হোম বই নিয়ে ঘুমের আবার নিরপরাধ কী

ঘুমের আবার নিরপরাধ কী

ঘুমের আবার নিরপরাধ কী
265
0

ঘুমের আবার অপরাধ-নিরপরাধ কী! ঘুম তো ঘুমই। তা কী জন্য কী হইল, আমরা একটু ভিতরে যাইয়া দেখি। মাত্র ছয়টা গল্প দিয়া একটা পোক্ত বুনটে ঠাসা বইটার আদ্যোপান্তে মন আর মগজের খেলা। এই খেলা মোটেও খেলো খেলা না। এর লগে জীবন এবং জীবন-বহির্ভূত অতি-জীবনের কাহিনি, অনুভব এবং করা না করার নানা চিহ্ন চইলা আসছে। কেমনে যে আসছে সেইটা এক তাজ্জব ব্যাপার। এই দুনিয়ায় থাইকাও দুনিয়ার গোচরে অগোচরের ম্যালা ম্যালা ঘটনা কী অবলীলায় গল্পকার চরকার মতো ঘুরাইয়া গ্যালেন। যার ফলে আমরা পাইলাম অতি মজবুত আর টেকসই গল্পের থান। ‘আমার যত ভণিতা, জিনিয়াকে নিয়ে’ গল্পে গল্পকার অনেক ভাব-ভণিতা কইরা ঠিক জিনিয়াকে বর্ণনা করলেন নাকি খোদ গল্প বলার এক ধরনের নতুন কায়দার লগে যোগাযোগ করাইলেন, সেই সন্দেহ করি। ‘গল্প যত সাদামাটা, বয়ান তত ভণিতাময়’ এই কথাডার মতো লেখকের অনেক কথাই যথেষ্ট দার্শনিক বৈশিষ্ট্যে আক্রান্ত। আবার ঠিক দর্শনও না যেন! জীবনের খুব ঘন জায়গার কথা এইগুলা। যদি ধইরা থাকি অগুরুত্বপূর্ণ কথা কইতে গেলে ভণিতার দরকার হয়, এই কথাও যেমন সত্য, আবার খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা কওনের জন্যও ভণিতা দরকার হইয়া থাকে। ভণিতা জরুরি কি অজরুরি সেইটা গুরুত্বপূর্ণ না হইলেও জগতে ‘ভণিতা’ কোনো প্রকার ভণিতা ছাড়াই চালু আছে—লেখক বোধ করি এইটাই কইতে চাইতেছিলেন। যদিও আমি এই মতরে চূড়ান্ত কমু না, তবু আমার মনে হইছে আর-কি! সবাই ‘হিস্যা’ চায়, মানে প্রকৃত দাম চড়া না পর্যন্ত ঘুরায় এবং ঘুরে। বর্ণনাগুলা এমন, যেন মনে হয় প্রত্যেকটা বাক্যের জন্য একদম সঙ্গত শব্দই নির্বাচন করা হইছে। এই গল্পের একখান ডায়লগরে মনে হইছে পুরা গল্পের কঙ্কাল কিংবা কইতে পারি মানবজীবনের জন্য অকাইট্য সইত্য। সেইটা হইলো ‘ওয়ান্স আ প্রডিউসার, অলওয়েজ আ প্রডিউসার’। মানে হইল একজন মেমরি ম্যানেজার পরিস্থিতি চাইলেই ‘জাতিস্মর’ কিংবা ‘ভোলানাথ’ হইয়া যাইতে পারে, এই বৈশিষ্ট্য যে খালি ব্যক্তি-বিশেষের অসীম নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতার চিহ্ন তাই না, এইটা রীতিমতো ঐশ্বরিক। ফলে এইটা অনেকটা ‘ম্যান প্রপোজেজ গড ডিসপোজেজ’-এর উচ্চাঙ্গে চইলা গেছে। গল্পডা দারুণ, বিশেষ কইরা গল্প বলার তরিকাডা।


একটা নিদারুণ সময়ের ভিতর দিয়া যখন মানুষ যায়, যখন নিয়তির একমাত্র দাস হয় মৃত্যু, তখন রূপক-প্রতীক ছাড়া উপায় কী?


