হোম গদ্য বাংলাদেশের কবিতা : পঞ্চাশের দশক

বাংলাদেশের কবিতা : পঞ্চাশের দশক

বাংলাদেশের কবিতা : পঞ্চাশের দশক
1.06K
0

অর্ধযুগ আগে লুপ্ত সাপ্তাহিক ‘নতুন ধারা’য় বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন কবি চঞ্চল আশরাফ। সে সময় তুমুল তর্ক জমে উঠেছিল এই লেখাকে কেন্দ্র করে। সেই ইতিহাস যারা উদ্‌যাপন করেন নি, তাদের জন্য এবং নতুন দিনের কবিতা-লিখিয়ে ও পাঠকদের জন্য লেখাটি আমরা পুনর্মুদ্রণ করছি। প্রতি সপ্তাহে ১ কিস্তি করে মোট ৬ কিস্তিতে লেখাটি ছাপা হবে।

এই লেখাকে কেন্দ্র করে আবারও কোনো প্রতিক্রিয়া, অভিমত কিংবা ভিন্ন মত যদি সৃষ্টি হয় পাঠকদের মধ্যে, তা লিখে পাঠালে আমরা সে-সব লেখাও পরস্পরে তুলে ধরতে আগ্রহী। সবাইকে শুভেচ্ছা।

– সম্পাদক


উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্ব থেকে বাঙলা কবিতার বাস্তবতা এই যে, পশ্চিমের প্রধান ভাষাগুলোর সাহিত্যের ইতিহাসের যে-গতিশীলতা বা ধারাবাহিকতা দেখা যায়, তার সঙ্গে এর মিল নেই; কিন্তু সম্পর্ক আছে এবং সেটি বেশ গোলমেলে। এক ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে আরেক ভাষার সাহিত্যের মিল থাকা বাধ্যতামূলক নয়, সম্পর্কও নয় জরুরি। কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্ত পাশ্চাত্যের সাহিত্যের সঙ্গে বাঙলা সাহিত্যের সম্পর্কের যে ঘটকালিটি করেছিলেন, তা আধা শতকেও কল্কে পায় নি ‘বঙ্গীয়’ সাহিত্যসমাজে। পেলে, বাঙলা কবিতার ইতিহাস অন্যরকম হতো। যা হোক, আমরা যদি ফরাসি সাহিত্যের ইতিহাস লক্ষ করি, বা, চোখ রাখি ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে, তাতে একটার পর একটা সংবেদনশীলতা ও আঙ্গিকের আবির্ভাব, প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ দেখি; দীর্ঘকাল কোনো বিশেষ ধারার চর্চা হতে থাকলে, তাতে নতুন এক সংবেদনশীলতা এসে আঘাত করেছে, বিদায় ক’রে দিয়েছে পুরনোকে; কিন্তু বাংলা সাহিত্যে এমনটি খুব কমই ঘটতে দেখা যায়। না-ঘটুক, সান্ত্বনার বিষয় এই যে, বাংলা কবিতার ইতিহাস তার নিজেরই; কিছু গোলমাল না-থাকলে যে-কোনো দিক থেকে তা সার্বভৌম ও পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত।


পঞ্চাশের কোনো কবিই পুরোপুরি আধুনিক নন, তারা খণ্ডিত বা অবিকশিত আধুনিক।


তবু বলা বাহুল্য নয়, ফরাসিরা নিজেদের সংবেদনশীলতা প্রকাশ করেছে তাদেরই ভাষায়; কিন্তু উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্ব থেকে ভাষা ছাড়া বাঙালি কবিদের কিছুই ছিল না। [হ্বিটগেনস্টাইনের সূত্র মেনে ভাষাকে যদি চেতনা ধরি, তাহলে তো বাঙালি কবিদের ভাষাও নেই, তারা কবিতার নামে ধ্বনি ও শব্দের প্রদর্শনী করেছেন, নয়তো বাক্য গঠনের অনুশীলন করেছেন] মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই না-থাকাদের শিরোমণি; রোম্যান্টিসিজমের একটি মাত্র শর্ত নিয়ে তিনি বাঙলা ভাষার প্রথম রোম্যান্টিক কবি; এই অর্থে যে মিথের পুনর্মূল্যায়ন তার হাতেই প্রথম ঘটে বাঙলা কবিতায়। এর আগে বাঙলায় লিখিত হয়েছে মঙ্গলকাব্য, পুঁথি-পয়ার এবং ভাষাটি বিরামচিহ্নেও বৈশ্বিক হয়ে ওঠে নি। মেঘনাদবধ কাব্য [১৮৬১] যখন রচিত হয়, ফরাসি কবিতায় তখন প্রতীকবাদের সোনালি সময় এবং বোদলেঅরের ফ্ল্যর দু মাল রচিত হয়ে গেছে এর ৪ বছর আগেই। কিন্তু আধুনিকতা আর প্রতীকবাদ বুঝতে-বুঝতে বাঙালির লেগেছে অর্ধশতাব্দীরও বেশি; অধিকন্তু মধুসূদনকে বুঝে ওঠার আগেই, বিহারীলাল চক্রবর্তীর কবিতা নিয়ে বাঙালি কাতর হয়ে পড়ে। এই কাতরতা থেকে রবীন্দ্রনাথও রক্ষা করতে পারেন নি নিজেকে। তার কবিতারাশির বড় একটা অংশ মূলত বিহারীলালের অসহায় সম্প্রসারণ। জীবনানন্দ দাশের পূর্ণ বিকাশ না-হ’লে [এতে পরিচর্যার রসদ যুগিয়েছেন বুদ্ধদেব বসু] আমাদের ধ’রে নিতে হতো, রবীন্দ্রনাথের ভাষাই বাঙলা কবিতার নিয়তি; কেননা তিরিশের এই কবি প্রমাণ ক’রে দিয়েছেন একটা অপরিণত ভাষায় এর আগে বাঙলা কবিতা রচিত হয়ে চলেছিল। সত্য যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন বিপুল; কিন্তু তার বিপুল-অধিকাংশ কবিতাই বাঙলা সাহিত্যের অগ্রগমনে কোনও কাজে আসে নি। যদি আসত, জীবনানন্দের ধূসর পাণ্ডুলিপি [১৯৩৬] প্রকাশের পর তার কবিতা হয়ে পড়ত না নিরীহ; তদুপরি, যে মরমিপনাকে ধরা হয়ে আসছে রোম্যান্টিকের নিয়তি ব’লে, সেই পরমের স্থিতি ছেড়ে সংশয়ী আধুনিকের চেহারা তাকে ধরতে হতো না। তার স্ববিরোধিতা বিস্ময়কর। তবে খুব বেশি লিখে ফেলেছেন রবীন্দ্রনাথ। এত বেশি লিখে উত্তরকালের কবিতায় এত কম প্রভাব বাঙলা ভাষায় আর একজনের ক্ষেত্রে ঘটেছে—তিনি শামসুর রাহমান।

উত্তরকালের বাঙলা কবিতায় তিরিশের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের চেয়ে অনেক বেশি, নজরুলের চেয়ে তো বটেই। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত বাঙলা কবিতার যে-ধারা চলছে, তার শুরু সেই তিরিশ থেকে; কিন্তু ভাষা ও চেতনায় কবিতা সপ্রতিভ হয়েছে সমর সেন ও আহসান হাবীবের সময় থেকে [তবে আহসান হাবীবের কবিতার বিষয় ও ভঙ্গিতে সমর সেনের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তার কৃতিত্ব এই যে, সমকালীন কবিতাভাষার অগ্রবর্তী অংশটি তিনি ধরতে পেরেছিলেন]; পঞ্চাশে এসে তা পরিণত, জোরালো ও বিচিত্রমুখি হয়েছে। শামসুর রাহমানের প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, আল মাহমুদের সোনালি কাবিন, হাসান হাফিজুর রহমানের বিমুখ প্রান্তর, শহীদ কাদরীর উত্তরাধিকার, ওমর আলীর এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি—কবিতার এই বইগুলো পুনর্বার পাঠ করলে এই তথ্যের স্পন্দন টের পাওয়া যায়। এগুলোর প্রতিটিই পঞ্চাশে বেরিয়েছিল, এমন নয়; তবে অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলোর বড় একটা অংশের প্রকাশ ঘটেছিল সে-সময়েই। এ-বইগুলো পাঠ করলে ধারণা পাওয়া যায় তখনকার কবিদের অভিপ্রায় ও অর্জন সম্পর্কে। এবং ভাষা ও বিষয়রুচিতে এদের প্রত্যেকেই যে কম-বেশি আলাদা, তা বোঝা যায় সহজেই। এও বোধগম্য হয়ে ওঠে, তিরিশ-নির্দেশিত পথে চললেও তাদের মধ্যে নতুনত্বের তৃষ্ণা ছিল; কিছু নতুনত্ব তারা সঞ্চারও করেছেন কবিতায়, যেমন—আত্মপরিচয়ের সাধনাসূত্রে ঐতিহ্য, লোকজীবন ও অন্ত্যজ মানুষের অনুভবের প্রকাশ তারা করেছিলেন সমকালীন আঙ্গিকেই। যা করতে গিয়ে এক সময় পুঁথি-পয়ার লিখেছেন বাঙালি মুসলমান কবিরা।

একটু আগে শামসুর রাহমানের কবিতার প্রভাব নিয়ে সামান্য কথা ওঠানো হয়েছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে [বাংলার পূর্ব অংশে] রবীন্দ্রনাথের পরই তার স্থান, পঞ্চাশের আর কোনও কবির এত প্রভাব আছে কি-না বলা মুশকিল। প্রথমত, কবিতা সম্পর্কে বাঙালি মুসলমানদের ধারণার পরিবর্তন তিনি ঘটিয়েছেন; দ্বিতীয়ত, কবিতাকে এখানকার শিক্ষিত জনসমাজের কাছে সহজ ও ঘনিষ্ঠ ক’রে তুলেছেন; তৃতীয়ত কবিতা যে রাজনৈতিক আবেগের আশ্রয় ও উৎস হতে পারে, সেই শিক্ষা এখানকার মানুষ তার কাছ থেকে পেয়েছে বেশি; চতুর্থত, বাঙলা কবিতায় প্রবহমান অক্ষরবৃত্ত কিংবা গদ্যের ভঙ্গিকে অভিযোজিত করেছেন তিনি—ইত্যাদি। কিন্তু উত্তরকালের বাঙলা কবিতায় বিষয়-ভাব ও নন্দনকাঠামোগত প্রভাব সম্মিলিত; কারও একক বাহাদুরির সুযোগ এতে নেই। সেই সম্মিলিত প্রভাবকে ছাপিয়ে উঠেছে শামসুর রাহমানের সাংস্কৃতিক প্রভাব; কবিতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ঢাকা; নগরমনস্কতা হয়ে এসেছে অনুকরণীয়; রাজনৈতিক-মানবিক বিষয়-ঘটনা-আবেগ প্রকাশের আধুনিকোচিত আঙ্গিকের সঙ্গে এখানকার পাঠকের পরিচয় ঘটেছে।

কিন্তু পঞ্চাশের কোনো কবিই পুরোপুরি আধুনিক নন, তারা খণ্ডিত বা অবিকশিত আধুনিক। তবে তারা খুব সমকালীন এবং ভাষার দিক থেকে বেশ সচেতন ও উত্তরণকামী। সে-সময়কার অধিকাংশ কবিতা একবার পড়লে দ্বিতীয়বার আর পড়তে হয় না; যদিও বারবার পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি আধুনিকতার অপরিহার্য কোনও শর্ত নয়। কিন্তু আধুনিক কবিতার মধ্যে এক গভীর-জটিল-ব্যাপক-সূক্ষ্ম অনুভব-বোধ-ভাষা-অনুষঙ্গ-অর্থ-সৌন্দর্যের সংগঠন রয়েছে, যা বোধগম্য ক’রে তোলার জন্যে বারবার পড়তে হয়। এবং কোনো ব্যাখ্যাই স্থিরনিশ্চিত নয় শেষ পর্যন্ত। কেননা, প্রতিটি পাঠেই এটি অন্যতর ভাষ্য কিংবা মন্তব্যকে আমন্ত্রণ জানায়। পঞ্চাশের কবিতার ব্যাখ্যা-সমালোচনা এখনও তেমন হয় নি, তার কারণ সমালোচকদের ইচ্ছা বা সামর্থ্যের অভাব অথবা অসততা; হয়তো তখনকার কবিতার কোনও সমালোচকই আমাদের মধ্যে নেই! কিছু আলোচনা-অভিসন্দর্ভ প্রকাশিত হয়েছে সেই সময়ের কবিতা নিয়ে; কিন্তু ওগুলোর প্রায় প্রতিটিই স্তাবকতা আর কপটতার আদর্শ নমুনা হয়ে আছে। কপট প্রশংসায় আর সমালোচনা না-হওয়ার আত্মতৃপ্তিতে পঞ্চাশের কবিরা বছরের পর বছর যে-বিপুল কবিতার জন্ম দিয়ে গেছেন, সেগুলির বেশির ভাগই অভ্যাসজনিত রচনায় পর্যবসিত হয়েছে। অভ্যাস যে শিল্পকলার শত্রু, তা সবারই কম-বেশি জানা।

ব্যতিক্রম সৈয়দ শামসুল হক। পঞ্চাশের সবচেয়ে নিরীক্ষাপ্রবণ কবি তিনি। নিরীক্ষা আসলে উচ্চাভিলাষী কবির অনুশীলন এবং এর সাধারণ উদ্দেশ্য ব’লে আমরা যা জানি, তা হলো, নিজস্ব-নতুন একটি আঙ্গিক ও ভাষা খুঁজে বের করা; কিন্তু ক্রমাগত নিরীক্ষা কবির অস্থিরচিত্তের জানান দেয়। এতে পাঠককে চমকে দেয়া যায়; তবে বারবার কাজটি চলতে থাকলে, তা হয়ে পড়ে সন্দেহজনক। কেননা, যে-কোনও কবি সম্পর্কে পাঠক চান প্রত্যয়গত স্থিতি ও ব্যাখ্যার পরিসর। এবং এর মধ্যে খুঁজে নিতে চান নিরীক্ষার কোন অংশটি গ্রহণ করেছেন বা সেই অনুশীলনের কোন স্তরে কবির সিদ্ধি ঘটেছে। সৈয়দ শামসুল হকের নিরীক্ষার মূলে তার বৈচিত্র্যকামী মন, কোনও সিলেকশনের দায় এতে কাজ করেছে ব’লে মনে হয় না। মনে হয়, দৃষ্টি আকর্ষণের পৌনঃপুনিক চেষ্টায় তার এই অনুশীলন নিঃশেষিত। তার নিরীক্ষার চেহারা লক্ষ করলে এ-সিদ্ধান্ত অসমীচীন হবে না যে, নিজের কবিতার জন্যে জুতসই ভাষা বা ভঙ্গি নির্বাচনের প্রণোদনা থেকে তিনি নিরীক্ষায় মেতে ওঠেন নি। টাইপোগ্রাফিক কবিতা লিখেছেন তিনি, সনেটে যুক্ত করেছেন উপভাষার অন্তর্গত এককগুলো, ব্যালাড বা আখ্যানকবিতা লিখেছেন, কবিতায় নাট্যাবহ এনেছেন, চরণবিন্যাসের প্রচলিত ছকও ভেঙেছেন। মোট কথা, বাঙলা কবিতা সম্পর্কে পাঠককে তিনি দিয়েছেন নানা অভিজ্ঞতা। এসব দিক থেকে তাকে পঞ্চাশের সবচেয়ে অগ্রসর ও বৈচিত্র্যসন্ধানী কবি মনে হতে পারে। অধিকন্তু পাশ্চাত্য কবিতাদর্শ, লোকজীবনজাত বিষয়-অনুষঙ্গ এবং উপভাষিক জগতের এত স্পষ্ট মেলবন্ধন তার সমকালীন আর কারও কবিতায় দেখা যায় না। ওমর আলী কিংবা আল মাহমুদেও এই স্পষ্টতা নেই। দৃষ্টান্ত :

একবার চাই এক চিক্কুর দিবার, দিমু তয়?
জিগাই কিসের সুখে দুঃখ নিয়া করো তুমি ঘর?
আঙিনায় পাড়ে ফুল গাছ দিলে কি সোন্দর হয়
দুঃখের কুসুম ঘিরা যার জিয়ন্তে কবর।
[পরানের গহীন ভিতর]

লক্ষণীয়, সৈয়দ শামসুল হক মানেন নি কবিতার ভাষাগত সংস্কার, এমন-কি নগরমনস্ক আধুনিকতার ধারও ধারেন নি। অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার, লোকজ উচ্চারণের অনুগামী উল্লেখে এ-মন্তব্যের সমর্থন মেলে।


আধুনিকতার গ্যারান্টি হিসেবে পশ্চিমের দ্বারস্থ হওয়াটা আবশ্যকীয় একটি শর্তে পরিণত হয়।


পশ্চিমবঙ্গের কবিতা পাশ্চাত্যবাহিত আর পঞ্চাশের কবিতা কোলকাতাবাহিত; এক সাক্ষাৎকারে শামসুর রাহমান সেটা স্বীকার করেছেন, যদিও তিনি বলেছেন যে, ‘অনুবাদের ভেলা বেয়ে সরাসরি বিশ্বকবিতার মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ’ করার ক্ষেত্রে এখানকার কয়েকজন কবি সচেষ্ট। অর্থাৎ পাশ্চাত্যের সাহিত্য থেকে রসদ আহরণের যে-ধারা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্বে, তিরিশে তা নানা মাত্রায় পল্লবিত হলে এবং তাতে একটি স্পষ্ট মোচড় দেখা গেলে বাঙলা কবিতার বাঁকবদলে এবং আধুনিকতার গ্যারান্টি হিসেবে পশ্চিমের দ্বারস্থ হওয়াটা আবশ্যকীয় একটি শর্তে পরিণত হয়। কিন্তু তখনকার পূর্ববঙ্গের পটভূমিতে পশ্চিমের কী গ্রহণযোগ্য আর কী বর্জনীয়, তা সম্ভবত পঞ্চাশের কবিরা বুঝে উঠতে পারেন নি। ফলে, নগরজীবনে প্রবেশের আগেই কবিরা নাগরিক ব’নে গেছেন। তখনকার, বিশেষত শহীদ কাদরীর কবিতা পড়লে মনে হয়, একটা পরিপূর্ণ নগরব্যবস্থার মধ্যেই তার বসবাস। অথচ ঢাকা তখনও নগর হয়ে ওঠে নি এবং পূর্ববঙ্গে বা বাংলাদেশে যৌথ পরিবার কেবল সে-সময়ে নয়, সত্তর দশক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। শামসুর রাহমানের বেশির ভাগ কবিতায় আধুনিকতার প্রধান একটি শর্ত বিচ্ছিন্নতাবোধের প্রকাশ ঘটেছে ব’লে মনে হলেও সেটি রোম্যান্টিক আচ্ছন্নতায় পরিপূর্ণ। কখনো-কখনো মনে হয়, ওই বিচ্ছিন্নতা কবি বেশ উপভোগ করছেন! শুরু থেকেই শামসুর রাহমানের কবিতায় রোম্যান্টিক ও আধুনিক মনের মিলন ও সংঘর্ষ টের পাওয়া যায়। একটি দৃষ্টান্ত :

