হোম পুনর্মুদ্রণ গদ্য তখন রবীন্দ্রনাথকে আমাদের স্তম্ভ বলা যাবে না : আনিসুজ্জামান

তখন রবীন্দ্রনাথকে আমাদের স্তম্ভ বলা যাবে না : আনিসুজ্জামান

তখন রবীন্দ্রনাথকে আমাদের স্তম্ভ বলা যাবে না : আনিসুজ্জামান
735
0

২০১১ সালের কোনো এক ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায়, বাদ-মাগরিব, এই সাক্ষাৎকারটি আমাকে নিতে হয়েছিল প্রথম আলোর অনুরোধে। আনিসুজ্জামানের সাথে আমার আলাপ হয়েছিল সম্পাদক মতিউর রহমানের কক্ষে। আলাপের শুরুতে ও শেষে সম্পাদক মশাই ছিলেন, মাঝখানে ছিলেন না। কিছুই বলেন নি তিনি, শুনেছেন শুধু। কখন একবার ফলমূলের প্লেট এগিয়ে দিয়েছেন আমাদের দিকে। তাতে ফরমালিন থাকতে পারে ভেবে আমি ছুঁয়েও দেখি নি। তবে মগভর্তি কফি খেয়েছিলাম। আনিস স্যার সম্ভবত কিছুই খান নি। গম্ভীরভাবে বসে খুক খুক করে কাশছিলেন। আমি তাকে সালাম দিয়ে বললাম, ‘স্যার আমি পুরনো পাপী। বালক বয়সে আমার কবিতার বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন আপনি।’ তা শুনে উনি কাষ্ঠহাসি দিয়ে ক্বফ-গেলা গরগর আওয়াজে কী বললেন, ঠিক বুঝতে পারি নি।


সােহেল হাসান গালিব

আমরা জানি, আমাদের সংবিধানের যে বাংলা ভাষ্য, সেটি আপনারই তৈরি করা। সংবিধানে আছে, বর্ণনায় কোনাে অস্পষ্টতা তৈরি হলে বাংলাকেই প্রামাণ্য বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু লক্ষ করি, ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হচ্ছে। কার্যত, এটি না হয়ে বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার কথা। ফলে রাষ্ট্রের গোড়াতেই প্রবণতার দিক থেকে কোনো ঝামেলা রয়ে গেছে মনে হয়।

আনিসুজ্জামান

আসলে সংবিধান মূলত রচিত হয় ইংরেজি ভাষায়। কারণ, এই খসড়াটি তৈরি করেছিলেন ড. কামাল হােসেন। তখন আমাদের দেশে যারা আইনি খসড়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, তাঁরা কেউই বাংলায় আইন তৈরি করতে অভ্যস্ত ছিলেন না। ফলে কারও পক্ষেই বাংলায় খসড়া তৈরি করা সম্ভব ছিল না তখন পর্যন্ত। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করতে হতাে। এটিই আমরা করেছিলাম। কেউ কেউ বলেন, আপনারা কি একটা প্রবঞ্চনা করলেন, যখন বললেন, সংবিধানের একটা ইংরেজি পাঠ থাকবে। আসলে প্রবঞ্চনা নয়। বাংলা পাঠ এবং ইংরেজি পাঠ—এই দুটিকে আলাদা পাঠ হিশেবেই নিতে হবে। বলা হয়েছে, এ দুটির যদি বিরােধ হয়, তাহলে বাংলা প্রাধান্য পাবে। আমি দুটি পাঠ বলছি, কারণ, যখন কামাল হােসেন খসড়া করলেন, তারপর একজন বিশেষজ্ঞ, যিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রাইভেট মেম্বারস বিল তৈরি করতেন (মানে তার যে প্রতিষ্ঠান সেটা এই কাজ করত, কমনওয়েলথ সচিবালয় তাকে পাঠিয়ে দেয় আমাদের সংবিধানের বিষয়ে সাহায্য করতে) তিনি কামাল হােসেনের খসড়া পরিমার্জনা করেন। আমরা তা অনুসরণ করি। কিন্তু কামাল হােসেনের খসড়া পর্যায়েই অনেক সময়ে আমাদের মনে হয়েছে, এই কথাটি ঠিক ভালো করে বাংলায় প্রকাশ করা যাচ্ছে না বা বাংলায় এমন করে বললে ভালাে হয়, ইংরেজিতে তখন কিছু কিছু বদলানাে হয়েছে। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, দু-এক জায়গায় আমরা হয়তাে ঠিক পাঠ বা ঠিক অনুবাদ করি নি। আর এই সঙ্গে বলতে চাই, এই বাংলা ভাষ্য যদিও আমার নেতৃত্বে করা হয়েছিল, কিন্তু তা আমার একক কাজ নয়। আমার বন্ধু নেয়ামাল বাসির, যিনি গণপরিষদের বিতর্ক সম্পাদক হয়েছিলেন, খ্যাতনামা অনুবাদক, তিনি এবং তার এক সহকর্মীর সঙ্গে মিলে কাজটি করেছিলাম।

