হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য মধুপুরে বুশের খেলা

মধুপুরে বুশের খেলা

মধুপুরে বুশের খেলা
574
0

সাদ্দামদের সরদার বোগদাদি সাদ্দাম খড়নির্মিত বুশের পশ্চাদ্দেশে একটা লাঠি ঢোকানোর চেষ্টায় সুবিধা করতে না পেরে অবশেষে কোদালের মতো বড় বড় দাঁতগুলি বের করে অন্য সাদ্দামদের দিকে চেয়ে বলল, ‘বুশের গোয়াত ত ছিদ্রি নাই রে! লাঠি শিলামো ক্যাংকা করে?’

খিক খিক খিক!

হেসে উঠল বাকি ছয়জন সাদ্দাম ও তাদের অন্য সাথিরা। বটগাছের ডাল থেকে একটা পাখি পিচিক্ করে হেগে দিল, ক্রুজ মিসাইলের ঢঙে চুনসাদা বিষ্ঠা নিক্ষেপ করল খড়ের বুশের পাতিল-মাথায়; থিপিস্ করে একটা শব্দ উঠল। তাই দেখে মধুপুর গ্রামের সাত জন সাদ্দাম আর চেংটু, আলি, ছয়ফুল ও ফেদু—ধূলি-ধূসরিত, ফুর্তিবাজ, স্কুল-থেকে-ঝরে-পড়া ১১টি কিশোর বুড়ির ভিটায় বুড়ি বটগাছের তলায় হাততালি বাজিয়ে শোরগোল করে উঠল। চৈতালি বাতাসে ধুলোবালি, শুকনো পাতা আর খড়কুটো মিলেমিশে ঘোঁট পাকিয়ে ছোট একটি ঘূর্ণি তুলল, তার ফলে বালকদের মনে পড়ে গেল মরুভূমির ঝড়ের দৃশ্য। সুরেলা সমস্বর বেজে উঠল: ‘মরু সাহারাত্ ঝড় উঠিছে, মরু সাহারাত্ ঝড় উঠিছে!’

এই গানের মধ্যে বোগদাদি সাদ্দাম উপরের পাটির দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে খড়ের বুশের ‘গোয়া’য় কষে একটা কিক্ লাগিয়ে হাঁক ছাড়ল, ‘চুদির ভাই, এইবার যাবু কোন্টে?’

হাসির রোল উঠল আবার। কিন্তু বুশের দিক থেকে একটুও প্রতিরোধ এল না। মধুপুরে সাত জন সাদ্দাম আছে, কিন্তু বুশ নাই একজনও। দুটি কুকুরের নাম বুশ রাখা হয়েছিল, কিন্তু সাদ্দামদের মতো তারা ১২ বছর ধরে বেঁচে নাই।

তাই বেকারত্বের বোধ নিয়ে বালকেরা ছটফট করতে লাগল। বুড়ির ভিটায় বুড়ি বটগাছের নিচে এই দুপুর-দুপুর সময়ে চৈতালি বাতাসে সাত জন সাদ্দাম, যাদের প্রত্যেকের বয়স কমবেশি ১২ বছর, যারা প্রত্যেকেই সাদ্দাম নাম ধারণ করে বলে মধুপুরের লোকজনের বেজায় অসুবিধা—কেননা একজনকে ডাকলে আরেকজন দৌড়ে আসে, একজনের দুষ্টামির নালিশ ভুলক্রমে অন্যজনের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে, একজনের ভালোছেলেমির তারিফ অন্যায্যভাবে প্রচারিত হয় অন্য একজনের নামে—তারা হন্যে হয়ে ভাবতে থাকল, কী করা যায়, কোথায় একজন বুশকে পাওয়া যায়।


ভূতের মতো কালো ছেলে দুধের মতন ফর্সা বুশ সাজলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। 


‘এ বোগদাদি, তুই বুশ হ!’ হঠাৎ প্রস্তাব করল উত্তর পাড়ার ফকরুজ্জামানের ছেলে, যাকে মধুপুরের লোকেরা ডাকে ‘ফকের ব্যাটা সাদ্দাম’।

বোগদাদি সাদ্দাম মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘হুশ্ শালা!’

তার মানে সে বুশ সাজার প্রস্তাবে অপমানিত হয়েছে। হওয়ার কারণ আছে: সাদ্দামদের মধ্যে একমাত্র সে-ই স্বকীয় সাদ্দাম, তাকে ডাকতে বা তার সম্পর্কে কিছু বলতে হলে তার নামের আগে তার বাপের নাম অথবা চিকনা, কালু, মুরগি ইত্যাদি অপ্রীতিকর বিশেষণ যোগ করার প্রয়োজন হয় না। খাঁটি সাদ্দাম হোসেনের মতোই সে গায়ে-গতরে গাট্টা-গোট্টা, ঘাড়ে-মাথায় বাকি ছয় জনের বাড়া এবং বুদ্ধিতেও সবাইকে ছাড়িয়ে। তাই মধুপুরের লোকেরা তার নামের আগে গুণবাচক বিশেষণ হিসেবে যোগ করেছে ‘বোগদাদি’।

অপমানিত বোগদাদি সাদ্দাম অপমানের শোধ নিতে ফকরুজ্জামানের ছেলেকেই উল্টো হুকুম দিল, ‘ফকের ব্যাটা, তুয়ি হ বুশ।’

কিন্তু ফকের ব্যাটার বুকের মধ্যে লাফিয়ে উঠল প্রতিবাদ, ‘ইহ্‌ শালার শখ কত!’

