হোম গদ্য ফিরে দেখা কোড়কদী

ফিরে দেখা কোড়কদী

ফিরে দেখা কোড়কদী
593
0

[২০১০ সালের ৩০ জানুয়ারি ফরিদপুরের বর্ধিষ্ণু গ্রাম কোড়কদীতে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সে-সমাবেশ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত স্মরণিকার জন্যে বর্ধমান থেকে এই রচনাটি পাঠিয়েছিলেন নৃত্যশিল্পী অজিত সান্যাল। পরে রচনাটি ২০১১ সালে প্রকাশিত সুব্রত কুমার দাস সম্পাদিত কোড়কদী একটি গ্রাম গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়।]

আমার বয়স এখন চুরাশি চলছে। আমার গ্রাম ছেড়েছি উনসত্তর বছর আগে। অনেক ঝড়-ঝাপটা সহ্য করে সেই গ্রাম এখন ময়দান। সুব্রতবাবুর অনুরোধে আমার ছোটবেলার গ্রামের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে বেশ সমস্যায় পড়েছি। তবু আমার কৈশোর পর্যন্ত যে গ্রামে কেটেছে সে-কথা সবাইকে জানানোর লোভ সামলাতে পারলাম না।

আমার পৈত্রিক বাস কোড়কদী গ্রাম। আগে রাজবাড়ি মহকুমার অধীনে বালিয়াকান্দি থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে এটি মধুখালী উপজেলার মধ্যে। মধুখালী রেলস্টেশন থেকে তিন মাইল দূরে হাঁটা পথ। আমার বাবার নাম অপূর্বদাস সান্যাল, দাদা অবন্তীকুমার সান্যাল, ছোট বোন সুলেখা সান্যাল, সুজাতা সান্যাল, ছোট ভাই সুজিত সান্যাল।

2
২০১০ সালের ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কোড়কদী সমাবেশের একাংশ।

১৯২৬ সালে আমার জন্ম চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লায়। মাসিমা অমিয়া সান্যালের বাড়িতে। ছয় বছর বয়সে আমি পৈত্রিক বাড়িতে আসি। আমাদের যৌথ পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল পঁচিশ। আমার বাবা, জ্যাঠামশাই কোড়কদী রাস বিহারী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। পাঁচু মাস্টারমশাই-এর পাঠশালায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু।

আমি খুব রোগা আর দুর্বল ছিলাম বলে আমার তুতো পড়ুয়া ভাইদের কাছে খুব হেনস্তা সহ্য করতে হতো তবু আমরা একসঙ্গেই খেলাধুলা, মারামারি, আম, জাম, ডাব চুরি একসঙ্গেই করতাম। খাল, বিল জলার গ্রামে বর্ষার শুরু আর জল সরে যাবার সময় মাছ ধরা আমাদের নেশা ছিল। মাছ ধরার জন্য ম্যালেরিয়ায় ভোগা আর জ্যাঠামশাই, বাবার কাছে মার খাওয়া ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।


আমাদের সঙ্গে মুজিবর রহমান নামে একজন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন যিনি পরে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। 


চুরাশি বছর বয়সে পুরানো স্মৃতি যতই ধূসর হোক তবু কোড়কদী গ্রামের কথা কি ভুলতে পারি! হাঁরখালীর মাঠে, স্কুলের মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট, গোল্লাছুট খেলা, ভাদুড়ী পুকুরে ঝাঁপা-ঝাঁপি, মহিন্দিরদার দোকানের সামনে দুধের বাজার থেকে দুধ কেনা, কুঠিবাড়ির আমবাগানে আম কুড়ানো, দেবিন্দির সান্যালের নারকেল বাগানের ডাব চুরি, থিয়েটার হলের পাশের নোয়াবাড়ির ভাঙা মণ্ডপ থেকে রাতে পায়রা ধরা, রায় বাহাদুর দাদুর বড় দালানের সামনের বিরাট উঠোনে যাত্রা দেখা, দুর্গা পুজোর আগে কলকাতা থেকে প্রবাসীদের গ্রামে আসার নৌকার সংখ্যা গোনা, গ্রামের দশ বাড়িতে দুর্গার আরতি দেখা, বিজয়া সম্মিলনী উপলক্ষ্যে গ্রামে আসা প্রবাসীদের থিয়েটার দেখা, চন্দনা নদীতে নৌকা বাইচ, বর্ষাকালে নিজেদের নৌকায় চেপে স্কুলে যাওয়া আসা, বাগাট গ্রামে ফুটবল ম্যাচ খেলতে গিয়ে মারামারি করা, সান্যাল পাড়া, লাহিড়ী পাড়া আর ভটচাজ পাড়ার মধ্যে ঘুড়ির লড়াই, লাহিড়ী পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে সান্যাল পাড়ার ছেলেদের মারামারি, সরস্বতী পুজোয় ছোটদের থিয়েটার, গাজনে রামধন তর্কপঞ্চানন লাইব্রেরির সামনে শিবু রাজমিস্ত্রির বিশাল পাট চালান, স্বদেশি আন্দোলনের সময় কাকাদের পুলিশের চর থেকে সাবধান করা, পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলে ‘বন্দে মাতরম, পুলিশের মাথা গরম’ স্লোগান দিয়ে পিছন পিছন ছোট বটতলা পর্যন্ত দল বেঁধে ছোটা এসব কি  ভোলা যায়?

