হোম বই নিয়ে একটা নীল রঙের নিগার সুলতানা

একটা নীল রঙের নিগার সুলতানা

একটা নীল রঙের নিগার সুলতানা
898
0

২০১৭ সালে কবিতার যে বইটি পড়ে আমি সবচেয়ে বেশি সচকিত হয়েছি, তা নিয়ে কিছু কথা বলব আজ, বছরের এই শেষ দিনে। কোনোভাবেই এ কথা প্রচার আমার উদ্দেশ্য নয় যে, এটি বছরের সেরা বই। কিংবা, এই হলো সেই কিতাব, যা এতদিন খুঁজছিলাম—এমন বলবারও অভিপ্রায় নেই আমার।

আসলে বইটা পড়ে আমোদ পেয়েছি, এইটুকু বলা যায়। কোনো কবিতার বইকে কখনো আমুদে বলে ডাকা হয়েছে কিনা জানি না। তবে প্লেফুল রাইটিং বলে একটা কথা আছে। আমি যে বইটির কথা বলতে চাইছি, সেটি আমার জন্য প্লেফুল রিডিংই বটে। কিন্তু এই লীলা-খেলাই যদি সার হতো, তবে আর এ বই নিয়ে কথা বেশিদূর এগুতো না। ফলে আমি নিশ্চিত এ বইতে আরও নিগূঢ় কিছু আছে।

বইটার নাম ‘মিস্টার টী ও প্রেমময় বুলডোজার’। কবিতার বইয়ের এমন একটা নাম, আর যাই হোক, আমি অন্তত নিজের জন্য পছন্দ করতাম না। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার এই, নামটি আমার মধ্যে একটা মুচকি হাসিই শুধু জাগিয়ে তুলল না, মলাট খুলে দেখতেও প্ররোচিত করল।

এই মুহূর্তটি যেকোনো লেখকের জন্যেই খুব চিন্তার একটা বিষয়। সত্যি বলতে কি, আমি দারুণ দ্বিধার মধ্যে পড়ে যাই। যে-ধরনের লেখা নিজে কোনোদিন লিখব না বলে ভাবি, কিভাবে আমিই পারি তার ভোক্তা হতে!

বুঝতে পারি, বইটি আমাকে আহ্বান করছে পূর্বানুমিতি বা পূর্বসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে। এমনকি এই স্বাধীনতাও অফার করছে, তুমি একে গ্রহণ নাও করতে পারো। তাই অনায়াসে, বেশ নির্ভার হয়েই এ বইতে ঢুকে পড়া সম্ভব হলো।

আবু মুস্তাফিজের কবিত্বের আশ্রয়কেন্দ্র তার ভাষা। আরও পিনপয়েন্টে বলা যায়, শব্দ। শব্দকে ভেঙে শব্দের গায়ে জড়িয়ে, কখনও অনুপ্রাসের টানে শব্দের বিন্যাস পাল্টে দিয়ে ভাষা-অভিব্যক্তির নতুন একটি সম্ভাবনা তিনি দেখিয়েছেন।

‘চোখের আড়েঠারে বুঝাক ভালোবাসা কত মধুরসা
খসাক পয়সা। পকেটের টকেট খেয়ে প্যাকেট ফেলে দিয়ে’

[পিথিমি একটা নীল রঙের নিগার সুলতানা]

লক্ষ করুন, ‘টকেট’ শব্দটি এখানে কেবল অর্থহীন দ্বিরুক্তি হয়ে থাকে নি, এটি পকেটস্থ বস্তুর অর্থও ধারণ করেছে। এমন অজস্র মেটোনিমি ও মেটাফরের খেলা আছে তার কবিতায়। যেমন, কবি ডাইনোসরকে বলছেন ‘ডাইনোশুয়ার’। মানুষের দানবিকতা ও পাশবিকতা বোঝাতে এর চেয়ে লক্ষ্যভেদী আর কী হতে পারে!