তখন বোগদাদি কয়, ‘ক্যা? বুশ হলে কী হোবে?’

‘ক্যা? মুই কোন দুঃখে শয়তান বুশ হবা যামু রে? তুই হওয়া পারিস না?’

বোগদাদি আঁতে ঘা-লাগা মান্যগণ্য মোড়লের মতো বলল, ‘বোগদাদি সাদ্দাম বুশ হয় ক্যাংকা করে? এইডা তোর ক্যাংকা বিবেচনা?’

‘বিবেচনা মারাস না। মুই বুশ হমু না, বাস্!’ ফকের ব্যাটা তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে পগারের দিকে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিল।

তারপর বোগদাদি ফিরে তাকাল দক্ষিণ পাড়ার খাতু ফকিরের ছেলের দিকে, যাকে ‘খাতুর ব্যাটা সাদ্দাম’ ডাকা হয়, মুরগির মতো ছোটখাটো ও হাড্ডিসার বলে ‘মুরগি সাদ্দাম’ও ডাকা হয়, আবার কখনো কখনো, সংক্ষেপে শুধু ‘মুরগি’ বলে ডাকা হয়।

‘মুরগি, তালে তুই হ রে! মজা হোবে!’ ফুসলায় বোগদাদি।

খাতুর ব্যাটা নারাজ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘উঁহু, মুই বুশ হমু না।’

‘শালা মাগি!’ বোগদাদি বলল। তারপর ইব্রাহিমের ছেলের দিকে চেয়ে বলল, ‘কালু, তুই বুশ হ দিনি, খানিকক্ষণ মজাক্ করা হোক!’

বর্গাচাষি ইব্রাহিম বক্সের ছেলে, ইব্রার ব্যাটা ওরফে কালু সাদ্দাম, হেসে বলল, ‘বুশ ত গোরো রে!’

মানে, সে বোঝাতে চাইল, ভূতের মতো কালো ছেলে দুধের মতন ফর্সা বুশ সাজলে তা বাস্তবসম্মত হবে না। তার এই কথায় অন্য বালকেরা ভুল বুঝল; তাদের ধারণা হলো, বুশ সাজতে কালুর কোনো আপত্তি ছিল না, যদি তার গায়ের রং বুশের গায়ের রঙের উল্টোটা না হতো।

‘তে অসুবিদা কী?’ বোগদাদি কালুকে বলল। তারপর অন্যদের সমর্থনের আশায় যোগ করল, ‘আম্রিকার বুশের লাকান ধলো বান্দর হামরা পামো কোন্টে?’ বলে সে অন্যদের মুখের দিকে তাকাল, তাদের সায় প্রত্যাশা করছে সে। অন্যরা তার প্রত্যাশা পূরণ করে মাথা নাড়ল, ‘হয় হয়, কোন্টে পামো?’

তাই বোগদাদি সর্বজন-সমর্থিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের হুকুমের সুরে কালুকে বলল, ‘হ হ, তুয়ি বুশ হ। কোনো অসুবিদা নাই।’

কিন্তু কালু নারাজ। পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে, ডানে-বাঁয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘না, অসুবিদা আছে। মোর পক্ষে বুশ হওয়া সম্ভবপর লয়।’

এবার অসাদ্দামদের দিকে চেয়ে বোগদাদি বলল, ‘সাদ্দামেগেরে যখন বুশ সাজতে এতই আপত্তি, তালে তোরাই কেউ একজন সাজো রে। এ ফেদু, তুই সাজ্।’

ফেদু কয়, ‘মুই কিসক খিস্টান সাজমু? আল্লা গুনা দিবে না?’

‘না না, মিছামিছি খিস্টান সাজলে কোনো গুনা হোবে না।’ চিকনা সাদ্দাম রায় দিল।

মুরগি সাদ্দাম সায় দিয়ে মাথা দুলিয়ে বলল, ‘কোনো গুনা হোবে না।’

বোগদাদি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল, ‘তুই যুদিল্ বুশ হয়া ঠিক ঠিক বুশের লাকান পাট করা পারিস, তালে তোর ছোয়াব হোবে, বুঝিছু?’

ফেদু বোগদাদিকে খারিজ করে দিল, ‘ফাত্রা কতা কস না।’

চেংটু এই ফাঁকে বোগদাদির ধর্মীয় জ্ঞান সংশোধন করার উদ্যোগ নিল, বলল, ‘নাটক-ছিনামাত যারাই পাট করে তারগেরে গুনা হয়। মৌসুমী-শাবনূর ব্যাবাক মাগিরা হাবিয়া দোজখের মধ্যে যায়া কান্দন জুড়ে দিবে, ও আল্লা মাপ করে দে, আর কোনোদিন পাট করমু না।’

আলি বলল, ‘হাসান-হোসেনের পাট করলে গুনা হোবে না রে। সাদ্দামের পাট করলেও গুনা হোবে না। তোরা কেউ যুদিল্ বুশের পাট করিস, মুই সাদ্দামের পাট লিতে রাজি।’

সাদ্দামেরা এক সঙ্গে কোলাহল করে উঠল: ‘সাদ্দামের পাট লেওয়ার মানুষ মেলা আছে হে। তুই বুশ হবু কি না তাই ক!’

আলি শ্বাসাঘাত করে বলল, ‘নাহ্‌!’

