হোম বই নিয়ে কাহলিল জিবরানের THE MADMAN : কয়েকটি প্যারাবল

কাহলিল জিবরানের THE MADMAN : কয়েকটি প্যারাবল

কাহলিল জিবরানের THE MADMAN : কয়েকটি প্যারাবল
812
0

[১৮৮৩ সালে কাহলিল জিবরান লেবাননের উত্তরে এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কাহলিল; ট্যাক্স কালেক্টর ছিলেন। মায়ের নাম ছিল ক্যামিলা রামেহ। ১৮৯৫ সালে জিবরানের মা তার চার সন্তানকে নিয়ে জীবিকার তাগিদে বোস্টনে পাড়ি জমান। ১৮৯৮ সালেই জিবরান আবার লেবাননে চলে আসেন আরবি এবং ফ্রেঞ্চ শেখার জন্যে। আবারও বোস্টনে ফিরে যান তিনি আরো ৪ বছর পরে, ১৯০২ সালে। এর মাঝে যক্ষ্মা ও ক্যান্সারের কারণে তিনি হারিয়ে ফেলেন তার এক বোন, এক ভাই এবং মাকে। ১৯০৮ সালে তিনি পাড়ি জমান প্যারিসে, আর্টের জন্যে। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় তার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম The Prophet। এই বই সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন, ‘the most loving book ever written.’ ১৯৩১ সালে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে নিউইয়র্কের এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অতঃপর তার দেহ নিয়ে যাওয়া হয় লেবাননে। উল্লেখ্য, ১৯১৮ সালে প্রকাশিত The Madman তার প্রকাশিত প্রথম ইংরেজি সাহিত্যকর্ম।]


The new pleasure

গতরাতে আমি নতুন এক আনন্দের সন্ধান পাই; এবং প্রথমবারের মতো যখন সেটা পরখ করতে গেলাম একজন দেবদূত ও একজন শয়তান দ্রুত বেগে আমার গৃহের দিকে আসতে লাগলেন। আমার দরজার সম্মুখেই তাদের সাক্ষাৎ হয় এবং আমার নতুন ‘আনন্দ’কে নিয়ে তুমুল তর্কে লিপ্ত হন দুজন।

একজন তীব্র অনুযোগের স্বরে বললেন, ‘এইটা পাপ!’

অন্যজন বলে উঠলেন, “না, এইটা পুণ্য!”


The two learned men

আফকার নামক শহরে দুজন শিক্ষিত লোক বসবাস করতেন এবং দুজনেই একে অপরের শিক্ষাকে চরম ঘৃণার চোখে দেখতেন। তাদের একজন ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতেন এবং অন্যজন ছিলেন পুরোদমে আস্তিক।

একদিন বাজারে তাদের দুজনের দেখা হয় এবং অনুসারীদের সামনেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে তুমুল যুক্তি-তর্কে মেতে ওঠেন। এবং কয়েক ঘণ্টা বচসার পরে দুজন ক্ষান্ত দেন।

ওই সন্ধ্যাতেই …

যিনি নাস্তিক ছিলেন, তিনি মন্দিরে গমন করে নিজেকে সমর্পণ করেন ঈশ্বরের সামনে এবং নিজের অতীতের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ঠিক এই সময়েই, অপর শিক্ষিত লোক, যিনি ছিলেন পুরোদমে ঈশ্বরে বিশ্বাসী, পুড়িয়ে ফেলেন তার সকল পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থাবলী। অতঃপর, তিনি হয়ে যান সম্পূর্ণ নাস্তিক।

42301357_522479508178044_6604413426292752384_n
কাহলিল জিবরান

The good God and the evil God

পাহাড়ের এক চূড়ায় মঙ্গলের দেবতা এবং অনিষ্টের দেবতার সাক্ষাৎ হয়। মঙ্গলের দেবতা বললেন, ‘শুভ সকাল, ভ্রাতা!’

অনিষ্টের দেবতা কোন জবাব দিলেন না। এবং মঙ্গলের দেবতা আবারো বলেন, ‘আজকে মন খারাপ মনে হচ্ছে!’

