হোম নাটক মরমী হাছন রাজার মঞ্চভ্রমণে

মরমী হাছন রাজার মঞ্চভ্রমণে

মরমী হাছন রাজার মঞ্চভ্রমণে
537
0

কিংবদন্তি নিয়ে নাটক নির্মিত হলে স্বভাবতই আগ্রহের কমতি থাকে না। নতুন এসব নাট্যপ্রদর্শনীতে বেশ জোয়ার পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজ কিংবদন্তির চরিত্র নিয়ে যতগুলো নাটকই নির্মিত হয়েছে তার প্রায় প্রতিটি নাটকই দর্শকনন্দিত ও মঞ্চসাফল্য অর্জন করেছে। বিদেশেও প্রভূত সুনাম কুড়িয়েছে। আরজ চরিতামৃত, বিনোদনী দাসী, খনা, লীলাবতী আখ্যান, বেহুলার ভাসান, মহাজনের নাও প্রভৃতি কিংবদন্তি নির্ভর প্রযোজনাগুলো তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। সম্প্রতি ঢাকার তারুণ্যদীপ্ত নাট্যদল ‘প্রাঙ্গণেমোর’ মরমী সংগীতসাধক হাছন রাজাকে নিয়ে ‘হাছনজানের রাজা’ শিরোনামে মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন। গত ২০ এপ্রিল ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে নাটকটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। এ নাটকটি রচনা করেছেন শাকুর মজিদ এবং নির্দেশনা দিয়েছেন অনন্ত হীরা। ইতঃপূর্বে শাকুর মজিদের বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে রচিত ‘মহাজনের নাও’ মঞ্চে অত্যন্ত আলোচিত ও বহুল প্রশংসিত নাটক। স্বভাবতই দর্শকের আগ্রহের কমতি ছিল না। উদ্বোধনের পরই ‘হাছনজানের রাজা’ নাটকটি নিয়ে নানা রকমের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এমনকি হাছন রাজার আত্মীয়-স্বজনদের কাছেও নাটকটি নিয়ে বিরূপ মন্তব্য প্রকাশ পায়। অতি তরুণ কিছু নাট্যকর্মী এ প্রযোজনাকে শিল্পকুশলতার গণ্য করতে চান। এ নাটকটি গত ২৬ জুন, ২০১৮ তারিখে শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল মঞ্চে চতুর্থ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ওই প্রদর্শনীর ওপর ভিত্তি করে পরিবেশনাটি কেমন, কী আছে নাট্যে, কিভাবে নাটকে হাছনরাজার জীবন-চরিত কিংবদন্তি প্রতিরূপায়িত হয়েছে, নাট্যআখ্যানের ধরন, উপস্থাপনায় কী কৌশল অবলম্বন করেছেন নির্দেশক; এছাড়াও অভিনয়, মঞ্চসজ্জা, শিল্পমূল্যসহ উপযোগিতার স্বরূপ অনুসন্ধানেই আমরা লেখাটিতে ব্যাপৃত হব।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রাম্য গীতিকবি হিসেবে ১৯২৬ সালে প্রথম সবার সামনে তুলে ধরেন হাছন রাজাকে।


উদ্বোধনের দিন লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়লেও ২৬ জুন প্রদর্শনীতে অতি উপচেপড়া দর্শক ছিল না। উদ্বোধনী পূর্ব থেকেই প্রাঙ্গণেমোর ফেসবুকে বেশ বিজ্ঞাপন করছিলেন তাদের এ নতুন প্রযোজনা হাছন চরিত নিয়ে। ফেসবুকে হাছন রাজার নানা ‘কোড’ তারা এমনভাবে ব্যবহার করছিলেন ফলে সহজাতই নাট্যকর্মীদের মধ্যে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানেসহ বিজ্ঞাপনে বারবার এটাও বলা হচ্ছিল হাছনজান কারা? কিংবা যে পিয়ারীর প্রেমে যে হাছন রাজা মজেছিল বলে গানে উল্লেখ পাওয়া যায় সে পিয়ারী আসলে কে? তাদের নাটকের নাম ‘হাছনজানের রাজা’ কেন। দার্শনিক ভিন্ন পরিপ্রক্ষিতমূলক আকর্ষণ ছাড়াও নানা কারণে নানা ভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ছিল নাট্যকর্মী ও দর্শক। অস্থির হয়ে উঠেছিল নাট্যকার-নির্দেশক কিভাবে হাছন রাজাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে তা দেখার জন্য। অধীর অপেক্ষার ইতি ঘটে মঞ্চ দর্শক আসনের সারিতে আসন গ্রহণ করে। দর্শকের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে তখন হাছন রাজার কিছু গানের স্মৃতি। কারো কারো বাংলা একটি সিনেমা। প্রবেশের পথেই দর্শকের হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি সুভ্যেনির। যাতে শুধু নির্দেশকের কয়েকটি কথা এবং ক্রেডিট লিস্ট। যা একই সঙ্গে টিকিট হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।

