হোম গদ্য আজফার হোসেনের দর্শনাখ্যান : রাগী বুদ্ধিজীবীর স্বর

আজফার হোসেনের দর্শনাখ্যান : রাগী বুদ্ধিজীবীর স্বর

আজফার হোসেনের দর্শনাখ্যান : রাগী বুদ্ধিজীবীর স্বর
558
0

বছর আটেক বা আরেকটু আগের কথা। তখন আজফার হোসেন সম্ভবত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়ান। ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় তুমুল বক্তৃতা করে বেড়ান। বিভিন্ন জায়গায় শুনি সেইসব বক্তৃতা। ইউনিভার্সিটি করেন আর ‘নির্দিষ্ট’ মানুষদের সাথে আড্ডা দেন। ওইসব আড্ডায় মাঝেমধ্যে আমি গেছি। নিজ গুণে না। আজফারের খাতিরের লোক লেখক-চিন্তক মোহাম্মদ আজম। আজম আমার খাতিরের। ফলে আজমের লেঞ্জা ধরে যেতাম। যেমন গিয়েছি জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলনের তখনকার পার্টি অফিস শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে। সেখানে দেখেছি অস্থির উত্তেজনায় আলাপমগ্ন আজফার হোসেনকে। কথার মধ্যে দেদার কোট করছেন আবশ্যিকভাবে কার্ল মার্কস, ফুকো, দেরিদা, নগুগি ওয়াথিওঙ্গা, চিনু আচেবে থেকে। তাঁর কোট করা থেকে বাদ পড়ছেন না আফ্রিকার ‘কালো মানুষদের’ সাংস্কৃতিক লড়াই-সংগ্রামের সাথি সাম্প্রতিক কবি-সাহিত্যিক-তাত্ত্বিকরা। হামেশা উদ্ধৃত করছেন মধ্যপ্রাচ্যের কবিদের গনগনে কবিতা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজস্ব অনুবাদে। থরবিথর উদ্ধৃত করা বিচিত্র নামগুলো থেকে তখনই এটা টের পেয়েছিলাম যে, আজফার দারুণভাবে বর্তমান সময়ের সারা বিশ্বের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। শুধু পরিচিত নন, এর কিছুকিছুর সাথে যুক্তও বটে। আজফারের সেসব কথাবার্তা যেমন শোনার মতো তেমনি দেখার মতোও ছিল। তাঁকে দেখেই আমি প্রথম এই সিদ্ধান্তে আসি যে, জ্ঞানও পারফর্মিং আর্ট।

একদিনের ঘটনা খুব মনে আছে। গণসংহতির অফিস থেকে বেরিয়ে আজিজ মার্কেটের পুবপাশে কোনার মধ্যে চায়ের দোকানে চা খেতে গেলাম। মোহাম্মদ আজম, আজফার হোসেন আর আমি লেঞ্জুটি। লেজুড়হেতু চায়ের অর্ডার আমিই করলাম। আজফার চায়ের দোকানের একটু দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন মার্কসের দাস ক্যাপিটাল বা এরকম কিছু একটা নিয়ে। কথা বলার মধ্যে তিনি স্বভাবসুলভভাবে উত্তেজনায় একপা আগাচ্ছেন আবার দুই পা পেছাচ্ছেন। হাত উপরে তুলে ধরছেন আবার নিচে নামাচ্ছেন। ডানে বাঁক নিচ্ছেন বামে বাঁক নিচ্ছেন। কখনো তর্জনি তুলে অদৃশ্য শত্রুকে শাসাচ্ছেন। আর খই ফোটাচ্ছেন মুখে। আমরা শুনছি আর অবশ্যই দেখছি। হঠাৎ আমার চোখ গেল চায়ের দোকানে। দেখি চায়ের দোকানদার কাপের মধ্যে দুধ-চিনি-চায়ের লিকার দিয়ে চামচ দিয়ে নাড়ছে, নাড়ছে এবং নাড়তেই আছে। কারণ, কোন কুক্ষণে তাঁর চোখ পড়েছিল বক্তব্যরত আজফারের ওপর। বেচারা একবার তাকিয়েই ধরা খেয়ে গেছে, যাকে বলে একেবারে কট। চা বানিয়ে লোকজনকে যে দেবে তা ভুলে গেছে। নাড়তেই আছে, নাড়তেই আছে…। খানিক পর একজন খেঁকিয়ে উঠল, ‘ওই ব্যাটা কী দেখস্। তোর চা তো লাড়তে লাড়তে ঠাণ্ডা হয়্যা যাইতাছে।’ অনেকদিন আজফার হোসেনের সাথে দেখা হয় না। দীর্ঘ অদর্শনের সাধ মিটল তাঁর সম্প্রতি লেখা বই দর্শনাখ্যান পড়ে।