নিরপরাধ ঘুম বইডায় গল্পকারের প্রায় সব গল্পই উৎকৃষ্ট। তয়, ‘নীল হিজাব’ আর ‘একটি রোহিঙ্গা উপকথা’ গল্প দুইটার বিষয়-মাহাত্ম্যের কাছে বয়ান-তরিকা মাইর খাইয়া গেছে। গল্পকার খালি কইয়া গেছেন কোনো প্রকার ‘ভণিতা’ ছাড়াই। মানে তাই মনে হইছে। ‘নিরপরাধ ঘুম’—এই নামগল্পটারে একটা ঘোর-গল্প মনে হইছে। রাশেদের থাকা না থাকার ভিতর কী এক অদ্ভুত অনুভূতি স্নায়ুর উপর দিয়া চাপ দিয়া গেছে। ঘুমটা নিরপরাধ নাকি ঘুমানো মানুষটা? ‘ক্রসফায়ার’-এর গল্পগুলা মর্মান্তিক হয়! রাশেদ-শাহেদগো নিয়া গল্প লেখনের ঝুঁকি একটা ‘নিরপরাধ ঘুম’-এর জন্য কইমা গেছে। একটা নিদারুণ সময়ের ভিতর দিয়া যখন মানুষ যায়, যখন নিয়তির একমাত্র দাস হয় মৃত্যু, তখন রূপক-প্রতীক ছাড়া উপায় কী? ‘নিরপরাধ ঘুম’ নানান দিক থিকা গল্পের নাম-ভূমিকা নিতে পারছে। গল্পকার যেই সময়ে বাস করতেছেন, যেইখানে নিজেরে বিভিন্ন ঘটনা-অণুঘটনার চক্রের মধ্যে দিয়া যাতায়াত করাইতেছেন, সেই বাস্তবতা অনুযায়ী বইটার নামকরণ একবারে খাঁটি হইছে।

সমসাময়িক রাজনৈতিক অস্থির পরিস্থিতি যদি না থাকত তাইলে বইটার নাম হইত ‘সুপারহিরো পরিবারে একটা খুব অর্ডিনারি পাতাঝরা দিন’। ইয়েস, এবং তা হইতোই, মানে হইতেই হইতো। কেন হইতো তা এই গল্পের পাঠকমাত্রেই বুঝবার পারবেন। কিন্তু ব্যক্তি-সংকট থিকা বা পারিবারিক সংকট থিকা সামাজিক কিংবা রাষ্ট্র-সংকট বেশি প্রাধান্য পাইব, এইটাই নিয়ম। ‘সুপারহিরো…’ গল্পটা এই বইয়ের সব থিকা যত্নে লেখা গল্প। এই গল্পে একটা দীর্ঘদিনের পরিচর্যার আভাস আছে। ব্যক্তি-সংকট, মানে অটিজম এবং গৃহপরিচারিকার ভূমিকা নাগরিক জীবনে একটা জটিল বাস্তবতার স্মারক বইলাই মনে হয়। সাদের লগে টুনির যেই সম্পর্ক তা ব্যাখ্যা করনের কেউ নাই, বা থাকলেও তা একান্ত নাগরিক সংকট। এর লগে ডাক্তার যতটা যুক্ত ততটা এমনকি স্কুলও না । রাষ্ট্রীয়ভাবে বৃহত্তর সংকট মনে না করা হইলেও অটিজমের প্রকোপ নেহায়েত কম না। লেখক ক্যাম্নে যে এই গল্প লিখা ফালাইলেন আমি ভাইবাই পাই না। স্কুল থিকা বাইর কইরা দেওন, এবং গৃহপরিচারিকার ঘর থিকা বাইর হইয়া যাওনের গল্পটারে কী অদ্ভুতভাবে মিলায়া দিলেন লেখক! এইটা কেবল তারাই পারেন যাগো দুই চক্ষুর লগে একটা দিব্যচক্ষু থাইকা থাকে, যেই দিব্যচক্ষু খালি অভ্যাসের কাতুকুতু টাইপের দর্শনই না, বরং চামড়ার অন্তরালের ছোট বড় নানা কিসিমের ক্ষতও দেখবার পারে! সাদ নামক অটিস্টিক পোলার কাছে টুনির ‘টুট-ফেরি’ হওনের সরল পাঠের ভিতর যে গূঢ-গভীর গন্তব্যের সম্ভাবনা রইয়া গেছে তা গল্পকার একটা সাবধানী পরিণতিওয়ালা পরিকল্পনার মাপে সাজায়া কইয়া দিলেন। মিনু আর কথকের যেই বেদনা তা একই লগে প্রাত্যহিক এবং মর্মান্তিক। প্রাত্যহিক এই অর্থে যে সাদের যেই প্রব্লেম সেইটা অনেকটা ডায়বেটিসের মতো চিরঞ্জীব। কন্ট্রোলে রাখতে হইলে প্রচুর সময় দেওন লাগে রোগেরে, যেই সময়ডা মা হইয়াও মিনু দেয় নাই, দিছে গিয়া টুনি নামের গৃহপরিচারিকাটা; কিঞ্চিৎ মিনুর লগে টুনির আত্মীয়তার গন্ধও বুঝি আছিল। মা না হওনে টুনি-সাদের যা হইছিল তা নিয়া সামাজিক জটিলতার চাইতে মুখ্য হইয়া উঠছে বহুমুখী মনস্তাপ। মিনু যেই কারণে টুনির ম্যালা ম্যালা অপারগতারে প্রশ্রয় দেয় নাই সেই কারণই একসময় তার খেদের মহাউৎস হইয়া দাঁড়াইল। মিনু কি ভাবছিল কোনোদিন এমন বিশ্বাসের বৃক্ষ থিকা এমন বিষফল বাইরাইবো! কিন্তু বাইরোইছে তাই। কিত্থিকা কী হইতে পারে, কত বিন্দু থিকা বড় বড় সিন্ধু সাইজের ভোগান্তি যে তৈয়ার হইবার পারে, এবং সেই সিন্ধু-ভোগান্তির প্রত্যেকটা বিচি দিয়া যে তা জীবনের পাড় অবধি নিয়া ঠেকায়া দিবার পারে, তার নকশাটাই গল্পকার পরম যত্ন নিয়া আঁইকা দিলেন।


অবশ্য আড়ালের তলেই সাহিত্য তার আসলি রূপ নিয়া মহিমা প্রকাশ কইরা থাকে।


মোটামুটি সবগুলা গল্প নিয়াই কইলাম। একটা বাকি আছে, সেইটা হইল মাহাদি-শিমুলের গল্প ‘হাবা যুবকের হাসি’। বোকা ও ভালা মানুষের কপালে কী হয় তারই একটা পথচিহ্ন এই গল্পে আছে। কিন্তু ব্যাপারটা যত সরল মনে হইতেছে, বর্ণনার প্রকৌশলে গল্পটারে অত সরল লাগে নাই। বিষয় সিম্পল। সমকামিতা নিয়া শঠতা। শঠ যে, সে যে-কোনো বিষয় নিয়াই শঠতা করবার পারে। বলা হয়, খলের ছলের অভাব হয় না। এই ‘হাবা…’ গল্পডায় কবিতার দুই তরিকার ফলোয়ার পাই আমরা। একই লগে পাই বর্ণনার ভিতর দিয়া কাব্যিক পরিচর্যা। গল্পকার র‌্যাঁবোর মাটিকাদা আর ক্ষতসর্বস্ব জীবনের বিপরীতে পূর্ণেন্দু পত্রীর পুতুপুতু জীবনরে দাঁড় করাইয়া দিতে পারছেন। লগে স্নিগ্ধা এন্ড গংরে নিয়া পুতুপুতু খেলা জুইড়া দিছেন। অথচ যার পুরাটাই বিপরীত হইয়া ধরা পড়ছে ফেসবুকের একটা গ্রুপছবি দেখনের সূত্রে। এই গল্পটার বর্ণনায় আসছে নানা কিসিমের কাব্যিকতা। এক মৌ-ফুল দুই ভিন্ন জগতের ভিন্ন পরিস্থিতিরে চিহ্নিত করছে। একদিকে র‌্যাঁবো এবং গল্পকথকের অনিদ্রা থেইকা মৌ-ফুল টুপটাপ কইরা ঝরত, অন্যদিকে মাহাদির গভীর ঘুমের লগে লগে বাইরে মৌ-ফুল ফুটত। এক মৌ-ফুল ফুটত এবং ঝরত দুই ভিন্ন মানুষের বাস্তবতায়। এই মৌ-ফুল এক রহস্য বটে। এটা আদৌ ফুল নাকি কোনো বিশেষ মাইয়া, যার পাণিপ্রার্থী দুজনেই; বা কোনো মোক্ষম আগ্রহের বস্তু কিনা তা কিন্তু পুরোদস্তুর রহস্যই রইয়া গেল। অবশ্য আড়ালের তলেই সাহিত্য তার আসলি রূপ নিয়া মহিমা প্রকাশ কইরা থাকে। তয়, ব্যাপারডা বেশ ইনটারেস্টিং কিন্তু। পাঠক চাইলে আমার এই পাঠ নিয়া বহুদূর আগাইতে পারেন। না চাইলে মন দিবার পারেন এই দুই চরিত্রের মনস্তত্ত্বের দিকে।

তো, বইটা পড়তে গিয়া দেখলাম আমি অত্যন্ত অলস পাঠক হওয়া সত্ত্বেও প্রায় এক নিশ্বাসেই পইড়া ফেলতে পারছি। আমার মতো আইলসারেও বইয়ের দিকে ঝুঁকাইতে পারা এবং তা নিয়া দুই চাইর লাইন লিখানোর জন্য দৈবপথে প্ররোচিত করার ক্ষমতা কেবল নিরপরাধ ঘুম বইয়ের লেখকেরই হইছে দেখলাম। সেইজন্য লেখকের জন্য শুভকামনা।


নিরপরাধ ঘুম ॥ সুমন রহমান ● প্রথমা প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সেঁজুতি জাহান

জন্ম ১১ জুলাই ১৯৮৬; বোয়ালমারী, ফরিদপুর। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :
জিনটিকা [কবিতা; আদর্শ, ২০১৬]

ই-মেইল : senjuti85@gmail.com

Latest posts by সেঁজুতি জাহান (see all)