HJR-1

বাংলা মরমী সংগীত জগতে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের তিন সাধক রাধারমণ দত্ত [১৮৩৩-১৯১৫], হাছন রাজা [১৮৫৪-১৯২২], শাহ আবদুল করিম [১৯১৬-২০০৯] অত্যন্ত সুপরিচিত। স্বনামে প্রত্যেকে সুবিদিত হলেও এদের মধ্যে হাছন রাজার নাম বিশেষভাবে আলোচিত। তার গানে আত্মার স্বরূপ ও মানবমুক্তি অদ্বৈত ব্যঞ্জনায় বিদ্যমান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রাম্য গীতিকবি হিসেবে ১৯২৬ সালে প্রথম সবার সামনে তুলে ধরেন হাছন রাজাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উল্লেখ করেন, ‘পূর্ববঙ্গের একটি গ্রাম্য কবির গানে দর্শনের একটি বড় তত্ত্ব পাই—সেটি এই যে, ব্যক্তিস্বরূপের সহিত সম্বন্ধসূত্রেই বিশ্বসত্য।’ যদিও জমিদারী ও গানের সূত্র ধরে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন সিলেট অঞ্চলে। তবুও রবীন্দ্রনাথের দুটো বক্তব্যের ধারায় ধীরে ধীরে আলোচিত হয়ে ওঠেন হাছন রাজা। ‘লোকে বলে বলেরে, ঘর বাড়ি ভালা নাই আমার; কি ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ও মাঝার’ ‘বাউলা কে বানাইলোরে হাছন রাজারে বাউলা কে বানাইলো রে’, ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে’, ‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপরে’, ‘সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইল’, ‘কানাই তুমি খেইর খেরাও কেনে’, ‘একদিন তোর হইব রে মরণ রে হাছন রাজা’, ‘নিশা লাগিলো রে; বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলো রে; হাছন রাজা পিয়ারির প্রেমে মজিলো রে’ ইত্যাদি গান এখনো বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে সর্বাধিক প্রচলিত ও জনপ্রিয়।

হাছন বা হাসন নামের বিতর্ক থাকলেও হাছন রাজার প্রকৃত নাম দেওয়ান হাসন রাজা [১৮৫৪-১৯২২]। তিনি ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের রামপাশা লক্ষ্মণছিরি দুই মিলে পাঁচ লাখ বিঘার জমিদার। কিশোর বয়সেই প্রথম বড় ভাই ও পরে বাবা মারা গেলে বাবা ও মা দুই পক্ষের বিশাল জমিদারীর মালিকানা পেয়ে যান। ফলে সম্পদ ও ক্ষমতার দাপটে সে বয়সেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তিনি। অত্যাচার ভোগবিলাস নারীলিপ্সা তার জীবনের অঙ্গাঙ্গী হয়ে ওঠে। কিন্তু মধ্য পঞ্চাশে এসে হঠাৎ করেই চিন্তা জগতের আমূল পরিবর্তন ঘটে তার। তিনি জগৎ সংসারে অনাচারের মূল হিসেবে অতিরিক্ত সম্পদকেই দেখতে পান। আকস্মিত মায়ের মৃত্যুকে গভীরভাবে বেদনাহত হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতি তার মোহ কেটে যেতে থাকে। তিনি হয়ে উঠতে থাকেন অন্য আরেক মানুষ। হাছন রাজা তার সম্পদের সিংহভাগ মানব কল্যাণে উইল করে দেন। ধীরে ধীরে সমাজ-সংসার থেকে বিচ্যুত হতে থাকেন। এ সময় বর্ষায় হাওরে সাধনসঙ্গিনী নিয়ে দিনের পর দিন ভাসতে থাকেন। ক্ষণজীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ হাছন রাজা যেন নিজেকেই খোঁজে ফেরেন গানে। বৈরাগ্য জীবন সাধনায় তিনি সৃষ্টিকর্তাকেই আবিষ্কার করেন। তা যেন তার নিজের মধ্যেই বাস। গানের মধ্যদিয়ে তার মরমী দার্শনিক সত্তার বিকাশ লাভ করে। এ পর্যন্ত তার প্রায় ছয় শতাধিক গানের সন্ধান পাওয়া গেছে।

