হোম পুনর্মুদ্রণ ‘বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য : একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ’-এর ভিত্তির সরলতা ও দুর্বলতা

‘বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য : একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ’-এর ভিত্তির সরলতা ও দুর্বলতা

‘বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য : একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ’-এর ভিত্তির সরলতা ও দুর্বলতা
648
0

১.
আকবর আলি খান একটা ইতিহাসের বিশ্লেষণমূলক বই লিখেছেন। বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য : একটি ঐতিহাসিক বিশ্নেষণ। এই দেশে প্রগতিশীলতা ও ধর্মচর্চার যে রূপরেখা সেখানে ইসলাম নিয়ে কিছু লেখা খুবই সেনসেটিভ বিষয় উভয় তরফ থেকেই। প্রগতিশীলরা ইসলামফোবিক আর ধর্মাচার পালনকারীরা চান না ধর্মের নানা তাত্ত্বিক দিক আলোচিত হোক সমাজবাস্তবতার আলোকে। এটাকে তাদের বিরাট একটা অংশ সন্দেহের চোখে দেখে। তারা নিজ নিজ সিলসিলার চিন্তাগুলো নিয়ে খুশি থাকতে চান। সেই হিসাবে আকবর আলি খানের ইসলাম সমাচার বিরল ও উল্লেখযোগ্য ঘটনা এই দেশে। উপমহাদেশে ইসলামের প্রচার ও বিকাশ নিয়ে তার লিখিত বইটি প্রগতিশীলরা এড়িয়ে যেতে চাইবেন। কারণ তারা ইতিহাসের একটা ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্যুত, বায়াসড। ইংরেজ কলোনির সুবাদে এই দেশে স্বাক্ষরতার শুরু। স্বাক্ষরতা যখন তাত্ত্বিক জায়গায় গিয়েছে আঠরশ শতকের শেষ দিকে, তখন ইংরেজি-শিক্ষিত শ্রেণি ইতিহাসের খণ্ডিত বয়ান লিখেছেন। উচ্চবর্ণের সনাতন ধর্মালম্বীরাই প্রধানত ইংরেজশিক্ষার সুবিধাপ্রাপ্ত। ফলে, এই শিক্ষিত শ্রেণির লেখা ইতিহাস দিয়ে তারা মূলত শ্রেণি ও জাতস্বার্থ রক্ষার্থে নিবেদিত ছিল। ফলে, সকল বাস্তবতাকে বাতিল করে দিয়ে ভারত-জাতীয়তাবাদের গুরুরা বিগত চারশ বছরের মুসলিম শাসন আমলটাকে বাদ দিয়েই ইতিহাস লিখতে চেয়েছে, লিখেছেন। এবং এই ইতিহাসের চল আজ অব্দি আছে এই দেশের তাত্ত্বিক সমাজে। ফলে, এগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের একটা দায়িত্ব অনুভব করেছেন আকবর আলি খান।

‘বাঙ্গলার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ প্রবন্ধে বঙ্কিম লিখেছেন :

আমাদিগের বিবেচনায়, একখানি ইংরেজি গ্রন্থেও বাঙ্গলার প্রকৃত ইতিহাস নাই। সে সকলে যদি কিছু থাকে তবে সে সকল মুসলমান বাঙ্গলার বাদশা, বাঙ্গলার সুবাদার ইত্যাদি নিরর্থক উপাধি ধারণ করিয়া, নিরুদ্বেগে শয্যায় শয়ন করিয়া থাকিত, তাহাদিগের জন্ম, মৃত্যু, গৃহবিবাদ এবং খিচুড়ি ভোজন মাত্র। ইহা বাংলার ইতিহাস নয়, ইহা বাঙ্গলার ইতিহাসের এক অংশও নয়।

ফলে, বঙ্কিমসহ তার অনুসারী হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা যে ইতিহাস রচনা করলেন সেখানে মুসলিম শাসন আমল ভিলেনের রাজত্ব হিসাবে চিহ্নিত। ১৮৭২ সালের উপমহাদেশের প্রথম পরিসখ্যানের হিসাব আকবর আলি খান উল্লেখ করেছেন। দেখা যায়, এই অঞ্চলের পঞ্চাশ ভাগ লোক মুসলিম হয়ে যাওয়ার পরও হিন্দু জাতীয়তাবাদের ধারকগণ সমাজের বিপুল অংশকে উপেক্ষা করেই নতুন ইতিহাস লিখতে শুরু করে। তাদের সেই অর্ধেক কলোনিয়াল ইতিহাসের ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। বিদ্যায়তনে এগুলোই চর্চিত হয়ে আসছে, যেহেতু ব্রিটিশ-পরবর্তীকালে এই দেশের চিন্তা-কাঠামোর উপর ভারত-জাতীয়তাবাদী চিন্তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বৃহৎ ভারত-জাতীয়তাবাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পরিসংখ্যান-ভিত্তিক বাংলা অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস লেখার চেষ্টা চালিয়েছেন আকবর আলি খান।


ইসলাম একটি অযাচিত বহির্গত ধর্ম।


১৯৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হয়। দাম দুই টাকা হলেও এর মূল্য উত্তর উত্তর বেড়েছে আমাদের জন্য। এর ব্যাপক প্রভাব ছিল ভারত-জাতীয়তাবাদী চিন্তায়। ‘বাঙ্গলার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ প্রবন্ধের শেষ অংশে তিনি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তুলে লেখাটি শেষ করেছিলেন। তিনি প্রশ্নই তুলেছিলেন সেখানে, কিন্তু উত্তর দেন নি।

