হোম বই নিয়ে তারেক খানের কনডম পলিসি : ব্যক্তির নীতি বনাম রাষ্ট্রের পলিসি

তারেক খানের কনডম পলিসি : ব্যক্তির নীতি বনাম রাষ্ট্রের পলিসি

তারেক খানের কনডম পলিসি : ব্যক্তির নীতি বনাম রাষ্ট্রের পলিসি
10.51K
0

তারেক খানের সাথে আমার আলাপ বহুদিনের। সে লেখে জানতাম; কিন্তু ভালো যে লেখে, তা জানতাম না। অনেক দিন আগে সে আমাকে একটা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি দেখতে দিয়েছিল। মধুর কেন্টিনে। আমি কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে বললাম, ভালো লাগে নাই। তারপর এ ব্যাপারে খুব একটা আলাপ হয় নাই। বছর তিন-চারেক পরে সে বিপুলাকার এক পাণ্ডুলিপি নিয়ে হাজির। প্রায় সাত শ পৃষ্ঠার উপন্যাস। কয়েক বাক্য পড়েই আমি বুঝেছিলাম, আমাকে বেঘোরে রেখেই গত ক বছরে তারেক হাত পাকিয়ে ফেলেছে। দারুণ বিষয় নিয়ে কাজ করেছিল তারেক। উপন্যাসটির নাম ছিল বান্ধাল। নদী মরে যাচ্ছে, উৎপাদন-সম্পর্কের পরিবর্তন হচ্ছে, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামষ্টিক জীবনের মারাত্মক সব পরিবর্তন হচ্ছে, সবকিছু আবার আর্সেনিক দূষণের মতো বিশেষ পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত হচ্ছে। খুব দীর্ঘ পরিসরে তারেক খান, আমার বিবেচনায়, বিষয়গুলো সাফল্যের সাথে ধরতে পেরেছিল।

বছর তিনেক আগে সে আমাকে আরেকটা পাণ্ডুলিপি দিল। দেখলাম, এটা ছোট লেখা। ষাট-সত্তর পৃষ্ঠা হবে। শুরু করেই দেখলাম লেখার ভঙ্গি একেবারেই ভিন্ন। আমার পছন্দ হলো। এই গণ-পছন্দের কারণে আমার রুচি সম্পর্কে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু আমার সত্যি সত্যি ভীষণ পছন্দ হয়েছিল। আমি পড়ে বললাম, এটা ছেপে ফেল। পত্রিকায় ছাপা হলো। কিন্তু সে খুব হতাশ হলো। কেউ এ সম্পর্কে কিছু বলল না। কোনো পাঠক-প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না। আমি বললাম, বই আকারে ছেপে ফেল। প্রকাশক ঠিক হলো। কিন্তু ফ্ল্যাপ লেখার জন্য লোক পাওয়া গেল না। আমাকেই লিখতে হলো। বুঝলাম, বান্ধালের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার পরেও তারেক খান ঢাকার সাহিত্যজগতে শুভানুধ্যায়ী বিশেষ পেয়ে ওঠে নি।

ফ্ল্যাপে আমি লিখেছিলাম : ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতিবাদ রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যখন নিপীড়নের সংস্কৃতি নিয়ে অব্যাহতভাবে একমত থাকে, তখন সন্ত্রস্ত জনপদের জমাট নিস্তব্ধতা আর কিছুতেই কাটতে চায় না। সরব হতে হয় বিবেকবান ব্যক্তিকেই। বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে কলম ধরেছেন অনেকেই। কলাম লিখেছেন ফরহাদ মজহার, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল প্রমুখ; কবিতায় প্রতিবাদ করেছেন বিচারপতি মুহম্মদ হাবীবুর রহমান; উপন্যাস লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ। এবার এ তালিকায় শামিল হলেন তারেক খান। কনডম পলিসি উপন্যাসে এক হত্যাকাণ্ডের পশ্চাদপট উন্মোচন করেছেন তিনি। তুলে এনেছেন রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি, সামাজিক ও পারিবারিক জীবন। তারেক খান চিত্রায়ণ ও চরিত্রায়ণটা উপন্যাসের ধর্ম মেনেই করেছেন। সাথে যোগ করেছেন সম্ভাব্য রাজনীতির পর্যালোচনা। প্রধান চরিত্রের বাস্তবজীবন আর সত্তার সাথে মিলিয়ে উপন্যাসের মেজাজেই তুলে এনেছেন তাত্ত্বিক-প্রায়োগিক বিচার-বিশ্লেষণ। কনডম পলিসি রাজনৈতিক উপন্যাসের এক নতুন দৃষ্টান্ত।’


