হোম বই নিয়ে একিলিসের আদর্শ : কূটাভাস বিশ্বে নতুন দিগন্ত

একিলিসের আদর্শ : কূটাভাস বিশ্বে নতুন দিগন্ত

একিলিসের আদর্শ : কূটাভাস বিশ্বে নতুন দিগন্ত
684
0

‘সব স্পার্টান মিথ্যা কথা বলে। আমি স্পার্টান এবং আমার জাহাজে খাদ্য ব্যতীত শত্রু নেই। জাহাজটি বাঁচাও।’—ডুবিডুবি জাহাজের ডেক থেকে সমবেত এথেনীয়দের উদ্দেশ্যে বলতেই পারেন হেলেনিক যুগের কোনো মানুষ। এখন এখানে বিশ্বাস করা বা না করা, জাহাজ ডুবি বা ভাসান, যুদ্ধ বা শান্তি নির্ভর করছে, বলা বাক্যটির নৈতিক বৈধতা কে কিভাবে দিচ্ছে তার উপর। কিন্তু জেনোর কূটাভাসটি (Paradox) একই সাথে বৈজ্ঞানিক ও আপেক্ষিক (Relative And Scientific)। আর জেনোর এই কূটাভাস এর উপরই দাঁড়িয়ে আছে কলোম্বীয় লেখক পাউল ব্রিতোর ১০১টি স্প্যানিশ অনুগল্প বাংলা ভাষায় যার অত্যন্ত সাবলীল অনুবাদ করেছেন অনুবাদক, কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিন।

আমরা একটু ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখতে পারি। দক্ষিণ ইতালি উপসাগরের তীরবর্তী শহর এলোয়া (Elea)-এর এক পাশে ক্রোটোন (Crotona), অন্যপাশে টরেন্টাম (Tarentum)। এই প্রত্যেকটি স্থানের সাথে আমরা একজন করে দার্শনিককে স্মরণ করতে পারি। আর্বিটাস যখন টরেন্টাম (Tarentum)-এ প্রকৌশল ভাবন (Mchanical Model) প্রয়োগ করেছেন, তার প্রায় দুই শ বছর পরে ক্রোটন (Crotona)-এ পিথাগোরাস জ্যামিতির ভূমিতে নতুন নতুন শব্দকল্পদ্রুম নির্মাণ করে চলছেন। এই মাঝামাঝি সময়ে এলোয়ার জেনোয়া (495-435B.C) গণিতে প্রথম বারের মতো দার্শনকিতার প্রয়োগ ঘটান। বলা যায়, দর্শনে গণিতের ফিউশন মিশিয়ে গাণিতিক গতিবিদ্যার অসীম প্রান্তিকতায় মাল্টিপুলার ইউনিক ইভেন্ট-এর দুয়ার মেলে ধরেন। তিনি জ্যামিতির অসীম অগ্রগতীয় যোজনাকে (Infinite Progression of Geometry) বিখ্যাত কূটাভাস একিলিস (Achilles) এবং তার কচ্ছপ-এর সাহায্যে যে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক সমাধানকে চ্যালেঞ্জ করেন।


প্রতিযোগিতা নিকটবর্তী হলেই বরং গাণিতিক জগৎ আরো বেশি করে সূক্ষ্মতা দাবি করবে।


উদাহারণ হিসেবে তিনি বলেন, যদি দ্রুতগতির একিলিস এবং একটি কচ্ছপ একই সাথে দৌড় শুরু করেন যেখানে কচ্ছপটি একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব সামনে থাকবে এবং একিলিস বরাবরই সময়ের নির্দিষ্ট সীমায় কেবল একটা অংশ অতিক্রম করতে পারবে, তবে একিলিসের পক্ষে আদৌ কখনো কি কচ্ছপটিকে ধরা সম্ভব হবে? আমরা জানি এই দূরত্বের ভগ্নাংশ একিলিস অবশ্যই কোনো না কোনো দিন অতিক্রম করে কচ্ছপটিকে ধরতে সক্ষম হবেন। কিন্তু আমরা জানি না সময়টা সুদূর ভবিষ্যতের কোথায় লুকিয়ে আছে।

আমরা জানি যে, জেনোর প্যারাডক্সের একপ্রান্তে প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে এবং অন্য প্রান্ত খোলা রয়েছে। এই খোলা প্রান্ত ধরে যুগ যুগ ধরে গণিত, দর্শন ও সাহিত্য হেঁটে চলেছে। পাউল ব্রিতোও সদর্থেই সেই সুযোগ নিয়েছেন। তিনি এমনভাবে ১০১টি অনুগল্পে ছড়িয়ে দিয়েছেন যে, আমাদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতার কোনো একটা উপেক্ষিত (খুব সম্ভবত বিশৃঙ্খল) অংশে আমাদের মনোযোগ এল—গোছানো হতে লাগল সব যুক্তি—লেখক যা দেখাতে চাচ্ছেন আমরা ভিন্ন ব্যক্তি বলে, এই খেলার সবটা সম্পূর্ণভাবে দেখতে পাব না, এমন নয়। কিন্তু সবটা অবশ্যই দেখতে পেলেও ফলাফল মেনে না-ও নিতে পারি। কিন্তু আমরা মনশ্চক্ষে যতখানি অগ্রসর হতে পারব তার জন্য আমাদের অভিজ্ঞতার একটা সংগতি সাধনের আনন্দ অবশ্যই পাওনা থেকেই যাবে।

অন্যদিকে, বিজ্ঞানের পদ্ধতি সবসময় মহা জনপদ যুগের সত্যের জন্ম দিবে এই দিব্যতা প্রদান প্রায় অসম্ভব। এ জন্যই ব্রিতোর অনুগল্পগুলো প্রায় উতরে গেলেও কোনো কোনো অনুগল্পে চিন্তার দিগন্তে কুজ্ঝটিকাও স্পষ্ট। তাছাড়া সত্য ও দিব্যতা লাভ ব্যতিরেকে জেনোর প্যারাডক্সটিকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না সেরকম কোনো দিব্যি নেই। সম্ভবত জেনোও তা আশাও করেন নি। ফলে লেখক যখন বলেন, একিলিস আর কচ্ছপের মধ্যকার দূরত্ব যত কমতে থাকল, প্রতিযোগিতা তত বেশি সূক্ষ্মতা হারিয়ে ফেলে। তখন আমরা বরং বিপরীত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, প্রতিযোগিতা নিকটবর্তী হলেই বরং গাণিতিক জগৎ আরো বেশি করে সূক্ষ্মতা দাবি করবে। আবার, (এই) ‘ধাবমান জীবাশ্ম (এতই দূরবর্তী যে) ওই অলস নিদর্শন বহু আগেই মরে গিয়ে থাকবে। যাই হোক, কচ্ছপ কাল ও স্থানের বাইরে হেঁটে যাচ্ছে নিছক এই কারণে যে, এটাই তার ইচ্ছে।’ পাঠকের পক্ষে এখানে সহজে কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। কারণ, এ জটিলতা নিছক ইচ্ছা দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কারণ, ইচ্ছা থাকে কর্তার। এখানে একিলিস ও কচ্ছপ উভয়ই অকর্তা। কারণ, একিলিস ও কচ্ছপ উভয়ই স্থানের বাইরে হেঁটে যাচ্ছে হয় জেনোর, নয় লেখকের, নয় পাঠক বা চতুর্থ কারো ইচ্ছার অনুবর্তী হয়ে। এরা উভয়েই মহাবিশ্বের হেঁয়ালি প্রপঞ্চ। কূটাভাস বিশ্বে নতুন ঘটনা দিগন্ত (Event Horrizon) এভাবে নতুন মাত্রা লাভ করছে।


একিলিসের আদর্শ যদি এমন করে পাঠকদের বিমূঢ় করে তুলে তাতে গাণিতিক বা দার্শনিক কথাসাহিত্যের জয়ই সূচিত হবে।