সমাজচিত্রের মধ্যে প্রথম তত্ত্ব ধর্মবল। এখন তা দেখিতে পাই, বাঙ্গলার অর্ধেক লোক মুসলমান। ইহার অধিকাংশ যে ভিন্ন দেশ হতে আগত মুসলমানের সন্তান নয়, তাহা সহজেই বুঝা যায়। কেননা, এর অধিকাংশই নিম্নশ্রেণির লোক—কৃষিজীবী। রাজার বংশাবলী কৃষিজীবী হইবে, প্রজার বংশাবলী উচ্চশ্রেণি হইবে, ইহা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, রাজানুচরবর্গের বংশাবলী এত অল্প সময়ে এত বিস্তৃতি লাভ করিবে, ইহাও অসম্ভব। অতএব, দেশীয় লোকেরা যে স্বধর্ম ত্যাগ করিয়া মুসলমান হইয়াছে, ইহাই সিদ্ধ। দেশীয় লোকের অর্ধেক অংশ কবে মুসলমান হইল? কেন মুসলমান হইল? কোন জাতীয়েরা মুসলমান হইয়াছে? বাঙ্গলার ইতিহাসে ইহার অপেক্ষা গুরুতর তত্ত্ব আর নাই।

বঙ্কিম সচেতনভাবেই জানতেন বাংলা অঞ্চলে অর্ধেক মুসলিমের বসবাস। তারই স্বীকারোক্তি তিনি দিয়েছেন। কেন অর্ধেক লোক মুসলিম সেই বিচারে, বিশ্লেষণে তিনি আর যান নাই। কারণ সেই উত্তর দেওয়া তার জন্য সমীচীন না। তা তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে অন্তরায়। ফলে, তিনি এটাকে এড়িয়ে গিয়েছেন আজীবন। তিনি এই দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে মুছে দিতে চেয়েছেন। এই প্রশ্নকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করেছেন ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’-এর উত্থানের ভেতর দিয়ে নানা লেখার মাধ্যমে। সেই সময়ের ইংরেজি-শিক্ষিত ইতিহাসবেত্তারাও তারই অনুসারী। ফলে, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথসহ আরো অন্যান্য ইংরেজি-শিক্ষিত জাতীয়তাবাদীদের বৃহৎ ভারতের বিপরীতে দীনেশচন্দ্র সেনের ‌’বৃহৎ বঙ্গ’ ধারণাকে নাই করে দেওয়ার প্রচেষ্টা, প্রকল্প সফল একদিক দিয়ে। সেই সমস্ত সামন্তবাদী ইতিহাসের পতন শুরু হয়েছে। খুব সামান্য কয়েকজন বাদে কোনো ইতিহাসবিদই প্রশ্ন তোলেন নাই, কারণ যাচাইয়ের প্রয়োজন বোধ করেন নাই কেন এই ভূখণ্ডের পঞ্চাশ ভাগ লোক মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হলো। তারা ইসলাম-ধর্মাবলম্বী শাসক ও ইসলাম ধর্মকে সমার্থক হিসাবে দেখেছে। ফলে, তারা ইসলাম ধর্মকে বহিরাগত শত্রু ভেবেছে, কলোনিকে মুক্তির সোপান ভেবেছে।

বঙ্কিম আরো সংযুক্ত করেছেন :

আত্মজাতিগৌরবান্ধ, মিথ্যাবাদী, হিন্দুবিদ্বেষী মুসলমানের কথা যে বিচার না করিয়া ইতিহাস বলিয়া গ্রহণ করে, সে বাঙ্গালী নয়।

তিনি ইতিহাসের পাঠ নিতে চেয়েছেন খুবই পরিকল্পিতভাবে। জাতি ও বর্ণের স্বার্থরক্ষায় বাইরে তিনি ইতিহাস নিতে প্রস্তুত নন। বঙ্কিমবাবু ইতিহাসবিদ নয়। কিন্তু তিনিই অন্যতম চিন্তক যিনি ভারতের ইতিহাসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেছেন। ইতিহাসের যাত্রা নির্ধারণ একটা রাজনৈতিক কাজ। ফলে, কলোনিয়াল ভারতের স্বার্থপর শিক্ষিত শ্রেণিটি যে ইতিহাস রচনা করতে চাইল তাতে তারা প্রতিরোধহীনভাবে দেখাতে সক্ষম হলেন ইসলাম একটি অযাচিত বহির্গত ধর্ম।

বঙ্কিম যে প্রশ্ন তুলেছিলেন :

দেশীয় লোকের অর্ধেক অংশ কবে মুসলমান হইল? কেন মুসলমান হইল? কোন জাতীয়েরা মুসলমান হইয়াছে? বাঙ্গলার ইতিহাসে ইহার অপেক্ষা গুরুতর তত্ত্ব আর নাই।

সেই প্রশ্নের সুরাহা করতে চেষ্টা করেছেন আকবর আলি খান তার বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য : একটি ঐতিহাসিক বিশ্নেষণ বইয়ে।