চরিত্রায়ণের মধ্য দিয়ে, কাহিনি বলার মধ্য দিয়ে বক্তব্য এগোচ্ছে না, অথচ প্রায় প্রতিটি চরিত্রকে আলাদাভাবে পাওয়া যাচ্ছে—এটা আমার কাছে খুব উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে।


বই আকারে ছাপার পর আলোচনা উপলক্ষে বইটা আমি আবার পড়েছি। দেখলাম, আমার মত পরিবর্তন করতে হয় নাই। আমি নিশ্চিত, তারেক খান খুবই ভালো উপন্যাস লিখেছে। ক্যাটাগরিকেলি ভালো, এবং আলাদা। এটা একটা রাজনৈতিক উপন্যাস। ঢাকায় এ ধরনের লেখালেখি খুবই কম হয়। রাজনৈতিক মানে শুধু বিষয়বস্তুগত নয়, এর যে উপস্থাপন-প্রণালি, বর্ণনাভঙ্গি, এর যে দেখার দৃষ্টি, চরিত্রায়ণ, এর তাৎক্ষণিকতা, কাঠামো-নির্মাণ, এর যে উন্নাসিকতা, এর যে ঘৃণা, ব্যক্তিগত নানান ধরনের নিষ্পেষণ—আত্মনিষ্পেষণ—সবকিছুই গভীরভাবে রাজনৈতিক।

কনডম পলিসি নামটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তিনি কাজ করেছেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। রাষ্ট্র তার বিবেচনার বিষয়। কাজ করেছেন উৎপাদন-সম্পর্ক নিয়ে। তিনি খুবই হুঁশিয়ার যে বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশের জমি যথেষ্ট নয়। এমন অবস্থায় পরিবার পরিকল্পনা রাষ্ট্রের একটা পলিসি হওয়াই উচিত, বিনা পয়সায় কনডম সরবরাহ করাই উচিত। একই সঙ্গে রাষ্ট্র আরেক কাজ করতে পারে। রাষ্ট্র র‌্যাব কিংবা অপরাপর বাহিনী তৈরি করতে পারে। নির্বিচারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করে মানুষ কমিয়ে ফেলতে পারে। এই যে নামের মধ্যে একটা প্রচণ্ড শ্লেষ, এটা তারেক খান তৈরি করেছেন। উপন্যাসের মধ্যে তৈরি করেছেন আর নামের মধ্যে ব্যবহার করেছেন। এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে এটা প্রায় একধরনের প্রতীকী তাৎপর্য অর্জন করেছে। কনডমের কথা এই গল্পের প্রথমেই আছে। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র তানজীব ক্লাসে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ায়, জনসংখ্যা সমস্যা আর পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে পড়ায়। সে অন্য কথার ফাঁকে কনডমের ব্যবহারের কথাও বলে। ফলে এই উপন্যাসটির নাম তিনি যে কনডম পলিসি দেবেন, তার একটা প্রস্তুতি উপন্যাসে আছে। কখনও শ্লেষ, কখনও হাসিঠাট্টা, তরুণ-তরুণী ছাত্রছাত্রীদের সাথে শিক্ষকের রসাত্মক সম্পর্ক—ইত্যাদি বিচিত্র পন্থায় প্রসঙ্গটা তিনি এনেছেন। এই জন্য নামটা আমার আরো বেশি পছন্দ হয়েছে।

