হোম নাটক মহাস্থান : যেখানে হাজার বছরের ইতিহাস কথা বলে

মহাস্থান : যেখানে হাজার বছরের ইতিহাস কথা বলে

মহাস্থান : যেখানে হাজার বছরের ইতিহাস কথা বলে
335
0

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য বগুড়ার মহাস্থানগড়ে দুইদিন ব্যাপী পরিবেশিত হলো প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বৃহৎ পরিসরে ইতঃপূর্বে নাটক উপস্থাপিত হতে দেখা যায় নি। প্রায় সাড়ে তিন শ অভিনেতা-অভিনেত্রী, কয়েক শতাধিক নেপথ্য কলা-কুশলীর সমন্বয়ে উপস্থাপিত হয়েছে এ নাটক। মহাস্থানগড়ের ভাসু বিহারের বিস্তৃত উন্মুক্ত স্থানটিতে গত ২৩-২৪ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখে হাজার হাজার দর্শক পরপর দুদিন দুটো প্রদর্শনী উপভোগ করে। দর্শকের কাছে ছিল এটা ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। নাটকটি রচনা করেছেন সেলিম মোজহার। প্রায় চার কোটি টাকা বাজেটে নির্মিত এ নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান ডিজি নাট্যনির্দেশক লিয়াকত আলী লাকী। বর্ণিল আলোয়, দিগন্ত বিস্তারী দৃশ্যায়ন, থ্রিল তৈরি করা কোরিওগ্রাফি, বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিনেয় স্থান, নাটকীয় নানা মুহূর্তে বিস্ময়ের ঘোরেই প্রায় আড়াই ঘণ্টার জন্য নিয়ে গিয়েছিল দর্শকদের ইতিহাস পরিক্রমণে। উক্ত ‘মহাস্থান’ নাটকের প্রথম দিনের প্রদর্শনীর উপর ভিত্তি করে আমরা এ আলোচনায় অনুসন্ধান করব নাটকে মহাস্থানগড় প্রসঙ্গ, ইতিহাসের পরিক্রমণ, উপস্থাপনের ভিন্নমাত্রিকতার ধরন, বৃহৎ পরিসরে ব্যবহৃত আলো, অভিনয় ও কোরিওগ্রাফি, মঞ্চবিন্যাস, নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রপস ও অন্যান্য শিল্প-উপকরণ এবং শিল্পমূল্যসহ প্রযোজনাটির উপযোগিতা।

ভিন্নমাত্রিক এ আয়োজনকে বিশেষায়িত করেছে ‘প্রত্ননাটক’ শিরোনাম। প্রত্নস্থানে তার নিজস্ব ঐতিহ্য ইতিহাস নিয়ে প্রদর্শিত নাটককেই প্রত্ননাটক হিশেবে আখ্যায়িত করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রত্নস্থানে নানা প্রদর্শনী, লেকচারের ব্যবস্থা থাকলেও এমন প্রথাসিদ্ধ নাট্যাভিনয় সাধারণত দেখা যায় না। বাংলাদেশে এ ধারার চর্চা ইতঃপূর্বে সম্ভবত হয় নি। শিল্পকলা একাডেমির ডিজি লিয়াকত আলী লাকীই বাংলাদেশে এ প্রত্নধারার নাট্যচর্চার প্রথম কুশলী। যদিও ইতঃপূর্বে আশিষ খন্দকার পরিবেশ থিয়েটার নামে উন্মুক্ত মঞ্চে একধরনের নাট্যচর্চা হয়েছিল। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে ইতঃপূর্বে নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নিয়ে ‘সোমপুর কথন’, নরসিংদীর উয়ারি বটেশ্বরের স্থাপনা নিয়ে ‘উয়ারি-বটেশ্বর’-এর পরিবেশনা অত্যন্ত আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এবারের এ ‘মহাস্থান’ নাটকে বৃহৎতর পরিসরে প্রত্ননিদর্শন মহাস্থানপড়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের শৈল্পিক উপস্থাপনায় নিবিষ্ট ছিলেন। বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসে এত সুবৃহৎ নাট্য উপস্থাপনা বোধহয় এটিই প্রথম।


২০১৬ সালে মহাস্থানগড়কে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিশেবে ঘোষণা করা হয়েছে।


