হোম বই নিয়ে অলকার কবিতা : সংসারীর পাহাড়ি মন

অলকার কবিতা : সংসারীর পাহাড়ি মন

অলকার কবিতা : সংসারীর পাহাড়ি মন
82
0

‘দরজায় খিল নেই’ একটি ঝুঁকিপূর্ণ কবিতার বই। ঝুঁকিপূর্ণ এই কারণে যে খিলহীন দরজা বিষয়ে আমরা কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসতে পারি না। খোলা দরজা একই সঙ্গে সঙ্কট এবং সম্ভাবনার সুযোগ করে দেয়। খিলহীন দরজা ভেদ করে ঠান্ডা বাতাস, আকস্মিক প্রেম, বেদনা, স্মৃতিকাতরতা থেকে শুরু করে চোর-ডাকাত এসে ভর করে অনায়াসে।

এখন পাড়ায় পাড়ায় তস্করের ভয়
ঘর খালি রেখে গেলে কি না কি হয়। (অজুহাত)

কথায় বলে, চোরের আর বাটপারের ভয় কী! একবার সব হারালে আর ভয়েরই-বা থাকে কী! সংরক্ষণবাদী এই মানব জীবন পার হয়ে যায় সংসার আর সুখ-সম্পদ আগলাতেই। একবার আগল খুলে গেলে কী হয়? অলকা নন্দিতার ‘দরজার খিল নেই’ সেই আবরণ-আভরণ খুলে ফেলার পাঁচালি তুলে ধরে।

আলমারিতে তালা ছিল। দরজায় খিল ছিল। যেদিন ডাকাত এসে নিয়ে গেল সব, সেদিন থেকে আমার গোপন বলে কিছু নেই, দরজায় খিল নেই। বললাম সাবলীল। (দরজায় খিল নেই)

অবশ্য দ্বার খুলে গেছে আরো আগেই। অলকার কবিতায় ডাকাত কেবল একটি অনুসঙ্গ। আদতে তার ঘরছাড়া মন। ঘরছাড়া আর ঘরে ফেরার টানাপড়েনেই কাটে তার কবিতার দিনকাল।

বাড়ি যাওয়ার কথা ভেবেছি বহুবার
মায়ের শাসন আর বোনের আদরে
খুলে যাবে দ্বার (অজুহাত)

ঘর ছেড়ে যাওয়ার কথা ভেবেছি বহুবার
না ঘরকা না ঘাটকা হয়ে লাভ কী? (ভুলে গেছি পাহাড়ের মন)

ঘরে আর বাইরে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের মুড়ি ফেটে রক্ত বেরোয়। (বয়স)

একই সঙ্গে তার মন পড়ে থাকে ঘরে ও সংসারে, আবার ঘর ছাড়িয়ে বেরিয়েও যেতে চান তিনি। ঘরে-বাইরের এই টানাপড়েন সাংসারিক বাঙালি চরিত্রের চিত্র।

ঘরকুনো বাঙালিও পাহাড় জয় করতে চায়। আর অলকার কবিতায় ঘুরে ফিরে পাহাড়ের ডাক আসে। আর কোনো বাংলা কবিতার বইতে আমি এত পাহাড় একসাথে দেখি নি কখনো—

বর্ষায় পাহাড় সবুজ শাড়ি পরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে প্রিয়জনের অপেক্ষায়। (প্রিয় জিনিস খুব দ্রুত হারিয়ে যায়)

বসন্তে পাহাড়ে যাব—
জুমক্ষেতে জল ঢেলে বুনো হাওয়ায় আঁচল উড়াব। (প্রতিশ্রুতি)

দুইপাশে ছুটছে পাহাড়। কখনো মেঘের বুকে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। কখনো-বা সোনা রোদে সবুজে উপচায়। বৈশাখে সব পাহাড় যেন যমজ ভাই। (বিজুর অপেক্ষায়)

পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে বেড়ে যাওয়া মেদ
নষ্ট করে দেয় পাহাড়ি সৌন্দর্য। (শীতের সুবলং)

ক্যান্ডি থেকে হাসালাকা গ্রামে যেতে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে অসংখ্য হনুমান সীতার কথা ভেবে ভেবে মেঘের কোলে কাটিয়ে দেয় জীবন। জন্ম-জন্মান্তরের সাধ মেটে নি তারও। দূরের দুগ্ধবতী পাহাড়ি ঝরনা ডাকে আমাদের। সময় ছিল, সাহস ছিল না যাওয়ার। সিদ্ধার্থের কথা ভেবে নেমে আসি সমতলে, যেখানে তামিল আর সিংহলীরা একঘরে থাকে। ধ্যানে মগ্ন রাখে জগৎ দাদা। (লংকা ভ্রমণ)

মেঘ ও পাহাড়ে ঘেরা নাফ নদী যেন বিঘাজুড়ে লবণের চাষ
শোকে মুহ্যমান কোনো সাদাশাড়ি
পড়ে আছে মৃত্তিকায়
স্বপ্নহীন, নীরব ধূসর (নাফ নদী)