HJR-2

শাকুর মজিদ রচিত ‘হাছনজানের রাজা’ নাটকটি মূলত এক রাতের কাহিনি। হাওর অঞ্চলে নাকি কিংবদন্তি আছে—বর্ষার পূর্ণিমার রাতে হাওরে হাছন রাজা তার সাধনসঙ্গিনী নিয়ে গান করতে ফিরে আসেন। ঢাকা থেকে হাওর অঞ্চলে হাছন রাজাকে জানতে যাওয়া একদল তরুণ-তরুণীর মধ্যে পূর্ণিমার রাতে হাছন রাজা ফিরে আসেন নাটকে। কোরাস, কথোপকথনের ধারায় তার জীবনের কাহিনিগুলো বিবৃত হয় এতে। তারপর ভোরের সূর্যের আলোয় হাছন রাজাকে আর পাওয়া যায় না। হাওরের পূর্ণিমার একরাতে হাছন রাজা চরিত্রের জবানিতে নাটক বিবৃত। নাট্যকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে যে পিয়ারীকে সবাই হাছনজান হিসেবে জানে সে আসলে হাছন রাজা। তারই ভেতরের সত্তা। পিয়ারী হাছনজানের ভেতরেই প্রকৃত হাছন রাজা বিরাজমান। তাই নাটকের নামকরণ করেছেন ‘হাছনজানের রাজা’। পয়ার ছন্দে গীতির আলেখ্যে নাট্যটি রচিত। নাট্যকার এটিকে গীতি-কাব্যনাট্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। শাকুর মজিদ নাটকটি উৎসর্গ করেছেন এ দলের কর্ণধার অনন্ত হীরা ও নূনা আফরোজকে। এ নাটকটি প্রাঙ্গণেমোর নাটদলের ১৩তম প্রযোজনা। এ নাটকের মঞ্চ পরিকল্পনা করেছেন ফয়েজ জহির; সংগীত পরিকল্পনা রামিজ রাজু, আলোক পরিকল্পনা তৌফিক আজীম রবিন এবং পোশাক পরিকল্পনা করেছেন নূনা আফরোজ। এ ‘হাছনজানের রাজা’ নাটকটিতে অভিনয় করেছেন রামিজ রাজু, আউয়াল রেজা, মাইনুল তাওহীদ, সাগর রায়, শুভেচ্ছা রহমান, সবুক্তগীন শুভ, জুয়েল রানা, আশা, প্রকৃতি, প্রীতি, সুজয়, নীরু, সুমন, বাঁধন ও রুমা। নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন অনন্ত হীরা।

শুরুতেই মঞ্চে আলোয় ফুটে ওঠে ভরা বর্ষার জোছনালোকিত হাওড়। হাছন রাজা সুনামগঞ্জের হাওড়ে বর্ষায় দিন পর দিন ভাসতেন; সংগীত করতেন। মঞ্চে নীল রঙের বজরার সিম্পল। মঞ্চের দু পাশে সম্মুখভাগে বজরার দুই মাথা বা গুলুই। মাঝখানে উঁচু তিনস্থরের পাটাতন। পাটাতনে দুটো গিটার, ঢোল ও জিপসি রাখা। বজরাটির সব অংশেই চোখের নানা রকমের সিম্বল। মঞ্চে এ পাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত রশি দিয়ে একটি নৌকার প্রতীকে আটকে রেখেছে। সমস্তটি মিলে বজরায় হাওড়ে ভাসার সমূহ পরিবেশ। পিছনে সাদা পর্দা তারও পেছনে সাদা সায়াক্লোমা। পানির শব্দের মধ্যদিয়ে গল্পে প্রবেশ। মধ্যমঞ্চে নৌকার পাটাতনে অনেক তরুণ-তরুণী। কারো হাতে গিটার, কারো হাতে, কাঁধে ক্যামেরা। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে সাংবাদিক, চিত্রপরিচালকসহ বিভিন্ন পেশার এ তরুণ অনুসন্ধিৎসু দল হাছন রাজার তথ্যানুন্ধানেই ব্যাপ্ত। ‘ছাড়িলাম হাছনের নাওরে/ আরে বৈঠা ফালাইতে নারে শূন্যে করে উড়ারে’ হাছন রাজার এ গানের রূপক ভাব-ব্যাজস্তুতির মধ্যদিয়ে নাটকের শুরু। গান ও কথোপকথনে ফুটে উঠতে থাকে হাছন রাজার নানা দিক। তবে হাছন রাজা নারীভোগ লিপ্সাই যেন প্রধান প্রসঙ্গ হিসেবেই গুরুত্ব পায়। তরুণ তরুণীদের পরিচয় পাওয়া না গেলেও পোশাক পরিচ্ছদ, কথার ধরন, আচরণে এ সময়ের আল্টা মডার্ন হিসেবেই তাদের মনে হয়। এমন ভরা পূর্ণিমায় উনিশ শ বাইশের তিরোধান পরেও হাছন রাজাকে নাকি সুরমার পাড়ে কুড়া শিকারে, লাউডের বনে কিংবা ডুগডুগি বাজায়া অষ্টসখী সনে নাচতে দেখেছে। এটা এখন বর্ষাকালীন হাওড় অঞ্চলের মিথ। এক অধিবাস্তবিক ভাববস্তুর মধ্য দিয়ে দর্শক প্রবেশ করতে থাকেন হাছন রাজার জীবন চরিতে। সবার যেন অপেক্ষা। হাছন রাজা আসবে। কেউ ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়; কেউ বা ভিডিও ক্যামেরা রেড়ি করে অপেক্ষা করতে থাকেন। তবে নাটক দেখতে দেখতে প্রশ্ন জাগে—এ তরুণ প্রজন্ম কারা? পোশাক পরিচ্ছদ ও আচরণে আমাদের অনেকেরই অচেনা মনে হবে হয়ত। এ কী সমকাল। এ প্রজন্ম প্রসঙ্গটি ভিন্ন মাত্রা পেলেও প্রশ্ন থাকে যে, সমকালীন পপ কালচারের সঙ্গে হাছন রাজার প্রসঙ্গ আনার বিরোধাভাষ কিংবা বৈপরীত্যের প্রতীকী অর্থ দর্শকের কাছে সুস্পষ্ট করে তুলে কী না তা বিবেচনায় রাখতে হবে। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে হাছন মিথস্ক্রিয়ায় নাট্যকার-নির্দেশক দর্শককে কী বুঝাতে চান তা জরুরি। নাট্যকার নতুন দর্শক প্রজন্মের কাছে কী সংকেত, কী ভাষা কিংবা কী ইমেজ এবং কিভাবে তুলে ধরছেন সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

