হোম বই নিয়ে কিংবদন্তি নভেরা ও বাংলাদেশের শিল্পকলায় আধুনিকতার খোঁজে

কিংবদন্তি নভেরা ও বাংলাদেশের শিল্পকলায় আধুনিকতার খোঁজে

কিংবদন্তি নভেরা ও বাংলাদেশের শিল্পকলায় আধুনিকতার খোঁজে
309
0

কবি ও তাত্ত্বিক সাখাওয়াত টিপু প্রণীত কিংবদন্তি ভাস্কর নভেরা আহমেদের কর্মজীবন উপজীব্য—নভেরার রূপ বাংলাদেশের শিল্প-সমালোচনার ভুবনে একটি অভিনব বই। তবে কেবল অভিনবত্বের দাবিতে কোনো বইয়ের মূল্য বিচারে ব্রতী হলে একটি সমস্যারও সূত্রপাত ঘটে। সমস্যা হলো এতে বইয়ের সারাৎসার পাঠ করার তাৎপর্যটি গৌণ হয়ে যায়। এই চিন্তার সূত্রে প্রশ্ন হাজির করা যায় ‘আদর্শ’ প্রকাশনা থেকে ২০১৯-এর ফেব্রুয়ারিতে বের হয়ে আসা নভেরার রূপ বইয়ের স্বরূপ কী? টিপু নভেরার রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে একটি একক বইয়ের বিপরীতে এজমালি বই লেখার ধারণা প্রয়োগ করেছেন। নিজের কবিতা, প্রবন্ধ, গৃহীত সাক্ষাৎকার এবং সমকালীন আটজন শিল্পীর আঁকা নভেরার প্রতিকৃতিকেও টিপু ‘ভাষা’ হিসেবে প্রস্তাব করেছেন। টিপুর একগুচ্ছ লেখার সাথে নভেরার এই প্রতিকৃতিগুলো নভেরার পরিচয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার পাঠ করতে দরকারি কিছু চিহ্নও সরবরাহ করেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে টিপুর লেখাগুলোর ইংরেজি অনুবাদ। ইংরেজি অনুবাদগুলো প্রকাশিত হয়েছিল মোস্তফা জামান সম্পাদিত শিল্প ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন বিষয়ক যুগান্তকারী ত্রৈমাসিক ‘ডেপার্ট’-এ।


শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন নভেরা আহমেদের প্রথম প্রদর্শনী ‘ইনার গেইজ’কে ‘ছোটখাট বিপ্লব’ অভিহিত করেছেন।


