হোম বই নিয়ে অজস্র ধ্বনির অকেস্ট্রা

অজস্র ধ্বনির অকেস্ট্রা

অজস্র ধ্বনির অকেস্ট্রা
286
0

বিচ্ছিন্নতার ছায়াতলে বসেও কোভিড-১৯ আতঙ্কে সারা বিশ্ব এখন কম্পিত। সঙ্গনিরোধ কাল। বেশ কিছুদিন, আমারও নিজের সাথে নিজের বসবাস। এরইমাঝে হঠাৎ এক রাতে নির্দেশ এলো, সিসিফাস হও। কী রূপ সিসিফাস?

সাদা চোখে ভাগ্যবিড়ম্বনার যে সিসিফাসের পাথর তোলা আর গড়ানোর গল্পটি আমরা জানি সেরকম, নাকি কাম্যুর মিথ অব সিসিফাসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী সেই সিসিফাস যে পাথর ঠেলে তোলে হাসিমুখে এবং সেই কাজটার আগে কী ঘটেছিল, একটু পরে কী ঘটবে, তা মাথায় রাখে না!

রাজি হয়ে যাই। এবং এ যাত্রায় দু’রকমভাবেই নিজেকে সিসিফাস ভাবতেও চাই। কেননা কদিন ধরে একটি কবিতাগ্রন্থ রাত্রি ও বাঘিনী পড়তে চেয়ে তার প্রথম পাতা ছাড়িয়ে দ্বিতীয়. তৃতীয় করে বেশ কিছু পাতা এগিয়েছি ঠিক, কিন্তু তারই মাঝে আবার অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় বই খোলা পড়ে থাকে আর পাতাগুলো এলোমেলো নিজের মতো চলে। আবার আমি বইটির প্রথম পাতা খুলে বসি। অতএব এইখানে আমি অডিসি, ওভিদের সেই মিথের চরিত্র। অথচ নিজেকে কিছুতেই দুর্ভাগা ভাবতে পারি না, কারণ রাত্রি ও বাঘিনী পাঠ যে এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে, সে সুপ্ত ইঙ্গিতটি তো টের পাই। মনের ভেতর জ্বলজ্বল করে তার কাব্যইশারা। আবার এও জানি পাঠশেষে বাংলা সাহিত্যের আশির দশকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবি জুয়েল মাজহারের কবিতা নিয়ে এই যে আমি আমার অনুভূতি জানাব, এক অর্থে আমি যথেষ্ট দুঃসাহস দেখাতে চলেছি। এ বেলায় তাই আলবেয়ার কাম্যুকে স্মরণ করি। সিদ্ধান্ত নিই, আমি এখন রাত্রি ও বাঘিনী নিয়ে আমার অনুভূতি জানাব এবং এখন আর কোনো পূর্বাপর ভাবব না। কাজেই, কবি জুয়েল মাজহার প্রণীত রাত্রি ও বাঘিনীতে এবার পূর্ণ মনোসংযোগের চেষ্টা করি। মলাট থেকে, প্রিন্টার্স লাইন, ফ্ল্যাপ থেকে ব্যাক পেইজ উল্টেপাল্টে দেখি। মোস্তাফিজ কারিগরের প্রচ্ছদটি এইক্ষণে আমার ভালো লেগে যায়। মোচা আর সিডারের মিলিত রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর রাতকে কালো অ্যাবস্ট্রাক্টশনে নারী-আদলের মতো করে টেনে আনা হয়েছে, যার বুকের মাঝ বরাবর জ্বলে আছে লাল বৃত্তের ভরা পূর্ণিমার চাঁদ! রাত ছুঁয়ে নিচে বয়ে যাচ্ছে ব্রোঞ্জ-কেনারির ঢেউ।

