হোম গদ্য গল্প শিকারির বিচার

শিকারির বিচার

শিকারির বিচার
27
0

আমি সবে কাঁটার বড়শিতে কেঁচো গাঁথা শিখছি আর মাঝেমধ্যে দুএকদিন জাল থেকে মাছ ছাড়াতে হিমশিম। মধুমতীর তীরে পাড়ার ছেলেদের সাথে স্বেচ্ছাচারের স্বাধীনতা এখনও ষোলোআনা, এইকালে এক সকালে ছোট চাচা বলে বসল, ‘মাছ ধরার চাইতে পাখি ধরা ঢের ভালো।’

পাখি শিকারিদের প্রতি এমন অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাতি জেলেরা কিছুতেই মানতে না পারলেও তাদের কিছু করার থাকল না। ছোট চাচা সাফ জানিয়ে দিল, তার আর মাছ ধরার ইচ্ছা নেই।

আমারও পাখি শিকারের লোভ ছিল। চাচার সাথে দুচারদিন বাঁশকাঠির ফাঁদ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছি বৈকি।

আমি চাচার পিছু নিলাম। বাপ চেঁচামেচি করলেও কে শোনে কার কথা। কিন্তু ছোট চাচা অল্প কদিনেই হতাশ হয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে দুচারদিন দুচারটা পাখি ধরা আর পেশা হিসেবে দৈনিক ১০-১৫টা ত এক কথা না। ত জ্ঞাতি ভাইয়েরা দমকা হেসে শান্তি ফিরে পেল। ঘরের ছেলে ঘরে ফেরার শান্তি। তবে চাচার জেদ চাপে। বিলু শিকারি দৈনিক ১৫-২০টা পাখি কিবায় ধরে। দিঘল গ্রামের একদল শিকারি ঝাঁকা ভরে পাখি ধরে। আর বড়দিয়া বন্দর বা খুলনা শহরের কথা যদি কও, ঝাঁকাঝাঁকা হাঁস বা ধবধবে বক তারা কিবায় ধরে।

এক ঝাঁকা মাছ বেচতে দিন কাবার হয়ে যায়। আর পাখির কথা যদি কও, যতই নিয়ে যাও, এক ঘণ্টায় সব কাবার।

চাচা বাঁশের চটা দিয়ে দৈনিক চার-পাঁচটা ফাঁদ বানায়, নাইলনের সুতোয় ফাঁদ বানায়। ফাঁদের সংখ্যার সাথে বেড়ে চলে পাখির সংখ্যা। দৈনিক ১৫-২০টা বক চাচার ফাঁদে পা দেবেই দেবে।

চাচার লোভ ধরে গেল। সেই সাথে আমারও।


আমাগো যুগে আমরা নদীতে পানির স্রোত দেখতাম। তোগো যুগে তোরা মানুষের স্রোত দেখবি।


একদল জ্ঞাতিও মাছ ছেড়ে বক ধরার কথা ভাবতে শুরু করেছে। প্রথম শীতে যেদিন আমরা ঘাঘার বিলে ১৭টা হাঁস ধরলাম আর একটা দশাসই মদনটাক সেদিন একদল তরুণ জ্ঞাতি বুড়োদের মুখের ওপর বলে দিল, ‘তামাম দিন খালি বাপ-দাদা বাপ-দাদা কর কিলায়, নিজের কথা একটু ভাবতে পার ত।’ কিন্তু তালুকদার এ কয় কী, বিলের ধারের এই বাগান নাকি বেচে দেবে, সব গাছ নাকি কেটে নেবে শহরের লোকেরা।

আমরা ত বাগবিমূঢ়। গাছ কেটে ফেললে বকেরা থাকবে কই।

তয় দাদা কয়, ‘আরে বলদ, এ রকম একটা-দুইটা বাগানে কি আর কিছু আসে-যায়? আশপাশে দেখিস না, বাগানের কি অভাব আছে?’

‘তা ত। তা ত। যেদিক ইচ্ছে দিনভর হাঁটলেও ঠান্ডা বাগানের কি মুড়ো পাওয়া যায়।’

‘আচ্ছা, তাইলে এইবার কও দেহি, এত গাছ দিয়ে শহরের লোকেরা করেটা কী? একটা-দুইটা গাছ না হয় ঘরদোর বানানোর জন্য কাটা যায়। কিন্তু পুরোটা বাগান—।’

নিছক আজগুবি খবর বলে উড়িয়ে দেয় আমার বাপ-চাচারা।

আর দাদা মাথা নেড়ে কয়, ‘তাই হবে।’ কিন্তু সত্যি সত্যি যখন পুরো বাগান কাটাকুটি শুরু করল ব্যাপারির লোকজন তখন আবার দুশ্চিন্তা। তবে কোনো বক চলে গেল মনে হলো না।

দাদা কয়, ‘শোন তাইলে এক গপ্প কই।’

আমরা জানি দাদা গপ্প বানাতে ওস্তাদ লোক। তার গপ্প বেশির ভাগই আজগুবি হলেও আমরা খুব মজা পাই। আমরা তার রাজা-উজিরের গপ্প শুনি আর সহজ শিকারের উপায় খুঁজি। যদি এমন একটা যন্তর থাকত যা দৈনিক ১০০টা পাখি, নদী থেকে ঝাঁকা ভরে মাছ ধরে আনত! যদি এমন একটা যন্তর থাকত যা দিয়ে সহজে গাছ কেটে ঘর বানাতে পারতাম।

আমরা স্বপ্ন দেখি আর দাদার মুখে ‘পরি ও রাজকন্যা’র গপ্প শুনি আর স্বপ্ন দেখি।

আমরা তরুণ হই, যুবক হই। আমরা দাদার মুখে পরির গপ্প শুনি আর আমাদের ঘরবাড়ি ভূত-প্রেতে ভরে ওঠে। তারা তালুকদারের বাড়িভরা পরির বাচ্চাদের দেখে দেখে আমোদিত হয় আর তাদের জন্য মাছ ধরে, পাখি ধরে। কিন্তু তালুকদারের বেটারা এ করে কী। তারা বাঁধ দেয়, রাস্তা বানায়। তারা ইটের ভাটা খোলে আর সিমেন্টের কারখানা বসায়।

তা বড়লোকের এসব কাণ্ডবাণ্ড নিয়ে আমাদের এত ভাবনা কী। আমরা বরং তালুকদারের কারখানার ধোঁয়া খাই, ধুলো খাই, আর তাদের ব্যস্ততা দেখি আর ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, ‘ওহে ভগবান, আমাদের পানি ও বাগান রক্ষা করো। আমাদের মাছ ও পাখির বংশ বৃদ্ধি করো।’

কিন্তু দাদা কয়, ‘প্রলাপ বকিস ক্যা।’ আমরা দাদার কথায় প্রায়ই হোঁচট খাই। দাদা যে কখন কী কয়-না-কয়।

আমরা শুনেছি যে ‘পাগলে কি না কয়, ছাগলে কি না খায়’ তার নাকি ঠিক নাই, কিন্তু কিছুতেই মানতে পারি না যে, আমাদের প্রিয় দাদা এমন করে পাগল হয়ে যাবে যে বলতে শুরু করবে, ‘আমাগো যুগে আমরা নদীতে পানির স্রোত দেখতাম। তোগো যুগে তোরা মানুষের স্রোত দেখবি।’

‘দাদা ভুঁদাই কয় কী। শালা কি সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেল নাকি?’ আমাদের মেজাজ চড়ে যায় কিন্তু দাদা হেসে কয়, ‘চুদির ভাই কেমন বকা শিখিছে।’

তালুকদারের ছেলেরা ইশকুল বানায়, কলেজ বানায়। তালুকদারের নাতি-পুতিরা লেখাপড়া শেখে, নন্দনতত্ত্বের চর্চা করে। জেলেপল্লির ভূত-প্রেতরা তাদের জন্য মাছ ধরে, বক ধরে, ইট-সিমেন্ট বানায়। কিন্তু তালুকদারের ছোট নাতি এ কয় কী। ভার্সিটিতে পড়ালেখা শিখে একযুগ পরে দেশে ফিরে আকাশে পাখি না দেখে সে মহা খাপ্পা।

আমার নাতি দৌড়োয় এসে খবর দিল, ‘তালুকদারের দোতালা বাড়ির নিচতালার বারান্দায় তুমার ডাক পড়িছে। বাঁচতি চাও ত শিগগির দোড় দাও।’

আমি দোড় দিলাম।

‘পাখি হলো পবিত্র প্রাণী!’ তালুকদারের নাতি পাখি তালুকদার। তার ওয়াজ শুনে আমরা ত লজ্জায় মরে যাই কিন্তু পাখি শিকার বন্ধ করি না।

পাখি তালুকদার ‘পাখি ঠেকা’ আইন দাবি করল।

তালুকদারের বসার ঘরে বৈঠক। ব্যালেন্স তালুকদার যুক্তি দেখাল, ‘জমি যেহেতু বাড়ছে না, মানুষও বাড়া উচিত না। সুতরাং পাখি নয়, “মানুষ ঠেকা” আইন চাই। কোটি কোটি পাখি, কটা আর খাবি। সারাদিন আকাশে তাকায় তাকায় দেখবি।’

কিন্তু রাজা বললেন, ‘মানুষ জন্ম দিয়ে সুখ পায়। এই সুখে ঠেকা দিতে পারি না। আমরা ত অনেক ভাইবোন ছিলাম, কোনো ত সমস্যা দেখি না।’ রাজা ‘পাখি ঠেকা’ আইন চালু করে দিলেন।

‘তাহলে আমরা এখন খাব কী?’

‘কেন ফার্মের মুরগি, হাইব্রিড কুমড়ো, আফ্রিকান মাগুর? তালুকদার খামারে কি এসবের অভাব পড়েছে নাকি?’


আমি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, অন্যায় জেনেও জাল পেতে পাখি ধরে অপরাধ করেছি।


তবু এই আইন আমরা মানি না। বেশির ভাগ এলাকায় পাখি না থাকলেও সুন্দরবনে এখনও অনেক। আর শীতকালে বিলভরা হাজার হাজার পাখির লোভ আমরা কিছুতেই সামলাতে পারি না। তালুকদার কারখানার চমৎকার জালগুলো আমাদের আরও বেশি লোভ ধরায়। রাতে জাল পেতে সকালে গিয়ে দেখি ৩০-৪০টা পাখি শোরগোল করে ডাকছে, ‘শিগগির আসো। আমাদের বাজারে নিয়ে যাও।’ আহ্‌ কী শান্তি! দুনিয়ার কত উন্নতি। সেযুগে আমরা ত সারাদিন রক্ত পানি করেও ২০টা পাখি ধরতে পারতাম না। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট বাদশা তালুকদার এ কয় কী।

‘বুড়ো হয়ে গেছেন, এখনও আপনার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হলো না। পাকা পাকা দাড়িমুখে এমন জঘন্য কাজ করেন কিবায়?’ শিরা ভাসা হাতে কড়া পরিয়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে, পুলিশ আমাকে রাস্তা দিয়ে নিয়ে গেল বড়দিয়া বাজারে।

বুড়ো মাথা নুয়ে পড়ল বুকের ওপরে।

‘এখন স্বীকার করেন, “আমি স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, অন্যায় জেনেও জাল পেতে পাখি ধরে অপরাধ করেছি।”’

ভ্রাম্যমাণ আদালতে আমার বিচার দেখছে একদল ছেলেবুড়ো। আমার বুড়ো কোমর বেঁকে সামনের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ল। আমি ‘হ্যাঁ’ বলব নাকি ‘না’ বলব ভাবছি। ‘হ্যাঁ’ বললে এখনই জেলে। ‘না’ বললে নিয়মিত মামলায় আদালতে দৌড়াদৌড়ি।

(27)

Latest posts by তারেক খান (see all)