আমাদের শিক্ষিত শ্রেণি আজ অবধি কলোনিয়াল বঙ্কিমীয় উদ্দেশ্যযুক্ত চিন্তার হেজিমনির অংশ। কলকাতার বাবুয়ানার চিন্তাদোষের আবেশ এখনো কাটে নাই তাদের। ফলে, এই কালের চিন্তক, রাজনীতিবিদরা কলোনিয়াল মাইন্ডসেটের বাইরের কিছু না। দীনেশচন্দ সেনের বৃহৎ বঙ্গ যে যে কারণে বাতিল হয়েছিল বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের উত্তরসূরিদের হাত ধরে, সেই একই কারণে আকবর আলি খানের বইটি প্রগতিশীলতার নীরবতার উপেক্ষা পাবে বলে মনে হয়। কেননা তারাও সেই কলিকাতার বাবু-কালচারের তল্পিবাহক। তাদের ইতিহাসের বয়ান ভিন্ন। আমাদের এই শিক্ষিত প্রগতিবাদী শ্রেণিটি কেমন? তারা ইসলাম প্রসঙ্গে নীরব কালের পর কাল, যদিও জনগোষ্ঠীর একটা বিপুল অংশ সুদীর্ঘকাল ধরে এর অংশ। কৃষ্টি-কালচার বলতে ধুতি, পাঞ্জাবি। আর একটু বেশি কালচারড হলে বড়জোর শান্তিনিকেতন, সেক্যুলারিজমের বোরকা পড়ে তারা মুখ ঢেকে চোখ খুলে হিন্দুত্ববাদের চর্চা করে। ইতিহাস থেকে বিপুল একটা জনশ্রেণিকে মুছে ফেলার সক্রিয়তা শুরু হয়েছিল ইংরেজশিক্ষায় শিক্ষিত ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী’দের হাতে। তারা ভারতমাতার নানা ধর্মের সন্তানের মধ্য থেকে হিন্দু সন্তানটিকে একমাত্র শুদ্ধ রক্তের সন্তান হিশাবে চিহ্নিত করেছে। এই হলো ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। বহু-ধর্ম-বর্ণে বহুত্ববাদী ভারতে অন্যান্য সকল মত ও ধারারাহিবতাকে মিথ্যা খণ্ডিত ইতিহাস দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। দীনেশচন্দ্র সেনের বৃহৎ বঙ্গে-র প্রথম খণ্ড থেকে উদ্ধৃত করি :

… বর্ণাশ্রম ভিত্তিক—রক্তের বিশুদ্ধতা কতটা অসার। সেই পুরাকাল হইতে নানাজাতীয় লোক—আর্য্য ও অনার্য্য—ভারতীয় সমাজ গঠন করিয়াছে। সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে বৃত্তি-হিসাবে শ্রেণিবিভাগ স্বীকার করা যাইতে পারে—কিন্তু রক্তের বিশুদ্ধতা অলীক স্বপ্ন।

ফলে, ইতিহাসের সঠিক পাঠ নেওয়া জরুরি। এই জরুরি কাজটা সূচনা করেছেন আকবর আলি খান।

২.
রিলিজিয়ন ও কালচার নানাভাবে বিকশিত হয়। ইসলাম মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত হলেও এ অঞ্চলের নিম্নমধ্যবিত্তরাই তা ধারণ করেছে সবচেয়ে বেশি। এবং তা এমনভাবে জারিত হয়েছে যা আমাদের ইতিহাসের বাইরের কিছু না। কিন্তু কলকাতাকেন্দ্রিক যে কালচারাল ইতিহাস পাওয়া যায় সেখানে ইসলামকে ভারতবর্ষের বাইরের কিছু হিশাবে দেখানো হয়েছে নানাভাবে। ব্রিটিশ কলোনিয়াল শাসন আর ইসলামি শাসনকে এক করার উপায় নাই। বরং এই ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপিত আছে ইসলামকে ভারতবর্ষ থেকে বিযুক্ত করে দেখতে চাওয়ার প্রবণতায়। এরই শেষ ফলাফল দেশভাগ, দাঙ্গা, পারস্পরিক অবিশ্বাস। দেশের একটা সুবিধাভোগী নব্য-শিক্ষিত-শ্রেণি দরিদ্র, অনগ্রসর একটা অংশকে রাষ্ট্রের বাইরের লোক হিশাবে দেখেছে। অক্ষরজ্ঞানের সুবিধাজনক অবস্থা থেকে তারা মূলত নিজেদের ইতিহাসটা লিখেছে। এই অর্ধসত্যকে ইতিহাসের লুপহোল না বলে, ধর্মান্ধতার গহ্বর বলা চলে, যা ভারতের নব্য শিক্ষিত পর্দানশীল ও হিন্দুত্ববাদী ফান্ডমেন্টালিস্ট চিন্তকরা একত্রে রচনা করেছে। বঙ্কিম হিন্দুত্ববাদী র‌্যাডিকালিজমের দার্শনিক গুরু হলে, রবীন্দ্রনাথ ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষ। এই ধর্মনিরপেক্ষতার ভেতর আপনি সমাজের একটা বিশেষ শ্রেণির প্রতি পোলারাইজেশন দেখতে পাবেন উপনিবেশ আমলে গড়ে ওঠা ধর্মনিরপেক্ষদের। মুসলিম বাদ দিলে ভারতবর্ষের অপরাপর যে জাতিগোষ্ঠী আছে সকলই তাদের এই বিশেষ সমাজচর্চা থেকে উপেক্ষিত। ফলে, কলোনির কালে ভারতে যে হিন্দুত্ববাদ ও প্রোগ্রেসিভ ভণ্ডামিপূর্ণ সেক্যুলারিটির জন্ম হয়েছে তারা মূলত মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

