হোম বই নিয়ে কেতাবে বন্দিনি, সত্যবতী : গোমেজের ‘দশ মহাবিদ্যা’

কেতাবে বন্দিনি, সত্যবতী : গোমেজের ‘দশ মহাবিদ্যা’

কেতাবে বন্দিনি, সত্যবতী : গোমেজের ‘দশ মহাবিদ্যা’
710
0

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ তাঁর নবতম কবিতা-বইয়ের নাম নির্বাচন করেছেন ‘দশ মহাবিদ্যা’। বাঙালি পাঠক জানেন, এই ভাষার কবিতাপরিসরে নামটি অভিনব কিংবা মৌলিক নয়। আজ থেকে প্রায় শ’ দেড়েক বছর আগেই ১৮৮২ সালে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এক কাব্য রচনা করেছিলেন ‘দশমহাবিদ্যা’ নামে। সে বইয়ের সূচনায় ‘গ্রন্থকারের নিবেদন’ অংশে ছন্দপ্রয়োগে কাব্যটির চমৎকারিত্ব এবং ছন্দরচনায় কবির নিজস্ব কলাকৌশলের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার পরে পরিশেষে কবি বলেছিলেন,

দশমহাবিদ্যা লইয়া এই গ্রন্থ বিরচিত হওয়াতে পাঠকগণ ভাবিবেন না, যে তৎসম্বন্ধে পুরাণাদির আখ্যান, সকল স্থানে ঠিক্ ঠিক্ অনুসরণ করিয়াছি। বস্তুতঃ আমি কবিতা রচনার প্রয়াস পাইয়াছি, শাস্ত্রিকতা, অথবা চলিতমতের প্রশুদ্ধতার মীমাংসায় প্রবৃত্ত হই নাই।

বলা বাহুল্য, যথার্থ কবিজনোচিত ঘোষণাই ছিল এ। পুরাণাদির আখ্যানকে অবিকল অনুসরণ করার দায় যে একজন কবির ওপর বর্তায় না, তা হেমচন্দ্র ভালোমতোই জানতেন। বস্তুত, এই কাব্যে তিনি যেভাবে নারদের কৌতূহল নিবারণার্থে শিবকে দিয়ে দশমহাবিদ্যার মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করিয়েছিলেন, তাতে পুরাণের আনুগত্য ছিলও না। তথাপি কাব্যের যে সারবস্তু, অর্থাৎ মহাবিদ্যার দশ রূপ, তাঁদের প্রকৃতি বর্ণনার সময় শাস্ত্রোল্লেখ থেকে খুব বেশি দূরেও যেতে পারেন নি হেমচন্দ্র। ফলত ষোড়শীর শাস্ত্রোক্ত ধ্যানমন্ত্র “বালার্কমণ্ডলাভাসাং চতুর্বাহুংত্রিলোচনাম। পাশাংকুশ শরাংশ্চাপান ধারয়ন্তীং শিবং ভজে।।”—এর সঙ্গে হেমচন্দ্র রচিত ষোড়শী-প্রশস্তি, যথা—

নেহার তাঁর পাশে কি জ্যোতি দেহে ভাসে,
শ্বেতবরণবামা পূর্ণকলা কামিনী।
প্রেমসঞ্চারি হৃদে জীবগণে ডোরে বেঁধে
ঐখানে রাজিছে ষোড়শী-রূপিণী।।

—ইত্যাকার পঙ্‌ক্তির প্রকৃতিগত প্রভেদ ছিল সামান্যই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০২০ সালে প্রকাশিত একটি কবিতা-বইয়ের আলোচনাসূত্রে প্রায় দেড়শ’ বছরের প্রাচীন একটি কাব্য প্রসঙ্গে আমরা যে এতগুলি শব্দ ব্যয় করছি তা কি নিছকই দু’টি বইয়ের নামসাযুজ্যের কারণে, নাকি আমরা সন্দেহ করছি যে, গোমেজের বইটি কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংযোগে হেমচন্দ্রেরই উত্তরাধিকার বহন করছে? প্রশ্নটি অন্যায্য নয়, তথাপি এর উত্তর অনুসন্ধান যদি আপাতত মুলতুবি রাখা যায়, তাহলে অন্য একটি প্রশ্নও হয়তো এই সূত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, এবং সেটি এ-ই যে, শেষমেশ কেনই-বা এই নামসাযুজ্য? জানতে ইচ্ছে করে, এ কি নিছকই সমাপতন, নাকি কনটেন্টের মুখের দিকে তাকিয়ে গ্রন্থনাম নির্বাচনের দায়জাত এ এক অনিবার্যতারই পরিণাম? বিষয়টি পাঠককে কৌতূহলী করে, কারণ তিনি ভুলতে পারেন না যে, গোমেজের এযাবৎ প্রকাশিত কবিতা-বইয়ের নাম ইতিপূর্বে কখনও হয়েছিল ‘দিগম্বর চম্পু’, কখনও-বা ‘গর্দিশে চশমা সিয়া’। এদেরই উত্তরকালিক প্রয়াস যে বর্তমান গ্রন্থ তাঁর, সেই ‘দশমহাবিদ্যা’কে দ্যাখা যাচ্ছে, কবি কয়েকটি পর্বে ভাগ করেছেন। বইয়ের ‘প্রথম প্রকরণ’ অংশের ‘প্রবেশক’ কবিতার প্রথম পঙ্‌ক্তিতে কবি লিখছেন,

