হোম গদ্য জেহাদি নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী

জেহাদি নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী

জেহাদি নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী
124
0

বুলবুল চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৪৫ সালে। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের কেন্দ্রীয় শাখার নৃত্যানুষ্ঠান ‘ভারতের মর্মবাণী’ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বুলবুল চৌধুরী গণনাট্য সঙ্ঘের কলকাতা শাখার নৃত্যবিভাগের গোড়াপত্তন করেন। নৃত্যশিক্ষার্থী হিসাবে শম্ভু ভট্টাচার্য, চিত্ত হোড়, সুশীল মুখার্জী, অজিত সান্যাল, মাধবী রায়, বেবি দত্ত প্রমুখ অনেকেই হাজির হন। কলকাতা কেন্দ্রের নৃত্যবিভাগের দায়িত্বে ছিলেন সুধী প্রধান, জ্ঞান মজুমদার প্রমুখ অনেক শিল্পী। লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন উপদেষ্টা। বুলবুল চৌধুরীর পরিচালনায় ‘এই আমার দেশ’ মঞ্চস্থ হয় মিনার্ভা থিয়েটারে। সংগীত পরিচালক তিমির বরণ, ধারাভাষ্য পাঠ করেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানসূচীতে ছিল ৪৩-এর মন্বন্তর নিয়ে রচিত ‘পাছে আমরা ভুলে যাই’, ‘বন্দিনী ভারত’, ‘বীতংশ’, ‘মহাবুভুক্ষ’ প্রভৃতি নৃত্যনাট্য।


যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে বুলবুল জেহাদ ঘোষণা করেন। নাচের বদলে হাতে তুলে নিলেন কাগজ কলম। 


নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর শিল্প প্রতিভার আসল প্রকাশ বোধহয় গণনাট্য সঙ্ঘের মঞ্চ থেকেই। বলা যেতে পারে সেটা হলো বাস্তববাদের পথ, মানুষের জন্য শিল্প সৃষ্টির প্রেরণা। শিল্পের জন্য শিল্প সৃষ্টির প্রবক্তা বুলবুল চৌধুরী যে এ পথেই আসতেন তা বোধহয় অনিবার্যই ছিল। সেজন্য বুলবুল চৌধুরীর প্রথম জীবনের দিকে নজর দেওয়া যাক।

১৯১৯ সালের ১ জানুয়ারি বিত্তশালী পরিবারে দেবশিশুর রূপ নিয়ে জন্ম হলো টুনু মিঞার। ১৯৩৪ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষার পর টুনু মিঞা এক বিচিত্রানুষ্ঠানে স্বরচিত ‘চাতক’ নৃত্য প্রদর্শন করে গুণীজনের অজস্র অভিনন্দন আর উৎসাহের মাধ্যমে পেল শিল্পীর সম্মান আর এই নাচের জন্যই গোঁড়া রক্ষণশীল আত্মীয়রা আর গ্রাম্য সমাজের মুরুব্বিরা হলেন খড়্‌গহস্ত। টুনু মিঞার এই বেশরিয়তি কাজের জন্য তার পরিবারকে শাস্তি দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর টুনু মিঞা সচেতনভাবে জেহাদ ঘোষণা করে নাচের চর্চা শুরু করল এবং নাচ সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করে দিল।

প্রবেশিকা পরীক্ষার পর অখণ্ড অবসর। চট্টগ্রামের সীমান্তে পাহাড় জঙ্গল ঘেরা নিজ গ্রাম চুনতীর উদার প্রসন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশ রোমান্টিক সুপুরুষ টুনু মিঞাকে নৃত্যশিল্পী হবার প্রেরণা দিল, নাকি মুরুব্বিদের অবিবেকি সমালোচনা জেদি টুনু মিঞাকে নৃত্য চর্চা করার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল সে কথা জানা যায় নি কিন্তু অনুমান করা যায়। যা ছিল মনের গভীরে তরল অবস্থায় সুপ্ত, হুমকি আর সমালোচনার আগুনে তেতে তা লড়াই-এর হাতিয়ারের নিশানা ছিল।