আমরা যখন কোনো কল্পনা করি, তখন প্রায়ই দৃশ্যমান তত্ত্বসমূহ বাস্তব তথ্যের মতো সামনে এসে দাঁড়ায় আর আমরা তাকে নতুন রূপে রচনা করি। পাউল ব্রিতোও এই মানবধর্ম তাড়িত। আমাদের মতোই, লেখকের বোধিতত্ত্বের সীমাবদ্ধতার জগতে দৃষ্টি রেখেই আমরা এই বই পাঠ করে যাব। কেননা এই সীমা আমাদের জন্য অনতিক্রম্য এবং এখানে আমরা বিসর্জন দেই আরো বেঁচে থাকা যুক্তিচক্রের সুন্দর সুন্দর ব্যূহগুলোকে। কারণ, পাঠক মনের গহিনে সমুৎপন্ন অসীম অভিমন্যু যেকোনো লেখকের যুক্তিব্যূহ ভেদ করতে সক্ষম এবং সেই যুক্তিব্যূহ ভেঙে যুক্তিসংগতভাবেই পাঠক বিজয়ী হতে আগ্রহী।

পাঠক একিলিসের আদর্শ পাঠে অবশ্যই বিজয়ী হবেন। তবে, জেনোর এই ধাঁধা সূক্ষ্মতম ও বৃহত্তম ক্ষেত্রে অসীমতার ও  অবশ্যম্ভাবী পরিণতি, যা একই সাথে মানব জাতির কর্মভূমির রিক্ততা ও সমৃদ্ধতাকে ব্যাখ্যা করতে পারে। কারণ, সময় ও স্থানকে অসীম সংখ্যক ভাগে বিভক্ত করা সম্ভব হলে যে গাণিতিক দিগন্ত তৈরি হয় যার উন্মোচন Revelation of Spacc and understanding of time দাবি করে যামন ও জড় বস্তুর সীমায় একটা চেতন প্রাচীর।

লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্য যখন সাহিত্যের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে, অর্থাৎ সাহিত্য বিচারের প্রচলিত সব ক’টি মানদণ্ড প্রয়োগ করেও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপভোগ অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে; ইউরোপীয় সাহিত্য ও সেই সাহিত্যের উপজাত পড়ে আমাদের প্রত্যাশা ও অভ্যাস যখন লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের কাছে ধাক্কা খায়, তখন এক ধরনের বিমূঢ়তায় আমরা মুগ্ধ হই। একিলিসের আদর্শ যদি এমন করে পাঠকদের বিমূঢ় করে তুলে তাতে গাণিতিক বা দার্শনিক কথাসাহিত্যের জয়ই সূচিত হবে। তাছাড়া, বিশেষ এক ধরনের ভাষারীতি অনুসরণ করে একটি কূটাভাসকে কিভাবে এগিয়ে নেওয়া যায় তা পাউল ব্রিতো খুব চমৎকারভাবে আমাদের দেখিয়েছেন। লাতিন আমেরিকার আখ্যান-ইতিহাসে এই লেখাটি গণিতের ঘটনা-দিগন্ত এবং বিজ্ঞানের অনিশ্চয়তায় দর্শনের আপাত সরল কিন্তু প্রহেলিকাপূর্ণ প্রপঞ্চসমূহের সাথে বাস্তববাদের কিভাবে সেতুবন্ধ রচনা করা যায় তার জন্যও সমাদৃত হয়ে থাকবে।