HJR-3

এমন সময় হঠাৎই ঢোলক, করতাল ও হারমোনিয়ামে ‘নেশা লাগিল রে নেশা লাগিল রে, বাঁকা দুই নয়নে নেশা লাগিল রে।’ গানের সুর শোনা যায়। গানের শব্দে মাঝি হাছন রাজার আগমনের সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেন। মাঝি চরিত্রটি অত্যন্ত সাদা-মাটা। সাদা রঙের লুঙ্গি পরিহিত গায়ে সবুজ রঙের গ্রামীণ স্টাইলের শার্ট আর গলায় লাল গামছা ঝুলানো। এ মাঝি চরিত্রে অভিনয় করেছে আওয়াল রেজা। অত্যন্ত বাচনিক দক্ষতা তার অভিনয়ে। মাঝি চরিত্রটিই কখনো কখনো মনে হয়েছে রূপক। চরিত্রটির পরিচয়ে সুস্পষ্টতার অভাব থাকলেও রবীন্দ্রনাথের ঠাকুর চরিত্রের মতোই নাটকের মূল বিষয়, গতি কিংবা কাহিনির নানা বাঁকগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছে। নাট্যকারের লেখা হাছন রাজার অনেক সংলাপও অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে এ মাঝি চরিত্রের জবানিতে।

কাহিনি এগিয়ে চলে। পিছনে স্পট লাইটের আলোয় ভিন্ন রজরার সিম্বলে বেগুনি রঙের আলখাল্লা পড়া কাঁচা-পাকা চুল দাড়ি ও গোঁফ সমেত হাছন রাজাকে দেখা যায়। যদিও হাছন রাজা ছিল পিছনে তবুও মঞ্চের তরুণ তরুণী তখন যথাক্রমে বাঁ পাশ ও পরে ডান পাশে উইংসে খুঁজতে থাকে তাকে। ঠিক এমন মুহূর্তে দুপাশে চারজন রমণী নিয়ে রেকর্ডকৃত সংগীতের সাথে নৃত্য করতে করতে মঞ্চে প্রবেশ করেন হাছন রাজা। সিনেমাটিক মডার্ন ডান্স। বাংলা ও হিন্দি সিনেমায় নৃত্যের এ মুদ্রা এবং চলনগুলো সাধারণত দেখা যায়। আর প্রশ্ন উঠে মনে—হাছন রাজা কী এত চমৎকারভাবে নৃত্য পারত! মরমীভাবের এমন ধ্রুপদী সংগীত মানস নাট্য উপস্থাপনায় সিনেমাটিক নৃত্য না হয়ে ধ্রুপদী মুদ্রা-নৃত্যচলন পরিবেশ সৃষ্টিতেই সহায়ক হয়ে উঠতে পারত। তবে এ মডার্ন ডান্স বেশ প্রাণোচ্ছলই ছিল। নাটকের আবহ মিউজিকের ক্ষেত্রেও সেরকম প্রবণতাই দেখা গেছে। সমস্তটাই ছিল রেকর্ডকৃত মডার্ন মিউজিক। বাঙালি কিংবদন্তির চরিত্রের আবেগ প্রকাশে ইউরোপীয় বায়োলিন বাজানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তাও আবার মরমী সংগীত ব্যক্তিত্বের। আর তরুণ তরুণীর দল হাছন নিয়ে অনুসন্ধিসুর বিপরীতে নৃত্যে মেতে ওঠেন এসময়। বিবৃত হয়ে ওঠতে থাকে হাছন রাজার সাধনসঙ্গিনী প্রসঙ্গ।

HJR-4

হাছন রাজার চরিত্রে অভিনয় করেছেন রামিজ রাজু। অসাধারণ মেধাদীপ্ত তার অভিনয়। স্বতঃস্ফূর্ত ছিল তার চলনগুলো। পার্শ্ব অভিনেতা ও মঞ্চ ক্রিয়ায় ছিলেন অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ। চরিত্রের বয়সজনিত পার্থক্যগুলো সুস্পষ্ট না হলেও আবেগগুলো অত্যন্ত সহজ-সরলভাবে তার দেহভঙ্গিমায় প্রকাশিত হয়েছে। স্বর প্রক্ষেপণে নাসিক্য প্রভাব অধিক ছিল। উদ্ভট আচরণগুলো যেন হাছন রাজার চরিত্রের উদ্ভট মানবিকতাগুলোই প্রকাশ করেছে। চরিত্রকে ধারণ ও উপস্থাপনে যথেষ্ট নিষ্ঠা ছিল তার। স্ট্যান্ডবাজি কিংবা ফাঁকির প্রবণতা লক্ষ করা যায় নি। তখন কেউ মোবাইলে ছবি, কেউ ভয়েস রেকর্ডার, নোটবুক, হ্যান্ডিক্যাম কিংবা কেউ সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। হাছন রাজা ভিন্ন অনুরোধ করে, ‘আজকের এই মহা পূর্ণিমায় যদিবা হইল মুলাকাত। যতক্ষণ চান আছে আসমানে আর তোমরা সাক্ষাৎ। সকলেরি নিয়া আমি ভাসিমু হাওড়। সঙ্গে মোর সঙ্গী যত, তার সঙ্গে তুমরা তত, মিলেমিশে চল আজ ভাসাই বহর।’ সঙ্গে সঙ্গে ড্রামে তাল পড়ে। সবাই উচ্ছ্বসিত। ধীরে ধীরে সবাই তখন ‘ভাসতে শুরু করে হাছন চেতনের নাও’-এ। নাটক তখন মূল আখ্যানে স্নাত হতে থাকে।

কোরাস, প্রশ্ন, গান ও নৃত্যের ফাঁকে ফাঁকে হাছন রাজা বলতে থাকে তার জীবনের ঘটনাগুলো। বংশ পরিচয় দিয়েও শুরু হয় কথন। ‘তিন পুরুষ আগে মোরা হিন্দু ছিলাম; বীরেন্দ্র সিংহ দেব ছিল যার নাম।’ ‘আলী রেজা ছিল মোর পিতাজির নাম; ব্রিটিশ রাজার ঘরে খাজনা তোলার কাম।’ ‘হুরমত জাহান বানু মাতাজি আমার; ঈসা খার বংশে ছিল জমিদারি তার।’ চরিত্রের অস্বাভাবিক নানা প্রবণতাগুলো রামিজ রাজুর অভিনয়ে ফুটে উঠতে থাকে। অশ্লীল ও স্বল্পশিক্ষার বিষয়টিও নানা শব্দ ব্যবহারে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। ‘ফুুটানি’ শব্দ নিয়ে সবার মধ্যে যেন আলাদা একটি হাস্যরসের তৈরি হয়। বর্ণনা করতে থাকেন কিভাবে তার নাম রাখা হয়। ভাই মারা যায় এবং তার চল্লিশ দিনের মাথায় তার বাবা আলী রেজা মারা যায়।’ ‘রামপাশা লক্ষ্মণছিরি দুই মিলে আর; পাঁচ লাখ বিঘা নিয়া হাছন জমিদার।’


জগতের প্রতি বৈরাগ্যে তিনি নিজের সম্পদের একটা অংশ উত্তরসূরিদের জন্য এবং বাকি সিংহভাগ অংশই জনহিতকর কাজে উইল করে দেন।


হাছন রাজা লম্পটিয়া প্রসঙ্গে গর্বভরে জানায় ‘আমি যখন কিশোর; শ্রীমান কৃষ্ণ এসে মোরে করে ভর। যমুনা না থাক, আমি সুরমার পাড়ে; ওত পেতে বসে থাকি রাই শিকারে।’ হাছন রাজা তার ভোগ-বিলাস প্রসঙ্গে আরো বলেন—ক্ষমতা যাহার ছিল শক্তি ছিল দখল করবার; সুলেমান নবীর ছিল পত্নী হাজার; ষোল শ গোপিনী ছিল কৃষ্ণের বাহার।’ নারীভোগ লিপ্সা যেন অহংকারের সূত্রেই গৌরবত্ব বহন করে হাছন রাজার। মাঝি বারবার প্রসঙ্গের অবতারণা ও ব্যাখ্যায় কাহিনিগুলোর গতিপথ নির্ধারণ করতে থাকেন। গীতের সঙ্গে সুরমা নদীর পাড়ে হাছন রাজার ‘রাই শিকার’ বা নারীলোলুপতা অত্যন্ত নান্দনিক প্রতীকী কোরিওগ্রাফিতে ফুটে ওঠে। ‘সুন্দরী রাধে গো সুন্দরী রাধে’ গানের সাথে প্রতীকী নৃত্যের অপরূপ এক সৌন্দর্যলীলায় দর্শক যেন হারিয়ে যান কিছু সময়ের জন্য।