পাতা উল্টে যাই। উৎসর্গের পাতায় চোখে পড়ে ‘রাত্রি ও বাঘিনী’ নামক মনোগ্রাহী অথচ শিউরে ওঠা এক কবিতা, যে নামে মূল বইটির নামকরণ করা হয়েছে। ‘থ্যাঁতলানো অণ্ড-শিশ্ন, কালশিটে উরু ও জঘন আর/ এই দুটি রক্তমাখা ঠোঁটে বিশল্যকরণী ঘষে/ ফিরে পাবো অনাঘ্রাত আমাকে আবার/ আমাকে পাবে না আর বাঘিনীর অতিরিক্ত রতি-আক্রমণ!’ এ কবিতা পাঠের পর সম্পূর্ণ বইটি এক বসাতেই পড়ে ফেলার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা মনে তৈরি হয়ে যায়। পাতা উল্টে দেখি পরের পাতায় লেখা আছে কবিতাগুলোর রচনাকাল, ২০১৭-২০১৯। অর্থাৎ দুই বছর তিনি যে ধ্যানে মগ্ন ছিলেন তারই ফসল এবার পাঠকের হাতে। দেখার পালা সূচিপত্রও। সেখানে গুনে দেখা গেল মোট চব্বিশটি কবিতার নাম অঙ্কিত হয়েছে, যদিও চব্বিশটি কবিতার মাঝে বেশ কিছু কবিতা আবার সিরিজ কবিতা। যাহোক, এবার আমার পাঠযাত্রা শুরু। মনোযোগ অক্ষুণ্ন থাক শুরুর কবিতা ‘আততায়ী’-তে :

আততায়ী

আমি জানি, আমার প্রস্থানপথ হয়ে থাকবে
শয়তানের পুরীষে আবিল!
স্বপ্নের ভেতরে গিয়ে জিরোবার ছল করে ডাকলে তোমাকে
কান দু’টি ভরে উঠবে প্রতিধ্বনিময় কা-কা রবে;

অথবা, আমার স্বর শুষে নেবে খর মরুবালি;
ঘুমের অশক্ত ডাল ভেঙে যাবে
চোখ দুটি খসে পড়বে নর্দমার পাঁকে

আমাকে ঘুমন্ত দেখে কালো দাঁড়কাক
অবসিডিয়ান নাইফের মতো তার ঠোঁটজোড়া নিয়ে
আমার মুখের দিকে ঝুঁকে র’বে, চেয়ে র’বে চুপ;

— সারারাত বসে থাকবে শান্ত হয়ে বুকের ওপরে।

আমি এর কিছু জানবো না।

কাব্যিক ডানার প্রসারে বর্ণিত এক ব্যক্তিক দর্শন! শুধুই ব্যক্তিক? অবচেতনে আমারও তো বাজছে মৃত্যুর ভায়োলিন, আমি আক্রান্ত হচ্ছি, হায়… আমি এর কিছু জানবো না… কিছু জানবো না… কবি নিজেকে ছিড়েখুঁড়ে তবেই কি তুলে আনেন এমন তীব্র কবিতা? পঙ্‌ক্তিতে পঙ্‌ক্তিতে ঝরে পড়ছে যাপনের ভেতর ভীষণ অন্ধকারের কথা। কা-কা প্রতিধ্বনিতে ছড়িয়ে পড়ছে ক্যাওস। প্রলম্বিত শ্বাস নিতে নিতে ভাবি প্রস্থানপথ, চলে যাব, চলে যাব সবাই। যেতেই হয়। ঘুমের অশক্ত ডাল ভেঙে যাবে… এ ভঙ্গুর জীবনের শেষকথা তো ওই। আর যাপনের পদে পদে জমাট অন্ধকার, আমাকে স্থির দাঁড় করিয়ে দেয় এক অবসিডিয়ান নাইফের সাথে দাঁড়কাকের ঠোঁটের তুলনায়। ভাবি অবিসিডিয়ান নাইফ, ভাবি দাঁড়কাকের ঠোঁট… কবিতায় রয়ে যায় কত যে ইশারা!

মানুষের উপাখ্যান। বারো পর্বের সিরিজ। পাঠকের দিকে তীক্ষ্ণ শর নিক্ষেপের তুমুল এই কবিতার প্রতিটিই মানুষ সম্পর্কে উচ্চারিত তীব্র সত্যবচন। মানুষ এবং মানুষ। কবি জুয়েল মাজহারের কবিতায় মানুষ প্রধান এক উপজীব্য। এইসব কবিতায় তিনি অবলীলায় বর্ণনা করেন মানুষের স্বরূপ এবং তীক্ষ্ণ ব্যঞ্জনা হানেন, যা একেবারে মর্মে গিয়ে আঘাত করে। শুরুতে তাই হয়তো তিনি বলেন, তোমার উদ্দেশে আমি বহুস্তর বুলাভা মিসাইল/ স্বপ্নে নয়, ঘুমে পাঠালাম। ব্যতিক্রমী স্বর, অন্যরকম এক সূচনা, তারপরই সাবমেরিন বেজড ব্যালেস্টিক মিসাইলগুলো পরপর আঘাত হানতে থাকে। মানুষ নিজের কাছেই হয়ে যায় পর, মানুষের চিন্তা, প্রেম, স্নেহ ও ঘৃণার মর্মে/ ওঁত পেতে থাকে বুমেরাং, মানুষ চাইছে শুধু জতুগৃহ, যুদ্ধ, হ্রেষা, রক্তহোলি, খুলি আর জয়, অথবা মহাশয়গণ শুধু শংসা চায়, দর্প চায়… তীব্র তীক্ষ্ণ শ্লেষে তিনি খুলে দিচ্ছেন আগল। পঙ্‌ক্তিতে তুলে ধরছেন মানুষের ক্ষুদ্রতা। আবার একইসাথে এ কবিতায় তুলে আনা হয়েছে সমগ্র মনুষ্যজাতির ভিতর আরেক শ্রেণির মানুষের কথাও যারা অসহায়, নিরন্ন ও নিরুপায়।

কবিতার নাম ‘সিঁড়িঘর’। শুরুতে প্রেম, শুরুতে মদির ভ্রুকুটি অথচ শেষ অবধি সেই প্রস্থানের দিকেই তার যাত্রা, অর্থাৎ এ কবিতার শুরুয়াত এক ইরোটিক যাত্রার সম্ভাবনা মনে করালেও একেবারেই ভিন্ন মেজাজে তার সমাপ্তি ঘটে। তৃতীয় বিশ্বে এই যে অন্যের মর্জিতে বাঁচা আর হাঁড়িকাঠে গলা পেতে রাখা তা যেন কখন বহুমাত্রিকের দিকে যাত্রা শুরু করে। মানুষের ঈর্ষা ও চাতুরির ছলকে তিনি তাঁর জাদুকরী কাব্যভাষার তীব্র শ্লেষে আঘাত হানেন, বারবার যা মনে এসে লাগে। তাঁর কবিতার যে বৈশিষ্ট্যটি আমাকে আকর্ষণ করে তা হলো কল্পনাশক্তির অসামান্য ব্যবহার। তিনি অনায়াসে আমাদের নিয়ে যান অতিবিস্ময়কর এক-একটি কল্পনারাজ্যে, যেখানে অবাধে এসে পড়ে স্বাভাবিক জগৎ-বহির্ভূত রহস্যঘন অন্য এক জগতের অনুষঙ্গ। আসে ভূত, ডাইনি, প্রেত, মিথের কিছু চরিত্র। প্রতিবেশী, নিজের প্রেতের সাথে, রাইতের নীল ডহরে, বিলজিবাব—এই কবিতাগুলোতেও এর সংশ্লেষ ঘটেছে। মনুষ্য-চেনা জগৎ আর অচেনা রহস্যময় জগৎ, পরস্পরকে তিনি এতটাই সাবলীলভাবে সম্পর্কিত করে দেন যে মনে হয় যেনবা এইসব চরিত্রদের সাথে আমাদেরও সহজ বসবাস।

তেমন একটি কবিতা ‘বিলজিবাব’। অচেনা এই বিলজিবাব শব্দকে ভর করেই একটি কবিতা এগিয়ে যায় যখন, তখন কৌতূহলী মন স্বভাবতই প্রশ্ন তোলে, বিলজিবাব কী? বিলজিবাব কে? উত্তর মেলে গুগলে, বিলজিবাব বাইবেলে বর্ণিত এক ডেভিল চরিত্র, যে আসলে শয়তানকুলের রাজকুমার, মাছির দেবতা। ‘যেখানে গড়বা তুমি ঠাইন,/ তোমার পিছন নিবে/ তিন লক্ষ সাতশো কোটি/ পেত্নি পিশাচ আর ডাইন।’ কবিতার শুরু এভাবে। সামান্য এগোলেই দেখা মিলবে বিলজিবাবের, যার বাস অন্তরে। ‘ব্রহ্মাণ্ডের অচিন, প্রাচীন আর গহন সন্ধ্যায়/ আমারই ভিতর থিকা বাইর হয়া আসবে বিলজিবাব।/ সে আমারে বলবে কানে কানে:/ মিয়া সাব ডরায়ো না!/ বানায়ে তুলব আমি তোমারে ক্রমশ/ স্বাদুতম/মধুতম/ সদা ঝলসিত এক/ প্রকাণ্ড কাবাব।’ বিলজিবাব কবিতায় কেবল মিথনির্ভর অতিলৌকিক চরিত্রই আনা হয় নি, কবিতার ভাষাটিও লক্ষণীয়। কিন ব্রিজ দেখবার স্মৃতি, খোমা, রাইতের নীল ডহরে, চিরাং বাজারে কান্দে চান্দ সদাগর—এ বইয়ের আরও কিছু কবিতা, যেখানে এধরনের মনোরম কথ্যভাষার দেখা মেলে। ভালো লাগার আরেকটি কবিতা কবি আল মাহমুদ স্মরণে ‘গোলাপের জন্ম’, যা টানা গদ্যে লিখিত। এরই বিপরীতে আবার সমান ভালো লাগায় আচ্ছন্ন করে প্রবল ঝোঁকের আরেকটি কবিতা ‘পিগমি হেন এই টরসো আমার’।