‘হুম’ বললেন অনিষ্টের দেবতা, ‘প্রায়ই মানুষ আমাকে তুমি মনে করে তোমার নামে ডাকে, আমাকে তোমায় ভেবে তোমার মতো করে আচরণ করে এবং এটা আমাকে পীড়া দেয়।’

মঙ্গলের দেবতা তখন বললেন, ‘কিন্তু আমাকেও তো তুমি ভেবে ভুল করা হয়!’

অতঃপর, অনিষ্টের দেবতা মানুষের বোকামিকে অভিশাপ দিয়ে হন হন করে চলে গেলেন।


Ambition

সরাইখানার টেবিলে তিনজন লোক মিলিত হলেন; একজন তাঁতি, একজন কাঠমিস্ত্রি এবং একজন কৃষক।

তাঁতি বলে উঠলেন, ‘আমি আজকে সবচেয়ে ভালো শবাচ্ছাদন বস্ত্র বিক্রি করেছি দুটো স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে। চলো, কিছু পান করা যাক!’

‘এবং আমি’, কাঠমিস্ত্রি বললেন, ‘আমি আজকে সর্বোৎকৃষ্ট কফিন বিক্রি করেছি। মদের সাথে রোস্ট নেব আজকে।’

কৃষক বললেন, ‘আমি শুধু একটা কবরই খুঁড়েছি, কিন্তু মালিক আমাকে দিগুণ পরিশোধ করেছেন। তাই মধু কেকও নেয়া যাক সাথে।’

সে সন্ধ্যায় পানশালাটা খুবই ব্যস্ত ছিল; বারে বারে মদ, মাংস আর কেক আসছিল টেবিলে। এবং তারা তিনজনই খুবই উৎফুল্ল ছিল।

সরাইরক্ষক তার হাত কচলাচ্ছিলেন এবং স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছিলেন, কেননা অতিথিরা হাত খুলে খরচ করছিলেন।

তারা যখন চলে যাচ্ছিল আকাশে তখন পূর্ণ চাদ এবং তারা গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে এবং চিৎকার করতে করতে হাঁটছিল। সরাইরক্ষক তার স্ত্রীর সাথে সরাইখানার ফটকে দাঁড়িয়ে তাদেরকে দেখছিলেন।

‘আহ!’ স্ত্রী বললেন, ‘ভদ্রলোকেরা! বড়ই খরচে এবং বড়ই প্রাণচঞ্চল! তারা যদি প্রতিদিন এমন সৌভাগ্য নিয়ে আসত, তাহলে আমাদের ছেলেকে আর সরাইরক্ষক হতে হতো না এবং এত কষ্ট করতে হতো না। আমরা তাকে পড়ালেখা করাতাম এবং একদিন সে একজন যাজক হতো।’


42282126_208667979857595_5098836095496355840_n
কাহলিল জিবরানের সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রন্থ।

The wise king

কোনো একসময় উইরানি নামক এক দূরবর্তী শহরে এক প্রতাপশালী ও জ্ঞানী রাজা শাসন করতেন। তার শক্তিমত্তাকে সবাই যেমন ভয় পেত, তেমনি ভালোবাসত তার বিজ্ঞতাকে।

তো, সেই শহরের প্রাণকেন্দ্রেই ছিল একটি কুয়ো; যেমন ঠান্ডা ছিল এর পানি তেমন ছিল স্বচ্ছ। শহরের সকল অধিবাসীরা এমনকি রাজা স্বয়ং এই কুয়ো থেকে পানি পান করতেন, যেহেতু রাজ্যে আর কোনো কুয়ো ছিল না।

এক রাত্রে, যখন সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন তখন এক ডাকিনি প্রবেশ করে শহরে; কুয়োর পানিতে সে অদ্ভুত ধরনের সাত ফোঁটা তরল ছেড়ে দেয় এবং বিড়বিড় করে বলে, ‘এই মুহূর্তে হতে যে এই পানি পান করবে সে বদ্ধ উম্মাদে পরিণত হবে।’

পরেরদিন সকালে, শুধুমাত্র রাজা এবং তার গৃহাধ্যক্ষ ছাড়া সবাই সেই কুয়োর পানি পান করল এবং সকলেই ডাকিনির কথা মতো পাগল হয়ে গেল।