শীতল অনল, মা গো, সুরভি অনল…

এই পঙ্‌ক্তি পাঠের পর পাঠক হয়তো ঈষৎ থমকে দাঁড়ান, কেননা এই উচ্চারণ তাঁর মনকে পুনরায় অতীতচারী করে তোলে। হয়তো নিতান্ত অকারণে, অথবা হয়তো ততটা অকারণে নয়ও, তাঁর মনে পড়ে যায়, ১৮৪৮ সালে ক্যালকাটা ক্রিশ্চিয়ান ট্র্যাক্ট অ্যান্ড বুক সোশাইটি কর্তৃক প্রচারিত ক্রিশ্চিয়ান হাইমস্-এর নির্বাচিত সংকলন-গ্রন্থ ‘ধর্ম্মগীত’-এর একটি গীতিতে বর্ণিত নরকাগ্নির বিবরণ—“অনন্ত কাল জ্বলিবে তবু সে অনল না শীতল হয়।” কিংবা আরও অতীতে গিয়ে তাঁর মন হয়তো তুলে আনে গোবিন্দদাস রচিত ‘ভাবসম্মিলন’ পর্যায়ের পদপঙ্‌ক্তি—“শীতল যমুনা জল, অনল সমান ভেল”। নরকের অগ্নি কখনও শীতল হয় না, আবার কৃষ্ণবিরহ শীতল যমুনাবারিকেও অগ্নি করে তোলে। কিন্তু বস্তুজগতে কোনো অগ্নিই কি কখনও শীতল হ’তে পারে, কিংবা শীতল জল কি হ’তে পারে অনল-সমান? যদি না-ই পারে, তাহলে নরকাগ্নি কিংবা কৃষ্ণবিরহজাত দহনের স্বাতন্ত্র্য কোথায়? আদপে, পাঠক জানেন, মরজগতের কোনো আগুনই ‘অনন্ত কাল’ জ্বলে না, এবং যমুনা-বারিও তেমন-তেমন সূর্যতাপে ‘অনল-সমান’ না হ’লেও সুতপ্ত নিশ্চয়ই হ’য়ে ওঠে। নরকের আগুন যেমন একান্তই অপার্থিব বিষয়, গোবিন্দদাসের রাধার মানসদহনও তেমনই বিশুদ্ধ গৌড়ীয় ‘ভাবলোকে’র অধীন। বস্তুপৃথিবীর নিয়ম এদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, এবং সে কারণেই এরা মৌলিক। লক্ষণীয়, গোমেজ অনল-কে শুধুমাত্র ‘শীতল’ই বলেন নি, বলেছেন ‘সুরভি’ও। ‘সুরভিত’ অর্থাৎ বিশেষণ নয়, স্পষ্টত বিশেষ্য ‘সুরভি’—‘সুরভি অনল’। মনে রাখতে হবে, ‘সুরভি’ শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ হলো, স্বর্গীয় কামধেনু (সু + √ রভ্ + ই), স্মরণ্য রবীন্দ্রপ্রয়োগ, “কেতকী কেশরে কেশপাশ করো সুরভি,/ ক্ষীণ কটিতটে গাঁথি লয়ে পরো করবী”। যা স্বর্গীয়, তা অধ্যাত্ম বলেই তথাকথিত ইন্দ্রিয়গম্য জগতের ছকবাঁধা যুক্তিবিগর্হিত এক চরাচরের বস্তু, যে চরাচরের প্রবেশদ্বার ‘দশমহাবিদ্যা’র ‘প্রবেশকে’ই হয়তো নির্মাণ করতে চান গোমেজ। এ এমন এক জগৎ যেখানে অনলের শীতলতার মতো বাহ্যত অসম্ভাব্যও সম্ভাবিত হয়ে যায় কোনও এক ‘মা’-এর মধ্যস্থতায়। কিন্তু কে এই ‘মা’? কী তাঁর স্বরূপ? দেখা যায়, গোমেজ তাঁর বইয়ের এক-একটি অংশকে চিহ্নিত করছেন শাস্ত্রোক্ত মহাবিদ্যার এক-একটি সত্তার নামে। ‘কালী’ নামাঙ্কিত অংশের প্রথম কবিতায় উক্ত ‘মা’ স্পষ্টতর হচ্ছেন। কবি লিখছেন, “তুমি গো সে-বিষ, যার পানে সদাশিব/ স্থাণু দশা।” সদাশিব যে ‘স্থাণু’ তা শাস্ত্রসম্মত তো বটেই কাব্যসম্মতও, স্মরণ্য, মধুসূদন দত্তের “স্থাপিলা বিধুরে বিধি স্থাণুর ললাটে।” কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘তুমি’-কে ‘বিষ’ ব’লে চিহ্নিত করা হচ্ছে কেন? কবি লিখছেন—

অস্মিতার বাহির ঈশ্বর
যেতে পারলে যিনি হ’ন নাহি-র ঈশ্বর,
তেজে মেরি ওলস্টোনক্রাফ্ট, জেদে তিনি তুমি,
মা আমার, বোন আমার, প্রিয় মৃত্যুভূমি
স্বর্গাদপী লঘীয়সী মায়া।

‘অস্মিতা’-মুক্ত ঈশ্বরের ধারণা পাতঞ্জল যোগসূত্র সমর্থিত, “ক্লেশকর্মবিপাকশিয়ৈরপরামৃষ্ট পুরুষবিশেষঃ ঈশ্বরঃ।” পতঞ্জলি-কথিত যে পাঁচ প্রকার ক্লেশ, তারই একটি হলো অস্মিতা। ঈশ্বর এই অস্মিতার দ্বারা স্পৃষ্ট নন। কিন্তু তাহলে ঈশ্বরের ক্ষেত্রে ‘যেতে পারলে’র সম্ভাব্যতা তৈরি হয় কিভাবে, কেননা ঈশ্বর তো স্বতই অস্মিতার পরিধি-বহির্ভূত! যদি নির্দিষ্টভাবে শাক্ত প্রেক্ষাপটেই বিষয়টি বিচার্য হয়, তাহলেও দেখা যাবে, দেবীমাহাত্ম্য-এর কাহিনিতে উল্লিখিত দেবীর হাতে শুম্ভ-নিধন আদপে অস্মিতা-নাশনেরই প্রতীকী প্রকাশ—এমন ব্যাখ্যা দুর্লভ নয়। তবে কি স্থাণু সদাশিবের কল্পনার মধ্যে আপাত শাস্ত্রানুগত্যের যে নিহিত ইঙ্গিত তাকে শেষ পর্যন্ত উল্লঙ্ঘনই করতে চান কবি? সম্ভবত তা-ই, এবং এই প্রক্রিয়ায় গ্রন্থ-প্রবেশকে নিছক বস্তুজগতের যৌক্তিকতাকে অতিক্রম করে যাওয়ার যে আভাসটি ছিল, তা এবার প্রবর্ধিত হলো প্রচল শাস্ত্র-ভিত্তিক অধ্যাত্মযুক্তিরও অতীত হওয়ার দিকে। কেননা কবির অভীষ্ট হয়ে উঠলেন এক ‘নাহি-র ঈশ্বর’, যিনি একদিকে বিষোপম এবং মৃত্যুভূমি-তুল্য, অন্যদিকে পার্থিব মা-বোন প্রতিম অন্তরঙ্গা। পাঠক জানেন, শ্রীচণ্ডীতে দেবীকে যে বারবার ‘সর্বভূতেষু’ বলে বন্দনা করা হ’চ্ছে সেই ‘ভূত’ শব্দটিতে বিদ্যমানতা এবং অস্তির বোধ নিহিত। অতএব গোমেজের কলমে যিনি ‘নাহি-র ঈশ্বর’ তিনি নিশ্চয়ই শাস্ত্রীয় বিচারে সেই সর্বভূতান্বিত দেবীর সঙ্গে অভিন্ন হ’তে পারেন না। আবার অন্যদিকে, অদ্বৈত বেদান্তে নির্গুণ ব্রহ্মের বর্ণনায় তাঁকে যে ক্রমাগত নিরুপাধিক, নির্বিশেষ, নিরবয়ব ইত্যাকার নঞ্-বহুব্রীহি সমাসসিদ্ধ বিশেষণে অভিহিত ক’রতে ক’রতে মূলত নেতির দ্বারাই তাঁর ইতির ধারণাকে ধারণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাতে তাঁকে ‘নাহি-র ঈশ্বর’ বললেও নিতান্তই কি অত্যুক্তি হয়? হয়তো হয়, আবার হয়তো হয়ও না। কারণ, দেখা যায়, অভিপ্রেত ‘তুমি’-কে কবি একবার ‘মায়া’ ব’লে সম্বোধন করেন, আবার অন্যত্র বলেন,

ভূমাতে যে-শূন্য, বা যে-শূন্যে জাগে ভূমি
সে-বুদ্বুদ মায়া হ’লে. সে-বুদ্বুদ তুমি।

‘হ’লে’র শর্তসাপেক্ষতা এখানে লক্ষণীয়। পাঠকের মনে হ’তে পারে, দার্শনিক বিচারে ঈশ্বরকে ‘মায়া’ বলে বিবেচনা করার গভীরে নিহিত রয়েছে শঙ্করভাষ্যের বিরোধিতার একটি সূত্র। স্বামী বিদ্যানন্দ সরস্বতী তাঁর ‘অদ্বৈতমত খণ্ডন’ গ্রন্থে “পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদম্…” ইত্যাদি শ্লোকের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছেন, ‘অদস্’ চেতন, এবং ‘ইদম্’ অচেতন বা জড়, চেতন থেকেই অচেতনের উৎপত্তি, স্বরূপে উভয়েই পূর্ণ, অতএব উভয়েই সত্য। কেননা স্বর্ণ সত্য হ’লে তা থেকে নির্মিত অঙ্গুরি মিথ্যা হ’তে পারে না। গোমেজ যেন এই বিশ্লেষণকেই এক বিপরীত পথে চালিত করতে চান। বলেন, ভূমি যদি শূন্যে জাগ্রত বুদবুদের মতোই মায়িক হয়, তবে ভূমাও তা-ই, কারণ মায়ার রচনাকারীও মায়া থেকে অপৃথক, এবং বাধ্যত মায়া। কিন্তু কবির অভীষ্ট যে ‘তুমি’, সম্বোধনে যিনি ‘মা’, এবং নামান্তরে যিনি কখনও কালী, কখনও-বা শ্যামা, ভৈরবী বা মাতঙ্গী, তাঁকে যদি নিশ্চিতভাবে ‘মায়া’ বলেই জেনে থাকেন কবি, তাহলে তিনি কোন অর্থে কবির বন্দনীয় হ’তে পারেন! অথবা ঈশ্বরও কি সত্যিই হ’তে পারেন মায়ামাত্র? পাঠকের হয়তো মনে পড়বে, ‘শ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গে’ ঠাকুরের প্রাসঙ্গিক উপমা, “সাপ যাকে কামড়ায় সেই মরে; সাপের মুখে বিষ সর্বদা রয়েছে, সাপ সর্বদা সেই মুখ দিয়ে খাচ্চে, ঢোক গিলচে, কিন্তু সাপ নিজে তো মরে না।” অর্থাৎ ঈশ্বর মায়াধীশ হ’লেও স্বয়ং নিছক মায়া নন। কিন্তু ঠাকুরের মুখে যে-ঈশ্বরের কথা শোনা যায়, সেই ঈশ্বরের ক্ষেত্রে তো অস্মিতার বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠতে পারে না, কারণ তিনি তো স্বতই অস্মিতাবিবর্জিত। তাহলে গোমেজের আরাধ্য মা তাঁর থেকে ভিন্ন কোনও সত্তা। আদপে, এক্ষণে এসে পাঠক পুনর্বার তার পূর্বসিদ্ধান্তে আরূঢ় হ’ন, তিনি বোঝেন, প্রচলিত লৌকিক বা শাস্ত্রিক কোনো বিশ্লেষণে গোমেজের আরাধ্যাকে ধরা সম্ভব নয়। বস্তুত, নির্দিষ্ট কোনো শাস্ত্রের বিধিবদ্ধ কোনো পন্থার অনুগত হ’তে, অবিমিশ্র কবির মতোই, গোমেজ চূড়ান্ত অরাজিও বটে। ফলত, তাঁর বইয়ের ‘কালী’ নামাঙ্কিত গ্রন্থাংশ তিনি শুরুই করেন আল্লাহ-র উল্লেখ দিয়ে—“রব হয় শব্দ আর আল্লাও তো রব”, এবং দ্বিতীয় কবিতাতেই শ্যামা, জৈন ধর্মানুচার পর্যূষণ, এবং ইঞ্জিল কোরাণকে এক জায়গায় এনে লিখে ফেলতে পারেন, “শ্যামা, এই পর্যূষণ/ শিখায়েছে ইঞ্জিল কোরাণ আমাদিগে।” ‘সর্বধর্মসমন্বয়’ বা ‘যত মত তত পথ’ গোছের উদ্ধৃতিধন্য তত্ত্ব দিয়ে এই সমীভবনকে বোঝা অসম্ভব। কারণ ভুললে চলে না, কবি-কথিত ‘মা’ শুধু সদাশিবের সহচরী নন, সেই সঙ্গে তিনি ‘বিষ’, এবং ‘মৃত্যুভূমি’। অনুসন্ধিৎসু হয়ে পাঠক এইবার হয়তো কবি-কথিত ‘অস্মিতা’র অন্যতর অর্থও অনুধাবন করতে পারেন। তাঁর মনে পড়ে যায়, গোধরা-পরবর্তী দাঙ্গার ‘প্রত্যুত্তরে’ আহমেদাবাদে সংঘটিত বিস্ফোরণের আগে সংবাদমাধ্যমগুলিতে প্রেরিত সন্ত্রাসীদের ইমেল বার্তাটির কথাও, যেখানে বিশেষত রাষ্ট্রপ্রধান, এবং সাধারণভাবে গুজরাটবাসীদের চ্যালেঞ্জ করে লেখা হয়েছিল, ““We are back with the will of Allah, striking in your own land. With the will of Allah, assaulting and ruining your own cities, raiding and ravaging your own territory! Show us where has all your Gujarati asmita gone?” পাঠকের মানস তখন অস্মিতার দ্বন্দ্বদীর্ণ যে-মৃত্যুভূমিতে প্রবেশ করে সেখানে যথার্থই এক ‘নাহি-র ঈশ্বর’-এর সর্বময়তা, যিনি কখনো মায়া, কখনোবা বিষবৎ প্রকট, যে ঈশ্বর কোনো নির্দিষ্ট শাস্ত্রের আধারে নির্ণিত নন বলেই সর্বাধারিক হ’তে যাঁর কোনো বাধা নেই।


সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের ‘দশমহাবিদ্যা’র মতো এমন তীব্র মননদীপ্ত, সুপরিকল্পিত, এবং সদর্থে দুর্গম বই সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা-পরিসরে অলভ্য।


যে-ঈশ্বরের অস্তিত্বই নাস্তিত্বের ভিত্তিতে তাঁকে, বলা বাহুল্য, কোনো চেনা ছকে ফেলা যায় না। তিনি, পাঠকের পূর্বসিদ্ধান্তমতোই, বস্তুজগতের এবং বহুলাংশে অধ্যাত্মজগতেরও যুক্তির অতীত। কিন্তু তা’বলে কি তিনি সম্পূর্ণত অযৌক্তিক? এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে গিয়ে গোমেজের বর্তমান বইটির ঈষৎ পুরু তাত্ত্বিক, তা-সে তত্ত্ব শাস্ত্রসমর্থিত বা অসমর্থিত যা-ই হোক কেন, আবরণটি ভেদ করে (অবশ্যই আক্ষরিক অর্থে নয়) পাঠক যখন মূল কাব্যকন্দরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি অভিভূত হ’ন। কারণ তিনি বুঝতে পারেন, আদপে এই বইয়ের প্রতিটি কবিতা, পঙ্‌ক্তি, মায় শব্দও নিক্তিতে তৌল ক’রে এমন এক গভীরতম শৈল্পিক যুক্তির ভিত্তিতে গাঁথা, যে-যুক্তি ফিজিকাল বা মেটাফিজিকাল—যে কোনো প্রকার র‍্যাশনালিটি-নিরপেক্ষভাবে স্বতঃসিদ্ধ, এবং অচ্ছেদ্য। বস্তুত, আলোচনার এই অংশে এসে এবার বলে ফেলতেই হয় যে, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের ‘দশমহাবিদ্যা’র মতো এমন তীব্র মননদীপ্ত, সুপরিকল্পিত, এবং সদর্থে দুর্গম বই সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা-পরিসরে অলভ্য। বর্ণনাতে বিশদ করে এ-বইয়ের রহস্য ঘোচানো সম্ভব নয় ঠিকই, কিন্তু নিদর্শনে বর্তমান আলোচনাটিকে কিঞ্চিৎ প্রাঞ্জল করার চেষ্টা করা যেতে পারে। বইয়ের প্রথম পর্বের প্রথম কবিতায় কবির যে-আরাধ্যা “তেজে মেরি ওলস্টোনক্রাফ্ট”-উপম, তিনিই কিছুদূর এগোনোর পর দেখা যায়, অভিহিত হচ্ছেন “মেরি শেলির ঈশ্বর” ব’লে। পাঠক জানেন, ওলস্টোনক্রাফ্ট ও শেলি মাতা-কন্যা সম্পর্কে সম্পর্কিত, এবং সমাজাচারের অমান্যতা কিংবা ঈশ্বর বিষয়ে শেলি মায়ের মতোই বৈপ্লবিক, যে কারণে অধ্যাপিকা অ্যান কে. মেলর তাঁর বইতে শেলির বিরুদ্ধে অধার্মিকতার অভিযোগ এনেছেন। এই উপলব্ধির পর প্রবেশকের “যে-তোর মাথায়/কন্যা হ’য়ে ধন্যা ছিল মাতার মাতায়” ইত্যাদি পঙ্‌ক্তি নতুন তাৎপর্যে প্রতিভাত হয় পাঠকের সামনে। কবির সুগ্রন্থনার আর একটি নিদর্শন দ্যাখা যাক। বইয়ের প্রথম প্রকরণের তৃতীয় পর্বের শিরোনাম ‘ষোড়শী’। এর চার নম্বর কবিতায় কবি লিখছেন—