HJR-5

বিভিন্ন জনের প্রশ্নের উত্তরে একের পর এক বলতে থাকেন জীবনের নানা দিক। নানা স্মৃতি আওড়াতে থাকে হাছন রাজা। এক উদ্ভট মানসিকতায় সারাক্ষণ আচ্ছন্ন। নিজে প্রতিষ্ঠানে না পড়লেও পারিবারিক পড়াশোনা ছিল তার। নিজে না লিখলেও মহুরি লিখে দিতেন। বড় বোন কবি ছিলেন। হাছন রাজা বলতে থাকেন তিনি নারীদের স্বভাব ও চরিত্র নিয়ে তার প্রথম গ্রন্থ সৌখিন বাহার। নারী চরিত্র কৌতূহলী তরুণ তরুণী তখন নতুন এ কৌতূহলে অধীর হয়ে ওঠেন। হাছন রাজা তার সৌখিন বাহার থেকেও উদ্ধৃত করে শোনান—‘মধ্য ক্ষীণা, ভাসা আখি, পদ্মিনী কামিনী; পতিহীনা হইলেও সে শ্রেষ্ঠ রমণী। মাথা ছোট আওরত, বে-আক্কল হয়; বাট্টী আওরত দোষণীয়, সর্বলোকে কয়। বাট্টী, হালকা যেসব আওরত হয়; তাহাদের খারাবির কথা, শরীরে না সয়। নাকের আগা মোটা যে আওরতের হইল; সে আওরত বিবাহ কৈলে প্রাণখানি গেল। মুখ ছোট, চক্ষু, কর্ণ যদি ছোট হয়; ছোট যত হইবেক, সবে মন্দ কয়। দন্ত উঁচা হইলে ক্বচিৎ মূর্খ হয়; সুন্দর হইলে নারী, সতী নাহি রয়।’ হাছন রাজা এ তরুণ তরুণীর কাছে যেন অযৌক্তিক বা অযাচিতর মতোই একের পর এক বলে যেতে থাকেন নিজের ভোগ বিলাস ও হীন চরিত্রমানসিকতার কথা। সাথে সাথে আবারও ‘সোনাবন্ধে দেওয়ানা বানাইছে’ গানের সাথে নৃত্য ও কোরিওগ্রাফিতে ভিন্ন আরেক মাত্রা পায়। এমন মডার্ন নৃত্য কুশলতা হাছন চরিত্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মাঝিও কৌতুক করে হাছন রাজাকে ‘রমণীমোহন’ বলে আখ্যা দেন। এমন সময় এক তরুণী প্রশ্ন করে হাছন রাজা নাকি রেপ কেইসেও পড়ছিল। হাছন রাজা সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়। ‘‘এমন ঘটনা হলে থাকে কি মান? সেই বেটি ফাঁসাই ছিল, নাম—‘সুরজান’’’। মাঝির মধ্যস্থতায় কাহিনি ফুটে উঠতে থাকে। অন্য জমিদারের ছিল চক্রান্ত। সে জমিদারের সঙ্গে সংঘাতটিও কোরিওগ্রাফিতে তুলে ধরেছেন নির্দেশক। লাঠির কাজ ও ড্যান্সের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পায়। টুপি ও নতুন গাউন করে আবার মিউজিক, নৃত্য ও কোরিওগ্রাফির কারিশমায় চমৎকারভাবে ফুুটে ওঠে সুরজানের প্রতি প্রীতি। নারীপ্রীতির নানা প্রতীকী ব্যঞ্জনাও এতে নানাভাবে বিধৃত। ঘটনায় হাছন ছিল না এমন রায়ের মাধ্যমে কিভাবে উদ্ধার পেয়েছিল সে প্রসঙ্গও আলোচনায় স্থান পায়। ‘ইজ্জত’ যাওয়ার মধ্য দিয়ে হাছন রাজা আত্মসম্মানবোধেও পরিচয় প্রথম স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ নাটকে। নাটকের প্রবণতায় অন্যতম ছিল হাছন রাজার নারী কেন্দ্রিক নানা বিষয়ের আবর্তন। অতঃপর মৃত্যুর প্রসঙ্গ আসে। ‘তোমার লেবাসে নাচে অন্য কেউ’ এমন এক ধরনের বৈরাগ্য ভাবনা নাটকটিকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করে। নাটকে উনিশ শ বাইশে মৃত্যুর পরের নানা ঘটনাও আলোচনায় ওঠে আসে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রসঙ্গও গুরুত্ব পায়।

HJR-6

জমিদারী কী হলো সে প্রসঙ্গের প্রশ্নের উত্তরে নিজের পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলেন হাছন রাজা। আঠারো শ সাতানব্বইর বড় ভুঁইসাল পর মানুষের ফুটানি বেহুদা সে অনুভব হয়। প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায় সে ভাবটি পেয়ে বসে তখন। পিপড়াঁ ও হাতির প্রতীকে দেখেন বিশ্বক্ষমতাকে। তার সাত বছর পর যখন হাছনের মা মারা যায় তখন তার মধ্যে বৈরাগ্য ভাবের উদয় হয়। ‘আকাশ ভাঙিয়া পড়ে মাথার ওপর; জননী যেজন মোরে দিয়া ছিল ছায়া।’ ফ্ল্যাশব্যাকে মা-এর সঙ্গে স্নেহ-মমতার সম্পর্কগুলো মঞ্চে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এ নাটকে এ দৃশ্যটিই নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি করেছে। অসাধারণ অভিনয়ও দৃশ্যটিকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে। লাশ নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি দর্শকমনকে নাড়া না দিয়ে পারে না।