সাধারণ মানুষ, সংসারী মানুষ পাহাড়ে বেড়াতে যায়, কেউ কেউ পাহাড়কে জয় করে, পাহাড়কে ভালোওবাসে হয়তোবা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমতলে নেমে আসতেই হয়, ঘরের টানে ফিরতেই হয়। অলকার পাহাড়ি মন বারবার ফিরে আসে সংসারের টানেই—

সমতলে নেমে ভুলে গেছি পাহাড়ের মন (ভুলে গেছি পাহাড়ের মন)

তবুও ফিরতে হয় নিজ বাসভূমে
বৃক্ষ ও পাতার কাছে
দ্রুত ফিরে আসার বাসনায় আমি আস্তিক হয়ে উঠি। (মধ্যবিত্ত)

পাহাড় ছাড়াও গ্রাম বারবার আসে তার কবিতায়। তবে এমন ধারণা করা যায়, নগরবাসী অনেকের মতোই অলকা নন্দিতার মূল রয়ে গেছে দূর গ্রামে। নাগরিক ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন প্রায়শই।

অখণ্ড অবসরে ফিরে দেখি আমি কোথাও নেই, পড়ে আছি সহস্রাধিক ইটের চাপায়। (আমি কোথাও নেই)

নিজের দর্পণে নিজেকেই খুঁজি, আমি নেই
বিনুনির ফাঁকে ফাঁকে স্থির অন্য কেউ। (আমি নেই)

গ্রীষ্মেও কম্বল মুড়ি দেই, ছুটে যাই গ্রামে। যেখানে আমার সাধের ময়না ছটফট করে। (প্রিয় মানুষেরা)

সংসারে, নগরের খাঁচায় বন্দি একটা মানবজীবন বারবার ফিরে যেতে চায় শিকড়ের টানে। গ্রাম আর পাহাড় তাকে নিয়ত ডাকে। আমাদের চৌহদ্দির চেনা ভূগোলের বাইরে তার বিচরণ। ‘শীতের সুবলং’, ‘শৈলানের বর্ষা-উৎসব’, ‘চিলমারি-সুর’, ‘হাওড় থেকে পাহাড়ে’, ‘লংকা ভ্রমণ’—কবিতার শিরোনাম দেখেই ধারণা করে নেয়া যায় তিনি আমাদের এই রাজধানী-কেন্দ্রিক জীবন থেকে বেরিয়ে পড়েছেন। তাই যেমন বলছিলাম, এত পাহাড় আর কোন বাংলা কবিতার একক বইতে দেখি নি আমি; তেমনি বলতে চাই, এতটা ভ্রমণের সুযোগও আর কারো কবিতার বইতে পাই নি আমি। আমি ভ্রমণের অবিরাম সুযোগ পাই অলকা নন্দিতার কবিতায়। রাঙামাটি, বান্দরবান, নীলগিরি, হিমছড়ি, ইনানী বিচ, সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা, পায়রাবন্দ, মিঠাপুকুর, রানীখং, পঞ্চগড়, রাজশাহী, ময়মনসিং, শ্রীমঙ্গল, সিলেট—এ যেন পুরো বাংলাদেশ উঠে আসে তার কবিতায়। এমনকি দেশ ছাড়িয়ে লংকা ভ্রমণেরও সুযোগ পাই তার রচিত পঙ্‌ক্তিতে। তবে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে আমাদের অপ্রধান নৃগোষ্টীদের জীবন আর সংস্কৃতি উঠে আসে তার কবিতায়। অপ্রধান নৃগোষ্ঠীদের উৎসব, আনন্দ, বেদনা চিত্রিত হয় তার কবিতায়।

সরলতা তার কবিতার অন্যতম সুর। উত্তরাধুনিক কবিতার জটিলতা পরিহার করেন তিনি। দুর্বোধ নন তিনি। উচ্চারণগুলি সরল, তবে গভীর। বাক্য গঠন, দুরূহ শব্দ ব্যবহার কিংবা কবিতার শরীর নিয়ে ব্যাপক নিরীক্ষাপ্রবণতা নেই অলকা নন্দিতার মধ্যে।

দূরের সবকিছুই তখন স্পষ্ট ছিল।
এখন চশমা ছাড়া চিনতে পারি না। (চশমা)

তবে কোথাও তিনি অতি সরল আছেন। খুব বেশি সরল মানুষের মতো তার কবিতার উচ্চারণও কখনোবা একপেশে হয়ে যায়—

গ্রামের সব পথ উৎসবের দিকে যায়
শহরের মানুষগুলো মুখোশ পরে ফূর্তি করে
হরহামেশা রঙ বদলায়। (উৎসব)