অতি সঙ্গত কারণে সাধারণ সাদ্দামরা প্রত্যেকেই বুশের ভূমিকায় অভিনয় করতে নারাজ। আর স্বনামধন্য বোগদাদি সাদ্দামের পক্ষে ধিকৃত ‘চুদির ভাই’ বুশের ভূমিকায় অভিনয় করতে সম্মত হওয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। অসাদ্দামরাও প্রবল আপত্তি সহকারে বুশের ভূমিকা গ্রহণের প্রস্তাব নাকচ করে দিল।

ফলে দুপুরটা মাটি মাটি মনে হতে লাগল, চৈতালি বাতাস হঠাৎ থম্ মেরে গেল, একঘেঁয়ে নিরানন্দ প্রহর বালকদের চঞ্চল মনকে বাষ্পাচ্ছন্ন করে তুলল। বুড়ির ভিটার পগার পেরিয়ে দূরে চৈত্রের মাঠে কটকটে রোদের ঢেউ তির তির করে কাঁপছে, মাঠপ্রান্তে বনগ্রামের কিনারে কালছে গাছপালার ফাঁকে একটা ঘরের নতুন টিনের চালে রোদ ঝিকমিক করছে।

হঠাৎ মাঠের উপর দিয়ে ছুটে এল এক হলকা গরম বাতাস; খঞ্জনি বেজে উঠল খড়কুটো আর শুকনো পাতায়। তারপর ধূলিবালি, নুড়ি, খড়কুটো আর শুকনো পাতা মিলেমিশে একটা ঘূর্ণি পাকিয়ে উঠল; সেই ঘূর্ণি ঘুরতে ঘুরতে জায়গা বদল করতে লাগল: বাম থেকে ডানে গেল, ডান থেকে এঁকেবেঁকে সামনে খানিকটা গিয়ে আবার বামে ঘুরে কিছু দূর এগিয়ে অবশেষে খড়ের বুশকে ঘেরাও করে ফেলল, তারপর তাকে কেন্দ্র করে ক্রমাগত পাক খেতে থাকল। বালকদের আবার মনে পড়ে গেল মরুভূমির ঝড়ের কথা, তারা চোখগুলো বিস্ফারিত করে ঘূর্ণিবায়ুটির দিকে চেয়ে রইল: খড়ের বুশকে কেন্দ্র করে ফরফর পট্পট্ শব্দ তুলে ঘূর্ণিবায়ুটি তুমুল ঘুরছে; উড়িয়ে নিতে চাইছে খড়ের পুত্তলিকাটিকে: যেন এই অশুভ, নাপাক বস্তুটিকে দোজখে নিক্ষেপ করার খোদায়ী নির্দেশে ছুটে এসেছে অশরীরী আত্মারা।

বালকদের ছোট ছোট বুকগুলি কেঁপে কেঁপে উঠল, চোখগুলি আরও বড় বড় হয়ে গেল। তাদের মনে পড়ে গেল: বুড়ির ভিটা ও এখানকার শতবর্ষী বটগাছ ‘দোষান্তরি’। এই ভিটায় মানুষের লাশ পাওয়া গেছে, খটখটে শুকনো মাটিতে তাজ্জবভাবে পোঁতা ছিল লাশটির মাথা, যেন আকাশ থেকে ছুড়ে-মারা তির সোজা ছুটে এসে সেঁধিয়ে গেছে খটখটে কঠিন মাটিতে। আর, এই বুড়ি বটগাছের গায়ে ভুলেও কেউ একটা আঁচড় কাটে না। কারণ, এই গাছের গায়ে কুড়ালের কোপ বসালে লাল টকটকে রক্ত ঝরেছে, আর যে-লোক কোপটি মেরেছিল সে রক্তবমি করতে করতে মরে গেছে।

সুতরাং বালকদের বুক দুরুদুরু, চোখ বিস্ফারিত। কিন্তু ঘূর্ণিবায়ুটি খড়ের বুশকে এক চুলও নড়াতে পারল না। কিছুক্ষণ ধরে বৃথাই পাক খেল, তারপর চাপা একটা হু হু ধ্বনি তুলে কোথায় মিলিয়ে গেল। একদম হঠাৎ গায়েব। এই লীলা বালকদের বোধের অতীত। চৈত্রের দুপুর হঠাৎ নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলল, চারদিকে নেমে এল দমবন্ধ এক নৈঃশব্দ্য। বটের পাতারা অকস্মাৎ জড়বৎ স্থির। পাখিরাও হঠাৎ রহস্যময় নীরব। বুড়ির ভিটার খটখটে সাদা মাটিতে এখন চিতপটাং পড়ে আছে বুশ, ঘূর্ণিবায়ুটির পরিত্যক্ত ধূলিবালি, খড়কুটো আর শুকনো পাতার জঞ্জালে আকীর্ণ।

‘মুই ভয় খাছিনু রে!’ নীরবতা ভাঙল চিকনা সাদ্দাম।

তার সরল স্বীকারোক্তি শুনে হেসে উঠল বোগদাদি, ‘ক্যা? ভয় খাছু ক্যা?’

‘মুই মনে করিছিনু, এই বাউরুল (ঘূর্ণিবায়ু) আসিছে বুশের জন্যি।’ চিকনা হেসে বলল।

‘তে হলোডা কী? ভয় খাওয়ার কী আছে তাত্?’ বোগদাদির ভঙ্গি এমন, যেন সে নিজে একটুও ভয় পায় নি, ‘বাউরুল ত ভালো বাউরুল, ইবলিসের পয়দা বুশের…’

বোগদাদির কথা শেষ হওয়ার আগেই কালু বলে উঠল, ‘কারবালত্ থে আসিছে। কারবালাত্ বালুঝড় উঠিছে লয়?’