সেদিনই শহরের অলিতে-গলিতে, বাজারে-বন্দরে সবখানেই অধিবাসীরা সকল কাজকর্ম বাদ দিয়ে শুধু ফিসফিস করছিল, ‘আমাদের রাজা পাগল হয়ে গিয়েছেন। তিনি এবং তার গৃহাধ্যক্ষ সকল যুক্তি খুইয়েছেন। আমরা কোনোভাবেই একজন পাগল রাজার অধীনে থাকতে পারি না, আমাদেরকে অবশ্যই তাকে সিংহাসনচ্যুত করতে হবে।’

ওই সন্ধ্যাতেই রাজা আদেশ দিলেন তার স্বর্ণালি পানপাত্রটি দিয়ে কুয়ো থেকে পানি আনতে। অতঃপর রাজা এবং তার গৃহাধ্যক্ষ সেই পানি পান করলেন।

এবং অবশেষে উইরানি নামক ঐ দূরবর্তী শহরে আবারো শুরু হল আনন্দ উৎসব, কেননা, রাজা ও তার গৃহাধ্যক্ষ তাদের চেতনা ফিরে পেয়েছেন।


The Pomegranate

এককালে, যখন আমি এক ডালিমের মাঝে বসবাস করছিলাম, আমি শুনলাম এক বীজ বলছে, ‘এক সময় আমি এক শক্তিশালী বৃক্ষে পরিণত হব এবং বাতাস আমার ডালে গান গাইবে, সূর্য আমার পাতায় নাচবে এবং প্রতিটা ঋতু জুড়েই আমার সৌন্দর্য অটুট থাকবে।’

আরেকজন তখন কথা বলে উঠল, ‘যখন আমি তোমার মতোই তরুণ ছিলাম, আমিও এমন স্বপ্ন দেখতাম। এখন আমি বুঝি এবং জানি, আমার সকল আশাই ভেস্তে গেছে!’

তৃতীয়জন বলল, ‘আমি তো অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জন্যে সম্ভাবনামূলক কিছুই দেখি না।’

চতুর্থজন বলল, ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ব্যতীত আমাদের জীবন কি একটা উপহাসেই না পরিণত হবে!’

পঞ্চম জন বলল, ‘যখন আমরা জানিই না আমরা কী, তখন কী হব এটা নিয়ে কেন খামোখা তর্ক করছি?”

কিন্তু, ষষ্ঠজন উত্তর দিল, ‘আমরা যা আছি তাই থাকব।’

এবং সপ্তমজন বলে উঠল, ‘আমি খুব ভালো করে জানি কিভাবে কী হবে, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।’

তারপর অষ্টমজন বলল, পরে নবমজন, পরে দশমজন এবং ধীরে ধীরে সবাই বলতে শুরু করল। এবং আমি কারো কণ্ঠ আলাদা করতে পারছিলাম না।

এবং ওইদিনই আমি একটা কুইন্সের ভিতরে প্রবেশ করি, যেখানে বীজের সংখ্যা ছিল অল্প এবং সবকিছু প্রায় নীরবই ছিল।

[কুইন্স নাশপাতির মতো একধরনের ফল]

42324425_705255376507792_6616455659892244480_n
কাহলিল জিবরানের আঁকা ছবি।

On the strips of the temple

গত সন্ধ্যায়, মন্দিরের সিঁড়িতে দুই পুরুষের মাঝে আমি এক মহিলাকে বসে থাকতে দেখলাম।

মহিলার মুখাবয়বের এক পাশ ছিল বিষণ্ণ, অন্যদিকটা ছিল লজ্জায় আরক্তিম।


The grave-digger

একদা, আমার এক মৃত আত্মাকে কবর দিচ্ছিলাম, তখন এক গোরখোদক পাশে এসে বলল, ‘এখানে যতজন কবর দিতে আসে তাদের মধ্যে তোমাকেই আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ।’

শুনে খুব খুশি হয়েই বললাম, ‘কিন্তু কেন আপনি পছন্দ করেন?’

