হোম বই নিয়ে তিমিরের তারানায় বসে লেখা দিনলিপি

তিমিরের তারানায় বসে লেখা দিনলিপি

তিমিরের তারানায় বসে লেখা দিনলিপি
486
0

১৮.০৩.২০১৮

তখন প্রায় ৫.১৫। বিকাল। রাস্তা পার হচ্ছিলাম। কী অসহায়ভাবে গিজগিজ করছে গাড়ি। যেন লোহা আর ডিজেলের বাগানে কেউ হুড়মুড় করে আগুন দিয়ে পালাচ্ছে। এ এক অনন্ত খাণ্ডবদাহন। ভাবছি, আমার পড়াশোনাহীন জীবনে কত কিছুই তো এড়িয়ে গেলাম। বালিশের দুই পাশে, টেবিলে অনেক বই। ধুলার বাস্তবতা প্রমাণ করাই যাদের লক্ষ্য। কিন্তু তবুও তো কিছু কিছু বই ভালো লাগে। পড়তে ইচ্ছা করে।

ছাত্রের বাসায়। ও কতগুলো ম্যাথ করছিল। কোনিকসের। পরীক্ষা। হঠাৎই জিজ্ঞাসা করে বসল—আচ্ছা, তিমির শব্দের অর্থ কী? আমি ভাবছিলাম, এলিপসের সঙ্গে তিমিরের কী সম্পর্ক! জানি না। কিন্তু আজকাল এমন হইছে যে, তিমির শব্দটা মনে হলেই পরপরেই তারানা শব্দটা মনে আসে। গালিব ভাইয়ের সর্বশেষ কবিতার বইটার নাম। অনেক দিন দেখা-পড়া হয় নি।

আচ্ছা, এই যে দুইটা শব্দ একসাথে মনে পড়ছে, এটা কি অনুপ্রাসের কারণে?


১৯.০৩.২০১৮

তিমিরে তারানার কবিতাগুলো পড়তে গিয়ে আমার বারবার মনে পড়বে ঢাকা কলেজ, টিটিসি-র ঘাস, [এই ঘাসকেই কি গালিব ভাই লিখছিলেন, ‘ঘাসের হরিৎ উচ্চারণে আজ’] আবার কখনো এমন বসন্তদিনের প্রায়মৃত তৃণের উপর বসে থাকা, একটা ডাবগাছের নিচে টাইলস করা বেদি। আশলে, এইসব জায়গাতেই আমি আর গালিব ভাই বিস্তীর্ণ আড্ডা দিয়েছি। মাঝে মাঝে ষড়’দা (ষড়শ্বৈর্য মুহম্মদ) আসতেন, হামেদী ভাইও (মোস্তফা হামেদী)। সে অনেক কথা। শুনেছিই বেশি। এখানেই বাংলা ও অন্য ভাষার কবিতা নিয়ে তুমুল আলাপ তুলেছি।

অর্থ ও নিরর্থকতা। ছন্দ। দীর্ঘকবিতার শক্তি। জীবনানন্দের নারীরা। এলিয়টের দীর্ঘকবিতা কিভাবে কিভাবে পরিবর্তন করলো নানান ভাষার কবিতাকে। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ—তাদের মেটাফর। সিকদার কতটা দেশজ। এইসব। আরো কত কিছু। আজ আর সেসব গুছিয়ে বলতে পারা যাবে না হয়তো।


গালিব ভাই সেসময় প্রায়ই একটা কথা বলতেন—যে কোনো কবিরই উচিত তার অ্যাটিচুডকে লেখা।


গালিব ভাই সেসময় প্রায়ই একটা কথা বলতেন—যে কোনো কবিরই উচিত তার অ্যাটিচুডকে লেখা। তি.তা. পড়তে গিয়ে আমারও মনে পড়বে এই কথাটি। এবং বারবার বুঝতে চাইব, গালিব ভাই কি নিজে তার অ্যাটিচুড লিখতে পেরেছেন? সম্ভবত না। রক্তমেমোরেন্ডাম-এ তার সেই অ্যাটিচুড কিছু ধরা পড়েছে। কিন্তু তি.তা.-র মাত্র কয়েকটা লেখা ছাড়া সবই তার সেন্সরড মনের থেকে সায় নিয়ে লেখা কবিতা। সেই জন্যই এই কবিতাগুলো ভালো কিন্তু স্বভাব-বহির্ভূত। সেই জন্যই এই কবিতাগুলো দারুণ কিন্তু অসূর্যম্পশ্যা নয়। আমার ধারণা, গালিব ভাইয়ের ব্যর্থতা এখানেই। অথচ বাদ মাগরিব-এ উনি আনকোরা ও অপ্রতিরোধ্য।