সােহেল হাসান গালিব

তখন আপনারা যারা গদ্যচর্চা করছিলেন, সাহিত্যে ও গবেষণায় দেখতে পাই, চলিত ভাষা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সংবিধানে সাধুভাষা নির্বাচনে কোনাে বাধ্যবাধকতা ছিল কি?

আনিসুজ্জামান

বাধ্যবাধকতা ছিল না। আমরাই আলাপ করে স্থির করলাম, সাধারণত আইনের ভাষা তাে একটু রক্ষণশীলই হয় এবং তখন পর্যন্ত আমাদের এখানে আইনের যতটুকু অনুবাদ হয়েছে, সেটা সাধু ভাষায়ই হয়েছে। তখনাে সংবাদপত্রের ভাষায় সাধুরীতির একাধিপত্য। আমরা সংবিধানের ভাষার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারতাম হয়তাে, এটিকে কথ্য ভাষায় নিয়ে এসে। কিন্তু দেখা যায়, ইংরেজিতেও যখন আইন রচিত হচ্ছে, তখনাে কিছু কিছু পুরােনাে অপ্রচলিত শব্দ ও ভঙ্গি রেখে দেওয়া হয়েছে। তার মানে আইনি ভাষার একটা নিজস্ব গঠন তৈরি হয়ে গেছে। বেশ খানিকটা পুরােনাে ও অপ্রচলিত জিনিশের ব্যবহার তাতে আছে। সেটি মনে করে আমরা ভাবলাম, সাধু ভাষায় কাজটা করি। এটিই হয়তাে স্থায়ী হবে আইনের ক্ষেত্রে। তবে আমি নিশ্চিত নই, আজকে যদি এ কাজ করতাম, তাহলে হয়তাে কথ্য ভাষাই ব্যবহার করতাম।


আজকে আমাদের নৃতাত্ত্বিক জাতিগােষ্ঠীরা বলছে, তাদের ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হােক, তত্ত্বগতভাবে আমিও এটি সমর্থন করি।


সােহেল হাসান গালিব

রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার আইনগত ভিত্তি তৈরি হলাে। এমনকি আদালতের পরিভাষাও তৈরি করলেন আপনারা। তার পরও উচ্চতর আদালতে আমরা কেন বাংলা ভাষাকে চালু করতে পারছি না?

আনিসুজ্জামান

এটির কারণ, আমি মনে করি, সবটিই মানসিক। দ্যাখাে, আমাদের তাে ইংরেজ আমলেই নিচের দিকের আদালতে বাংলার প্রচলন হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ হওয়ার পর দেখা গেল, ব্যতিক্রম ছাড়াই নিম্ন আদালতের সব পর্যায়ে, জেলা জজ আদালত পর্যন্ত, বাংলায় লেখা হচ্ছে। অনেক পরে হামিদুল হক চৌধুরী দেশে ফিরে এসে মামলা করলেন, ইংরেজিতেও মামলা করার সুযােগ চেয়ে। সেই মামলায় হাইকোর্টে তিনি রায় পেয়ে গেলেন। সরকারও তার বিরুদ্ধে আর আপিল করল না। ফলে নিম্ন আদালতে বাংলার যে একচেটিয়া অধিকার ছিল, সেটিও কিন্তু ক্ষুণ্ন হয়ে গেল। এটি গেল একটি দিক। অন্যদিকে উচ্চ আদালতে বাংলা কখনােই ব্যবহৃত হলাে না, যদিও আমরা জানি, হাইকোর্ট বিভাগের তিনজন বিচারক কখনাে না কখনাে বাংলায় মামলার রায় দিয়েছেন। কিন্তু সংবিধানের স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও উচ্চতম আদালতে যে বাংলা গৃহীত হতে পারল না, এটি একই সঙ্গে আমাদের দুর্ভাগ্য এবং ব্যর্থতা আমি বলব। এখন বাংলা প্রচলনের বিষয়ে নানা ক্ষেত্রেই অনেক দ্বিধা দেখা যাচ্ছে।