‘কারণ,’ প্রত্যুত্তরে বলল সে, ‘সবাই কাঁদতে কাঁদতে আসে, কাঁদতে কাঁদতে যায়; শুধুমাত্র তুমিই আসার সময়ও হাসো, যাওয়ার সময়ও হাসো।’

42409901_238293903699033_350385545131589632_n
কাহলিল জিবরানের আঁকা ছবি।

The sleep-walkers

যে শহরে আমার জন্ম হয়েছিল সেখানে এক মহিলা তার মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন এবং তারা দুইজনেই ঘুমের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করত।

এক রাতে, যখন পুরো পৃথিবী নীরবতায় ডুবে আছে, তারা দুজন ঘুমের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে তাদের কুয়াশাচ্ছন্ন বাগানে এসে মিলিত হলো। মা বলে উঠলেন, ‘অবশেষে, আমার শত্রুর দেখা পেলাম! তোর কারণে আমার যৌবন নষ্ট হয়েছে—যে তার নিজের জীবন গড়েছে আমারটা নষ্ট করে। তোরে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে!’

এবার কন্যাটাও মুখ খুলল, ‘আরে তুই সেই স্বার্থপর ঘৃণ্য বুড়ি! যে আমার নিজের জীবন ও স্বাধীনতার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে! যে আমার জীবনটা তার বিষণ্ণ জীবনের ছায়ায় গড়ে তুলছে! মরিস না কেন তুই?’

ঠিক এই সময় এক মোরগের ডাকে তাদের ঘুম ভেঙে গেল।

মা খুব আদুরে গলায় বললেন, ‘এইটা তুমি, ডার্লিং?’

‘হুম মা!’ শান্তভরে জবাব দিল মেয়েটা।


The fox

সূর্যোদয়ের মুহূর্তে এক খেঁকশিয়াল নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে ভাবল, ‘আজকে লাঞ্চের জন্যে একটা উট লাগবে!’

সারাটা সকাল হন্য হয়ে উট খোঁজাখুঁজি করল এবং দুপুরে আবারও নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে চিন্তা করল, ‘নাহ! ইঁদুরেই চলবে!’

42322595_924252361097385_389035333058035712_n
কাহলিল জিবরানের আঁকা ছবি।

God

আদিকালে, যখন প্রথমবারের মতো শব্দের কম্পনে আমার ঠোঁট কম্পিত হল, আমি আরোহণ করি পবিত্র পাহাড়ে এবং ঈশ্বরের সাথে কথা বলি, ‘প্রভু, আমি তোমার দাস। তোমার গোপন ইচ্ছাই আমার জন্যে আইন এবং আমি অবশ্যই তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।’

ঈশ্বর কোনো উত্তর দিলেন না এবং প্রবল ঝড়ের ন্যায় চলে গেলেন।

এবং আরও হাজার বছর পরে আমি আবারও সেই পবিত্র পাহাড়ে চড়ে ঈশ্বরের মুখোমুখি হই, ‘স্রষ্টা, আমি তোমারই সৃষ্টি। মাটি থেকে তুমি আমাকে গড়ন দিয়েছ এবং আমি সর্বোপরি তোমার কাছে ঋণী।’

এবং ঈশ্বর এবারও কোনো উত্তর দিলেন না এবং ক্ষিপ্রগতির ডানার ন্যায় চলে গেলেন।

আরও হাজার বছর পরে আমি আবারো চড়ি পবিত্র সে পাহাড়ে এবং ঈশ্বরের কাছে আবারও বলি, ‘পিতা, আমি তোমার পুত্র! কৃপা এবং ভালোবাসা দিয়ে তুমি আমায় জন্ম দিয়েছ এবং ভালোবাসা আর ভক্তি দিয়ে আমি তোমার রাজত্বের উত্তরাধিকারী হব।’

এবারও ঈশ্বর কোনো উত্তর দিলেন না, দূর পাহাড়ের অবগুণ্ঠনকারী কুয়াশার ন্যায় চলে গেলেন।

এবং হাজার বছর পরে আমি আবারও পবিত্র পাহাড়ে আরোহণ করি, ঈশ্বরের পানে চেয়ে বলে উঠি, ‘ঈশ্বর, তুমি আমার স্বপ্ন এবং আমার পূর্ণতা; আমি তোমার অতীত এবং তুমিই সৃষ্টি কর আমার ভবিষ্যৎ । পৃথিবীর বুকে আমি তোমারই মূল এবং তুমিই আকাশে ফোটাও আমার ফুল এবং একসাথে আমরা সূর্যের সম্মুখে বেড়ে উঠি।’