সেই মুদ্রার মূল্যে তাদের স্বাধীনতা, দেশভাগ, জাতীয়তাবাদ, পারস্পরিক ঐতিহাসিক ঘৃণা, জাতিবিদ্বেষ ইত্যাদি ক্রয় করতে হয়েছে। এই মুদ্রার অপর পিঠ সেক্যুলারিটির নামে ইতিহাস ও বৃহৎ জনগণের একটা বিপুল অংশকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এই উপেক্ষা চলমান আজও। ভারতে এর যে রূপ আপনি দেখবেন তার উল্টাটা আপনি বাংলাদেশে দেখবেন। ওখানে মুসলিম নিপীড়িত, এখানে সংখ্যালঘু তকমায় হিন্দুরা নিষ্পেষিত রাষ্ট্রকাঠামোর জাঁতাকলে। এই নিপীড়নের উৎস হলো ভুল ইতিহাসের উপস্থাপন। ভারত সভ্যতাকে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, নির্বিশেষে সকলের ইতিহাস হিশাবে দেখার পথটাকে রহিত করে দেওয়া হয়েছে ভারত সূচনার প্রাককালে। এই চর্চার অনিবার্যতা হলো ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ। তার ভালোমন্দের হিশাবে যাওয়ার দরকার কী! ভারতের মতো নানা মত ও ধর্মের দেশের সহাবস্থানমূলক ইতিহাস রচনা করতে আমাদের পূর্বপুরুষরা ব্যর্থ হয়েছেন। ভারতের জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের পৃষ্ঠপোষক ছিল মূলত ইংরেজরা। ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির ফসল হলো এই খণ্ডিত চর্চার ইতিহাস। এই এক-তরফা ইতিহাসের ব্যাক-ফায়ারিং হলো রাষ্ট্র কর্তৃক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নিপীড়ন। সমাজে সকল মতের সহাবস্থানকে সহ্য করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে আমাদের। এই নতুন ইতিহাস তৈরির জন্য ইতিহাসের তথ্যউপাত্তমূলক বিচার দরকার।


ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে বর্ণহিন্দুদের তীব্র বিদ্রোহের সুযোগ তৈরি হয় ইসলাম আগমনের ভেতর দিয়ে।


আকবর আলি খান উপস্থাপিত পরিসংখ্যান ও উপাত্তের আলোকে বলা যায়—

১৯০০ সালে সারা বিশ্বে ২০ কোটি মুসলমান ছিল। এর মধ্যে ভারতেই ছিল ৬ কোটি ২১ লাখ মুসলিম। অর্থাৎ, গোটা পৃথিবীতে যা মুসলমান ছিল, ভারতের নাগরিক ছিল তার প্রায় ৩১ শতাংশ। ১৯০১ সালে বাংলায় মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ২ কোটি ১৫ লাখ।

… ১৯০১ সালে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ১০.৭৫ শতাংশের বাস ছিল বাংলাদেশে। মুসলমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শুধু অটোমান সাম্রাজ্যের মোট জনসংখ্যা বাংলার মুসলমানদের চেয়ে বেশি ছিল; কিন্তু যদি অমুসলমানদের বাদ দিয়ে শুধু মুসলমানদের সংখ্যা হিশাব করা হয়, তবে অটোমান সাম্রাজ্যের চেয়ে বাংলার মুসলমানের সংখ্যা বেশি ছিল। বাংলাদেশে যখন মুসলমানের সংখ্যা ২ কোটি ১৫ লাখ, তখন আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ মিসরের মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ২ লাখ, (মিসরের মুসলমান সংখ্যা এর থেকে ৫ শতাংশ কম ছিল) ইরানের মোট জনসংখ্যা ৯৮ লাখ ৬০ হাজার এবং আরব দেশে মাত্র ৪২ লাখ ৪৮ হাজার।

এত মুসলমান এল কোথা থেকে বাংলায়? দলিল দস্তাবেজ অপ্রতুল হওয়ার কারণে এর উত্তর পাওয়ার উপায় নাই। এর কারণ নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে, তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। এই সমস্ত তর্কাতর্কি মূলত পাঁচটি কারণের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে বহুদিন। তথ্যের আলোকে বিশ্লেষণ হয় নাই যদিও। আকবর আলি খান এই পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছেন ভূমিকায়।

এক ঘরানার ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এই অঞ্চলের মুসলিমরা বহির্গত, এরা স্থানীয় হিন্দুদের বংশধর নয়। কিন্তু দেখা যায় যে এখানকার অধিকাংশ নিম্নবর্ণের কৃষক, কাঠুরে, জেলে ও মাঝিরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। অধিকাংশ উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, জমিদাররা ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু। ফলে, তাদের অধিকৃত অঞ্চলে বাইরে থেকে মুসলিম এসে বসতি স্থাপনের যুক্তি তেমন গ্রহণযোগ্য নয়। আরেক ঘরানা বিশ্বাস করে, এখানে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে তরোয়ালের জোরে। অর্থাৎ, শাসকশ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু, বাংলার হিন্দুদের উপর মুসলিম শাসকশ্রেণির নিপীড়ন-ক্ষমতা কম ছিল, যেহেতু দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হয়েছে। রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রয়োজনে হিন্দুদের সাথে শাসকশ্রেণির সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়েছে। মুঘল সুবেদার ইসলাম খান (সপ্তম দশক) তার কর্মচারীদের শাস্তি প্রদান করেছিলেন হিন্দুদের মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার কারণে। রাজকার্যে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের চেয়ে হিন্দুরা বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত ছিল। কায়স্থরা সমাজে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছিল মুসলিম শাসন-আমলে। ফলে, মুসলিম শাসন এখানে ধর্মপ্রচার ও প্রসারের দায় নিয়ে আসে নি। তারা মূলত শাসন করতে এসেছিল।

আবার অনেকেই ভেবে থাকেন ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে বর্ণহিন্দুদের তীব্র বিদ্রোহের সুযোগ তৈরি হয় ইসলাম আগমনের ভেতর দিয়ে। ফলে, নিম্নবর্ণ হিন্দুরা ইসলাম গ্রহণের ভেতর দিয়ে সেই প্রতিশোধ নিয়েছে। এই বক্তব্যের বিপরীতে দুই রকম যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে।

মধ্যযুগের বাংলায় নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের শোষণের ধারণার অস্তিত্ব ছিল না। প্রাক-আধুনিক যুগে উচ্চবর্ণের হিন্দু কর্তৃক নিম্নবর্ণের হিন্দুুদের শোষণকে অত্যাচার হিসাবে দেখা হতো না, বরং মনে করা হতো এটা প্রাকৃতিক নিয়ম-নীতিরই অংশ। উচ্চবর্ণের হিন্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের ধারণা ইউরোপের আলোকিত দর্শনের (enlightenment) ফসল।

তবে, এই মত অতটা গ্রহণযোগ্য নয়। এটা একটা উল্লেখযোগ্য কারণ বলে মনে হয়। কেন মনে হয়, তার ইতিহাসের দোহাই পরে দিব। দ্বিতীয় কারণ হিসাবে উল্লেখযোগ্য হলো, ভারতের অন্যান্য অংশে শোষণের ইতিহাস থাকলেও বাংলা অঞ্চলে এর অস্তিত্ব ছিল না। আমার মতে, এই অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্যবাদের উৎপাত একদমই ছিল না তা বলা যায় না। ইসলামের আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার যে প্রণোদনা তার উৎস এই ব্রাহ্মণ্যবাদী অত্যাচার, সেটা বলা যায়। চতুর্থ মতানুসারে, কিছু কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, বাংলায় যখন মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বেশিরভাগ লোক বৌদ্ধ ছিল। তারা হিন্দুদের দ্বারা অত্যাচারিত ছিল। ফলে, হিন্দুদের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। সেই হিশাবে, ত্রয়োদশ শতকে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে সব মুসলমান হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু পরিসংখ্যান তা বলে না। এই মতও গ্রহণযোগ্য নয়। পঞ্চম মত হলো, বাংলায় ইসলাম প্রচারিত হয়েছে সুফি, দরবেশ, পীরগণের হাত ধরে। তাদের একটা ভূমিকা ছিল বই-কি! কিন্তু এই পীররা কেন শুধু বাংলায় সফল হলো তার কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। আকবর আলি খান সেই প্রশ্নের সুরাহা খুঁজেছেন।

ইসলাম প্রসারের নানা দিক নিয়ে দেশি-বিদেশি নানা জনের তত্ত্ব আলোচিত হয়েছে বইটিতে। অধ্যাপক এনামুল হক ও ড. রহিমের মতে এই এখানে ইসলাম প্রচার হয়েছে আরব বণিকদের হাতে। তারা মনে করেন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালি অঞ্চলে আরব বণিকরা বসতি স্থাপন করে। Test-ta-going হতে চাটগাঁও শব্দের উৎপত্তি। শুধু তাই নয়, তারা এও মনে করেন যে নোয়াখালি ও চট্টগ্রামের ভাষার উপর আরবি ভাষার প্রভাব আছে। এই অঞ্চলে আরব বণিকরা যারা আসত তারা মূলত শাফেয়ি মাজহাবের। কিন্তু এখানে হানাফি মাজহাবের প্রাধান্য প্রমাণ করে যে পানিপথের ইসলাম এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় নি, স্থলপথে ইসলামের আগমন। অসীম রায়ের পীর তত্ত্ব আলোচিত হয়েছে। পীরদের অলৌকিক ক্ষমতা থাকে। ফলে, সেই ক্ষমতার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে একত্রে অনেক জনগোষ্ঠী ধর্মান্তরিত হয়েছে। কিন্তু এমন উদাহরণ নাই। মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড এম ইটনের তত্ত্ব খুবই মজার। আমেরিকার কর্পোরেট তত্ত্বের সাথে মিল আছে। তার মতে এই অঞ্চলের পীররা উদ্যোক্তা ছিল। তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি ছিল। তিনি বাগেরহাটের খান জাহান আলির উদাহরণ দিয়েছিলেন। খান জাহান আলি স্থানীয় জনগণের সহায়তায় বন পরিষ্কার করে ধানখেত তৈরি করেন। লবণাক্ততা দূর করা জন্য বাঁধ তৈরি করেন। ফলে, দলে দলে লোক পীরের নেতৃত্বের গুণে ইসলাম গ্রহণ করে। এই তত্ত্বের বড় দুর্বলতা হলো, এই অঞ্চলে পীররা আসার আগেই জনগণ কৃষিতে দক্ষ ছিল। তবে কিসের কারণে পীররা এই দেশে কী এমন সুবিধা পেয়ে যান যার কারণে পঞ্চাশ শতাংশ লোক মুসলিম হয়ে যায়! দিল্লি-আগ্রাতে মুসলমান শাসক ও অনেক পীরের দেখা মিললেও সেখানে ইসলাম প্রচারের এত সাফল্য দেখা যায় নাই। এর কারণ হিশাবে জাফর শরীফের সারসংক্ষেপ হলো, মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বর্ণাশ্রয়ী হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদ সক্রিয় ছিল, যা হিন্দুদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা প্রতিরোধ করে। ইতিহাসবিদ ব্যাশামের মতে হিন্দুসমাজের সবলতা হিন্দু ধর্মকে রক্ষায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে। যে সমাজ সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী সেখানে ধর্ম ত্যাগের ফলে একঘরে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে যা ধর্মান্তরকে প্রতিরোধ করে থাকে। ১৮৭২ সালে ভারতে আদমশুমারির সময় এইচ বেভারলি দেখেন যে, পূর্ব বাংলায় চিরাচরিত গ্রাম অনুপস্থিত।


বাংলাদেশের গ্রাম-কাঠামোর উপর একজন ইংরেজের মন্তব্য, দৃষ্টিভঙ্গি কতটা সঠিক তা জনাব আকবর আলি খান আরও একটু ভেবে দেখতে পারতেন।


নৃবিজ্ঞানী ম্যান্ডিলবাউমের মতে ভারতের গ্রাম তিন রকম। কেন্দ্রঘেরা গ্রাম কেন্দ্রের চারদিকে গাদাগাদি করে গড়ে ওঠে। রৈখিক বসতির বাড়িগুলো লম্বালম্বি স্থাপিত। এক গ্রামের সাথে অন্য গ্রামের তেমন সম্পর্ক থাকে না। শেষ প্রকার হলো পাহাড়ি বসতি, যেখানে সুবিধা মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতি গড়ে ওঠে। ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চলে কেন্দ্রঘেরা গ্রাম দেখা যায়। এই সমস্ত গ্রামের সংগঠনগুলো শক্তিশালী। পাহাড়ি গ্রামগুলোও নিরাপত্তার প্রয়োজনে সংঘবদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামগুলো রৈখিক। একের উপর অপরের প্রভাব কম। ফলে, পীররা সহজেই প্রভাবিত করতে পেরেছে মানুষদের। এমন উন্মুক্ত গ্রামে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের চর্চা হয়। হাইপোথিসিস অনুসারে :

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের সংগঠন ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের গ্রামীণ সমাজ থেকে অনেক দুর্বল ছিল। যেখানে গ্রামীণ সমাজ শক্তিশালী ছিল সেখানে বাইরের ধর্মের অনুপ্রবেশকে প্রতিহত করা হয়েছে। তবে বাংলায় যেহেতু এই ধরনের সংগঠন দুর্বল ছিল, সেহেতু এখানে ইসলাম ধর্মের অনুপ্রবেশকে ঠোকনোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় নাই।

সমাজে সামজিক পুঁজির ঘাটতি ছিল। সামাজিক পুুঁজি হলো সেই সমস্ত অলিখিত নিয়ম, যা সমাজকে সংগঠিতভাবে দক্ষতার সাথে কোনো একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পালনে সহায়তা করে। যে অঞ্চলে সামাজিক পুঁজির অভাব থাকে সেই সমাজ দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এই বাংলাদেশে সামাজিক পুঁজির অভাব, রৈখিক গ্রাম, পীরদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এখানকার বড় একটা অংশ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে।

তবে নির্দিষ্ট সামাজিক ফ্যাক্টরের নিয়ামক কখনো একটা বা দুটো হয় না। অনেকগুলো ফ্যাক্টরের একত্রিত কাজের ফলে একটা ফলাফল অর্জিত হয়। এক সাথে অনেকগুলো বিষয় কাজ করে। এই সমস্ত বহু কারণের একটা অনুমান বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য : একটি ঐতিহাসিক বিশ্নেষণ বইটিতে করা হয়েছে। লেখক পরিসংখ্যান বা উপাত্তের উপর ভর করেছেন। আকবর আলি খান সমাজতাত্ত্বিক হাইপোথিসিসের উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বেভারলির বাংলার গ্রাম-দর্শন ও ফুকুইয়ামার সোস্যাল ক্যাপিটাল দ্বারা কনভিন্সড। কিন্তু নানা সময়ে এদেশে ভারতবর্ষ ভ্রমণে যে সমস্ত পরিব্রাজক, ধর্মছাত্র এখানে এসেছে, তাদের লেখাপত্র পড়লে দেখা যায়, বাংলা সমৃদ্ধ জনবহুল জনপদ ছিল ইসলাম প্রচারের বহু আগে থেকে। সেই হিশাবে বেভারলির বাংলার গ্রাম-দর্শন থেকে সেই সমস্ত বিদেশি পর্যটক, যারা পায়ে হেঁটে এই দেশকে চিনেছে তাদের কথার উপর বেশি গুরুত্ব দিলে এই উন্মুক্ত-গ্রাম তত্ত্ব কতটা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ফলে ইসলাম প্রচারের আগে এই অঞ্চলে যে সমস্ত পরিব্রাজকরা এদেশ ভ্রমণ করেছে তাদের তথ্যের উপর গুরুত্ব আরোপ করা যেতে পারে। ইসলামপূর্ব সুদীর্ঘকাল ধরে বাংলার সমাজ ব্যবস্থা কেমন ছিল তার একটা রূপ পাওয়া যায় এই সমস্ত ভ্রমণ কাহিনিতে। কিছুটা নিরপেক্ষ ইতিহাস জানা যায়। খ্রিস্ট প্রথম শতকে চাণক্য বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ভ্রমণ করেছিলেন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রায় বারো তেরশ বছর আগেই সমাজ ব্যাপকভাবে সংঘটিত এবং প্রতিটা শতকে সমাজ আরো ঘনীভূত হয়েছে। নানা সময়ের চিন পর্যটক ফা হিয়েন, হিউয়েন সাং, ই-সিং, মা-হুয়ান, ফেই-সিন, আরব দেশি সোলায়মান, ইবনে বতুতার দলিল পত্র পাওয়া যায়। তাদের তথ্য ও বেভারলির তথ্যের বিপুল ফারাক। বাংলাদেশের গ্রাম নিয়ে বেভারলির মন্তব্য ১৮৭২ সালের। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ শতকের পর থেকে তিন-চারশ বছর ধরে।

ইংরেজ আমল পর্যন্ত যাদের মুসলিম হওয়া দরকার হয়ে গিয়েছিল। ফলে, বেভারলির ১৮৭২ সালের পর্যবেক্ষণ কতটা নির্ভর করা যায়? বাংলাদেশের গ্রাম-কাঠামোর উপর একজন ইংরেজের মন্তব্য, দৃষ্টিভঙ্গি কতটা সঠিক তা জনাব আকবর আলি খান আরও একটু ভেবে দেখতে পারতেন। বাংলাদেশের গ্রাম সম্বন্ধে বিদেশি পর্যটদের লেখাপত্রে যা পাওয়া যায়, তা থেকে বেভারলির গ্রাম ভিন্ন, বিপরীত। যে সমস্ত পর্যটকের কথা বলছি তারা খুব নিবিড়ভাবে এই দেশ দেখেছেন রাজা-প্রজা উভয়ের সাথে মিশে। এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মঠ ছিল। এই সমস্ত মঠ পরিচালিত হতো প্রজা আর রাজাদের দানে। ফলে, ইসলাম প্রচারের আগে এই অঞ্চলের সামাজিক কাঠামো সংঘবদ্ধ ছিল। এই কালে মসজিদ পরিচালনা যেমন সামাজিক সংঘের মাধ্যমে হয়, সেই কালে মঠও সেভাবেই চলত। সমাজ সংঘবদ্ধ না হলে এই সমস্ত বড় বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও তার বিকাশ অসম্ভব ছিল। ইতিহাসের এই বৈপরীত্যের উপর আকবর আলি খানের ইসলাম প্রচারের সাফল্যের অনুসন্ধানের সরল হাইপোথিসিস দাঁড়ানো বলে মনে হয়। আজকের যে গ্রাম-অঞ্চলের রূপ, তা আদি গ্রামব্যবস্থারই বিবর্তন। গ্রামকাঠামো যতটা হালকা হিশাবে দেখতে চাওয়া হচ্ছে ততটা হালকা নয়। এই অঞ্চল কৃষিসমৃদ্ধ জনপদ। কৃষিব্যবস্থা সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগভিত্তিক। কৃষিভিত্তিক সমাজে শক্তিশালী সংগঠন ছাড়া বেঁচে থাকা যায় না। সেই হিশাবে কৃষিজীবী সমাজে সামাজিক পুঁজির অভাব অবিশ্বাস্য ব্যাপার ঠেকে আমার কাছে। ধর্ম মানুষের আধ্যাত্মিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যাপার। সেগুলোকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা দরকার ছিল।

এবার অন্য প্রসঙ্গে যাই। ইতিহাসের অন্য কিছু দোহাই আনি এবার।

ভারতবর্ষে ইসলাম প্রসারের যে রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক কারণ দীনেশচন্দ্র সেন উত্থাপন করেছিলেন, তা বাংলাদেশের জন্যও প্রযোজ্য।

চৈতন্যদেব বলিয়াছিলেন, ‘আমি এবং আমাকে যাহারা ভালোবাসে তাহাদের মধ্যে জাতি বলিয়া কিছু নাই—আমরা সকলে একজাতি।’ এই কথায় মুহম্মদের বিজয়ী কণ্ঠস্বরের প্রভাব ও প্রতিধ্বনি আমরা লক্ষ্য করিতে পারি।

এই সকল নৈতিক শক্তি লইয়া বিশ্বাসের খড়্গহস্তে মুসলমান আসিয়াছিল। সেই খড়্গে আমাদের পরাজয় হইয়াছে। লৌহ বা ইস্পাতের খড়্গ নহে। যখন তাহারা দেবমন্দির ভাঙ্গিয়া হিন্দুরাজপ্রসাদের উত্তুঙ্গ চূড়া অতিক্রম করিয়া বন্যার মত খরেবেগ আমাদের চন্দ্র-সূর্য-বংশের ধুরন্ধরগণকে প্লাবিত করিয়া ক্রমশ পূর্ব্বামুখে আসিতেছিল, তখন লক্ষণসেনের রাজসভায় পদ্মাবতী নৃত্য করিতেছিল, এবং জয়দেব তাল রাখিয়া গীতগোবিন্দের ললিতপদে মদিরা ঢালিতেছিল, লক্ষণসেনের মন্ত্রী—বিদ্যুৎপ্রভা ও শশিকলা নাম্নী নত্তর্কীদ্বয়ের সাঙ্গে রাত্রি কাটাইয়া তাহাদের প্রাপ্য লইয়া প্রাকৃত ব্যক্তির মত রাজসভায় ঝগড়া করিতেছিল।