বর্তমানে ‘মহাস্থানগড়’ বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান। যা একসময় প্রাচীন জনপদ পুণ্ড্র বর্ধনের রাজধানী ছিল। সংস্কৃত কাব্য ‘হরিবংশ’-এ বলিরাজার পাঁচ পুত্রের মধ্যে এক পুত্র—পুণ্ড্র; অন্যরা হলেন : অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ প্রমুখ। প্রাচীন ভারতীয় নানা গ্রন্থাদিতে প্রাচীন ‘বঙ্গ’ অঞ্চলের লোকদের নিষাদ, অসুর, দাস, দাস্য প্রভৃতি তুচ্ছার্থেও উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে আজকের বাংলাদেশে ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল ক্ষুদ্র নৃপতি শাসিত বঙ্গ, পুণ্ড্র, সমতট, বরেন্দ্র, হরিকেল, গৌড় প্রভৃতি নামে জনপদে বিভক্ত ছিল। অত্যন্ত প্রাচীন নগরী ‘পুণ্ড্র’ খ্রিস্টপূর্ব ৮০০-১০০০ শতকের দিকে পুণ্ড্ররাজ্যের রাজধানী ছিল। সে সময় অত্যন্ত সুসমৃদ্ধ নগরী ছিল এটি। প্রাচীরবেষ্টিত এ নগরী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী হিশেবে ব্যবহৃত হতো। বিভিন্ন হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানীও ছিল এটি। বর্তমানে এ প্রত্নস্থান মহাস্থানগড়টি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর তীরে এর ধ্বংসাবশেষ। ৬৩৯ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এ অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। তার বিবরণীতে এই অঞ্চলের অত্যন্ত সমৃদ্ধ চিত্র পাওয়া যায়। এ সময়ে চীন ও তিব্বত থেকে শিক্ষার্থীরা এ মহাস্থানগড়ে লেখাপড়া করার জন্য আসতেন বলে উল্লেখ করেন। জানা যায়, মহাস্থানে এক রাজা ছিল—নল। যার বড় ভাই নীলের সঙ্গে তার সর্বদা বিরোধ লেগে থাকত। সেসময় ভারতের দাক্ষিণাত্য থেকে পরশু বা কুঠার দ্বারা মাতৃহত্যার পাপে অভিশপ্ত ‘রাম’ নামে একজন এ অঞ্চলে আগমন করেন। নল ও নীলের বিরোধ মীমাংসার সূত্র ধরে কৌশলে রাজা হয়ে যান তিনি। পরিচিত হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের অত্যাচারী পরশুরাম [রা. ১২০৫-১২২০] নামে। যার বাড়ি-ভিটার ধ্বংসাবশেষ ও জীয়ন্তকূপ এখনো গড়ের ভিতরে রয়েছে।

হযরত শাহ সুুলতান বলখী (র.) পরশুরামকে পরাজিত করে এখানে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। বলখী সম্পর্কে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। বলখী মহাস্থানগড়ে প্রবেশ করার সময় করতোয়া নদী পার হয়েছিলেন একটি বিশাল মাছ-আকৃতির নৌকার পিঠে চড়ে। তারপর চৌদ্দশত শতকে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এ অঞ্চলের সমস্ত জনপদগুলোকে একত্র করে ‘বাঙ্গালাহ’ নামে পরিচিত অখণ্ড রাজ্য গড়ে তুলেন। তার একত্রীকরণ জনপদগুলো হচ্ছে—গৌড়, বঙ্গ, রাঢ, পুণ্ড্র, হরিকেল, সমতট ইত্যাদি। মোঘল আমলে বাঙলার নামকরণ করা হয় ‘সুবে বাঙলা’। ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনের সময় ইংরেজি উচ্চারণে বাঙলার নামকরণ হয় ‘বেঙ্গল’। বর্তমানে মহাস্থানগড়ের চারপাশে প্রায় ৩৬-৪২ ফুট উঁচু ও প্রশস্ত সুরক্ষা প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। এর ভিতরে পরশুরামের বাসগৃহ, বৈরাগীর ভিটা [সন্ন্যাসীদের আখড়া], জিয়ৎকুণ্ডসহ নানা স্থাপনার পরিচয় পাওয়া যায়। মহাস্থানগড়ে খননকৃত নানা ঢিবির মধ্যে গোবিন্দ ভিটা, খুল্লনার ধাপ, মঙ্গলকোট, গদাইবাড়ি ধাপ, তোতারাম পণ্ডিতের ধাপ, নরপতির ধাপ [ভাসু বিহার], গোকুল মেধ [লখিন্দরের বাসরঘর], স্কন্ধের ধাপ, বৈরাগীর ভিটা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এখনো অখননকৃত অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে—শীলাদেবীর ঘাট, ধনিকের ধাপ, রাসতলা ধাপ, চুনোরু দিঘি ধাপ, মন্দিরির দরগাহ, শশীতলা ধাপ, কৈবিল্কি ধাপ, বিষমরদন ঢিবি, চাঁদের ধাপ, জুরাইনতলা, মলিনার ধাপ, সিন্ধিনাথ ধাপ, পরশুরামের শোভাবাতি, মলপুকরিয়া ধাপ, শালিবাহন রাজার কাচারিবাড়ি ঢিবি, বলাই ধাপ, যোগীর ধাপ, ধনভাণ্ডার ঢিবি, প্রচীর ঢিবি, পদ্মবতীর ধাপ, কাঁচের আঙিনা, কাঞ্জির হাড়ি ধাপ, কানাই ধাপ, মঙ্গলনাথের ধাপ, লহনার ধাপ, দুলু মাঝির ভিটা, ছোট টেংরা, খোজার ঢিবি, পদ্মার বাড়ি, সন্ন্যাসীর ধাপ, দোলমঞ্চ ঢিবি, ওঝা ধন্বন্তরির ভিটা, দশহাতিনা ধাপ প্রভৃতি।

২০১৬ সালে মহাস্থানগড়কে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিশেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সে-প্রেক্ষিতেই শিল্পকলা একাডেমির এখানে সংস্কৃতির জাগরণমূলক কর্মসূচির পরিকল্পনা গ্রহণ। ‘মহাস্থান’ পরিবেশনাটি উপস্থাপন হয় মহাস্থান গড়ের প্রাচীর সীমানা পেরিয়ে প্রায় ২ কিমি দূরে ভাসু বিহারে। এটি একটি বৌদ্ধ স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ। সম্ভবত এটি বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র ছিল। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দের এখানকার ভ্রমণবিবরণীতে ভাসু বিহারকে বিশ্ববিহার নামে উল্লেখ করেছেন। বিশালায়নের এ ভাসু বিহারেই এ ‘মহাস্থান’ নাটকটির উপস্থাপন।

২৩ নভেম্বর, ২০১৮ তারিখ সারাদিন ধরেই ভাসু বিহারের উন্মুক্ত স্থানে ছিল হাজার হাজার দর্শকের অপেক্ষা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পর উদ্বোধনী আলোচনা শেষ হলেই নাটকটি শুরু হয়। শুরুতেই আলোকসজ্জার মতো আকাশের দিকে দুটো ফোকাস সারপি লাইটের আলো ঘুরতে শুরু করে। অন্ধকার খোলা জায়গায় এক অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা হয়। সবার মনোযোগ নিবিষ্ট হয় বিহার মধ্যে। ভাসু বিহারের বিশাল জায়গার একপাশে দর্শক বসবার জায়গা রেখে প্রায় সমস্তটাই মঞ্চের আবহ। এরই মধ্যে হঠাৎ মাঝখানে গাড়ির শব্দ। আলো-মিউজিকের কারিশমায় যেন গাড়ি চলতে চলতে থেমে যায়। যাত্রী ও কথকের মধ্যকার কথাগুলো উঁচুগ্রামে ভেসে আসতে থাকে। সমস্ত পরিবেশনাটিই রেকর্ডেড। গাড়ি ঠিক করার সময়ক্ষেপণে যাত্রী কিছু সময় কাটিয়ে যেতে চায় মহাস্থান থেকে। আরও কথোপকথনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেদিন বগুড়ার মহাস্থান গড়ে আড়াইশ বছরের ইতিহাস নিয়ে নাটক হবে। তাতে নাচ-গান-যুদ্ধ সবাই আছে। সাথে সাথে মঞ্চের পিছনে অনেক উঁচু স্ক্রিনে ধারাভাষ্যে ভেসে উঠতে থাকে মহাস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস। প্রদর্শিত ডকুমেন্টটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন আসাদুজ্জামান নূর। এভাবেই পরিবেশনাটি শুরু হয়।

‘আমি মহাস্থান। ২৫ লক্ষ বছর আগে করতোয়া আর মহানন্দার কোলে আমার জন্ম। লক্ষ বছরের নদী বিধৌত পলি বুকে নিয়ে যখন হয়ে উঠেছিলা উর্বরা, তখন থেকেই এখানে মানুষের সভ্যতার গল্প শুরু। শুরুতে হয়তো খুব সাধারণ কোনো গ্রাম ছিলাম, কিন্তু ভৌগোলিক কারণেই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলাম আমি। প্রাচীন বাংলার রাজধানী পুণ্ড্রবর্ধণ বা পুণ্ড্রনগর নামে পরিচিতি ছিল আমার, কালের প্রবাহে সেই নাম মহাস্থান। আজ থেকে তিনহাজার বছর আগের কথা বলছি। কী জৌলুসে ভরা ছিল সেই দিনগুলো।’

হাজার বছরের বাঙলার নাট্য উপস্থাপনরীতি অনুসরণ করা হয়েছে এতে। স্ক্রিনের বর্ণনার পর মঞ্চে প্রাকৃতজনদের বন্দনার মধ্য দিয়ে পরিবেশনাটির শুরু। এ নাটক কখনো বর্ণনাত্মক; পুঁথি পাঠ; কখনো চরিত্রাভিনয়ের ধারায় উপস্থাপিত। সমস্ত পরিবেশনাটিতেই যোগসূত্রধার ছিলেন। ‘পরথমে বন্দনা করি এই জগৎ সংসার/ যার মধ্যি মেলা করে প্রাণের বাজার/ বঙ্গ-সাগর কূলে ভারতের মাঝে/ পুণ্ড্র বরিণ সমতট হরিকেল নাম/ পুরাণে-কিতাবে লেখা, তাহার সুনাম/ সেই বিশাল বঙ্গের বুকে অতি পুণ্যধাম/ আদি নাম তার পুণ্ড্র যদি পরে মহাস্থান/ মহাস্থান নাকি পুণ্যস্নান কারণ ন জানি/ পুণ্ড্রভূমি ছিল বাঙলার প্রাচীন রাজধানী।’

মঞ্চে কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে উঠে আসে এ ভূভাগে মানবজীবন যাত্রার উদ্ভাসন। ভাসু বিহারের বিশাল ভূমি যেন প্রাচীন জনারণ্যে পরিণত হয়। খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকের সে মানুষগুলো যেন আবার জেগে ওঠে। চড়ক পূজা, বনশিকার, সামগান ও যজ্ঞে যেন দর্শক হারিয়ে যায় সভ্যতার ঊষালগ্নের জীবনভূমিতে। অভিনয়, প্রপস, মিউজিক ও আলোর কারিশমায় অন্যরকমের এক আবহ তৈরি হয়। আদিম প্রজাতি বাইসনগুলো, বাঘ, হায়েনা বৃক্ষ বনরাজির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে। সামগান ও যজ্ঞ আদিম নৃত্যে অনবদ্যরূপে ফুটে ওঠে—‘রুনুরে ঝুনু রাজাপুখাড়িয়া দুইওরে বাহানিয়া/ হাতিয়া পিয়াছাওয়ে/ গোড়াতোড়া লাগে, হাতিরে মাহুথা/ তানিরে তানামানি/ হাতিয়া ছামার হামি লেবে।’ আদিম মানুষের নৃত্যের কলরোলে যেন সমস্ত ভাসু বিহার ফিরে গিয়েছে সেই কয়েক হাজার বছর অতীতে। তখন কী জীবনের আনন্দ; তখন কী রঞ্জিত জীবনের ছন্দ।

সময় গড়াতে থাকে। পিছনের স্ক্রিনে সময় দেখায়। আর তার আলেখ্যে পরিবেশন তৈরি হয়। খ্রিস্টপূর্ব চার শতকে নন্দ রাজার সময়কালের প্রসঙ্গে সিকান্দর বাদশার পুঁথির মতো পুঁথি পাঠের মধ্যদিয়ে ফুটে উঠে গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের প্রসঙ্গ। এ গঙ্গাঋদ্ধিকে আলেকজান্ডার দখল করতে পারে নি। হাজার হাজার হাতি নিয়ে রাজা নন্দ তাকে প্রতিহত করেছে। ‘নন্দ নামের মহাবলী বাঙ্গালার রাজা, আর্য-ফার্য মানে না এমন বাঙ্গাল ভজা।’ রামায়ণী গান পরিবেশনের মধ্যদিয়ে নির্দেশক এদেশীয় জীবনসংস্কৃতিই যেন কালানুক্রমিক চিত্র তুলে ধরছেন। শুরু হয় রাজায় রাজায় দ্বন্দ্ব। বিহারের দু’পাশে দুই রাজার দল। সেসময় প্রপস নির্মাণে প্রশংসা না করেই পারা যায়। সময়কে তুলে ধরতে পোশাক-প্রপসে অসাধারণ গবেষণা ও প্রযত্ন পরিশ্রমের ছাপ আছে। মিউজিক, আলোর নিপুণতায় অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে। ছড়া কেটে কেটে তাদের মধ্যকার যুদ্ধগাঁথাকে তুলে ধরেন নির্দেশক।

ইতিহাসের আলোয় উঠে আসে গৌতম বুদ্ধ। কী অনবদ্য কোরিওগ্রাফি। বিশাল পরিবেশনা-স্থান জুড়ে হাজার হাজার মানুষের হাহাকার। এত দুঃখ মানুষের। মানুষের দুঃখ মুক্তির পরিত্রাণে পথদাতা গৌতম বুদ্ধ আবির্ভূত হন। রাজসিংহাসন ছেড়ে নেমে পড়ে রাস্তায়। মঞ্চে অনবদ্যভাবে ফুটে উঠতে থাকে গৌতমবুুদ্ধের প্রসঙ্গটি। নাটকে উঠে আসে ল্যাঙটা পুরোহিতের প্রসঙ্গ। ‘আমারে ক্ষমিয়া তুমি মরণ লজ্জা ঢাকো ॥ কইন্যারে বরিনু আমি ন্যাংটা পুরোহিতে।’

পরিবেশনায় গৌতম বুদ্ধ একটি বিশিষ্ট আসন লাভ করে। উপস্থাপনটি অত্যন্ত চমৎকার নান্দনিকতায় ফুটে ওঠে। আলোর কারিশমা অসাধারণ। সেই গৌতম বুদ্ধ বাঙ্গালায় আসনে। প্রায় বাইশ বছর আগে। বাঙ্গালের বাইর থেইকা পরথম মৌর্য্য রাজা। পাটালি পুত্রের, আজীবিক ধর্মের গুরু পিঙ্গলা-ভৎসের অনুসারী রাজা বিন্দুসারের তেজবান বেটা—অ-শোক।


বিশাল পরিসরে বিস্তর উপকরণে এত চমৎকারভাবে উপস্থাপন নির্দেশকের সৃজন ও নেতৃত্বের অসীম গুণকেই প্রকাশ করে।


শৌর্যবীর্যবান অশোক যখন মঞ্চে তখন সমস্ত বিহার জুড়ে অপূর্ব আলো-আঁধারীর খেলা। সমস্ত মঞ্চ মিলে হত্যাযজ্ঞের ইন্সটলেশন। অত্যন্ত চমৎকারভাবে মানবীয় আবেদন তৈরি করে। রাজা অশোক শোক বুদ্ধের শরণ নেন। এই মহাস্থানে বানাইলেন বুদ্ধের শরণে অশোকের স্তূপ। পরিবেশনাটিতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে অশোক প্রসঙ্গটি ফুটে ওঠে। অশোক লিপিতে বঙ্গের বর্ণ-পরিচয়। ‘বঙ্গভাষার আদি কথা জানিও নিশ্চয়ই ॥ ব্রাহ্মীতে আঁকিলেন রাজন প্রকৃতির স্বর। বাঙ্গালের মুখের ‘বাণী’ ধরিল অক্ষর ॥ লেখনের বয়স তোমার তেইশ শ বছর।’ এভাবে নাটকে ফুুটে উঠতে থাকে খ্রিস্ট দুই হতে সাতশতকের নানা ঘটনা। গুপ্ত, শশাঙ্ক ও পরবর্তী শাসনকালের নানা বৈচিত্র্য।

নৃত্য-গীত ও ভাষ্যকারের বর্ণনার এ সময়ের বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক নানা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে প্রয়াসী নির্দেশক। বেদ-ভরতসহ নানা প্রসঙ্গ আসে। নাট্যশাস্ত্রের আট রসের উপর পরিবেশিত নৃত্যের মার্গতা দর্শককে অভিভূত না করে পারে না। ঘোষণায় পুণ্ড্রের নতুন নামকরণ ভেসে ওঠে ‘আজি হইতে পুণ্ড্রনগর সুবিশাল, সুমহান গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীন হইলো। পুণ্ড্রকে অত্র প্রদেশের রাজধানী ঘোষণা করা হইলো। সেইসাথে পুণ্ড্রের নাম করা হইলো পুণ্ড্রবর্ধন। গুপ্ত প্রদেশের সকল প্রজা, নিজ নিজ ধর্ম আর কর্ম করিবে, শূদ্র বৈশ্য ক্ষাত্র বামুন—এই চাইর ভাগে ভাগ হইয়া।’

শত শত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চলনে সমস্ত ভাসু বিহার যেন প্রাণে উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের উল্লাসে ভাসু বিহার চমকিত। নাকাড়া বাজে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতাকা ওঠে। গীত-বাদ্যে ভরে উঠে চারদিক। তারপর সনাতন রাজ বংশের রাজা সমুদ্দর গুপ্ত, চন্দর গুপ্ত, কুমার গুপ্ত। বৌদ্ধ বামুন ধ্বংসকারী নতুন নরপতি আসে। শশাঙ্ক, হর্ষবর্ধন, ভাস্করবর্মা নিয়ে নতুন এ উপাখ্যানের দিকে এগিয়ে যায়। হর্ষবর্ধন কর্তৃক শশাঙ্ক নিহত; ভাস্করবর্মার হাতে হর্ষবর্ধন নিহত। শুরু হয় ধর্মের নামে ভাইয়ে ভাইয়ের রক্ত, জাতের নামে ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তক্ষয়।

হঠাৎ করেই সমস্ত বিহার জুড়ে হাহাকার শুরু হয়ে যায়। দেখা যায় শত শত মানুষের জ্বরাগ্রস্ততা, অনাবৃষ্টি, ফসলহীন, খাবারহীন, সাধারণ মানুষের মধ্যে হাহাকার। শুরু হয় বাঙলায় মৎস্যান্যায়। বড়ো মাছ ছোট ছোট মাছকে গিলে খায়। পতাকা, ইন্সটলেশন আর্ট, অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠতে থাকে সেসময়ের জীবন ও সমাজের করুণ চিত্র। সেসময় পুণ্ড্রের রাজার রাজমহলে নৃত্যগীত চলে। কার্তিকের মন্দিরে নৃত্য পটিয়সী দেবদাসী কমলা নাচে। কমলার নৃত্যে জয়াপীরের হৃদয় দ্বিধাবিভক্ত। নির্দেশক চমৎকারভাবে নৌকায় জয়পীর ও মন্দিরের দেবদাসীর নৃত্য উপস্থাপন করেন। বাঙালির নৃত্যকৌশল যেন অনন্য পরিচয়ে সেখানে ফুটে ওঠে।

শুরু হয় পাল শাসন। ভাসু বিহারের উঁচুর স্ক্রিনে ভেসে আসতে থাকে পাল রাজাদের কৃতিত্ব। বারো শতকের জীবন যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। বিশাল উৎসব কার্নিবাল। চর্যানৃত্যের অপরূপ ঢঙে সমস্ত ভাসু বিহার যেন নব আনন্দে নেচে ওঠে। সরহ কুক্কুরী পা অভ্যর্থনা জানায় অতীশ দীপঙ্করের আগমনকে। ভাসু বিহারের সাধক কবি সরহ-কুক্কুরীর মনে শান্তি নেই। প্রভু, এ মহাসংকট হতে পরিত্রাণের উপায় কী? অতীশ বর্ণনা করতে থাকেন ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’। হঠাৎ মঞ্চমধ্যে গোরক্ষনাথ ও মীননাথের আবির্ভাব ঘটে। চারদিকের রমণীয় নৃত্যে শুরু মীননাথ ভাববিভোর। গুরু কামখাদে পড়ে গেছে। তাকে উদ্ধারে ছুটে গোরক্ষনাথ। অত্যন্ত চমৎকার মিউজিক, নৃত্য গীতের মধ্যদিয়ে ফুটে ওঠে। সমস্ত বিহার ঘিরে সে কী উন্মাদনা তা অভিভূত করে রাখে।

উপস্থাপনার কাহিনি একাদশ শতকে এসে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় মহীপাল যেন এসে দাঁড়ায় আজকের জীবনে। মাছুয়া জাতির হাল ধরে মহীপাল। সেসময়ের রায়বেঁশে নৃত্য যেন দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। শুরু হয় ব্রাহ্মণ্য শাসন। সেনদের পতাকা উত্তোলিত হয়। ঘটনা আসে—‘আজি হইতে গৌড়-বঙ্গে লিখন-পঠন সমেত, সকল কার্য্য, গুরুভাষা, তথা সংস্কৃতভাষা, তথা শাস্ত্রভাষায় প্রণীত তথা সম্পাদিত হইবেক। গৌড়-বঙ্গের গো আর মৎস্য জাতির প্রতি এমন আদেশ বলবত। গুরুভাষা ব্যতীত, অন্য কোনো অপবিত্র, শূদ্রজন, ম্লেচ্ছ-যবন ভাষা লিখনে-পঠনে ব্যবহার করিলে, দণ্ড হইবেক—জ্বলিতে হইবেক রৌ-র-ব নরকে…।

বাঙলা ভাষার সঙ্গে যেন নতুন দ্বন্দ্বে উৎকীর্ণ হয়ে ওঠে এক সময়। সংস্কৃত ভাষা প্রধান ভাষা। শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ। মাহী সওয়ার বলখীর আগমন ঘটে। দ্বন্দ্ব হয় পরশুরামের সঙ্গে। পরশুরাম যুদ্ধে নিহত হন। তার একমাত্র কন্যা শীলাদেবী আত্মহত্যা করেন। একদিকে অভিনয় আবার অন্যদিকে উপরের স্ক্রিনে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে বর্ণিত হতে থাকে। কীর্তন, পুঁথিপাঠ, পাঁচালিতে যেন মুখর হয়ে ওঠে বাংলার জনপদ। বাংলায় মোঘল শাসন শুরু হয়। কত্থক, যন্ত্রসংগীত, কণ্ঠসংগীতে চারপাশ ভরে ওঠে। শুরু হয় বেহুলার ভাসান যাত্রা। বেহুলার ভাসান যাত্রা চলতে চলতেই নিধুবাবু যেন নতুন গান নিয়ে উপস্থিত হয়। কবি রামপ্রসাদ তার শাক্ত পদ নিয়ে উপস্থিত। লালনের বর্ণনায় মুখরিত হয়ে ওঠে জনপদ। এমন সময় মঞ্চের মধ্যে যাত্রা উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। মীরজাফরের ইশারায় মোহাম্মদী বেগ কর্তৃক সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যু হয়। কণ্ঠে ভেসে আসে সেই সংলাপ—‘বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার মহান অধিপতি, তোমার অন্তিম সময়ে শেষ উপদেশ আমি ভুলি নি জনাব। তুমি বলেছিলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের প্রশ্রয় দিও না। আমি তাদের প্রশ্রয় দেই নি। আমি বেঁচে থাকতে তোমার রাজ্যে তারা দুর্গ তৈরি করতে পারবে না। সৈন্য সমাবেশে সক্ষম হবে না। তোমার অন্তিম সময়ে সিংহাসন স্পর্শ করে যে প্রতিজ্ঞা আমি করেছিলাম, আমরণ আমি তা পালন করব।’

ব্রিটিশ শাসন কিংবা চরিত্রগুলো নাটকীয়তায় তুলে আনেন নি নির্দেশক। নানা কোরিওগ্রাফি দলীয় নৃত্যের মাধ্যমে ব্রিটিশ সময়কালের নানা বৈচিত্র্য তুলে ধরেন নির্দেশক। ‘নীল বিদ্রোহে কৃষকেরা দলে দলে মরে/ বিদ্রোহীরও দ্রোহের রক্ত যুগ পেরিয়ে চলে। হিন্দু মুসলিম দুই ভাগেতে চলে ভারতবাসী/ বাঙলা ভাঙে শয়তান ব্রিটিশ ইন্ডিয়াতে বসি। নৃত্যের মধ্যদিয়েই ফুটে উঠে—বন্দেমাতারাম। ভয় কি মরণে’ নামের সাথে নৃত্য তখন দর্শকের হৃদয় কাড়ে। গান-নৃত্য- কোরিওগ্রাফি ও বর্ণনায় আসে ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, চাকমা বিদ্রোহ, রংপুর কৃষক বিদ্রোহ, পাগলপন্থি বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, পাবনা কৃষক, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, তেভাগা আন্দোলন প্রভৃতি।

নির্দেশক ব্রিটিশ সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত স্ক্রিনে ধারাভাষ্য এবং নৃত্য-গীতের মাধ্যমে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পরিভ্রমণ দেখিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল সংগীত ও নৃত্যের মধ্যদিয়ে ফুটে উঠে বাঙালির মানসরূপ। ১৭ শহিদদের ইনস্টলেশন ও তিনকবির গান। বিশ্বযুদ্ধ, দেশ বিভাজন ধারাভাষ্যে ফুটে উঠতে থাকে। ভারতের জাতীয় সংগীত ও পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতের সঙ্গে নৃত্য উপস্থাপিত হয়। হঠাৎ ভেসে আসে—Urdu and Urdu shall be the state language of Pakistan. শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালে গুলির আওয়াজ। ভেসে আসে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো। বর্ণনা ও নৃত্যগীতের মধ্যদিয়ে ফুটে উঠে ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। এমন সময় বাজতে থাকে সেই বিখ্যাত গান ঐ মহামানব আসে/ দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে। এমন সময় বঙ্গবন্ধুর আগমন ঘটে। আইয়ুব খানের মার্শাল ল—কুচকাওয়াজরত পায়ের ফুটেজ দেখা যায়। প্ল্যাকার্ডে আন্দোলন বোঝা যায়। গান-কবিতা ও নৃত্যের মাধ্যমে ফুটে উঠতে থাকে নানা ঘটনা ও তার প্রেক্ষাপট। ১৯৬২-র শিক্ষা কমিশন, ১৯৬৬-র ছয়দফা আন্দোলন অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুঠে উঠতে থাকে। স্ক্রিনে দেখাতে থাকে দাবিগুলো। গান ও নৃত্যের মধ্যদিয়ে তুলে ধরেন ১৯৬৯-এর গণ আন্দোলন, ১৯৭০-এর নির্বাচন; ১৯৭১-এর ঘটনা, ৭ই মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের নানাদিক। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে। নৃত্যে গান বাজে—হে মহামানব একবার এসো ফিরে/ শুধু একবার চোখ মেলো/ এই গ্রাম নগরীর ভিড়ে। স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর উন্নয়নের বর্ণনা ভেসে উঠতে থাকে। হঠাৎ মঞ্চে উঠে আসে এগারো জন নারী—লীলাবতী, কবি চন্দ্রাবতী, রাস সুন্দরী দেবী, নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ইলামিত্র, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা, বেগম সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম এবং শেখ হাসিনা। কম্পোজিশেনের পর আবার ভেসে উঠে সেই শুরুর দিকের বর্ণনা—আমি মহাস্থান…। তারপর সেই জনপ্রিয় সংগীত ‘আমি জন্মেছি বাংলায়/ আমি বাংলায় কথা বলি গান’ এবং সর্বশেষ জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে পরিবেশনাটির সমাপ্তি ঘটে।

এ উপস্থাপনাকে ‘নাটক’ শব্দে উল্লেখ না করে ‘পরিবেশনা’ বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত। এতে নাট্যকার মূলত ইতিহাসের পরম্পরায় মনোযোগী হয়েছেন। সেজন্য একক কোনো ঘটনার বিকাশ না ঘটিয়ে প্রতিটি বিষয়ের ছোট্ট ছোট্ট, আঁচ করে ইতিহাসের প্রবহমানতা দেখিয়েছেন। কোনো চরিত্র নির্ভর একক কোনো অস্তিত্ব এ নাটকের নেই। আছে সমগ্রতার বিকাশ। এটি একধরনের ‘পারফরমেন্স’ বা পরিবেশনা যেখানে নানা উপাদান ও কৌশলে অখণ্ড এক বিষয়কে উপস্থাপন করেছে। সমগ্রটা দিয়ে নাট্যকার প্রকৃত অর্থে ইতিহাসের পুনরুত্থানই ঘটিয়েছেন। সেলিম মোজহার বাংলাদেশের প্রথিতযশা নাট্যকার না হলেও এই একটি নাটকই তাকে উত্তীর্ণ করেছে নাট্যকারের পরিচয়ে।

নির্দেশক লিয়াকত আলী লাকী ভাসু বিহারের বিশাল স্থান, তিনশতাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী, শতশত আলোক, মিউজিক, ইলাস্ট্রেশন, ভিডিওগ্রাফিসহ সমস্তটার মধ্যদিয়ে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। প্রায় আদিবাসী জীবন থেকেই নানা ঘটনাগুলো নাটকীয়তায় সমকাল পর্যন্ত তুলে ধরতে সচেষ্ট ছিলেন। অনবদ্য অভিনয়, কোরিওগ্রাফি, নৃত্য-গীতে অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে বাঙালির ইতিহাস। সম্প্রীতগত জায়গা থেকেও হাজার বছরের বাঙালিরা যে অহিংস এবং অসাম্প্রদায়িক তারও একটি রূপরেখা তৈরি হয়েছে এ পরিবেশনায়। নির্দেশক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘পৃথিবীতে এভাবে আর্কিও ড্রামার ইতিহাস নেই। এর কাজ প্রত্ন-ইতিহাসকে দৃশ্যকাব্যে রূপান্তরিত করে শিল্পে রূপ দেয়া। মহাস্থানের গৌরবোজ্জ্বল আখ্যানের ভিতর দিয়ে সমগ্র বাঙলার মহাস্থান হয়ে ওঠার গল্প। মহাস্থান, কোটি বছরজুড়ে এ-মটির জেগে ওঠার কথা। হাজার হাজার বছর ধরে তার মানব বসতির কথা।’ অত্যন্ত নান্দনিকতায় উপস্থাপিত হয়েছে বাঙালির গৌরবগাঁথা। ইতিহাসের দৃশ্যকাব্য উৎকলনে লিয়াকত আলী লাকী নিঃসন্দেহে সার্থক। বিশাল পরিসরে বিস্তর উপকরণে এত চমৎকারভাবে উপস্থাপন নির্দেশকের সৃজন ও নেতৃত্বের অসীম গুণকেই প্রকাশ করে।


অত্যন্ত নান্দনিকতায় ফুটে উঠেছে ইতিহাসের এ নতুন পাঠ। উপস্থাপনা কৌশলে আবহমান বাংলা নাট্যরীতিকেই ঔজ্জ্বল্য করেছেন নির্দেশক।


‘মহাস্থান’ পরিবেশনা মূলত নির্দেশকের সৃজন অভিঘাত। নির্দেশক লিয়াকত আলী লাকী অত্যন্ত কুশলী সমন্বয়ক। পরিবেশনার আলাদা আলাদা ক্ষেত্রভিত্তিক আলাদা আলাদা ইউনিট তৈরি করেছেন। প্রতিটি ইউনিট একজনের তত্ত্বাবধানে কয়েকজন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল। ফলে অতি সহজেই সামগ্রিকতার এক চমৎকার সমন্বয় ঘটে নাটকটিতে। এ প্রযোজনার সহকারী নির্দেশক ছিলেন সম্রাট প্রামাণিক ও আলি আহমেদ মুকুল। এ উপস্থাপনাটির টিমওয়ার্ক এত চমৎকার ছিল যা সত্যি অকল্পনীয়। সমন্বিত এ উপস্থাপনা বলে একে একক চরিত্র কেন্দ্রিক বিশ্লেষণ করা দুরূহ। ইতিহাসের পরম্পরায় নাট্যক্রিয়া গতিশীলতায় অসংখ্য ঘটনাগুলো রূপায়িত হয়েছে। সে প্রতিটি ঘটনারই অসংখ্য চরিত্র রয়েছে। প্রায় আড়াই ঘণ্টার এ নাটকটিতে প্রায় ৭০০-৮০০ চরিত্রের সমাগম ঘটেছে। বিশাল ক্যানভাসের বিশাল স্পেসে হবার কারণে ঘটনাটিই মূর্ত হয়ে উঠেছে বেশি। চরিত্র ও তার ক্রিয়াগুলো আলাদা গুরুত্ব না পেলেও অভিনয়িক কোনো ঘাটতি ছিল বলে মনে হয় নি। সমস্ত নাটকটির অডিও ছিল রেকর্ডেড। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ঠোঁট মিলিয়েছেন বটে। চমৎকার সামগ্রিক সমন্বয় ছাড়া এত বড় প্রোডাকশন কখনোই সম্ভব হতো না। ব্লকিং কিংবা কোরিওগ্রাফিক মাত্রাগুলোও অত্যন্ত পরিমিত, নান্দনিক। এ নাটকে আলো সবচেয়ে গুরুত্ববহ ভূমিকায় ছিল। প্রায় পাঁচ শতাধিক লাইট ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে। কিন্তু এত চমৎকারভাবে চরিত্রগুলো, ঘটনা ও তার আবেগকে আলোকিত হয়েছে নাট্যবিষয়কেন্দ্রিক তা অত্যন্ত মেধা ও পরিশ্রম সাপেক্ষ। আলোর দায়িত্বে ছিলেন ঠাণ্ডু রায়হান ও জুনায়েদ ইউসুফ। পোশাক ও প্রপস এক কথায় অসাধারণ। কালানুক্রমিক, সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক মূল্যবোধ সম্পন্ন হাজার হাজার প্রপস নির্মাণ দেখে চোখ ছানাবড়া হবার উপক্রম। ভাসু বিহারের সমস্ত স্থানই মঞ্চ হিশেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে সম্মুখ-মধ্য ভাগে একটি কৃত্রিম মঞ্চও তৈরি করা হয়েছিল উপস্থাপনার সুবিধায়। প্রায় বারোর অধিক জোন নাট্যক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়েছে। মঞ্চের চারপাশে কোথাও সাজঘর না থাকলেও কখনো চরিত্রের প্রবেশ-প্রস্থানে কৃত্রিমতা তৈরি হয় নি। অত্যন্ত নান্দনিকতায় ফুটে উঠেছে ইতিহাসের এ নতুন পাঠ। উপস্থাপনা কৌশলে আবহমান বাংলা নাট্যরীতিকেই ঔজ্জ্বল্য করেছেন নির্দেশক। কখনো বর্ণনা, কখনো চরিত্রাভিনয়, কখনো পুঁথি গান নানা বৈচিত্র্যেই। এটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে শিল্পকলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে।

এ পরিবেশনাটিকে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ নাট্য পরিবেশনা বলাও যেতে পারে। এতে ভাসু বিহারের প্রায় তিনহাজার ফিট আয়তনের নানা ডিবির বারোটি অভিনেয় স্থানে, প্রায় সাড়ে তিনশত অভিনেতা-অভিনেত্রী, পাঁচশতাধিক আলোক প্রক্ষেপণ সোর্স, ইলাস্ট্রেশন আর্ট, স্যাডো চিত্র, কালারফুল পোশাক, নানা ব্যঞ্জনায় সেট, বিভিন্ন সময়ের বিচিত্রভঙ্গিম প্রপস-মুখোশ, অডিও-ভিডিওগ্রাফি প্রজেকশন, পাঁচশতাধিক ছোট-বড় স্পিকার, নানা মাত্রায় বৈচিত্র্যপূর্ণ কোরিওগ্রাফি-চলনবিন্যাস, নানা বৈচিত্রের নৃত্য, সুর-গীতের পরম্পরা, অভিনয়সহ সামগ্রিকতার সুসমন্বয়ে দু ঘণ্টা বিশ মিনিট সময়সীমায় প্রায় তিন হাজার বছরের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস অনবদ্য টানটান নাট্যমুহূর্তে তুলে ধরলেন নির্দেশক। সে এক অবিশ্বাস্য রকমের অভিজ্ঞতা। নাটকের সাধারণী সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে  এ মহানাটক। প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যমুখী নাট্য পরিবেশনা। অনন্য বিচিত্রভঙ্গি নান্দনিক শিল্পপ্রয়াস। তবে মনে রাখতে হবে, শিল্পনির্মাণের রাজনীতিতে যেন ক্ষমতা বা দলীয় রাজনীতির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কৌশল বা রিপ্রেজেন্টেশন না থাকে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে নানা বৈচিত্র্যের নানা মাত্রিক শিল্পকৌশলের প্রয়োগ ঘটেছে। কিন্তু এ ‘মহাস্থান’র মতো এত বৃহৎ পরিসরে এত বৃহৎ সমন্বিত পরিবেশনা আর উপস্থাপিত হয় নি। সেদিক থেকে বাংলাদেশের নাট্যচর্চার ইতিহাসে এক মাইফলক সংযোজন। আমরা এ পরিবেশনা থেকে শিল্পকৌশলে কিভাবে হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিকাশ ঘটাতে পারে তার একটি শিক্ষা নিতে পারি। এমন গুরুত্ববহ প্রযোজনা মাত্র একটি-দুটি শো-তেই শেষ হয়ে যাবে তা আমাদের কারো কাম্য নয়। অধিক প্রদর্শনীর প্রত্যাশা করি। নানা নিরীক্ষা, নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নাটক আত্মপরিচয়ে বিশ্বে বিকশিত হোক সে প্রত্যাশা আমাদের সবার।

আবু সাঈদ তুলু

জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৯; জামালপুর । তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্য-শিল্পের প্রতি অনুরাগী। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখে আসছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

প্রকাশিত বই :

লিপির উদ্ভব, ক্রমবিবর্তন ও বাংলা লিপির পরিণত পর্যায় [প্রবন্ধ; অন্তরীপ পাবলিকেশন, ২০০৭]
বিপ্রলব্ধ [উপন্যাস; শিখা প্রকাশনী, ২০০৮]
রূপান্তরবাদ [শিখা প্রকাশনী, ২০০৯]
অনন্তপথের যাত্রী [ভাষাচিত্র, ২০১৪]
জলের আয়না [ভাষাচিত্র, ২০১৫]
পাতার বাঁশি [লিটলবিট, ২০১৭]
সেলিম আল দীনের সাহিত্য ভাবনা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮]

ই-মেইল : tuluart@yahoo.com