তথাকথিত মূলধারার চিন্তা-দর্শন আর ‘মানবাধিকারের’ আওতা থেকে ‘অ্যাবসেন্ট’ হয়ে যাওয়া মানুষদের জন্যে সমকালে বাংলাদেশ মুলুকে এত হাহাকার আর শূন্যতাবোধ খুব কম লেখক প্রকাশ করেছেন


দর্শনাখ্যান-এর ভূগোলে ঢুকে দেখি সে এক এলাহি কাণ্ড। তত্ত্ব আর আবেগের দারুণ এক মজমা! তর্জনীর ওঠানামা, চোখের শাসানি, কণ্ঠস্বরের বিচিত্র স্কেল, সর্বহারা মানুষের কলকোলাহলে ভরা এক জগৎ। এছাড়া আছে, মিথের মতো জেঁকে বসা ‘মূলধারার চিন্তার’ জঞ্জালকে ‘নতুন চিন্তার’ বুলডোজার দিয়ে নির্মমভাবে ভাগাড়ে ফেলার প্রাণান্তকর চেষ্টা। সব মিলিয়ে একজন রাগী বুদ্ধিজীবীর সাক্ষাৎ স্পষ্ট এই বইয়ে। শুধু তাই নয়, দুনিয়ার যত লাঞ্ছিত, ভূমিচ্যুত, আক্রান্ত, অন্যায়ভাবে পরাধীন, সংগ্রামশীল, আধিপত্যের শিকার, নাই করে দেয়া, ‘অ্যাবসেন্ট’ ও শোষিত মানুষদের জন্যে আজফারের বেদনায় আক্রান্ত বইয়ের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। আমার মনে হয় তথাকথিত মূলধারার চিন্তা-দর্শন আর ‘মানবাধিকারের’ আওতা থেকে ‘অ্যাবসেন্ট’ হয়ে যাওয়া মানুষদের জন্যে সমকালে বাংলাদেশ মুলুকে এত হাহাকার আর শূন্যতাবোধ খুব কম লেখক প্রকাশ করেছেন। তবে সবসময় এই হাহাকার, শূন্যতা আর বেদনার বোধ ব্যক্তিগত বুকের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে নি। এইসব মানুষদের ফেটে পড়ার ব্যাকুলতার কথাও আছে। এবং এটাই এই বইয়ে আজফারের পজিশন বা অবস্থানবিন্দু। কিভাবে, তা দেখা যেতে পারে।

বিন্দুর প্রসঙ্গ দিয়ে বইয়ের ভেতরবাড়ি ঢোকা যাক। দর্শনাখ্যান-এ ‘বিন্দু’ নামে একটি ‘আখ্যান’ আছে। ‘সনাতন জ্যামিতিতে বিন্দু কোনো বস্তু নয়’। আপাতদৃষ্টিতে বিন্দু স্থানু। বিন্দু একটি ‘খোঁচা বা ডট মাত্র’। কিন্তু আজফার নিজের দৃষ্টি আর বিভিন্ন দার্শনিকের নানা দার্শনিক তত্ত্ব দিয়ে বিন্দুকে স্থাণুতার অভিশাপ থেকে যেন মুক্ত করেছেন। দার্শনিকদের মতকে তিনি তাঁর লেখায় ঠ্যাকনা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বিন্দু বস্তু না হলেও এর বস্তুকতা রয়েছে। বিন্দু স্থির, এটা দার্শনিকভাবে একটি ভ্রান্ত ধারণা। বিন্দু চলিষ্ণু। অনেকগুলো বিন্দু দৌড়ে চলে তৈরি করে একটি রেখা। এই রেখা সব সময় সরল না-ও হতে পারে। অনেক বিন্দু যুক্ত হয়ে তৈরি করতে পারে ‘একটি দারুণ নাছোড়বান্দা বা ঘাড়ত্যাড়া কার্ভ।’ আপাতদৃষ্টিতে বিন্দুকে মনে হয় ওজনহীন। কিন্তু অনেক দার্শনিকের মতো আজফার মনে করেন, ‘ওজনহীনতার সঙ্গে ওজনহীনতা যোগ করলে যে ওজনহীনতাই পুনরুৎপাদিত হয় তা কিন্তু নয়; বরঞ্চ অনেক ওজনহীনতার সমবায়ে ওজনহীনতার নতুন ওজনও তৈরি হয়।’ এই গেল বিন্দুকে সিন্ধু করে তোলার আজফারীয় দৃষ্টিকোণ।


