হোম গদ্য গল্প রোকনের মৃত্যু

রোকনের মৃত্যু

রোকনের মৃত্যু
295
0

পূর্বকথা

১.
কোনো কোনো মধ্যরাত আমাকে রোকনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আহা আমার শতসহিষ্ণু বন্ধুটি। কয়েকটি নোট বই আর একবাক্স পোকামাকড় এখন ওর সঙ্গকামনা করে। একটি শূন্যতার স্বপ্ন তৈরী হয়, আমাকে অস্থির করে তোলে; আমি ফুঁপিয়ে উঠি।

কমলালেবু রঙের বিশাল এক আকাশ, তার মধ্যে খুব তুচ্ছ ও অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে চাঁদসূর্য কাতরাচ্ছে। পূর্বপশ্চিম দিগন্তরেখায় জমাট আলো। একই সাথে ভোর ও সূর্যাস্ত হচ্ছে। দুটি টিলার ওপর দুটি মানুষ একই স্বরে কথা বলছে কিন্তু কেউ কাউকে বুঝতে পারছে না। একজন বলছে, ‘কি কইছেন?’ অন্য টিলা থেকে খাটো লোকটিও বলছে, ‘কি কইছেন?’—আসলে কে যে কোন টিলায়, তারও কোনো ঠিক নেই। একবার দেখি ডানের টিলায় খাকি প্যান্টপরা লোকটি, পরেই সে বামের টিলায়, যেখানে একটু আগে বামন লোকটি দাঁড়িয়েছিলো। দুজনেরই চিবুকে ও গালে জমানো অন্ধকার দাড়ি। হয়তোবা লোক দুটি স্থির ছিলো কিন্তু আমারই ডান-বাম বোধ লুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। স্বপ্নে অসম্ভব সম্ভব হয়। কিন্তু আশা মেটে না।


ইতিহাস সর্বত্র বীরব্যঞ্জক নয়। প্রবল আকাঙ্ক্ষা প্রতিদিনকার অনুশীলনে ক্ষয় পেতে থাকে।


রোকনের লাল ও নীল মলাটের দুটি নোট ডায়েরী আছে আমার কাছে। ওখানে অসম্ভব আশা। বিশ্বাস। পরি ও কল্পনা।

কিভাবে লিখতো ও?

লিখেছে: ‘বেদ ও গীতার বাংলা ভাষ্য পড়ছি। আশ্চর্য জটিল সৌরভময়! স্বাধীনতায়। ভারতীয় ঋষিদের চিন্তায় যৌক্তিক বুদ্ধিচর্চার আভাস রয়েছে। মাঙ্গলিক ও মনোমুগ্ধকর।’

নীল ডায়েরীর মন্তব্য:
‘মাওলার বিতর্ক প্রতিভা কল্যাণকর। কেবিনেট মন্ত্রিত্ব মানাবে। অবশ্য ব্যাপারটি আমার রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সাথে যুক্ত।’

নানারকম কালিতে লেখা। কিছু পৃষ্ঠায় কেবল এলোমেলো ডুডল। ইকরি মিকরি।

২.
গোবিন্দপাড় কানাপরাশি। রোকন ও আমি একবার একটি অখ্যাত সস্তা রেস্টুরেন্টের মালিকের নাম দিয়েছিলাম। লোকটা সাদা কাগজে কখনো দাগ দিতো না, ভয় পেতো দস্তখত নিয়ে, তবে চা বানাতো ভালো। স্কুল থেকে পালিয়ে একবার সারাটাদিন লুকিয়েছিলো রোকন কানাপরাশির দোকানে লাকড়ির ভেতর। সেই থেকে কানাপরাশির সঙ্গে রোকনের বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। লোকটি উবু হয়ে চায়ের চুলায় লাকড়ি গুঁজতো, দূর থেকে মনে হতো টুলে বসে কানাপরাশি সেলাই মেশিন চালাচ্ছে। ও-কে একদিন একথা বলতেই দাঁত আকর্ণ উদ্ভাসিত করে হি হি শুরু করে। একটা বয়স্ক লোককে আমি কখনো এভাবে হাসতে দেখিনি। হাভাতে ভাব ছেড়ে সেদিন সে অতিরিক্ত সরল হয়ে উঠেছিলো। যেনো একটি বক গ্রামের চাপ কল হয়ে উঠতে চাইছিলো। হাসতে হাসতে হেঁচকি উঠছে। চোখ দিয়ে দুফোঁটা পানি বেরোবার পথ থামলো। কিন্তু কানাপরাশির সঙ্গে রোকনের কি সম্পর্ক থাকতে পারে? রোকনের শান্ত শ্যামলা ত্বকে ছায়াময়তা ছিলো। ঢোলা কাপড় পরলে ওকে লাগতো বাজারের থলির মতো, এক মুখ খোলা। সর্বদা লুঙ্গির জয়গান করতো। অর্ধ কোঁকড়া চুলে মাঝসিঁথির জন্য মধুসূদন দত্তের মতো লাগতো ওকে। মায়াবী চোখ জোড়া। ও চোখে দেখেছি গভীর বিদ্যুতের খেলা। চাঁদে পাওয়া মানুষ যেনো আতাফলের বিস্ময় দেখছে।

