হোম বই নিয়ে একুশ শতকের জন্য একুশটি পাঠ

একুশ শতকের জন্য একুশটি পাঠ

একুশ শতকের জন্য একুশটি পাঠ
469
0

ইউভাল নোয়া হারারি [Yuval Noah Harari] এ সময়ের একজন জনপ্রিয় লেখক। অক্সফোর্ড থেকে ইতিহাসের উপর পিএইচডিধারী প্রফেসর হারারি মূলত সেপিয়েন্সের [Sapiens] মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পাঠকের নজরে আসেন। তাঁর এই মাস্টারপিস নন-ফিকশন বেস্টসেলার মূলত লক্ষ-কোটি বছরের ইতিহাসে আধুনিক মনুষ্য প্রজাতি [Homo sapiens] কিভাবে ধীরে ধীরে এ পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ তথা শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, তাঁরই সামাজিক-নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ। সেপিয়েন্সে যেমন মানবজাতির অতীতকে তিনি তুলে এনেছেন, তেমনি মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে লিখেছেন ‘হোমো দিউস’ [Homo Deus]।

তাঁর তৃতীয় বই ‘একবিংশ শতাব্দীর জন্য ২১টি পাঠ [21 Lessons for the 21st Century] ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে। বইটি সাউথ এশিয়া অঞ্চলে প্রকাশ করেছে ভিনটেজ যা পেঙ্গুইন রেনডম হাউসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। এ বইতে একবিংশ শতাব্দীতে লেখক বড় ধরনের তিনটি চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন : পারমাণবিক যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তনহেতু ইকোলজিক্যাল ড্যামেজ এবং টেকনোলজিক্যাল ডিসরাপশন। এ চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে রেখে তিনি ২১টি বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করেছেন। এ ২১টি বিষয় ৫টি অধ্যায়ের অধীনে সাজানো।


তথ্য ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ধাক্কায় সকল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক তত্ত্ব ভেঙে পড়তে পারে।


প্রথম অধ্যায়ে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক তত্ত্ব, কাজ [work], মুক্তি [liberty], সমতা [euality] ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি সমাজ, সভ্যতা, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম ও ইমিগ্রেশান নিয়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে সন্ত্রাস, যুদ্ধ, অবমাননা [Humility], ঈশ্বর, ইহজাগতিকতা [Secularism]; চতুর্থ অধ্যায়ে অজ্ঞতা, ন্যায়-বিচার, পোস্ট-ট্রুথ [post truth] ও সায়েন্স ফিকশন; এবং পঞ্চম ও শেষ অধ্যায়ের রেজিলিয়েন্স [resilience] তথা একবিংশ শতাব্দীতে তথ্য ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলা করে টিকে থাকার সরল রেপিসি দিয়েছেন।

বইয়ের শুরুতে তিনি যা বলতে চেয়েছেন তা হলো, এই একবিংশ শতাব্দীতে ইনফরমেশন টেকনোলজি [infotech] বায়োটেকনোলজির [biotech] সাথে মিলে মানুষের জীবনে যে বড় পরিবর্তন ইতোমধ্যে এনেছে এবং ভবিষ্যতে আনতে যাচ্ছে তা অভাবনীয় এবং আমাদের কল্পনারও বাইরে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক তত্ত্বের [ideology] উদ্ভব ঘটেছে। এ তত্ত্বগুলো একবিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে বেশি সংকটের মুখে পড়বে। তথ্য ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ধাক্কায় সকল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক তত্ত্ব ভেঙে পড়তে পারে।

ইতিহাসের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পৃথিবীর অধিকাংশ স্থানে এখনো উদার গণতন্ত্র [Liberal Democracy] টিকে আছে। লেখক বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদ, ফ্যাসিবাদ, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদির পাশাপাশি উদার গণতন্ত্রেরও কঠোর সমালোচনা করছেন। তবে হারারি উদার গণতন্ত্রের সমালোচনা করলেও তিনি পাঠকের কাছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেছেন, উদার গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নত আইডিওলজি এখনও পর্যন্ত তৈরি হয় নি, তাই তাঁর উদার গণতন্ত্রের সমালোচনা এর সংশোধনের জন্য করা হয়েছে মর্মে ধরে নিতে হবে।

তিনি বলেন, মানুষের জীবনের সবকিছুই ইনফরমেশন টেকনোলজির আওতায় চলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা [Artificial Intelligence] পৃথিবীর উপর মানুষের কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করছে, এটি ইতোমধ্যে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে অতিক্রম করে গেছে। এর কারণ হলো অসংখ্য ডাটা [Big Data] একসাথে প্রসেস করে মেশিন অনেক কিছু শিখে নিচ্ছে [machine learning] এবং সেখান থেকে মেশিন অনেকটা দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে। মানুষের পক্ষে এত দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব নয়। গুগল, ফেসবুক, বাইদুর মতো টেকজায়েন্টদের [tech-giant] দখলে চলে যাচ্ছে মানুষের যাবতীয় তথ্য। মানুষের জীবনের সবকিছুই এসব টেকজায়ান্টরা নিয়ন্ত্রণ করবে। মেশিন লার্নিং-এর উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষের কর্মক্ষেত্র [jobs] সংকুচিত হয়ে পড়বে। অল্পসংখ্যক মানুষ, যাদের এ উচ্চ প্রযুক্তির উপর দখল থাকবে, তারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে; এবং তাদের সম্পদ হবে পাহাড়সম। আর এ টেক-বিপ্লবে অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন, অকেজো হয়ে পড়বে—যাদের হারারি বলছেন—একবিংশ শতকের ‘useless class’।

হারারি মনে করছেন, একবিংশ শতাব্দীর ইনফোটেক ও বায়োটেকের মিলিত শক্তি মানুষের সকল ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে। পুরাতন তত্ত্ব, নীতি-নৈতিকতা এ নতুন পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথেষ্ট হবে না। তখন এসব তত্ত্ব বাতিল হয়ে যাবে, প্রয়োজন পড়েবে নতুন ধরনের আইডিওলজির। বর্তমানে যে উদার গণতন্ত্র [Liberal Democracy] রাজত্ব [prevail] করছে সেটি একবিংশ শতকের এ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে খাপ খেয়ে [adapt or modify] টিকে থাকতে পারবে কিনা একটি বড় প্রশ্ন। যদি না পারে তবে, একবিংশ শতাব্দীতে মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে, নতুন আইডিয়োলজির দরকার হবে।


মানবমনের রহস্য উদ্‌ঘাটনে তিনি কোনো অতিপ্রাকৃত বিষয়ের উপর নির্ভর করতে নারাজ।


এ নতুন আইডিওলজির উৎপত্তি না হওয়া পর্যন্ত লেখকের দৃষ্টিতে যা করণীয় তা তিনি তাঁর শেষ তিনটি লেসনে তুলে ধরছেন। আজকে যে শিশু জন্ম নিল, ২০৫০ সালে তার বয়স হবে ৩০ এবং হয়তো সে দ্বাবিংশ শতাব্দীরও সাক্ষী হবে। আজকের শিশুরা যা শিখছে তার অধিকাংশই আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে অপ্রাসঙ্গিক [irrelevant] হয়ে যাবে। এ ধরনের একটি আনপ্রেডিকটেবল ভবিষ্যৎ মোকাবেলায় আমাদের তৈরি হতে হবে এমনভাবে যাতে যন্ত্র আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ না করে বরং আমরাই যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এজন্য দরকার জীবনের গভীর উপলব্ধি, জানা দরকার জীবনের মানে। তবে হারারি বলছেন, জীবন কোনো গল্প নয়। যেভাবে বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-তত্ত্ব-রাজনীতিতে মানুষকে বিভিন্ন গল্পের [ইলুশন, আফটার লাইফ, জাতীয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ, সমাজতন্ত্র, সর্বোপরি উদার গণতন্ত্র] মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে তার থেকে মানুষকে বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি বলছেন :

To change the world, you need to act, and even more importantly, you need to organize… it is easier to act and cooperate effectively when you understand the human mind, understand your own mind, and understand how to deal with your inner fears, biases and complexes.

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তিনি কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্ব নিয়ে হাজির হন নি, তবে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, বিজ্ঞান এখনও মানবমনের রহস্য উদ্‌ঘাটন করে যাচ্ছে এবং মনকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বৈজ্ঞানিক টুল [scientific toolkit] হিসেবে তিনি মেডিটেশন বেছে নিয়েছেন। কিন্তু এটিকে সর্বরোগের ওষুধ [panacea] মনে করা ঠিক হবে না। মন নিয়ন্ত্রণে কারো কারো ক্ষেত্রে থেরাপি, আর্ট বা ম্পোর্টসও বেশ কার্যকর হতে পারে। তবে, মানসিক প্রশান্তি বা মানব মনের রহস্য উদ্‌ঘাটনে তিনি কোনো অতিপ্রাকৃত বিষয়ের উপর নির্ভর করতে নারাজ।

বইটি অত্যন্ত প্রাঞ্জল ইংরেজি ভাষায় লিখিত। লেখার ফ্লো বা ধারাবাহিকতা, শব্দের ব্যবহার, বাক্যের বিন্যাস অত্যন্ত চমৎকার। শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, যারা ইংরেজিতে পড়া ও লেখার দক্ষতা [reading and writing ability] অর্জন করতে চান তাদের জন্যও বইটি সুপাঠ্য।

সুজন চৌধুরী

জন্ম চট্টগ্রামে। এমএসসি (ফরেস্ট্রি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এমএসসি (এনভায়রনমেন্টাল পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজম্যান্ট), ব্রিস্টল, ইংল্যান্ড। পেশায় সরকারি চাকুরে (বিসিএস প্রশাসন)।

ই-মেইল : sujan16222@gmail.com

Latest posts by সুজন চৌধুরী (see all)