হঠাৎ বালকেরা দেখতে পেল, লাকড়ির মতো লম্বা লম্বা দুটি হাত দোলাতে দোলাতে হেলে দুলে এগিয়ে আসছে মন্তাজের ব্যাটা জব্বার: বয়স বিশ-বাইশ, গায়ে-গতরে সমর্থ মরদ, কিন্তু কথা বলে পাঁচ বছরের বালকের মতো আধো আধো বোলে, বুদ্ধিশুদ্ধিও তথৈবচ। সমবয়সীদের সঙ্গে তার পরতা হয় না, আট-দশ বছরের কম বয়সী ছেলেদের পিছু পিছু বেখাপ্পাভাবে ঘুরে বেড়ায়, খেলাধুলা করে। সব খেলাতেই সে কাজের চেয়ে বেশি অকাজের, কিন্তু হাসিঠাট্টার খোরাক, তাই ছেলের দলের কাছে অপাঙ্‌ক্তেয় নয়। তার মোটা মোটা ঠোঁট দুটো সব সময় ফাঁক হয়ে থাকে বলে শুধু বাপ-মা ছাড়া সবাই তাকে ডাকে ‘হা-করা জোব্বার’।

জব্বার খানিকটা দূর থেকেই সমাচার জিজ্ঞাসা করল, ‘কী রে সাদ্দামেরা, কী করোছিন?’

‘আয় আয়, হামরা অ্যাডা বুশ ঢুঁড়ে বেড়াওছি।’ বলল বোগদাদি। কিন্তু জব্বার তার কথা স্পষ্ট শুনতে পেল না। সে আরও কাছে এসে পুছ করল, ‘কী কলু? কী ঢুঁড়ে বেড়াওছিন?’

সাদ্দামেরা সমস্বরে হেসে উঠল। ওরা নিশ্চিত মনে ভাবল, ভেবে খুশি হলো যে, এইবার বুশকে পাওয়া গেছে। হা-করা জব্বারকে বুশ সাজার প্রস্তাব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে রাজি হয়ে যাবে।

কিন্তু প্রস্তাবটা পাওয়ার পর জব্বার সবাইকে অবাক করে দিল: ‘না, মুই বুশ হমু না।’

‘ক্যা? হবু না ক্যা রে?’ সাদ্দামদের কপালে ভাঁজের ঢেউ খেলে গেল, ভুরু কোঁচকাল।

অজব্বারসুলভ গুরুতর ভঙ্গিতে জব্বার বলল, ‘বুশ খারাপ। চুদির ভাই কারবালাত্ বোমা মারিছে। কারবালাত্ ইমাম হোসেনের মাজার আছে লয়?’

‘হয় হয়, তোর মাথাত্ অ্যাতো বুদ্দি?’ এটা সাদ্দামদের ফুসলানি। নির্বোধ জব্বারের বুদ্ধির তারিফ করে ওরা আসলে ওকে ভজাতে চায়।

কিন্তু অন্যদের প্রশংসার দিকে জব্বারের মন নাই, সে বলল, ‘শালা বুশ ইংকা বজ্জাত?’

অন্য ছেলেরা জব্বারের কথা বলার ভঙ্গি দেখে হাসল। ইমাম হোসেনের মাজারে বোমা মারার সাহস বুশ কোথায় পেল, এই কথা ভেবে সে তাজ্জব বনে গেছে দেখে সবাই বেশ মজা পেল।

জব্বার এবার বলল, ‘আল্লা বুশের কী দশা করে দেখিস তোরাই! নোয়ার ডাং দিয়ে মারবে। ডাংগাতে ডাংগাতে শরীলের ব্যাবাক গোস্ত থিতলা করবে, হাড়হাড্ডি গুঁড়া করে পাউডার বানাবে। তারপরে আগুন দিয়ে পোড়াবে, পুড়ে বুশ ছাই হয়া যাবে। শ্যাষ!’ বলে জব্বার থামল, একটু দম নিল।

চেংটু কিছু-একটা বলার জন্যে মুখ হাঁ করল। কিন্তু জব্বারের ততক্ষণে দম নেওয়া শেষ, সে আবার বলার শুরু করল, ‘ওস্! যাবু কোন্টে বাপধোন? শ্যাষ নাই! তোর লিস্তার নাই!’


হামার দুনিয়াত হামি মোছলমান থোমো না। ব্যাবাক মোছলমান শ্যাষ করে ফ্যালামো। 


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং জর্জ বুশ সশরীরে মধুপুরের ‘হা-করা জোব্বারের’ সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আর জব্বার তাকে ভ্যাংচাচ্ছে।

তারপর সে আবার সাদ্দামদের দিকে চেয়ে ঘোষণা করল, ‘শোনো রে, আল্লা ছাইগুলা জড়ো করে আবার বুশক্ বাঁচে তুলবে। তারপরে নোয়ার ডাং দিয়ে আবার পিটন। যে-সে পিটন লয়। এই পিটনের আর শ্যাষ নাই। ক্যা হারামজাদা, কারবালাত বোমা মারবু না? বোমা তোর গোয়ার মদ্যে শিলান হোবে, ওসেক্!’

হা-করা জব্বারের মুখে এক সঙ্গে এত কথা কেউ কখনো শোনে নি। এত ভালো ভালো কথা এমন সাজিয়ে-গুছিয়ে সে যে বলতে পারে এমন ধারণাই সাদ্দামদের ছিল না।

বোগদাদি সাদ্দাম তাই লম্বা সুর করে তার তারিফ করে বলল, ‘জোব্বার রে, অ্যাতো কতা তুই শিখলু কোন্টে, ভাই?’

জব্বার বুদ্ধিমান ছেলের মতো বলল, ‘শিখার কী আছে? হারামজাদা বুশ বজ্জাতের হাড্ডি।’

‘তে হোক। তুই অ্যানা মিছামিছি বুশ সাজেক দিনি। হামরা অ্যানা যুদ্দ যুদ্দ খেলি!’

‘না রে, বুশ মুই হমু না।’

‘সত্যি সত্যি হবু নাকি রে গরুডা? মিছামিছি। খেলা ত, খেলা!’

‘খেলা? তে মোক্ ক্যান বুশ সাজা লাগবে? তোরা ব্যাবাকে বাপের ব্যাটা সাদ্দাম হবিন আর মুই হমু শয়তানের হাড্ডি বুশ?’

জব্বারের পিঠে এবার হাত বুলিয়ে বোগদাদি বলল, ‘হোস না ক্যা বাপু! সত্যি ত আর লয়। হলে কী হোবে!’

‘না, মুই হমু না।’ ঘাড় গোঁজ করে বলল জব্বার।

‘হ রে হে! হামরা তোক ট্যাকা দিমো। যুদি ভালো করে পাট করিস, বিশ ট্যাকা পাবু।’

‘হেহ্‌! তোরা মোক মিছাই লোব দ্যাখাওছিন।’

‘মিছা লয় রে, মিছা লয়। হামরা ব্যাবাকে চাঁন্দা তুলে তোক বিশ ট্যাকা দিমো।’

এবার জব্বার ধন্দে পড়ে গেল। এই বিশ-বাইশ বছরের জিন্দেগিতে চার-পাঁচে কুড়ি টাকা সে কখনো ছুঁয়ে দেখারও সুযোগ পায় নি। আর-বছর শিবগঞ্জের মেলায় যাওয়ার সময় তার বাপ তাকে পাঁচ টাকার ময়লা একখানা নোট দিয়েছিল, তাতেই তার খুশির চোটে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে মরার দশা হয়েছিল। আর এখন এরা বলছে, শুধু একটু বুশের ভূমিকায় ‘পাট’ করলেই চার-পাঁচে কুড়ি টাকা দেবে। বিবেচনার বিষয় বটে।

একটু পরে সে অবিশ্বাসের সঙ্গে বোগদাদির মুখের দিকে তাকাল। তারপর অন্যদের মুখগুলোও জরিপ করে দেখতে লাগল। শেষে মোটা মোটা ভুরুদুটিতে সন্দেহের ঢেউ খেলিয়ে বলল, ‘সত্যিই দিবিন ত?’

‘হয় হয়, সত্যিই দিমো।’ ছেলেদের মুখপাত্র বোগদাদি কপট হেসে আশ্বাস দিল।

কিন্তু জব্বারের অবিশ্বাস কাটল না। সে বলল, ‘না, তোরা আগে কও, মোর সাথে চিটারি করবিন না ত?’

ছেলেরা হাসল, বোগদাদি তাদের দিকে চেয়ে চোখ পাকাল, তাদের বোঝাতে চাইল যে এভাবে হাসিঠাট্টা করলে আলোচনা বরবাদ হয়ে যেতে পারে। তারপর বোগদাদি গম্ভীর হলো, গুরুত্বের ভাব এনে জব্বারকে আবার আশ্বাস দিয়ে বলল, ‘না না, চিটারির কথা আসে ক্যান? হামরা কি চিটার?’

‘বুকত্ হাত দিয়ে কও, চিটারি করবিন না ত?’

‘না না, চিটারি করমো না, লে।’ বোগদাদি তারচেয়ে বিঘতখানেক লম্বা জব্বারের পিঠ থাবড়ে দিতে দিতে মুরুব্বির মতো বলল।

‘না, মোর বিশ্বাস হওছে না রে। তোরা খোদার কসম খায়া কও। ব্যাবাকে আল্লার কিরা খায়া কও যি তোরা মোক বিশ ট্যাকা দিবিন। চিটারি করবিন না।’

‘লে লে, আল্লার কিরাই খাওছি। বিশ ট্যাকা তোক্ দেওয়া হোবে।’

জব্বার কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর বলল, ‘তে বুশ হয়া মোক কী করা লাগবে?’

বোগদাদি অভিনয়-পরিকল্পনা বয়ান করতে লাগল: ‘তুই কবু, হামি বুশ, আমি দুনিয়ার বাদশা। এই দুনিয়াত হামার সমান আর কেউ নাই। হামি যা ইচ্ছা তাই করা পারি। এইবার হামি সাদ্দামের পুটকি ফাটামো। সাদ্দাম ক্যান মোছলমান? হামার দুনিয়াত হামি মোছলমান থোমো না। ব্যাবাক মোছলমান শ্যাষ করে ফ্যালামো। এল্যা কতা কবু আর চিগরে চিগরে উঠবু। আর তোর মনত্ যা যা আসে তাই কয়া যাবু, কোনো অসুবিদা নাই।’

‘আর তোরাই কী করবিন?’ জব্বার বলল।

বোগদাদি বলল, ‘হামরা? হামরা কমো, ইল্লতের বাচ্চা বুশ, খিস্টানের বাচ্চা বুশ। শুয়ারের পয়দা শুয়ারের গোস্ত খাস, তোর গাওত্ কত শক্তি, আয় দিনি, কারবালাত্ আয়। তারপরে কারবালাত্ যুদ্দ হোবে, বুঝিছু?’

‘মুই একলাই, আর তোরাই ব্যাবাকে?’

‘ক্যা? তুই জুয়ান মরদ লয়?’

‘এ, তোরাই মোক মারবিন না ত?’ হঠাৎ সচকিত হয়ে বলে উঠল জব্বার।

‘মিছামিছি যুদ্দ। মজাক বুঝিস না?’

‘তারপরে কী হোবে?’

‘কী আর হোবে? বুশ সালিন্ডার করবে। হামরা কমো, চুদির ভাই তওবা কর। তওবা করে এইবার মোছলমান হ। শুয়ারের গোস্ত আর খাবু না, নমাজ পড়বু পাঁচ ওক্তো।’

‘তারপরে তোরা মোক বিশ ট্যাকা দিবিন?’

‘হয় রে, হয়!’

তারপর ভিটার মাঝখানে দাঁড়াল জব্বার। চোখেমুখে তার শরমিন্দা হাসি, জীবনে কখনো সে অভিনয় করে নি। তাকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াল অন্য ছেলেরা। বৃত্তের মাঝখানে জব্বারকে অন্য ছেলেদের তুলনায় বেশ উঁচু আর শক্তিশালী দেখাচ্ছে। তারা তাকে ঘিরে চক্রাকারে ঘুরতে আরম্ভ করল। তাদের অনুসরণ করে একইভাবে ঘুরতে লাগল জব্বারের চোখের দুই তারা।

‘কী রে, সাদ্দামেরা…!’ হঠাৎ হেসে ফেলল জব্বার। সে এই নাটকের মধ্যে এখনো মানসিকভাবে ঢুকতে পারে নি।

কিন্তু বোগদাদি অ্যাকশান শুরু করে দিল: ‘তুই কে হে?’

জব্বার হাসতে হাসতে বলে, ‘হামাক্ তোরা চিনিন না? হামি দুনিয়ার বাদশা… এই, মোর হাসি বারাওছে রে!’

‘হাসি তোর গোয়া দিয়ে বার করা হোবে, ওস!’ মুরগি সাদ্দামের অভিনয় গুরুতর।

‘খবরদার! হুশিয়ার! হামি বুশ, হামি এই দুনিয়ার বাদশা! হামার এক কুটি রকেট, দুই কুটি বোমারু, দশ কুটি বোমা..।’ জব্বার এখন সত্যি সত্যি নিজেকে বুশ ভাবতে শুরু করেছে।

‘কোন্টে তোর বোমা?’ মুরগি সাদ্দাম জব্বারের পিছন থেকে এগিয়ে গিয়ে ওর পাঁজরে একটা খোঁচা মেরেই ঝট করে পিছিয়ে গেল। জব্বার উল্টো দিকে ঘুরে তাকাল, তখন পিছন থেকে চেংটু এগিয়ে এসে তার পাছার নিচে হাত ঢুকিয়ে অণ্ডকোষে টোকা মেরে সাৎ করে সরে গেল।

তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়াল জব্বার, ‘বিচি ধরে কে রে?’

হি হি হি করে হেসে উঠল সবাই। একটা বড়সড় মাটির ঢেলা কুড়িয়ে নিয়ে জব্বারের দিকে ছুড়ে মারল চিকনা সাদ্দাম। বেলেমাটির নরম ঢেলাটা জব্বারের মাথার মাঝখানে পড়ে ঠুস করে ভেঙেচুরে ধুলা হয়ে উড়ে গেল। জব্বার একটুও ব্যথা পেল না বলে বাহাদুর সেজে বলল, ‘বুশের মাতা মাতা লয়। হেমলেট হে, হেমলেট। রকেট মারা লাগবে। ফকিন্নির বাচ্চারা, রকেট আছে তোরগেরে?’

পিছন থেকে আলি ছুটে এসে জব্বারের দুই নিতম্বের ফাঁকে একদম গুহ্যদ্বার বরাবর তর্জনী দিয়ে জোরে একটা গুঁতো মেরে বলল, ‘আইদা তোর রকেট!’

জব্বার উত্যক্ত ঘোড়ার মতো ডান পা দিয়ে পেছন দিকে মারল এক লাথি, তার পায়ের গোড়ালি আঘাত হানল আলির পেটে, আলির মুখ থেকে একটা শব্দ বেরিয়ে এল: কোঁক্। সঙ্গে সঙ্গে ডান হাতে মুখ চেপে ধরে নিশ্বাস বন্ধ করে সে ল্যাটাপেটা হয়ে বসে পড়ল মাটির উপর। জব্বার ওর দিকে চেয়ে কোমরে দুই হাত রেখে সব দাঁত বের করে বাহাদুরের মতো হাসতে লাগল।

বোগদাদি হাসতে হাসতে আলিকে বলল, ‘কী রে, প্যাট ফাটিছে নাকি?’

হাসাহাসি আরম্ভ করে দিল সবাই। হাসল না শুধু আলি। সে উঠে দাঁড়াল, পেটে হাত বুলাতে বুলাতে জব্বারের দিকে চোখ পাকিয়ে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল।

জব্বারের ঘাড়ে একটা চাটি মেরে বোগদাদি ধমকাল, ‘তুই হামার সৈন্যের প্যাটত লাত্থি মারিস? শালা ইল্লত–খিস্টান, এত্তি বড় সাওস?’

জব্বার ঘাড়ে ব্যথা পেয়ে বোগদাদির দিকে ঘুরে কিছু বলতে যাবে, তখনই পিছন থেকে মুরগি সাদ্দাম ছুটে এসে জব্বারের পাছায় চটাস শব্দে একটা চড় মেরে হাঁক ছাড়ল, ‘খিস্টানের বাচ্চা, মোছলমানের প্যাটত লাত্থি মারিস?’

জব্বার ছুটে গেল মুরগি সাদ্দামের দিকে, পিছন থেকে তার উপর এক সঙ্গে চড়াও হলো ফেদু আর ছয়ফুল। ফেদু চিমটি কাটল পাছায়, আর ছয়ফুল খোঁচা মারল পাঁজরে। চিমটি আর খোঁচার মিলিত পীড়নে কাউমাউ আর্তনাদ করে উঠল জব্বার। দুই হাতের দশটা আঙুলের নখর মেলে সে দুই নিপীড়ককে এক সঙ্গে পাকড়াও করতে চাইল সে, কিন্তু ওরা দুজন দুদিকে ছুট দিল দেখে সে কাঁদো কাঁদো মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল অসহায় ভঙ্গিতে।

তখন পিছন থেকে তার ওপর আক্রমণ চালাল এক সঙ্গে তিনজন। লুঙ্গি ধরে টান মারল একজন, একজন পিঠে দিল খোঁচা, আর একজন, সে বোগদাদি সাদ্দাম, একটা কান ধরার চেষ্টা করল। লুঙ্গি টানল যে, সেই চিকনা সাদ্দামের দিকেই জব্বার ধেয়ে গেল, কেননা ইজ্জতের উপর আঘাতটাই বড়। কিন্তু চিকনা বাতাসের বেগে ছুটে অনেক দূরে চলে গিয়ে থামল, ঘাড় ফিরিয়ে হলুদ দাঁতগুলো সব বের করে ভ্যাটকানো হাসি দিল। জব্বার মাটি থেকে একটা ঢিল তোলার জন্য মাজা বেঁকিয়ে সামনে ঝুঁকে যেই নিচু হলো, অমনি পিছন থেকে তার পিঠে লাফ দিয়ে উঠে বসল বোগদাদি সাদ্দাম। কিন্তু জব্বার তো ঘোড়া নয় যে তার পিঠে জুত হয়ে বসা যাবে। ফলে বোগদাদি পড়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে তার গলা দু’হাতে বেড় দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে তার পিঠে ঝুলতে লাগল, যেন বড়সড় একটা কাঁঠাল।

জব্বারের গলায় ফাঁস লাগার অবস্থা হলো, তার গলার ভিতর থেকে গোঁ গোঁ শব্দ বেরিয়ে আসতে লাগল। বোগদাদির হাতের ফাঁস থেকে নিজেকে মুক্ত করার কোনো বুদ্ধি না পেয়ে সে চড়কির মতো ঘুরতে লাগল, তার পিঠে ঝুলন্ত বোগদাদিও একইভাবে ঘুরে চলল, তা দেখে অন্য ছেলেরা মজা পেয়ে হাততালি বাজাতে লাগল।

এই অবস্থায় পেটে লাথি খাওয়ার শোধ নিতে এগিয়ে এল মুরগি সাদ্দাম। সে ছুটে গিয়ে ঘুরন্ত জব্বারের লুঙ্গি ধরে মারল এক হ্যাঁচকা টান। জব্বারের লুঙ্গির গিঁট সেই জবরদস্তি হজম করল বটে, কিন্তু সস্তা পুরোনো কাপড়ের দুর্বল জমিন তা সইতে পারল না, আর্তনাদ করে উঠল: পরাৎ।


মধুপুর গ্রামের সমস্ত মানুষ জড়ো হয়েছে সড়কের তেমাথায়, যেখানে শক্ত করে পোঁতা একটা বাঁশের ডগায় জিভে কামড় দিয়ে চোখ বিস্ফারিত করে ঝুলছে ‘আম্রিকার পেসিডেন বুশ’।


ওই শব্দে লুঙ্গি নয়, ছিঁড়ে গেল জব্বারের প্রাণটাই। তার নাকের পাটা ফুলে উঠল, দুই ফুটো দিয়ে বেরিয়ে এল এক হলকা গরম বাতাস। তারপর সে বাঘের হাই তোলার ভঙ্গিতে বিশাল হাঁ মেলে দাঁত বসিয়ে দিল বোগদাদির একটা হাতে, যে-বোগদাদি তখনো তার গলা শক্ত করে চেপে ধরে তার পিঠে ঢাউস একটা কাঁঠালের মতো ঝুলছিল। কামড় খেয়ে বোগদাদি একটা মরণচিৎকার দিয়ে টাকি মাছের মতো লাফ মারল শূন্যে, তারপর দড়াম করে মাটিতে পড়ে গিয়ে বাম কনুইয়ের নিচটা ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে ‘ওরে মা রে মরে গেনু রে’ বলে ককাতে ককাতে কুণ্ডলী পাকিয়ে গড়াগড়ি আরম্ভ করে দিল। সবাই জব্বারের দিকে তাকিয়ে দেখতে তার ঠোঁট বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, দুই চোখ আগুনের বল। নাকের ফুটো বাঁশের চোঙের মতো বড় বড় করে সে ফোঁস ফোঁস করে হাঁপাচ্ছে। তার লুঙ্গির গিঁট থেকে বিঘত খানেক নিচে অনেকটা জায়গা ছিঁড়ে নেমে গেছে।