এ উপন্যাসটি আকারে ছোট। এ ছোট আকারটাও কাহিনি আকারে উপস্থাপিত হয় নি। আমরা সাহিত্য-আলোচনার সময়ে মাঝে-মাঝে বলি, এ উপন্যাসটি কাহিনি-রিক্ত। যেমন চাঁদের অমাবস্যায় কাহিনি কম, কিংবা ধারাবাহিক কাহিনি উপস্থাপন লেখকের লক্ষ্য ছিল না। বিশ্লেষণ বেশি। কনডম পলিসি উপন্যাসটা সে রকম। এবং একটা মজার কাজ করেছেন লেখক। উপন্যাসের ঘটনাগুলো তিনি দুচার দিনের মধ্যে শেষ করেছেন। এর যে প্রধান চরিত্র বা নায়ক সে এই সময়টার প্রতিটা মুহূর্ত একেবারে বাস্তব অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে এবং এসব বাস্তবতার মধ্য দিয়ে লেখক তার অতীত নিয়ে এসেছেন, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে এসেছেন এবং তার সংশ্লিষ্ট সব বিচার-বিশ্লেষণ নিয়ে এসেছেন। এটাও লেখকের একটা মুনশিয়ানার ব্যাপার। তানজীবই এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র। এক অর্থে সে এ উপন্যাসের একমাত্র চরিত্র। অন্য চরিত্রগুলো পরোক্ষভাবে ওই তানজীবের মাধ্যমে, তার সঙ্গে সম্পর্কসূত্রে, তার চোখ দিয়ে, তার বিবেচনা থেকে উপস্থাপিত হয়েছে। বৃহত্তর কাঠামো বা আকারের সঙ্গে সে যেভাবে এই চরিত্রগুলোকে সম্পর্কিত করছে, সেভাবেই সেগুলো উপস্থাপিত হচ্ছে। আলাদাভাবে বর্ণিত হয় নাই। নির্মিত হয় নাই। তবে চরিত্রগুলোকে আলাদা করে পড়া যায়। এ উপন্যাস খুব চরিত্রায়ণ-নির্ভর উপন্যাস নয়। কিন্তু তাতে গৌণ চরিত্রগুলোও বিশিষ্টতা হারায় নাই। যেমন, তানজীবের বাবাকে আলাদা করে পড়া যায়, তার মাকে পড়া যায়। তারা গ্রামে থাকে। তাদের কিছু ধানি জমি আছে। তাদের আকাঙ্ক্ষা, সন্তানদের সাথে তাদের সম্পর্ক এবং তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে তাদের আশা বা সে সম্ভাবনার বিপর্যয়ে তাদের যে হতাশা, তা আলাদা স্বরে-সুরেই উপস্থাপিত হয়েছে। এমনকি তাদের আশপাশে আরও যারা আছে তাদের সাপেক্ষে, তাদের সন্তানদের সাপেক্ষে নিজেদের সন্তানদের সম্ভাবনা—এসবও বাদ যায় নি। এসব হয়তো সাকুল্যে পৃষ্ঠা দুয়েক হবে; তাও আবার তানজীবের বয়ানে। বিচ্ছিন্ন ছেঁড়া ছেঁড়া বয়ানে। কিন্তু ছবিটা স্বচ্ছ। অর্থাৎ চরিত্রায়ণের মধ্য দিয়ে, কাহিনি বলার মধ্য দিয়ে বক্তব্য এগোচ্ছে না, অথচ প্রায় প্রতিটি চরিত্রকে আলাদাভাবে পাওয়া যাচ্ছে—এটা আমার কাছে খুব উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে।

