হোম বই নিয়ে ‘ত্রিমোহিনী’ : ইতিহাস আর গল্পের বাঁকে গড়ে ওঠা এক বর্ণিল ক্যানভাস

‘ত্রিমোহিনী’ : ইতিহাস আর গল্পের বাঁকে গড়ে ওঠা এক বর্ণিল ক্যানভাস

‘ত্রিমোহিনী’ : ইতিহাস আর গল্পের বাঁকে গড়ে ওঠা এক বর্ণিল ক্যানভাস
285
0

সম্প্রতি কাজী রাফির বিশাল ক্যানভাসের [৪৫৬ পৃষ্ঠার] ত্রিমোহিনী উপন্যাসের পাঠ শেষ করে বিপুল আনন্দে আপ্লুত হওয়ার পাশাপাশি পুণ্ড্র সভ্যতার ইতিহাসের মাঝে স্নান করেছি। উপন্যাসটি পাঠ করে ঔপন্যাসিকের সৃষ্টি-সক্ষমতায় আমি এত বিস্ময়াভিভূত আচ্ছন্নতায় ডুবে গেছি যে, এই উপন্যাস এবং এর স্রষ্টাকে নিয়ে কিছু বলার জন্য আমার দুর্বল কলমকে হাতে তুলে নিয়েছি। এমন একটি উপন্যাস লেখার জন্য ঔপন্যাসিক যিনি জন্মগতভাবে বিরল এবং বিশেষ প্রতিভার অধিকারী বলে আমার কাছে প্রতিভাত এবং যার উপযুক্ত মূল্যায়ন ও প্রশংসা প্রাপ্য বলে আমি মনে করি। এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের সাম্রাজ্যে ইতোমধ্যে এক ঈর্ষণীয় অবস্থানে সমাসীন। চোখের ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি এবং বাংলা রচনায় দুর্বলতার জন্য আমি পাঠককূলের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

কাজী রাফির বিষয় এবং আঙ্গিকে একেবারেই ভিন্ন উপন্যাস ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা পাঠ-অভিজ্ঞতা আমার বিগত দিনের অগণিত উপন্যাস পাঠের স্বাদে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল। শুধু তাই-ই নয়, উপন্যাসটি পাঠ করে বিস্ময়াভিভূত গর্ব অনুভব করেছি—আমাদের সাহিত্য-দিগন্তে নতুন উজ্জ্বল তারকার আবির্ভাব ঘটায়।ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা করতোয়ার পলিমাটি থেকে সুদূর আফ্রিকার বৈরি প্রকৃতিতে রোপিত ও প্রস্ফুটিত এক ত্রিভুজ প্রেমকাহিনি—যা বর্ণনার উৎকর্ষতায় শাণিত অথচ উপন্যাসটির সুধারসভরা কথোপকথন যে কোনো পাঠককে মোহগ্রস্ত করে রাখে এবং তা তার এক প্রিয় পাঠ হয়ে দাঁড়ায়।


ইতিহাসের আঞ্চলিক প্রতিভূ হিসেবে করতোয়া তীরস্থ ‘ত্রিমোহিনী’ গ্রামটি যা প্রত্যক্ষ করে তারই এক বিস্ময়কর নির্মাণ ত্রিমোহিনী


কালি ও কলম ও নির্ণয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ঔপন্যাসিক/ ছোটগল্পের কারিগর সেই কাজী রাফির মহাকাব্যিক উপন্যাস ত্রিমোহিনী। শিলালিপিতে খোদাই করা ইতিহাস বর্ণনার মতো দুই হাজার বছর পূর্বে আমার এই দেশ তথা মহাস্থানে পুণ্ড্রসভ্যতার গৌরবময় বিকাশ ও বিস্তৃতি ঘটেছিল—সেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আধুনিক কালের ইংরেজ ও পাকিস্তান শাসনের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে তারই হাজারো ইতিবৃত্ত নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় ত্রিমোহিনী। ইতিহাসের আঞ্চলিক প্রতিভূ হিসেবে করতোয়া তীরস্থ ‘ত্রিমোহিনী’ গ্রামটি যা প্রত্যক্ষ করে তারই এক বিস্ময়কর নির্মাণ ত্রিমোহিনী