৩.
আসলে রোকনের শৈশব বলা দরকার। কিন্তু কিইবা জানা যায় শৈশবের। হয়তো ভয় পেতো সরীসৃপে। সরীসৃপের পা নেই বলে। হয়তো গোঁয়ার্তুমি ছিলো।

ও কিভাবে মেটাফিজিক্যাল হলো, তা বলা যাক। কৈশোরে একদিন হাতের আঙুল থেকে রক্ত বের করে স্বাক্ষর করেছিলো, সেই স্বাক্ষরের রং, স্বাভাবিকভাবেই লাল। পেছনে, কাগজের, এক ক্রুদ্ধ বৃদ্ধ। তার মুখ বন্ধ, কিন্তু গলায় ঢোঁক গেলার কাছে, হলকুমের উপরে চামড়া তিরতির করে। মহুয়া ও মোদক চোখে।

বিপ্লবে যোগদানের জন্য বাড়ি ছেড়ে তিরিশ মাইল দূরে এক গণ্ডগ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলো রোকন। পঞ্চমুখ সকলে, শিশু চারাগাছ কেমন সাধুতা বা একাগ্রতা দেখাচ্ছে ভেবে। ধানের চিটা থেকে পুষ্টটি বাছতে এতটুকু দ্বিধা নেই। বা গরু চরাতে, বা গাভী দুইতে, কাদার মধ্যে নেমে শিং মাছের কাঁটা বিধলেও কোনো অভিযোগ নেই।

এই সে মহাকাব্য যার প্রতিটা পৃষ্ঠাই মানুষের শ্রমের দানের। সাফল্যে জ্বলন্ত।

ইতিহাস সর্বত্র বীরব্যঞ্জক নয়। প্রবল আকাঙ্ক্ষা প্রতিদিনকার অনুশীলনে ক্ষয় পেতে থাকে। বৃদ্ধ নেতৃত্ব ধ্যানজ্ঞান সরিয়ে দিয়ে ওর অনুশীলনকেই আগ্রহভরে তুলে নেয়। যে আগ্রহ, রোকন ওর স্বভাবসিদ্ধ অনুসন্ধিৎসায় বুঝতে পারে, ওকে ক্রমেই যান্ত্রিকতার দিকে নিয়ে চলছে। পুরাকালের গল্পের রাধা উঠোনে পানি ঢেলে কাঁটা পুঁতে অভিসারের মহড়া দিতো। কিন্তু ‘লাইন ও নেতৃত্বের প্রতি সর্বপ্রকার অনীহা জন্মলাভের ফলে…’ ইত্যাদি ইত্যাদি।

খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তনের দরজা ঝুরঝুরে উইকাটা। শুধু একটি নীরব ফোঁকর, মা। মরণাপন্ন বাবা—ঘড়ঘড়ে কাশি, বুক যার দুই সুতা রডে বানানো। ভাইয়েরা, তাদের স্ত্রীরা আর গতানুগতিক সংসার। বাইরের ঘরে একটা তক্তপোষ, আড়াই হাতের। ঘরের সামনে সুপারী গাছের সারি। অযত্নে বেড়ে ওঠা বহুপ্রাচীন গন্ধরাজ, কাঁঠাল গাছের ঝরেপড়া পাতা। শীতে বর্ষায় ভরা সুবাস ঘরের চৌকাঠ পর্যন্ত গড়াতে গড়াতে আসে; কিন্তু ঘর অন্ধকার, চৌকির নিচে ইঁদুর-মাটি, একটি টেবল নড়বড়ে, খবরের কাগজ বিছানো তার ওপর। রোকনের হাতের জিজ্ঞাসার আঙুলে লাল, সবুজ ও কালো রঙের কাগজ ছুঁয়ে যায়। অন্দরের দরজায় মায়ের নিঃসঙ্গ আগমনে ইঁদুর ভয় পায় না। কেননা স্পন্দন কম্পনবিহীন এই ঘরের ঝুলও অনির্ধারিত উপায়ে বেড়ে চলেছে। গৃহাধিকারীর কোনো কিছুতে আর মন নাই। আগ্রহের সলতে নিভে গিয়ে কালো ধোঁয়া চিকন সুতার মতো কেবল উড়ে উড়ে যায়।