টিপুর এই এজমালি বইয়ের শরিকানার হিস্যা বস্তুত বিপ্রতীপ জোড়ে বা বাইনারি দিয়ে চিহ্নিত হয়। যেমন এই বইয়ের ভাষা দুটো—বাংলা ও ইংরেজি। এই বইয়ের রচনা-পদ্ধতির মধ্যে আত্মস্থ হয়েছে দুটো দৃষ্টিভঙ্গি—নৈর্ব্যক্তিক ও ব্যক্তিক [অবজেক্টিভ ও সাবজেক্টিভ]। তিনি নিজে যখন বিশ্লেষণে সংলিপ্ত তখন মননশীল প্রবন্ধ লেখার যে রীতিসিদ্ধ ধরন বা প্রথা রয়েছে অর্থাৎ লেখার নৈর্ব্যক্তিক বয়ানের কৌশল সেটি স্বাভাবিকভাবেই মেনে চলেছেন। কিন্তু যখন নিজের প্রণীত বইয়ে সাক্ষাৎকারও সংকলিত করেছেন তখন তিনি সাক্ষাৎদাতার আত্মবাচক স্বর বা ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও অঙ্গীভূত করে নিয়েছেন। এর ফলে সাখাওয়াত টিপু প্রণীত নভেরার রূপ পুস্তিকাটি লেখকের একান্ত নিজের স্বরের সাথে অপরের স্বর মিশিয়ে একটি কলস্বর তৈরি করেছেন। এভাবে টিপুর বইয়ে উদ্দেশ্য ও বিধেয় এক হয়ে গেছে। এই প্রসঙ্গে একটি সত্য আত্মসাৎ করলে সত্যের চূড়ান্ত অপলাপ হবে। টিপুর নৈর্ব্যক্তিক রচনা-পদ্ধতির মধ্যেও একটি জটিলতার সংশ্লেষ ঘটেছে। নিজের আবার একটি ব্যক্তিক ভাষ্য এই বইয়ের প্রায় শুরুতেই যোজনা করেছেন একটি কবিতারূপে।ইয়ের নামেই কবিতার নাম কিংবা উল্টোটাই সত্য। এভাবে মননশীল লেখার সঙ্গে সৃজনশীল উপাদান যূথবদ্ধরূপে আত্মপ্রকাশের ফলে আবারও এই বইয়ের দ্বান্দ্বিক মর্ম আবারও উন্মোচিত হয়। টিপু নভেরার জীবন ও কাজ ব্যাখ্যা করছেন নৈর্ব্যক্তিকভাবে। কিন্তু আবার যেন ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন। সুসান সনটাগের বিখ্যাত তত্ত্বায়ন এগেইনস্ট দ্য ইন্টারপ্রিটেশন প্রসঙ্গ আমাদের মনে পড়ে যায়। সৃজনশীল কাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সম্পর্কিত করার প্রচলিত তরিকার সাথে আরো কিছু মিলিয়ে দিয়েছেন টিপু। এর ফলে নভেরার রূপ কেবলি নভেরার জীবন ও কাজ নিয়ে চৌকশ ব্যাখ্যার খোপেই আটকে নেই। এই বইয়ে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি আধুনিক শিল্পী [ভাস্কর] নভেরা আহমেদের পৌরাণিক জীবনের প্রতি এক প্রকার বিমুগ্ধ শ্রদ্ধাঞ্জলিও রচনা করেছেন টিপু। অতএব সাখাওয়াত টিপুর উচ্চারণ এখানে উদ্ধৃতিযোগ্য :

টুকরো লোহার খাঁজে টুকে রাখা আর্দ্র
না-রাজ নীতির খোপে ডুবেছে সমুদ্র
তারারা নমিত আজ দেহাতি শিলায়
নভেরার খেরো রূপ ছায়া হেঁটে যায়   [পৃ.১৩]

‘বুনোর আত্মপরিচয়’ লেখাটিতে আমরা অবারও জেনে যাই নভেরা আহমেদের ডাক নাম বুনো। উত্তরকালে বুনোর ফরাসি প্রেমিক গ্রেগোয়া দ্য ব্রুনস নভেরা আহমেদের সত্তার স্বরূপতত্ত্ব কী ভাষায় চিহ্নিত করেছেন তা টিপু আমাদের অবহিত করেছেন। নভেরা নাকি ‘জঙ্গলের বুনো চিতার মতো’! টিপু নভেরার বিশেষ বিশেষ কাজ নিয়ে ক্লোজ রিডিং বা নিবিড় পাঠ হাজির করেন নি। টিপু বরং বাংলাদেশের চারুশিল্পে আধুনিকতা উন্মেষের ধারণাকে বিস্তারিত পটভূমি হিসেবে নিয়ে সেখানে নভেরাকে সামগ্রিকভাবে স্থাপন করতে চেয়েছেন। এই আধুনিক শিল্পের মণ্ডলে ভাস্কর নভেরার স্থান ও অবস্থান নির্ণয়ে টিপু নিকটতম তুলনা হিসেবে শিল্পী জয়নুল আবেদিনের নাম নিয়েছে :

ভাস্কর নভেরার শিল্পের উন্মেষ ঘটে পাক-উপনিবেশ আমলে। জয়নুল আর নভেরা—দুজন মহান শিল্পীর শিল্পের প্রকরণ-কৌশল প্রায় পশ্চিমাই। দুজনেই পুব আর পশ্চিমের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন; যা উপাদানের স্থানিকতার সঙ্গে পশ্চিমা শিল্পের কৃৎকৌশল বটে! […] আধুনিক শিল্পকাঠামোর সঙ্গে পুবের উপাদান মিলিয়ে নতুন শিল্প প্রকরণ সৃষ্টি কম কথা নয়। সেই সৃষ্ট ক্যানভাসের চিত্রকলায় প্রথম জয়নুল আর ভাস্কর্যে প্রথম নভেরা।   [পৃ.১৮]