1
‘আনারকলি’ নৃত্যনাট্যে সেলিমের চরিত্রে বুলবুল চৌধুরী।

কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তির সঙ্গে সঙ্গে টুনু মিঞা ওরফে রশিদ আহমদ চৌধুরীর নতুন পরিচয় হলো বুলবুল চৌধুরী। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সুপুরুষ মুসলিম যুবক ছাত্রদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বকল্পিত নৃত্য প্রদর্শন করে অল্পদিনের মধ্যে অ্যামেচার নৃত্যশিল্পী হিসেবে সুধীজনের বিস্ময়দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ছাত্রাবস্থাতেই বুলবুল সাধনা বসুর নৃত্যসঙ্গীরূপে ‘রাসলীলা’ নৃত্যে তার বিস্ময়কর প্রতিভার পরিচয় দেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ধাপ পার হয়ে আসেন বেশ সাফল্যের সঙ্গে, কিন্তু তৎকালীন শিক্ষিত ছেলেদের শতকরা ৯৯ জন যা করতেন, তা করতে তার মন ওঠে নি। মন তার যায় নৃত্যশিল্পের দিকে। এরপর স্বাধীনভাবে তিনি দুটি শিল্পীচক্র গঠন করেন—ওরিয়েন্টাল ফাইন আর্টস এসোসিয়েশন এবং ক্যালকাটা কালচার সেন্টার। কমলেশকুমারী, প্রতিমা দাসগুপ্তা, মণিকা দেশাই প্রমুখ খ্যাতনাম্নী অনেক নৃত্যশিল্পী তার কেন্দ্রগুলিতে যোগ দেন। ১৯৪২ সালের মধ্যে সংস্কৃতির চারণকেন্দ্রে নৃত্যশিল্পী হিসাবে বুলবুল চৌধুরীর আসন স্থায়ী হয়েছে। শিল্পী মিহিরকরণ, তিমিরবরণ, জ্ঞান মজুমদার, সাধন বসু প্রমুখের সহযোগিতায় বুলবুল চৌধুরী প্রচুর নৃত্য রচনা করেন তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য রোমান্টিক নাচ—সূর্য্যনৃত্য, অভিমন্যু, রাসলীলা, ইন্দ্রসভা, সুর্ষন্বা, কবি ও বসন্ত, মরু সংগীত, সোহরাব ও রুস্তম, হারেম নর্তকী, হাফিজের স্বপ্ন, ইরানের পান্থশালাসহ প্রায় ষাটটি নাট কম্পোজ করেন। এ বুলবুল রোমান্টিক, এ বুলবুল শিল্পের জন্য শিল্পতত্ত্বে বিশ্বাসী। ১৯৪২ থেকে ভারত জুড়ে বৃটিশবিরোধী অগ্নিস্রোত, যুদ্ধ, জাপানি বোমা, দুর্ভিক্ষের সর্বগ্রাসী থাবা আর লক্ষ লক্ষ মানুষের মরণ, মহামারী রোমান্টিক বুলবুলকে তার চিন্তার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ছিল।

যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে বুলবুল জেহাদ ঘোষণা করেন। নাচের বদলে হাতে তুলে নিলেন কাগজ কলম। ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘের সদস্য হয়ে বুলবুল লেখায় মন দিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের সমস্যা নিয়ে উপন্যাস লিখলেন, পরিচয় পত্রিকা গোষ্ঠীর সদস্য হয়ে গল্প, কবিতা লিখে নিজের রোমান্টিকতা, শিল্পের জন্য শিল্প সৃষ্টির তত্ত্বের বিরুদ্ধে নতুন করে জেহাদ ঘোষণা করে ‘জনগণের জন্য শিল্প সৃষ্টির প্রতিজ্ঞা নিয়ে নতুন নৃত্য রচনা করতে লাগলেন। বিষয়বস্তু হলো যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কার। বুলবুলের নতুন ভাবনা চিন্তার ফলশ্রুতি হলো ১৯৪৫ সালে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘে যোগদান এবং কলকাতা শাখায় নৃত্যবিভাগের গোড়াপত্তন করা।

১৯৪৫-এর পর বুলবুল কয়েকটা নতুন নৃত্য রচনা করেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘পাছে আমরা ভুলে যাই’, ‘কুইট ইন্ডিয়া’, ‘মহা বুভুক্ষা’, ‘বিতংস’, ‘এই আমার দেশ’ বুলবুল নতুন বিষয়বস্তু নিয়ে নৃত্য রচনার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

১৯৪৬ সালের দাঙ্গা আর দেশ ভাগ শিল্পী বুলবুলের মনে এমন একটা নতুন দায়িত্ববোধ আর লড়াকু চেতনার সৃষ্টি করে যা থেকে তিনি স্থায়ীভাবে একটি নৃত্য সম্প্রদায় গড়তে মনস্থ করেন। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে পাকিস্তানের শিল্প সংস্কৃতির প্রসারের জন্য নিজের শিল্প প্রতিভাকে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

১৯৪৮ সালে বুলবুল মুঠি পাকিয়ে শক্ত পায়ে ময়দানে নামলেন নতুন রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভাবনার জরাগ্রস্ত বন্ধ দরজা ভেঙে নবজীবনের আগমন সংবাদ পৌঁছে দিতে হবে পুব থেকে পশ্চিমে। বিদ্রোহী শিল্পবিশ্বাসের দায় স্বীকার করে বুলবুলকে কতখানি ত্যাগ, কতখানি সংগ্রাম, কতখানি দৃঢ় প্রত্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তার বিবরণ দেবার সুযোগ বুলবুল পান নি তার অকাল মৃত্যুর জন্য। বুলবুল জানতেন ধর্মান্ধতা আর মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হবে কঠিন আর দীর্ঘস্থায়ী। পাকিস্তানের শিল্প প্রতিনিধি বুলবুল নিজের শিষ্য এবং পেশাদার শিল্পী নিয়ে নিজস্ব দল গঠন করলেন। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সব শ্রেণির শিল্পীদের এক অপূর্ব সমন্বয়। উনি বলতেন নাচ সৃষ্টি করা, বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠান করা তার মিশনের এক দিক আর মিশনের অন্য দিক হচ্ছে ঢাকায় ‘একাডেমি অব ফাইন আর্টস’ গড়ে তোলা।

১৯৫০ সালে চট্টগ্রামের শিল্পমেলার মঞ্চ থেকে বুলবুলের মিশনের সূত্রপাত হলো। হঠাৎ বিস্ফোরণের আলোর ঝলকানিতে বিরোধীরা হয়তো হতচকিত। ঢাকা, ময়মনসিংহ শহরে উৎসব শুরু হলো বুলবুলের নৃত্যানুষ্ঠান নিয়ে। উৎসাহিত বুলবুল পশ্চিম পাকিস্তান সফরের দিন ঘোষণা করে দিলেন।


বুলবুল ইমাম সাহেবকে প্রকাশ্য তর্কযুদ্ধে আহ্বান করলেন। 


১৯৫০ সালের আগস্ট মাসে তার মিশন অর্থাৎ ফাইন আর্টস একাডেমি প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাকিস্তান সফরের পরিকল্পনা করেন বুলবুল।

করাচিতে অনুষ্ঠান দর্শকের অকুণ্ঠ সমর্থন ও প্রশংসা পায়। সরকারের পক্ষ থেকে বুলবুল চৌধুরীকে জাতীয় নৃত্যাশিল্পীর সম্মান ঘোষণা করা হয়।

2
১৯৫৩ সালে হলান্ডের রাজধানী আমস্টারডামে নৃত্যদলের ম্যানেজার অ্যালেক্স মুলার (মাঝে) ও যন্ত্রশিল্পী জ্ঞান মজুমদারের সাথে বুলবুল চৌধুরী (বায়ে)।

লাহোরে অনুষ্ঠানের সময় বুলবুল বিরোধীদের আভাস পেলেন। সুভেনিরে অনুষ্ঠান পরিচিতি ইংরেজি আর বাংলায়। দাবি করা হলো উর্দু ভাষায় সুভেনির চাই। বাঙালি শিল্পী বুলবুল সুভেনিরে উর্দু ব্যবহারের বিরোধিতা করলেন। শেষ পর্যন্ত লাহোর রেডিও স্টেশনের একজন ঘোষক মঞ্চে উপস্থিত থেকে উর্দু তর্জমায় অনুষ্ঠান পরিচিতি ঘোষণা করলেন। বুলবুলের অনুষ্ঠান বিপুল সমর্থন পেলেও লাহোর থেকেই শুরু হলো নাচের সমালোচনার মাধ্যম ধর্মান্ধদের বিরোধিতা। আমৃত্যু এই বিরোধীতার বিরুদ্ধে লড়াই করেই বুলবুল তার মিশনকে সফল করার জন্য নৃত্যানুষ্ঠান চালিয়ে গেছেন। ‘হিন্দু কালচার’, পোশাক আর নৃত্য ভঙ্গিতে ‘হিন্দু প্রভাব’, মেয়েদের প্রকাশ্যে নাচ ইসলাম বিরোধী ইত্যাদি সমালোচনার গুঞ্জন বিশ্লেষণ করে বুলবুল যখন জবাব দেবার জন্য তৈরি হচ্ছে তখনই জামে মসজিদের মহামান্য ইমাম সাহেব বকলমে বুলবুলের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করলেন। বুলবুল ইমাম সাহেবকে প্রকাশ্য তর্কযুদ্ধে আহ্বান করলেন। নাচ গান যে শরিয়তবিরোধী নয় তর্কযুদ্ধে সেটা প্রমাণ করতে না পারলে বুলবুল ধর্মান্তর হবেন, আর প্রমাণ করতে পারলে ইমাম সাহেবকে গদি ছাড়তে হবে এটাই ছিল বুলবুলের শর্ত। শেষ পর্যন্ত তর্কযুদ্ধ কেন স্থগিত হয়ে গেল, কেন ‘ফতোয়া’ প্রত্যাহার করা হলো সে খবর কেউ জানে না। এই সময়ে পাক-ভারত আলোচনা প্রসঙ্গে পণ্ডিত জওহরলাল নেহ্‌রু লাহোরে লিয়াকত আলি খানের আমন্ত্রণে বুলবুলের নৃত্যানুষ্ঠান দেখে বলেছিলেন “… একমাত্র বুলবুলকেই দেখলাম যে হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতিকে পাশাপাশি রূপ দিয়েছে। ‘কৃষ্ণের ননী চুরি’, ‘হোলি’, ‘কবি হাফিজের স্বপ্ন’, ‘ইরানের পান্থশালা’, ‘সোহরাব রুস্তম’ ইত্যাদি তার প্রশংসনীয় উদাহরণ। এই অনুষ্ঠান প্রাঙ্গনেই লিয়াকত আলি খান বুলবুলকে পাকিস্তানের কালচারাল এম্বাসেডার হিসেবে বিদেশ সফরের ব্যবস্থা করার সুপারিশ ঘোষণা করেন।

১৯৫১ সালে বুলবুল ময়মনসিংহ শহরে রাজবাড়ির দেওয়ান হয়ে সদলবলে “শশী লজ”-এ আস্তানা গাড়লেন। এই রাজবাড়ির এক অংশের মালিক তার নিজের অংশ বুলবুলকে ‘ফাইন আর্টস একাডেমির জন্য দান করতে সম্মত হলেন।

একাডেমির জন্য টাকা চাই। দীর্ঘ সময় মহড়া দিয়ে বুলবুল পূর্ব পাকিস্তান সফরের জন্য যখন তৈরি তখন প্রথম অভ্যর্থনা জানাল স্থানীয় হেজবুল্লাহ পার্টি। টাইপ করা চিঠিতে হুমকি এল সাত দিনের মধ্যে মেয়েদের নাচ গান বন্ধ করে ‘শশী লজ’ খালি করে না দিলে গুলি করে বুলবুলকে হত্যা করা হবে। সঙ্গে সঙ্গে বুলবুলও সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকার বদলে ময়মনসিংহ শহরকেই সফরের শুভারম্ভ হবে এবং সেই মতো ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়ে গেল বুলবুলের জেহাদি অভিযান।

কুষ্টিয়া সফরে খরব এল ফরিদপুর শহর অগ্নিগর্ভ। মোল্লা মৌলবাদীদের বড় একটা দল বেশরিয়তি নাচ গান বন্ধ করার দাবিতে নিয়মিত মিটিং মিছিল করছেন। বুলবুল জেনে নিলেন ফরিদপুরের জেলা শাসক অনুষ্ঠানের অনুমতি প্রত্যাহার করেন নি, তবে ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার ব্যাপারে তিনি উদ্বিগ্ন। বুলবুল জানিয়ে দিলেন বাহিনী পায়ে হেঁটে গন্তব্যস্থানে যাবে। সেই মিছিলের প্রথমে থাকবে শিশুকন্যা নার্গিস, বেগম আফরোজা আর বুলবুল নিজে। অনুষ্ঠান উদ্বোধনের দিন মেয়েদের মঞ্চে যাওয়া আটকানোর জন্য স্বেচ্ছাসেবকরা চোখ বন্ধ করে গেটের সামনে শুয়ে ব্যারিকেড রচনা করলেন। তারা জানতেও পারছেন না কোন কৌশলে মেয়েরা হাঁটু পর্যন্ত শাড়ি তুলে ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে পিকেটারদের টপকে টপকে হলের মধ্যে ঢুকে গেল। যথাসময়ে অনুষ্ঠানও শুরু হলো।

মুন্সীগঞ্জ নাকি উলেমাদের মুক্ত এলাকা। অনুষ্ঠান মঞ্চের পাশের এক মসজিদ থেকে নামাজের সময়টুকু বাদ দিয়ে মাইকে অবিরাম প্রচার চলে মেয়েদের বেআব্রু করে দর্শকের সামনে হাজির করা বেশরিয়তি কাজ। এরকম কাজের ফল খারাপ হবে। নির্ধারিত অনুষ্ঠান শেষে একই মঞ্চে আরো দুদিন কম দর্শনি মূল্যে অনুষ্ঠান করে জেহাদ ঘোষণা বুলবুলের।

সিরাজগঞ্জে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর আমন্ত্রণে অনুষ্ঠানে চুক্তিবদ্ধ বুলবুল প্রতারণার আঁচ পেয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করে উদ্যোক্তাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শিল্পীবাহিনী নিয়ে ফিরে আসেন। দর্শকদের বিক্ষোভে উদ্যোক্তারা পলাতক, হলের চেয়ারের বহ্ন্যুৎসব আর মঞ্চের পর্দা, বাল্ব, মাইক সব উধাও।

নীলফামারীতে সিনেমা হলে অনুষ্ঠানের আগে ইলেকট্রিক লাইন অচল হয়ে যায়। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চেষ্টায় মোটরের হেড লাইট আর ব্যাটারি এনে বুলবুলের অনুষ্ঠানের চালু থাকে। অনুসন্ধানে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পেয়ে অপারেটারকে গ্রেফতার করা হয়।

বুলবুলের জন্মস্থান বগুড়াতে অনুষ্ঠানের আগে জানা গেল গোপন উলেমা কনফারেন্সে বুলবুল বাহিনীর এক মহিলা শিল্পীকে লোপাট করার ছক কষা হয়েছে। অবিচলিত বুলবুল স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে আলোচনা সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়েকটি নাচের বিষয়বস্তু  চরিত্র এবং আনুষঙ্গিক পোশাকের পরিবর্তন করে। স্থানীয় সংগঠকদের সহযোগিতায় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।

দীর্ঘ সফরের পরিশ্রম আর ক্যানসার রোগের যন্ত্রণা সত্ত্বেও বুলবুলের জেহাদ হয়তো অব্যাহত থাকত। কিন্তু তৎকালীন রাজনীতির জটিল বিষাক্ত ধোাঁয়ায় বুলবুলের চলার পথ আচ্ছন্ন হয়ে গেল। লিয়াকত আলি খানের হত্যা সংবাদে বুলবুলের বিদেশ সফর অনিশ্চিত হয়ে গেল। ওদিকে দামাল ছেলেদের বাঙলা ভাষার মান রক্ষার জন্য বুকের রক্ত ঢালার আন্দোলনে বুলবুলকে বিচলিত করল। নির্ধারিত সফর সেরে ‘শশী লজ’-এ ফিরে বুলবুল স্তম্ভিত। ‘একাডেমি অব ফাইন আর্টস অ্যান্ড মিউজিক’-এর তালাবন্ধ অংশের দখল নিয়েছে সরকার। বুলবুলের আশার প্রদীপ নিভিয়ে অন্ধকারে মোতায়েন রয়েছে পাঞ্জাবি  সেনা, হাতে রাইফেল।


ইউরোপে সাংস্কৃতিক ভাবনার ইশতেহার ছড়িয়ে দিলেন বুলবুল। ইউরোপ সাবাস দিল।


১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বুলবুলকে উত্তেজিত করল। বুলবুল আবার জেহাদ ঘোষণা করলেন। যে কোনো মূল্যে তিনি সাগর পাড়ি দেবেন। সরকারের তরফ থেকে নাচের জন্য আর্থিক বা নৈতিক, কোনোরকম সাহায্য পাওয়া যাবে না বলে কি বুলবুলের জেহাদ বন্ধ থাকতে পারে? বন্ধু বান্ধবের আর্থিক আর নৈতিক সাহায্যে বুলবুল লন্ডনে গিয়ে বিদেশ সফরের ব্যবস্থা পাকা করে ফিরে এসেই সেনাবাহিনীকে তলব করে কুচকাওয়াজ শুরু করে দিলেন।

3
২০১১ সালের ১ জানুয়ারি বুলবুল চৌধুরীর ৯২তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের নিকট থেকে সম্মাননা নেন অজিত সান্যাল। পাশে জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং লেখকের ছাত্রী বরেণ্য নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসান।

১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে ১৮ জন শিল্পী নিয়ে লন্ডনের পথে করাচি শহরে কয়েকটি অনুষ্ঠান করেন, শিল্প সংস্কৃতি আন্দোলনের ওপর ঐতিহাসিক এক বক্তৃতা দেন। নাচ গানের ব্যাপারে অর্থ সাহায্য করে প্রধানমন্ত্রী গদি হারাতে রাজি নয় জেনেও বুলবুল শেষ চেষ্টা করলেন। বিদেশ সফরে সরকারি স্বীকৃতি যদি পাওয়া যায়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী নাচগানের দলকে স্বীকৃতি দিতেও রাজি হলেন না। শেষ পর্যন্ত কিছু অকৃত্রিম বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীর উষ্ণ শুভেচ্ছা আর দোয়া মোনাজাত সম্বল করে জেহাদি ঝান্ডা নিয়ে বুলবুলের দিগ্বিজয় যাত্রা বাতানুকূল জাহাজ এমভি ভিক্টোরিয়াতে ২৯ শে মার্চ ১৯৫৩ সালে।

এপ্রিল মাসে লন্ডনে পৌঁছে অনুষ্ঠান শুরুর আগেই বুলবুল অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। ডাক্তারের অভিমত বুলবুলের মূত্রথলির ক্যানসার অপারেশন ছাড়া নিরাময়ের কোনো রাস্তা নেই। অপারেশনের পর নাচতে পারার কোনো গ্যারান্টি ডাক্তাররা দিতে না পারায় বুলবুর হাসপাতাল ছেড়ে এসে নির্ধারিত অনুষ্ঠান শুরু করে দিলেন। বুলবুলের নৃত্য সম্ভারে ছিল বৃটিশবিরোধী নৃত্যনাট্য ‘পাশে আমরা ভুলে যাই’, ‘তিন ভবঘুরে’ [ইরানের তেল নিয়ে বৃটিশ মার্কিন বিরোধ], ‘হোলি’, [ইংরেজ তাড়াও], ‘চাঁদ সুলতানা’, ‘হাফিজের স্বপ্ন’, ‘ইরানের পান্থশালা’, ‘আনারকলী’, ‘দুন্দর্ভির আহ্বান’,‘ সাপুড়ে’, ‘মৎস্য শিকারি’, ‘মুনলাইট সোনাটা’ ‘মালকোষ’ ইত্যাদি।

ইংল্যান্ড সফর শেষে বুলবুল আয়ারল্যান্ড সফর শেষ করেন লন্ডন ফিরে চুক্তি খেলাপের জন্য ইম্প্রেসারিওর বিরুদ্ধে মামলা, ইংরেজদের অত্যাচারের ঘটনা নিয়ে নাচের বিরূপ সমালোচনা, কমনওয়েলথ রিলেশন এ চিড় ধরায় পাকিস্তান হাইকমিশনারের অসহযোগিতা বুলবুলকে বিব্রত করলেও ইউরোপের অন্য দেশ থেকে বুলবুল অনুষ্ঠানের জন্য ইম্প্রেসারিওদের আমন্ত্রণ পেয়ে অসুস্থতা আগ্রাহ্য করে এগিয়ে এলেন।

