হোম বই নিয়ে গোলাপের নাম

গোলাপের নাম

গোলাপের নাম
0
Latest posts by খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার (see all)

উমবের্তো একোর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ইল নোমে দেল্লা রোসা’ বাতিঘর থেকে বাংলায় ‘গোলাপের নাম’ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। অনুবাদ করেছেন জি এইচ হাবীব। জি এইচ হাবীবের অনুবাদের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের, তাঁর অনুবাদ ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ (মূল গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেযের ‘সিয়েন আনিওস দে সোলেদাদ’) পড়ে বহু পাঠক মুগ্ধ হয়েছেন।

‘গোলাপের নাম’ হাতে নিয়েই বুঝেছি, এ বই দ্রুত শেষ করার উপায় নেই। অনুবাদক শুরুতেই বলে রেখেছেন, এক বইয়ের দামে এখানে দেড়খানা বই পাওয়া যাচ্ছে (আমার হিসেবে দুইখানা)। পৃষ্ঠাসংখ্যা প্রায় ছয়শ। ‘গোলাপের নাম’ যত না উপন্যাস, তার চেয়ে বেশি নন্দন-চিন্তা, প্রতীক-চিন্তা, ধর্মতত্ত্ব-চিন্তা, ইতিহাসের ভাঙা টুকরো দিয়ে সাজানো মধ্যযুগের বিস্তারিত কল্পনা। এ বইয়ের দুই-তিন পৃষ্ঠা পড়লেই মহাকবি মাইকেল মনের ভেতর বলে ওঠেন ‘তিষ্ঠ ক্ষণকাল!’ তখন পড়া বন্ধ করে চিন্তা করতে ইচ্ছে করে। আরও দুই-চার পাতা এগোলে অনুচ্ছেদ শেষ, সেখানে অনুবাদক খুলে বসেছেন টিকা-টিপ্পনির ঝাঁপি। সেই টিপ্পনির তোড়ে নিজের অজ্ঞতা আর আংশিক-জ্ঞানকে ধুয়ে নিয়ে তার পর-ই কেবল সামনে যাওয়া যায়। তবু সে বইয়ের এমন গুণ, সিরিয়াস পাঠক ‘গোলাপের নাম’ শেষ না করে উঠতে পারবেন না।


১৩২৭ সালে ইতালির এক কাল্পনিক মঠে ঘটতে থাকা কিছু খুন এবং তার অনুসন্ধান এই উপন্যাসের প্রেক্ষিত।


উমবের্তো একো (১৯৩২-২০১৬) ইতালির শুধু নন, পুরো বিশ্বের চিন্তাশীল পাঠকদের কাছে এক পরিচিত নাম। তিনি একাধারে লেখক, অধ্যাপক, দার্শনিক, সেমিওটিশিয়ান (যিনি প্রতীক বা চিহ্নের বিজ্ঞান নিয়ে মাথা ঘামান)। মধ্যযুগের দর্শন এবং নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে বিপুল জ্ঞানের অধিকারী এই লেখক ১৯৮০ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস লেখেন। সেই উপন্যাসের-ই নাম ‘ইল নোমে দেল্লা রোসা।’ ১৩২৭ সালে ইতালির এক কাল্পনিক মঠে ঘটতে থাকা কিছু খুন এবং তার অনুসন্ধান এই উপন্যাসের প্রেক্ষিত। প্রকাশের পর-পরই উপন্যাসটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গত চল্লিশ বছরে এই বিশালকায় উপন্যাসটির পাঁচ কোটি কপি বিক্রি হয়েছে, এর থেকে পাঠক উমবের্তো একোর লেখার ক্ষমতার খানিকটা ধারণা পাবেন।