পুণ্ড্র সভ্যতার বুনিয়াদ মহাস্থানগড়—রাজা অশোকের গৌরবময় শাসন, অশোক কর্তৃক গৌতম বুদ্ধকে এখানে সম্মান প্রদর্শন ও তাকে শান্তির প্রতীক [উপন্যাসের প্রচ্ছদে অঙ্কিত] স্বস্তিকা অর্পণ—আমাদের ভুলে থাকা ইতিহাসের এইসব তথ্যকে ঔপন্যাসিক ভাস্বর করে তুলেছেন। চমক হলো এই যে, স্বস্তিকা এশিয়ার পুণ্ড্র-সভ্যতার মহাস্থানগড় থেকে সুদূর ইউরোপের জার্মানির পতাকায় স্থান লাভ—আমাদের বিগত সভ্যতার ঐতিহ্য ও সম্মানে আমরা উজ্জীবিত হই।

ইতিহাসের পটভূমিকায় আধুনিক কাল অবধি বিস্তৃত এই উপন্যাসের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বগুড়ার করতোয়া বিধৌত ‘ত্রিমোহিনী’ তথা নওয়াব পরিবার। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহে সমর্থন এবং অর্থ এবং জীবন উৎসর্গ করা জমিদার চৌধুরী আসাদুজ্জামানের পুত্র-কন্যাকে নওয়াব মোহাম্মদ আলী স্বীয় পুত্র-কন্যা হিসেবে গ্রহণ করেন। মাহজাবিনকে [লেখকের কল্পিত চরিত্র] মহীয়সী নারী হিসেবে গড়ে তোলেন। মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারে নওয়াব পরিবার গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং নবাব ভবনে লাইব্রেরি গড়ে তোলেন যার মুখ্য উদ্দেশ্য পুণ্ড্র সভ্যতা নিয়ে গবেষণাগার গড়ে তোলা। ওই পরিবার এবং সচেতন মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়  আজিজুল হক কলেজ। আরো বেশ কিছু নতুন তথ্য জানা যায়। যেমন, স্যার আজিজুল হক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ছিলেন। স্বনামধন্য লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী ও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ যিনি পরবর্তীতে পণ্ডিত হিসেবে খ্যাত, ওই কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

হ্যাঁ, এসব তথ্য-উপাত্তের বাইরে যা উপন্যাসের মূল আবেদন সেই ‘প্রেমকে’ লেখক রূপায়িত করেছেন বিশাল ক্যানভ্যাসে, বহু ঘটনার রঙতুলিতে নতুন বিন্যাসে, প্রাণবন্ত ছন্দময় ভাষায়, যেখানে ঔপন্যাসিক শুধু সিদ্ধহস্তই নন, চমৎকারিত্বেও অনন্য। মহাস্থানগড়ের সভ্যতার উর্বরতায় গড়ে ওঠা করোতোয়ার পলিতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ, জমিদারদের নিপীড়নকে পরাস্ত করে  নতুন জীবনের উত্থান, স্বপ্ন ও সংগ্রাম, মানুষের রক্তে প্রবাহিত যৌন প্রবৃত্তি ও তা মেটাতে বর্বর নিষ্ঠুরতা, স্বার্থ লাভে কুটিলতা সব ছাপিয়ে আনন্দ বেদনার পটভূমিকায় ‘ত্রিমোহিনী’  যেন কালের সাক্ষী, মানুষের দীর্ঘ সময়ের কলেবরকে সন্নিবেশ করে লেখক আমাদেরকে এক অনন্য সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন [৭১-এ পাকিস্তানি সৈন্যদের ও দেশীয় চরদের বর্বরতা নিষ্ঠুরতার কাহিনিও বিধৃত হয়েছে]। পুণ্ড্র সভ্যতার পাণ্ডুলিপির রচিয়তা-মহীয়সী মাহজাবিন ও তার ভাই নাগিব এর উত্তর কালের প্রতিনিধি নির্ঝরের সঙ্গে নওরীন ও দিপ্তীর ওই পাণ্ডুলিপিকে ঘিরে প্রেমের এক সুনির্মল উদ্বোধন ও দীপ্তির আত্মত্যাগের মাধ্যমে সেই প্রেম যে মহিমায় ও গৌরবে উন্নীত হয়—তারই কাব্যগাথা, যা পাঠকের মনে স্থায়ী আসন লাভ করতে সক্ষম।

অতীত ইতিহাসকে বর্তমানের ঘেরাটোপে আবদ্ধ করে বিশাল এই মনোগ্রাহী উপন্যাস সৃষ্টি করতে লেখককে স্বভাবতই অতীত ইতিহাসের গবেষণা কর্মে পাঠ নিতে দীর্ঘ সময়ের শ্রম দিতে হয়েছে—উপন্যাসটি পাঠ করতে গিয়ে বারবার আমি এই ভাবনার সম্মুখীন হয়েছি। তার শ্রমের সার্থক ফসল ত্রিমোহিনী। একজন সত্যিকারের প্রতিভাবান লেখক হিসাবে তিনি আমার অন্তরে শ্রদ্ধার আসনে আসীন।

পার্ল পাবলিকেশন্স কর্তৃক প্রকাশিত উপন্যাসটির প্রচ্ছদের পেছনে বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি এবং ছোটগল্পের রাজপুত্র খ্যাত হাসান আজিজুল হকসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার প্রকাশিত রিভিউয়ের কিছু প্রণিধানযোগ্য অংশ উপন্যাসটি সম্পর্কে আমাদের প্রাথমিক ধারণা তৈরি করে। উপন্যাসটির বহুমুখিতা এবং উৎকৃষ্টতা বুঝাতে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু উদ্ধৃতি পাঠকের জন্য তুলে ধরছি—

১। ক। ‘ঔপন্যাসিক হিসেবে বাংলাদেশে এবং বর্তমান বাংলা সাহিত্যে একজন জিনিয়াসের আবির্ভাব ঘটেছে। সেই জিনিয়াসের নাম কাজী রাফি। তার ত্রিমোহিনী এক মহাকাব্যিক উপন্যাস। মহামূল্যবান সম্পদ এই উপন্যাসটি এবং গ্রন্থটি কোনোদিন মরবে না। এই উপন্যাসের অনুবাদ হোক। এই গ্রন্থটি সারা পৃথিবীকে জানান দিক যে, খুব বড় করে কল্পনা করার, ইতিহাসকে বড় করে তোলার মতো ঔপন্যাসিক আমাদেরও আছে।’

খ। ‘শওকত আলী, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আর এরই ধারাবাহিকতায় এখন পেয়েছি তাদের যোগ্য উত্তরসূরি কাজী রাফিকে।’

গ। ‘কাজী রাফির সৃষ্টিতে, তার লেখনীতে, তার গল্প-উপন্যাসে মানুষের এই অফুরান গল্প তাদের প্রেম-ভালোবাসা হয়ে, তাদের স্বদেশভূমি হয়ে, তার স্বপ্ন-কল্পনার উপাখ্যান হয়ে একদিন ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীময়—এই প্রত্যাশা।’

—হাসান আজিজুল হক; কালি ও কলম কার্তিক ১৪২২, অক্টোবর ২০১৫ সংখ্যা।

২। ত্রিমোহিনী এক ইমাজিনারি ল্যান্ড। এ যেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের সেই মাকান্দো গ্রাম। Hundred Years of Solititude-এ মার্কেজ পৃথিবীর মানচিত্রে অস্তিত্বময় মাকান্দোকে সৃষ্টি করেছেন অনেক অবাস্তব জগতের আখ্যান দিয়ে। আর ত্রিমোহিনী উপন্যাসে কাজী রাফি নির্মাণ করেছেন সেই কল্পিত ভূমিকে যার অস্তিত্ব বাস্তব পৃথিবীর কোথাও নেই। কিন্তু তিনি তার সৃষ্ট এই জগৎকে আশ্চর্যজনক দক্ষতায় সমৃদ্ধ করেছেন আমাদের অতীত ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি আর কৃষ্টির ছায়া দিয়ে।

—বজলুল করিম বাহার; মল্লিকা, সংখ্যা-৫৩, বর্ষ-২৯।

৩। ত্রিমোহিনী ইতিহাস ধারণকারী এক গতিময় কাব্য। একটি উপন্যাসে ঔপন্যাসিক প্রাচীন সময়ের সাথে বর্তমানকে যে অবলীলায় জুড়ে দিয়েছেন তার প্রকরণ এবং সক্ষমতা অনবদ্য এবং একই সাথে তার নির্মাণশৈলী আমাদের বিস্ময় জাগায়।

—ইত্তেফাক সাময়িকী ০৭ নভেম্বর ২০১৪

৪। ত্রিমোহিনী সৃষ্টি করে ঔপন্যাসিক বাংলা ভাষার কথাসাহিত্যে এমন এক অবদান রাখলেন যা সুদূর ভবিষ্যতেও আলোচিত হবে।

—শব্দঘর, সমকালীন বই সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৪।


কাজী রাফি করতোয়া-বিধৌত হৃদয় নিয়ে এই নদীকে তার উপন্যাসে মহীয়ান করে তুলেছেন। 


উপন্যাস থেকে আমার ভালো লাগা দু-একটি উদ্ধৃতি—

১. টেক্টোটেনিক প্লেটে ভর করে কোনো এককালে টেথিস সাগর অতিক্রম করেছিল ভারতবর্ষের ভূখণ্ড। সেই সাগরের গভীর মন্ত্র ধারণ করে টিথিয়া আহম্মেদ দীপ্তি অতিক্রম করেছে পৃথিবীর সব মায়া।

২.  মানুষের বুদ্ধিমত্তা পৃথিবীর ধ্বংস ডেকে আনবে সেজন্যেই তাদের জ্ঞানী হওয়া প্রয়োজন।

৩. তোমার রক্তের গন্ধে আকুল এই নির্জন এই বাতাস, তোমার কণ্ঠের মর্মর হয়ে ঝরে পড়া এই সব পাতার আওয়াজ…

৪.  বাঙালির নিষ্ঠুরতা আর পলায়নপরতা তার দারিদ্র্যের সমানুপাতিক এক ইতিহাস!

৫.  দেশের আপামর জনতার অনুভূতিকে মূল্যায়নের নাম গর্ব। মৃত্যুও গর্বের।

ত্রিমোহিনী বহু হাজার বাক্যে এবং অভিজাত ভাষায়, চমৎকার এবং অসাধারণ বর্ণনায় এক অনন্য সৃষ্টি। এই উপন্যাস থেকে ভিন্ন ভিন্ন পাঠক ভিন্ন ভিন্ন রসদ খুঁজে পাবে। সুশিলার উপর নিরঞ্জন এবং হানিফ যে নির্মমতা দেখিয়েছে তা বড় রক্তক্ষরণের। মানুষের এমন দুর্ভাগ্য হতে পারে তা কল্পনা করা যায় না। জীবনের এই পরাবাস্তব বাস্তবতা লেখক অত্যন্ত নির্মোহভাবে তুলে এনেছেন তার বর্ণিল ক্যানভাসের পাতায়। কাজী রাফি করতোয়া-বিধৌত হৃদয় নিয়ে এই নদীকে তার উপন্যাসে মহীয়ান করে তুলেছেন। তার যথার্থ মূল্যায়ন করার ক্ষমতা আমার নাই। শুধু প্রত্যাশা, গুপ্তধনের মতো মহামূল্যবান এই গ্রন্থটি বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারগুলো সংরক্ষণ করবে, অধ্যয়ন করবে। আমি বলিষ্ঠ কণ্ঠে এই উপন্যাসের ব্যাপক পাঠ প্রত্যাশা করি।

আব্দুল হাফিজ দেওয়ান

জন্ম ২২ আগস্ট, ১৯৪৩; ঢাকা।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : এমএ [সাংবাদিকতা], ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল : ah_dewan@yahoo.com