রোকনের বেদ অধ্যয়ন

এই পর্বে জিজ্ঞাসার আঙুল গিয়ে উপস্থিত বৈদিক দর্শনের নৈতিক ভারসাম্য উদঘাটনে দিস্তা দিস্তা নোট। প্রাচীন ক্রিয়াপদ্ধতির অনুসন্ধান। কিন্তু পূর্বাঞ্চলের তান্ত্রিক মতের বিবর্তন আকর্ষণীয়। দেব, বন্য আর নাগরীতি থেকে নাগরীতির আকর্ষণ। ‘আলো ও অন্ধকার, মৃত্তিকা ও উর্ধ্বলোককে অধিকার এই চক্র উর্ধ্বদৃষ্টি সূর্যমুখীর আলোক ও বায়ুর উপভোগে উল্লোল।’


নোট বই থেকে

‘কয়েকটি আসন অভ্যাস করি। পদ্মাসনে তিরিশ মিনিট থাকার পর নিজেকে একই সঙ্গে হালকা ও ভারি মনে হলো।’

আরেকটি পৃষ্ঠা, নীল কালি :

‘বাসা থেকে আধ মাইল দূরে একটি লোক। সন্ধের পরে অনেকে এখানে আসে। বহু কথা। কালো ও তামাটে। পোড়া মাটি। ইরা পিঙ্গলা। চাঁদ ও সূর্য। পদ্ম। বিজিত অনার্যের চর্যা। গোড়া থেকে কি হয়েছিলো অনুমান করছি। পঞ্চ ম-কার। মদ্য, মাংস, মীন, মুদ্রা, মৈথুন।’

‘তিন দলের মানুষ। সত্ত্ব তমঃ রজঃ। আমি?’

পার্টি সূর্যের মতো। সততা ও করণীয়ের মাঝমাঝি একটি সরুগলির ওপর দিয়ে চলতে থাকলে বৃদ্ধি ও বিকাশ ভালো করে। কৈশোর ও যৌবনের জটার মধ্যে স্বতঃপ্রবাহ অনুপ্রবেশ করতে পারে। চাঁদ ও সূর্যকে চাইবে একই চোখে দেখতে। দেখাটার মাপ বহুবিস্তৃত। দিগন্তে গাছপালার সিল্যুয়েট অতিক্রম করে আরো অনেক দূর হয়তো, ভবিষ্যত সেখানে পরাভূত। সামান্য কটি সমস্যা ও তার রূপায়ণ দিয়ে ধরা যায় না। নির্দিষ্ট লাল মলাটের বিদ্রোহ মগজে বা হৃদয়ে ঝড় তোলার জন্য যথেষ্ট নয়। যথেষ্ট নয় কৈশোর ও যৌবনের পাগল বাতাস একটিমাত্র পালে আটকে রেখে সমুদ্রযাত্রা।

১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাস। শান্ত সুবোধ ঘাস, নীল রঙের প্রজাপতি, বড় বড় পাঅলা পিঁপড়ে। হাতের কাছে একটা ধারালো কাস্তে তাতে ঘাস কাটার পর ঘেসো গন্ধ লেগে রয়েছে, কাস্তেটা বাঁকানো, একটু দূরে স্তূপ করে রাখা ঘাসে পালিত ছাগল মুখ দিয়ে রেখেছে।

আকাশ থেকে ঘুরতে ঘুরতে মাছরাঙা কাছের হিজল গাছে এসে বসলো। এখনও বর্ষাকালের কচুরীপানা ও মরা আবর্জনা ঝুলছে। চিলবক বসে, এজন্য ডালপালায় সাদা সাদা দাগ, পাখির পুরীষের। বর্ষাকালে গাছটি ডুবে যায়।