নিঃস্ব বুলবুল হল্যান্ড পৌঁছালেন নতুন আশা নিয়ে। আমসটারডামের অনুষ্ঠান, বিশেষ করে ‘পাশে আমরা ভুলে যাই’ পশ্চিম ইউরোপে তুফান সৃষ্টি করেছে। ইংরেজদের অবিচার, অত্যাচার নিয়ে রচিত নৃত্যনাট্য বেলজিয়াম, ফ্রান্সেও বিপুলভাবে অভিনন্দিত হয়। ইউরোপে সাংস্কৃতিক ভাবনার ইশতেহার ছড়িয়ে দিলেন বুলবুল। ইউরোপ সাবাস দিল। বৃটেনের ‘ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান’, ‘নিউ স্টেটসম্যান অ্যান্ড নেশন’, থেকে শুরু করে বৃটেনের কমিউনিস্ট পত্রিকা ‘ডেলি ওর্য়াকার’, ফরাসি প্রগতিশীল পত্রিকা ‘লে লেতর ফ্রাঁসেজ’ বুলবুলের সৃজনশীল নৃত্যের যে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে তা হয়তো অনেকের কাছেই ঈর্ষার ব্যাপার।

বুলবুল বুঝতে পেরেছিলেন বাঁচার মেয়াদ কমে আসছে। তাই সফর সংক্ষিপ্ত করে আমেরিকা সফর সম্পর্কে কথাবার্তা পাকা করে দেশের পথে রওয়ানা দিলেন। ১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে দেশে ফিরে আসেন। আমেরিকা সফরের প্রাথমিক প্রস্তুতির অর্থ চাই। চট্টগ্রামে এবং ঢাকায় কয়েকটা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে বুলবুল কলকাতায় ফিরে এলেন সেনাবাহিনীকে দিয়ে কুচকাওয়াজ করানোর জন্য। কুচকাওয়াজ শুরুর আগেই বুলবুল শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। ১৯ এপ্রিল বুলবুলকে চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৭ মে শুক্রবার ভোরের আজানের কিছু পরে জেহাদি বুলবুল নিজের অজান্তে নিঃশব্দে আত্মসমর্পণ করলেন বিশ্বনিয়ন্তার পদতলে।

ইতিহাস বুলবুল সৃষ্টি করতে পারেন নি। তার স্বপ্ন একাডেমি, তার মিশন দুই বাংলা সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন অসমাপ্ত রেখে তাকে চলে যেতে হলেও তার অকৃত্রিম বন্ধু বান্ধব, অনুগত সহকর্মীদের চেষ্টায় ঢাকায় ‘বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস’ [বাফা] প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় পাঁচটি শাখায় কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী দেড় শ জন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে চারুকলার বিভিন্ন শাখায় শিক্ষা লাভ করছে।

[২০১০ সালে রচিত। রচনাটি লেখক সুব্রত কুমার দাসের সৌজন্যে প্রাপ্ত।]

অজিত সান্যাল

অজিত সান্যাল [জন্ম১৯২৬- মৃত্যু ১২ আগস্ট ২০১৮]

খ্যাতনামা নৃত্যগুরু। আদিবাড়ি : ফরিদপুরে কোড়কদী। অজিত সান্যাল কোড়কদীর শতবর্ষ প্রাচীন স্কুল রাস বিহারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪৩-৪৪ সালের দিকে কলকাতায় গণনাট্য সংঘের সাথে জড়িত হন। ১৯৪৫ সালে কলকাতার বুলবুল চৌধুরীর কাছে নৃত্যে হাতেখড়ি। ১৯৪৯ সালে বুলবুল চৌধুরীর নৃত্যশিল্পী সম্প্রদায়ে স্থায়ীভাবে কাজে নিযুক্ত হন অজিত সান্যাল। বুলবুল নির্মিত অনেক নৃত্যনাট্য যেমন ‘এই আমার দেশ’, ‘পাছে আমরা ভুলে যাই’, ‘বন্দিনী ভারত’, ‘বীতংস’ প্রভৃতিতে কাজের সূত্রে সারা পূর্ববাংলা, পশ্চিম পাকিস্তানসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম প্রভৃতি সফর করেন কৃতি এই নৃত্যশিল্পী।

অজিত সান্যালের দুটি গ্রন্থ হলো :

—দুই দেশ দুই মন
—আলোর পাখি

ই-মেইল : ajit.sanyal@gmail.com

Latest posts by অজিত সান্যাল (see all)