হোম গদ্য গল্প ভার অথবা নির্ভারের গল্প

ভার অথবা নির্ভারের গল্প

ভার অথবা নির্ভারের গল্প
874
0

সামনের একমাস পত্রিকা দিতে হকারকে তিনি নিষেধ করে দিলেন। দিনকে দিন অসহ্য হয়ে উঠছে পত্রিকার নিউজ। নিউজ, নাকি এই দেশটাই অসহ্য হয়ে উঠছে! গতকালের পত্রিকায় ঢাকা, মফস্বল, গ্রাম মিলিয়ে সাতটা ধর্ষণের খবর। এই পত্রিকা তিনি কিভাবে ঘরে রাখবেন, যেখানে ঘরে একটা মেয়ে আছে তার! নিউজ নির্ভর অনেকগুলো চ্যানেল হয়েছে। রাতদিন তারা খবর দেখাচ্ছে। খবরের উপর  বিশ্লেষণ করছে। সুযোগ হলেই তিনি সেসব চ্যানেল খুলে বসে পড়তেন। আজ থেকে টিভির সামনে বসাও ছেড়ে দিলেন। স্ত্রী আর কন্যার এতে সুবিধাই হলো। ভারতীয় সিরিয়াল দেখায় ব্যাঘাত ঘটাবে না খটোমটো মুখের সংবাদ পাঠকরা।

তৃতীয় দিনে কন্যা এসে বলল, বাবা, তুমি কি আমাদের উপর রাগ করেছে, টিভির ঘরে আসছ না যে!

তিনি বললেন, রাগ করব কেন! টিভির দেখবটা কী! প্রতিদিন এক খবর। বোগাস!

সেজন্যই তো বলি আমাদের সাথে জলসা দেখ। বোরিং লাগবে না।

তোদের জিনিস তোরাই দেখ। ওসব মেয়েলি ঝগড়াঝাঁটি ভালো লাগে না। আচ্ছা, তুই আবার খবর-টবর দেখিস না তো?

আমার অত সময় নেই। তোমাদের ওই রাজনীতি-মারামারি-চাঁদাবাজির নিউজ দেখলে গা গুলিয়ে ওঠে।

এটাই ভালো। ওসব দেখতে যাবি না।

দেখছি নাকি!


পদ্মা সেতু দিয়ে কী হবে! মানুষ যদি ভালো না হয়!


মেয়ে  এবার এগারোতে পড়েছে। দেখতে দেখতে এগারোটা বছর চলে গেল। এগারো বছরে কয় হাজার দিন! অনেক সাধনার পর এই একটা মাত্র মেয়ে তাদের। বিয়ের পর সাত বছর পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন তিনি। অনেক চেষ্টা করেছেন, সন্তান আসে নি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দুজনের কারোরই কোনো ত্রুটি ধরতে পারে নি। শেষে একদিন গরিব শাহ মাজারে দুটো মোরগ মান্নত করেন স্ত্রী। তার এসবে বিশ্বাস নেই। তবু সন্তানের বাসনায় আর্দ্র মন স্ত্রীর কাজে বাধা দেয় নি। এমনকি সেদিন মোটর সাইকেলের পেছনে বসিয়ে স্ত্রীকে মাজার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। অবশ্য মাজারের ভেতরে তিনি ঢোকেন নি। দূরে, ভিড়ের বাইরে, সহজে কারো চোখ পড়ে না এমন জায়গায় তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। সব সময় পীর-দরবেশ, মাজার-কবরের অলৌকিকত্ব নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা তাকে যদি মাজারের সিঁড়িতে জ্যান্ত মোরগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেউ, ইজ্জতের প্রশ্ন।

গরিব শাহ মাজারের মান্নতের পরপরই মেয়েটা গর্ভে আসে। আর অমনি বৃষ্টিধোয়া কদম গাছের মতো ঝলমল করে ওঠেন স্ত্রী, আনন্দে। বলেছিলাম না একটা মান্নাত দিয়ে দেখতে। তুমি তো রাজিই হচ্ছিলে না প্রথমে।

তবু তিনি বিশ্বাস করেন নি তার মেয়ে গরিব শাহর দান। এই নিয়ে অবশ্য স্ত্রীর সাথে লাগতেও যান নি। যে যার বিশ্বাস নিয়ে থাকুক। পৃথিবী তার সন্তানদের নিয়ে মজার মজার খেলা খেলতে পছন্দ করে। মান্নতের পরপর স্ত্রীর গর্ভবতী হওয়া পৃথিবীর একটা খেলা।

মেয়েকে নিয়ে তিনি সর্বক্ষণ আতঙ্কে আছেন। বাংলাদেশের বয়সের সমান তার বয়স। এমন কঠিন অবস্থা তিনি আগে কখনো দেখেন নি। বাবার হাতে মেয়ে ধর্ষণ হচ্ছে—ভাবা যায়! এই খবরটা যদি কোনোভাবে মেয়ের কানে পৌঁছে সেও কি বাবা থেকে গা বাঁচিয়ে চলবে! পুরুষ হয়ে বড় লজ্জায় পড়েছেন তিনি। অফিসেও কলিগদের ভেতর ওই একই আলোচনা—পদ্মা সেতু দিয়ে কী হবে! মানুষ যদি ভালো না হয়!

এতদিন খবরের কাগজে ছিল। অদেখার উপর দিয়ে গেছে। এবার ঘটনা কাগজ থেকে বেরিয়ে এল তার এলাকায়। তরফদার ব্রিকসের উত্তর পাশে ডোবা মতো একটা জায়গা, তার  ভেতর অচেনা যুবতীর লাশ। উলঙ্গ। বিক্ষত লজ্জাস্থান। বাসার বুড়ো দারোয়ান এনেছে খবর। বুড়োর সীমাহীন আগ্রহ ঘটনা নিয়ে। তাকে দেখতে যাওয়ার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করল দারোয়ান। পুলিশ, র‌্যাব আর টিভির গাড়িতে সয়লাব এলাকা। সাধারণ মানুষ তো আছেই। এমন জনকোলাহল তো সব সময় দেখা যায় না। তার দেখা উচিত। বুড়ো দারোয়ানকে হতাশ করে দিয়ে তিনি গেলেন না। না গেলে কী হবে, ঘটনার উত্তাপ ঠিকই এসে পড়ছে আবাসিক এলাকায়। এখান থেকে তরফদার ব্রিকস কতই-বা আর দূর। দশ টাকা রিকশা ভাড়া। অবশ্য এখন নাকি পনের টাকা দাবি করছে রিকশা চালকরা। ওই এলাকার গুরুত্ব হঠাৎ করে বেড়ে গেছে।

তিনি চাইলেন তরফদার ব্রিকসের ঘটনা যেন মেয়ের কানে না পৌঁছে। মেয়ে জানতে পারলে পথে-ঘাটে চলতে ভয় পাবে। ভয় যা পাচ্ছেন তিনি একাই পান, এর ভেতর মেয়েকে না জড়ানোই ভালো। তিনি দুদিন মেয়েকে স্কুলে যেতে দিলেন না। মায়ের সাথে তাকে পাঠিয়ে দিলেন মামার বাসায়। ওর নানু নাকি অসুস্থ।

কী হয়েছে নানুর?

কী আর হবে। বয়স হয়েছে না! এখন তো রোগব্যাধি লেগেই থাকে। যাও, আম্মুর সাথে ঘুরে আসো। এই সময় মুরব্বিদের কাছে কাছে থাকলে দোয়া পাওয়া যায়।

মেয়ে গোছগাছ শুরু করে দিল। তিনি স্ত্রীর কানের কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বললেন, এই মিথ্যার জন্য কি আমার পাপ হবে আফসানা?

স্ত্রী কিছু বললেন না। থমথমে চোখে কতক্ষণ তাকিয়ে থেকে তার কাঁধে হাত রাখলেন।

সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে কী ভেবে তিনি বাজারের দিকে গেলেন। ইতস্তত ঘুরে ঘুরে বিকিনি পাওয়া যায় এমন দোকান খুঁজতে লাগলেন। এর আগে কখনো এই গলিতে তিনি আসেন নি। তার স্ত্রী নিজেই নিজের জিনিস কিনে থাকে। আজ ঝোঁকের মাথায় এসে অস্বস্তিতে পড়েছেন। অস্বস্তির কারণ, এই গলিতে মেয়েদের আনাগোনা বেশি। বেশিরভাগ দোকানদারও মেয়ে। একটা দোকানের সাইনবোর্ডে গলিটার নাম দেখলেন—কাপুড়িয়া পট্টি।

এদিক-ওদিক তাকিয়ে তিনি ‘আরাম বিকিনি হাউস’-এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। এই দোকানটা ফাঁকা। দোকানি মেয়েটা চওড়া স্ক্রিনের মোবাইল চোখের সামনে ধরে বসে আছে। তিনি গলা খাকারি দিতেই মেয়েটা মাথা তুলে দ্রুত ফোন রেখে দিল ড্রয়ারে। বলল, কী লাগবে স্যার? ঘেমে গেছেন তো। একটু বাম দিকে চেপে দাঁড়ান। বাতাস লাগবে।

তিনি সিলিঙে ঘুরতে থাকা ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বললেন, পেন্টি আছে না?

অবশ্যই আছে। কত সাইজের দেবো?

তিনি ফাঁপড়ে পড়লেন। সাইজ তো জানেন না। আমতা আমতা করে বললেন, আসলে হয়েছে কী, সাইজ জানা নেই। বয়স বললে হবে না?

কত বয়স?

সাড়ে এগারো। তবে স্বাস্থ্য ভালো। দেখলে তেরো চোদ্দ মনে হয়।

অসুবিধা নেই স্যার। আমি অনুমান করে দিয়ে দিচ্ছি। সমস্যা হলে বদলে নিয়ে যাবেন। মেয়েটা ঝটপট তার সামনে নানা রঙের পেন্টির স্তূপ বানিয়ে ফেলল। তিনি ডানে বায়ে তাকাতে লাগলেন  বারবার। এই সময় কেউ যেন না আসে।

কয়টা নেবেন স্যার? এই কালারটা নেন। অল্প বয়সী মেয়েরা এই কালার পছন্দ করে। মেয়েটা শ্যাওলা কালার তার সামনে মেলে ধরেছে। তিনি কয়েকটা নেড়েচেড়ে দেখলেন। সবই ফিনফিনে পাতলা। টান দিলেই যেন ফেসে যাবে। এর থেকে মোটা হবে না? আমার মোটা দরকার।

কী বলেন স্যার! এগুলো পাতলা হলেই তো পরে আরাম। সবাই পাতলা খোঁজে। দেখছেন তো, আমাদের দোকানের নামও কিন্তু ‘আরাম’।


এমন ছেলের প্রতি মুগ্ধ হওয়ার ন্যায্য অধিকার সবারই আছে। তনু কেন বাদ পড়বে!


তিনি কথা বাড়ালেন না। দেখেশুনে তুলনামূলক মোটা কাপড়ের তিনটা পেন্টি নিয়ে বাসার পথ ধরলেন।

বাসায় পৌঁছে স্ত্রীর হাতে প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এগুলো তনুর জন্য আনলাম।

স্ত্রী প্যাকেট খুলে অবাক হয়ে বললেন, ওর তো আছেই। আবার আনতে গেলে কেন!

এগুলো মোটা কাপড়ের, তাই আনলাম। আর এখন থেকে রেগুলার পরতে বলবে। শুধু বিশেষ সময়ে না।

তোমার হয়েছেটা কী বল তো!

কিছু হয় নি। আর শোন, একটা ভালো খবর, তরফদার ব্রিকসের সেই বদমাশটা ধরা পড়েছে। বাজারে লোকজন বলাবলি করছিল।

ইচ্ছা থাকলেও রেগুলার নামাজে যেতে পারেন না তিনি। তবে শুক্রবার এলে গায়ে সুগন্ধি মেখে সবার আগে আগে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মসজিদে নতুন ইমাম এসেছে। বয়সে তরুণ। এই জুমায় ধর্ষণের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখলেন ইমাম। তিনি দ্বিতীয় কাতারে ছিলেন। আলোচনা শুনতে শুনতে তার লোম দাঁড়িয়ে গেল। কয়েকবার পেছন ফিরে দেখলেন সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে আলোচনা শুনছে। বিশেষ করে তরুণদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। তিনি ভাবলেন, শুক্রবারের এই নামাজ সমাজ পরিবর্তনের বড় হাতিয়ার হতে পারে। দেশে লক্ষ লক্ষ মসজিদ। সাতদিন পরপর মানুষের সামনে কথা বলার সুযোগ আর তো কেউ পায় না। ইমামরা পাচ্ছে। দেশের সব ইমাম যদি এক যোগে সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতেন!

তনুর খালাত ভাই বেড়াতে এসেছে। ভার্সিটির ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিল সজল, এখন আত্মীয়দের বাসায় ঘোরাঘুরি করে ক্লান্তি দূর করছে। সজলের খুব ভক্ত তনু। সজলকে পেলে তনুর রাতদিন এক হয়ে যায়। ভাইয়া ভাইয়া ডেকে বাসা মাতিয়ে রাখে। সজলের প্রতি তনুর এই মুগ্ধতার কারণ উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করেছেন তিনি। সজল তার চারপাশকে মুগ্ধ করার মতোই ছেলে। মেধাবী। প্রচুর পড়াশোনা করে। পৃথিবীতে এমন বিষয় কমই আছে যার উপর সে তিন মিনিট বক্তৃতা দিতে পারবে না। প্রকৃতির অদ্ভুত অদ্ভুত তথ্যও তার জানা। আগের বার সে যখন এসেছিল, তাদের বাসার সামনের একমাত্র পেঁপে গাছে ঝুমঝুম করছিল পেঁপে। সজল তনুকে নিয়ে পেঁপে পাড়তে লেগে গেল। পাড়া শেষে বলল, পেঁপের রস প্রজাপতির খুব পছন্দের খাবার। পেঁপে পাকলে ওরা সবার আগে টের পায়। কিন্তু ওদের তো শক্ত দাঁত নেই তাই পেঁপের শক্ত চামড়া ফুটো করে রস খেতে পারে না। ওরা তখন পাকা পেঁপের গায়ে বসে ক্রমাগত পাখা দোলাতে থাকে। ওদের পাখা দোলানো দেখে পাখিরা বুঝতে পারে পেঁপেটা পেকে গেছে। পাখি তখন চামড়া ফুটো করে পেঁপে খাওয়া শুরু করে। এই সুযোগে প্রজাপতিরাও মহানন্দে পেঁপের রস খায়। গল্পটা শুনে তনুর চোখমুখ বিস্ময়ে আর আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। তনু যখন গল্পটা হুবহু তার বাবাকে আবার শুনিয়েছিল, তার চোখমুখও উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। এমন ছেলের প্রতি মুগ্ধ হওয়ার ন্যায্য অধিকার সবারই আছে। তনু কেন বাদ পড়বে!

সজলের এবারের বেড়াতে আসাটা তাকে নতুন টেনশনে ফেলল। তিনি সব সময় মেয়েকে চোখে চোখে রাখতে লাগলেন। দুই ভাইবোনের বাইরে ঘুরতে যাওয়ার প্রোগ্রাম নানান অজুহাতে ক্যানসেল করে দিতে লাগলেন। হোক সজল তার খালাত ভাই, তার থেকে বড় পরিচয় সে পুরুষ। আর তিনি ভালো করেই জানেন, মেয়েরা সব থেকে বেশি সেক্সুয়াল হ্যারেজমেন্টের শিকার হয় নিকটাত্মীয় দ্বারা।

সেদিন রাতে তিনি খেতে বসেছেন। পাশে বসে আছেন স্ত্রী। এটা সেটা তুলে তুলে খাওয়াচ্ছেন। পাশের ঘরে তনু আর সজলের হইহুল্লা শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ তনু চিল্লিয়ে উঠল—উহু, লাগছে তো! ছাড়েন ভাইয়া ছাড়েন!

তিনি এঁটো হাতে লাফিয়ে উঠলেন। পাশের ঘরে ছুটে গিয়ে বললেন, কী হচ্ছে তনু! এমন চিৎকার করছ কেন!

তনু বলল, ভাইয়ার মোবাইলে একটা সুন্দরী মেয়ের ছবি। আমি দেখতেই মোবাইল কেড়ে নিয়েছে। আর আমার কান ধরে টানছে, না বলে ছবি দেখেছি বলে।

তিনি গলা চড়িয়ে বললেন, অন্যের মোবাইল ধরতে যাও কেন! যাও, তোমার ঘরে যাও। রাত হয়েছে। সজল ঘুমাক।

খালুর চেহারার মানচিত্রে সজল বিব্রত হলো। খালু আসার আগ পর্যন্ত আলো হয়ে যেন জ্বলছিল সে। হঠাৎ নিভে গেল। সে তনুকে নিষ্প্রভ গলায় নিজের ঘরে চলে যেতে বলল।

স্ত্রী বললেন, এভাবে কথা বলছ কেন! কী এমন ঘটল যে এঁটো হাতে ছুটে আসতে হবে! ভাইবোনের মধ্যে কি এমন হয় না!

তিনি খাবার টেবিলে ফিরে আসলেন। স্ত্রী চাপা গলায় রাগত স্বরে বলল, তোমার হয়েছেটা কী! কদিন ধরেই দেখছি নানান সিনক্রিয়েট করছ। ছেলেটা কী ভাবল বলো তো!

তিনি মাথা নিচু করে খাওয়া শেষ করলেন।

পরদিন সজল বাড়ি চলে গেল। তনু সকালে ভাত খেল না। বাবার উপর অভিমান করে গটগট করে স্কুলে চলে গেল। তিনি অফিসে যাওয়ার আগে মেয়ের স্কুলের পথ ধরলেন। শিশির বেকারি থেকে টিফিন বক্সে পিৎজা নিলেন সাথে। আর কিটক্যাট চকলেট। ক্লাস তখনো শুরু হয় নি। মেয়ের পেছন পেছনই ঢুকেছেন স্কুলে। ক্লাসরুমে ঢুকবে তনু, তিনি ডাক দিলেন—খুকি।

বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে তিনি কন্যাকে খুকি সম্বোধনে ডাকেন। বাবার গলা শুনে এতটাই চমকাল তনু, যেন বাবা নয়, ভুত তার পিছু নিয়েছে। সে চমকে উঠে বলল, তুমি এখানে!

তিনি টিফিন বক্সটা মেয়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, জলদি খেয়ে নে, স্যার এখনো ক্লাসরুমে ঢোকে নি। পানি আনতে ভুলে গেছি। তোদের এখানে পানির ব্যবস্থা আছে তো!


এই শ্বাপদের জনপদ থেকে দ্রুত বিদায় নিয়ে তনু তার কাঁধটাকে নির্ভার করে দিয়ে গেছে।


তার কণ্ঠে এবং চেহারায় এমন মায়া ছিল, তনুর সব অভিমান গলে পড়ল। আগুনের আঁচে মোম যেভাবে গলে পড়ে। সে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। তিনি মেয়ের কোঁকড়ানো চুলে হাত বুলিয়ে বললেন, রাগ করিস নে খুকি। আমি তোর ভালো চাই।

বাবার এত আদরের মেয়ে তনু বেশিদিন বাঁচল না। পৃথিবীতে অকারণে কেউ মরে না। প্রকৃতি প্রত্যেক মৃত্যুর পেছনে একটা কারণ সাজিয়ে রাখে। তনু মারা গেল জন্ডিসে। এই ঘাতক কবে থেকে যে তনুর ভেতরটা কুরে খাচ্ছিল কেউ টের পায় নি। যখন জানা গেল, দেরি হয়ে গেছে। জন্ডিস ধরে গেছে লিভারে। তিনি মেয়েকে নিয়ে খুব ছোটাছুটি করলেন। পনের দিন অফিস কামাই গেল। দাড়িমোচে মুখ হয়ে গেল অচেনা। খাওয়া গোসল ঘুমের ঠিক নেই। এত ছোটাছুটি করলেন অথচ তনু নীরব হওয়ার সাথে সাথে তিনিও নীরব হয়ে গেলেন। জানাজার আগ পর্যন্ত প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে রইলেন নিথর। আত্মীয়রা তাকে একটু কাঁদতে বলল। তিনি কাঁদলেন না। পড়শিরা কিছু মুখে দিতে বলল। তিনি দিলেন না। কলিগরা চেয়ার ছেড়ে একটু  হাঁটতে বলল। তিনি হাঁটলেন না। মুর্দার গোসল শেষে জানাজায় নেয়ার সময় হলে তিনি নিজ থেকে উঠে খাটিয়ার হাতল ধরলেন। আফসানা তখন ঘরের ভেতর অজ্ঞান।

জানাজাগামী দুজন বলাবলি করতে লাগল—পৃথিবীর সব থেকে ভারি জিনিস হলো পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। এই দুর্ভাগ্য যেন আর কারো না হয়।

তিনি শক্ত করে খাটিয়ার হাতল ধরলেন। আর আশ্চর্য, তার কাঁধে সন্তানের লাশ ভারি ঠেকছে না। এই শ্বাপদের জনপদ থেকে দ্রুত বিদায় নিয়ে তনু তার কাঁধটাকে নির্ভার করে দিয়ে গেছে।

সাব্বির জাদিদ

জন্ম ১৭ আগস্ট, কুষ্টিয়া। কথাসাহিত্যিক।

শিক্ষা : ইসলামিক স্টাডিজ, অনার্স, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

প্রকাশিত গ্রন্থ —
একটি শোক সংবাদ [গল্পগ্রন্থ, ঐতিহ্য, ২০১৭]
পাপ [উপন্যাস, ঐতিহ্য, ২০১৮]
জীবনঘড়ি [উপন্যাস, বইকেন্দ্র, ২০১৮]

ই-মেইল : sabbirjadid52@gmail.com

Latest posts by সাব্বির জাদিদ (see all)