সােহেল হাসান গালিব

আমরা দেখছি, সারা বিশ্বে এখন মাতৃভাষা সংরক্ষণ এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার ওপর এক ধরনের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমাদের এখানে গঠিত হলাে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আসলে কী কাজ করছে, এটি কিভাবে চলছে?

আনিসুজ্জামান

আমি তােমার প্রশ্নের প্রথম অংশটির বিষয়ে বলি। এটা ঠিক, জাতিসংঘ বলছে, যেসব ভাষা বিপদোন্মুখ, তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে এবং তত্ত্বগতভাবে মাতৃভাষাই শিক্ষাদানের উপযুক্ত মাধ্যম ইত্যাদি। এ সত্ত্বেও মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যাপার অনেক জায়গাতেই পিছিয়ে আছে। আমাদের দেশে নয়, অনেক দেশেই। আমাদের দেশে ধরাে, আজকে আমাদের নৃতাত্ত্বিক জাতিগােষ্ঠীরা বলছে, তাদের ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হােক, তত্ত্বগতভাবে আমিও এটি সমর্থন করি। কিন্তু আমি জানি না, এটি বাস্তবায়িত হতে কত দেরি হবে। আমরা বাংলাতেই পারছি না, এত লােকবল থাকা সত্ত্বেও! সেখানে তারা কী করে করবে? আরও অনেক সময় লাগবে। এই সমস্যাটা পৃথিবীর সব ভাষার জন্যই সত্যি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের কাজটা কিন্তু বাংলায় বইপত্র রচনা করা কিংবা প্রকাশ করা নয়। এখনাে এই ইনস্টিটিউটের আইনটা প্রণীত হয় নি। হলে আমরা বুঝতে পারতাম যে কী করা হচ্ছে। দ্যাখাে, যখন ইনস্টিটিউট হলাে, তারপর সরকার বদল হয়ে গেল, পাঁচ বছর অন্তত এই ইনস্টিটিউটের খবরও কেউ নিলেন না। মানে আওয়ামী লীগের আমলে এটি হয়েছে, অতএব বিএনপির আমলে কাজ বন্ধ থাকল। তারপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আবার চেষ্টা করা হলাে এটিকে জাগিয়ে তােলার, বর্তমান সরকার এসে আবার কাজ শুরু করছে। কিন্তু এখনাে আইন প্রণীত হয় নি, এখনাে লােকবল পূরণ করা হয় নি। অতএব সময় লাগবে। এদিকে এই সরকার তাে তৃতীয় বছরে পা দিয়েছে। আমার ধারণা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট যেটা করবে, তা হলাে আমাদের দেশে অপরাপর ভাষা যেগুলাে আছে, বাংলার বাইরের ভাষা, তা সংগ্রহ করা, সংরক্ষণ করা, অবলুপ্তির হাত থেকে তাকে বাঁচাবার ব্যবস্থা করা। তা ছাড়া পৃথিবীর সব ভাষা সম্পর্কেই তথ্য সংগ্রহ করা, খোঁজখবর নেওয়া ইত্যাদি। এরা যে বাংলায় পাঠ্যবই তৈরির কাজ করবে, এটি আমি দেখতে পাই না। এই কাজটি বাংলা একাডেমিকেই নিতে হবে। এক সময় কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বাের্ড বাংলা পাঠ্যবইয়ের দায়িত্বটা নিয়েছিল। কিন্তু তাদের প্রকাশনাটা দ্যাখাে, তারা যত সাহিত্যের কাজ করেছে, সে অনুযায়ী পাঠ্যবইয়ের কাজ করতে পারে নি। ওই একই কারণে পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নি বলে বাংলা পাঠ্যবই লেখার কাজ এগােয় নি। মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কী করবে, এখনাে আমাদের কাছে তা খুব পরিষ্কার নয়। আমরা আশা করি, এই যে আন্তর্জাতিক অংশটি আছে, এটি তারা বজায় রাখবেন। বাংলা ভাষা ও অন্যান্য ভাষা সংরক্ষণ এবং রক্ষার জন্য চেষ্টা করবেন।


