হোম নাটক ‘স্বপ্নরমণীগণ’ যখন বিবর্ণ স্বপ্নের কথা বলে

‘স্বপ্নরমণীগণ’ যখন বিবর্ণ স্বপ্নের কথা বলে

‘স্বপ্নরমণীগণ’ যখন বিবর্ণ স্বপ্নের কথা বলে
676
0

ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যেও অধীর অপেক্ষা ছিল দর্শকের। সেলিম আল দীনের শেষ-দিককার রচনা স্বপ্নরমণীগণ উপস্থাপন করেছে তারই প্রতিষ্ঠিত নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ। নির্দেশনা দিয়েছেন সেলিম আল দীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর সহকর্মী সুহৃদ আফসার আহমদ। স্বভাবতই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুটা ছিল সেলিম আল দীনের নাট্যদর্শন এ নাটকে কিভাবে প্রতিভাত হয়েছে তা দেখা। তখনও প্রবেশঘণ্টা পড়তে অনেক দেরি। আয়োজকদের ব্যস্ততার সীমা নেই। নাটকটিতে কী এক আকর্ষণ যেন টানছে সবাইকে। বছর দেড়েক হলো নাটকটি প্রযোজনা করেছে, অথচ এরই মধ্যে অনেকবারই বিভিন্ন উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে চলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রযোজনা সাধারণত ভেঙে ভেঙে বারবার উপস্থাপিত হয় না। কিন্তু এর প্রদর্শনীর আমন্ত্রণই যেন নাটকটির গুণাগুণ তুলে ধরছে। বিভিন্ন উৎসবে দর্শকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও কুড়িয়ে চলেছে। সম্প্রতি তেমন এক প্রদশর্নীর উপর ভিত্তি করে নাটকটি নিয়ে এ আলোচনা। এ আলোচনায় আমরা দেখব সেলিম আল দীন রচিত মূল নাটলিপিকে ভেঙে কিভাবে নির্দেশক নব-নাট্যরূপ তৈরি করেছেন, বাঙলা নাট্যরীতির আলেখ্যে কিভাবে উপস্থাপনকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। দর্শকের প্রতিক্রিয়াসহ বৃত্তের পরম্পরাকে ধরে নাট্যশিল্পের নানা নান্দনিক মাত্রা নিয়ে আমরা এ আলোচনা এগিয়ে যাব।

দর্শকের সমবেত প্রতীক্ষার অবসান হয় মিলনায়তনে প্রবেশের ঘণ্টাধ্বনির মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে দর্শক প্রবেশ করে। দেখা যায়—প্রসেনিয়াম নিরাভরণ মঞ্চে হালকা আলো জ্বলছে। পিছনে সংগীতদল বসা। হালকা সংগীতের নিনাদ বাজছে। আপস্টেজের মধ্যমঞ্চে একটি রাস্তার নৈর্ব্যক্তিক সাজেশন। কিছুক্ষণ পর মঞ্চে উঠে আসেন নাট্যজন নাসিরউদ্দীন ইউসুফ। তার অতি সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ফুটে উঠে সেলিম আল দীন হাজার বছরের বাঙলা নাটককে নিয়ে যেতে চেয়েছেন বিশ্বসভ্যে। সর্বপ্রাণবাদী ধারণা এ নাটকে আছে। আর এ নাটক রচনার মধ্য দিয়ে তিনি নিউ এথনিক থিয়েটার তত্ত্বের উদ্ভাবনও করেছেন। নাটকটির নির্দেশক আফসার আহমদ তার দীর্ঘ দিনের সহকর্মী ছিলেন। তিনিও একজন গুণী গীতিকার, সুরকার এবং নাট্যনির্দেশক। তারপর তিনি নাটক দেখার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য সমাপ্ত করেন।


এ নাটকে সেলিম আল দীন সর্বপ্রাণবাদী ও নিউ এথনিক থিয়েটারের উদ্ভাবন করেছেন।


সেলিম আল দীন স্বপ্নরমণীগণ নাটকটি ২০০৬ সালের দিকে রচনা করেন। এটি মূলত গীতিনৃত্যনাট্য। সাতটি ভিন্ন কবিতাকারে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায়। এ সাতটি কবিতাকে গানে রূপান্তর ও নৃত্যে দৃশ্যমান সম্ভব বলে তিনি বাঙলার মধ্যযুগের সাহিত্যধারার মতো রাগরাগিণীভিত্তিক নৃত্য ও অভিনয় প্রদর্শনের মাধ্যমে নাট্যরূপে উপস্থাপনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ২০০৭ সালে একটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে যুগলবন্ধ আছে তার আরেকটি নাটক ঊষাউৎসব। নাট্যকার নিজে কামনা করেছেন এ নৃত্যনাট্যটি নির্দেশনা দিবেন যথারীতি তার শিল্পবন্ধু নাসিরউদ্দীন ইউসুফ। কিন্তু নাসিরউদ্দীন ইউসুফের নির্দেশনা দেওয়া হয় নি। বিভাগীয় শিখন ও নির্দেশনা দিয়েছেন অধ্যাপক আফসার আহমদ। স্বপ্নরমণীগণ নাটকে নাচাড়িবৃন্দের বন্দনানৃত্যের পর নৃত্যকের ঘন অরণ্যে মারমাপল্লির বর্ণনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় নাটকের কাহিনি। অরণ্যবাসের কটা দিন মারমাদের নাচ হয়ে থাকে। এক ভ্রমণকারী অলৌকিক এক পাথর পায় মারমাপল্লি থেকে। শহরের যাপিত জীবনের মরা আলো বিছানায় নানা কথা মনে আসে। পাথর থেকে ভেসে আসে মানবীয় আবেগ-ঘেরা বিক্ষুব্ধ নারী-জীবন-বাস্তবতার সাতটি চরিত্র। এগিয়ে চলে সাহিত্য ইতিহাসের সাতটি গল্প। সাত রাত্রিতে সাত রমণীর অতৃপ্ত আত্মার জীবনবাস্তবতায় সংক্ষুব্ধ জাগরণ এবং স্বস্তিবচনের মধ্য দিয়ে ছোট্ট কলেবরের গীতিনৃত্যনাট্যটি শেষ হয়।

0

সেলিম আল দীনের নৃত্যনাট্যটি উচ্চাঙ্গের কাব্যায়নে বর্ণিত। ইতঃপূর্বের ‘ঊষাউৎসব’ নাটকে যেমন দোহারকে ভেঙে নৃত্যকের দলকে নাচাড়ি রূপে উপস্থাপন করেছেন তেমনি এ নাটকেরও নৃত্যক ও নৃত্যকীর বর্ণনাত্মক উপস্থাপনায় নাট্যটি উপস্থাপিত। নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এ নাট্যের মূল সুরে প্রবহমান।

দেশীয় নাট্যচর্চায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক। ১৯৮৬ সালের ৩ জুলাই এ বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন সেলিম আল দীন। বাঙলা নাট্যকে বিশ্ব দরবারে আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার প্রত্যয় নিয়েই এ বিভাগের প্রতিষ্ঠা। গত একত্রিশ বছরে প্রায় সাত শতাধিক শিক্ষার্থী এ বিভাগ থেকে শিক্ষা নিয়ে স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বপ্রতিষ্ঠ। ইতঃপূর্বে বিভাগীয় অধিকাংশ প্রযোজনাই দর্শকপ্রিয় ও শিল্পমূল্যে উত্তীর্ণ। এবছর স্বপ্নরমণীগণ উপস্থাপন করছে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা। সম্ভবত নাটকটি বেছে নেয়ার পেছনে নানা কারণের মধ্যে অন্যতম—শিক্ষার্থীদের সাহিত্য-ইতিহাস পাঠ করানো, বাঙলা নাট্যরীতি সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া এবং নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। এবং সেলিম আল দীনের দর্শনকে পরিচিত করানো। এ নাটকে সেলিম আল দীন সর্বপ্রাণবাদী ও নিউ এথনিক থিয়েটারের উদ্ভাবন করেছেন।

নাটক শুরুর ঘণ্টা বাজে। ঘণ্টাধ্বনির সাথে নিভে যাওয়া মঞ্চ ধীরে ধীরে নব আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। প্রসেনিয়াম মঞ্চধারায় উপস্থাপন। মঞ্চে প্রদীপ জ্বলতে দেখা যায়। দোতরা বাদনের সাথে মঞ্চে প্রবেশ করে নৃত্যকী দল। গান গাইতে থাকে। প্রদীপ নিয়ে চলে যাওয়ার পর নৃত্য-গীতের মাধ্যমে নাটকের গল্পের আরম্ভ হয়। এক নৃত্যক বা ভাষ্যকারের (প্রান্ত সাহা) বর্ণনায় মারমার পল্লির প্রসঙ্গ ওঠে। সে নৃত্যক বেড়াতে যায় বান্দরবনের মারমা পল্লিতে। উৎসবমুখর মারমা পল্লি থেকে উপহার হিশেবে পাওয়া একটি পাথর নিয়ে শহরে ফিরে। নৃত্য-গীত ও হাবভাবের মাধ্যমে অনবদ্যভাবে ধরা দেয় মারমা জীবন ও সংস্কৃতি। বর্ণনা-অভিনয় যেন অদ্বৈতরূপে ন্যাস। নৃত্যকের শহরে ফেরার দৃশ্যে হঠাৎই ট্রেনের সাজেশন তৈরি হওয়া ভালো লাগাই তৈরি করে। ভাষ্যকার বা সূত্রধর চরিত্রে হাবভাব ও সাত্ত্বিকবোধ বিশ্বাসে আরও মনোযোগে প্রাণের সন্তরণই তৈরি করতে পারত। বাচনিক অভিনয়েও সুস্পষ্টতা দর্শকের কষ্ট করে শোনার প্রচেষ্টাকে কমিয়ে দিতে পারত। ভাষ্যকারের অ্যাপার্টমেন্টের মরা আলো বিছানায় শুনে কত কথা মনে আসে তার। মঞ্চের পিছনের সায়াক্লোমায় একটি আলোর সাজেশন দিয়ে শহরের জোছনালোকিত রাত তুলে ধরেন নির্দেশক। যদিও শহর জীবনে অতবড় চাঁদের আলো চোখে পড়ে কিনা সন্দেহ। হঠাৎ ভেসে আসে নারীকণ্ঠের গান—মুখর নূপুরশালী নৃত্যকীর ঝুনঝুন।

1

মঞ্চে উঠে আসে শরবী (কৃষ্ণা সজ্জন পূজা) ও শরব (তুষার ধর)। উঁচা উঁচা পাবত তহিঁ বসই শবরী বালি/ মোরঙ্গপুচ্ছ পরিহিন শবরী গিবত গুঞ্জার মালি—সেই বিখ্যাত চর্যাগান পিছনে দোহারগণ গান গাইতে থাকে। নৃত্য-গীতের অনবদ্যতায় সমগ্র মঞ্চদর্শকই যেন প্রাণদীপ্ত হয়ে ওঠে। চর্যাপদকালীন বিধৃত বাঙলার জীবন ও সংস্কৃতি যেন একে একে অনবদ্যরূপে ধরা দেয় দৃশ্যকল্পে। অসাধারণ কথোপকথন এবং এক মূর্ছনীয় নাটকীয়ভাবে শরব ও শরবীর প্রেম ফুটে ওঠে। প্রত্মবাসর আর হয় না তাদের। শশাঙ্কের সৈন্যগণ আগ্রাসী আক্রমণাত্মক। নির্মমভাবে জীবন দিতে হয় তাদের। ইতিহাসের চেয়ে শিল্পসত্যে রূপায়িত হয়ে ওঠে তখন নাটকটি। সৈন্যের আগমন সংগীতের অপরূপ তাল-লয় ও ব্যঞ্জনায় ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে নির্দেশক তুলে ধরেন। এ যেন নতুন রূপ-রূপায়ণ। সাহিত্য ইতিহাসকে আশ্রয় করে এক মানবীয় শিল্পসত্যের রক্তক্ষরণে ভাসিয়ে দেয় শবর-শরবীর আর্তনাদ। কী অসাধারণ কথোপকথনের অনবদ্য রূপে ধরা দেয় অনিবার্য সত্য।

দ্বিতীয় রাতেও নৃত্যক টের পায় পাথর থেকে ভেসে আসছে নূপুরের ধ্বনি। এ যে চিরন্তন বাঙালি প্রেমের প্রতীক রূপী বিরহিনী রাধা (অন্তরা সাহা লাকি)। কৃষ্ণের (আকাশ সরকার) বিরহ তাকে অতৃপ্ত সুরে বেঁধে রেখেছে। বৃন্দাবনে কী আজও কৃষ্ণ বসে আছে। খুঁজতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। উচ্চাঙ্গের কণ্ঠ নিনাদের মাধুর্য, অপরূপ নৃত্যকলা ও সংগীতে অনুপমরূপে ফুটে উঠে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-বিরহগাঁথা। কিন্তু এ অতৃপ্ত হৃদয়ের পরিণতি কী। যেন নতুন করে আবার দৃশ্য পদাবলি রচিত হতে থাকে নির্দেশকের হাতে। রাধা চরিত্রে অন্তরা সাহা লাকির বাচনিক অভিনয় বিশ্বাস আশ্রয়ী নয়। নৃত্য ও অঙ্গশোভায় রাধা মনে হলেও মন-সত্তা কিংবা বচন দৃঢ়তায় রাধা ভেবে নিতে কষ্টকর হয়েছে। আর পোশাকও নীল বসন নয়। কথায় নীল বসন আর শরীরের শাদা বসন ভাবনায় ছেদ পড়ে। কিন্তু প্রেমের যে চিরন্তন রূপ ফুটে ভাব ও ভাষায় তা নিঃসন্দেহে হৃদয়ের অতলস্পর্শী।


উপস্থাপনাটি হাজার বছরের বাঙলা নাটকের নৃত্য-গীত-সংগীতের অদ্বৈত মাধুর্যমণ্ডিত উপস্থাপন রূপই পরিগ্রহ লাভ করেছে।


তৃতীয় রাতে নৃত্যক হারিতি মূর্তির সংক্ষুব্ধ রূপ দেখে ভয় পেয়ে যায়। হারিতি মূর্তি থেকে তেজস্বিনী নারী ওঠে আসে। মঞ্চে দেখা যায়—এ যে ঋকবেদের ঋষি অপালা (নুসরাত তুবা)। ঋকবেদের মন্ত্র রচয়িতা। অপালা বলতে থাকে নিজের জীবনের কাহিনি। যুগে যুগে নারীরা জ্ঞানচর্চায় অবহেলিত। নারীর অধিকার মন্ত্রে থাকে বাস্তবে নয়। নারীর অপমান যেন শাশ্বত। সহজ সরল উপস্থাপন অথচ কী অসাধারণ ধ্রুপদ। নারীর অধিকারহীনতাই নারীর সঙ্গী। অপলা চরিত্রের অভিনয়ে দৃঢ়তা থাকলেও উক্তি-প্রত্যুক্তিতে আরো বলিষ্ঠতা কী কম মনে হয় নি! কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে নারীর চিরন্তন অবস্থা ব্যাখ্যাত হয়ে ওঠে।

29186149_10216160175865097_7384340841130622976_n (1)

পরের চতুর্থ রাতে নৃত্যক মঞ্চের পিছনে নূপুরের ধ্বনি শুনে চমকে উঠেন। উঁচু পাটাতনের পিছন থেকে উঠে আসে নৃত্যকী (নূর-ই-নাজনীন)। এক যেন কলহনের রাজতরঙ্গিণীর ‘কমলা’। নৃত্যপটীয়সী কমলা যে ভালোবেসে ছিল জয়পীডকে। কাশ্মিরের রাজা জয়পীড বগুড়ার কার্তিকের মন্দিরে দেবদাসী কমলার কাছে প্রেম নিবেদন করেছে। নৃত্য-গীতের মধ্যে ভক্তিবাদী ধ্রুপদী ঢঙে অনবদ্য হয়ে ওঠে দৃশ্যটি। কিন্তু এ নৃত্যকী কী পায় সুখের স্পর্শ। গুপ্ত ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে নিহত নৃত্যকী। ইতিহাস যেন নতুন সুরে শিল্পকথায় বেজে ওঠে। সম্ভবত নির্দেশক প্রকৃত পক্ষে কমলাকেই চিত্রিত করতে চান নি। শিল্পী জীবনকে তুলে ধরার প্রয়াসী ছিলেন। কারণ রাজতরঙ্গিণীর কমলা মারা যায় নি। কাশ্মিরবাসী হয়েছিলেন। নির্দেশক সুভ্যিনিয়রে ‘কমলা’র স্থলে শুধুই নৃত্যকী শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যেহেতু জয়পীড চরিত্রটি আছে সেহেতু কমলা হিশেবেই সহজে কল্পনীয়। ইতিহাসের দায়ভার এড়ানোর কৌশল হিশেবেও বিষয়টি ভাবা যেতে পারে।

সেলিম আল দীন বলেন—‘সমকালীন শেকড়হীন—লুণ্ঠনবৃত্তিক এবং আপাদমস্তক রক্তাক্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহ এক দুর্মর নৃগোষ্ঠীর আবেগ আর প্রাচীন ও মধ্যযুগের সৃষ্টিমুখর স্বাতন্ত্র্যে (মাৎস্যানায় যুগ ব্যতীত) উদ্ভাসিত বাঙালির পুনরুত্থানের স্বপ্ন জাগ্রহ হয়। আমি সখেদে দেখতে পাই—এই নদীবেষ্টিত অপূর্ব শ্যামলভূমির মানুষেরা রাজনীতির নামে গোত্র বিভক্ত—সাম্প্রদায়িক এবং আদিম হিংস্রতায় রক্তাক্ত সংঘাতে লিপ্ত। মনে হলো রাজনৈতিকভাবে গড়ে ওঠা দলগুলো হুতু তুতসিদের মতো ক্ল্যান ভিত্তিক হয়ে উঠেছে এবং রাষ্ট্র বিধ্বস্ত ও পরাজিত হবার পথে। তখন দেশের আবহ আর আমার স্বপ্ন এক ট্র্যাজিক পরিণতি হয়ে সাতটি কবিতায় ঘুরে ফিরছিল।… আশা করি মঞ্চে এ কাব্য অধিকতর বিমূর্ত ও সংঘাতময় নৃত্যনাট্য হয়ে উঠবে।’ (স্বপ্নরমণীগণ নাটকের মুখবন্ধ, সেলিম আল দীন রচনাসমগ্র, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, খণ্ড- ৬, পৃষ্ঠা- ৫৭৯)

3

পাথর থেকে বৌদ্ধ ভাস্কর্যের প্রজ্ঞাপারমিতা (মেহনাজ জাহান) উঠে আসে পঞ্চম রাতে। এ যে বৌদ্ধ সংস্কৃতির অতৃপ্ত আত্মা। নারীত্বের অভিশপ্ত জীবনের গ্লানি থেকে কী মুক্তি নেই। নির্দেশক অত্যন্ত ধ্রুপদী সংগীত সহযোগে নৃত্যভঙ্গিম প্রজ্ঞাপারমিতাকে অপরিসীম মমতায় উপস্থাপন করেছেন। অসাধারণ লাবণ্য নৃত্য পরিবেশনায়। অরূপ সৌন্দর্য ও ভালোলাগার মায়াজাল তৈরি হয়। নারীর অপূর্ণতার এক শিল্পভাষ্য ধরা দেয় পরতে পরতে। কথোপকথন, নৃত্য-গীতের অদ্বৈতনিক সমন্বয়ে দৃশ্যকাব্যের অবচেতনীয় দ্যোতনায় দোলা দেয়। নাট্যকারের বর্ণনায়—‘কাল রাতে ধর্মগৃহে প্রার্থনারত মানুষেরা/ খুন হয়ে গিয়েছে সহসা/ সশব্দে উড়ে গেছে বিশ্বাসের গম্বুজ।’

ষষ্ঠ রাতে পাথর থেকে উঠে আসে পালা নাট্যের চিরবিরহী চরিত্র মদিনা বিবি (নুশিন আদিবা)। নৃত্যকই যেন পালাকার হয়ে উঠেছে। অত্যন্ত নাটকীয়তায় মদিনা বিবির দুঃখ গাঁথা ফুটে উঠতে থাকে। প্রভাবশালী আলালের (রিফাত খান অনিক) উপস্থাপন অত্যন্ত প্রাণবন্ততায় ধরা দেয়। দুলালের (প্রণয় সরকার) এত লোভী প্রবণতা। মদিনা বিবি কখনো কী ভাবে বিচ্ছেদের কথা। শোকে প্রায় উন্মাদ হয়ে যাওয়া মদিনার দুঃখ যেন সমস্ত নারীদের চিরন্তন দুঃখ গাঁথার রূপ পায়। অত্যন্ত নান্দনিক চলন বিন্যাসে ধরায় নারীর চিরন্তন আকুতি। কোরিওগ্রাফি, সংগীত ও সংলাপে অত্যন্ত নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি করে। মদিনার বিরহে যখন সখীরূপী সব নারীই বিরহী মূর্তি ধারণ করে তখন যেন চিরন্তন নারীর দুঃখ গাঁথা এক চিরন্তন মহাকাব্যিক রূপ লাভ করে।

হাজার বছরের ইতিহাস বয়ে চলেছে প্রত্নপাথর। সপ্তম রাত্রিতে পাথর থেকে অতর্কিত উঠে আসে মান্দি দেবী আস্কি (হাজেরা আক্তার কেয়া)। আকাশের তারা হয়ে জ্বলা এ দেবী যে ভালোবেসেছিল মর্তেরই একজন আৎসুকে (পার্থ বৈদ্য)। কিন্তু হৃদয়ের আকুতি কী সোমেশ্বরী পাড়কে রক্ষা করতে পারে। নির্মম বাস্তবতা নৃগোষ্ঠীর বিধ্বস্ত জাতিসত্তার হত্যা যেন চিরন্তন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসত্তাকে হত্যা করা পাপ। পাথরটি ছুড়ে ফেলে নৃত্যক। নাট্যকার শেষে এসে বলেন—‘পাথর জুড়ানো নীলবর্ণ তোয়ালে ওই তো ওখানে। হাঁটু গেড়ে বসি কেননা এখন মেঝেতে লেপটে যাওয়া রক্ত মোছার পালা।’ …স্বপ্নরমণীগণ এখন হয়তো মৃত কিংবা অপার্থিব হুহু স্বর সে পাথর থেকে সৃত/ শুনে যাই শুনে যাই খোয়াবের পার।’

4

এ নাটকটির নবনাটলিপি, সুর, সংগীত ও নির্দেশনা দিয়েছেন অধ্যাপক আফসার আহমদ। মাত্র সাত পাতার কাব্যিক একটি পাণ্ডুলিপি ভিত্তি করে বর্ণনা, উক্তি-প্রত্যুক্তি ও সংগীত তৈরি করেছেন তা অনবদ্য সৃজনশীলতার পরিচয়ই বহন করে। তবে গল্পগুলো ইতিহাস সত্যের চেয়ে শিল্পসত্য বা নাট্যকীয়তা তৈরিই করা হয়েছে। সাহিত্য ইতিহাসে যেমন দেবদাসী কমলা গুপ্তহত্যা হন নি। বরং কমলা কাশ্মিরিদের নৃত্যকলার ব্যাপক প্রসার করেছিলেন। তেমনি শবর-শবরী হত্যা হয়েছিল কিনা তা প্রশ্নবিদ্ধ। তবে আজকের নৃগোষ্ঠীরা এমনভাবেই সামন্তবাদের হাতে অঘোরে প্রাণ দেন সত্য। গল্পগুলোর উক্তি-প্রত্যুক্তিগুলো এতই জীবন ঘনিষ্ঠ ও পরিমিত যে নাট্যকারের মূল ধ্রুপদী ছন্দের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মনে হয় নি। বরং কখনো কখনো মনে হয়েছে সেলিম আল দীন যদি গল্পগুলোর নাট্যউপস্থাপন করতেন হয়তো এমনটাই করতেন। তবে শুরুর দিকে বান্দরবন যাওয়া বিষয়টি আরও ভাবনার থাকতে পারে। সাত সাতটি গল্পের লিঙ্কগুলোতে আরও সাবলীলতা দর্শককে আরো স্বস্তি দিতে পারত। গানগুলো তো অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। সেলিম আল দীনের নাটকের কিছু গান ব্যবহার ছাড়াও অসংখ্য গান নতুন করে সৃজিত বলেই মনে হয়েছে। তবে অত্যন্ত সহজ সরল নান্দনিক উপস্থাপন।

উপস্থাপনাটি হাজার বছরের বাঙলা নাটকের নৃত্য-গীত-সংগীতের অদ্বৈত মাধুর্যমণ্ডিত উপস্থাপন রূপই পরিগ্রহ লাভ করেছে। সেলিম আল দীনের গীতিনৃত্যনাট্যের কাব্য পাণ্ডুলিপি যেন বহুমাত্রিকতায় দৃশ্যকাব্য সৃষ্টি হয়েছে। এ নাটকের সহকারী নির্দেশক ছিলেন ফাহিম মালেক ইভান। এ নাটকের কথকের ভূমিকায় বিভিন্নজন অভিনয় করেছেন—প্রশান্ত প্রসাদ স্বর্ণকার, আকাশ সরকার, অংশুমান রায়, আশিকুর রহমান বন্ধন, অসিম কুমার, প্রণয় সরকার প্রমুখ। নাটকের অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন—সামিউল হক ভুঁইয়া, বর্ষা বিশ্বাস, আবীর হাসান, রফিকুল ইসলাম, আয়শা সিদ্দিকা জামান রুমানা প্রমুখ।


নাচ-গান, অভিনয়, উপস্থাপন সবমিলে প্রাণবন্ত টানটান প্রযোজনা। সর্বোপরি নাটকটি হয়ে উঠেছে অনন্য এক দৃশ্যকাব্য।


মঞ্চ ও পোশাক পরিকল্পনায় ছিলেন রুবাইয়াৎ আহমেদ। মঞ্চ পরিকল্পনা প্রসেনিয়াম ধারাকে ঘিরে করা হয়েছে। অত্যন্ত সহজ সরল একটি রাস্তার প্রতীক। তা আল্পনা খচিত। পিছনে বাদকদল বসা। পালাকারদের মধ্যে একই ধরনের পোশাক ব্যবহৃত হয়েছে। মেয়েদের হালকা বুটিকের কাজ করা শাদা শাড়ি। আর ছেলেদের বুটিকের কাজ করা শার্ট, পাজামা, কোমরবন্ধনী জাতীয় কাপড়। দেখতে ভালো লাগলেও চরিত্রায়ণের সময় বাড়তি চরিত্রের প্রতীকী কাপড় ও রং ব্যবহার করলে হয়তো আরো উপভোগ্য হয়ে উঠত। বিশেষত রাধা যখন মুখে বলছে সে নীল বসনা কিন্তু বাস্তবে শাদা শাড়ি তখন ভাবনায় ছেদ পড়ে পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। চরিত্রাভিনয়গুলো শুধু হাবভাব, সাত্ত্বিকতা ও উক্তি-প্রত্যুক্তিতে চরিত্রায়ণের প্রক্রিয়া ছিল। তবে আরো সুনির্দিষ্ট জোনভিত্তিক ঘটনাগুলো নির্মাণে ভাবা যেতে পারত। অন্তর্নিহিত দৃশ্যগুলোতে আলাদা কিছু নৈর্ব্যক্তিক সাজেশন আরও বেশি ভালোলাগা ও গল্প বুঝতে সহায়তা করত বলে মনে হয়। রাধার দৃশ্যে নীল উড়নাসহ মন্দিরের দেবদাসী, জয়পিড, প্রজ্ঞাপারমিতা, আস্কিসহ নানা চরিত্র বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশে রং ও হালকা কাপড়ের সাজেশন নাট্য বোধগম্যে আরও সহজ-সুখকর অবস্থার তৈরি করত না কী!

5

মহিবুর রৌফের আলোক পরিকল্পনায় আলাদা মাত্রা আছে। বিভিন্ন জোনভিত্তিক আলোর বিন্যাস লক্ষ করা গেলেও আলোক পরিকল্পনায় আরও প্রচুর ভাবার ছিল। শহরে জীবনের রাত বোঝাতে পেছনে যেভাবে চাঁদের মতো গোল আলো প্রক্ষেপণ করেছে তা শহর না বুঝিয়ে গ্রামীণ চাঁদনি রাতকেই চিহ্নিত বেশি করে। সাধারণ দর্শকের এই ভ্রমটা হবে বলেই মনে হয়। কৃষ্ণা সজ্জন পূজার কোরিওগ্রাফি প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় খুবই গুরুত্ববহ। তবে রাস্তার সাজেশনের পিছনে শুয়ে থাকে কিংবা উঠে আসা নিয়ে আরও সহজ-সরলীকৃত অকৃত্রিম চলন বিন্যাসের ভাবনা ভাবা যেতে পারে। কোনো চলনই যেন দর্শককে পীড়া না দেয়।

ধ্রুপদী সংগীতের ঢং নাটকে আলাদা একটি মাত্রা তৈরি করেছে। নৃত্য ও সংগীত অন্য এক সৌন্দর্যের স্রোতে ভাসিয়েছে। নাটকে সংগীত প্রয়োগে ছিলেন—নুশিন আদিবা, মোক্তাফী রওনক ঐতৃজা, প্রশান্ত প্রসাদ স্বর্ণকার, প্রনয় সরকার, নূর-ই-নাজনীন (তমা), তুষার ধর, নির্ঝর অধিকারী, হিমালয় রাজ পাল হিমু, তাওসিফা তাহিয়া নুযহাত, মো. আবীর হাসান, মো. আশিকুর রহমান বন্ধন। প্রযোজনাটি সমকালীন বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। প্রসেনিয়াম মঞ্চ ধারায় উপস্থাপিত হলেও হাজার বছরের বাঙলা নাট্যের ধারায় সমকালীন বাঙলা নাট্যের আদর্শজাত রূপ তৈরিতে বলিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সেলিম আল দীনের দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পদর্শনের যথাযথ রূপ পরিগ্রহ লাভ করেছে। বিষয়বস্তু ও শিল্পদর্শনের দিক থেকে চারদিকের দর্শকবেষ্টিত মঞ্চেই উপস্থাপনের দাবি রাখে নাটকটি। সংলাপ-প্রক্ষেপণ, মডুলেশন, চরিত্রায়ণে আরও প্রচুর ভাবার জায়গা আছে। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হিশেবে তাদের ঐকান্তিকতা-প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের। নির্দেশক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এমন দুরূহ নাট্যকে সহজ সরল প্রাণদীপ্ত কাব্যিক বিন্যাসে উপস্থাপন করেছেন তা নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের। নাচ-গান, অভিনয়, উপস্থাপন সবমিলে প্রাণবন্ত টানটান প্রযোজনা। সর্বোপরি নাটকটি হয়ে উঠেছে অনন্য এক দৃশ্যকাব্য। আমরা নাটকটির আরও প্রদর্শনী প্রত্যাশা করি। উত্তরোত্তর বাঙলা নাটকের সমৃদ্ধি ঘটুক। বাঙলা নাট্য বিশ্ববুকে আত্মমর্যাদায় স্বতন্ত্র পরিচয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠুক—এটা আমাদের সবারই কামনা।

আবু সাঈদ তুলু

জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৯; জামালপুর । তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্য-শিল্পের প্রতি অনুরাগী। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখে আসছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

প্রকাশিত বই :

লিপির উদ্ভব, ক্রমবিবর্তন ও বাংলা লিপির পরিণত পর্যায় [প্রবন্ধ; অন্তরীপ পাবলিকেশন, ২০০৭]
বিপ্রলব্ধ [উপন্যাস; শিখা প্রকাশনী, ২০০৮]
রূপান্তরবাদ [শিখা প্রকাশনী, ২০০৯]
অনন্তপথের যাত্রী [ভাষাচিত্র, ২০১৪]
জলের আয়না [ভাষাচিত্র, ২০১৫]
পাতার বাঁশি [লিটলবিট, ২০১৭]
সেলিম আল দীনের সাহিত্য ভাবনা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮]

ই-মেইল : tuluart@yahoo.com