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন নভেরা আহমেদের প্রথম প্রদর্শনী ‘ইনার গেইজ’কে ‘ছোটখাট বিপ্লব’ অভিহিত করেছেন। এই প্রসঙ্গে জয়নুলকে টিপুর উদ্ধৃত করার অর্থ হলো নভেরার আত্মপ্রকাশকে লেখক নিজেও একটি বিপ্লব হিসেবেই গণ্য করতে চান। কেননা অপরকে সদর্থে উদ্ধৃত করার অর্থ হলো প্রতিষ্ঠিতকে দোহাই দিয়ে নিজের ভাষ্যের সপক্ষে পর্যাপ্ত যুক্তি ও ভাবনা বিস্তার করা। এক্ষেত্রে জয়নুল আবেদিন উদ্ধৃতির জন্য অবিসংবাদিত উৎস। এভাবে সাখাওয়াত টিপু প্রস্তাব করছেন, বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পে নভেরা আহমেদ এক বৈপ্লবিক নাম।


দিঙ্‌নাগ তিনটি অবয়বের কথা বলেন : প্রতিজ্ঞা [প্রেমিস], হেতু ও উদাহরণ। 


এই ‘বৈপ্লবিকতা’ মার্কসবাদী রাজনীতির গূঢ় অর্থে নয়। এই ‘বৈপ্লবিকতা’ নন্দনের যে রাজনীতি আছে সেই অর্থে। আমাদের শিল্পে ‘আধুনিকতা’ তার ভেতরে আবার ‘বৈপ্লবিকতা’র এই খোঁজকে আমরা একটি বড় ক্ষেত্রে স্থাপন করে বুঝতে চাইতে পারি সাখাওয়াত টিপুর শিল্প-সমালোচনার ভাবভঙ্গি।

২.
সাখাওয়াত টিপু প্রণীত নভেরার রূপ বইয়ে অঙ্কুরিত তার সমালোচনার প্রণালি সম্পর্কে একটি ভাষ্য প্রস্তুত করতে আমাদের প্রয়োজন হলো বাংলাদেশের শিল্পকলায় আধুনিকতা কী এবং কিভাবে তা চিহ্নিত হয়েছে সেটি তলিয়ে খুঁজে দেখা। এই খোঁজের জন্য এদেশের শিল্প-সমালোচনার ডিসকোর্সে বিচরণ প্রয়োজন। এবং সেই লক্ষ্য নিয়ে এখানে আমরা বুঝতে চাইতে পারি আধুনিকতার মর্মার্থ কী? ‘নতুন’ [দ্য নিউ] কে প্রধান প্রত্যয় ধরে নিয়ে জার্মান তাত্ত্বিক বাল্টার বেনজামিন সামনে নিয়ে এসেছেন ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের ‘ফ্ল্যানুর’কে, যে একই সাথে পর্যবেক্ষক ও ভোক্তা হিসেবে বিরাট শহর ঘুরে বেড়িয়ে পরিবর্তন ও পণ্যায়ন মোকাবিলা করে হয়ে উঠেছে দ্য পেইন্টার অফ মডার্ন লাইফ। যদিও আধুনিকতার ইমেজ গভীরভাবেই দ্ব্যর্থবোধক। বিশেষত বেনজামিনের আলোচনার সূত্রেই আমরা আধুনিকতার লক্ষণ তখনই বুঝে উঠতে পারছি যখন শুনতে পাই বোদলেয়ার ল্য ফ্লর দু মাল কবিতায় ব্যক্ত করছেন সেই নান্দনিক প্রয়োজনীয়তা যাতে দেখা যায় ‘নতুন কোনো কিছুর খোঁজে অজ্ঞাতের তলদেশে নিমজ্জন’ [“plunge into the depths of the unknown in order to find something new”]। এমনকি শিল্পী মানেঁ ও বিভিন্ন আভাঁগার্দ শিল্পান্দোলনে উদ্বোধিত হয়েছে আধুনিকতার মূল সূত্র ‘নতুনের চর্চা’ [“tradition of the new”]

বাংলাদেশের শিল্পে আধুনিকতাস্বরূপ এই ‘নতুনত্ব’ কিভাবে চিহ্নিত হয়েছে সেই বিচারের প্রণালি অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে আমাদের কনটেক্সচুয়ালাইজড করতে হয় দক্ষিণ এশিয়ার দর্শনগত বিচার-প্রণালির সাথে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মারফতে জানা যায় “[সম্রাট] অশোকের সময় কথাবস্তু নামে একখানি বৌদ্ধদের বিচারগ্রন্থ লেখা হয়। উহাতে বিচার করিয়া বৌদ্ধদের সমস্ত মত স্থাপন করা হয়। […] উহার বিচার-প্রণালি বিচিত্র। […] একটা কথা উঠিল, সঙ্গে সঙ্গে অনেক ফেকড়ি উঠিল, সব ফেকড়ি উদ্ধার করিয়া তবে মূলকথার বিচার হইল। মীমাংসকদের বিচার-প্রণালি আর একরকম। ১. সন্দেহ। ২. বিষয়। তাহার পর পূর্বপক্ষ, তাহার পর উত্তর। তাহার পর নির্ণয়। এই পাঁচটির নাম অধিকরণ। কিন্তু মহাযানীরা ঠিক ইংরেজি সিলজিসম মতো কথা কহিত, উহাতে বিচারটা বেশ পরিষ্কার হইয়া যাইত”। আবার, নাগার্জুনের প্রায় দুই শ বছর পর, বৌদ্ধ ন্যায়শাস্ত্রের যথার্থ প্রবর্তক খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষ দিকে জন্মগ্রহণকারী ‘তর্ক-পুঙ্গব’ নামে খ্যাত আরেক বিশিষ্ট নৈয়ায়িক দিঙ্‌নাগ পূর্ববর্তী বিচার-প্রণালির রূপান্তর সাধন করেন এবং সংক্ষিপ্ততার প্রণালিতে বিচারের ধারা গঠন করেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী জানান, দিঙ্‌নাগ বিচার-প্রণালির লক্ষ্যস্বরূপ প্রমাণকে দুইভাগে ভাগ করেন—প্রত্যক্ষ আর অনুমান। শাস্ত্রী মহাশয় দিঙ্‌নাগের বিচার-পদ্ধতির সাথে বর্তমানের ইউরোপীয় লজিক পারসেপশন ও ইনফারেন্স-এর মতন বলে অভিমত দিয়েছেন। প্রমাণিত অনুমান সম্পর্কে ভাষার প্রয়োগকে ‘অবয়ব’ বলা হয়। দিঙ্‌নাগ তিনটি অবয়বের কথা বলেন : প্রতিজ্ঞা [প্রেমিস], হেতু ও উদাহরণ। প্রথমটিতে পক্ষ ও সাধ্য নির্দেশ, দ্বিতীয়টিতে হেতু নির্দেশ ও তৃতীয়টিতে সাধ্য ও হেতুর মধ্যে ব্যাপ্তি দেখানো।


‘শহীদ মিনারের নকশা হামিদুর রাহমান আর নভেরা আহমেদের যৌথ চিন্তাপ্রসূত’