অসীমতা আসলে ঘাটতির যোগফলের চেয়ে বেশি কিছু নয়।


বস্তুত ফিকশনের কাঠামোর মধ্যে নন-ফিকশনের অবকাঠামো নির্মাণ সাহিত্যে সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর ফলে এ ধরনের সাহিত্য অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজ চিন্তার স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গল্পমালা প্রলম্বিত হতে হতে ‘নীতিশিক্ষা’র দিকে ঝুঁকে পড়ার একটি ঝুঁকি রয়েই যায়। সেক্ষেত্রে একিলিসের আদর্শ জাতীয় রচনা হয়তো পুরোপুরি ক্ল্যাসিক সাহিত্যের মর্যাদায় উত্তীর্ণ হতে পারে না; তবে, এটি যে শক্তিশালী একটি সৃষ্টিশীল রচনা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ব্রিতোর একিলিসের আদর্শে কল্পনা ও বাস্তবতার যে অনুবর্তন আমরা দেখি তা না সম্পূর্ণ বাস্তব, না সম্পূর্ণ অবাস্তব বা কল্পনা। বরং বাস্তব-অবাস্তব ইত্যাদি বোধিবোধ ছাপিয়ে একটি দর্শন চিন্তা অন্য একটি দর্শন চিন্তার মধ্যে, একাল থেকে অন্যকালে মিথষ্ক্রিয়ায় মেতে ওঠে। তবে, তা নিছক এমন সময়েই শুরু হয় নি যখন থেটিস তার সন্তান একিলিসকে স্টিক্স নদীর স্রোতে ভিজিয়েছিল এই আশায় যে, একদিন তার পুত্র রণকলায় নিপুণ হয়ে উঠবেন। পুত্র একিলিস রণে অজেয় হয়ে উঠেছিল ঠিকই, তবে স্টিক্সের জলে তার শরীর প্রক্ষালন কালে ডান পায়ের গোড়ালির যে অংশটুকু ছিল তার পিতার মুষ্টির মধ্যে, তা রয়ে গেল মানবীয়—দুর্বল কাঠামোতে। এভাবেই পিতা থেটিস অজান্তে রচনা করলেন যুদ্ধে পরাজয় আর জেনো শুরু করলেন পরিহাস। ‘এই মানবীয় দুর্বলতা অসম্পূর্ণতার দ্যোতক এবং ওই অসম্পূর্ণতাই ধ্বংসের পরিপূর্ণতার এক খুঁত হিসেবে যুক্ত হলো। অসীমতা আসলে ঘাটতির যোগফলের চেয়ে বেশি কিছু নয়।’ তবে, অসীমতা প্রকৃতপক্ষে উদ্ধৃতির (Surplus) অসীম যোজনা (Infinite Addition) ছাড়া অন্য কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কেননা, আমরা জানি যে, পুঁজিবাদের এটাই হচ্ছে মূল কথা। আর মার্কিন পুঁজিবাদের নীল থাবার নিচে বাস করেও ব্রিতো অন্য কোনো অনুগল্পে এই সম্ভাবনার বিস্তার কেন ঘটান নি তা আমাদের আশ্চর্যান্বিত করেছে।

এ ধরনের জটিল, বহুমুখী ও বহুমাত্রিক বই অনুবাদ যেকোনো ভাষার জন্য আনন্দের। তবে এই অনুবাদ কেবল ভাষাটির উপর স্বচ্ছন্দ অধিকারের ফলেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। এর নির্বাচনই যেমন অনুবাদকের রুচি ও সামর্থ্যরে বিশ্বস্ত দলিল, তেমনি ইন্টার ডিসিপ্লিনারি বিষয়ে অনুবাদকের অসাধারণ দক্ষতার উত্তর-দায়ীও। বইটি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদে রাজু আলাউদ্দিন সে স্বাক্ষর অতি উজ্জ্বলভাবেই রেখেছেন। বাতিঘর থেকে প্রকাশিত বইটি অনুসন্ধিৎসু পাঠক মনের ক্ষুধা আরো বাড়িয়ে তুলবে সে বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই।

লোকমান হেকিম

জন্ম ২৫ অক্টোবর, ১৯৮১; ময়মনসিংহ।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : রসায়নে অনার্সসহ মাস্টার্স, পুনরায় ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট-এ বিআইবিএম থেকে মাস্টার্স।

পেশা : উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

ই-মেইল : lokmaan.hakiim@gmail.com