হোম গদ্য গল্প অনুরণন 

অনুরণন 

অনুরণন 
1.10K
0

আমি শব্দ সন্ধানী—শব্দ শিকারি। অবিমিশ্র শব্দের পেছনে আমার  ক্লান্তিহীন ছুটে চলা। আকাশ সাঁতরে বেরিয়েছে চোখের দৃষ্টি, আবার নেমেছে অতলে—অনুসন্ধিৎসার সোৎসাহে কৌতূহল পৌঁছেছে গিরিতলে, জলে, প্রান্তরে—সাথে ছিল শব্দের মোহে শ্রবণেন্দ্রিয়ের ধ্যান। জীবনে তেত্রিশটি বছর পার করেছি। বোধের বয়স কত? তেত্রিশ? না, তা নয়। বহতা জীবনের প্রথম দিনে শোনা আজানের কথা কি মনে আছে? জীবন-চেতনার শব্দ আমি কবে প্রথম শুনতে পেলাম? বাবার হাতুড়ি পেটার তির্যক শব্দই কি আমাকে প্রথম নাড়িয়ে দেয়? এফোঁড়-ওফোঁড় করে বোধের দরজা? জাগিয়ে তোলে আমার আমির অপরিচিত সত্তাকে? মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন বাবা সারাদিন হাতুড়ি দিয়ে পিটাপিটি করে? বিকট শব্দ হয়। মা বলেছিল, ‘এই শব্দই তো আমাদের আহার জোগায়। শব্দ থেমে গেলে আমরা আর বাঁচব না। শব্দই আমাদের জীবন।’ তখন বুঝি নি শব্দ থেমে গেলে আমরা আর বাঁচব না কেন? বুঝি নি শব্দের সাথে জীবনের সম্পর্ক কী? তবে কেন যেন মায়ের কথা শোনার পর সেই বিকট শব্দ মন থেকে মেনে নিতে শিখলাম। মগ্নচৈতন্যের শুভ্র যাত্রায় বাবার হাতুড়ি পেটার শব্দে আর বিরক্তি জাগে নি—বরঞ্চ ভালোবেসে ফেললাম একটা সময়। এ শব্দ যেন প্রাণের শব্দ হয়ে গেল। এখন ভাবি, মা সেদিন আমার মধ্যে কী মন্ত্র ঢুকিয়ে দিয়েছিল? হাপর দিয়ে কয়লার আগুন উস্কে দেয় বাবা আর আমি শব্দের ভালোবাসায় উস্কে উঠি।


জলেরও কি নিজস্ব ভাষা আছে? কেমন শূন্যে হারিয়ে যেত মন।


ছেলেবেলার ঝোঁক খুব বেহায়া হয়—মন থেকে কিছুতেই তাড়ানো যায় না। বিচিত্র সব শব্দের অনুসন্ধান চলতে থাকে আমার ভেতর। মা মক্তবে পাঠাত সেই সকালে। সূর্য যখন নরম আলো নিয়ে হাজির হতো আমাদের উঠোনে। আমি মক্তবে যেয়ে আরবি হরফ শেখার বদলে বড় ছেলেদের উচ্চস্বরে কোরান শোনার ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে থাকতাম। কী এক অদ্ভুত সুর! আচ্ছন্ন হয়ে যেত আমার সারা দেহ-মন। এভাবে চলতে থাকল দিনের পর দিন। কৌতূহলী মন খুঁজে বেড়ায় শব্দের উৎস, আর শব্দের ভেতরে প্রবেশ করে বুঝতে চাইত তার মর্মার্থ। মক্তব থেকে বাড়ি ফেরার পথে প্রাইমারি স্কুলের আঙিনা। সঙ্গত কারণে স্কুলের শরীর ঘেঁষেই বাড়ি ফিরতে হতো। স্কুলের ছেলেমেয়েদের উচ্চস্বরের কণ্ঠস্বর আমাকে টানত। ওদের সমস্বরে নামতা পড়ার শব্দ আমাকে নড়তে দিত না। বিহ্বলের মতো তাকিয়ে থাকতাম ছেলেমেয়েদের দিকে আর শব্দের মূর্ছনা ঝঙ্কার তুলত আমার প্রাণে। তখন মনে হতো মা ঠিকই বলেছে—শব্দই জীবন।

দশ-বার বছরের দিকে আমাদের মহল্লায় একটি পরিবার নতুন ভাড়াটিয়া হিশেবে আসে। সেই পরিবারে এক মেয়ে ছিল— ছবির মতো চেহারা। আমরা দুবন্ধু মেয়েটিকে ছবি বলেই ডাকতাম। শান্ত, কোমল—নৈঃশব্দ্যের রূপ সারা শরীরময়। ওর পায়ের নূপুর বেজে উঠত সশব্দে, সানন্দে। তখন বুকের ভেতরটাকে একটি শব্দ কিরকম ভালোলাগা অনুভূতিতে নাড়িয়ে দিত। বন্ধু শ্যামল আর আমি সুযোগ পেলেই ছবির সঙ্গ প্রত্যাশা করতাম। ছবিও আমাদেরকে কাছে পেলে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠত স্রোতস্বিনীর মতো। ছবির পছন্দ ছিল নীলকণ্ঠ আর পদ্ম ফুল। শ্যামল আমাদের বাড়ির সামনের রেল লাইন পার হয়ে পুকুরে নেমে ফুল নিয়ে আসত। জলে ভেজা শ্যামল প্রতিদিন স্নান করত পুকুরে আর প্রতিমুহূর্তে ছবির ভালোবাসায়। আমি আর ছবি বসে থাকতাম পুকুর-পারে। ছবি ফুলের প্রাপ্তির আনন্দে খিলখিল হেসে উঠত। আমার প্রাপ্তি ছিল অন্য জায়গায়। শ্যামলের জলে নামার শব্দ আর ছবির হাসির শব্দ শুনতাম। জলেরও কি নিজস্ব ভাষা আছে? কেমন শূন্যে হারিয়ে যেত মন। এসব ভাবনার ভেতর প্রায়ই ট্রেন চলে আসত নিজস্ব আওয়াজ নিয়ে—কু-ঝিকঝিক, কু-ঝিকঝিক ধ্বনিতে। আমরা ছুট দিতাম ট্রেনের পিছু পিছু। কী এক মন মাতানো শব্দ। মাঝে মাঝে ট্রেন থেকে নেমে আসত খালা কিংবা মামা। অতিথি পেয়ে আমার মন আনন্দে নেচে উঠত আরো বেশি। সীমাহীন উৎসবের আমেজ নিয়ে আসত এই শব্দময় ট্রেন। এই শব্দের ট্রেনও একদিন আমায় কাঁদাবে বুঝতে পারি নি। এ বাহন-বন্ধুটি সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে কেড়ে নিবে তা কি ভেবেছিলাম আগে? শব্দ যে সব সময় জীবন হয় না সেদিন ভালো ভাবে উপলব্ধি করি।শব্দ জীবন নয়—শব্দ বেদনা, শব্দ মৃত্যু, প্রথম উপলব্ধি আসে এক সকালে বাবার করুণ চিৎকার কানে এলে। বাবা তখন হাপর দিয়ে আগুনকে উস্কে দেয় আর হাতুড়ি দিয়ে জাগিয়ে তুলে শব্দময় জগৎ। বাবার ককিয়ে উঠা চিৎকার শুনে দৌড়ে যেয়ে থেতলানো আঙুলগুলো দেখে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মা, এই কি তবে জীবন? মা কোনো কথা বলে নি। আমি মনে মনে বলেছিলাম, শব্দ জীবন নয়, শব্দ হলো রক্তের চিৎকার…


ছবির দুচোখ বেয়ে টপটপ পানি ঝরছিল। চলে যাবার মুহূর্তে দেখলাম ওর নূপুরও কাঁদছে। কী অদ্ভুত বেদনাময় শব্দ!


আমার রক্তাক্ত হৃদয় শব্দকে সেদিন থেকে খুব ভয় পেত। যেকোনো শব্দ শুনলেই মন আতঙ্কিত হয়ে উঠত—শরীর কাঁপত। বাবা সেদিনের পর কামারের কাজ ছেড়ে দিল—রৌদ্রকোলাহলের রূপ সন্ধ্যায় মিলিয়ে যাওয়ার মতো।  কাজের সন্ধানে বাবাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। ঠিক হলো বরিশাল যাবে কাকার কাছে। মায়ের সে কী কান্না। দূরে থাকা মানেই তো প্রথম মৃত্যু! মা চূড়ান্ত মৃত্যুর আগেই মৃত্যু প্রত্যাশা করে নি। আমি কিভাবে কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না। বাবা বিদায় বেলাতে কপালে চুমু খেল। তখনও কান্না ঠিক চোখের কোণে এসে পৌঁছায় নি। ভেঁপু বিকট শব্দ করে লঞ্চকে নিয়ে যখন সামনে চলে গেল তখন খুব কান্না পেল। মনে হচ্ছিল আমার আপনজনকে নিয়ে লঞ্চ সারা জীবনের জন্য চলে যাচ্ছে। ভেঁপুর এ শব্দ আমার কাছে নির্মমতার প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। কান্না আর কিছুতেই থামছিল না। নদী কত কাঁদতে পারে? কত দিন, কত রাত কেঁদে ও এ পানি জমিয়েছে? মনে হচ্ছিল আমার চোখ থেকে এর চেয়ে বেশি কান্না পানি হয়ে বের হবে। এই ঘাট, বাজার, রাস্তা, সবকিছু চোখের পানিতে ডুবে যাবে। এখনও গোপন ব্যথা নিয়ে ভেঁপুর শব্দ আমার কানে আসে। বাবা চলে যাবার অনেকদিন পর্যন্ত আমার কাছে ভেঁপুর শব্দ মানেই ছিল বিদায়ের মুহূর্ত, আপনজন কেড়ে নেবার শব্দ।

আমি এখনও মাঝে মাঝে ভাবি, ট্রেন নাকি লঞ্চ কার শব্দে আমি বেশি আতঙ্কিত হয়ে উঠি? কার গর্জনে বিষম অস্থিরতা কাজ করে দেহ-যন্ত্রাংসে? ট্রেনের শব্দ শুনলে নূপুরের শব্দও আমার কানে ঝনঝন করে ওঠে। ছবির হাসি মুখটা ভেসে ওঠে আর শ্যামলের রক্তাক্ত দেহ। শ্যামল ছবিকে ভালোবাসত—আমার মতো চুপিচুপি নয়, প্রকাশ্যে। ছবিদের এ মহল্লা ছেড়ে চলে যাওয়া ও কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি। মানতে পারে নি চলে যাবার মুহূর্তে ছবির প্রত্যাখ্যানকেও। শ্যামলের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ছবি ‘না’ বলা শব্দটা খুব জোর দিয়ে বলেছে এমনটা নয়। তবুও শ্যামল জোর ধাক্কা খেল। ঝাপ দিল ট্রেনের নিচে। সেদিনও ট্রেন কু-ঝিকঝিক, কু-ঝিকঝিক করে ছুটে এসেছিল। এতদিন ট্রেনের শব্দ আমার কাছে ছিল একান্ত প্রিয় অতিথিদের কাছে আসার গল্প। উচ্ছ্বাসের শব্দ। সেই ট্রেনে শ্যামল ঝাপ দিল। আমার চোখের সামনেই চলল এ মৃত্যু খেলা। মৃত্যুর শব্দ কিরকম তা আগে জানতাম না। চিৎকারে মৃত্যু হলেও মৃত্যু এক শূন্যতার নাম। এ শূন্যতা ভীতি হয়ে ভেতরে নতুন শব্দের জন্ম দেয়—অনুরণিত হয় পুরো শরীর জুড়ে। মৃত্যুর পর ছবি এসেছিল শ্যামলকে দেখতে। লক্ষ করলাম, ছবির দুচোখ বেয়ে টপটপ পানি ঝরছিল। চলে যাবার মুহূর্তে দেখলাম ওর নূপুরও কাঁদছে। কী অদ্ভুত বেদনাময় শব্দ! আজও ট্রেনের লাগামহীন দৌড় দেখলে শ্যামলের কথা মনে পড়ে—ট্রেনের নিচে রক্তাক্ত সেই চিৎকার-মুহূর্ত চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তেমনি কোনো মেয়ের পায়ে নূপুর খেলা করলে ছবির সেই বেদনাময় কান্নার ধ্বনি আমার ভেতরে সুর হয়ে খেলা করে। বিরহ সুর।

এরপর বেশ কিছুদিন মায়ের সেই কথা মনে পড়ত। শব্দই জীবন। সেই বলা শব্দের মধ্যে কতটুকু সত্যি লুকিয়ে আছে ভেবে ভেবে আমি অস্থির হয়ে উঠতাম। তবে শব্দ কেন চিরবিদায়ের কারণ হয়? বেদনার কারণ হয়? মৃত্যুর কারণ হয়?


দুরন্ত বাতাসের চলার শব্দ—নদীতে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, আকাশের বজ্রপাতও যেন অলৌকিক কোনো শব্দের বার্তা দিয়ে যায়। 


আজ বাবা নেই। মা নেই। বন্ধু শ্যামল নেই। ছবি থেকেও নেই। এখন বুঝতে পারি, শব্দ মানে জীবন নয়, মৃত্যুও নয়। শব্দ হলো জীবন-মৃত্যুর মাঝে স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত। ভাবি, আমার কবিজীবন শব্দের উপলব্ধিতে কিরকম বর্ণময় হয়ে উঠেছে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া প্রকৃতিতে ঝিঁঝিঁ পোকা দেখেছি আর কয়টা? কিন্তু ওদের ডাক কী এক মন্ত্রমুগ্ধের আবহ তৈরি করে। মধ্যরাতে বিছানা ছেড়ে সেই শব্দের সাথে শুয়ে থাকি মাঠের উপর। ব্যাঙের ডাক শুনি। বাতাসের সাথে বটপাতার যুদ্ধের শনশন শব্দে ঘুম চলে আসে। দিনের আলোয় বিস্তৃত মাঠের মাঝখানে বাচ্চারা খেলাধুলা করে আর বাঁশির সুরে মেতে ওঠে মাঠের প্রতিটি ঘাস। এই সুর-শব্দে আমার ভেতর কেমন এক মায়ার জগৎ তৈরি হয়।

এ শব্দভাণ্ডার না থাকলে আমি কি কবি হতে পারতাম? দুরন্ত বাতাসের চলার শব্দ—নদীতে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, আকাশের বজ্রপাতও যেন অলৌকিক কোনো শব্দের বার্তা দিয়ে যায়। সত্যি, তাড়িত হই। আজও শব্দের অনুরণন আমার ভেতরে জাগিয়ে তুলে জীবনের প্রকৃত ছবি।

অনুরণন : দুই

মহ্‌সীন চৌধুরী জয়

জন্ম ২ এপ্রিল ১৯৮৪, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ। কবি ও কথাসাহিত্যিক। ঢাকা সিটি কলেজ থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই —
অদৃশ্য আলোর চোখ [গল্পগ্রন্থ, অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি, ২০১৮]

সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের ছোট কাগজ ‘শীতলক্ষ্যা’।

ই-মেইল : joychironton@gmail.com

Latest posts by মহ্‌সীন চৌধুরী জয় (see all)