বাংলাদেশে শিল্পের আধুনিকতার বিচারে সাঈদ আহমদ দিঙ্‌নাগ প্রবর্তিত তিনটি অবয়বের মধ্যে প্রতিজ্ঞা পেশ করেছেন ও প্রয়োজনীয় উদাহরণ দিয়েছেন। সবসময় হেতু নির্দেশ করেন নি। এই প্রণালিতেই সাঈদ নান্দনিকতার নীতিমালা প্রয়োগ করেছেন সমালোচনায়। সন্তোষ গুপ্তের সমালোচনায় আধুনিকতার খোঁজের সাথে মীমাংসকদের বিচার-প্রণালির সাযুজ্য দেখা যায়। তিনি প্রথমে সন্দেহ পোষণ করেন। তারপর মূল বিষয় উত্থাপন করেন। এরপর আলোচনা বিস্তারের মাধ্যমে উত্তর নির্ণয় করেন। এই প্রণালিতে বিষয়ের পর্যালোচনার ভাবাদর্শ হিসেবে মার্কসবাদী পদ্ধতির স্থানীয় করণের আশ্রয় নেন। কথাবস্তুর অন্তর্গত বিচার-প্রণালি অনুযায়ী একটা ‘কথা’ তুলে, এর সঙ্গে অনেক ‘ফেকড়ি’ জুড়ে সব ফেকড়ি উদ্ধারের পর তবে মূলকথার বিচারে ব্রতী হন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। অনেকটা মহাযানী ও ইংরেজি সিলজিসম প্রণালির মিশ্রণে জাহাঙ্গীর সমাজতাত্ত্বিক শ্রেণি ও উত্তর-ঔপনিবেশিক চৈতন্যে শিল্প-সমালোচনা হাজির করেন। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সমালোচনা-পদ্ধতিতে লক্ষ করা যায় নান্দনিকতার বিধিমালাকে পদ্ধতির কেন্দ্রীয় বিষয় রূপে গ্রহণ করে শিল্পের মূল্য বিচারের প্রচেষ্টা। যদিও নান্দনিকতার শাস্ত্রীয় অবস্থান থেকে আধুনিকতা চিহ্নিত করতে সচেষ্ট এমন পথিকৃত সমালোচক হলেন সাঈদ আহমদ। অন্যদিকে মোস্তফা জামান বিভিন্ন সমালোচনা-পদ্ধতির সংশ্লেষ ঘটিয়ে শিল্পকর্মের নিবিড় পাঠ-পাঠান্তর করে এদেশে শিল্প-সমালোচনার মানচিত্র বিস্তৃত করেছেন। এবাদুর রহমান জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে শিল্প-সমালোচনা চর্চার মাধ্যমে মোস্তফা জামানসহ অন্যান্যদের যে স্কুলিং তৈরি হয়েছে তাতে দিয়েছেন বেগ ও আবেগ। এই পরম্পরায় আমরা স্থাপন করতে পারি সাখাওয়াত টিপুর সমালোচনা-প্রণালিকে এবং অবশ্যই তার এই আলোচিত পুস্তিকা নভেরার রূপ-কেও।

সন্তোষ গুপ্ত চর্চিত মার্কসবাদী সমালোচনার স্থানীয় পদ্ধতির সাথে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতির একটি মিনিমালিস্ট সম্পর্ক ঘটলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় তা সাখাওয়াত টিপুর সমালোচনায় কিছুটা ফুটে ওঠে। এক ধরনের জাতীয়তাবাদী মনোভঙ্গি প্রযোজনীয়ভাবেই এই বইয়ে টিপু প্রযোগ করেছেন। বাংলাদেশের জাতীয় শহীদ মিনারের মূল নকশাকার কে? এই বিতর্কে সোৎসাহে ও উল্লাসে যোগ দিয়েছেন টিপু। উপাত্ত হাজির করে সাখাওয়াত টিপুর শেষ সিদ্ধান্ত—‘শহীদ মিনারের নকশা হামিদুর রাহমান আর নভেরা আহমেদের যৌথ চিন্তাপ্রসূত’। যদিও তাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর ঘোষণা করেছেন, ‘শহীদ মিনারের মূল নকশা নভেরাই করেছে’।

স্থূল গদ্যের বিপরীতে চৌকশ ও ছোট বাক্যবিন্যাসে রচিত, দার্শনিক প্রত্যয়ে দীপ্ত এবং তার্কিক প্রণালি দ্বারা শানিত এই পুস্তিকাটি যদি আরো বিস্তারিত হতো তাহলে আমাদের কান্তিবিদ্যার প্রগতির জন্য আরও কতই না ভালো হতো। তথাপি সাখাওয়াত টিপু রচিত নভেরার রূপ বাংলাদেশের আধুনিক নন্দনতত্ত্বের অনুশীলনে একটি তীক্ষ্ণ তির যোজনা করেছে বলে ভাবি।

smoishan@yahoo.com'

শাহমান মৈশান

নাট্যকার, নির্দেশক, অনুবাদক ও শিল্প-সমালোচক। সহকারী অধ্যাপক, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি-তে অধ্যয়নরত।
smoishan@yahoo.com'