হোম বই নিয়ে অন্তরাল যাত্রার সিম্ফনি

অন্তরাল যাত্রার সিম্ফনি

অন্তরাল যাত্রার সিম্ফনি
778
0

দূরাগত সুরের তালে
দলছুট পাতা
প্রজ্ঞাবান বৃক্ষের পাতা
ক্রমশ পতনের দিকে, কম্পিত
তন্দ্রামগ্ন পাতা
গাছেদের হৃদয়ে স্বপ্ন জাগিয়ে
ক্রমশ গভীর নিচে!
[একটি পাতার ভ্রমণ]

এই ‘নিচ’ মূলত স্থান কিংবা কোনো দিককে নির্দেশ করে না। বস্তুত এ এক অন্তরাল ভ্রমণ। কলকাকলিময় বাহির দুনিয়া থেকে গুটিয়ে যাওয়া কোনো সত্তার গভীরে সন্তরণ। যেন পানির বুদ্বুদ পেরিয়ে শীতল তলদেশে কোনো মীন শুনে চলেছে স্রোতের বেহাগ।

তন্দ্রামগ্ন একটা পাতার তলিয়ে যাওয়ার যে চিত্রকল্প, তা যেন হয়ে উঠছে কোনো ধ্যানীর মানসকল্প। প্রজ্ঞাবান বৃক্ষের ছাল ফেটে যে বেরিয়েছে। দূরাগত সুরের টানে ছিটকে যাচ্ছে নিজস্ব বলয় থেকে এক অদ্ভুত সজ্ঞার জগতে।


দৃশ্যকল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে হুজাইফা খুবই সতর্ক। সহজ-শাদামাটা বহির্দৃশ্যের বর্ণনার চেয়ে তিনি আঁকতে চান অন্তর্দৃশ্য।


এইভাবে নিজের কাব্যযাত্রাকে চিত্রিত ও চিহ্নিত করেন হুজাইফা মাহমুদ তার অন্তঃস্থ ছায়ার দিকে কাব্যে।

সেই যাত্রার সবচেয়ে বড় অনুঘটক সুর। হুজাইফার সবচেয়ে সহজ আশ্রয়। শীতল অস্ত্রও বটে। খুব সন্তর্পণে কোনো প্রাণসঞ্চারী পথ্যের মতো তা বোধের সিরিঞ্জে পুশ করেন বাক্য-শরীরে। আর সুর হচ্ছে এমন এক বস্তু জগতের সমস্ত কিছুকে যে নিজের লুপের মধ্যে পুরে ফেলতে পারে। স্তব্ধ করে ফেলতে পারে। করতে পারে খুনও। তবে হুজাইফার সুর মরণঘাতী নয়। হুজাইফা বাঁচিয়ে রাখতে চান নিজেকে। পাঠককেও। কেননা তিনি মনে করেন :

কিছুটা সুর ধরে, কিছুটা তীর ধরে
ধীরে চলি
ধীরে
….
কিছুটা সুর ধরে, আরও কিছুদূর তবু যাওয়া যায়!
[কালসুর]

তিনি শুশ্রূষা নেন আত্মনাশের মন্ত্রে নয়, উল্লাসের দীপ্তিতে। ফলে স্থিত হন শ্রেয়োবোধে :

একফোঁটা আত্মা কেবল
ঘিরে রাখে অপার শূন্যতা,
তবু সমস্ত ক্ষত আজ ভরে গেছে
আলো আর সুরে,
যেন বিবশ স্বপ্নালোকে অবিরাম ঘণ্টারোল
যেন উতরোল আলোর কম্পনে হাসছে নিখিল!
[দ্য ড্রিম বেলস]

ধীর বায়ুপ্রবাহের মতো শান্ত-সমাহিত সে সুর ধরে সামনে এগোই। আর ঝরাপাতা উড়াতে উড়াতে যেমন আবিষ্কার করতে পারি ঋতুর বেদনাকে—গাছের মর্মকে, তেমনি ধরা দেয় এক পরিযায়ী কবির আত্মপরিচয়, দুনিয়া দেখবার চোখ। বিস্ময়াভিভূত কোনো প্রাণস্পন্দ সেখানে টের পাই। বহু উপাদান থেকে নিজের কথাগুলোকে যে কুড়িয়ে আনছে। সমুদ্র তটে কোনো শিশু যেমন আনমনে কুড়িয়ে চলেছে জলের দীপ্তিতে মাখা অজস্র জলনুড়ি।