যে তোমার ঘাড়ের রগের থেনে কাছে,
যে তোমার ধারণাতীতের চেয়ে দূরে,
যে-বরফ উহ্য থাকে রমজান-রোদ্দুরে,
এ-স্ফিয়ার পয়দা হ’ল যে-স্কয়ার কাচে
তারই একটা ফোঁটা আমি তোমাকে দিলেম,…

বাদবাকি অংশ ছেড়ে দিয়ে আপাতত নিছক ‘বরফ’ শব্দটির প্রতি একটু মনোনিবেশ করা যাক। গ্রীষ্মকালীন ঈদের আগে পালিত রমজানের সময় ইফতারে বরফকে শরীর ঠান্ডা করার কাজে লাগানোই যায়, কিন্তু সেই বরফ, আর যাই হোক, ‘উহ্য’ হ’তে পারে না। একটু অনুসন্ধিৎসু হ’লে বোঝা যায়, বুখারি ও মুসলিম-এ যে উল্লিখিত রয়েছে, নবীজী দোয়া করার সময়ে আল্লাহের উদ্দেশে নিয়ত বলতেন, আল্লাহ যেন বরফ, জল আর শিলার দ্বারা তাঁর পাপ প্রক্ষালন করে দেন, কবি-কথিত ‘উহ্য’ বরফ সেই পাপ-ধৌত করার গূঢ় ভূমিকাতেই নির্ণিত। কিন্তু বইয়ের তৃতীয় পর্বের চতুর্থ কবিতায় ‘বরফ’-এর এই যে দুর্নিবার প্রয়োগ, তার একটি ভূমিকা কিন্তু কবি নির্মাণ করে দিয়েছেন প্রথম গ্রন্থাংশের সূচনাতেই। ‘কালী’ শীর্ষক পদক্ষেপটি শুরুই হয়েছে এভাবে—

রব হয় শব্দ আর আল্লাও-তো রব,
রবের বাহিরে তবে কেবল বরফ,…

প্রাথমিক নির্ণয়ে, পরম করুণাময়ের অস্তিত্ব ব্যতিরেকে ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী শুধুই পাপমুক্তির প্রক্রিয়া চলমান—এই বার্তাতেই কবি পূর্বোদ্ধৃত অংশটির প্রাগাভাস দিয়ে রাখতে চান। কিন্তু গভীরতর বিচারে এখানেও খেলা করে যায় কবির স্বভাবসিদ্ধ রহস্যপ্রিয়তা। পাঠক বিস্মিত হয়ে লক্ষ করেন, ‘কেবল’ শব্দটি ইটালিক্সে মুদ্রিত, যেন প্রচল অর্থের অতিরিক্ত গূঢ়তর কোনো বার্তা বহন করছে এ-শব্দ। অতঃপর পাঠকের উপলব্ধি হয়, ‘কেবল’-এর অর্থ নিছক ‘শুধুমাত্র’ নয়, তা অদ্বিতীয়, অসঙ্গ অর্থেও প্রযোজ্য। সাংখ্যদর্শনে স্বয়ং ঈশ্বরই তাই ‘কেবল পুরুষ’, যা থেকে একান্ত ঈশ্বরানুরাগ হয়েছে ‘কৈবল্য’। ঈশ্বর অদ্বিতীয়, তাই তাঁর কাছে ক্ষমা যাচ্ঞার প্রক্রিয়াটিও দ্বিতীয়রহিত, গোমেজের কাব্যযাত্রার সূচনাতেই ‘বরফ’ তাই ‘কেবল’, এবং রমজানের ‘উহ্য’ বরফ-কে মর্মার্থে গ্রহণ করার মানসিক প্রস্তুতির সোপান। অন্যদিকে. স্বয়ং মহাবিদ্যাই ‘কেবল’-এর ভাব অর্থাৎ কৈবল্য-প্রদায়িনী। বস্তুত, কবির রচনায় ইটালিক্সে একটিমাত্র শব্দের সজ্জাই এই যাবতীয় গূঢ়ার্থের চাবিকাঠি। বলা বাহুল্য, আন্তরিক কাব্য-অভিনিবেশকে কবিতার দৃশ্য মাধ্যমে এভাবে অনূদিত করে দেওয়ার সাফল্যও বাংলা কবিতায় খুব সুলভ নয়।

যিনি মেরি শেলির মতো তথাকথিত ‘অধার্মিকে’র বন্দনীয়, ‘দশমহাবিদ্যা’ বইতে তিনিই গোমেজেরও অভীষ্ট, “প্রতিমা না, সবই প্রতিবিম্বিত প্রতীক”-এই উপলব্ধিতে যিনি নিরূপ, অতএব সর্বরূপেই নিরূপিত। কিন্তু তাহলেও, প্রশ্ন জাগে, কেনই-বা দশমহাবিদ্যা? যিনি অনির্দেশ্য তিনি মহাবিদ্যার দশ রূপেই বা কিভাবে নির্ধারিত হ’ন? হেমচন্দ্র লিখেছিলেন, “বিদ্যারূপ দশ/ ভুবন পরশ/ করেছে আকাশ জুড়িয়া।” এই ‘বিদ্যা’র শাস্ত্রীয় তাৎপর্য রয়েছে। গোপীনাথ কবিরাজ তাঁর ‘সাধনা ও সিদ্ধি’ গ্রন্থে লিখেছেন, “অবিদ্যা হইতে অস্মিতা অথবা অহংভাবের উদয় হয়।” ঈশ্বর এই অস্মিতার পরিধি-বহির্ভূত, অতএব তিনি অবিদ্যার দ্বারাও অবশীভূত, বরং তিনিই মূর্ত বিদ্যা। দশটি রূপে ব্রহ্মাণ্ডে তাঁর বহিঃপ্রকাশ, তাই তিনি দশমহাবিদ্যা। গোমেজ দেখা যায়, তাঁর বইয়ের ‘ভৈরবী’ শীর্ষক অংশের পাঁচ নম্বর কবিতায় লিখছেন,

কত গপ্পো গজাচ্ছে-রে এই নদিয়ায়!
অবিদ্যা রায়বেঁশে নাচে, ন্যাংটা মদ্দা-মাগ
বেগে ধায়; ধুলা নয়-তো, জীবন্ত পরাগ
বাসন্তী উল্লাসে ওড়ে—

এই অপ্রেয় ‘অবিদ্যা’র নাশন যাঁর দ্বারা সম্ভব তিনিই কবির মহাবিদ্যা, দশটি সত্তায় যিনি প্রকাশিতা। তাঁর ধর্মীয় পরিচয় অকিঞ্চিৎকর, স্থান-কালের পটভূমি তাঁর ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য, তিনি মায়ার বুদবুদ বলেই সর্বদেশকালাতিচারী, কেননা গোমেজ জানেন, ‘অবিদ্যা’-ক্লিন্ন নদিয়ার সঙ্গে অবিরাম মৃত্যুকলরোলে জর্জর সুদানের দারফুরের কার্যকালীন দূরত্ব সামান্যই। অতএব, বইয়ের দ্বিতীয় প্রকরণের ‘প্রবেশকে’ তিনি লিখতে পারেন,

পশুক ঈশ্বরকণা পশু-চামড়া ফুঁড়ে,
মরা-মা’র মাইয়ে যথা সুদূর দারফুরে
দুধ এসে জমে তবু বুকের বাচ্চার
জন্মের ভুখের লাগি।

পাঠক জানেন, হেগেলীয় দর্শনে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে শিল্পচর্চাকে ঈশ্বরের উদ্দেশে মানুষের প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়, কেননা শিল্প দিনানুদৈনিকের প্রয়োজনাতিরিক্ত, ফলত পশুবৎ মানুষের পশুত্ব নির্মোচনের প্রথম সোপান। গোমেজও তেমনই তাঁর কবিতাপয়োধিজলে অবিদ্যার মোচন প্রার্থনা করেন, আবাহন করেন মহাবিদ্যার, পশুত্বনাশী ঈশ্বরকণার অপেক্ষায় ব্যাকুল হ’ন, এবং তাঁর ব্যাকুলতায় ‘সুদূর’ দারফুরের সুদূরতা ঘুচে যায় অনায়াসে। দশমহাবিদ্যা সেই অভীষ্টের বাহ্য প্রতিমা মাত্র, প্রতীকে ইঞ্জিল কোরাণ বা পর্যূষণে ব্যাপ্ত হয়ে যেতে তাঁর কোনো বাধা নেই।

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ-বিরচিত ‘দশমহাবিদ্যা’র পরিধি ব্যাপক, এতটাই ব্যাপক যে তার সীমা-নির্ণয় বহু পাঠকের পক্ষে অসম্ভব ব’লে বোধ হ’তে পারে। কিন্তু সেই অপারগতা কি এই বইয়ের আস্বাদনের পথে কোনো প্রতিবন্ধক হ’য়ে দাঁড়ায়? সম্ভবত হয় না। কারণ কবির যাদুকর-সুলভ কৌশলে যেভাবে “পদনখে পড়ে আছে তার যতগুলা” কিংবা “সোনা রূপা নহে, বাপা, এ বেঙ্গা পিতল”-এর কালাতিক্রমী অথচ একান্ত বঙ্গীয় পারম্পর্যের সঙ্গে ঈশ্বরকণা, ভার্জিল, সিন্দবাদ থেকে শুরু করে ট্রাম্প-পুতিন পর্যন্ত এক সূত্রে গ্রথিত হয়ে যান, তা পাঠকের কাছে খোদ মহামায়ার সৃজন-প্রকৌশলের মতোই রোমহর্ষক ব’লে বোধ হয়। বাহ্যত এ বই ঐতিহ্যের রীতিমতো অনুগত, চিরকালীন পয়ারের আদল এর চেহারায়, চতুর্দশ পদ ও প্রতি পদে চতুর্দশ মাত্রার সংহতিতে যা পিনব্ধ, উপরন্তু আদি বঙ্গীয় আখ্যানকাব্যের মতোই এ বই পর্ব কিংবা সর্গ-বিভক্ত। শব্দালংকারের বহুল এবং সুনিশ্চিত প্রয়োগে, এমনকি প্রথম প্রকরণের অন্তে ‘ভক্তিরত্নাকর’-কথিত “আভোগেতে কবি-নায়কের নাম হয়” নির্দেশিকার অনুসরণে “মহাবিদ্যা পয়লা সর্গ সাঙ্গ করিলাম।/আপনাদের ভালো লাগলে আর লিখিব না।” প্রভৃতি চরণে কবির সাবজেকটিভ উপস্থিতির কৌশলেও হয়তো আবহমান বঙ্গকবিতারই ধারাবাহিকতা। কিন্তু নিবিষ্ট পাঠক জানেন,

গঙ্গামাতা মিলে গেল নীলে। অট্টহাসে
ফুল্লরার ওষ্ঠ যাচে বিশ্বনাথে, আর
রাবানন্দ মহামুদ্রা ঢুণ্ঢে কামাখ্যার।

—এই সমস্ত ছলনাময় উচ্চারণের কতটুকু যথার্থই পূর্বানুসার, আর কতটা কবির স্বোদ্ভাস। তবে তার চেয়েও বড় কথা, ফর্ম আর কনটেন্টের মেশামেশির অনেক উদাহরণ হয়তো বাংলা কবিতা-বাজারে মেলে, কিন্তু খোদ ফর্মকেই যে ক্ষেত্রবিশেষে কনটেন্ট ক’রে তোলা যায়, তার এক বিরল দৃষ্টান্ত গোমেজ রেখেছেন এই বইয়ে। ‘কালী’ নামক পর্বের এগারো নম্বর কবিতার সূচনায় রয়েছে—“চার-বছরেরটি তুমি…”, আর অন্তিমে—“আমি তবু ব’সে ছিনু—কবে হবে ষোল।” প্রশ্ন হলো, কোনো এক ‘তুমি’র সম্পর্কে কথিত এই ‘চার’ আর ‘ষোল’-র সংযোগসূত্র কী? সংযোগসূত্রটি হলো আদি পাদাকুলক ছন্দের গড়ন, মূলত যে-ছন্দে চর্যাপদ রচিত, এবং দীর্ঘস্বরের উপস্থিতি-সহ চার মাত্রার চারটি পর্বে যার বিন্যাস, অর্থাৎ যে-ছন্দে ‘চার’-এ প্রতিটি চরণের সূচনা এবং ‘ষোল’-য় পূর্ণতা। এখন, এই উদ্দিষ্ট ‘তুমি’টি আদপে কে, কিংবা এহেন কবিভাবনাকে, নিহিতার্থেই, ঐতিহ্যের আনুগত্য বলা চলে কি না, তা বিবেচক পাঠকই স্থির করবেন।

আনপ্রেডিক্টেবিলিটি যদি সাহিত্যের একটি সদগুণ বলে বিবেচিত হয়, তাহলে, এমনকি অননুমেয়তায় অভ্যস্ত গোমেজ-নিষ্ঠ পাঠকের কাছেও, ‘দশমহাবিদ্যা’ পূর্ণমান পেতে বাধ্য। প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে গমনের দ্রুতিতে, গুরু থেকে চণ্ডালী ভাষার ব্যবহারের বিচিত্রতায়, আরবি-ফারসি প্রচল-অপ্রচল শব্দপ্রয়োগের অক্লেশে, সমাজকালপ্রেক্ষাপটের ব্যাপকতায় এভাবে মুহুর্মুহু চমকিত করতে পারে, এমন বই সচরাচর দেখা যায় না। সামান্য একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। বইয়ের ‘মাতঙ্গী’-পর্বের তিন নম্বর কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি এরকম—

হেকেটি, তুমি-তো ছিলে দু’এককাঠি এগিয়ে
পুরুষমহল থেকে, পুরুষমহলে
তবু মাত্র-একটিবারও অভ্যাগত হ’লে
যে-ঝিল্লি পর্দার মতো জেহোহ্বার গৃহে
ফর্দা হয়, জোড়ে না তা আফিমেরও জোরে।
স্বয়ং-শয়ন!— প্যাঁচা— লক্ষ্মীর পায়ের
আলতা-ছাপ বুকে তোর রাহুর হা-য়ের
মতো ক্রমাতত, মিতা, চিতা কিংবা গোরে।
পরভৃতা, তুমি এক শূন্য রণাঙ্গনে
অদৃশ্য শরের শয্যা করিলে বরণ;
কাদম্বরী,…

হেকেটিকে দিয়ে যে-প্রসঙ্গের সূচনা, তা মধ্যবিন্দুতে স্পর্শ করে আফিম-কে, এবং শেষমেশ উপনীত হয় কাদম্বরীতে। কিভাবে এই তিনের অন্তর্গত বহুল দূরত্বকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলতে পারেন কবি সেই বিস্ময়ের ঘোর একটু কাটলে পাঠক বুঝতে পারেন, এই ত্র্যহস্পর্শের একটি মাত্রা রাবীন্দ্রিক, কেননা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বউঠান কাদম্বরী দেবীকে সম্বোধন করতেন গ্রীক দেবী হেকেটি-র নামে, মিথোলজি-মতে যে-হেকেটি মূর্ত রহস্যাধার। অন্যদিকে ‘কাদম্বরী’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হ’লো সুরা বা মদিরা, স্মরণ্য, বাণভট্টের ‘কাদম্বরী’র প্রবাদপ্রতিম পঙ্‌ক্তি—“কাদম্বরী রসজ্ঞানাং আহারোপি ন রোচতে”, অর্থাৎ কাদম্বরীর রস পান করলে আহারের আর রুচি থাকে না। আফিম-এর সঙ্গে এখানেই তার নৈকট্য, অন্যদিকে আফিম ঠাকুরবাড়ির কাদম্বরী-নাম্নী বধূটির আত্মহননেরও উপকরণ। প্রায় আনঅ্যাচিভেবল যে কৌশলে এই তিনের সমাপতন ঘটাতে পারেন গোমেজ, তাতে টুপি খুলি শত কুর্নিশও তাঁর জন্য যথেষ্ট হয় না।

জানতে ইচ্ছে করে, গোমেজের এই অসম্ভব কাল্টিভেটেড বইটির লক্ষ্য-পাঠক ঠিক কারা? কিংবা, আদৌ কি এ বই নির্দিষ্ট কোনো পাঠককুলকে লক্ষ্য ক’রে লেখা, নাকি সম্পূর্ণ পাঠক-নিরপেক্ষভাবে নিছক আত্মমোক্ষণের জন্যই লিখে গিয়েছেন গোমেজ? বলা বাহুল্য, এহেন উৎকট কৌতূহলের নিরসন বহুলাংশে বিতর্কনির্ভর, যে-বিতর্কের অবকাশ আপাতত নেই, কাজেই প্রশ্নটিকে শিকেয় তুলে একটি মুলতুবি প্রসঙ্গে বরং এক্ষণে ফিরে যাওয়া যাক। আলোচনার সূচনায় আমরা হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা উল্লেখ করেছিলাম, এবং একটি প্রশ্ন সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছিলাম, এবং সেটি এই যে, গোমেজের ‘দশমহাবিদ্যা’ কি কোনোভাবে হেমচন্দ্রের সমনামের কাব্যটির উত্তরাধিকারবাহী? এক্ষণে এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে বসলে আপতিকভাবে মনে হয়, আদৌ কি বাংলা কবিতায় গোমেজের বইটির কোনো পূর্বসূরি রয়েছে? বার্ডস-আই-ভিউ থেকে দেখলে, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলালের ‘দেবী’, কিংবা অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের ‘শাক্তচতুর্দশপদী’র কথা স্মরণে আসতে পারে, মনে আসতে পারে গীতা চট্টোপাধ্যায়ের ‘নিস্তার-নৌকা’ নামের একটি নাতিদীর্ঘ সিরিজের স্মৃতি, প্রবেশক ব্যতিরেকে যার দশটি কবিতা নিবেদিত হয়েছিল মহাবিদ্যার দশটি রূপের প্রতি। বিচ্ছিন্নভাবে হয়তো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে অরুণ বসু বা রঞ্জিত সিংহের লেখায় ধৃত কোনো কোনো কুহেলিকাচ্ছন্না দেবীর আভাসও। কিন্তু শেষ বিচারে পার্থপ্রতিম, অনির্বাণ, গীতা কিংবা অরুণ বসু—কারোর সঙ্গেই গোমেজের গতিবিধি মেলে না। উৎকর্ষ বা অপকর্ষের প্রশ্ন নয়, ব্যাপ্তিতে, প্রজ্ঞায়, গুরুত্বে এবং লঘুতার অনায়াস মিশ্রণে, ঐতিহ্যের আনুগত্যে এবং ঐতিহ্যকে নস্যাৎ করে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তিনি স্বতন্ত্র, মৌলিক, এবং ‘কেবল’। অতএব হেমচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর সংযোগসূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা নিতান্তই অপপ্রয়াস ভেবে নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত, কিন্তু সে পথে কাঁটা দেন গোমেজ নিজেই। বিশুদ্ধ এরুডাইট কবি তিনি, পাঠকের কাছে তাঁর প্রত্যাশাও অনেক, প্রহেলিকার মতো এই বইতে তাই বারবার তিনি ছড়িয়ে দেন এই ধরনের উক্তি—“আমি-তো আমিশ গো, মা, উনিশ শতক/ থেকে উঠে এসে এবে পুড়ে যাইছে ত্বক্”, কিংবা বলেন, “তোমাকে পেয়েছিলাম হঠাৎ হারায়ে/…সেও আজি আধাশতকেরও বুঝি আগে।” প্রশ্ন জাগে, কিভাবে এই অভীষ্ট ‘তুমি’কে অর্ধশতকেরও কিছু আগে, কিংবা হয়তো সামান্য পরেই (‘বুঝি’র সন্দেহ লক্ষণীয়), পেয়েছিলেন কবি? সেই প্রাপ্তি কি প্রায় দেড় শতাব্দী-প্রাচীন হেমচন্দ্রীয় ‘দশমহাবিদ্যা’র আধারেই ঘটেছিল? কবির ইঙ্গিত হয়তো সেরকমই। কেননা ভুললে চলে না, ‘শাস্ত্রিকতার…প্রশুদ্ধতায়’ আস্থাশীল না হয়েও, একক সত্যের বিবিধ বহিঃপ্রকাশকে যেভাবে দশ মহাবিদ্যার রূপকে বিধৃত করার প্রয়াস নিয়েছিলেন হেমচন্দ্র, তা কোনো বিচারেই অশাস্ত্রীয় ছিল না। সেই প্রক্রিয়ায় দশ মহাবিদ্যার যে-সমস্ত রূপের শাস্ত্রের বাইরের লৌকিক জীবনে প্রায় কোনো অস্তিত্বই নেই, তাদেরও সাদরে নিজের কাব্যাসনে বসিয়েছিলেন হেমচন্দ্র। অন্যদিকে, একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে গোমেজকে তাড়িত করেছে এই উপলব্ধি “কলিতে ঘুমায় সত্য পাশার আশায়।” সেই ঘুমন্ত সত্যকেই কি তিনিও খুঁজে ফেরেন পুরাণবদ্ধ মহাবিদ্যাদের দুয়ারে দুয়ারে, যেমনটা হয়তো খুঁজেছিলেন হেমচন্দ্র, উনিশ শতকের পুনর্জাগরিত কোনো এক সময়ে? নিজের সাম্প্রতিকতম কবিতাবইকে হেমচন্দ্রের কাব্যের সমনামী ক’রে পাঠকের এই কৌতূহলকে নিবৃত্ত করার পরিবর্তে গোমেজ বরং তাকে আরও উস্কে দিতে চান, মহাবিদ্যাকে উদ্দেশ ক’রে রহস্যবাচনে শুধু বলে যান—“কেতাবে বন্দিনি, সত্যবতী মা গো, জাগো!”


গ্রন্থনাম: ‘দশমহাবিদ্যা’
লেখক: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ
প্রকাশক: বৈভব
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২০
দাম: ৩৪০ টাকা


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

(710)