যে দেশে সাক্ষরতার হার বেশি, শিক্ষিতের হার বেশি, সেই দেশে প্রমিত ভাষা অনেক বেশি গৃহীত হয়।


সােহেল হাসান গালিব

আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে ৪০ বছর। তাে, সুস্পষ্ট ভাষা-পরিকল্পনা, যেটা রাষ্ট্রের প্রণয়ন করার কথা, আমরা কি এখন পর্যন্ত কোনাে ভাষা-পরিকল্পনার মুখােমুখি হতে পেরেছি?

আনিসুজ্জামান

না। আমরা ভাষা-পরিকল্পনা করতে পারি নি। ভাষানীতিও তৈরি করতে পারি নি। ভাষানীতি আগে তৈরি হওয়া দরকার, তারপর ভাষা-পরিকল্পনা। ভাষানীতি রাষ্ট্রকে ঠিক করতে হবে। যেমন ধরাে যদি বলি আমরা বাংলায় সব করব, বাংলা হবে শিক্ষার বাহন। তারপর, কোন পর্যায় পর্যন্ত হবে? দ্বিতীয় ভাষা কী হবে? যদি ইংরেজি হয়, তা কথাটা স্পষ্ট করে বলতে হবে। একবার আরবি, একবার ইংরেজি এভাবে বলা যাবে না। স্থির করে নিতে হবে, এই। আরবি যদি শিখতে হয়, তাহলে ঠিক করতে হবে, কেন শিখব, কোন পর্যায় পর্যন্ত শিখব। এগুলাে নীতির মধ্যে আসবে। আর এই নীতিগুলাে বাস্তবায়ন করার জন্য যে পদক্ষেপগুলাে নিতে হবে, সেটা ভাষা-পরিকল্পনা। যেমন ধরাে, প্রতিবছরই আমরা বার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করছি, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করছি। এখানে কতগুলাে পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করার জন্য কাজ করা হচ্ছে। ওইটা হচ্ছে পরিকল্পনা আর লক্ষ্যটা হচ্ছে ভাষানীতি প্রণয়নের কাজ।

সােহেল হাসান গালিব

সে ক্ষেত্রে আমরা দুটি সমস্যার মুখােমুখি হই। এক, বাংলাদেশকে চূড়ান্তভাবে একভাষী দেশ বলে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। দুই, বাংলায় প্রমিত ও মৌখিক ভাষার পার্থক্য অনেক বেশি। এটা নিয়ে বিতর্ক আজকের নয়, প্রায় দেড়শ বছরের। আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে মান ভাষার বিতর্ক বা বিরোধের জায়গাটা আমরা কিভাবে নিম্পন্ন করব?

আনিসুজ্জামান

১৯৭১-এ আমরা মনে করেছিলাম, আমরা এক ভাষাভাষী দেশ। কিন্তু পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি যে আমরা বহু ভাষাভাষীর দেশ, বহু সংস্কৃতির দেশ। কাজেই এখানে একটা কাজ হবে এই বহু ভাষাকে জায়গামতাে বসানাের কাজটা করা। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে যে সমস্যার কথা তােমরা বলছো, সেটা অনেক পুরােনাে সমস্যা। কিন্তু এটা যে বাংলা ভাষার নিজস্ব সমস্যা তা নয়, বহু দেশেই এই আঞ্চলিক ভাষা এবং মান ভাষার সমস্যা আছে। ইংরেজিতেও আছে। এখন যে দেশে সাক্ষরতার হার বেশি, শিক্ষিতের হার বেশি, সেই দেশে প্রমিত ভাষা অনেক বেশি গৃহীত হয়। ফলে এই বৈষ্যমাটা সেখানে এতটা প্রকট নয়। কিন্তু আমাদের দেশ এখনাে শিক্ষার ক্ষেত্রে, সাক্ষরতার ক্ষেত্রে, অনেক পিছিয়ে। সুতরাং আমাদের কাছে এই আঞ্চলিক ভাষা আর প্রমিত ভাষার পার্থক্যটা অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়। আঞ্চলিক ভাষা সব সময়ে থাকবে। প্রমিত ভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও আঞ্চলিক ভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে না। আমরা যেমন বাড়িতে কেউ দেখা করতে এলে শয়নকক্ষের পােশাক ছেড়ে গায়ে কিছু একটা দিয়ে বের হই, রাস্তায় গেলে আরেকটু সজ্জিত হই, অন্য কোথাও যেতে হলে আরেকটু পরিবর্তন করি, প্রমিত ভাষা এ রকম। আমি যখন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলি, তখন হয়তাে কিছুটা ছাড় দিই আমার আঞ্চলিক ভাষাকে, আরেকটু বৃহৎ ক্ষেত্রে গেলে আর সেটা করি না। কাজেই, প্রমিত ভাষার যে আবশ্যকতা এবং এর যে ব্যবহার, তারও কোনাে বিকল্প নেই। আমরা যেন এই দুটোকে পরস্পরবিরােধী মনে না করি। আমাদের বুঝতে হবে যে ভাষার প্রধান কাজ সংযােগ ঘটানাে, নিজেকে প্রকাশ করা,  আরেকজনের কাছে নিজেকে তুলে ধরা, তার কথাটা বােঝা। এটা করতে হলে প্রমিত ভাষা লাগবেই। আজকে সিলেট বা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় যদি কেউ কথা বলে, আমি হয়তাে তার অনেকখানিই বুঝতে পারব না। কিন্তু আমি এ কথা বলতে পারব না যে এ ভাষা বাংলাদেশের ভাষা নয়। সেই সঙ্গে আমি এটাও বলব, আমাদের যে প্রমিত ভাষা, যা দিয়ে আমরা তিনজনেই কথা বলতে পারি, তা ব্যবহার করলে আদান-প্রদানের সুবিধা হয়। এটা আমাদের করতে হবে। এখন কিছুকাল ধরে আমাদের বন্ধুদের কেউ কেউ বলছেন যে বাংলায় প্রমিত ভাষা বলে আমরা যা ব্যবহার করি তা আসলে প্রায় একশ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় ভাষাকে ভিত্তি করে গড়ে তােলা হয়েছিল।


এই যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বললেন, ৩০ লাখ লােক মারা গেল, অথচ জাতীয় সংগীত লেখার মতাে একটা লােকও পাওয়া গেল না—এসব একই কথা আসলে।


সােহেল হাসান গালিব

আমরা যে মানভাষা ব্যবহার করছি, তা কি আদৌ আমাদের মানভাষা? মৌখিক ভাষার সঙ্গে দূরত্ব কমাতে নতুন করে মানভাষা নির্ণয়ের প্রয়ােজন হয়ে পড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। রবীন্দ্রনাথের বরাতে তারা বলে থাকেন, মৌখিক ভাষার ব্যাকরণই হবে খাঁটি বাংলা ব্যাকরণ।