এমন উচ্চারণে রোমান্টিকতা আছে, কিন্তু তা অতি সরলীকরণও বটে। ‘গ্রামের মানুষ সরল’, ‘গ্রাম বেশি প্রাণবন্ত’, ‘শহরের মানুষরা মুখোশ পরা’—এমন সব কথাবার্তা অতি সরলীকরণের একচেটিয়া বহিঃপ্রকাশ হতে পারে কখনোবা।

কখনোবা এত পাহাড়, গ্রাম আর বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাইরে ভ্রমণ করে অলকা রয়ে যান একা। আদতে আধুনিক নিঃসঙ্গ নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা তাকে ক্লান্ত করে, বিষণ্ন করে—

বন্ধুরা এখন ব্যস্ত নিজস্ব ফেইসবুকে
কথা বলে অন্যের ভাষায়
আমার আনন্দ, আমার উচ্ছ্ল দিন
বিদায়। (বিদায়)

কখনোবা অলকার কবিতার দুয়েকটা লাইন বিদ্যুৎ-চমকের মতো মনে হয়। আপাতসরল আর ভ্রমণশীল বাক্যের গভীরে তিনি প্রথিত করে রাখেন গভীর আর স্থির প্রাজ্ঞ চিন্তা—

হঠাৎ বিদুৎ চলে গেলে মোম-ম্যাচেরও পাখা গজায়। (প্রিয় মানুষেরা)

প্রশ্ন জাগে মনে মোম-ম্যাচের পাখা গজানো আর পিপীলিকার পাখা গজানো কী এক? মোম-মেচের পাখা গজালেই কী মৃত্যু অবধারিত নয়? তবু এ মৃত্যু অহেতুক অহংকারের নয়, পিপীলিকার মতো নয়, অহং নেই, এ মৃত্যুতে আছে আত্মত্যাগ। মোম আর ম্যাচের পাখা গজালেই বিদ্যুৎবিহীন মুহূর্ত আলোকিত হয়। আরেকটি কবিতায় তিনি বলছেন—

এখন মাছ খেতে ভয় পাই। মাছের একটি কাঁটা বিঁধে আছে বহুকাল ধরে। (প্রিয় জিনিস খুব দ্রুত হারিয়ে যায়)

আমাদের সবারই ডিঙানোর জন্যে যেমন একটি করে ব্যক্তিগত দুর্গম পাহাড় রয়েছে তেমনি আমাদের সবারই আরাম, স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট হয় প্রকাশ্য আর গোপন বিবিধ কাঁটা বেঁধার ভয়েই।

এ কবিতা থেকে একটু, ওই কবিতা থেকে আরেকটু—এমন করে অনেক কবিতার উদ্ধৃতি তুলে ধরলাম। শেষটা করি একটা পূর্ণাঙ্গ কবিতা দিয়েই :

বাস থেকে ফার্মগেট মোড়ে নামলেই
আমার চোখ যায় অশত্থ গাছের পাতায়
মৃদু হাওয়ায় দুলে উঠে কেমন পানপাতা মন
কাকফাটা রোদ্দুরেও তারা বাতাসের ভাষা বোঝে
অল্পে তুষ্ট মানুষেরা সুখ নয়, শান্তি খোঁজে
ঝিরিঝিরি পাতার মতোন।

প্রাচীন অশত্থকে বৃদ্ধ বলো না, বলো বোধি
কারণ সে জানে সৃষ্টির রহস্য
সে জানে নির্বাণের গল্প
সে জানে সৃষ্টি ও ধ্বংসের নাবিক একজনই, মানুষ।

(অশত্থ গাছ)


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :

উপন্যাস—
মায়াবি মুখোশ
কমৎকার

ছোটগল্প—
অন্ধকারের গল্পগুচ্ছ
ছোট ছোট ছোটগল্প
শতগল্প
হয়তো প্রেমের গল্প

কবিতা—
চার লাইন

চলচ্চিত্র বিষয়ক—
বিশ্বসেরা ৫০ চলচ্চিত্র
বিশ্বসেরা আরো ৫০ চলচ্চিত্র
১০ রকম ১০০ চলচ্চিত্র
বিচিত্র চলচ্চিত্র
বিশ্বসেরা চলচ্চিত্র সমগ্র
বিশ্বসেরা শত সিনেমা
অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র

নাটক—
দুইটি ব্রিটিশ নাটক
তিনটি মঞ্চ নাটক

অনুবাদ—
সাদাকো ও সহস্র সারস
বব ডিলান গীতিকা
কাফকা : অণুগল্প
সাফোর কবিতা

শিশুতোষ—
মজার প্রাণীকূল

চিত্রকলা বিষয়ক—
বেদনার রং তুলিতে একটি জীবন

প্রবন্ধ—
বই কেনা, বই পড়া
বই বিশ্ব
কিতাবি কথা

অন্যান্য—
তিতা কথা

সম্পাদনা—
অনির্ণীত হুমায়ূন

ই-মেইল : moomrahaman@gmail.com