এবং অতঃপর ঈশ্বর ঝুঁকে পড়লেন আমার দিকে এবং মৃদু কণ্ঠে শোনালেন মাধুর্যের শব্দ। এমনকি তার নিচ দিয়ে প্রবাহিত যে ছোট নদী সেও আমাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল।

এবং যখন আমি নেমে আসি উপত্যকায়, সমতলের দেবতাকেও সেখানে দেখতে পাই।

42321849_268818677083463_6490546928378445824_n
কাহলিল জিবরানের আঁকা ছবি।

The other language

আমার জন্মের তিনদিনের মাথায় আমার মা নার্সকে জিগ্যেস করেছিলেন, ‘আমার বাছাধন কেমন আছে?’

আমি তখন দোলনায় দোল খেতে খেতে অবাক বিস্ময়ে দেখছিলাম নতুন পৃথিবীটাকে। পাশে থেকে নার্স জবাব দিয়েছিল, ‘অবস্থা ভালো ম্যাডাম; তিন বেলা করেই খাওয়ানো হচ্ছে এবং ওর মতো উৎফুল্ল বাচ্চা আমি খুব কমই দেখছি।’

কথাটা শুনে আমার খুব রাগ হচ্ছিল; কাঁদতে কাঁদতে মা’কে ডাক দিলাম, ‘না, আমি ভালো নেই আম্মা! বিছানাটা খুব শক্ত, দুধটাও খেতে ভালো লাগছে না, আর স্তনের গন্ধটাও খুব বিচ্ছিরি!’

কিন্তু, আমার কান্নার ভাষাটা তারা কেউই বুঝল না; কেননা আমি কথা বলছিলাম অন্য জগতের ভাষায়!

জন্মের একুশ দিনের মাথায় আমাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দিয়ে আমার নাম রাখা হয়। যাজক যাওয়ার সময় আমার মা’কে বলে গেলেন, ‘আপনি খুবই ভাগ্যবান যে, আপনার সন্তান জন্মগতভাবেই একজন খ্রিস্টান।’

আমি অবাক হয়ে যাজককে বললাম, ‘ও! তাহলে তো তোমার স্বর্গীয় মা খুবই দুর্ভাগ্যবান! কেননা তুমি তো আর জন্মগত খ্রিস্টান না।’ কিন্তু যাজকও আমার কথা বুঝলেন না।

আরও অনেক দিন পর এক জ্যোতিষীর সাথে আমার মায়ের দেখা হলো। আমাকে দেখে সে ভবিষ্যৎবাণী করল, ‘ও বড় হয়ে একজন রাজনীতিবিদ হবে, মানুষের নেতা হবে—দেখবেন।’

সাথে সাথে আমি তীব্র প্রতিবাদ জানালাম, ‘না, এটা ভুল! আমি বড় হয়ে মিউজিসিয়ান হব—আর কিছুই না!’

অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, তখনো তারা কেউই আমাকে বুঝে নাই।

এই জ্যোতিষের সাথে আমার আবার দেখা হয়েছিল আরও তেত্রিশ বছর পর এক মন্দিরের সামনে; মা, নার্স, যাজক—তারা কেউই তখন আর বেঁচে নেই। বেচারা আমাকে বললেন, ‘আমি জানতাম তুমি একদিন অনেক বড় মিউজিসিয়ান হবে! এমনকি তোমার শৈশবেই আমি এটা বলেছিলাম।’

এবং এই জ্যোতিষের কথা আমি সেদিন পুরোপুরিই বিশ্বাস করি। কেননা, অন্যজগতের সেই ভাষাটা এখন আর আমার মনে নেই, ভুলে গিয়েছি।


How I Became a Madman

জানতে চেয়েছিলে, কিভাবে আমি উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম। ঘটনাটা এভাবে ঘটে—

একদিন, বহু দেবতার জন্মেরও অনেক পূর্বে—গভীর এক ঘুম থেকে জেগে ওঠে আবিষ্কার করি আমার মুখোশগুলো চুরি হয়ে গিয়েছে। আমার সাতটা মুখোশ, যা আমি সাত জনমে পরেছিলাম।

মুখোশহীন অবস্থায়, ‘চোর, চোর, অভিশপ্ত চোর!’—চিৎকার করতে করতে আমি রাস্তায় দৌড়াতে থাকি। নারী-পুরুষ সকলে আমাকে দেখে হাসতে থাকে এবং কেউ কেউ ভয়ে পালিয়ে যায় ঘরের দিকে।

এবং বাজারে ঢোকা মাত্রই দালানের উপর থেকে এক বালক চিৎকার করে বলল, ‘পাগল!’

আমি ঊর্ধ্বনয়নে তার দিকে তাকাই এবং প্রথমবারের মতো সূর্য আমার উলঙ্গ চেহারায় চুম্বন করে। এতেই সূর্যের আলোতে ভালোবাসায় উদ্ভাসিত হয় আমার আত্মা এবং আমি মুখোশগুলোও আর চাই নি।

‘ধন্যবাদ চোর—যে চুরি করেছ আমার মুখোশ!—বলে আমি কাঁদতে থাকি।

এইভাবেই আমি হয়ে গেলাম পাগল।

এই পাগলামিতেই আমি পেয়েছি স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা।

একাকিত্বের স্বাধীনতা এবং কেউ বুঝে ফেলার থেকে নিরাপত্তা, কেননা সেটা দাসত্বের শৃঙ্খল।

তবে, আমার নিরাপত্তা নিয়ে খুব একটা নিরাপদ-বোধ করি না, এমনকি কারাগারে একজন চোর আরেকজন চোরের কাছ হতে নিরাপদ।

42361331_670927956611970_4112452849735041024_n
কাহলিল জিবরান

The wise dog

এক বিড়াল-দলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক বিজ্ঞ কুকুর এবং ব্যস্ত বিড়ালদের কেউই তাকে লক্ষ করে নি।

অতঃপর, দলের মধ্যস্থল থেকে বিরাটকায় এক গম্ভীর বিড়াল দাঁড়ালেন এবং সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘ভাইয়েরা, প্রার্থনা কর; যখনই কোনো ধরনের সংশয় ছাড়া বারেবারে প্রার্থনা করবে, ঠিক তখনই ‘ইঁদুর বৃষ্টি’ হবে!’

এবং, এ প্রার্থনা শুনে মনে মনে হেসে উঠলেন সেই বিজ্ঞ কুকুর; তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘হায়রে অন্ধ ও বোকার দল! এটা কী লেখা নেই এবং এটা কী আমাদের পূর্বপুরুষদের মাধ্যমে জানতাম না যে, বিশ্বাস ও প্রার্থনার মাধ্যমে যে বৃষ্টি হয় সেটাতে ইঁদুর নয়, বরং হাড় পাওয়া যায়!’


The Eye

দূরের নীলাভ কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ের দৃশ্যে মোহিত দুচোখ বলে উঠল, ‘পাহাড়টা অসাধারণ, তাই না?’

মনোযোগ দিয়ে কান শোনার চেষ্টা করল—‘কিন্তু, আমি তো কিছু শুনতে পাচ্ছি না!’

স্পর্শের শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হাতও বলল, ‘কই? কিছুই খুঁজেই পাই না।’

এবং নাক—কোনো গন্ধ না নিতে পেরে বলল, ‘কোনো পাহাড় নেই; গন্ধই তো পেলুম না।’

অতঃপর, আমার চোখ জোড়া দৃষ্টি ফেলল অন্যদিকে এবং সবাই মিলে চোখের এই অদ্ভুত বিভ্রম নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন, ‘নাহ! চোখের কিছু একটা অবশ্যই হয়েছে!’

সহুল আহমদ

জন্ম ২৬ আগস্ট, ১৯৯১; সিলেট।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।

প্রকাশিত বই—
‘মুক্তিযুদ্ধে ধর্মের অপব্যবহার’ [আমার প্রকাশনী, ২০১৭]

ইমেইল : sohul.munna118@gmail.com