো আন্তর্জালিক তথ্যপবনে অখিল বিশ্ব সমবেত হয় একই তীরে। আগন্তুক-বিকাশের সমান্তরাল বাংলার বৌদ্ধিক-চিন্তা দুনিয়ায় আছড়ে পড়ে সেই অভিঘাত। ‘রঙিন মেঘেদের সন্ধ্যা চ্যানেলে’ [সখাসংগীত] পরম সন্দেশ পাঠায় প্রাচ্যতত্ত্ব। মাসুদ খানের কবিতায় প্রথম সাফ রূপধারী হয় উত্তর-ঔপনিবেশিক চৈতন্যের পরিগঠন।

মাসুদ খান তার ‘প্রাচ্যতত্ত্ব’ কবিতায় প্রশ্ন করেছেন, ‘সূর্যের এই যে দিক-নিশানা, পশ্চিমমুখী—কারা ঠিক করে দেয় প্রতিদিন?’ তারপরেই বিদ্রোহ করেন ‘পশ্চিম?—মানি না’। মাসুদ খানের এই উচ্চারণ—সমাজতাত্ত্বিক, প্রাচ্যের গহ্বর থেকে উঠে আসা আত্মপরিচয়। বাংলা কবিতায় তিনিই প্রথম পশ্চিমকে যথার্থভাবে সত্যের মুখে বিপদগ্রস্ত করেছেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আজ থেকে উলট-চলনে চলবে সূর্য, চলবে ইতিহাস—’ এবং এরপর তিনি প্রাচ্যের নিয়তি তুলে ধরেন এভাবে—এ কথা ‘বলতে বলতে গাট্টাগোট্টা ধরনের ক’জন খননবিদ অতীত খুঁড়তে/ দুড়দাড় করে নামতে গিয়ে হড়কে পড়ে যায় অথই অতীতে’।

মাসুদ খান আমাদের এক ইতিহাসমুক্ত দুনিয়ার সামনে দাঁড় করান। ‘ইতিহাস’ কবিতায় তিনি আমাদের সেই প্রশ্ন-মুখে ছুড়ে দেন, যার কোনো উত্তর নেই। তিনি জিগ্যেস করেন—‘কী করে সম্ভব তবে পৃথিবীর সঠিক ইতিহাস? কারণ, যিনি লিখেছেন, তিনি কে এবং কোথায়? কোন সময়ে, কোন অবস্থানে দাঁড়িয়ে কী উদ্দেশে লিখছেন, সে-সবের ওপর নির্ভর তার ইতিহাস। আর তাছাড়া বিষয়টি বিষয়ীগত, সাবজেকটিভ। তবে কি সত্যিই অসম্ভব সঠিক ইতিহাস?’ তিনি আমাদের বলে দেন, মানুষের কোনো ইতিহাস হয় না। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় বিভ্রমের নাম ইতিহাস।

সমকালীন বাংলা কবিতায় মাসুদ খানের প্রধান কৃতিত্ব হলো তিনি একটি সাম্প্রতিক সম্পন্ন কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন। জীবনানন্দ-পরবর্তী বাংলা কবিতায় আহসান হাবীব, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, ফরহাদ মজহার, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ এবং রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-পরবর্তী যাদের কবিতায় আমরা পূর্ণ ধ্যানলোকের সন্ধান পাই, মাসুদ খান তাঁদের অন্যতম।

মাসুদ খানের কবিতা অতিমাত্রায় ‘সংঘটিত’। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, কবিতাকে যারা এখনো স্বয়ংক্রিয়তার শিল্প, সংগঠনের বিরুদ্ধপক্ষ মনে করেন, মাসুদ খান তাদেরও নিরাশ করেন না। কর্পোরেট কুলাচার, তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার যুগে আমাদের অনুভূতিরা পর্যন্ত যেহেতু ‘সংগঠন’ ছাড়া অস্বিত্বময় হয়ে উঠতে পারে না—সুতরাং মাসুদ খানের এই কাব্য-প্রযুক্তিও প্রতিস্থাপিত হয় আসমানি বয়ানে। দুনিয়ার নয়া সেন্সিবিলিটির স্বতোৎসারিত কণ্ঠই মাসুদ খানের কবিতায় অবতীর্ণ হয়েছে অপার তরিকায়। মানুষের নতুন ভাব ও ভাষার এমন নিষ্ঠুর ও নির্লিপ্ত অনুশীলনের সঙ্গে বাংলা কবিতার ইতঃপূর্বে পরিচয় ছিল না।

