আসফিয়া

আসফিয়া
553
0

নাম ধরে ডাক দিয়েছিলাম শুধু

আমি তখন পড়ি ক্লাস থ্রি-তে। সদ্য গ্রাম থেকে শহরে এসেছি, ভর্তি হয়েছি উদয়ন স্কুলে। ভেতরে ভেতরে খাপ-খাওয়ানোর মানহানিকর চেষ্টা আর বাইরে তাল-মেলানোর খেলায় ওস্তাদি দেখাবার সময় তখন। এক সহপাঠিনী ছিল আমাদের—ঠিক স্পষ্ট মনে নেই, ও ক্লাস থ্রিতে ছিল কি-না, ভালো করে পরিচয় হলো ক্লাস ফোরে—নাম কাস্পিয়া। এ কেমন নাম! ভারি অদ্ভুত তো! সত্যি বলতে কি, নামের মোহে পড়ে গেলাম আমরা। এবং আমরা কয়েক বন্ধু অকারণেই ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সময়ে-অসময়ে নাম ধরে ডাকতাম ওকে—যেন নামটা উচ্চারণ করাতেই ভীষণ মজা।

তখন এটুকুমাত্র জানা ছিল আমার, রাশিয়াতে ‘কাস্পিয়ান’ বলে একটা হ্রদ আছে। হ্রদ কাকে বলে—সে সংজ্ঞাটি অবশ্য মুখস্থ করেছি ততদিনে। ঢাকা শহরে, সেই ব্রিটিশ কাউন্সিলের উল্টোপাশে একটা স্কুলের ছোট্ট ক্লাসরুমে দশ-পনের জন মেয়ের মাঝখানে বসে, শুধু একটা নামের উপর ভর করে চলে যেতাম রাশিয়ায়, আর সেই মেয়েটিকে ঘিরে সুবিশাল হ্রদের কলতান শুনতে পেতাম। হ্রদের কলতান শুনতাম—কারণ মেয়েটিও ছিল বেশ কলোরোলা। অচিরেই সে টের পেয়ে গেল, কিছু ছেলে তার নাম নিয়ে খেলছে। ফলে এরপর ওকে ডাকলেও, বিশেষ কোনো প্রয়োজনেও যদি ডাকতাম, খেপে উঠত সে।

যদিও আমি সবসময় মেয়েদের সারিতেই বসতাম—কেন জানি না—খুব সম্ভবত এমন একটা রেওয়াজ ছিল যে, ভদ্র-শান্ত ভালো ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গে বসবে আর ডানপিটে বদমাশগুলো, যারা প্রকৃতই পুরুষ, ওরা বসবে আলাদা সারিতে। কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমি ভালো ছেলে ছিলাম না—এ কথা স্বীকার না করলে ইতিহাসের সঙ্গে নাফরমানি করা হবে। ভালো-মানুষির পুরো ব্যাপারটাই ছিল আমার ভান ও ভণিতার ফল। আর, কোনো মেয়েলিপনা আমার মধ্যে থাকবার প্রশ্নই আসে না—কেননা ছোটবেলা থেকেই আমি নারীবাদী—অর্থাৎ সব বড় কাজে আমি নারীকে বাদ দিয়ে চিন্তা করতাম—যেমন ও-পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল ম্যাচ, মিঠুপিন্টুকে কায়দা মতো পেলে ধরে ঠেঙ্গানো, কলার ভেলা বানিয়ে বিলে মাছ ধরতে যাওয়া—এসব গুরুতর পরিকল্পনায় মেয়েরা কোনো কাজে আসে না—ফলে এ তো সহজেই অনুমেয়, জগতের মহৎ কর্তব্যপালনে ওরা কখনো সঙ্গী হবার নয়। তবু যে কারণেই হোক ক্লাসে আমাকে সবসময় মেয়েদের সারিতেই বসতে হতো। অথচ তারপরও কাস্পিয়ার কাছে বিশেষ পাত্তা পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। ক্লাসের সবচে ধনীর দুলালিদের একজন হবে সে—এই ছিল আমাদের ধারণা। সে পরিচয় আমরা পেতাম তার সঙ্গে থাকা জিনিশপত্রে। বিশেষ করে মনে আছে, ওর একটা পেন্সিল-বক্স ছিল—কয়েকটা সুইচ বসানো—সুইচ টিপলে বক্সটার ভেতরে লুকানো ছোট ছোট চেম্বার বের হয়ে আসত। সার্কাস-বালিকার মতো ঐ জাদুবাকশো নিয়ে ও খেলা দেখাত আমাদের মাঝখানে বসে। বলত, কানাডা থেকে ওর আংকেল এটা নিয়ে এসেছে। কানাডার রাজধানীর নাম যে অটোয়া—তাও আমি জানি না তখন। মন্ট্রিলের নাম শুনি নি বলে কতই না দীন-হীন মনে হতো নিজেকে।

ক্লাস ফোরে, অর্থাৎ ১৯৮৭ সালের এপ্রিলে আমি উদয়ন ছেড়ে গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলে চলে আসি। সেও আমেরিকা চলে যায়। তার সঙ্গে প্রায় একই সময়ে চলে যায় আরেকটি মেয়ে—যে মেয়েটির মুখ আমি এখনো আঁকতে পারব বলে মনে হয়। কেননা একদিন এঁকেওছিলাম ক্লাসে বসে। যদিও কিচ্ছু হয় নি, বুঝতেও পারে নি কেউ। কিন্তু আজ হবে। জানি না কেন এ আশা করছি। মনের ভেতর থেকে ওর মুখ উঁকি দিচ্ছে বলে? সে কি তবে ছিল আমাদের ক্লাসে সব থেকে সুন্দরী কেউ? ও-দিক বিচারের বয়স নয় সেটা। তবু মন একটা চোরাগোপ্তা হিশেব কষে নিলেও নিতে পারে সবার অজান্তে।

তার সাথে আমার প্রায়ই দেখা হতো ক্লাসের বাইরে, হাতিরপুল বাজারের মোড়ে। এত ভিড়ভাট্টা ছিল না তখন, কাঁটাবন ছিল একটা বস্তি। প্রায় ফাঁকা রাস্তায়, সিগনাল পয়েন্টে, দুদিন সে আমাকে গাড়ি থেকে ডাক দেয়। একদিন ওদের গাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড় করানো—আমি রিকশায়—মুখোমুখি দেখা। আরেকদিন রিকশায় ফিরছি, হঠাৎ পাশ থেকে গাড়ির গ্লাস নামিয়ে—‘এই গালিব’—উত্তরে আমিও হাত নাড়লাম। সে বিস্ময় প্রকাশ করল, কী করে আমি একা একা বাড়ি ফিরি। এখানে বলে রাখি, আমি কিন্তু ওকে অনেকদিন গাড়িতে আমার পাশ দিয়ে চলে যেতে দেখেছি, কখনো ডাকি নি। ওর পাশে কি ওর মা বসে থাকতেন?—লক্ষই করি নি। ওদের বাসাটা ঠিক কোন দিকে? কেন বারবার এই পথ দিয়ে আসত ওরা? আজ মনে হয়, রিকশা থেকে গলা বাড়িয়ে জিগ্যেস করি, ‘এই তোমাদের বাসা কোথায়?’

সে ছিল আমাদের ফার্স্ট গার্ল। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, কিছুতেই ওর নাম আমি মনে করতে পারি না। ছোট্ট একটা সবুজ খাতায় মোটা কালিতে লেখা নামটা শুধু চোখে ভাসে আবছা মতো—’মুনসিয়া’ বা এই ধরনের কিছু। আর অন্যদিকে, কাস্পিয়ার নাম মনে আছে বটে, কিন্তু ওর চেহারা, মুখাবয়ব কিছুই মনে পড়ে না আমার। তবে ও ছিল কালো (তাই বলে আমার মতো নয়), স্বভাবে খানিকটা রাগী এবং জেদি। রাগী, জেদি—কথাগুলো বানিয়ে বললাম, কারণ ওকে সবাই একটু সমীহ করত। শুধু বিত্তের কারণে কাউকে সমীহ করার কোনো কারণ নেই ছোটদের।

হায়, কবেকার কথা এসব! এর মধ্যে কবে কোন গ্রন্থের কাহিনি এসে ঢুকে পড়েছে কোন গ্রন্থে, কে জানে? কত শীত গ্রীষ্ম বর্ষা এল গেল—কত সকাল সন্ধ্যা রাত্রি দুপুর! কেটে গেল বারোটি বছর। এক যুগ। প্রসঙ্গগুলি কখন মরে মুছে গেছে মন থেকে, খবরও পাই নি। শিক্ষাজীবনে ছোটখাটো একটা বিপর্যয়ের পর এসে ভর্তি হয়েছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে। নানান পাগলামিতে কেটে যাচ্ছে সময়। কেটেও গেল দু’দুটো বছর। ঠিক এর পরের বছরই কোনো এক নির্বিশেষ ও নিরুত্তাপ সময়ে তুচ্ছ একটা ঘটনা ঘটল। ঘটনাটা ঘটল—যখন আমাদের ক্যাম্পাসে থমকে থাকা বাতাসে মৌচাকের মধুগন্ধ—মৃদুমন্দ—আর থোকা থোকা হাসি—রাশি রাশি মে ফ্লাওয়ার থেকে ছিটকে ছিটকে পড়ে—সেই মন্থর অবসরে নৃবিজ্ঞানের একজন তরুণ শিক্ষক (মানস চৌধুরী, ড্যাশিং আইকন) হঠাৎ আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন তার সংগঠনের আড্ডায়। আমাদের বলতে আমি ও আমার বন্ধু মাদল হাসান। যথারীতি একদিন বিকেলে, স্বর্ণচাঁপার আভায় জ্বলে ওঠা মেঘ আকাশে ওড়াতে ওড়াতে দুবন্ধু গিয়ে হাজির হলাম সেখানে। আমাদের সাথে ছিল জগলুল আসাদ, এক ইয়ারের জুনিয়ার, ইংরেজির ছাত্র। পরবর্তীকালে অবশ্য ভাববাদে দীক্ষা নিয়ে কবিতা লেখার মতো অপকর্ম ত্যাগ করে সে। কিন্তু ঐ সময় ওর মতো চৌকশ এবং বাকপটু কবি আমাদের ক্যাম্পাসে কমই ছিল। যাই হোক, দল বেঁধেই গিয়েছিলাম আমরা। গিয়েই মনে হলো, এসে ভালো করেছি। খুব সহজেই চোখে পড়ার মতো এবং মনে ধরার মতো একটা মেয়েও দেখি সেখানে উপস্থিত। আলাপপ্রসঙ্গে জানা গেল ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী—আমাদেরই ইয়ারমেট। ওর নামটা শুনে চমকে উঠলাম—‘আসফিয়া গুলরুখ’। এক মুহূর্তে ঐ নামের মধ্যে আরও কিছু ধ্বনি, ধ্বনিপুঞ্জ গুঞ্জরিত হয়ে উঠল। আরও কিছু স্মৃতি।