ভালোবাসা ঘনীভূত নিরীহ এক তীব্র যন্ত্রমা
মন্ত্রণার মাকে পেয়ে শাসিয়ে যায় গভীর সব অনুশাসনা

[পিথিমি একটা নীল রঙের নিগার সুলতানা]

যন্ত্রণা শব্দটিকে আঞ্চলিক স্বরের আচ্ছাদনে ‘যন্ত্রমা’য় পরিবর্তনের মুহূর্তে, ‘মা’ শব্দাংশের ভিন্ন একটি ব্যঞ্জনা আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। আমাদের স্মৃতি থেকে জেগে ওঠে মায়ের স্নেহ ও শাসনের এক বিমূর্ত রূপ। পরবর্তী পঙ্‌ক্তিতে তাই অবধারিতভাবে চলে এসেছে ‘মন্ত্রণার মা’, যাকে তছনছ করে দেয় অধরা ভালোবাসার তীব্র ব্যাকুলতা। এমন ভালোবাসা আমাদের বাস্তুচ্যুতও করে বটে। তখন মনে হয়—

পিথিমি এক নীল রঙের নিগার সুলতানা
যাকে ভালোবেসে আর ভালো লাগে না।

[পিথিমি একটা নীল রঙের নিগার সুলতানা]

এই ভালো না লাগাটাও বেশ জটিল। পৃথিবীর সঙ্গে, তার বস্তু-পরিপার্শ্বে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে না পারা ও তাকে ছেড়ে যাবার বিকল্প না পাবার যে অস্থিরতা, তার ভেতর দিয়ে কবির জীবন শুধু নয়, আমাদের নিভৃত সত্তাটিকেও খুঁজে পাই যেন।

যৌথ অবচেতন, মব-সাইকোলজি, স্ট্রিট-ফিলোসফি—এসবেরই একটা মিসিং আছে প্রমিত ভাষায়। বলতে চাইছি, হারিয়ে যাওয়া বা বাদ পড়ার একটা ব্যাপার। জ্যান্ত মানুষের জবানে ভাষার দ্যোতনা অনেক গভীর, অর্থময়তা বহুরৈখিক। কেবল বাগভঙ্গি দিয়েও অনেক অর্থ প্রকাশ সম্ভব হয়। টঙ ঘরে চায়ের আড্ডায় আমরা নিজেদের অজান্তেই এমনটা পারফর্ম করে থাকি।

সেই টঙ ঘরে আমাদের অসচেতন বাক-বিভূতি আর অপরিকল্পিত বাগভঙ্গি যে সমস্ত অর্থ বিনিময় করে, তাতে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গগুলি ক্রমাগত অনুষঙ্গে রূপ নিতে থাকে। সামাজিক অনুষঙ্গগুলি প্রসঙ্গের মতো ফিরে ফিরে আসে। এভাবেই আমরা ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে থেকে রাজনীতি, প্রেম, যৌনতা, দাম্পত্য ইত্যাদি বিষয়ে সুগভীর মতামত বিশ্বাসের আকারে হাজির করি। অথচ, তখন হয়তো কথা হচ্ছিল ফলমূলে ফরমালিন ব্যবহৃত হয় কিনা, তাই নিয়ে। মানে, আলোচ্যসূচির মধ্যে অনালোচ্য থাকছে না কিছুই।

এই যে অপ্রাসঙ্গিককে প্রাসঙ্গিক করে তোলা, যা আমাদের নিত্যদিনের বোলচালের অংশ, তাকে কবিতায় প্রবেশাধিকার দেয়ার মধ্য দিয়ে দুটি জিনিশ ঘটে। এক, মাল্টি-লিনিয়ার বা মাল্টি-ডাইমেনশন তৈরি হয় রচনাশৈলীতে, তার আভ্যন্তর প্রকাশের চাপে। দুই, কবিতার কেন্দ্রচ্যুতি ঘটে। ফলে, স্বভাবতই বহুকথকের বহুস্বর-সমন্বয়ে সময়ের একটা অখণ্ডরূপ যেন দাঁড়ায়। আবু মুস্তাফিজও হয়তো কথা বলতে শুরু করেছিলেন ইলিশ মাছ নিয়ে। কিন্তু সেটা গিয়ে ঠেকল পদ্মাব্রিজে। বেরিয়ে এল ইলিশ বাদ দিয়ে টাকা খাওয়ার প্রকল্প।