বিন্দুবাসী চিৎ হয়ে শুয়ে ছিলো। বিকেলের দিকে একটি পা উঁচিয়ে। পায়ের পাতায় অবিরাম কালা ফাটা দাগ। তার ভেতরে জমে থাকা মাটি। কানের কাছ দিয়ে পিঁপড়ের ঘন সন্নিবিষ্ট সারি।


ইদানীং শূন্যতা খেলা করছে, একহারা শরীরের সূঁচালো পদপ্রান্তে স্লিপার, পায়ের নখ খেলা করে সেখানে, আনত দৃষ্টি সেই ক্রীড়াপরায়ণ অঙ্গুলিপ্রান্তে।


দৌড়াতে দৌড়াতে ঘুন্টি লাগানো উলঙ্গ বালকশিশু দিগন্তরেখায় দাঁড়িয়ে বলে, ‘ও কাহাআ, কাহাআ’—সেই উচ্চারণে তথ্যের ব্যগ্রতা। পাশে রোকন অন্যমনস্ক হয়ে বসে ছিলো। রোকনের এই সময়টা অবসর মুক্তি। শতধা বহুবিচিত্র উপায়ে চিড় ধরছে পার্টির দেয়ালে। ছিটকে পড়ছে বিষাদ। যে বৃদ্ধের হাতে লাল স্বাক্ষর ছিলো, হারিয়ে গেছে সে কোন সুদূরপ্রার্থিত ধামে, কে জানে। বিন্দুবাসীর সঙ্গে কথা হয়। রাজ্যের পোকামাকড়, ঘাস, মাছরাঙা আর শব্জীক্ষেতের কথা। সেখানে বাঁধাকপির পিঠে বসে ফড়িং মলত্যাগ করে, টম্যাটোর ফুলের ভেতর পোকারা সংগম করে। বিন্দুবাসী কুঁজো ও কালো। বসলে মাথার উপর হাঁটু ভাসে। ফ্যাকাশে সাদা চুল। বিন্দুবাসী যখন কথা বলে পিঠের গামছা ফরফর করে বাতাসে ওড়ে আর সরাৎ করে নাক ঝাড়ে। রোকনের দৃষ্টি মুগ্ধ ও অবসন্ন হয় সেই দৃশ্য দেখে।

বিন্দুবাসীর বড় মেয়ে ঘর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলো অনেকদিন আগে। গতকাল শে এসেছিলো, বিন্দুবাসীর শোক ও সন্তাপ রোকনকে ছড়িয়ে দেয় আগামীকালের দিকে। কিন্তু আগামীকালের হাতে বই। প্রতিদিন একটি করে পৃষ্ঠা খোলে।


অন্বেষণ

শহরে ফিরে এল ঠিকই। কিন্তু রোকন অনির্ধারিত। যে রেস্তোরাঁগুলো ওর উপস্থিতি মেনে নিতো, রোকন এড়িয়ে গিয়ে পড়লো তারই উল্টোপিঠে। সাদাসিধে সরলতার চাকু বিধিয়ে পরম উদাসীনের মতো হেরে যেতে লাগলো। যে দুচারদিন দেখা হয় বন্ধুদের সঙ্গে তা কোনো রেস্তোঁরায় নয়, একটি অন্ধকার পুকুরঘাটে। এখানে ফিস ফিস করে কথা বলা যায়। পেছনে এ শতকের প্রথমদিকের ক্ষুদে ভূস্বামীর ভাঙা অট্টলিকা।

একদিন শিউলি এসে আমাদের খুঁজে বের করলো। ওর চোখ টানাটানা। মফস্বল শহরের এ্যাডভেঞ্চারিজমে আটকানো চোখের তারা, ইদানীং শূন্যতা খেলা করছে, একহারা শরীরের সূঁচালো পদপ্রান্তে স্লিপার, পায়ের নখ খেলা করে সেখানে, আনত দৃষ্টি সেই ক্রীড়াপরায়ণ অঙ্গুলিপ্রান্তে। রোকন আমাদের বন্ধু এবং শিউলি আমাদের চেনে বলেই বার বার করে কেঁদে কেটে বুক ভাসায়। রোকনকে ও প্রেম নিবেদন করেছিলো, কারণ কলেজগামিনীর স্বপ্নে ছিলো বিপ্লবী রাজহাঁস। রোকন তাকে রক্তের স্বাক্ষরে শপথ করায়—স্বাক্ষ্যপত্র বোঝেনি শিউলি, তবে রোকন ওর নামকরণ করে: অরণি। কিন্তু পঞ্চ ম-কারের পূর্ব-ধারণা ওর সাতজন্মে নেই। রোকন সে বিষয়ে শিক্ষাদানের প্রস্তাব করতেই—সেই সন্ন্যাসী প্রক্রিয়ায়—ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ে ওর ভালোবাসার দেয়াল। ও আবিষ্কার করে, এটি জন্তুবিশেষ, শুধু নিজস্ব প্রয়োজনে চলে। সেই প্রয়োজনে মনের শ্রান্তি কাটে না, আত্মার কলুষ মিলিয়ে যায় না, ইত্যাদি। মেয়েটা একেবারে রদ্দি।

একদিন আমি আর এক বন্ধু যৌথ অভিযান চালাই রোকনের আশ্রয়দাতা সাধুর ডেরায়। আধমাইল দূরে একটি পুলের ধার ঘেঁষে ছনের ঘর। এলাকাটা ভারি নিরালা, জঙ্গুলে। ঘরে ঢুকতে এত নিচু চৌকাঠ পার হতে হলো যে আরেকটু হলেই হোঁচট খেতাম। কুপির সামনে রোকন আসন করে বসে। একটি খোলা বই কুপির পাশে। ও আসলে একটি চক্রের অংশ হয়ে বসেছে। কুপির আলোতে চোখ ঠিক হতে খেয়াল করলাম—ওর বিপরীতে একজন অন্ধকার, আমার তাই মনে হলো, এসব লোক দেখলেই চট করে অন্ধকার মনে হয়, বসে আছে। সামনে নেশার সরঞ্জাম ছড়ানো। তামাক কাটার জন্য এক টুকরো কাঠ, নারকেলের শুকনো ছোবড়া, মুঠোয় ধরা যায় এমন একটি ধারালো লোহার টুকরো, ন্যাকড়া প্যাঁচানো দুটো পোড়ামাটির কল্কি, সরু লম্বা বাচ্চা-ছেলের উত্থিত নুনুর মতো। অনেকটা দাড়িগোঁফসুদ্ধ অন্ধকার লোকটি এ লাইনে বহুদিন ধরে আছে সহজেই বোঝা যায়। আমরা ঢুকতেই সবাই যে যার জাগায় চুপ করে গেলো। সরল মুদিত চোখে তাকালো। রোকন কি কথা শুনছিলো, সবাই থেমে যাওয়ায় ও তাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে আমাদের দেখলো।

এই স্তব্ধতার মুহূর্তটি ভারি অস্বস্তিকর। তাছাড়া আমরা দুজন নেশাজীবী নই, এমন একটি জায়গায় এসে পৌঁছেছি, যেখানে উৎকণ্ঠা ঘিরে ধরে। যদিও ওদের জন্য আশ্রয়। বেশ খানিক পর রোকন চক্র ভেঙে সরে আমাদের দুজনকে ইশারায় বসতে বলে। ওর ভেতর কোনো পীড়া নেই। আমরা বসতে চক্র আবার পুরো হয়। তামাক বানানো হলে হাতে হাতে ঘুরতে থাকলো। আমরা ভবদীয় হয়ে বসে। অনেক সময় হয়ে গেলো রোকন কিছু বলছে না। কেউই কিছু বলছে না। কুপির আলো নিষ্প্রভ হয়ে আসছে। ওর হাতে ছিলো ‘যোগী ও শাসনকর্তা’ বইটি। আর ছুঁলো না। শেষ অধ্যায়টি খোলা। অথর্ব হয়ে পড়ে আছে।

‘কি ব্যাপার?’ রোকন মুখ খোলে।

‘খুঁজতে।’ আমি বলি।

এখন শান্তি পারাবার। ওর চোখ ভীষণ লাল জবা।

‘রোকন, কি?’

এই পরিবেশে আমরা মেঘবার্তাবহ!

‘সর্বভূতে একাকার!’

‘তোমার মার্ক্স ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দলিল ঘাঁটছিলো…। সেই দাড়িঅলা কোথায়?’

রোকন নিশ্চুপ।

‘তুমি না একদিন বলেছিলে মার্ক্সীয় দর্শন প্রয়োগে আবু সয়ীদ আইয়ুব অভ্রান্ত। অপরোক্ষানুভূতিই সম্বল।’

‘ঠিক। পাঁচটি ইন্দ্রিয় সব গ্রহণ করতে পারে না। এক হাতে চাই মোম, অন্য হাতে বৈজ্ঞানিক শ্যাওলা।’

‘এই সাধুও তো দাড়িঅলা, কুপির আলোতে বসে আছে। এই কি সেই!’

‘জানি না। এই লোকটি আমাকে একটি বিশেষ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। এর হাতে আমি শক্তির উৎস দেখেছি। আমার চাই।’

‘জয় গুরু বার্গসঁর জয়!’ আমি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে শ্লোগান দিই। ও কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখায় না। গাঁজার এমন গুণ। অবিকল লালনের চোখা থুতনি নেড়ে সাধু মহাশয় কি যেন বলছেন একটি লোককে। আমি জানি জোরে দুটো কথা কললেই আসন নড়বড়ে হয়ে যাবে সাধু বাবার।

‘রোকন উঠবে?’ মধ্যম স্বরে ওকে জিজ্ঞেস করি। ও ঝুঁকে পড়ে ভাবছিলো। অনেকক্ষণ পরে মাথা তোলে। পরিস্থিতি যাচাইয়ের ভঙ্গিতে সবাইকে দেখে। আমি বেশ উপভোগ করছি। শিশুর মতো আচরণ। উঠবে বলে ঠিক করেছে। কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়ায়। সাধুর দিকে নিঃশব্দে অনুমতি প্রার্থনা করে। সাধু গ্রাম্য স্বরে বলে, আমাদের তিনজনকেই বোধ করি, অথবা রোকন বাদে আমাদের দুজনকে, ‘আবার আইন যে।’ বাইরে ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে একটি পাখী ভূতুম ভূম ভূতুম ভূম ডাকছে। চৌচির হয়ে পড়ে অন্ধকার। হেরিংবোনের রাস্তায় উঠতে দুপাশের গভীরতা সরে গেল।

আসলে রোকন এত সহজে আমাদের সঙ্গে উঠে আসবে ভাবতে পারিনি। গায়ে গা ঠেকিয়ে হাঁটতে থাকি।

‘রোকন, অরণিকে মনে পড়ে?’ সরল সার্জারির ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা।

‘অরণিকে মনে পড়ে।’

‘কি মনে পড়ে?’

‘মনে পড়ে ওর শরীরটা খুব ভালো, ঝকঝক করতো চোখ, সবেমাত্র পৃথিবীর যৌবনে প্রবেশ করেছে।’

‘আর?’

‘আর ওর বিষাক্ত ভয়, কুৎসিত ফিরে যাওয়া, ওর চোখ নিবে গেছে কবেই।’

‘সে তো তোর জন্য।’

‘জল্লাদের জন্য!’ রোকন হিসিয়ে ওঠে নেশার ভেতর থেকে।

‘ঠিক আছে আবার।’

‘সূর্য উঠবে বলে ঠিক হয়েছে, রাত্রি শেষ, অপেক্ষা, নীল চোখের তারা, সূর্য উঠবে, অপেক্ষা করছি… ভোর সূর্য, নীল চোখের তারার মতো আলো, অপেক্ষা করছি…’

‘…কি? অপেক্ষা? ঠিক আছে আবার…’

‘থাক বলতে হবে না’

‘না বলবো। নৌকা, একান্ত বাধ্যগত নৌকা চলছে; রাত্রি ঘনযোনি অন্ধকার, নৌকার দুলুনি, ঘুম আসছে, ছুটে লাফিয়ে, হ্যারিকেন ভেঙেচুরে ঘুম আসছে ঘুম…’

রোকন হাঁটতে হাঁটতেই আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। ওর হাত ধরতে গিয়ে টের পাই ভীষণ ঠান্ডা। ওর হাত নয়, ফণা মুড়ে দুটো মরা সাপ ঝুলছে। রাস্তার পাশে আমাকে ধরে এলিয়ে ঘাসের ওপর ভর নেয়। রাতের আকাশে তারা জ্বলছে প্রকাণ্ড থালায় বাচ্চা ভূতের চোখের মতো। কিন্তু শুধুমাত্র গাঁজায় তো এরকম হয় না। ও কি অন্য কিছু নিয়েছে?


প্রাণিজগতের দশ ভাগের নয় ভাগ পতঙ্গ। আমরা বাকি এক ভাগের অংশ। বুঝতে পারছো, এক ভাগ মাত্র, সংখ্যালঘু।


এরা নাকি অনেক সময় ধুতরা বিচি খায়?

আগের তেজ নেই আর। বলি :

‘কি যেতে পারবে?’

‘না, আর কোথাও না।’

‘যাবো যে।’

‘চলে যা।’

ওকে রেখে উঠি। হঠাৎ ও আর্তম্লান স্বরে বলে, ‘এখনো রেস্তোরাঁয় যাস? সব ফাঁকা, সব ফাঁকা, সব ফাঁকা…’ বলে ও নিজের বুকের ভেতর আত্মগোপন করে।

আমরা এক পা এক পা করে হাঁটি।

ও চেঁচিয়ে বলে, ‘বইও ফাঁকা, বই দেখলেই বমি আসে এখন।’

বইটা কাছেই ছিলো, একটা লাথি ঝেড়ে ঝোপের ভেতর পাঠিয়ে দিলো ওটা। শব্দ শুনে বুঝি কোয়েসলার পৌঁছে গেলেন বনে।

এর পর ওর সঙ্গে বহুদিন দেখা হয়নি।

তারিখ মিলিয়ে নোট বইতে দেখি লেখা :

‘অরণি, একটি শুঁয়োপোকা। না, ঝিঁঝিঁ। সবুজ করাত বাজিয়ে ডাকে। সারা রাত ডাকে। আমি যাবো না।’

‘সাধুটা গুবরে পোকা, সময়ই দিলাম, শালা খুললো না। ঢাকনাই খুঁজে পেলাম না।’

‘একটা কেন্নোকে মনে পড়ছে। শত পায়ের হৃদপিণ্ডরঙা গোল চাক্কি।’

এ সময়কার প্রতিটা পৃষ্ঠাতেই নানারকম পোকামাকড়ের উল্লেখ, সঙ্গে দোলাচলের কথা।

‘গেরুয়া রঙের রাস্তার সঙ্গে মিলন হবে।’

‘শিকড় ভালোবাসে শামুক। বইকে ভালবাসে উই। আমি?’

‘সংখ্যা: আত্মসংখ্যা, সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভালোবাসা-সংখ্যা।’

‘মধ্যরাতে দেবী এসে বললো, পতঙ্গের সঙ্গে আলিঙ্গন কর, পাবি।’

একটি বই খুঁজতে গিয়ে ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। চেনা ঘর তবু ঘরের ভেতর তাকানো যায় না। বইটির কথা জিজ্ঞেস করলাম না আর। আমাকে না চেনার ভান করছে। যেন এটাই ওর মৌলিকতা। অহং।

ওর হয়ে গেছে। খুব নড়বড়ে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এই মুহূর্তে কি আমাকে আচরণের কৌশল নিতে হবে? যেন কিছুই ঘটেনি আমি এগোতে থাকি :

‘রোকন!’

সদ্যপ্রাপ্ত ভাবলেশহীন চোখে তাকায়। ও কি সত্যি সত্যিই আমাকে ওর স্মৃতিশূন্য করে ফেলেছে?

আমাকে? সবাইকে?

‘কি?’

উর্ধ্বমুখ বসে রইলো। ঠোঁটের ভেতর হয়তো, চলে যা।

‘রোকন, তুমি নাকি পোকামাকড়ের…’ উত্তেজিত করার চেষ্টা। ও হাতের আঙুলগুলো বাঁকিয়ে কি একটা মুদ্রা তৈরী করে। অদৃষ্টপূর্ব সেই মুদ্রার কোনো অর্থ নেই। একসময় ঘরের বাইরে একটি ছেলে এসে দাঁড়ায়। আত্মসমাহিতি কাটিয়ে সামনে থেকে আমাকে সরিয়ে দ্রুত বাইরে গিয়ে বাচ্চাটির সঙ্গে ব্যস্ততায় লিপ্ত হয়। দুচারটা অস্ফুট শব্দ। দুই চার এ রকম সংখ্যা! রোকনের চোখমুখ চঞ্চল। ও দ্রুত, অতি দ্রুত কি যেন বলছে। মনে হলো বাচ্চাটির সঙ্গে নয়, ও নিজের সঙ্গেই কথা বলছে। ফিরে এলো কাগজে মোড়ানো কিছু নিয়ে।

রোকন আমার দিকে তাকায়।

আবার সেই অনুজ্জ্বল পাথর।

মনে হলো বোলতা বাসা করেছে খুলিতে।

‘জানো—’ ও আমার দিকে ঝুঁকে ফিস ফিস করে বলে, ‘একটা সত্যের খবর বলি তোমাকে—’ আমি মনোযোগের ভান করি। ও বলে, ‘প্রাণিজগতের দশ ভাগের নয় ভাগ পতঙ্গ। আমরা বাকি এক ভাগের অংশ। বুঝতে পারছো, এক ভাগ মাত্র, সংখ্যালঘু। জানোই তো সংখ্যাগরিষ্ঠের দলে সব সময় থেকেছি। এখন পোকাদের বুঝতে চাইছি। ওরা খুব অসহায় আর নির্যাতিত, বুঝলে?’

ওর কথায় আমার পাকস্থলী প্লীহায় উপচে পড়ে। হাতের কাগজের পুঁটলি খুলে দেখায় দুটো প্রজাপতির মতো পতঙ্গ। ও বলে, ‘এই দেখো মথ। লেপিডোপটেরা বর্গ, আসলে লুস্পেন চরিত্র। স্বভাবে নিশাচর, কিন্তু দেখতে প্রজাপতি।’

আমি বলি, ‘হ্যাঁ ঠিক তোমারই মতো। দেখতে মানুষ, কিন্তু কবে তোমার মেরুদণ্ড গ’লে বেরিয়ে গেছে। মাথায় বোলতা বাসা করে বসেছে।’

প্রচণ্ড আক্রোশে ক্ষেপে ওঠে ও। আমাকে ঘাড় ধরে বের করে দেয় ওর ঘর থেকে।

হ্যাঁ, সত্যিই ও এখন একটি নতুন প্রজাতির পতঙ্গ। মথ।


গল্পের বানানরীতি লেখকের নিজস্ব

কাজল শাহনেওয়াজ

জন্ম বিক্রমপুরের লৌহজং থানার দিঘলী গ্রামে (এখন পদ্মাগর্ভে বিলীন); ১ জুন, ১৯৬১। পড়াশোনা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরী বিষয়ে। পেশায় স্বনিয়োজিত আইটি কন্সালটেন্ট।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
ছাঁট কাগজের মলাট, যৌথকবিতা [বিকল্প কবিতা, ১৯৮৪]
জলমগ্ন পাঠশালা [শিল্পতরু, ১৯৮৯]
রহস্য খোলার রেঞ্চ [বিকল্প কবিতা, ১৯৯২]
সঙ্গীত পরিবারে সতীর আত্মহত্যা [ফৃ স্ট্রীট স্কুল, ১৯৯৮]
আমার শ্বাসমূল [ফৃ স্ট্রীট স্কুল, ২০০৭]
কাঠকয়লায় আঁকা তোমাকে আমার [পাঠসূত্র, ২০০৯]
তালগাছ হাতির বাচ্চা [ফৃ স্ট্রীট স্কুল, ২০১১]
একটা পুরুষ পেপে গাছের প্রস্তাব [সমাবেশ, ২০১৫]
কাজল শাহনেওয়াজের কবিতাসমগ্র [আগামী, ২০১৮]

গল্প—
কাছিমগালা [শিল্পতরু, ১৯৯৩]
গতকাল লাল [জনান্তিক, ২০০৭]
কাছিমগালা ও গতকাল লাল [শুদ্ধস্বর, ২০১১]
কাজল শাহনেওয়াজের গল্পসমগ্র [আগামী, ২০১৮]

সম্পাদনা—
বিকল্প কবিতা, যৌথ সম্পাদনা, ১৯৮৯
ফৃ, লিটল ম্যাগাজিন, ১৯৯৫-৯৮
ফৃ গ্রন্থিকা সিরিজ (পাতলা মলাটের বই), ১৯৯৮-৯৯, ২০০৭, ২০১১, ২০১৫

ই-মেইল: kajal.shaahnewaz@gmail.com

Latest posts by কাজল শাহনেওয়াজ (see all)