ধীরে ধীরে হাছন রাজা বৈরাগী হয়ে ওঠে। তবে বৈরাগ্য প্রসঙ্গের ব্যাপ্তি খুব অল্প সময় ছিল নাটকে। ‘কিসের আশায় কিসের বিষয় কিসের জমিদারি; কিসের হয় রামপাশা, কিসের লক্ষ্মণছিরি। ছাড় ছাড় হাছন রাজা এই ভবের আশা; চিন্তা করো পাইতায় বন্ধের চরণ তলে বাসা। মন যাইবায়রে ছাড়িয়া; কেহ নাহি পাইব তোমায় সংসার জুড়িয়া।’ বোন, নিজ ভাতিজির প্রতি জবর দখলসহ প্রজাদের উপর নানা অত্যাচারের প্রসঙ্গ ফুটে ওঠে। জগতের প্রতি বৈরাগ্যে তিনি নিজের সম্পদের একটা অংশ উত্তরসূরিদের জন্য এবং বাকি সিংহভাগ অংশই জনহিতকর কাজে উইল করে দেন। ‘উইল করে দিয়ে যাই সম্পদ আমার; মানুষের কাজে যেন হয় ব্যবহার।’ হাছন রাজা স্মৃতিচারণায় বলেন, ‘এ নিয়ে নাখোশ ছিল বাকিরা সবাই; তাহাদের কাছে আমি কদর না পাই। তাই, দেখার হাওরে মোর ভাওয়ালি ভাসাই; আর, সখীদের নিয়ে খুঁজি পিয়ারী সদাই। এবং জানা যায় মৃত্যু অবধি জাত-মান-কূল ফেলে আসা ষোলজন সঙ্গিনী বেষ্টিত ছিলেন। ‘লাগলরে পিরিতের নিশা; হাছন রাজা হইল বেদিশা। ছাড়িয়া দিব লক্ষ্মণশ্রী আর রামপাশা।’

ধীরে ধীরে সৌখিন বাহারের চটুলতা ফেলে সুফিবাদীদের মতো হাছন উদাস হয়ে ওঠেন। রামিজ রাজুু অভিনয়ের বৈরাগ্য প্রকাশে বৈরাগ্যের চেয়ে মৃত্যু ভীতির রূপই বেশি প্রকাশিত হয়েছে। সংগীতে ভেসে ওঠে মনের পরিবর্তন। সাধনসঙ্গিনীদের সঙ্গে মডার্ন নৃত্যের অপূর্ব তালে ফুটে থাকে জীবনের নতুন উপলব্ধি। ‘বাউলা কে বানাইলো রে; হাছন রাজারে বাউলা কে বানাইলো রে।’ তিনি আরও আত্মোপলব্ধিতে স্থিত হয়ে ওঠেন, ‘রূপ দেখিলাম রে নয়নে আপনার রূপ দেখিলাম রে। আমার মাঝত বাহির হইয়া দেখা দিল আমারে।’ উপলব্ধির এক পর্যায়ে হাছন রাজা বলে ওঠেন, ‘আমা হইতে আসমান জমিন, আমা হইতে সব; আমা হইতে ত্রিজগৎ, আমা হইতে রব।’ বৈরাগ্য ভাবনার মধ্যে নাট্যকার নারীসঙ্গিনী ভাবনার প্রসঙ্গ রেখেছেন। দিলারামসহ নানা সঙ্গিনীর প্রসঙ্গ আসে। সাধনসঙ্গিনীদের সঙ্গে নৃত্য-গীতও প্রতীয়মান।

HJR-7

‘লোকে বলে বলে রে ঘরবাড়ি ভালা না আমার।’ নৃত্য, গীতে ফুটে উঠতে থাকে হাছন রাজার ভাবনা। ‘মম আঁখি হইতে পয়দা, আসমান জমিন; কর্ণ হইতে পয়দা হইছে, মুসলমানি দিন। শরীরে করিল পয়দা, শক্ত আর নরম; আর পয়দা করিয়াছে ঠান্ডা আর গরম। নাকে পয়দা করিয়াছে খুশবয় আর বদবয়; আমি হইতে সব উৎপত্তি হাছন রাজা কয়।’ হাছন রাজা উদ্ভট উন্মাদ হয়ে ওঠেন। মঞ্চে আলোর কারিশমায় বর্ষায় হাওড়ের পানির প্রতিরূপ তৈরি করা হয়। মঞ্চে সব আলো নিভে গেলে পানির আলো ও হাছন রাজার অভিনয়ে যেন ভিন্ন এক মুহূর্ত তৈরি হয়। ‘আমি আউয়াল, আমি আখের, জাহের ও বাতিন; না বুঝিয়া দেশের লোকে ভাবে মোরে ভিন।’ সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে হাছন রাজা জানায়—হাছনের পিয়ারী যে জন, আর কেউ নয়; হাছনজানের রাজা সে-ই তো হয়। ‘নেশা লাগিল রে; বাঁকা দু নয়নে নেশা লাগিল রে। পিয়ারীর প্রেমে হাছন রাজা মজিল রে।’ শেষে পিয়ারীর প্রেমের ভাববাদী গীতের মধ্য দিয়ে ভোরের সূর্য উঠার আবাস পাওয়া যায়। তখন আর হাছন রাজাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। নৌকার তরুণ তরুণী ও সাংবাদিকরা রাতের কোনো ডকুমেন্টই আর খোঁজে পায় না। সারারাত ধরে রেকর্ড করা ক্যামেরাতেও কোনো ছবি খোঁজে পাওয়া যায় না। দিনের আলো ফুটে উঠলে আবার হাছন রাজাকে খোঁজে থাকে। শেষে হাছন রাজাসহ সব কুশলীর একসঙ্গে মডার্ন ড্যান্সের মাধ্যমে পরিবেশনাটির সমাপ্তি ঘটে।


