হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য বাংলাদেশের কবিতা : ষাটের দশক

বাংলাদেশের কবিতা : ষাটের দশক

বাংলাদেশের কবিতা : ষাটের দশক
750
0

পঞ্চাশের প্রবণতার সম্প্রসারণ ষাটের কবিতায় ঘটলেও এই কালপর্বে কিছু প্রতিভার আবির্ভাব ঘটেছে। তবে ষাটে যারা বিবেচিত হয়েছেন শ্রেষ্ঠ ব’লে, তাদের কাউকেই শেষ পর্যন্ত প্রতিভাবান বলা যায় না; যদিও তারা লিখেছেন প্রচুর। প্রতিভার ধর্ম হলো নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া, তার সৃষ্টি কখনো পূর্বনির্দিষ্ট নয়, এমন কোনো ধারণা তিনি নিজের সম্পর্কে দেন না, যা তার পরবর্তী রচনা কেমন হতে পারে, সেই আভাস পেতে পাঠককে সাহায্য করে। সেই বিচারে ষাটের প্রতিভা অঙুলিমেয়ও নয়। এখন, চল্লিশ বছরের বেশি সময় পর চট ক’রে ব’লে দেওয়া যায়—রফিক আজাদ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, মোহাম্মদ রফিক ছাড়া ষাটে কোনো প্রতিভা নেই। এই তিনজনের পাশে আছেন অনেক সৃষ্টিশীল কবি, তাদের অবদান কম নয় বাংলা কবিতায়; কিন্তু তারা ছাড়িয়ে যেতে পারেন নি নিজেদের; যে ভাষা ও বিষয়বোধ নিয়ে তারা আবির্ভূত হয়েছেন, তাতে অসহায়ের মতো ঘুরপাক খেয়েছেন অনেকেই, আবার কেউ কেউ হারিয়ে গেছেন কিছু উজ্জ্বল পঙ্‌ক্তি লিখে, কেউ-বা আত্মসমর্পণ করেছেন প্রতিক্রিয়াশীলতায়।

আঙ্গিক ও ভাষায় চমক সৃষ্টি ক’রে ষাটের যে কবি দিকে দিকে প্রচারিত হয়েছেন শ্রেষ্ঠ ব’লে, তিনি আবদুল মান্নান সৈয়দ; কিছু অসামান্য কবিতায় বাঙলা ভাষার ঋদ্ধি ঘটিয়ে নিজের পতন স্পষ্ট ও নিশ্চিত ক’রে রেখেছেন ‘সমস্ত প্রশংসা তাঁর’ লিখে; রবীন্দ্রনাথ যেমন হারিয়ে গিয়েছিলেন জীবনদেবতায়, কিন্তু বৈশ্বিক চেতনাবদল আর তিরিশি কবিদের সম্মিলিত মোচড় তাকে ফিরিয়ে এনেছিল ওই কুসংস্কার থেকে; আবদুল মান্নান সৈয়দ ফিরে আসেন নি; আর তাঁর সামনে পতনের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে ছিলেন আল মাহমুদ। অথচ এই কবি ষাটের দশকে যেসব কবিতা লিখেছেন, তা তুলনারহিত; বাঙলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ ওই কবিতাগুলো; কিন্তু প্রতিভার নিজস্ব দাবি তার উত্তরণ, এই উত্তরণ তার নিজের সত্তাপৃথিবী থেকে, সময় থেকে; সভ্যতার অগ্রগমনের সঙ্গে এর সম্পর্ক। একই চেতনাজগৎ বা চেতনার একই প্রকাশ নিয়ে যখন কোনো কবি তার প্রতিটি কবিতাগ্রন্থে বারবার হাজির হন, তখন তা বেশ সন্দেহজনক; একদিকে এটি প্রতিভাহীনতার পরিচয় দেয়, অন্যদিকে মনে হয় কবির মধ্যে এক ধরনের আপসকামী সত্তা রয়েছে। পঞ্চাশের আল মাহমুদ ও ষাটের মান্নান  সৈয়দ এই বিবেচনার উর্ধ্বে চলে গেছেন!


এদেশের পাঠক কবিদের কাতরানি খুব উপভোগ করে; তারা কবিতার চেয়ে বেশি আনন্দ পায় কাতরতায়


রফিক আজাদ, মুহম্মদ নূরুল হুদা এবং মোহাম্মদ রফিকের পাশে উচ্চারিত হতে পারে সিকদার আমিনুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, ফরহাদ মজহারের নাম। প্রথমজন কবিতার আঙ্গিক আর অন্তর্মুখিতার অবিরাম রগড়ে ছিলেন মত্ত ও মুহ্যমান; দ্বিতীয়জন সমকালীনতা ও রোম্যান্টিক অনুভবের দায় শোধ করতে করতে ছিবড়ে হয়ে গেছেন। শুরুতে ফরহাদ মজহার সমকালীনতার সঙ্গে বিপ্লবের রোম্যান্টিকতার মেলবন্ধনে উচ্চকিত ছিলেন; পরে তিনি স্থানিকতা ও মরমিপনায় আবৃত ধর্মীয় চেতনায় আত্মসমর্পণ করেন। আবুল হাসান, হুমায়ুন আজাদ, আবু কায়সার, অরুণাভ সরকার, আসাদ চৌধুরী ষাটের বেশ গুরুত্বপূর্ণ কবি এবং কিছু ভালো কবিতা লিখেছেন; কিন্তু অরুণাভ সরকার ছাড়া, অপচয়ের দিক থেকে এই চারজনের কেউ কারোর চেয়ে কম নন। মহাদেব সাহা, সানাউল হক খান, সাযযাদ কাদির পুরোপুরি ব্যর্থ; যদিও এদের মধ্যে মহাদেব সাহা খুব জনপ্রিয় এবং এর মূলে রয়েছে তাঁর কবিতার সারল্য ও কাতরতা। এদেশের পাঠক কবিদের কাতরানি খুব উপভোগ করে; তারা কবিতার চেয়ে বেশি আনন্দ পায় কাতরতায়, বাঙলা ভাষায় মহাদেব সাহার আবির্ভাব তাদের আনন্দ দেয়ার জন্যই। আমাদের জনপ্রিয় গানগুলোর সবই আসলে সুরারোপিত ক্রন্দন আর মহাদেব সাহার কবিতা শেষ পর্যন্ত স্থূল রোম্যান্টিক বিলাপ। তার একটি জনপ্রিয় পঙ্‌ক্তি হলো, ‘করুণা করে হলেও চিঠি দিয়ো,/ ভুল করে হলেও বলো, ‘ভালোবাসি!’ কবির এই কাতরানি পাঠকরা বেশ লুফে নিয়েছেন, তাতে কবিতার একটুও উন্নতি হয় নি বরং পতন ঘটেছে। কেননা, ব্যক্তিত্বহীন এই কাতরতার অনুকরণে এরপর অজস্র কবিতা রচিত হয়েছে। আবৃত্তিকাররা এতে মত্ত হয়েছেন এবং বাঙলা কবিতার শোচনীয় দশা অব্যাহত থেকেছে অন্তত কুড়ি বছর ধ’রে। ষাটের অতি প্রচারিত প্রধান ও উল্লেখযোগ্যরা এইভাবে ব্যাঘাত ঘটিয়েছেন বাঙলা কবিতার। সাযযাদ কাদির একটাও উত্তীর্ণ কবিতা লিখতে পারেন নি; তবে সানাউল হক খান দু’তিনটি ভালো কবিতা লিখতে পেরেছেন ব’লেই মনে হয়।

ফলে রফিক আজাদ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, মোহাম্মদ রফিক এই তিনজনই উঠে আসেন ষাটের তালিকার একেবারে সামনে (তবে এই তিন কবির মধ্যে দ্বিতীয়জনের অপচয় বিপুল); ব্যাপারটি এমন নয় যে, অন্যদের দুর্বলতার সুযোগে তাদের এই অর্জন; এর মূলে রয়েছে তাদের সমগ্রতাগামী মানবিক সংবেদনশীলতা আর কবিতা সম্পর্কে নিজস্বপৃথক নন্দনপ্রতীতি। উল্লেখের বিষয়, এই তিন জনের কবিতা তিন রকম। ষাটের কবিতায় যে বৈচিত্র্য, তার কারণ হয়তো এটিই; যদিও এতে রয়েছে অন্য অনেকের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।