নৈঃশব্দ্য আসলে জেগে ওঠার পূর্বপ্রস্তুতি। যেমন বিপ্লবীরা নিঃশব্দে একত্র হয় সশব্দ বিপ্লব ঘটানোর জন্যে।


ফেরা যাক নৈঃশব্দ্যে। বিন্দুর মতোই আপাতদৃষ্টিতে নৈঃশব্দ্যকে মনে হয় স্থাণু। নৈঃশব্দ্য যেন বেমালুম গুম হয়ে যাওয়া বা ঘাড় গুঁজে মেনে নেয়ার নামান্তর। কিন্তু আজফার নৈঃশব্দ্যকে জাগিয়ে তুলেছেন। নৈঃশব্দ্যকে হাতিয়ার করে তুলেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, বিন্দুর মতোই অনেক নৈঃশব্দ্য একত্র হয়ে তৈরি করে মহাকোলাহল। নৈঃশব্দ্য আসলে জেগে ওঠার পূর্বপ্রস্তুতি। যেমন বিপ্লবীরা নিঃশব্দে একত্র হয় সশব্দ বিপ্লব ঘটানোর জন্যে। শোনা যাক আজফারের মুখে :

তোমাদের বন্দুক, বুলেট আর বেয়োনেট নৈঃশব্দ্যকে ছিঁড়ে ফেলেছে। খান খান হয়ে-যাওয়া নৈঃশব্দ্যের ভেতর থেকে আরো নৈঃশব্দ্য জেগে ওঠে। নৈঃশব্দ্য ছড়িয়ে পড়ে, গাঢ় হয়, জমাট বাঁধে, চেয়ে থাকে নক্ষত্রের আকাশের দিকে। নৈঃশব্দ্যের কালো চোখ আরো কালো হয়। ছড়াতে ছড়াতে ছড়াতে ছড়াতে নৈঃশব্দ্য মহাকাব্যিক হয়। গভীর হতে হতে হতে নৈঃশব্দ্য মহাসাগর হয়। আমি অপেক্ষায় আছি সেই মুহূর্তের, যখন নৈঃশব্দ্য ফেটে পড়বে, বলকাবে মুক্তির ইশতেহারের মতো, ফুটবে কবিতার অক্ষরের মতো, আর গর্জে উঠবে কণ্ঠস্বর হয়ে ইতিহাসের ময়দানে বা মঞ্চে।