ছোট্ট কাহিনিটির মধ্যে আরেকটা ভারি ব্যাপার ঘটেছে। এর বিষয়ের বিস্তারটা যথেষ্ট বেশি। ছোট আকারের মধ্যে বড় বাস্তবতা; সেই বাস্তবতায় আবার নিখুঁত ছবি। কোনো কোনো অংশ প্রায় ফটোগ্রাফিক বাস্তবতার মতো। এ কথাটা আমরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখালেখি সম্পর্কে বলি। তারেক খানের এ উপন্যাসের ব্যাপারটা যদিও সেরকম নয়; কিন্তু এখানেও নানা ধরনের নিখুঁত বাস্তবতা, ডিটেল বাস্তবতা সংক্ষিপ্ত কিন্তু কার্যকরভাবে আছে। ওই ছোট্ট আয়তনের মধ্যে বিস্তারটা হয়েছে বেশ বড়। ওই ছোট আয়তনের মধ্যেই আছে ব্যক্তি; আছে কেন্দ্র ও প্রান্ত; আছে গ্রাম, আছে ঢাকা শহর; আছে রাজনৈতিক দল ও রাজনীতির লোক—যারা রাষ্ট্র চালায় বা চালাবে—এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এ রকম বড় আকারে তিনি কাজ করেছেন। এর আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এর আগে আমি বান্ধাল পড়ার সময় দেখেছি এবং আলোচনায়ও শনাক্ত করেছিলাম, সেটা হলো ব্যক্তি-চরিত্রের সাথে উৎপাদন-বণ্টনের সম্পর্ক। ঢাকার লেখকদের একটা বড় অংশ এ ব্যাপারে সচেতন না থেকেই উপন্যাস লেখেন। কনডম পলিসির এই সচেতনতা খুব উপভোগ্য। একটা চরিত্র উৎপাদন-সম্পর্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে, ওই সম্পৃক্ততার বশেই অ্যাকশন বা রিঅ্যাকশনের সাথে যুক্ত হয়। এটা শুধু শ্রেণিগত ব্যাপার নয়। মুহূর্তের আরো নানান ডাইমেনশন থাকে। মানসিক অবস্থা, সংশ্লিষ্ট অন্য চরিত্রগুলোর সাথে লেনদেন ইত্যাদি নানা অবস্থার একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে ব্যক্তি তার সংলাপ উচ্চারণ করে। কাজে নীরত হয়, বা অন্যের কথায়-কাজে প্রতিক্রিয়া জানায়। তারেক খান এসব ডিটেলসের ক্ষেত্রে দারুণ সতর্ক ছিলেন। একটা চরিত্র হয়তো একটি মাত্র বাক্যে প্রকাশিত হচ্ছে, কিংবা শুধুই একটি শব্দে। হয়তো উচ্চারণটা শুরু হলো মাত্র; তারপরই ডট চিহ্ন। এ উপন্যাসের বয়ানরীতি অনুযায়ী হয়তো তার পরই বর্ণনার বিষয় পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কিন্তু ওই একটি শব্দেই বা অসমাপ্ত বাক্যেই পুরো পরিস্থিতি পাঠ করা যায়।

তার মানে কনডম পলিসির মাইক্রোলেভেল বেশ উপন্যাসসম্মত; আবার একই সঙ্গে বিশিষ্ট। উপন্যাসসম্মত এই অর্থে যে, স্থান-কালের যে ধরনের জীবন্ত পরিস্থিতির মধ্যে উপলব্ধির একটা তাজা আবহ তৈরি করতে হয়, লেখক তা করতে পেরেছেন। পুরো পটভূমি এবং চরিত্রগুলো একত্রে মনের চোখে ধরা থাকলেই কেবল এ ধরনের সামঞ্জস্যপূর্ণ ডিটেল সম্ভব। অন্যদিকে আবার এ বয়ান বিশিষ্ট। কারণ, এখানে ডিটেলস বিস্তীর্ণ পরিসরে সামগ্রিক ছবিটা তৈয়ার করে নাই। সংক্ষিপ্তির মধ্যেই বিস্তারের কার্যকর আবহটা তৈরি করেছে। এই কাজটা তারেক করল কিভাবে? কাজটা তারেক করেছে বহু আগের একটা ন্যারেটিভ-টেকনিকে। স্ট্রিম অব কনশাসনেস পদ্ধতিতে। একটি অত্যন্ত পরিচিত সাহিত্যরচনা পদ্ধতি। বাংলায় আমরা একে বলি চেতনাপ্রবাহরীতি। গত শতকের তৃতীয় দশকের গোড়ায় জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফসহ বহু লেখক এ বর্ণনাপদ্ধতিকে অত্যন্ত কার্যকর রীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। বাংলায়ও কেউ কেউ লিখেছেন। এখানে সতর্কতার জন্য একটা কথা বলার দরকার বোধ করছি। আমার যেহেতু বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যের ইতিহাসের সাথে কিঞ্চিৎ পরিচয় আছে, সে কারণে জানি, উপনিবেশিত মনোভঙ্গির কারণে পশ্চিমা সাহিত্যকলার নামে সাহিত্য-বিশ্লেষণ বাংলাভাষীদের এক পুরানা খাসিলত। বহু লেখকের উপন্যাস স্ট্রিম অব কনসাসনেস রীতিতে লেখা হয়েছে বলে বাজারে জাহির আছে। আদতে বাংলা ভাষায় রীতিটির চর্চা খুবই কম। স্ট্রিম অব কনশাসনেস একটা জটিল পদ্ধতি যা কাহিনিক্রম লঙ্ঘন করে, সময়ক্রম লঙ্ঘন করে, স্বাভাবিক ন্যারেটিভ ভঙ্গিকে লঙ্ঘন করে। ব্যক্তির নিজের মনোজগতের নিয়ন্ত্রিত ও অনিয়ন্ত্রিত—প্রধানত অনিয়ন্ত্রিত; জ্ঞাত এবং অজ্ঞাত—প্রধানত অজ্ঞাত চিন্তাপ্রবাহকে সরাসরি বাক্যে-শব্দে ধরার একটি পদ্ধতি এটি। যেমন খুব ব্যাপকভাবে বলা হয়, কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসে স্ট্রিম অব কনশাসনেস আছে। আমি নিজে একাধিকবার এই উপন্যাস পড়েও এর সত্যতা পাই নি। এ উপন্যাসটি একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এর গুরুত্ব নির্দেশের জন্য চেতনাপ্রবাহরীতির বরাত প্রয়োজনীয় নয়।


তারেক সুন্দর শব্দচয়ন করেছেন—রাষ্ট্র চায় পলিসি, সে চায় তত্ত্বায়ন। রাষ্ট্র বিত্তবানের পক্ষেই কাজ করে। 


এদিক থেকে আমি বলব, অনেক বিলম্বে হলেও একটা পুরনো টেকনিক তারেক খান বেশ সফলভাবে ব্যবহার করেছে। অংশবিশেষ নয়, এ উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ শব্দ পর্যন্ত স্ট্রিম অব কনশাসনেস ভঙ্গিতে লেখা। এই পদ্ধতিই তারেককে এই ছোট্ট আকারের মধ্যে অনেক বড় ব্যাপারকে ধরার উচ্চাভিলাষে সাফল্য এনে দিয়েছে। যেকোনো অংশ পড়লেই বোঝা যায়, এর প্রধান চরিত্র তানজীব। এককালে সে খুব সক্রিয় ছিল। এখন সে-সক্রিয়তা নাই। আছে বিমর্ষতা। আছে আগের কাজের অর্থহীন পরিণতির পর্যালোচনা। আছে যে বিশেষ মুহূর্তের প্রচণ্ডতার মধ্যে সে বর্তমান যাপন করছে তার চাপ। এই চিন্তামূলক, পর্যালোচনামূলক সক্রিয়তাই তার জবানিতে চেতনার প্রবাহ আকারে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে বাইরের সক্রিয়তা আর মুভমেন্ট এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং পুরানা স্মৃতি, শ্রুতি, আকাঙ্ক্ষা এবং একটা প্রচণ্ড ঘোরের মধ্যে সময় কাটানোর বাস্তবতাই এখানে জোরাল হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে হানা দিচ্ছে তার পুরানা প্রেম, পুরানা বান্ধবী বা এখনকার কোনো ছাত্রীর প্রতি আসক্তি; তার পুরানা নেতা, যার সাথে তার মতের মিল না হওয়ায় সে রাজনীতি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে; তার পুরানা বন্ধু যাদের সাথে সে রাজনীতি করত এবং অন্যান্য বন্ধুবান্ধব যাদের সাথে নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা নিয়ে প্রচুর আলাপ হয়েছে। আরো আছে তার মা, তার বাবা, যাদেরকে সে প্রায়ই নাম ধরে ডেকে ফেলে এবং দুই-তিন-চার বার উল্লেখের পরে খেয়াল করে যে, এদের তো সে নাম ধরে ডাকতে পারে না; এরা তো তার মা-বাবা।

ওরা আছে এবং অবশ্যই তার ছোট ভাই সজিব। সে একজন ছাত্র, উচ্চাভিলাষী, বিদেশ গমনেচ্ছু। তানজীবের প্ররোচনায় রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছে, ক্যাডার বাহিনীর খুব কামিয়াব সদস্য হয়েছে এবং ঢুকে গেছে র‌্যাবের কালো তালিকায়। যে কোনো মুহূর্তে মারা পড়বে। চেষ্টা করা হচ্ছে অতি গোপনে বিদেশ পাঠিয়ে দেবার। এই ধরনের দুচার দিনের ঘটনা লেখক বেছে নিয়েছেন। বাকি সব এসেছে বিশেষ বর্ণনাভঙ্গিতে। মনোকথনের ভঙ্গিতে। যাকে আমি বলছি এক ধরনের—এক ধরনের—বেশ সফল স্ট্রিম অব কনশাসনেস। এত সংক্ষিপ্তির মধ্যে এত বড় বিষয় ধারণ করার জন্য এই প্রক্রিয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

চেতনাপ্রবাহরীতি অবলম্বনের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। তারেক খান শুধু গল্পই বলছেন না; বরং এই উপন্যাসের যে ব্যাপারটি আমাকে খুবই আকৃষ্ট করেছে, জানি অনেককে আকৃষ্ট নাও করতে পারে, তা হলো, উপন্যাসটি গভীরভাবে রাজনৈতিক। এতে আছে বর্তমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পরিচয়, তার সমস্যাগুলো এবং আছে সম্ভাব্য রাজনৈতিক তত্ত্বায়ন। তত্ত্বায়নের সাথে কিভাবে বাস্তবের সেই রাজনীতি ফলপ্রসূ হবে তারও প্রস্তাবনা উপন্যাসে তিনি দিচ্ছেন। তাহলে এই যে বিচিত্র রকম বিষয় নিয়ে তাকে কারবার করতে হবে, এবং তাকে লিখতে হবে উপন্যাস, উপন্যাসের ভাষার মধ্যে, উপন্যাসের প্রক্রিয়ার মধ্যে ব্যাপারটাকে সম্ভবপর করতে হবে, আমার ধারণা, অন্যভাবে বলার চেয়ে এই বিষয় এইভাবে বলাই অধিকতর উপন্যাসসম্মত হয়েছে। অন্যভাবে ব্যাপারটা যে বলা যায় না তা না। বাংলা রাজনৈতিক উপন্যাসের ধারা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আনন্দমঠের কথা আমরা ভুলে যাব না। আমরা কিছুতেই গোরা উপন্যাসের কথা ভুলে যাব না, আমরা সতীনাথ ভাদুড়ীর কথা ভুলে যাব না। কিভাবে রাজনৈতিক কথা বলতে হয় তার বহু নমুনা আছে। তারেক খান তার নিজের মতো করে একটা নমুনা তৈরি করেছেন।

এই নমুনার আকর্ষণীয় একটা দিক, আমার বিবেচনায়, এখানে ব্যক্তিকে চরম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটা চরিত্রের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। তার মধ্যে প্রচণ্ড আশা ও হতাশা আছে, কাম-ক্রোধ-প্রেম আছে। এখনকার যে ভয়াবহ সময়টা সে পার করছে, এই সময়টার, বলা যায়, ধর্ষকামী-মর্ষকামী-বিমর্ষ-হতাশ বয়ান আছে। এসব বর্ণনার আপেক্ষিক পূর্ণতাও আছে। আবার এই ব্যক্তি এখানে পরিপূর্ণভাবে বিরাট সমষ্টির সাথে যুক্ত। লেখক এই যুক্ততা তৈরি করলেন কিভাবে? একটা ছেলে মফস্বল শহর থেকে এসেছে, ছাত্র হিসেবে ভালো। তার মধ্যে আকর্ষণীয় কিছু উপাদান আছে। এই তার গুণ। এই গুণের ভেতর দিয়ে লেখক রাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত পৌঁছলেন কিভাবে? পৌঁছেছেন রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে। সে একটা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ঘটনাক্রমে সেই রাজনৈতিক দল এখন রাষ্ট্র চালায়। তার সঙ্গে দলের-দলনেতার মতবিরোধ হয়েছে। তারেক সুন্দর শব্দচয়ন করেছেন—রাষ্ট্র চায় পলিসি, সে চায় তত্ত্বায়ন। রাষ্ট্র বিত্তবানের পক্ষেই কাজ করে। তারেকের বিশ্লেষণটা আমার মনে ধরেছে: একজন লোক যতটুকু উৎপাদন করতে পারে তা দিয়ে সে বড়জোর খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে তার পক্ষে বিলাস-ব্যসন সম্ভব না। ফলে দরকার এমন কাঠামো, এমন পলিসি, যা দিয়ে উদ্বৃত্ত হাতিয়ে কিছু লোকের জন্য বিলাস-ব্যসনের বন্দোবস্ত করা যায়। রাষ্ট্র—যার প্রধানকে তারেক হয়তো কৌতুকভরে রাজা উপাধি দিয়েছেন—এমনটাই চায়। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন রাজনৈতিক দলও তা-ই চায়। বিরোধীদলও তা-ই চায়। কিন্তু এই তরুণ চায় নীতি, এই তরুণ চায় গবেষণা, চায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এই তরুণ চায়, মানুষের সম্ভাব্য উন্নতির জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষকে সম্পৃক্ত করে উন্নতি করার জন্য কী নীতি গ্রহণ করতে হবে তার জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। ফলে বিদ্যমান আকারের সাথে, রাষ্ট্রনীতি বা রাষ্ট্রকাঠামোর সাথে এই তরুণের বিরোধ হয়েছে। বিরোধের কারণেই সে এখন বিপর্যস্ত। কিন্তু তার ওই অভিজ্ঞতাটা আছে যা দিয়ে সে অপেক্ষাকৃত প্রান্তীয় সমাজের হয়েও কেন্দ্রে পৌঁছে যেতে পারে। এই ব্যবস্থাটা উপন্যাসে মোটামুটি ভালোভাবে তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়।

এই যে এমন একটা অন্যায্য, অসম রাষ্ট্রের কথা বারবার বলা হয়েছে, এমন একটা সমাজের কথা বলা হয়েছে, যেখানে কিছু ব্যক্তি নানান ধরনের পলিসির মাধ্যমে অন্যদেরকে কোণঠাসা করে উদ্বৃত্ত সংগ্রহ করছে, এই জায়গায় তারেক খুব সূক্ষ্মভাবে, আমি বলব, খুব সফলভাবে র‌্যাব নামক দৈত্যকে রাষ্ট্রের সাথে স্থাপন করেছে। একে বারবার গোখরা বলা হয়েছে। তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা হলো, রাষ্ট্রতন্ত্রের বিশেষ বিপর্যয় কাটানোর জন্য গড়ে তোলা এই র‌্যাব যে আরেকটা বড় বিপর্যয়, এই বোধটাকে তারেক তত্ত্বের সাথে এবং বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে বর্ণনাধারার মধ্যে প্রতিস্থাপিত করতে পেরেছে। অর্থাৎ র‌্যাবকেও তারেক ওই রাষ্ট্রের বৃহত্তর কাঠামোর সাথে মিলিয়ে দেখতে পেরেছে।


ভঙ্গির মধ্যে যে অস্থিরতা, বিস্রস্ততা এবং বিমর্ষ ভঙ্গি তৈরি করা দরকার, তার সবটা তৈরি করে ওই ব্যক্তির এই পরিণতির মধ্য দিয়ে তারেক উপন্যাসটি শেষ করেছে।