‘তোর লুশি দ্যাখা যাওছে রে হা-করা,’ খ্যাক খ্যাক করে হাসতে হাসতে বলল ফকের ব্যাটা।

জব্বার মাথা নিচু করলে ছেঁড়া লুঙ্গির ফাঁক দিয়ে তার চোখ পড়ল নিজের পুরুষাঙ্গের মাথাটির উপর, ফলে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে মাটিতে বসে পড়ল। অদূরে গোঙানিরত বোগদাদি সাদ্দামের দিকে চেয়ে শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে সে বলল, ‘দে, এখন মোক তবন কিনে দে, হারামজাদা!’

সাদ্দামের দল জব্বারের কান্না দেখে খিক খিক করে হাসতে হাসতে নাচতে লাগল; তারা গানের সুরে বলল, ‘দ্যাখো রে দ্যাখো, বুশ কান্দে। শালার ভোঁচা দেখা যায়।’

হঠাৎ বুড়ি বটগাছের কোটর থেকে লাফ মেরে বেরিয়ে এল এক খ্যাঁকশিয়াল। বালকেরা ভূত ভেবে চমকে উঠল, তাদের মুখ থেকে বিস্ময়ধ্বনি বেরিয়ে এল: ‘কী রে!’

দুপুরের চোখ-ধাঁধানো রোদে খ্যাঁকশিয়ালটি প্রথমে হকচকিয়ে গেল, কোনো দিশা না পেয়ে মুহূর্তখানেক দাঁড়িয়ে রইল, তারপর তড়াক করে ছোট্ট একটা লাফ মেরে ছুট লাগাল পুব দিকে। ছেলের দল সংবিৎ ফিরে পেল, রে রে ধর ধর চিৎকার করতে করতে সেটাকে ধাওয়া করে চলল। নিশাচর খ্যাঁকশিয়াল দুপুরের কটকটে আলোয় দিশা হারিয়ে একবার ডানে দৌড়ায়, একবার বামে; তারপর বুড়িভিটার পগার পেরিয়ে লাফিয়ে পড়ল শরিফ মৃধার ইরি ধানের খেতে; খেতের পানিতে পড়ে সে খাবি খেতে লাগল; চিৎকার করতে করতে ধেয়ে এল ঠ্যাঙারে ছেলের দল। ধানখেতে ঘপাৎ ঘপাৎ ছপাৎ ছপাৎ শব্দ উঠল। খ্যাঁকশিয়ালটি খেত পেরিয়ে যখন শুকনো মাঠের কিনারে পৌঁছুল তখন পাথারের চারদিক থেকে লে লে ধর ধর রবে পান্টি উঁচিয়ে ধেয়ে এল বিভিন্ন গাঁয়ের রাখাল বালকদের ঝাঁক। নিধুয়া পাথারের মাঝখানে সাদ্দামের দল আর পান্টিওয়ালা রাখালের দলের হাতে ঘেরাও হয়ে জিভ বের করে হাঁপাতে থাকল অসময়ের খ্যাঁকশিয়াল।

***

মধুপুর গ্রামের সমস্ত মানুষ জড়ো হয়েছে সড়কের তেমাথায়, যেখানে শক্ত করে পোঁতা একটা বাঁশের ডগায় জিভে কামড় দিয়ে চোখ বিস্ফারিত করে ঝুলছে ‘আম্রিকার পেসিডেন বুশ’। বাঁশের ডগাখানা তার ‘গোয়ার ছিদ্রিপথে’ ঢুকিয়ে ধাক্কা মেরে মেরে অন্ততপক্ষে ‘কলজা’ পর্যন্ত ঠেকানো হয়েছে। উত্তরপাড়ার ছবদের মাস্টারের বেটা তার মানকি টুপিটা নিজের মাথা থেকে খুলে পরিয়ে দিয়েছে বুশের মাথায়, আর বকলম বোগদাদি সাদ্দাম এক টুকরা কাগজে লাল কালিতে ‘বুশ’ লিখে চারটি দশাসই খেজুরকাঁটা দিয়ে সেটা গেঁথে দিয়েছে বুশের উল্লম্ব পেটের উপর।

লোকেরা যখন বলাবলি করছে যে আমরিকানদের গুলি-বোমার মধ্যেও বাপের ব্যাটা সাদ্দামকে বাগদাদের রাস্তায় ‘বীরের মতন’ হেঁটে যেতে দেখা গেছে, লোকেদের ভিড়ে বোগদাদি সাদ্দাম যখন গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করছে ‘এ বাপুরে, দেখে যাও, দেখে যাও, শয়তানের বাচ্চা বুশের হামরা কী দশা করিছি!’, তখনো হাঁ-করা জব্বারের ঘ্যানর ঘ্যানর কান্না বেজেই চলেছে, ‘তবন কিনে দে, মোর তবন ছিঁড়লু ক্যান, তবন কিনে দে!’

(574)