আনিসুজ্জামান

এ কথা কেউ কেউ বলছেন। তাহলে তােমাকে স্বীকার করে নিতে হবে, যেহেতু বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, এটাকে কেন্দ্র করে একটা ভাষা, আর পশ্চিমবঙ্গে কলকাতা কেন্দ্রিক আরেকটা ভাষা। বাংলা ভাষাকে দুই ভাগ করে ফেলছি, যেন এটা এক ভাষা নয়। তা যদি করো, তাহলে কিন্তু পরিস্থিতি অন্য রকম দাঁড়াবে। তখন রবীন্দ্রনাথকে আমাদের স্তম্ভ বলা যাবে না, বলতে হবে ওদের স্তম্ভ। পাশে যে দেশটা আছে ওই দেশের। এটিই হচ্ছে সমস্যা। রবীন্দ্রনাথের উদাহরণটা দিলে, তার সঙ্গে তিনি এ কথাও বলেছেন, কলকাতার অনেক আঞ্চলিক উচ্চারণ আছে, অশিষ্ট উচ্চারণ। সেটা তিনি গ্রহণ করেন নি। ‘ল’-কে ‘ন’ বলার যে প্রবণতা কলকাতায় আছে, লেবুকে নেবু, লুচিকে নুচি—এসব কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নেন নি। এটা কলকাতার ভাষা। কাজেই রবীন্দ্রনাথ এবং প্রমথ চৌধুরী প্রমিত ভাষার ভিতটা যখন তৈরি করছিলেন, তখন তারাও যে জায়গার ভাষাকে আদর্শ বলছেন, সে জায়গার ভাষার সব বৈশিষ্ট্যও নেন নি। প্রমথ চৌধুরীর প্রবল আপত্তি ছিল ছিলুম-করলুম নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ নিজে ব্যবহার করেছেন ছিলুম-করলুম। তর্ক সব সময়ে থেকে যাবে। আসলে কোথায় তুমি সীমারেখাটা টানবে? যদি বাংলা ভাষার ঐক্যের কথাটা ভুলে যাই, তাহলে কিন্তু পাকিস্তান আমলের ফাঁদে আবার পড়ব—আমাদের এই ভূখণ্ডে যে ভাষা এটিই আমাদের, এর বাইরে যেটা সেটি আমাদের নয়। তখন তুমি বাংলা ভাষাকে দ্বিখণ্ডিত করবে, বাংলা সাহিত্যকে করবে এবং বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকেও করবে। এই বিপদটা থাকবে। এখন ব্যাকরণ প্রসঙ্গে বলি। একটা হচ্ছে যে, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ—সেটা সংস্কৃত বা ইংরেজির আদলে হয়েছে, বাংলায় হয় নি। গত দেড়শ বছর ধরে কথাটা হচ্ছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই অর্থে বাংলা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ লেখা হয়ে ওঠে নি। এখন বাংলা একাডেমি এবং পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি মিলে একটা চেষ্টা করছে, দেখা যাক কী হয়। এই ব্যাকরণও প্রমিত বাংলার ব্যাকরণ, আঞ্চলিক ভাষার ব্যাকরণ নয়। যে সমস্ত ব্যাকরণ সাধারণভাবে পাঠ্য হয়, সেগুলাে প্রমিত ভাষার ভিত্তিতেই হয়—আমি যত দূর জানি। আঞ্চলিক ভাষার ব্যাকরণ নিশ্চয় লেখা যেতে পারে, চট্টগ্রামী বাংলার ব্যাকরণ লিখতে পারাে, সিলেটি ব্যাকরণ লিখতে পারাে, নােয়াখালী ভাষার ব্যাকরণ লিখতে পারাে, রংপুরের ভাষায় লিখতে পারাে। এগুলাে মােটেও প্রমিত ভাষার ব্যাকরণ হবে না। প্রত্যেকটাই হবে ওই আঞ্চলিক ভাষার ব্যাকরণ। তারও আঞ্চলিক প্রয়ােজন আছে, আমরা উপেক্ষা করতে চাই না, তাকে জানতে চাই। কিন্তু এই ব্যাকরণ লেখার উদ্দেশ্য হবে এটাকে বর্ণনা করা। প্রমিত ভাষার ব্যাকরণের বিকল্প হিশেবে ব্যবহৃত হওয়া নয়। তুমি বলছ, এত বড় একটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটা স্বাধীন দেশ হলাে, আমরা কি নিজস্ব কিছু করব না? এই যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বললেন, ৩০ লাখ লােক মারা গেল, অথচ জাতীয় সংগীত লেখার মতাে একটা লােকও পাওয়া গেল না—এসব একই কথা আসলে। কেননা যতক্ষণ বাংলাকে একটা ভাষা হিশেবে গণ্য না করছি, ততক্ষণ এই প্রশ্নটা মনের মধ্যে বারবার আসবে। আমরা যদি বাংলা ভাষাকে এক ভাষা বলে স্বীকার করি, তখন এই বৈচিত্র্যের কথা বলব। আমি বলব যে আমাদের ভাষার কিছু উপাদান আমরা ব্যবহার করব। আমি একটা উদাহরণ দিই : হুমায়ুন কবির চলতি রীতিতে লিখতেন, কিন্তু তিনি ‘নাই’ লিখেছেন, ‘নেই’ লেখেন নি। এটা স্পষ্টই তার পূর্ববঙ্গীয় উত্তরাধিকার থেকে এসেছে। এখন আমরা যদি সবাই মিলে স্থির করি যে আমরা পূর্ববঙ্গীয় উত্তরাধিকার হিশেবে এটা প্রমিত বাংলায় রাখব এবং আমরা বলব বাংলাদেশে এটা আমরা ব্যবহার করি, তাহলে তা-ই হবে। রবীন্দ্রনাথের কথা বারবার বলা হচ্ছে। আমিও বলছি। রবীন্দ্রনাথের খুবই আপত্তি ছিল ‘সাথে’, ‘হতে’ এগুলাে গদ্যে ব্যবহার করা নিয়ে। তিনি মনে করতেন, এগুলাে একেবারেই কবিতার শব্দ, গদ্যে চলবে না। কিন্তু আমরা পূর্ববঙ্গে সব সময়ে ‘সাথে’ বলে এসেছি। এখন রবীন্দ্রনাথের দোহাই দিয়ে আমরা কি এটা বাদ দেব না রাখব? রবীন্দ্রনাথের দোহাই দেওয়া মানে রবীন্দ্রনাথের যুক্তিটা মানব কি না? আমরা পদ্য-গদ্যের ভাষার মধ্যে পার্থক্য করব কি না? করলে এই জায়গায় করব কি না? এ রকম অসংখ্য প্রশ্ন আছে। আমি জানি না কী হবে। কিন্তু একটা কথা আমার মনে হয় যে, বাংলা ভাষার সাধারণ লক্ষণগুলাে ধরে একটা ব্যাকরণ হওয়া উচিত। আর এটা যদি একবার করা যায়, তাহলে নিশ্চয় চেষ্টা করতে হবে আঞ্চলিক বাংলার ব্যাকরণ রচনার। দ্যাখাে, কত পরিশ্রম করে আঞ্চলিক ভাষার অভিধান করা হলাে, এখন পশ্চিমবঙ্গও এই কাজ করছে। কিন্তু শহীদুল্লাহ যা করেছেন, সেটার মর্যাদা অনেক বড় রকমের। তার পরও অনেক শব্দ এই জরিপের বাইরে রয়ে গেছে, এগুলাে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। ওঁর কাজটা ছিল ৫০ বছর আগের। এই ৫০ বছরে আঞ্চলিক শব্দেরও হয়তাে অনেক বৃদ্ধি হয়েছে, বদল হয়েছে। এগুলাে আমাদের দরকার। একটা চেষ্টা থাকতে হবে। এটা হয়তাে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট করতেও পারে। একেবারে নিয়মিত ভাষা সম্পর্কে জরিপ চালানাে। শব্দভাণ্ডার, রূপগত বৈশিষ্ট্য, উচ্চারণগত পরিবর্তন—এসবের একটা নিয়মিত জরিপ করা দরকার হবে।


আলাপ আরও দীর্ঘ ছিল। সেসব বাদ দেয়া হয়েছিল পত্রিকার পাতায় স্থান-সংকুলানের কথা ভেবে। বাদ-দেয়া অংশটি আজ আর কোথাও নাই।
সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহযোগী অধ্যাপক ও প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ, নায়েম, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন [সমুত্থান ২০০৭]
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে [শুদ্ধস্বর ২০০৯]
রক্তমেমোরেন্ডাম [ভাষাচিত্র ২০১১]
অনঙ্গ রূপের দেশে [আড়িয়াল, ২০১৪]
তিমিরে তারানা [অগ্রদূত ২০১৭]

প্রবন্ধ—
বাদ-মাগরিব (ভাষা-রাজনীতির গোপন পাঠ) [অগ্রদূত ২০১৮]

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) [বাঙলায়ন ২০০৮]
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) [শুদ্ধস্বর ২০০৮]

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব