হোম বই নিয়ে ক্রমশ জলের দিকে : এক আনন্দ-বেদনার আখ্যান

ক্রমশ জলের দিকে : এক আনন্দ-বেদনার আখ্যান

ক্রমশ জলের দিকে : এক আনন্দ-বেদনার আখ্যান
272
0

নাজমুল আহসানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ক্রমশ জলের দিকে, বেরিয়েছে ‘জেব্রাক্রসিং’ প্রকাশনা থেকে। পাণ্ডুলিপি পড়ে প্রথম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তরুণ কবি অনুপম মণ্ডল।

আসুন তবে, এক তরুণের চোখে পড়া যাক আরেক তরুণের কবিতা…


একটি সুর যেখানে থেমে গেল, অথচ পুরোটাই তার এখনও নিঃশেষিত হয় নি—যেন সে অখণ্ড নীরবতার উপর ঝরে পড়ছে অধোগামী পাতারা। আর একটু একটু করে ঢেকে দিচ্ছে সে সুকঠিন নিস্তব্ধতা। বুঝি গোধূলির শেষ আলোটুকু সেই অপরিমেয় নিস্তব্ধতার উপর বাড়ি খেয়ে একটু একটু করে আভা তৈরি করে চলেছে। এই যে আভার তৈরি হয়ে ওঠা, বা, একটা সুরের ভিত গড়ে ওঠা—এই জার্নিটাই কবিতা। এ যেন এক আঁধার থেকে কোনো এক আধেয়র দিকে যাত্রা। ব্যাখ্যার সমস্ত কৌশল এখানে অদৃশ্য। জীবনের চূড়ান্ত অভিজ্ঞতা এইখানে তার রূপ-সংঘাত নিয়ে এক লীলার মাধুরী তৈরি করে চলেছে যেন।

অবারিত সবুজের মাতাল সৌরভে সেই থেকে
লেগে থাকে বিষাদ এমন
কে আমি—কবে থেকে জানতাম; ভুলে গেছি
জেনে গেছি সেই থেকে স্মৃতিরা এমন
ব্যথাতুর বেদনার আর্তি

[গোলাপের মতো ফুলে উঠি]


ভাষা তার কাছে মিলনের সেতু। বিচ্ছেদের প্রাচীর নয়।


কবি নাজমুল আহসানের সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ ক্রমশ জলের দিকে পড়তে গিয়ে আমার এই অনুভূতি হচ্ছিল, যে, সৃষ্টির অন্তরীক্ষে যে অপার রহস্য, কবি তাকে ধরার একটা সোজাসাপটা রাস্তা খুঁজে পেয়েছেন। শব্দ তার কাছে কবিতা সৃষ্টির উপাদান হিশেবেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। তিনি তাকে ঠ্যাক হিশেবে ব্যবহার করতে চান নি। ভাষা তার কাছে মিলনের সেতু। বিচ্ছেদের প্রাচীর নয়। যা কিছু দৃষ্টিভেদ্য, আলো তার প্রসারিত বাহুদ্বারা যতখানি স্পর্শ করতে পারে, কবি তাকেই কবিতা টেনে এনেছেন। প্রকাশ করেছেন এক সহজবোধ্য ভাষায়।

তোমার স্পর্শে আগুনেরা কথা বলে
কুয়াশা ফুলের গন্ধে মাতিয়ে রাখি অঙন
এত পঙ্কিলতা আমি কোথায় লুকোই
কোন আঁধারে ঢেকে রাখি তোমার
আলোড়িত গন্তব্য এমন

[কী সব আগুন জীবন]

এই গন্তব্যের রহস্য কবি শেষপর্যন্ত উন্মোচন করেন নাই। এই ‘অফুরান বেদনার আর্তি’ তিনি ‘জাগতিক বিস্ময় থেকে’ খোলসের মতোই লুকিয়ে রেখেছেন।

রাতের ঊরুসন্ধি থেকে রতিচিহ্ন মুছে গেলে
পাথরের চোখ থেকে ধেয়ে আসে যাতনা
আমি তখন হেঁশেলের দুঃখ নিয়ে উড়ে যাই
মাছরাঙা পাখি ক্রমশ জলের বিপরীতে…