২৮.০৩.২০১৮

একটা বই নিয়ে হরেক রকম সাজানো কথার আলাপ দিয়ে আশলে কী হয়! তার চেয়ে বরং অসূয়াপ্রবণ সাহিত্য-আড্ডায়, কানা গলির কোনা-কাঞ্চিতে, সদর রাস্তার ডামাডোলে, মোবাইলে, ইনবক্সে যে কারো টেক্সটকে তাপস-নিশ্বাস-বায়ে কুচুকাটা করার যে মহাসমারোহ সেটাই বরং ভালো।

একটা টেক্সটের দুএকটা পঙ্‌ক্তিও যদি জনগোষ্ঠীর কণ্ঠে না ওঠে। দুএকজন মানুষের আচমকা চলতিপথের ছায়া না হয়। কেবল সমকালীনতার দোহাই ও দাওয়াই দিয়ে প্রতিষ্ঠার ভাবালুতা করা হয়। আমার ধারণা, রঙিন ছাইয়ের মতো সেসব বাতাসে উড়তে উড়তে ঊর্ধ্বতমসায় বিলীন হয়ে যাবে একদিন।

তি.তা. অমন না। আমার ব্যক্তিজীবনের সাথেই এর কমপক্ষে ১০টি লাইনের রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। এই তো শুনতে পাচ্ছি—

‘সেসব গানের স্বরলিপি/ বনের ভেতর বনে/ একাকী লুকিয়ে থাকা ঐ যোদ্ধাটির মতো—
সে জানেই না, যুদ্ধ কবে শেষ হয়ে গেছে।’


৩০.০৩.১৮

ভাষা নিয়ে আমার অস্বস্তির শেষ নেই। এই গোপন পাখিটির প্রতিটি উড়ালপথ আমি ধরতে চাই, ভাবতে চাই তার সাধনাবিন্দুটিও। পরক্ষণেই আবার পিছপা হই। কারণ, আমাকে অযোগ্য করে তোলা ছাড়া ভাষার আর কোনো কাজ নেই। ইদানীং মাঝেমধ্যেই নানান জায়গার মানুষের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিই। তারপর চুপ হয়ে কেবল শুনতে থাকি। একেক অঞ্চলের রয়েছে একেক রকমের ডায়ালেক্ট, রয়েছে ইউনিক সিনট্যাক্স। আর প্রান্তিক মানুষেরা এসব বয়ে বেড়াচ্ছেন যুগের পর যুগ। কেন যেন মনে হয়, শিক্ষিত মানুষদের অধিকাংশই ভাষাধান্দাবাজ। যখন যে ভাষিক স্টাইল ক্ষমতার কাছাকাছি থাকে সেই স্টাইলকেই তারা ব্যবহার করেন। এক সময় যেমন ফারসি, তারপর ইংরেজি, এরপর প্রমিত বাংলা। এই ভদ্রভাষার যন্ত্রণায় বছরের কিছুদিন খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম। মনে আছে, রাজশাহী থেকে যখন বড় ফুফু আসতেন, ধরে ধরে আমার বগুড়ার গ্রাম্য উচ্চারণ ঠিক করে দিতেন। এই ঠেলায় তখন আমার বন্ধু আসিফকে রাসিফ বলে ডাকতাম কিছুদিন। পরে আবার সব ঠিক হয়ে যেত। এমন আতঙ্কের কথা কুমার’দাও (কুমার চক্রবর্তী) বলছিলেন একবার।

শহরের বাইরে কিন্তু ভাষা তার নিজ ক্যারেক্টার নিয়েই হাজির থাকে। তার অন্য কোনো স্টাইলের সাথে যেমন পোদ্দারি দেখানোর কিছু নাই তেমনি হীনম্মন্যতাও নাই এক পঙ্‌ক্তিতে বসবার। আর তাই, একাডেমির চত্বরের চাইতেও বেশি আপন লাগে চায়ের টং-ঘর; তথায় কথিত ভাষাপ্রেমীর চাইতেও বেশি ভালো লাগে আজাইরা মানুষজন। ভাষা নিয়ে যাদের কোনো ভাবনাও নাই, ভানও নাই।