কথা খুব বেশি নেই তার। না কথারাই সরব। বরং যেন গুঞ্জরণ আরাধ্য। ফলে তাকে পাই ছোট ছোট দৃশ্য ও বাক্য প্রক্ষেপণে। আর প্রভূত বিক্ষিপ্ত—গূঢ় কথনের মহিমায় রাঙানো স্তবক বিন্যাসের ভিতর এলায়িত নানা সংকেত-প্রতীক-রূপকের ভিতর।

কখনো পাতার হরন বাজে
অলস ঘুমের ঘড়িগুলো জাগাবে বলে,
[ইউরিডাইস]

শুনেছি, ওই অনির্ণীত দ্রাঘিমার তীরে
তোমাদের মায়া-বাড়ি
চিরকাল ঘুমঘোরে
অসীম উপকূলে হারানো জাহাজের ভেঁপু

যেন চিরকাল বাজে নিঝুম ঝিনুকের বনে!”
[ঝিনুক কুড়ানোর গান]

‘পাতার হরন’, ‘ঝিনুকের বন’ শব্দবন্ধের মধ্যেও পাই হুজাইফার নিজস্ব মুদ্রা। এ মুদ্রা ঝনঝন করে বাজে। অর্থ ও অনর্থের বাইরে কান ও মনকে যুগপৎ আরাম যোগান দেয়।

যেহেতু কবির চিন্তাপ্রবাহ গতি পায় সুরের প্রণোদনায়। ফলে সহায়ক এজেন্ট হিসাবে কাব্যে প্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে সুরসংশ্লিষ্ট বস্তু, বোধ ও ধ্বনির নিগূঢ় ব্যঞ্জনা।

আর, সহসা উন্মাদ বৃষ্টির গানে মুখরিত হলো
আমাদের অলৌকিক ভোরের বাগান
[ভোরের বৃষ্টি]

আর অবশিষ্ট দুঃখের আওয়াজ
ফেলে গেল যারা
দুপুরের বনভূমি জুড়ে
তারই বিহ্বল ভায়োলিন
বেজে ওঠে আজ
[একটি পাতার ভ্রমণ]

এখানে তন্দ্রা পাহাড়
এলায়িত বৃক্ষের বাগান
দু’হাতে বাজাই জাদুর এস্রাজ
[তন্দ্রা পাহাড়]

আরও দূর থেকে আসি আমি অজ্ঞাত বেহালা বাদক
ময়ূরপুষ্প অন্ধকার ছড়িয়ে দেই তোমার দূরাগত স্বপ্নে
এলোমেলো রিডের কম্পনে, কাঁপে উদ্যানপথ
পাখির পালক, মিহিন কেশদাম
[স্বগতসন্ধ্যা]

পৃথিবীব্যাপ্ত এক দুপুরের দেবদারু বন
দিনমান পাতার মর্মরে বাজে অপার ভায়োলিন
[জন্মান্ধ]

আর নাশপাতি বনে, নিমগ্ন যে বেহালা বাদক
তাকে ডেকে দিচ্ছে দীর্ঘ কাজু বাদামের ছায়া
[শালবন]


নির্জনতাপ্রিয় ব্যক্তির নির্জলা অনুভূতির পৃষ্ঠপোষক হুজাইফা। যিনি নিজেকে প্রতিস্থাপন করেছেন দেশকালহীন অখণ্ড সময় ও সত্তার কেন্দ্রে।


সংগীতের অনুষঙ্গকে কবি আশ্রয় করেছেন মূলত বাণীকে ললিত করার জন্য। ফলে প্রশ্ন জাগে, সুরই কি সবচেয়ে তীক্ষ্ণভেদী অস্ত্র? প্রকৃতি, মানুষ ও বস্তুনিচয়ের মর্মের যোগসাধনে সুর অবিকল্প? হুজাইফার কবিতা পাঠে তীব্রভাবে এই প্রশ্ন অন্তর্লোকে আঘাত করে। শব্দ ও বাণীর সাধারণ সীমানাকে দূর প্রসারিত করার জন্য কবিরা নানা পদ্ধতি অবলম্বন করেন। চিত্রকল্প তেমনই এক পদ্ধতি। কিন্তু দীর্ঘ চর্চায় দেখা গেছে, কল্পনার আতিশয্য গিয়ে ঠেকেছে বিমূর্ততা-দুর্বোধ্যতা-শব্দের ব্যায়ামে। হুজাইফা এই প্রেক্ষিতের মধ্যে নিজেকে প্রতিস্থাপন করেছেন দারুণ এক কৌশলের মাধ্যমে। সুর, ইমেজ আর বাণীর মিশ্রণে ঘন করে তুলেছেন তার সৃষ্টিকে। সম্ভবত এটাই তার ফর্ম। গদ্যের সরল গতিতে তিনি বাঁধ দিয়েছেন উল্লম্ফনের মাধ্যমে। আর উল্লম্ফনের ধাঁধাকে সহনীয় করেছেন দারুণ সব দৃশ্যকল্প সহযোগে, দৃশ্যকল্পকে মর্মগ্রাহী করেছেন সুরের আবেশ তৈরি করে।

দৃশ্যকল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে হুজাইফা খুবই সতর্ক। সহজ-শাদামাটা বহির্দৃশ্যের বর্ণনার চেয়ে তিনি আঁকতে চান অন্তর্দৃশ্য। প্রাকৃতিক দৃশ্যের সাথে কবির মনস্ক্রিয়া মিলেমিশে তৈরি হয় বিরল সেসব দৃশ্যনিচয়। উদ্দেশ্য ও বিধেয় প্রযুক্ত সেসব দৃশ্য কবির মনোজাগতিক আকাঙ্ক্ষারই রূপ মনে হয়। ফলে প্রকৃতির অনুকারক মনে হয় না তাকে। সেয়ানা শিল্পীর তুলির সহজাত পোঁচে রং যেমন নানা আকৃতি ও স্বভাবে প্রাণবান হয়ে ওঠে, তেমনি শব্দ হুজাইফার চিন্তাপ্রক্রিয়া ও সৃজনক্রিয়ার লালিত্যে জ্বলজ্বল করতে থাকে। এটা ঘটে তীব্রভাবে। কৃপণতার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে পেরেছেন বলেই তার বাক্য টানটান হয়ে ওঠে। নতুনের প্রগলভতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার এই বুদ্ধি তার লেখাকে ওজনের ভারে ঋদ্ধ করেছে। পরিণত কবিমস্তিষ্ক যে সেখানে ক্রিয়াশীল পঙ্‌ক্তির পর পঙ্‌ক্তি সে সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

মরমিপনা কোথাও কোথাও ছুঁতে ছেয়েছে হুজাইফার কবিতাকে। মাতৃ-সিঁথি বেয়ে নেমে আসা নদীর যে আত্মমুখী যাত্রা, তাতে কখনো কখনো ঢেউ তুলতে চেয়েছে—অলৌকিক খিলানের ছায়া, দুঃখিত গজলের সুরে বহমান অপার নদী, নিগূঢ় অন্ধকারে দ্বিধাগ্রস্ত ঘোড়ারূপ রুহ, অন্তঃস্থ ছায়ার দিকে নুয়ে থাকা গাছ প্রভৃতি প্রসঙ্গ। আত্ম অনুধ্যানের এই ঝোঁক হুজাইফার কবিতার ভিত্তিভূমিকে হয়তো আরও পোক্ত করতে পারত। কিন্তু তার ‘পথের সংশয় কাটে না কোনোদিন’। ফলে নিখিল প্রশ্নবিন্দুতে এসে তার মনে হয় :

সারি সারি জড়দৃশ্যের ভেতর
অমীমাংসিত গোলকধাঁধা
মায়াবিভ্রমের অপার হেঁয়ালি
[মায়াবিভ্রম]

এই মডার্নিস্ট সংশয়, দ্বিধা ও বিভ্রম হুজাইফার মানসকে অনেকখানিই নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে।

বিশেষণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও হুজাইফা বেশ কিছু জায়গায় চমৎকৃত করেছেন। কবির চিন্তার জোরকে চিনিয়ে দেয় বিশেষণ। সৃষ্টিকে করে নতুন স্বাদে রসস্নিগ্ধ। অলৌকিক খিলান, আম্মার নির্জন চোখ, সহজ মেয়েলী গ্রাম, অন্তঃস্থ ছায়া, নৈঋত দিন, অলৌকিক ভোর, কসমিক তামাশা, শিলীভূত বৃষ্টি, রোদনভর্তি দৃশ্য, কসমিক কোলাহল, বিহ্বল ভায়োলিন সেইরকম দারুণ কিছু স্ট্রোক।

অনুভবের মায়া মাখানো কোলাজ হুজাইফার কবিতার আরেক অনন্য দিক। ব্যক্তিগততা সেখানে কসমিক ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়। ফেনানো আবেগের লাগাম টেনে ধরে স্বল্পশব্দ ব্যয়েই কবি ছুঁইতে পারেন ইন্দ্রিয়জ স্পর্শকাতরতাকে। ফলে সেটা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো মুহূর্তের মধ্যে অনুভূতিকে আক্রান্ত করতে সক্ষম। দৃশ্যরূপের অঙ্কনশৈলীতে চারুশিল্পীর কৌশল যোগ হলে তা চিত্রকর্মের আভিজাত্যে উন্নীত হয়।

অসংখ্য উজ্জ্বল নক্ষত্রের মাঝে
একা একা চাঁদটির রাত কাটে নরম পুঁইয়ের মাচায়,
বিবিধ রজনীগন্ধা ও রাজহাঁস দেখে।
[নুড়িগুচ্ছ]

ঘন ঝোপ, বুনোলতা
নুয়ে পড়ে চাঁদের ছায়া
কুয়াশায় ভিজছে বুবুর মন
[বুবু]

কুড়িয়ে আনছি মহিষের ঘুম,
ফুলগন্ধ,
লতা পাতা,
বাতাস এসে উল্টায়ে দেয় যেইসব পাতার শরীর
[কালসুর]

মায়ের নাকছাবি
কোথাও অচেনা ফুল হয়ে ফোটে
আর ঘ্রাণের ভিতর কাটে সারাটা দুপুর
[উড্ডয়ন]

হুজাইফার অঙ্কিত দৃশ্য গতিময়। চলচ্চিত্রিক ট্রিটমেন্ট প্রয়োগ করে তিনি দৃশ্যের সচলতা, তার ইম্প্রেশন ও ইম্প্রোভাইজেশনকে তুলে আনতে পারেন। প্রকৃতির সাথে গভীরভাবে লগ্ন না হলে এটা করতে পারাটা একটু কঠিনই।

নির্জনতাপ্রিয় ব্যক্তির নির্জলা অনুভূতির পৃষ্ঠপোষক হুজাইফা। যিনি নিজেকে প্রতিস্থাপন করেছেন দেশকালহীন অখণ্ড সময় ও সত্তার কেন্দ্রে। মানুষের থেকে একটু দূরে সান্দ্র কোনো প্রকৃতির মৌন মুখচ্ছবিই যেন তার অভীষ্ট। ফলে তিনি ওক গাছের নিচে পরম গ্রন্থের পাঠরত এক মেষ পালকের কথা বলেন বটে, কিন্তু সেটা কাব্যের চিহ্নায়ক প্রতীক কিংবা বর্গরূপে হাজির হয় না। যে স্নেহসুতায় আম্মা ও বুবুর সাথে তিনি বান্ধা সেটা বাঙালি কৌমের বিশেষ বৈশিষ্ট্যরূপে হাজির না হয়ে নিঃসঙ্গতার উদ্‌যাপনরূপে এসেছে। এই কারণে কসমিক কোলাহলের ভিতর রোদনরত বাড়িটি হারিয়ে যায়। এই নক্ষত্রভেদী দুঃখবোধ বাঙালি সমাজে বিরল। এসবের ভিতর দিয়ে আসলে হুজাইফা হয়ে ওঠেন কসমোপলিটান রুচির পৃষ্ঠপোষক। ধর্মবর্ণজাতি নিরপেক্ষ এনলাইটমেন্টেরই এ এক শ্রেয়োধারা। ফলে বলা যায়, হুজাইফা আধুনিকতাবাদী কবিদেরই এক উত্তরসাধক। কিন্তু সমসাময়িক শিল্প-ব্যর্থতা ও টানাপোড়েন থেকে মুক্ত। যেন এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র তীরের টিলায় বসে কেউ গাইছে ঝরনার উচ্ছল গান।


প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পদ্বন্দ্বে তিনি চোরাটান অনুভব করেন পাশ্চাত্যের দিকে, এটা বলাই যায়।


এই যে বৈপরীত্যময় বাস্তবতায় গান গাওয়ার হিম্মত, এই যে মন্দমন্থর সুরের আবেশ তার কবিতাকে ছেয়ে থাকে, এর শেকড় কোথায়, ভাবি?

উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনে হয় স্প্যানিশ সাহিত্যের তন্নিষ্ঠ পাঠক হুজাইফা সঙ্গত করছেন কবি হুজাইফার সুরসৃষ্টির অন্তরালে। ফলে বাংলার সহজিয়া সুর, সাধনা ও জীবনরূপের চেয়ে তার কবিতায় আড়ালে উঁকি দেন লোরকা, মাচাদো, হিমেনেথ প্রমুখ স্প্যানিশ কবিদের নানা সুর ও স্বরকণা। এ কারণে বাঙালি জনসংস্কৃতির পাটাতনের মধ্যে তাকে খুঁজে পাওয়া মুশকিলই। কবিতা বিষয়ক ইউরোপীয় ধারার সেক্যুলার মনোবৃত্তির সচেতন প্রয়োগ ঘটাতে গিয়ে তিনি সযত্নে এড়িয়ে গেছেন মানুষের স্থানিক চিন্তা ও আচরণবিধিকে। ফলে তার কবিতা যেন হয়ে ওঠে পাশ্চাত্য সাহিত্যাদর্শের প্রাচ্যীয় ভাষ্যরূপ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পদ্বন্দ্বে তিনি চোরাটান অনুভব করেন পাশ্চাত্যের দিকে, এটা বলাই যায়।

আধুনিক বাঙালি কবিদের যে স্কুলিং, তাতে লোকজ মনোবৃত্তি, ঐতিহ্য ও ধর্ম সমাদৃত হয়েছে কমই। বড় একটা অংশের মননে পৌরাণিক ধর্ম, বিবিধ মহাকাব্য ও ইউরোপ [কখনো ইংরেজি, কখনো ফরাসি, হালে স্প্যানিশ] যেভাবে আলোড়ন তুলেছে, তার ছিটেফোঁটা মনোযোগও যদি পেত স্বদেশভূমির অন্ত্যজ, ব্রাত্য, প্রান্তিক তথা নন এলিট মানুষেরা, তাহলে হয়তো বাংলা কাব্যের ইতিহাস ভিন্নরূপ লাভ করত। ধান ভানতে হয়তো শীবের গীতের মতো মনে হবে, তবুও হুজাইফার কবিতা পাঠের সুযোগে এই গীত আমি গেয়ে যাচ্ছি মূলত একজন নবীন কবির শুভ উদ্বোধনের দিনে তার অপার ক্ষমতার সর্বোত্তম ব্যবহারের প্রত্যাশার দায় থেকে। কবির পথনির্দেশ করা সমালোচকের কাজ নয়। কিন্তু কবিকে বাগে পেয়ে সমালোচক ছত্রিশ ঘা না দিয়ে কেবল তৈলমর্দন করবে, সেটাও কাম্য নয়। ফলে সম্ভাবনা ও শঙ্কা নিয়েই একজন তরুণ কবিকে আমি পাঠ করতে চাই। একই নিক্তিতে বন্ধুপ্রতীম হুজাইফা মাহমুদকেও।

বাঙালি পাঠকের দরবারে হুজাইফা হাজির কবিসুলভ সহজাত মিষ্টি সুর নিয়ে, নিজস্ব বাকস্পন্দ ও প্রাপ্তমনস্ক পরিমিতি নিয়ে। কেবল কেবলাটা ঠিকঠাক চিনে রাখতে পারলেই কেল্লা ফতে।


অন্তঃস্থ ছায়ার দিকে হুজাইফা মাহমুদের প্রথম কাব্য। প্রকাশ করেছে নবীন প্রকাশনা : ঢাকা প্রকাশ। প্রচ্ছদশিল্পী : রাজীব দত্ত। মূল্য : ১২০ টাকা।

মোস্তফা হামেদী

২৭ আগস্ট, ১৯৮৫; ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, সরকারি মুজিব কলেজ, কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী।

প্রকাশিত বই :
মেঘ ও ভবঘুরে খরগোশ [কবিতা; কা বুকস, ২০১৫]
তামার তোরঙ্গ [কবিতা; জেব্রাক্রসিং. ২০১৮]

ই-মেইল : mostafahamedchd@gmail.com

Latest posts by মোস্তফা হামেদী (see all)