ও একটা লেখা অনুবাদ করে এনেছে, টেরি ইগলটনের তত্ত্বফত্ত্ব কিছু। সেটাই ছিল সেদিনের আলোচ্য। কোথাকার কোন ট্যারা ইগল কী লিখেছে, সেদিকে মন ছিল না একেবারেই। কিন্তু, পাঠ শেষ হলে ওর অনুবাদের ভাষাকে যে তারিফ করতে হবে সে ব্যাপারে ছিলাম সম্পূর্ণ সজাগ। ফিরে আসবার পথে মহুয়াতলায় বসে, সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে মাদল বলল, ‘আমার সঙ্গে মেয়েটার প্রেম হলে ভালো হতো।’ আশ্চর্য সরল উক্তি। হয়তো আমারও মনের কথা। মিটিমিটি হাসলাম শুধু, বললাম, ‘কার সঙ্গে হলে যে ভালো হতো কে জানে!’ কিছু না হোক, অন্তত মেয়েটার সঙ্গে আবার দেখা হবে, সেই লোভে এরপর একদিনই শুধু আমরা যেতে পেরেছিলাম ঐ আড্ডায়। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর যাওয়া হয়ে ওঠে নি। সত্যি বলতে কি মেয়েটির সঙ্গে আর দেখাই হয় নি ক্যাম্পাসে।

কিন্তু প্রসঙ্গটা কিছুতেই ছেড়ে গেল না আমাকে। অন্তত একটা কবিতা লিখিয়ে ছাড়ল। শিরোনামহীন একটা কবিতা। ‘স্রোতের নিমিত্তে’ নাম দিয়ে মাদল ওর সম্পাদিত ‘বোধ’ পত্রিকায় ছাপল। ছাপানোর আগেই কিভাবে যেন প্রচার পেয়েছিল এর ভেতরকার কাহিনিটা, বন্ধুদের মধ্যে। এবং সেটা কিছুটা রঙ চড়িয়েই। বান্ধবীদের শ্লেষ ও বক্রোক্তিও জুটেছিল বেশ। আমারও মনে একটা দুরভিসন্ধি জাগল তখন—কবিতাটি তার উদ্দিষ্ট জনের হাতেই পৌঁছে দেয়া যাক তবে, যাকে বলে নিবেদন করা—প্রেম নিবেদন নয় কিন্তু। সে আর হলো কই? ততদিনে ও গিয়ে ভর্তি হয়েছে উইমেন স্টাডিজে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর শুনেছি, চলে গেছে আমেরিকায়।

ফের দেখা হলো তিন বছর পর, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে। আমার বান্ধবী পাপুল, যে আমাকে সবচে বেশি খ্যাপাতো ঐ মেয়েটার প্রসঙ্গ তুলে, বলল, ‘দেখা হয়েছে স্বর্ণার সঙ্গে?’ মেয়েটার ডাকনাম স্বর্ণা। একবার ভাবলাম ওকে গিয়ে বলি কবিতাটার কথা। সে এজন্য নয় যে, লেখাটা বাংলা ভাষার এমন এক অক্ষয় সম্পদ, যা না দেখলে না জানলে ওর ক্ষতি হবে। সে এজন্যও নয় যে, ও বিগলিত হবে কবির প্রতি। বরং কিছুটা পাজলড করা। শুধু ওর প্রতিক্রিয়াটি দেখা।

কিন্তু তখনই এই প্রশ্নটা এল মনে—কাকে নিয়ে কবিতা লিখেছি আমি? মানুষ না মানুষের নাম? নাম তো আশলে ডাক দেবার জন্য। কাকে ডাক দিতে চেয়েছি তবে? কোথায় পৌঁছুবে সেই ডাক? হয়তো ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম একদিন পেছন-পথের দিকে, বাঁশপাতার শনশন আওয়াজ ও নদীর স্রোতের দিকে—কারুরই কি সাড়া পাব আশা ক’রে? শৈশব কি পারে যৌবনের ডাকে সাড়া দিতে? কতদূর গেলে পর জীবনের একটা বৃত্ত পূরণ হয়? কখনো কি দেখা হবে উত্তরমেরুর সঙ্গে দক্ষিণমেরুর? সূর্যোদয়ের সঙ্গে সূর্যাস্তের? প্রথম দিনের কথা আমরা মনে আনতে পারি না, প্রথম গানের সুর। যদিও পৃথিবীতে জন্ম হয়েছিল একদিন। আমাদের কল্পনাতেও নেই সভ্যতার শেষ দৃশ্য কোনো। তবু জানি, এক অন্তিম দৃশ্যপট আছে অপেক্ষা ক’রে।…