১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেই। আমাদের সঙ্গে মুজিবর রহমান নামে একজন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন যিনি পরে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। পরীক্ষার পর কাকার সঙ্গে পারিবারিক ব্যবসার গদিতে বসতে হয়। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, এক টাকার জিনিস দশ টাকায় বিক্রি, কুড়ি টাকা মণের চাল চল্লিশ টাকায় বিক্রি করা আমার বিবেক মেনে নিতে না পারায় ব্যবসা ছেড়ে সরকারি লঙ্গরখানায় চাকরি পেলাম। সুপারভাইজার হিসেবে সরকারি বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত খাবার বরাদ্দ করায় মহকুমা শাসক আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। ১৯৪৩ সালের মাঝামাঝি কলকাতায় দাদা অবন্তীর মেসে হাজির হলাম সঙ্গে পঞ্চাশ টাকা।

3
কোড়কদী সমাবেশে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখছেন সুব্রত কুমার দাস।

জর্জ টেলিগ্রাম ইনস্টিটিউটে স্টেনোগ্রাফি-টাইপরাইটিং শেখার সময় ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে পরিচয়। নবান্ন নাটকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শ্রীরঙ্গম হলের গেটকিপার থেকে নাটকের লাঠিয়াল চরিত্রে উত্তরণ। এখান থেকে শুরু হলো নতুন জীবন। সুধী প্রধান গোয়াবাগান কমিউনে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়ে নাট্য আন্দোলনের অংশীদার হলাম। বিদেশি কোম্পানিতে স্টেনোর চাকরি পেলাম, গণনাট্য সঙ্ঘের নৃত্যশাখায় বুলবুল চৌধুরীর কাছে নাচ শেখা আর যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষ বিরোধী নাচের অনুষ্ঠানে, অফিস কামাই, বাংলাভাগের বিরুদ্ধে সাক্ষর করায় এবং কমিউনিস্ট হওয়ার অপরাধে বরখাস্ত হলাম।

১৯৪৯ সালে বুলবুল চৌধুরীর ব্যালে ট্রুপের সদস্য হয়ে ঘর ছেড়ে পেশাদার নৃত্যশিল্পী হয়ে পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তান এবং ইউরোপ সফর শেষ করে ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে কলকাতা ফেরা, ১৯৫৪ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ক্যানসারে বুলবুল চৌধুরী মারা যাওয়ার পর তার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আমি ঢাকায় ‘বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস’-এর প্রতিষ্ঠাতা নৃত্য শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খাঁন পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর ঢাকা ছেড়ে বর্ধমানে ফিরে সরকারি অফিসে টাইপিস্ট-এর চাকরি এবং ১৯৮৪-তে অবসরের পর অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর জীবনযাপন করছি। ঢাকাকে তবুও আমি ভালোবাসি। আমার দ্বিতীয় জননী আনোয়ারা বাহার, ছোটবোন সেলিনা বাহার জামান, ছোটভাই সাংবাদিক ফজলুল করিম অন্তিম শয়ানে শায়িত আছে, তাদের জন্য আমার মনে কষ্ট হলে আমি আবৃত্তি করি “বাসাংসি জীর্নানি যথা বিহায় লবানি গৃহ্নাতি নরোহ পরানি। তথা শরীরানি বিহায় জীর্নান্য ন্যানি সংযাতি লবানি দেহী”।

অজিত সান্যাল

অজিত সান্যাল [জন্ম১৯২৬- মৃত্যু ১২ আগস্ট ২০১৮]

খ্যাতনামা নৃত্যগুরু। আদিবাড়ি : ফরিদপুরে কোড়কদী। অজিত সান্যাল কোড়কদীর শতবর্ষ প্রাচীন স্কুল রাস বিহারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪৩-৪৪ সালের দিকে কলকাতায় গণনাট্য সংঘের সাথে জড়িত হন। ১৯৪৫ সালে কলকাতার বুলবুল চৌধুরীর কাছে নৃত্যে হাতেখড়ি। ১৯৪৯ সালে বুলবুল চৌধুরীর নৃত্যশিল্পী সম্প্রদায়ে স্থায়ীভাবে কাজে নিযুক্ত হন অজিত সান্যাল। বুলবুল নির্মিত অনেক নৃত্যনাট্য যেমন ‘এই আমার দেশ’, ‘পাছে আমরা ভুলে যাই’, ‘বন্দিনী ভারত’, ‘বীতংস’ প্রভৃতিতে কাজের সূত্রে সারা পূর্ববাংলা, পশ্চিম পাকিস্তানসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম প্রভৃতি সফর করেন কৃতি এই নৃত্যশিল্পী।

অজিত সান্যালের দুটি গ্রন্থ হলো :

—দুই দেশ দুই মন
—আলোর পাখি

ই-মেইল : ajit.sanyal@gmail.com

Latest posts by অজিত সান্যাল (see all)