তবে, তিরিশ ও পঞ্চাশের প্রধান কবিদের মতো এরাও খণ্ডিত আধুনিক। বাঙালি কবিদের নিয়তি—তারা আধুনিকতা গ্রহণ করেন, কিন্তু রোম্যান্টিকতা এড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না; যদিও এটির চেহারায় খানিকটা বদল কেউ কেউ আনতে পারেন, এবং এদের সংখ্যাও অঙুলিমেয়। এই তিনজনের রোম্যান্টিক চেতনায় সেই পরিবর্তন ও নিজস্বতার ইশারা টের পাওয়া যায়। রোম্যান্টিকের যে কাতরতা বাঙালি কবিদের গ্রাস ক’রে এসেছে বছরের পর বছর, তা থেকে এই তিন কবি বেশ মুক্ত; এটা সম্ভব হয়েছে তাদের প্রকাশগত দৃঢ়তার জন্য। তিনটি নমুনা :

মৃত নর্তকীর পদশব্দগুলো আমি বুনে যাই
আমার নূপুর-শব্দে; আদিম গুহার মধ্যে শুরু
হয়েছিল যেই নৃত্য—তাকেই সযত্নে
সম্মুখের দিকে নিয়ে যাওয়া—আমার যেটুকু সাধ্য,
করি সেইটুকু—এইভাবে সমস্ত জীবনব্যাপী
একটি নাচের মুদ্রা তৈরি করে ফেলি।
(নর্তকী, রফিক আজাদ)

উড়ে গেল হাওয়া;
আমার হলো না যাওয়া তেমন সুদূরে।
বাঁকানো বড়শির মতো আজো আমি গেঁথে আছি
জলের হৃদয়ে
আমার আঙিনা জুড়ে লক্ষ লক্ষ চাঁদ যায় ক্ষয়ে
এ আঙিনা এ আমার প্রাকৃত পাঠশালা
এইখানে জানু পাতে খড়কুটো, নষ্টভ্রষ্ট খয়েরি আটচালা
(বায়োনিক, মুহম্মদ নূরুল হুদা)

ওলো ও বেগুনি, আজ সেজেগুজে নোংরা বেপাড়ায়
অবশ দু’পায়ে ক্লেদে অপেক্ষার নেই প্রয়োজন;
কাল ফের ডাক দেবে কীর্তিনাশা জোয়ার-ভাটায়
দামোদর, আজ রাত অন্য রাত অন্য দাবি তার
(কীর্তিনাশা-খ, মোহাম্মদ রফিক)

কাতরতা থেকে এই যে মুক্তি, এটা ষাটের অর্জন, তবে তা পঞ্চাশের কবিতা থেকে খুব দূরে নয়। হোক তা কাছাকাছি, দশকে দশকে কবিতায় পরিবর্তন ঘটবে, এমন কোনো কথা নেই; তবে ষাটে কিছুটা ঘটেছে। ভাষা সপ্রতিভ হয়েছে, দৃঢ়তা এসেছে প্রকাশভঙ্গিতে, শব্দরুচিতে আগের চেয়ে বেশি নির্বাচনমনস্ক হয়েছেন কবিরা। শুধু তাই নয়, আমরা যদি রফিক আজাদের বিরামচিহ্ন প্রয়োগের দিকে তাকাই এবং দৃষ্টি দিই পূর্ণযতির দিকে, দেখি, এ নিয়ে তার একটা সিলেকশন রয়েছে; এটি কেবল বাংলা কবিতার নিজস্ব ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেয় না, ভাষার অগ্রগমন, নবায়ন ও আধুনিকায়নের প্রতি কবির মনোযোগকেও দেখিয়ে দেয়।


‘পরাবাস্তব কবি’ শুনতে খুব সুখবোধ হলেও কবি কখনো ‘পরাবাস্তব’ হতে পারেন না।


মুহম্মদ নূরুল হুদা তৈরি ক’রে নিয়েছেন নিজস্বপৃথক এক ভাষাজগৎ। মধ্যমিলের চকিত ও চেষ্টাহীন প্রয়োগ, প্রথাগত অলঙ্কারের সঙ্গে অপ্রচলিত শব্দের মিশেল, সমকালীন কাব্যভাষায় উপভাষিক ও মৌখিক ভাষার এককের সংশ্লেষ ইত্যাদি মিলে তার কবিতা আলাদা হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এ-অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক অতীতের প্রতি তার বিশেষ এক আগ্রহ। বাঙালি আলোচকরা খুব বিশেষণবাজ, ফলে, মুহম্মদ নূরুল হুদার নামের আগে একটা বিশেষণ ব’সে গেছে এবং এর স্থায়িত্ব রক্ষায় স্তাবকরা বেশ পরিশ্রম ক’রে চলেছেন। সেটি হলো, ‘জাতিসত্তার কবি’। আবদুল মান্নান সৈয়দের নামের আগেও পরমানন্দে বসানো হয়েছে ‘পরাবাস্তব কবি’। ‘জাতিসত্তার কবি’ বলতে বা শুনতে যত মধুর লাগুক না কেন, একজন কবির জন্য অভিধাটি খুব সংকীর্ণ, এতে কবিকে নিয়ে ভাবনার পরিসর হয়ে পড়ে ছোট। এখন যদি কোনো কবিকে আদিবাসীদের নিয়ে কবিতা লিখতে দেখে আমরা তার নামের আগে ‘আদিবাসীদের কবি’ অভিধাটি জুড়ে দিই, নিশ্চয়ই তা সেই কবির জন্য সম্মানজনক হবে না। বরং হাস্যকরই হবে। আমরা তামাটে জাতি লিখে মুহম্মদ নূরুল হুদা এমন কোনো অপরাধ করেন নি যে, ‘জাতিসত্তার কবি’ ব’লে তাঁর কবিসত্তাকে সংকীর্ণ করে তুলতে হবে! ‘পরাবাস্তব কবি’ শুনতে খুব সুখবোধ হলেও কবি কখনো ‘পরাবাস্তব’ হতে পারেন না।

মোহাম্মদ রফিকের কবিতার নিজস্বতা সৃষ্টি হয়েছে লোকসংস্কৃতির বিষয়আশয়কে সমকালীন ও প্রাত্যহিক ভাষায় প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এই বৈশিষ্ট্য আল মাহমুদের কবিতায় রয়েছে, কিছুটা দেখা যায় মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতায়ও। তবে প্রয়োগধর্মে এরা বেশ আলাদা। মোহাম্মদ রফিক একটা সামগ্রিক অভিপ্রায়ের দিকে লোকজ অনুষঙ্গকে নিয়ে যেতে চান; আল মাহমুদের মনোযোগ পুনর্মূল্যায়নের ওপর; আর মুহম্মদ নূরুল হুদা বিশেষ এক আবহ সৃষ্টিতে লোকজ অনুষঙ্গের ব্যবহার করেন।


সিকদার আমিনুল হক কিছু ভালো কবিতা লিখেছেন। তবে সেসব পড়লে মনে হয়, এই কবি ইউরোপে (যেখানে বরফ পড়ে খুব) বসবাস করেন


এটা ঠিক, ষাটের কবিরা বেশ কিছু ভালো কবিতা লিখেছেন। সে-সময়ে পঞ্চাশের কবিদের উর্বরতা চোখে পড়ার মতো, তারাও তখন এমন কিছু কবিতা লিখেছেন, যা ষাটের কবিদের ফেলে দেয় একটা কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্যে এবং এই চাপ তখনকার কবিরা ঠিকই সামলে উঠেছিলেন। পঞ্চাশের প্রবণতার সম্প্রসারণের পরও যেখানে ষাটের পৃথকত্ব সূচিত হয়েছে, সেখানে এই সংগ্রামের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। দ্বিতীয়ত ষাটের কবিরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন (সেই প্রমাণ আল মাহমুদ, মোহাম্মদ রফিক আর মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতায় খুব আছে) এবং তিরিশি কবিদের মতো, আবার, নতুন উদ্যমে পাশ্চাত্য থেকে সংগ্রহ করতে থাকেন কবিতার রসদ। পশ্চিমকে পুঁজি বরে নতুন, আধুনিক ও সমকালীন হওয়ার তৃষ্ণা তখন এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, কেউ কেউ চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের ইঙ্গ-মার্কিন কবিতা অনুবাদ করে নিজের নামেই চালিয়ে দেন এবং সেই কবিতাগুলোর কিছু কিছু বিখ্যাতও হয়। তৃতীয়ত, অন্যদিকে, বাঙালি সংস্কৃতির অবরুদ্ধ দশা ষাটের কবিদের জাতীয়তাবোধকে উসকে রেখেছিল। ফলে, কবিতায় বাঙালিত্ব সঞ্চারের তীব্রতা অনেকের রচনায় বেশ গুরুত্ব পেয়েছিল। রফিক আজাদ এর উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু এরা ভুলে থাকেন নি বা এড়িয়ে যান নি বৈশ্বিকতাকে। এও লক্ষ্যযোগ্য যে, ষাটের কবিতা বাঙালিত্ব ও বৈশ্বিকতার মিশ্রণ ও সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে।