… মুসলমান না আসিলে দুই ধর্মের সংঘাতজনিত প্রেরণার ফলস্বরূপ আমরা হয়তো কবির, নানক প্রভৃতি সাধুদিগকে পাইতাম না, এমনকি হয়ত বা চৈতন্যদেবকেও পাইতাম না। বঙ্গসাহিত্যের চতুর্দ্দশ হইতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্য্যন্ত যে অসামান্য পুষ্টিলাভ করিয়াছে তাহাও হয়ত সমধিক পরিমাণে মুসলমান নবাব বাদশাহগণের উৎসাহে হইয়াছিল।

মুসলমানরা আসাতে আমাদের ধন-ভাণ্ডার লুণ্ঠিত হইতেছে, স্বর্ণ-দেউল ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে, হয়ত কৃষ্ণের বক্ষের কৌস্তভ মণিও অপহৃত হইয়াছে। তাঁহারা আমাদের রাজলক্ষ্মীর কুণ্ডলের প্রধান মণিগুলি অপহরণ করিয়াছে এবং অনেক সময়ে অত্যাচারের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছে। কিন্তু তাঁহাদের আগমন যে মঙ্গলময় বিধাতার মঙ্গলময় বিধানে ঘটিয়াছিল, তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই।


ইসলামও সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলে একটা বিদ্রোহ, আন্দোলনই বটে। 


এই অঞ্চলে ইসলাম পীরদের দার্শনিকতা ও রাজনীতি দিয়েই প্রসারিত হয়েছে। সেখানে গ্রামকাঠামো কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে প্রশ্নে আর যাব না। ধর্মপ্রচারণা ও তার প্রসার রাজনৈতিক ও অধ্যাত্মিক ব্যাপার। রাখালদাস বন্দ্যোপধ্যায় তার বাঙ্গলার ইতিহাস গ্রন্থে আর্য্য শাসনের বিপরীতে মৌর্য্য শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার একটা ছোট্ট কারণ উল্লেখ করেছিলেন। কারণটা সঠিক কিনা সেই বিচারের ভার ঐতিহাসিকের। কিন্তু তার উচ্চারণ খুবই সিগনিফিকেন্ট। তিনি লিখছেন তৃতীয় পরিচ্ছেদের শুরুর দিকে :

আর্য্য রাজগণের অধঃপতনের পূর্ব্বে উত্তরাপথের পূর্ব্বাঞ্চলে আর্য্যধর্ম্মের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল, জৈনধর্ম্ম ও বৌদ্ধধর্ম্ম এই আন্দোলনের ফল। জৈনধর্ম্মের গ্রন্থমালা পাঠ করিলে স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায় যে, আর্য্যাবর্ত্তের পূর্ব্বাংশেই এই নূতন ধর্ম্মমতের জন্মস্থান।…

…বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম্মের ইতিহাস পর্য্যালোচনা করিলে স্পষ্ট বোধ হয় যে, দীর্ঘকালব্যাপী বিবাদের পরে সনাতন আর্য্যধর্ম্মের বিরুদ্ধবাদী নূতন ধর্ম্মদ্বয় ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠালাভ করিতে সমর্থ হয়।

নতুন ধর্ম আসলে পুরাতন সমাজকাঠামোর প্রতি বিদ্রোহ। ‘আন্দোলন’ বা ‘বিদ্রোহ’ পদ ব্যবহার করেছেন রাখালদাস বন্দ্যোপধ্যায়। খুবই যৌক্তিক শব্দ। ইসলামও সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলে একটা বিদ্রোহ, আন্দোলনই বটে। যেকোনো আন্দোলনের তীব্রতা সকল স্থানে সমান হয় না। এই অঞ্চলের মানুষ বিদ্রোহী। সেই ইতিহাস এই অঞ্চলের রাজাধিরাজদের শাসনকালের দৈর্ঘ্যের  দিকে তাকালে অনুধাবন করা যায়। ফলে বাংলাদেশ ইসলামের বিকাশ সামাজিক ঘটনা। পীর ও সমাজকাঠামোর ভূমিকা থাকা স্বাভাবিক ও আছেও ব্যাপকভাবে। তবে এটা যত না অর্থনৈতিক তার থেকে বেশি দার্শনিক, আধ্যাত্মিক ও আত্মচেতনা জাগানিয়া রাজনৈতিক এই অঞ্চলের মানুষের জন্য। সেটার ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ হবে হয়তো একদিন।

আকবর আলি খান এই সমস্ত চিন্তার উস্কানি দিয়েছেন তার বইয়ে। তার সঠিকতা, পূর্ণাঙ্গতা থেকে তিনি যে আলোচনার সূত্রপাত করতে পেরেছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসে চূড়ান্ত সত্যের অনুসন্ধান বোকারাই করে। ইতিহাস আসলে ব্যাখ্যা নির্ভর একটা বিষয়। তার ব্যাখ্যা আপনাকে ভাবাবে। নতুন কিছু উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে। এটাই বড় বিষয়।

মৃদুল মাহবুব

জন্ম ৯ অ‌ক্টোবর ১৯৮৪। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি করেন একটি বহুজা‌তিক কোম্পা‌নিতে।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
জল‌প্রিজমের গান [কবিয়াল, কলকাতা ২০১০]
কা‌ছিমের গ্রাম [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৫]
উনমানুষের ভাষা [চৈতন্য, ঢাকা ২০১৭]

ই-মেইল : mridulmahbub@gmail.com