শুধু দু’টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ
অথবা প্রখর ধূধূ পিপাসার আঁজলা ভরানো পানীয়ের খোঁজ
শান্ত সোনালি আল্পনাময় অপরাহ্নের কাছে এসে রোজ
চাই নি তো আমি। দৈনন্দিন পৃথিবীর পথে চাই নি শুধুই
শুকনো রুটির টক স্বাদ আর তৃষ্ণার জল।
[রুপালি স্নান, প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে]

এই অতৃপ্তি এবং আরও কিছুর আকাঙ্ক্ষা কবির রোম্যান্টিক সত্তার পরিচয় বহন করে; কিন্তু ‘শহরের কোনো নর্দমাতেই’ নিজের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার বর্ণনাটি আধুনিক উন্মূল ও বিপন্ন মনের উপস্থিতিকে টের পাইয়ে দেয়।

রোম্যান্টিকতা ও আধুনিকতার এই দ্বন্দ্ব শহীদ কাদরীর কবিতায় প্রায় নেই। তবে তার আধুনিকতায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে নগরজীবনের অতিরঞ্জিত প্রকাশ; এত যে, মনে হয় পূর্ব বাঙলার শহরগুলো বিকাশের পর পতনের দিকে চলেছে। সেই পতনোন্মুখ একটি শহরে বসবাসের অভিজ্ঞতা প্রকাশের মধ্যে তার কবিতা প্রায় নিঃশেষিত। একটি খুব বিখ্যাত দৃষ্টান্ত—

জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ন থেকে নেমে—
সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিলো যেন
দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নিচে, সন্ত্রস্ত শহরে
নিমজ্জিত সবকিছু, রক্তচক্ষু সেই ব্ল্যাক-আউট আঁধারে।
[উত্তরাধিকার]

আগেই বলা হয়েছে, পঞ্চাশের কবিরা খণ্ডিত আধুনিক, যেমন খণ্ডিত তিরিশের আধুনিকরা। এমনটি ঘটেছে কেবল তিরিশ-নির্দেশিত পথে তারা এগিয়েছেন ব’লে নয়, কোলকাতা থেকে স’রে আসার পর তাদের সামনে আর কিছু ছিল না ব’লে। দ্বিতীয়ত, এটি ছিল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ও সংস্কৃতির প্রতিক্রিয়া। পঞ্চাশের কবিদের সুযোগ ছিল তিরিশের আংশিকতাদীর্ণ আধুনিকতাকে পূর্ণতা দেয়ার; কিন্তু তারা পূর্বতনের প্রতিধ্বনি কিংবা সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন; যদিও পরবর্তীকালে তাদের কেউ-কেউ সেই ধারা থেকে মোটামুটি মুক্ত হতে পেরেছিলেন। চেতনার বহুরৈখিকতায় সেই মুক্তি ঘটে নি; আঙ্গিকচমক, কিছু সাংস্কৃতিক দায় আর শব্দের প্রয়োগগত নতুনত্বের সূত্রে ঘটেছে এবং পঞ্চাশের বাঙলা কবিতা এতেই ফুরিয়ে গেছে।


পরের কিস্তি : বাংলাদেশের কবিতা : ষাটের দশক
চঞ্চল আশরাফ

চঞ্চল আশরাফ

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯; দাগনভুইয়া, ফেনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতাগ্রন্থ : চোখ নেই দৃশ্য নেই (১৯৯৩), অসমাপ্ত শিরদাঁড়া (১৯৯৬), ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে (২০০২), গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো (২০০৮), খুব গান হলো, চলো (২০১৩)।

উপন্যাস : কোনো এক গহ্বর থেকে (১৯৯৭), যে মৎস্যনারী (২০১১)।

গল্পগ্রন্থ : শূন্যতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়ধ্বনি (১৯৯৯), সেই স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটে (২০০৭), কোথাও না অথচ সবখানে (২০১৩)।

স্মৃতিগ্রন্থ : আমার হুমায়ুন আজাদ (২০১০)।
প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার সৌন্দর্য ও অন্যান্য বিবেচনা (২০১১)

ই-মেইল : chanchalashraf1969@yahoo.com
চঞ্চল আশরাফ