ওই সময়ের সৃষ্টিশীলদের মধ্যে যিনি পাঠকের হৃদয়ে খুব জেগে আছেন নক্ষত্রের মতো, তিনি আবুল হাসান। কিছু অসামান্য কবিতা তিনি লিখেছেন এবং অল্প বয়সে মৃত্যু হওয়ায় তাঁর প্রতি পাঠকের এক ধরনের মমতা রয়েছে। আমরা মমতাকে গুলিয়ে ফেলি কাব্যবোধের সঙ্গে; ফলে অকাল প্রয়াত আবুল হাসানের কবিতাকে প্রশ্নোর্ধভাবে খুব উৎকৃষ্ট মনে হয়। এও বাস্তবিক, সমকালীন কবিতায় তাঁর প্রভাব আজও টিকে আছে। আবুল হাসানের বেশ কটি কবিতায় রয়েছে পাঠকদের আচ্ছন্ন ক’রে তোলার ক্ষমতা। গৌণ কবিরও তা থাকতে পারে এবং অনেক অপ্রধান কবির ঔরসে জন্ম হতে পারে বড় কবির। অকাল প্রয়াত কবি হুমায়ুন কবিরের প্রতি আমাদের মমত্ব কম নয়; ‘পার্শ্ববর্তিনী সহপাঠিনীকে’ নামে তাঁর একটা কবিতা খুব বিখ্যাত ও জনপ্রিয় হয়েছিল।

সিকদার আমিনুল হক কিছু ভালো কবিতা লিখেছেন। তবে সেসব পড়লে মনে হয়, এই কবি ইউরোপে (যেখানে বরফ পড়ে খুব) বসবাস করেন, বাংলাদেশের বা বাঙালির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। ঘটনাচক্রে বাঙলা ভাষায় কবিতা লিখে তিনি খুব সুখী ও আনন্দিত। এটা জাহিদুল হকের কবিতায়ও টের পাওয়া যায়। যাই হোক, বাস্তবতা এই, ষাটের কবিরা সম্মিলিতভাবে যা করেছেন, তাতে গৌণ ও প্রধানরা একাকার হয়ে গিয়েছিলেন, ফলে মুশকিল হয়ে পড়েছিল তখনকার প্রভিভাবানদের চিহ্নিত করা; তবে তা বেশিদিন স্থায়ী হয় নি।


আগের কিস্তি : বাংলাদেশের কবিতা : পঞ্চাশের দশক
চঞ্চল আশরাফ

চঞ্চল আশরাফ

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯; দাগনভুইয়া, ফেনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতাগ্রন্থ : চোখ নেই দৃশ্য নেই (১৯৯৩), অসমাপ্ত শিরদাঁড়া (১৯৯৬), ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে (২০০২), গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো (২০০৮), খুব গান হলো, চলো (২০১৩)।

উপন্যাস : কোনো এক গহ্বর থেকে (১৯৯৭), যে মৎস্যনারী (২০১১)।

গল্পগ্রন্থ : শূন্যতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়ধ্বনি (১৯৯৯), সেই স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটে (২০০৭), কোথাও না অথচ সবখানে (২০১৩)।

স্মৃতিগ্রন্থ : আমার হুমায়ুন আজাদ (২০১০)।
প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার সৌন্দর্য ও অন্যান্য বিবেচনা (২০১১)

ই-মেইল : chanchalashraf1969@yahoo.com
চঞ্চল আশরাফ