আমি তেখন মা পদমার কাছে গেলাম
গিয়া তার পাদুকাতলে সুন্নতমতো জবাফুল রাখলাম

[ইলিশ পুলিশ ও মা পদমা বিরিজ]

মায়ের পায়ে জবাফুল, এই ভক্তিনিবেদনের চিত্রটিতে ‘সুন্নতমতো’ শব্দটি এসে পালাবদলের একটি ‘লক্ষণা’ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। ভারত থেকে নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলেই কালীভক্তের পাশে সুন্নতপন্থিকেও জায়গা দিতে হলো।

উদাহরণটি দিয়ে আমি শুধু এটাই দেখাতে চাইলাম, আবু মুস্তাফিজের কবিতায় এমন অনেক লুকানো অর্থ, ইঙ্গিত চকিতে ঠিকরে বেরিয়ে আসে, যেমনটা আসে আমাদের প্রাত্যহিক আলাপে, কথাবার্তায়। কিন্তু মানুষের অঙ্গভঙ্গি ও উচ্চারিত বাক-বিভঙ্গের মধ্যে যার দিশা পাওয়া সহজ, তাকে লেখ্য ভাষায় ধরতে গেলে বেজায় অসুবিধা। এই অসুবিধাকে জয় করতে চেয়েছেন মুস্তাফিজ তার নানা শব্দ ও কলোকাল কলধ্বনির মধ্যে।

আমার প্রমিত-শাসিত মন ভাষার এই প্লেফুল জায়গাটিতে প্রবেশ করতে বেশ উদ্বেল, টের পাই।


কেন উব্দেল, তারও একটা ব্যাখ্যা সম্ভব, আঁচ করি। ভাষাকে যখন রিজিট, প্রতিষ্ঠিত একটা কাঠামোর মধ্যে দেখতে পাই, তাকে সেই কাঠামোর বাইরে টেনে আনার সময় ঘটে অনিবার্য কিছু বিপত্তি। কেননা ভাষার মধ্যে যা অপ্রকাশ অধরা, তাকে যখন কবি ধরতে চান, তখন সেই প্রচল ভাষার নিপুণ কলকব্জারও উনতা টের পান তিনি। এ কোনো নন্দনতাত্ত্বিক সমস্যা নয়, এ হলো রীতিমতো ভাষার সীমাবদ্ধতা। অভিনব, ব্যক্তিগত নানা অভিজ্ঞতার ঘাত-প্রতিঘাতে যে প্রকাশমাধ্যম পাল্টে যাচ্ছে নিয়ত, আমরা কোথায় খুঁজব তাকে? পুথির বাইরে নিশ্চয়ই। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, তাকে পাওয়া সম্ভব মানুষের জীবনে ও জবানে।

কিন্তু পুথির সন্তান যারা, তাদের কাছে সেই ভাষায় অবগাহন একটা নান্দনিক সমস্যা আকারে হাজির হয়। কতটুকু জলে নামবেন তারা? কতদূর স্নাত হলে বিলেতি বস্ত্রের আভিজাত্য অটুট থাকে, একেবারে ভিজে চুপসে না যায়? তবে যিনি ডুব দিবেন, তার জন্য এই ভাবনা অনাবশ্যক।

‘মিস্টার টী ও প্রেমময় বুলডোজার’-এর কবি নিজে শুধু ডুব দিতে আসেন নি, হ্যাঁচকা টান মেরে বন্ধুকে ডুবিয়েও আনন্দ তার। ফলে, আমারও, এখন আর জলকেলিতে কিসের বাধা!


পড়ুন কিছু কবিতা : মিস্টার টী ও প্রেমময় বুলডোজার
সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি ফজলুল হক কলেজ, বরিশাল।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪
তিমিরে তারানা ● অগ্রদূত, ২০১৭

প্রবন্ধ—
বাদ-মাগরিব (ভাষা-রাজনীতির গোপন পাঠ) ● অগ্রদূত, ২০১৮

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব