হোম বই নিয়ে ক্রুশকাঠে জেগে থাকা যিশুর বিষয়ে

ক্রুশকাঠে জেগে থাকা যিশুর বিষয়ে

ক্রুশকাঠে জেগে থাকা যিশুর বিষয়ে
379
0

কবিতা কী এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া বেশ কঠিন। দেশ-কাল-পাত্র ভেদে কবিতার নানা কিছিমের সংজ্ঞা হাজির হয়েছে, তাও যেন ঠিক শেষ কথাটা বলে দেয়া যাচ্ছে না, আরও একটা কিছু বাকি রয়ে যাচ্ছে। আর সে কারণেই এখনো অজস্র কবি হয়তো চেষ্টা করে যাচ্ছেন কবিতা লিখবার। তবে কবিতা তো শেষ পর্যন্ত ভাষিক শিল্প, ভাষাই কবিতার আশ্রয়, উপাদান। ফলে ভাষা-নৈপুণ্যের যতরকম কৌশল আছে তার সবই কবিকে আয়ত্ত করতে হয়। কিন্তু কবি কি ভাষা নির্মাণ করেন? নাকি তার যাপনের ভাষাকেই কবিতার নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তুলবার কারিশমা দেখান? সুমন সাজ্জাদের ক্রুশকাঠে জেগে থাকা যিশু কবিতাগ্রন্থটি নিয়ে কিছু লিখবার সময় এ প্রশ্নটাই বারবার ঘুরে ফিরে আসছে মাথায়। উত্তর হয়তো অন্যত্র খোঁজা যাবে, আপাতত বইয়ের আলোচনায় থাকি। কোনো কাব্যের পাঠ শুরু হয় তার শিরোনাম থেকেই। ক্রুশকাঠে জেগে থাকা যিশু নামটার মধ্যে যে নির্জন যন্ত্রণার ইঙ্গিত লুক্কায়িত আছে, তা দেখে সঙ্গত কারণেই মনে হতে পারে তিরিশি আধুনিকতার উত্তরাধিকারই বহন করছেন কবি। তিরিশি কবিতার হাত ধরে বাংলা কবিতায় ফরাসি প্রতীকবাদের যে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ পড়ে গেছে তারও দেখা মেলে এই বইয়ের কবিতাগুলোতে। তিরিশি কবিতার সাথে সম্বন্ধ পাতানোর জন্য নয় বরং মোটাদাগে কবিতাগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের জন্যই এই প্রসঙ্গের অবতারণা। লিরিকধর্মী কবিতাগুলো পড়তে পড়তেই মনে হয় কবি এক রোমান্টিক নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত, তবে এই নস্টালজিয়া তাকে বিমর্ষতায় আচ্ছন্ন করে না। বরং কবিতার সুরাপাত্রে ভরে পান করতে করতে একে সেলিব্রেট করতে চান তিনি।

এক নদী জল বর্ষা আসার আগে
বর্ষা নেমেছে, যমুনা যে থইথই
সব বসন্তে তোমাকে সুদূর লাগে,
এই বসন্ত?—হারাবার গল্পই!

হারাবার কথা থাকলেও যেন বেদনার সুর নেই এখানে। পরবর্তীতে ‘যাত্রা’ কবিতায় যখন নির্জন রাত্রিতে কোনো এক অজানা যাত্রার কথা পাই সেখানেও আমরা ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার নির্জন উপলব্ধিকেই খুঁজে পাই। যেই ব্যক্তি আত্ম-অনুসন্ধানী, নিজের মাঝে নিজেকে খুঁজে পাবার চেষ্টায় রত। কবিতার শুরুতে যেন প্রুফ্রকের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই আমরা—

রাত্রি যখন জেগে ওঠে সন্ধ্যায়,
ভিড়গুলো ছোটে নির্জনতার বাড়ি,
পাখিদের মন নিভুনিভু তন্দ্রায়,
খেয়াঘাটে থামে ঢেউগুলো সারিসারি।

সন্ধ্যার আকাশে অন্ধকার ঘন হয়ে আসলে যখন মানুষের কোলাহলগুলো ঘরে ফিরতে থাকে, আধো-নির্জন পথ ধরে অজানা গন্তব্যের পথে সেই ভ্রমণের সাথে সাথে আমাদের কানে ভেসে আসে সেই কণ্ঠস্বর, যেই কণ্ঠস্বর একসময় গোটা ইউরোপকে মনে করিয়ে দিয়েছিল এই সেই আধুনিক মানস, আমাদের সময়ের নায়ক। কিন্তু এই যাত্রায় আমরা সেইরূপ কোনো কণ্ঠস্বর শুনতে পাই না। প্রুফ্রকের থেকে এখানেই বোধহয় কবিতাটির প্রথম বিচ্ছেদ ঘটে, বুঝা যায় কবি কোনো নায়ক হয়ে উঠতে চান না। তবে এলিয়টের সাথে যেন কবির একটা সম্পর্ক আমরা আবিষ্কার করতে পারি।

সামগ্রিক বিচারে কবিতাগুলো আমাদের ব্যক্তি-অভিজ্ঞতারই কথা বলে। ব্যক্তি থেকে সমষ্টির ভাষায় কবিতাকে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেন নি তিনি। এমনকি যখন আমি থেকে আমরায় চলে যান কবি তখনো সেখানে ব্যক্তিমানসই কেন্দ্র হয়ে থাকে। কবিতাগুলোর ভাষায়, বিষয়ে, অনুষঙ্গে সামষ্টিক যাপনের অভিজ্ঞতা আমরা পাই না। পাই জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এক নির্জন তাপসের ভাববিলাশ। এ হয়তো কবির প্রবল আধুনিক হয়ে উঠবার বাসনা। এক্ষেত্রে কবি যথেষ্টই সফল হয়েছেন হয়তো। কিন্তু এই আধুনিক পরিস্থিতি কি সত্যিই আমাদের সমাজে বিরাজ করে? যেইখানে রাষ্ট্রের কাছে আমরা কেবলই অপাঙ্‌ক্তেয়, খরচযোগ্য জীব, ক্রমাগত সামাজিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে হয় আমাদের, সেইখানে আধুনিকতার যা প্রধান শর্ত—ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ, তা কি সম্ভব হয়ে উঠেছে? ফলে আধুনিক হয়ে উঠবার বাসনা এখনো কিছুটা আরোপিতই মনে হয়। তবে পথটা কবির নিজের, এবং একমাত্র তিনি নিজেই সেটা বেছে নিতে পারেন। ক্রুশকাঠে জেগে থাকা যিশু যদি কবিকে এই পথেরই সন্ধান দেয় তো সেখানেই তাঁর কবিতার বিস্তার ঘটুক। অন্য কারও পথ বাতলে দেয়া অনধিকার চর্চা হবে।

ডান পাশে অন্ধকার
বাম পাশে আলো
পথ জুড়ে ছেয়ে আছে বুদ্ধের হাসি।
মায়াবী। কালো।

কারুনৈপুণ্যের জোরে কবিতাগুলো বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে বলাই বাহুল্য। পয়ার ছন্দে কবির বিশেষ আকর্ষণ আছে বোঝা যায়। ছন্দ ও ইমেজের ব্যবহারে কিছু নিরীক্ষাও চোখে পড়ে। সবমিলিয়ে কবিতাগুলোর মধ্যে যে একটা জমজমাট ব্যাপার আছে, সেটাই শেষপর্যন্ত কবিতাগুলোকে উৎরে দেয়।


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০
তানভীর আকন্দ

তানভীর আকন্দ

জন্ম ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৪; গফরগাঁও, ময়মনসিংহ।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত।

ই-মেইল : tanvirakanda09@gmail.com
তানভীর আকন্দ