ভাষাব্যবহারের ক্ষেত্রে আমার বরং পয়লা পছন্দ শিশুদের। তাদের সিনট্যাক্স একদম আনকোরা। কে কী বুঝলো আর কে কী বোঝা নিল তা নিয়ে তারা শুধু উদাসীনই না, স্বৈরাচারীও বটে। পৃথিবীর তাবৎ একাডেমিকে তারা বুড়া আঙুল দেখায় খেলাচ্ছলে। আমি তাদের থেকে কালেক্ট করি আমার সিনট্যাক্স। আজকাল কবিতার ভাষাকে কেবলই ঋণগ্রস্ত সেই লোকটির মতো মনে হয় যে তার পাওনাদারের কাছ থেকে বাঁচার জন্য এড়িয়ে চলে প্রচলিত সবকটি পথ।


সম্ভবত তার কবিতায় যুক্তব্যঞ্জনের যে ঝংকার, তারেই কি উনারা ক্লাসিক কইতে চান!


আচ্ছা, গালিব ভাইয়ের কবিতার ভাষা আশলে কেমন? গদ্যের ভাষা তো মাশআল্লাহ লেভেলের! তি.তা. পড়তে গিয়ে মনে পড়তেছিল এই প্রশ্নটা। একটা সময় গালিব ভায়ের কবিতা নিয়ে বারবার কানে আসত—গালিব ক্লাসিসিস্ট। ভাবতেছিলাম, ক্লাসিক কেন তিনি! হালকার উপর ঝাপসা সাৎ বভ্-এর গদ্যটা আমারও পড়া ছিল। কিন্তু তা দিয়ে গালিব ভাই কেন ক্লাসিসিস্ট তা বোঝা হইল না। কপালই খারাপ আমার! সম্ভবত তার কবিতায় যুক্তব্যঞ্জনের যে ঝংকার, তারেই কি উনারা ক্লাসিক কইতে চান! জানি না। দারোগাগিরি করা আমার কাজ না। তবুও তৃষিত মন তো হঠাৎ হঠাৎ মাতব্বরিও করিতে চায়! আজ কেন যেন একটুখানি তেমন হইতে বড় সাধ জাগিতেছে।

আমার মনে হয়, গালিব ভাইয়ের কবিতা রোমান্টিক ঘরানার। অনেক কিছু আয়োজন করে বলতে চান, বলেনও। অনুপ্রাস, অক্ষরবৃত্ত, মাঝেমাঝে আয়রনি, কার্যকরণ কৌশল ব্যবহার করেন অধিক ক্ষেত্রে। সে জন্য আমি বলি, উনার আছে সিগ্নেচার ল্যাঙ্গুয়েজ। তিমিরে তারানাও ব্যতিক্রম নয় তার।


২৮.০৩.১৮

এই যে ভীষণ রাত্রি। আমার চারপাশে অন্ধকারের জমজ স্রোত। বাইরে একটা কুকুর ডেকে যাচ্ছে ইতিহাসের মতো। জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়ালেই দেখতে পাই একজন নৈশপ্রহরী তার বাঁশি থেকে ছুড়ে দিচ্ছেন বিষণ্নতা। আমার হঠাৎ মনে পড়তে থাকে মোহাম্মাদপুর কবরস্থানের কথা। কী নিঃসঙ্গতার মতো সবুজ! এখানে প্রায় কবরই দেখতে একই রকম। লম্বাটে আয়তাকার। কিন্তু কয়েকটা কবরের গঠন বেশ ভিন্ন রকম। এখানে নিয়মিত যেতে যেতে একদিন আমিও বুঝতে পারি এই যে কাঠামো—যারা একটু অন্যতা নিয়ে টিকে আছে, সেসবই ভালো লাগছে আমার। ভাবতে থাকি, কবিতার কথা। নতুন কী করা যায়—! ফর্মে। একটা কবিতা কাগজে দেখতে কেমন হবে এই সৌন্দর্যচিন্তা কবিরা যার যার মতো করে ভাবেন নিশ্চয়ই। গালিব ভাইও মাঝেমধ্যেই সেসব বলেছেন আমাকে।

‘ডার্কচেম্বার’ যে পার্টটা তি.তা.-তে দেখতে পাচ্ছি ১৮ মাত্রার অক্ষরবৃত্তের কাঠামোতে, গালিব ভাই কি এমনই কবিতা লিখবেন এর পরে! নাকি ‘গোলাপ ও কৌতুক’, যেখানে ধরা পড়েছে বৈঠকি ঢং, আড্ডার ছল, তেমন! জানি না। তবে নতুন কোনো ভাষাভঙ্গিমা যে তাকেও টানে সে আমি জানি। তবে কি নতুন করে শুরু করবেন তিনি? তৃতীয় দশকের কবিরা যেমন একটি আবিষ্কারপ্রতিম ভাষা ও ফর্মে লিখবেন, তিমিরে তারানার কবিও কি সেদিকে যাবেন?


২৯.০৩.১৮

কোনো কিছুই না ছোঁয়া এই দিনগুলোতে আমার খুব মনে পড়বে সেই ডাচ মেয়েটির কথা। যাকে আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম চট্টগ্রামের ওয়ার সিমেট্রিতে। সেখানে সাবলীল হতাশা, যুদ্ধজয়ের অথবা পরাজয়ের করুণ শ্লেষ। তার এপিটাফে লেখা নাম HARDJO BIN DALSIAH। । উনিশশো চুয়াল্লিশের কোনো এক দিন অথবা রাত্রিতে মৃত্যু এসেছিল যার। তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি যেন টের পাচ্ছিলাম নেদারল্যান্ডস-এর কোনো সবুজ রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে জীবনের সব আকাঙ্ক্ষাসমেত তারই প্রেমিক তাকে গভীরভাবে ডাকতে চাইছে ফোঁটা ফোঁটা বরফবৃষ্টির সুরে কান পেতে। আর বুঝতে পারছে সমস্ত ধর্ম ও রাষ্ট্রের কূট সব প্রতারণাবীজ—অবধারিত ভাবে আমারও মনে পড়বে—‘কেবল তোমার নামটিকে/ আলতোভাবে ছুঁয়ে ধর্ম ও রাষ্ট্রের ভেদ আমি/ কিছুটা বুঝেছি…/

সত্যিই কি বোঝা যায় কোনোদিন! এই অভিরূপ হাহাকার, এই জন্মদক্ষিণা—!


৩১.০৩.১৮

সারাদিন পড়ানোর পর আজ ভীষণ ক্লান্ত ছিলাম। রাত ৮ টার সময় হঠাৎ মনে পড়ল তানভীর মোহাম্মাদের কথা। আজ ওদের শর্টফিল্ম [নস্টালজিক কুহু]-এর স্ক্রিনিং। আমাকে যেতে দাওয়াত করেছিল কয়েকদিন আগেই। কিন্তু একা কোথাও যেতে ভালো লাগে না আমার। সাজিদকে ডাকলাম। বাসার সামনে থেকেই রিক্সা নিলাম। ভাড়া ঠিক করতে গিয়ে বুঝতে পারলাম রিক্সাঅলার বাড়ি বগুড়ায়। পরে অবশ্য ভুলেই গেলাম। সে অন্য কারণ। আচ্ছা, কারণটাই বলি না হয়। ‘মামাতো বোনের মতো স্নিগ্ধ জামপাতার আড়াল থেকে/ আজকে বেরিয়ে এসে মনে হলো’। বেরিয়ে এসে কী মনে হলো সে না হয় পরে বলা যাবে! এই লাইনটা সাজিদকে শুনাচ্ছিলাম। ও তো ইয়ার্কি করতে করতেই শেষ। আমি বললাম, এইটা কিন্তু কবিতার লাইন! ও বলে, তাতে কার কী! সদা জাগ্রত থাকিবে ইয়ার্কি।
যে করেই হোক তাকে দেখা চাই রাত্রি অথবা দিনে,
দেব সব কিছু উজাড় করিয়া মামাতো বোনকে কিনে।


সারাটা রাস্তায় আমি গুনগুন করব, ‘মামাতো বোনের মতো স্নিগ্ধ জামপাতার  আড়াল থেকে/ আজকে বেরিয়ে এসে মনে হলো…


কী প্যারোডি বাবা! এই শুনে রিক্সাঅলাও হাসতে থাকে। হঠাৎ জিজ্ঞাসা করি—মামা, বাড়ি কই? বগুড়া। বগুড়ার কোথায়? সারিয়াকান্দি। সারিয়াকান্দির কোথায়? নার্সি। ক্রমশ মন খারাপ হতে থাকে আমার। আমার একমাত্র মামার বাড়ি ওখানে। বছর দুই আগে হঠাৎ মারা যান মামা। মা’র ছোট। রিক্সাঅলাকে বলি, আমার মামার বাড়ি ওখানেই। উনি নাম শুনতে চান। নাম বলি। চিনে ফেলেন। মামার অনেক গল্পই আমাকে শোনালেন। একমাত্র মামাতো বোনের কথাও বললেন। ধীরে ধীরে আমার মনে পড়তে থাকবে ছোটবেলার কথা। কসকো সাবানের কথা। মামার সঙ্গে মাধুডাঙায় যাবার কথা। আর সহসা আস্ত একটা জামবাগান দুলে উঠবে আমার মগজের ভেতর। এই বসন্তের দিনে তার সহস্র পাতা থৈ থৈ করে কাঁপতে থাকবে। আর গালিব ভাইয়ের ঐ লাইনগুলো তার সমস্ত অর্থ হারিয়ে কী অপার ছায়ায় নড়তে থাকবে। সারাটা রাস্তায় আমি গুনগুন করব, ‘মামাতো বোনের মতো স্নিগ্ধ জামপাতার  আড়াল থেকে/ আজকে বেরিয়ে এসে মনে হলো…।

এবার কোনো হাস্যরস নেই, নেই অভ্যাসী কৌতুক, কেবল মায়া আর বেদনার ছাঁচ আমায় গ্রাস করছে ধীরে ধীরে।

কবিতা এমনই!


২৩.০৩.২০১৮

নানান কাহিনি-কিসিম করে সেন্টমার্টিন যাওয়া হয়েছিল। ধার-দেনা, [ধার ও দেনাকে কোন ভদ্রলোক যে দ্বন্দ্ব সমাস বলে প্রথমে রায় দিয়েছিলেন! আল্লাহ মালুম! এটা হওয়া উচিত ছিল ‘বিপদে পড়া’ সমাস। কেননা ধারের সময় তো ভালোই লাগে, যত বে-আরাম শুধু ঐ দেনার সময় অর্থাৎ দেওয়ার সময়। এরচে বড় বিপদ আর নাই। তবুও গিয়েছিলাম। যাইতে হয়। চলিতেছে এমনি অনাদিকাল হতে।]

চট্টগ্রাম নেমেই রাজীব [দত্ত]-দা আর মারুফ [আদনান] ভাইয়ের পুরানা মেসে ওঠা। এক ঘণ্টার জন্য মে বি। বাড়িটা বেশ আগের। ঘরের দেয়ালে রাজীবদা’র বহু আগের আঁকা কিছু ছবি তার সিগ্নেচার নিয়ে ঝুলে আছে। খাওয়া-দাওয়া। চট্টগ্রাম চারুকলা ঘোরা। ক্যান্টিনে এক মেয়েকে ভালো লাগছিল দেখতে। তাকালামও বেশ কয়বার। মেয়েটার কোনো বিকারই নাই যেন।

উপেক্ষার দৃষ্টিভেদ আমি/ ছত্রিশ দিগন্ত ঘুরে তবে/ শিখেছি।

সে শুধু হাসছে আর হাসছে। সমস্ত বন নিয়ে যেন উথাল করছে বাতাস। এবার আমি তার দিকে তাকাতেই থেমে গেল হাসি। মনে পড়বে খুব—

রবারের বনে, কী গন্ধের/ তুবড়িতে থেমে গেল হাসি!

তারপর সোজা কক্সবাজারের দিকে যাত্রা। নতুন ব্রিজ থেকে যখন গাড়ি ছাড়ল, মনে হলো পথে পথে ‘সবুজের অনুপ্রাস’। ডুলাহাজরা, মালুমঘাট, চকরিয়া, পদুয়া, দোহাজারি, রামু রাবার-বাগান—কেটে কেটে চলে যাচ্ছে বাস। হালকা গরম। তন্দ্রা এসে যায়। যেন—‘বনের মৌমাছি সব একে একে উড়িয়ে এনেছে/ হাওয়া।/’ হঠাৎ ঝিমুনি কেটে গেল আমার। এই যে হলুদ রঙের হাওয়া! কী অদ্ভুত না! কে যেন বাতাসকে পেইন্ট করছে এমন। কয়েকদিন আগে এমন ইন্দ্রিয় রাঙিয়ে দেওয়া আরেকটা কবিতা পড়েছিলাম। কার যেন! কার যেন! ওহ্! শ্যামসুন্দর মুখোপাধ্যায়ের, ‘হাওয়া-মোরগ বিষয়ে’। ‘মনে পড়ে একবার মাংসবিক্রেতার হাত ফসকে একটি গলাকাটা মোরগ/ হারিয়ে গিয়েছিল অন্ধকারে। যতদূর দৃষ্টি যায়, লাল হয়ে গিয়েছিল/ অন্ধকার।/’ আর আমি তখন চোখ বন্ধ করে গুনগুনাই, ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে…’

গাড়ি থেকে নেমে হোটেল খুঁজতে খুঁজতেই জিন্দেগি পয়মাল হবার জোগাড় [যদিও জয় ভাই আগেই ঠিক করে রাখছিলেন]। তারপর পাইলাম তাহাকে, পাইলাম। এর বেশি উচ্ছ্বাস হলো না। সন্ধ্যায় সমুদ্রে। খুব একটা ভালো লাগল না। কী আর করার! পুরী সিরিজ-এর কবিতার মতো মনে হলো না কিছুই। একদম রাতে একবার সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে মনে হলো, ঐ যে ‘লাখো লাখো গুণ্ঠনমিছিল এই নীল ঢেউ’ [উ.ব.]। ব্যাস, এটুকুই!

সকালে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে। কমল’দা খালি পাখির ছবি তোলে। আরও একটা পাখির দেখা সে পাইছিল সেদিন। সে কথা আর না বলি। আহারে বেচারা! এই হারায় তো এই পায়, এমন অবস্থা। দুপুরে গিয়ে নামলাম সেন্টমার্টিনে। আহা! কী নীল! ‘অপার আমার স্বপ্নে অসম্ভব বাণিজ্য চলছে!’ [উ.ব.]। তখন ধীরে ধীরে কেমন যেন মন খারাপ হতে লাগল। মনে হচ্ছিল কাকে যেন ফেলে এসেছি—‘জেনেছি কাকে চাই, কে এলে চোখে ফোটে/ নিমেষে শরতের খুশির জ্যোতিকণা/’ [শা.রা.]। তিমিরেও তারানা ফুটছে এক এক করে। ‘যতদূর ভেসে যায় ঢেউবার্তা, নদীর সংলাপ/ কম্পমান তরণীতে দেখি তুমি অনায়াসে/ পার হও পৃথিবীর পথ, সুপুরিবনের রাত্রি—’। সেদিন রাতে আমরা সেই দূরদ্বীপের এলোমেলো রাস্তায় হেঁটে ফিরে আসি জেটির দিকে। সমুদ্রে নীল আওয়াজ। আকাশে লক্ষ লক্ষ তারা। যেন মুশায়েরা বসিয়েছে। মনে পড়ে ‘হৃদয় মৃতের মুশায়েরা’। এই দিগব্যাপী অন্ধকার আর ঢেউয়ের বার্তা ক্রমশ আমার স্নায়ুতে ভর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ফাঁকা এক ‘আর্শিমহলের’ দিকে।

পরদিন সকালে যখন আবার সমুদ্রপাড়ে এলাম সবাই, ছোট ছোট মেয়েরা ঝিনুক কুড়াচ্ছে। মালা বিক্রি করছে। বারবার সুকান্ত হারিয়ে যাচ্ছে মারুফে। কেয়াবনের নির্জনতায় বসে আলাপ সেরে নিচ্ছে পাখিরা। ভাবছি, ‘নৈঃসঙ্গ্য হে। নিদ্রাভঙ্গ। দুপুর ও নির্জনতা।/ মন্থর স্রোতের নিচে ঝিনুকের গান গেয়ে’…।

এই তো আমার তিমিরে তারানা


সম্পাদকীয় নোট :
তি. তা. = তিমিরে তারানা
উ. ব. = উৎপলকুমার বসু
শা. রা. = শামসুর রাহমান
হাসান রোবায়েত

হাসান রোবায়েত

জন্ম ১৯ আগস্ট, ১৯৮৯; বগুড়া। শিক্ষা : পুলিশ লাইন্স হাইস্কুল, বগুড়া। সরকারী আজিজুল হক কলেজ; বগুড়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই —

ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [কবিতা; চৈতন্য, ২০১৬]
ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [ভারতীয় সংস্করণ, বৈভাষিক, ২০১৮]
মীনগন্ধের তারা [কবিতা; জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]
আনোখা নদী [কবিতা, তবুও প্রয়াস, কলকাতা, ২০১৮]
এমন ঘনঘোর ফ্যাসিবাদে [কবিতা, ঢাকাপ্রকাশ, ২০১৮]

ই-মেইল : hrobayet2676@gmail.com
হাসান রোবায়েত