তবে লেখক হিসেবে একোর মাহাত্ম্য পাঠক টের পাবেন অনুবাদটি মন দিয়ে পড়লে। ‘গোলাপের নাম’ নামেই রহস্যোপন্যাস। বাস্কারভিলের উইলিয়াম নামের সূত্রে যতই কোনান ডয়েলের শার্লক হোমসের কথা মনে করিয়ে দিন, তাঁর সহকারী আদসোর নামের এবং স্বভাবের সঙ্গে ওয়াটসনের যতই মিল থাক, শেষ পর্যন্ত তাঁরা আমাদের চেনা গোয়েন্দাদের মতো নন। তাঁরা সন্ন্যাসী, পরিব্রাজক। ঘটনাচক্রে তাঁদের জড়িয়ে পড়তে হয় একটি বেনেডিক্টীয় মঠে ঘটে চলা খুনের তদন্তে। তীক্ষ্ণধী উইলিয়াম সে তদন্তে সফল হন ঠিক-ই, কিন্তু সেটা এই উপন্যাসের অজুহাত, তার উদ্দেশ্য নয়। খুনের তদন্তের ‘চিনির প্রলেপ’ লাগিয়ে পাঠকের কৌতূহলকে জাগিয়ে রেখে উমবের্তো একো এবং তাঁর অনুবাদকেরা পাঠককে পরিবেশন করতে থাকেন মধ্যযুগের ইতিহাস, লাতিন ভাষার মণি-মাণিক্য, খ্রিস্ট-ধর্মের অন্তর্দ্বন্দ্ব, চিহ্নবিদ্যার বিজ্ঞান, বিশ্বাস-যুক্তির লড়াই, মৌলবাদের মৌলিক কাঠামো, এবং বিশুদ্ধ হাস্যরস।


প্রাঞ্জলতার তুলনায় মূল বক্তব্যের শতভাগ বাংলায় নিয়ে আসাকেই অনুবাদক গুরুত্ব দিয়েছেন, এবং সেটা খুব কঠিন কাজ


এ বইয়ে রহস্য-রোমাঞ্চ আছে, কিন্তু সেটার আস্বাদ করতে গেলে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রম দরকার। এ বই বিনোদনের বই নয়, তার জন্যে অনেক কম আয়াসে অন্যত্র ভালো ব্যবস্থা আছে। আমার মনে হয়, এ বই অগণিত পাঠকের প্রিয় হবে না, তবে কিছু পাঁড়-পাঠকের অত্যন্ত প্রিয় হবে। তার চেয়েও বেশি প্রিয় হবে লেখক-অনুবাদক-গবেষকদের কাছে। তাঁরা মুগ্ধ হবেন জি এইচ হাবীবের অনুবাদের সততায় (প্রাঞ্জলতার তুলনায় মূল বক্তব্যের শতভাগ বাংলায় নিয়ে আসাকেই অনুবাদক গুরুত্ব দিয়েছেন, এবং সেটা খুব কঠিন কাজ)। তাঁরা বিস্মিত হবেন অনুবাদকের পরিশ্রম দেখে (অনুবাদের টিকা নিয়ে এই পরিমাণ গবেষণা দেখে অভ্যস্ত নই আমরা কেউ, আর টিকাগুলো না থাকলে আমার মতো পাঠকেরা এই বইয়ের অর্ধেক রস থেকে বঞ্চিত হতোই)। লাতিন ভাষা, মধ্যযুগের গির্জা, খ্রিস্ট-ধর্মের আচার সম্পর্কে অনেক কিছু তাঁরা জানবেন, অনেক অস্পষ্টতা কেটে যাবে। যাঁরা উমবের্তো একোর শক্তি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানেন না, তাঁরা একোকে জানার সুযোগ পাবেন—ধ্বনিতত্ত্বে তাঁর অসামান্য দখল দেখে সাহিত্যের জগতের এই অমর প্রতিধ্বনিটির প্রতি সম্ভ্রম জাগবে। সোমনাথ ঘোষের প্রচ্ছদ আর নীল প্যাকারের অলংকরণ নেহাত বাড়তি পাওনা, সেও অসামান্য।

শোনা যায়, উমবের্তো একোর প্রকাশক তাঁকে বলেছিলেন, পাঠকপ্রিয় করতে গেলে ‘ইল নোমে দেল্লা রোসা’ সংক্ষিপ্ত করতে হবে। একো এক কথায় সেই পরামর্শ নাকচ করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, মধ্যযুগের যে সময় এবং বেনেডিক্টীয় মঠের যে পরিবেশ তিনি উপন্যাসে উপস্থাপন করতে চান, তার জন্যে উপন্যাসের এই ধীর গতিই মানানসই। বই পড়ার সময় পাঠক একোর এই দাবির সত্যতা টের পাবেন।


সেমিওটিশিয়ান বা চিহ্নবিদ্যার বিশারদ হিসেবে আজীবনের সঞ্চিত জ্ঞানকে একো এই বইয়ে ব্যবহার করেছেন।


সেমিওটিশিয়ান বা চিহ্নবিদ্যার বিশারদ হিসেবে আজীবনের সঞ্চিত জ্ঞানকে একো এই বইয়ে ব্যবহার করেছেন। সে কারণেই কোথাও মঠের একটি দরজার বিবরণ আছে পাঁচ-ছয় পৃষ্ঠা জুড়ে, কোথাও আছে মঠের বিভিন্ন অংশে সঞ্চিত রত্নরাজি, দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ, ধর্মীয় স্মৃতিচিহ্নের দীর্ঘ, বিস্তারিত বর্ণনা। ‘অ্যাপসলদের দারিদ্র’ নিয়েও দীর্ঘ ইতিহাস, তত্ত্ব, তর্কাতর্কি পড়তে হবে। কিন্তু পাঠশেষে পাঠক উপলব্ধি করবেন, এর কোনটিই অপ্রয়োজনীয় নয়। যে চিহ্নগুলোর বিশ্লেষণ করে বাস্কারভিলের উইলিয়াম মঠের হত্যাকাণ্ডের রহস্য সমাধান করেছেন, পাঠকের পক্ষে সেই চিহ্নগুলো বোঝার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে একোর দীর্ঘায়তন বর্ণনায়।

পুরো উপন্যাসেই মঠকে ঘিরে রাখা কুয়াশার মতো কিছু অস্পষ্টতা আছে। এই অস্পষ্টতা একো ইচ্ছে করেই রেখেছেন। তিনি চেয়েছিলেন, প্রত্যেক পাঠক কিছু জিনিসের অর্থ করে নিক নিজের মতো করে, কিছু জিনিস তার না-বোঝা থেকে যাক। আমার মনে হয়, অধিকাংশ পাঠকের বেলায় লেখকের এই চাওয়া পূরণ হয়েছে এবং হবে।

যে দেশে আট-ফর্মার বেশি বই প্রকাশ করতে গেলে লোকে হা-হা করে তেড়ে আসে, সে দেশে ছয়শ-পৃষ্ঠার এই বিশাল গ্রন্থ প্রকাশের সাহসের জন্যেই অনুবাদক জি এইচ হাবীব এবং প্রকাশক দীপঙ্কর দাশকে কৃতজ্ঞতা জানাই। ‘গোলাপের নাম’ সিরিয়াস পাঠকের মনোযোগ পাক। বহুল জনপ্রিয় না হোক, অন্তত ঋদ্ধ সব পাঠকের প্রিয় হোক।

অনুবাদক জি এইচ হাবীব ভবিষ্যতে এ রকম আরও কিছু অনুবাদ আমাদের উপহার দেবেন, এই আশা থাকল। এবারে ‘গোলাপের নাম’ বইমেলায় এসেছিল একেবারে শেষ দিকে, তাই বহু আগ্রহী পাঠক বইটি সংগ্রহ করতে পারেন নি। তাঁরা বাতিঘরের ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট শাখার কোনটি থেকে বা অনলাইন থেকে বইটি সংগ্রহ করে নিতে পারেন। আর দেরিতে হলেও যে বইমেলায় এসেছিল, তাও ভালো। কে বলে আমাদের বইমেলা নিষ্ফল? বাঙালির চিন্তাচর্চা অব্যাহত আছে, থাকবে। জনপ্রিয় ধারার হুজুগ সাময়িক, ধ্রুপদ টিকে থাকে তার প্রকৃত মূল্যের জোরে। ‘গোলাপের নাম’ সব অর্থেই একটি ধ্রুপদ উপন্যাস।


গোলাপের নাম । উমবের্তো একো । অনুবাদ: জি এইচ হাবিব । বাতিঘর । উপন্যাস । ৫৯৯ পৃষ্ঠা । ১৩৪৭ টাকা