এমন সময়ের ‘দুরারোগ্য সম্প্রসার’-এ [বহুদিন পর আবার প্রেমের কবিতা] সতত তাঁর কবিতার মধ্যে তাই ‘কিছু অতিনৈশ হাঁটুরেদের ছেঁড়া-ছেঁড়া হাঁকডাক’ [নিদ্রা-২] শোনা যায়। বিজ্ঞানবাসের অভ্যাসে ‘প্লাস্টিক-পলিথিনের লতায় গুল্মে আস্তে-আস্তে জড়িয়ে’ [মা] যাওয়া গ্রন্থি ছিঁড়ে যেখানে তিনি যেতে চান… অথচ দেখা যায় ‘একটি হারিয়ে যাওয়া নভোযান’-এ চড়ে ‘ভ্রান্ত আর অতিরিক্ত হয়ে’ তার গতিরা ছুটছে। রূপতরঙ্গ গাঁয়ের কবি তাঁর কবিতায় সময়ের ধারণা ভেঙেও সময়ের ভারে পীড়িত হন। তাঁর সম্মুখে উঠে আসে সেই একঘেয়ে পুরাতন রূপকথার ‘বামন মানুষদের কত কীর্তি আর বিষ্ঠা’ [কয়েকজন তরুণ কবি]। কিন্তু এখানে এসে মাসুদ খান তাঁর বাস-চৈতন্যের এক অত্যাশ্চর্য বিনির্মাণ ঘটান। প্রযুক্তিবিধির কবি মাসুদ খান হয়ে ওঠেন হাটখোলার বৈষ্ণব গাতক। কবিতায় শেষ পর্যন্ত তিনি সভ্যতাকে নদী নির্দেশ করেন। ‘নিস্তারহীন তথ্যজটের নিচে’ [সখাসংগীত] শনাক্তহীন অথই গভীরে শেষপর্যন্ত মাসুদ খান তাঁর নদীকূলে বাসরতা আত্মীয়ের পিপাসায় ভোগেন।


এইখানে এসে মাসুদ খান পূর্ণ হন। একই সূত্রে প্রযুক্তি-পীড়িত ও প্রযুক্তি-পুলকিত এক অপার সত্তায় হাজির হন। 


দূরে তার দেশ কাঁপা-কাঁপা রূপকাহিনির মতো কাঁপে
বন্ধু আমার নদীর কিনারে থাকে।
এবেলা আমার গৃহ নেই কোনো সখা,
কী যে ঘোর গৃহতৃষ্ণা জাগছে তাই
মনে করি, যাব তোমাদের দেশে চলে
নাকি
তুমিই আমাকে অধীনে তোমার ধীরে ধীরে টেনে নেবে?
[সখাসংগীত]

মাসুদ খানের সখা নদীর কিনারে থাকে এবং মাসুদ খান নদীকূলে বাসরতা প্রাণসখার অধীনে, অধিগ্রহণে আর শাসনের নিচে থাকতে চান। বন্ধুকে বলেন—

তুমি আমি মিলে উধাও উড়ালে
চলে যাব এই দেহ ছেড়ে, এই যৌথ রচনা ফেলে।
আশেপাশে কত জরুরি ভাণ্ড, মহান কীর্তি,
গুরুত্ববহ স্থাপনাসমূহ আর,
কথিত সিভিল দুনিয়ার।
[সখাসংগীত]

এইখানে এসে মাসুদ খান পূর্ণ হন। একই সূত্রে প্রযুক্তি-পীড়িত ও প্রযুক্তি-পুলকিত এক অপার সত্তায় হাজির হন। এই সভ্যতা ভুবনগ্রামের মানুষের অস্তিত্বকে তিনি ‘যথাযথভাবে নদীনির্দেশ’ করেন।

আলমগীর নিষাদ

জন্ম ১৩ নভেম্বর, ১৯৭৯; সিরাজগঞ্জ। কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই—

জোছনার ওহি [কবিতীর্থ, কলকাতা, ২০০৪]
জোছনার ওহি ও অন্যান্য কবিতা [বাংলালিপি, ঢাকা, ২০১৪]

ই-মেইল : kobialnishad@gmail.com