আসফিয়া


তোমার নাম উচ্চারিত হলে কাস্পিয়ান হ্রদের কথা মনে পড়ে
        মনে পড়ে পাটাতন ভেঙে-পড়া নৌ কিংবা নাবিকের
                                        হতোদ্যম জীবন-সংহিতা;
                        সুদূর-পরাহত প্রাণের ইচ্ছাজীর্ণ আর্তনাদ
কী প্রবল আকাঙ্ক্ষায় প্রতিধ্বনিত জগতে দৃশ্য গন্ধ গান হয়ে ফেরে—
                                                আমি চেয়ে দেখি
        লুপ্ত জনপদ থেকে জেগে-ওঠা এক ভুবনকল্পনা
                                        ধ্বস্ত পর্বতের মতো সমুদ্রে বিলীন হয়ে
                তোমার উদ্দেশে পঙ্‌ক্তি ও সোপান রচনা করেছে।

বিষুব-বলয় থেকে ছুটে গিয়ে মেরুর মাথায় নক্ষত্রকে ছুঁয়ে
                দাঁড়িয়েছ তুমি আলেকজান্ডারের লোভাতুর চোখে
                                        সাম্রাজ্যের অপর বিন্দুতে,
        অথচ মকর-কর্কট ক্রান্তিতে কোথাও
                        দূরত্বের ছায়া ফেলে রাখো নি।

        আগামী আকাশপটে স্ফুরিত আলোর স্মৃতি মনে রেখে
                                অন্ধকারের সংবৃত ইতিহাস আমি লুকিয়ে রেখেছি
আমার প্রতিরোধ ভেঙে-পড়া চেতনার আর্যাবর্তে,
                                                        ভুলে যেতে চেয়েছি
                        সুরের করতল মেলে-দেয়া শোকগাথার মতন
        চারদিকে যেন নিরুদ্ভিন্ন উল্লাসের অপরিসীম মৃত্যু,
                                                যেন ব্যষ্টি-সমষ্টির দোলাচলে
                                স্বপ্নস্খলিত ঘুমের পতন-উজ্জীবন।

                                                 তবু এখনও সহসা
তোমার নাম উচ্চারিত হলে কাস্পিয়ান হ্রদের কথা মনে পড়ে
        মনে পড়ে পাটাতন ভেঙে-পড়া নৌ আর নাবিকের
                                        স্রোতবিহ্বল জীবন-সংহিতা।

পুরাণে বর্ণিত বহু দেশ ও কালের কীর্তি নাশ হয়ে যাবার উদ্ভাসে
                আমার এ বেঁচে থাকা তোমাকে দেখার পর
                                                পৃথিবীর বিস্মরিত কল্পনার মতো
                                স্নাায়ুবিক আয়ুশূন্য।

বৃষ্টি ছুঁয়েছেনে মেঘে হাত বুলাবার অভিজ্ঞতা-ঋণে
        দিনযাপনের পালা শেষ। তোমার নৈকট্য
                আমাকে প্রত্যক্ষ করে গেছে সকাল ও সন্ধ্যার কাছে
                                        কত কতবার। আজ
        শামুকের মতো পাঁজরের হাড় খুলে
                                কিছু দেখাতে আপত্তি নেই আমার।

কথাকাহিনির বাঁকে বাঁকে মুহূর্তের ইতিবৃত্ত হয়ে
                পথে পথে পদচ্ছাপ রেখে তোমার প্রস্থান
        নগর-গ্রামের ভেদাভেদ মুছে ফেলার মতন
                                অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হয়।