এই উপন্যাসের প্রধান বিশেষত্ব হলো সমষ্টির কথা বলতে গিয়ে লেখক ব্যক্তিকে পরিহার করেন নি। ব্যক্তিকে পূর্ণ মূল্য দিয়ে অন্য কৌশলে, বর্ণনাভঙ্গির চাতুর্যে সমষ্টির সাথে ব্যক্তিকে ঠিকমতো স্থাপন করে পুরো গল্পটি বলেছেন। এটা একটা বিরল কৃতিত্ব বলে আমার মনে হয়েছে। সব ভালো উপন্যাস এ রকমই হয়; কিন্তু তারেক অনেক কম আয়তনের মধ্যে এটা করতে পেরেছেন। আরেকটা দিক হলো, নতুন রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রস্তাব। সেই প্রস্তাবকে উপন্যাসের বয়ানের সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে খাপ খাওয়াতে পারা মোটেই সহজ কাজ নয়। উচ্চকিত বক্তব্যকে উপন্যাসের ভাষার মধ্যে সম্ভবপর করার কাজটা খুব কম উপন্যাসে দেখা যায়।

তারেক খান এ পর্যন্ত দুটি উপন্যাস লিখেছেন। একটার নাম বান্ধাল, যার আয়তন বিপুল। একেবারেই বর্ণনাত্মক। অসংখ্য ঘটনা, বিপুল চরিত্র, লম্বা সময়, বিভিন্ন প্রেক্ষাপট। আর এই উপন্যাসে মোটে একটা চরিত্র। একেবাইে ভিন্ন টেকনিকে রচিত—স্ট্রিম অব কনশাসনেস রীতিতে। কাজ করলেন বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক নিয়ে। উন্নতির তত্ত্ব এবং সম্ভাবনা নিয়ে। তার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠল এমন এক ব্যক্তির হাহাকার যে ব্যক্তি তার ছোট ভাইকে—তার পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে—নিয়ে এসেছিল রাজনীতিতে। সেখান থেকে সে হয়ে গেল সন্ত্রাসী। পড়ে গেল র‌্যাবের কালো তালিকায়। এখন যে কোনো মুহূর্তে সে মারা পড়বে। তাকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়েছে। বিমানের টিকেট কাটা হয়েছে। যেন এয়ারপোর্ট ঠিকমতো পার হতে পারে তার ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে খবর এল মতিঝিলের কোনো এক জায়গায় র‌্যাবের সঙ্গে এনকাউন্টার হয়ে গেছে। আমাদের অতি পরিচিত গল্প। কিন্তু এই ব্যক্তির জন্য গল্প নয়; সংবাদপত্রের রিপোর্ট নয়। নিজের ছোট ভাইয়ের মৃত্যু। এ মৃত্যুর দায়ভার পরোক্ষে তার নিজের ওপরও বর্তায়। এমতাবস্থায় তার হাতাশার পরিমাণ যতটা, পরিবারের সদস্যদের প্রবোধ দেয়ার ক্ষেত্রে তার ব্যর্থতার পরিমাণ যতটা, এই ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য তার দায়-দায়িত্ব যতটা, তার সবটা মিলিয়ে বর্ণনা ভঙ্গির মধ্যে যে অস্থিরতা, বিস্রস্ততা এবং বিমর্ষ ভঙ্গি তৈরি করা দরকার, তার সবটা তৈরি করে ওই ব্যক্তির এই পরিণতির মধ্য দিয়ে তারেক উপন্যাসটি শেষ করেছে। ড্রামাকে মেলোড্রামা হয়ে ওঠার কোনো সুযোগ না দিয়েই। সমাপ্তির এই মুনশিয়ানাও উপভোগ্য হয়েছে।


[কনডম পলিসি, তারেক খান; আদর্শ, ঢাকা। লেখাটি একটি মৌখিক আলোচনার রেকর্ড থেকে অনুলিখিত। মূল কথাগুলো বিশেষ পরিবর্তন করি নি। পাঠযোগ্যতা খানিকটা বাড়ানোর চেষ্টা করেছি মাত্র। – লেখক]
Mohammad Aza

মোহাম্মদ আজম

জন্ম ২৩ আগস্ট ১৯৭৫, হাতিয়া, নোয়াখালী। এম এ বাংলা, ঢাবি, পিএইচ ডি, ঢাবি। সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাবি।

প্রকাশিত বই :
বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথ [আদর্শ, ঢাকা, ২০১৪]

ই-মেইল : mazambangla1975@gmail.com
Mohammad Aza