কবি জুয়েল মাজহারের কবিতার সরল উচ্চারণটি আমার ভালো লাগে এবং পাঠকমনের গভীরে তা পৌঁছে যায় সহজে। তিনি কখনও তাঁর কবিতা দিয়ে শ্লেষে ফালাফালা করে দেন সব, কখনও উদাসীনতায় ভর করে চলেন পথ। কবিতাগুলোও এমন এক ইশারা, যা উপলব্ধিকে, চেতনাকে জাগ্রত করে। কবিতা বহুরৈখিক হয়ে নানা আঙ্গিকে, ভাষার ভিন্নতায়, পাঠকের চেতনায় এমন অনুরণন তোলে যা বিস্ময়কর। অপূর্ব ইমেজারি আর নিজস্ব শক্তিশালী এক শব্দভাণ্ডার, কবিতায় ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দ, কথ্যভাষার ব্যবহার ছাড়াও, মাঝে মাঝে ইংরেজি শব্দের অনায়াস আনাগোনা, মিথ এবং ঐতিহাসিক কিছু চরিত্রের ব্যবহার এসমস্ত মিলিয়ে তাঁর কবিতা পাঠককে আরো পাঠের জন্য তৃষ্ণার্ত এবং আগ্রহী করে তোলে।

বইটির প্রথম কবিতা আমি শুরুতে দিয়েছিলাম। যারা এখনও পড়েন নি তাদের উদ্দেশ্যে রাত্রি ও বাঘিনী থেকে আমার ভালো লাগা আরেকটি কবিতা এখানে রাখলাম—

কিন ব্রিজ দেখবার স্মৃতি

দুই কিংবা তিন সাল আগে আমি শ্রীহট্টতে গিয়া
শ্রীহট্টরে ফিরা পাই নাই

কিনব্রিজে গিয়া দেখি কিনব্রিজ নাই।

শুধু একটা জংধরা জীর্ণ লাল লোহার ধনুক
সুরমা নদীর উপ্রে উপ্তা হয়া আছে

তাহার বুগলে এক আলিশান ঘড়ি; যারে আলি আমজাদ
চাবি মাইরা রাইখা গেছে। তবে এর দীর্ঘ পেন্ডুলাম
আজ আর লড়ে না চড়ে না।

যেনবা সে আসঙ্গবঞ্চিত কোনো অভিশপ্ত মৃত দানবের
নতমুখ প্রকাণ্ড নিঃসাড় লিঙ্গ; আইজকা তাহারে

ঘিরিয়া ঘিরিয়া শুধু বেশুমার চামচিকা ওড়ে


মূল পাতার লিংক : পরস্পর ঈদ আয়োজন ২০২০

মেঘ অদিতি

জন্ম ৪ মে, জামালপুর।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : এমএসএস [লোক প্রশাসন], ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ডুয়েল ডিপ্লোমা ইন মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড ওয়েব প্রফেশনাল [এরিনা মাল্টিমিডিয়া]।

পেশা : গ্রাফিক্স ডিজাইনার।

প্রকাশিত বই—

জল ডুমুরের ঘুম [কবিতা, সাম্প্রতিক, ২০১২]
অস্পষ্ট আলোর ঘোড়া [গল্প, আগুনমুখা, ২০১৩]
ও অদৃশ্যতা হে অনিশ্চিতি [কবিতা, সাম্প্রতিক, ২০১৪]
সময় শূন্যতার বায়োস্কোপ [গদ্য ও গল্প, ঐহিক ২০১৫]
প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত [কবিতা, অনুপ্রাণন, ২০১৬]
পাখি সিম্ফনি ও ক্যালাইডোস্কোপ [কবিতা, ঐহিক, ২০১৮]

ই-মেইল : megh613@gmail.com

Latest posts by মেঘ অদিতি (see all)