                                        তবু একদিন একবার
        মৃত্তিকার মর্মমূলে যাব ভেবে চোখে চোখ রেখে দিগন্তে অপস্রিয়মাণ
                মাস্তুলের দুলে দুলে কেঁপে কেঁপে ডুবে যাওয়া দেখেছি।
আজ পূর্বান্তিক বেদনার উপত্যকায় দূরবর্তী মেঘযান থেকে
                                                হে ঐতিহ্য-বিলাস-বিভ্রম-সঞ্চালিনী
        জীবনের এই রুগ্‌ণ দিগ্বলয় কী আশ্চর্য ভালোবেসে
                                দিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
                পশ্চিমের মুগ্ধমৌন আবির-আহ্লাদে
                                        অপহরণের প্রবোধ—দ্বিধার সান্ত্বনা
আর অনুতাপহীন গ্লানি রেখে তুমি
                নিহত দিনের রক্তিম গালিচা বেয়ে
                                উঠে গেলে সভ্যতার শৃঙ্গে।

        আমি শৃঙ্গ-অভিসারী নই, ছিলাম না কোনোদিন;
তোমার অহমের বস্তুগ্রাহ্য ছায়ায় লেপ্টে থেকে এখন আমার
                কেবল বপ্রকেলি—ঈর্ষাসমাচারহীন।
        আমার তুচ্ছ দিনাতিপাতে
                        জগৎ ও জীবনের ম্লেচ্ছ অনসূয়া
                                        দিকে দিকে রটনা করে যায়
        তোমার প্রতি অস্বীকৃতি যুগের মেদুর আড়ম্বরে।

                তবু যতবার শুনি তোমার নাম জনতার মুখে
টলে ওঠে অন্ধকারে আলোর সরলতা। ভাবি
                                এই নির্ঝরিণীর ম্লান মন্থরতা
                                                আমার তো নয়—

        আমি তো জেনেছি তীর ও তরণির কম্প্র অভিঘাত
এই নদীশাসনের পৃথিবীতে মহাপ্লাবনের দিনলিপি
                        লিখে গেছে চুপিসারে—
        যেন হংস-ফুল্ল ছায়া, শঙ্খশুভ্র কাশবন
                বহু বহু প্রত্যর্পণ-পেরুনো সূর্যের আবর্তনে
                                বর্ণিম ঔদাস্যমাখা দৃষ্টির
        অপ্রমত্ত সীমানায়—সৃজনের ভোরে
                        নৈর্ঋতে ঈশানে—কৃষাণে কৃষাণে।

        তাই বিশুষ্ক একটি তটিনীর মতো
                                        স্রোতের নিমিত্তে আমি একা বসে আছি
                ঋতু বদলের মতন নৈঃশব্দ্যে উৎকর্ণ হয়ে—
হয়তোবা শতাব্দীর প্রান্ত ঘেঁষে
                                অকস্মাৎ ছুটে পালায় একটি নিমেষ
                ইঙ্গিতে সংকেতে অস্ফুট ধ্বনির অনিকেত উৎসারণে।


উৎস : মাহমুদ শাওন সম্পাদিত ছোটকাগজ ‘সুতরাং’
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহযোগী অধ্যাপক ও প্রশিক্ষণ বিশেষজ্ঞ, নায়েম, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন [সমুত্থান, ২০০৭]
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে [শুদ্ধস্বর, ২০০৯]
রক্তমেমোরেন্ডাম [ভাষাচিত্র, ২০১১]
অনঙ্গ রূপের দেশে [আড়িয়াল, ২০১৪]
তিমিরে তারানা [অগ্রদূত, ২০১৭]
ফুঁ [বাতিঘর, ২০২০]

প্রবন্ধ—
বাদ-মাগরিব (ভাষা-রাজনীতির গোপন পাঠ) [অগ্রদূত, ২০১৮]

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) [বাঙলায়ন, ২০০৮]
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) [শুদ্ধস্বর, ২০০৮]

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
গালিব