বোঝা যাচ্ছে বিন্দুই বলি, নৈঃশব্দ্যই বলি, আর গন্ধই বলি না কেন, অথবা বলি না কেন ভাষা, মানচিত্র বা সাবান-এর কথা (গন্ধ, ভাষা, মানচিত্র, সাবান—এগুলো দর্শনাখ্যানের বিভিন্ন আখ্যান বা নিবন্ধের নাম)—প্রত্যেক প্রসঙ্গে আজফারের শত্রুমিত্র বিষয়ক পজিশন আছে। সব জায়গাতেই তাঁর শত্রু একই। তাঁর শত্রু সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী, পুঁজিবাদী, কেন্দ্রবাদী। ধরা যাক ‘গন্ধ’ আখ্যানটির কথা। সেখানে গন্ধের বিচিত্র ইন্দ্রিয়ঘন উপলব্ধির কথা আছে। এসব গন্ধের তালিকাধর্মী বয়ানের এক পর্যায়ে মনে হয়, কোনো আধুনিকতাবাদী কবির চোখে ও জিহ্বায় বিচিত্রভাবে গন্ধের রূপ আর স্বাদের জগতে আমরা নেমে যাচ্ছি। কিন্তু আখ্যানের শেষে আজফার তাঁর জাত চিনিয়ে দেন। ধপাস করে ভেঙে পড়ে আমাদের আধুনিকতাবাদী কবিতাপিয়াসী চৈতন্য। শেষ অনুচ্ছেদ দেখলে মনে হয়, এই কথাগুলো বলার জন্যই তিনি এতক্ষণ বুঝি ক্ষেত্র তৈরি করলেন। এ-যেন বিশাল বটবৃক্ষকে ধরাশায়ী করার আগে হেইও হেইও করে ঠেলার মতো। নৈঃশব্দ্য যেমন সশব্দ হয়ে ওঠার জন্য নীরব থাকে তেমনি তাঁর নিবন্ধে গন্ধ যেন ঘাপটি মেরে ছিল বিপ্লবী কাজে ব্যবহৃত হবার জন্য। গন্ধ নিবন্ধের শেষ অনুচ্ছেদে আজফার বলেন :

কসম খোদার, আমি গন্ধ নিয়ে লাইনের পর লাইন লিখে যেতে পারি। কিন্তু সেই গন্ধ, সেই সৃষ্টির গন্ধ, সেই ধ্বংসের গন্ধ, সেই জগতজোড়া প্রেমিক-বিদ্রোহী গন্ধ যা শুঁকে শুঁকে আমাদের প্রেম মহিমান্বিত হবে আর একেকটা স্বৈরাচার এবং একেকটা পুঁজিপতি ধপাস করে মুখ থুবড়ে পড়বে নির্যাতিতের পায়ের নিচে।


পৃথিবীর তাবৎ ভাবদর্শনের উৎপত্তিস্থল পাশ্চাত্যদুনিয়া—তিনি এই কেন্দ্র্রবাদী আধিপত্য মানেন না।


আজফার শুধু পুঁজিপতি, সাম্রাজ্যবাদী আর আধিপত্যবাদীদের শাসান না, তিনি কেন্দ্রবাদীদেরও চপেটাঘাত করতে চান। পৃথিবীর তাবৎ ভাবদর্শনের উৎপত্তিস্থল পাশ্চাত্যদুনিয়া—তিনি এই কেন্দ্র্রবাদী আধিপত্য মানেন না। তিনি মনে করেন, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ আর কেন্দ্রবাদ একই গাছের বিচিত্র ডাল। যেমন পাশ্চাত্য দুনিয়া মনে করে যে, জ্ঞান-দর্শনের যা-কিছু মহান তা-কিছুর উৎসভূমি ইউরোপ। যা-কিছু নতুন তা গ্রিকরাই আবিষ্কার করেছে বা সবকিছুর শুরু হয়েছে ওই গ্রিসেই—এ ধরনের ধারণা বিভিন্নভাবেই সারা পৃথিবীব্যাপী জারি রয়েছে। এটাই ইউরোপকেন্দ্রিকতা। অন্য অনেকের মতো আজফার এই ইউরোপকেন্দ্রিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চান। তিনি মনে করেন, এই ধরনের ইউরোপকেন্দ্রিকতার মধ্যে গলদ আছে। এর সাথে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তিনি ধরিয়ে দেন যে, ‘সবকিছুর শুরু গ্রিস বা ইউরোপ নয় বা জ্ঞানের একচেটিয়া আধিপত্যের দাবিদার কেবল ইউরোপই নয়।’ ঝাল খাওয়া যাক আজফার হোসেনের মুখেই :

হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াডঅডেসি-এর বহু শতাব্দী আগেই মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমানের ইরাকে) গিলগামেশ নামের এক মহাকাব্যের উৎপাদন-প্রক্রিয়া শুরু হয়। যাকে আমরা ডায়ালেকটিকস্ বলি, তারও শুরু প্লেটো দিয়ে নয় বা গ্রিসে নয়; তারও শুরু মিশরে অর্থাৎ আফ্রো-আরব জগতে। যাকে ‘লিখন’ বলা হয়, তাও প্রথমে গ্রিসে বা ইউরোপে আবিষ্কৃত হয়নি; তা আবিষ্কৃত হয়েছে ইউফ্র্রেটিস ও টাইগ্রিস নামের দুটো নদীর মাঝখানের জায়গায়। অর্থাৎ এশীয় আরব্য জগতে।

এমনকি তিনি ‘মানচিত্র’ আখ্যানে দাবি করেছেন যে, গ্রিস এক সময় পূর্বেরই অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। পরে গ্রিসকে রীতিমতো ছিনতাই করে ইউরোপের বা পশ্চিমের অংশ করা হয়েছে। এই ছিনতাইয়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, এর সাথে উপনিবেশবাদের রয়েছে ঘনিষ্ঠ আঁতাত। এই আঁতাতের ফসল মানচিত্র। এমনকি মানচিত্রে ইউরোপকে যে পৃথিবীর কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে তা-ও ওই কেন্দ্রবাদ, আধিপত্যবাদ ও উপনিবেশবাদেরই ফল। তিনি বিস্মিত হয়ে লক্ষ করেছেন, ‘এশিয়ার উপাঙ্গ থেকেই জন্মলাভ করে ইউরোপ কিন্তু হয়ে ওঠে কেন্দ্র।’ দর্শনের প্রশ্নে তিনি কেন্দ্র ভাঙেন। ইউরোপীয় দর্শনের গদল নিয়ে কথা বলেন। তিনি এক দার্শনিকের বক্তব্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘জেমিসন্ যখন ভূমির সমস্যা নিয়ে কথা বলছিলেন কিংবা যখন বিশ্বায়নের কথা বলেছিলেন, তখন তাঁর কথায় বিশ্বের অধিকাংশ জায়গা—এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা—ভীষণভাবেই অনুপস্থিত ছিল।’ এগুলো পশ্চিমা দর্শন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন বৈ কি! এমনকি মানুষ বলতে ইউরোপীয় দর্শনে যে মূলত সাদা মানুষকে বোঝানো হয় তা নিয়েও আজফার প্রশ্ন তুলেছেন দর্শনাখ্যান বইয়ে। আজফারের এসব প্রশ্নের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝি দর্শনেরও ‘আখ্যান’ (কাহিনি!) আছে। বাংলায় ‘কাহিনি’ শব্দের একটা বাঁকা মানে আছে। কোথাও ঘাপলা দেখলে আমরা বলি, ‘হুম! এর মধ্যে কাহিনি আছে দেখছি!’ এই অর্থেও আজফারের বইয়ে ‘আখ্যান’ শব্দকে খুব পড়া যায় (আমি অবশ্য সেভাবেই পড়েছি। তাছাড়া বাংলায় আখ্যান শব্দের একটা অর্থ ‘কাহিনি’ও বটে)। কারণ, তিনি পাশ্চাত্যদর্শন, পুঁজিবাদ, মানবতাবাদ ইত্যাদির ‘কাহিনি’ বা গুমর খোলাসা করেছেন প্রতিটি আখ্যান বা নিবন্ধে। পাঠকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেছেন, ‘প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! দেখুন, কী সব কাহিনি করে রেখেছে ইউরোপ-আমেরিকা!’


দর্শনাখ্যান বইয়ে প্রায়ই তিনি দর্শনকে ঝালিয়ে দেখেছেন মধ্যযুগের কবীর-লালন থেকে শুরু করে আধুনিকযুগের জীবনানন্দ দাশ পর্যন্ত অনেকের কবিতার মধ্য দিয়ে।


দর্শনাখ্যান পড়তে গেলে যে-কারো মনে হবে, আখ্যানগুলো বিস্ময়করভাবে অর্গানিক্যালি একসুতায় গাঁথা। দর্শনাখ্যান চিন্তার দিক থেকে একটা কমপ্লিট গ্রন্থ। এটা শুধু কিছু নিবন্ধ-প্রবন্ধের মলাটিকরণ না। আমাদের অজানা নয় যে, বিচিত্র প্রবন্ধ-নিবন্ধ মলাটিকরণ করে গ্রন্থ আখ্যা দেয়া আমাদের ঢাকায় একটা মহামারী রোগে পরিণত হয়েছে। সেই দিক থেকে, আজফারের দর্শনাখ্যান বাংলায় পরিকল্পিত গ্রন্থের দৃষ্টান্তই বটে।

চোখ-কান খোলা পাঠক নিশ্চয় খেয়াল করে থাকবেন, ঢাকায় সাহিত্য সমালোচনা এখনো ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘বিষয় ও শিল্পরূপের’ একঘেয়ে কচকচানি থেকে খুব একটা মুক্ত হতে পারে নি। এর সাথে পুঁজিবাদ উপজাত ‘আধুনিক সাহিত্য সমালোচনা’ বা ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’-এর ঘনিষ্ঠ যোগ আছে। এই বই এই ধারার সাহিত্যসমালোচনার গালেও এক ওজনদার চড়। আজফারের এই বই ঢাকায় সাহিত্যের দার্শনিক পাঠে নতুন রসদ জোগাবে। কারণ দর্শনাখ্যান বইয়ে প্রায়ই তিনি দর্শনকে ঝালিয়ে দেখেছেন মধ্যযুগের কবীর-লালন থেকে শুরু করে আধুনিকযুগের জীবনানন্দ দাশ পর্যন্ত অনেকের কবিতার মধ্য দিয়ে। প্রয়োজনে বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন কবির কবিতায় ভর করেছেন। যদিও কবিতার মধ্যে দর্শনের খোঁজ তিনি করেছেন চকিতে। ডিটেইলে যান নি। কারণ এই বইয়ে তাঁর লক্ষ ছিল রাজনীতি ও দর্শন, কবিতা নয়।

কবিতার দার্শনিক ভাষ্য দেয়া লেখকের উদ্দেশ্য নয়। একথা ঠিক। কিন্তু অধিকাংশ আখ্যানে কাব্যিকতা চোখে পড়ার মতো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আজফার দার্শনিক বয়ান দিয়েছেন কবিতার ইঙ্গিতময় ভাষায়। এটা এই গ্রন্থের অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি দিক। উপভোগ্যও বটে। কিন্তু যেখানে তিনি বিশ্লেষণপ্রমুখ সেখানকার ভাষা কাব্যিকতামুক্ত। এসব জায়গায় বাক্য ইংরেজি বাক্যের স্ট্রাকচার দ্বারা প্রবলভাবে শাসিত। চোখে পড়ার মতো উপবাক্যবহুল। তবে প্রচুর আঁকাড়া শব্দের সংযোজনায়, গতির তীব্রতায়, সত্যের নগ্নতায় ও পজিশনের স্পষ্টতায় আজফারের গদ্য উপবাক্যের জঞ্জাল থেকে জাদুকরীভাবে উৎরে গিয়েছে। আজফারের গদ্যের এ এক শক্তির দিকই বটে।

কিন্তু একটি বিষয় বলতেই হবে, আজফারের দর্শনাখ্যান বাংলায় লেখা হলেও এর বিষয় ও অভিমুখ বাংলাদেশ নয়। বরং বিশ্বব্যবস্থাকে আলিঙ্গনে উন্মুখ এই বই। তা হতেই পারে। বাংলা ভাষায় লেখা বই বাংলার সমস্যা নিয়েই হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু আজফার যে-বিষয়গুলো নিয়ে এই বইয়ে ডিল করেছেন, সেই বিষয়গুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কনটেক্সটে লিখিত হলে তা আরো কাজের হতো বলে মনে হয়। অনুযোগ নয়, এ প্রত্যাশা। আশা করি, আজফার তাঁর পরবর্তী বাংলা বইয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করবেন। ঘরের ছেলে আরো ঘরে ফিরে আসবেন। ঘরে তার হাজারো সমস্যা। নিজের অসুস্থ ভাইকে ভালো না বেসে বিশ্বভ্রাতৃত্ব কেমন দেখায়!

Kudrat E-Hud

কুদরত-ই-হুদা

জন্ম ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৮, ফরিদপুৱ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন 'ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশ ও বাংলাদেশের কবিতা' বিষয়ে। পেশা : অধ্যাপনা।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস : আঙ্গিক বিচাৱ [আদর্শ, ২০১৩]
জসীমউদ্‌দীন [প্রথমা প্রকাশন, ২০১৮]

ই-মেইল : kudratehuda@gmail.com
Kudrat E-Hud