[ক্রমশ জলের দিকে]

এই বেদনাবোধ, পাঠককে বলে ফেলার পরও নিঃশেষিত হয়ে যায় না। গুমরে গুমরে ওঠে। ‘রাত নিভে গেলে জ্বলে ওঠে’ মায়াবী অন্ধকারে। হিম হিম শব্দের কোলাহল তুলে।

সীমাহীন নৈরাশ্যের তীরে নির্বাসিত যে জীবন। সেই জীবনের এক অপরিমেয় অপচয়ের দিকটাকেই কবি তুলে ধরতে চেয়েছেন। বলতে চেয়েছেন এক দোদুল্যমান অভিজ্ঞতার কথা। কল্পনা যেখানে অশ্রুভরা বেদনার দিকে জেগে উঠতে চেয়েছে বারবার।

কোথাও কবিতা নেই। নিজের অস্ত্রোপচার নিজে করি। হৃদপিণ্ডে
দেই আটটি সেলাই। কোথাও পাই না এক টুকরো কবিতা।
এত আবেগ—এই ঢেউ ভাঙার হাট—আজন্ম ফেনিল উৎসব—

[সাবওয়ে ইস্টিশন]

অথবা

মল্লিকা
খেয়াল রেখো—কোনোদিন মানুষ হয়ে না যাই

[আমরা]


এই জন্মের ইঙ্গিত গভীর ও বিরাট—অথচ অতি সূক্ষ্ম।


এই বেদনা, এই নৈরাশ্যের সুর আরো গাঢ় হয়ে উঠেছে সময়ের পরিক্রমায়। কবির কল্পনা, কল্পনার ভেতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার একটা চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখতে পাই ‘ফুলদের আগুনপ্রীতি’ কবিতায়। এটি বিনয় মজুমদারের ‘মানুষের মাংস রন্ধনকালীন ঘ্রাণ’ ভালোবাসার মতো নয়—

একটি ফুল আমার অদৃষ্টের সাথে লেগে থাকে দিনমান
আমি তো বারুদের গন্ধই বেশি ভালোবাসতাম

কবির কল্পনার আভা এইখানে সমাজের কংকালসার রূপটাকেই দেখাতে চেয়েছে যেন। ‘বিষাদের ঘর’ কেটে জ্বালাতে চেয়েছে প্রাণের প্রদীপ—

যেন সে বিষাদের ঘর
বেপথু বাতাসে ফুলে ওঠে

[বিষাদের ঘর]

“সৃষ্টির ভিতর মাঝে মাঝে এমন শব্দ পাওয়া যায়, এমন বর্ণ দেখা যায়, এমন আঘ্রাণ পাওয়া যায়, এমন মানুষের বা এমন অমানবীয় সংঘাত লাভ করা যায়—কিংবা প্রভূত বেদনার সঙ্গে পরিচয় হয়, যে মনে হয় এই সমস্ত জিনিসই অনেকদিন থেকে প্রতিফলিত হয়ে কোথায় যেন ছিল; এবং ভঙ্গুর হয়ে নয়, সংহত হয়ে, আরো অনেক দিন পর্যন্ত, হয়তো মানুষের সভ্যতার শেষ জাফরান রৌদ্রালোক পর্যন্ত, কোথাও যেন রয়ে যাবে; এইসবের অপরূপ উদ্‌গীরণের ভিতর এসে হৃদয়ের অনুভূতির জন্ম হয়, নীহারিকা যেমন নক্ষত্রের আকার ধারণ করতে থাকে তেমনি বস্তুসঙ্গতির প্রসব হতে থাকে যেন হৃদয়ের ভিতরে; এবং সেই প্রতিফলিত অনুচ্চারিত দেশ ধীরে ধীরে উচ্চারণ করে ওঠে যেন, সুরের জন্ম হয়; এই বস্তু ও সুরের পরিণয় শুধু নয়, কোনো কোনো মানুষের কল্পনা-মনীষার ভিতর তাদের একাত্মতা ঘটে—কাব্য জন্ম লাভ করে’—[কবিতার কথা]। বুঝি, এই জন্মের ইঙ্গিত গভীর ও বিরাট—অথচ অতি সূক্ষ্ম। যা কিনা ‘শব্দ এক আকস্মিক মৃত্যুর নাম’—স্বীকার করে নিয়েই একটা মীমাংসায় আসতে চায়।

কবুতর—বিস্ময় নেমে গেছে নিকট বনে
যে নিখিল বেদনা ছড়ায় কুয়াশায়
তাকে কবিতা বংশের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়া যায়
সবিস্তারে

[যে নিখিল বেদনা ছড়ায় কুয়াশায়]

ক্রমশ জলের দিকে শেষ পর্যন্ত একটা নিরাশাকরোজ্জ্বল গ্রন্থ হয়েই থাকে নি—প্রেম ও তার কবিতায় এসেছে। এসেছে মল্লিকা বনের ফুলে ওঠা কোনো নীল চাঁদের মতন। সাড়ে তিন হাত শিল্পের ভেতর—

একদিন হাওয়ার ছদ্মবেশে ঢুকে যাব তোমার ড্রয়ারে

[একদিন]

কোন কথা বলি নি?
কোন কথা ফুরিয়ে গেছে!

[কাঁপন]

তবু এই প্রেম, অন্তিম বা শাশ্বত হয়েই থাকে নি। আচ্ছন্নতাকে খসিয়ে কেবলি শুদ্ধ করে গেছে। কবির চূড়ান্ত উপলব্ধি—

কুকুরটা দিন দিন মানুষের মতো ভয়ংকর হয়ে উঠছে
কুকুরটাকে থামানো দরকার

[অনুকবিতা—২]

রোজ আত্মহত্যা করে আশি বছর বাঁচল রমিছার মা

[ঐ]

এখনকার লোকেদের কাছে ভালোবাসা ঘাস হয়ে গেছে

[ঐ]


আমাদের চেতনাকে এই কবি এক বিমূঢ়, তমসাচ্ছন্ন নিঝুমপুরের থেকে টেনে হেঁচড়ে বের করে এনেছে। 


ক্রমশ জলের দিকে এক স্থূলতা-বর্জিত কাব্যগ্রন্থ। এই অসীম যাত্রা পথে কবি অহেতুক শব্দের কোলাহলকে সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছেন। তিনি অকুল পাথারে নেমে একটুখানি নির্মল রৌদ্রের অন্বেষণ করে চলেছেন বুঝি। জোছনা রাতে যারা আত্মহনন লিখে দেয়—যারা অভিমানী বিকেলে জলের নামতা বিকোয়—সেতারের ঘ্রাণে—উনুনে আগুন রাঁধতে রাঁধতে। কবি তাদের কথাই বলতে চেয়েছেন। বেদনার বুদ্বুদে। আমাদের চেতনাকে এই কবি এক বিমূঢ়, তমসাচ্ছন্ন নিঝুমপুরের থেকে টেনে হেঁচড়ে বের করে এনেছে। নিক্ষেপ করেছেন সুন্দরের এক অনিবার্য অন্তর্লোকে।

একটি কামনার ঘ্রাণ চেয়ে থাকে আকাশে—অবিরল বৃষ্টির গান গেয়ে নামাতে চায় শিলাখণ্ড। আমি তখন ঘরমুখী আল্পনার সোনারঙ মাখতে মাখতে পবিত্রতার দ্বারপ্রান্তে চিবুকের দিকে হেলে পড়ছিলাম।

একটি চৈতালীগান বাসনার মাঝে উথলে উঠতে উঠতে যখন মিইয়ে যাচ্ছিল, তখন সন্ধ্যাপ্রাতে রুপালি রাত্রির আহ্বান—ফিরে এসো, আর কত বেসুরো পথে হেঁটে হেঁটে চোখ জোড়া ক্ষয় করবে!

[অবিরল বৃষ্টির গান]


বই থেকে কিছু কবিতা : ক্রমশ জলের দিকে
অনুপম মণ্ডল

অনুপম মণ্ডল

জন্ম ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৮; কৃষ্ণনগর, খুলনা। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। পেশায় শিক্ষক।

প্রকাশিত বই :
ডাকিনীলোক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : anupamsoc@gmail.com
অনুপম মণ্ডল