এ কালেও আমাদের অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই একজন ত্যাগী ও ভোগী, সংগীতপ্রিয় ও মাতৃভক্ত, আত্ম-অনুসন্ধানী এবং উদাসী, বাউলা হাছন রাজা দুর্দান্ত প্রতাপ নিয়ে বসত করে।


নাটকের নির্দেশক অনন্ত হীরা বলেন, ‘এ নাটক মঞ্চে আনতে আমাকে প্রথমত আকৃষ্ট করেছে আমাদের ভাটি অঞ্চল সুনামগঞ্জের লক্ষণছিড়ি আর রামপাশাসহ সিলেট জেলার কিছু অংশ নিয়ে যে বিশাল ভাটি বা হাওড় অঞ্চল, সেই অঞ্চলে পাঁচ লাখ বিঘা নিয়ে এক বিস্তৃত জমিদারী ছিল যার, সেই দেওয়ান হাছনরাজা চৌধুরী জমিদারের বর্ণিল, বৈচিত্র্যময় জীবন। … নির্দেশক হিসেবে আমি এ নাটকে এ কালের মানস সরোবরে ভাবনায়, কল্পনায়, ইলিউশনে অথবা ফ্যান্টাসিতে এক শ বছর আগেকার হাছনরাজাকে দেখতে চেয়েছি। তাতে এমনটাই মনে হয়েছে সকলের হয়তো নয়, তবে এ কালেও আমাদের অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই একজন ত্যাগী ও ভোগী, সংগীতপ্রিয় ও মাতৃভক্ত, আত্ম-অনুসন্ধানী এবং উদাসী, বাউলা হাছন রাজা দুর্দান্ত প্রতাপ নিয়ে বসত করে।’ [প্রচারপত্র]

HJR-8

নাটকটির গুরুত্ববহ বিষয়টি হচ্ছে আজকের প্রজন্মের মধ্যে উঠে আসা হাছন রাজার সঙ্গে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় নাট্যআবর্তন। তবে প্রশ্ন থাকে এরাই নতুন প্রজন্ম কি না? পোশাক, ড্যান্স দেখে মুষ্টিমেয় ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার্থী বা গোটা কয়েক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনে হয়েছে। এ বিপরীতমুখী সংস্কৃতি আচারের মধ্য দিয়ে পরিবেশনাটি কী বোঝাতে চায় সে বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন বলে অনুভূত হয়েছে। হাছন রাজাকে দেখে তারা কী নিয়ে ফিরল সে প্রশ্ন কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমন মুখোমুখি বস্তুবাদী প্রক্রিয়ায় দর্শক ধরে রাখা কিংবা শিল্পমান তৈরি করা অত্যন্ত দুরূহ নির্দেশক সেক্ষেত্রে দুঃসাহসী ভূমিকা রেখেছেন। অ্যাখানভাগ নৃত্য গীত ও অভিনয় সে বিষয় উত্তীর্ণ করেছে। বিশেষ কিছু নাট্যমুহূর্ত, অভিনয়, নৃত্য-গীত নিঃসন্দেহে দর্শককে আনন্দ স্রোতেই ভাসিয়েছে। তবে নাটকে হাছন রাজা ছাড়া অন্য কোনো চরিত্রের বিকাশ ঘটে নি। মাঝি চরিত্রটি মাঝে মাঝেই যোগসূত্রকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ মাঝি চরিত্রের রূপক সাংকেতিক কিংবা কোনো চরিত্র বৈশিষ্ট্যকে প্রদর্শন করে নি। মঞ্চ উপস্থিত অন্যান্য চরিত্রগুলোকে চারিত্রিক বিকাশের পরিবর্তে জোকার কিংবা জুড়ির দল বা সহযোগী দল বলেই মাঝে মাঝে মনে হয়েছে। তারা মাঝে মধ্যে নৃত্য ছাড়া সারাক্ষণই হাছন রাজার দিকে হা করে তাকিয়ে থেকেছে। হাছন রাজা চরিত্রে রামিজ রাজুর অভিনয়ের প্রশংসা না করলেই নয়। ‘হাছনজানের রাজা’ নামকরণ নিয়েও নতুন করে ভাবার আছে। নাট্য বিষয়ে হাছন রাজার দার্শনিক ভিত্তি ও তার গানের বিকাশ প্রক্রিয়াটাই উদ্ভাসিত হবার কথা। কিন্তু নাটকে গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে হাছন রাজার ব্যক্তি পরিচয় ও ব্যক্তিচরিত। ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট নাটকের প্রায় ১ ঘণ্টা ২৫ মিনিটই প্রাধান্য পেয়েছে হাছন রাজার নারীভোগলিপ্সা প্রসঙ্গ। নোংরা জানার অশিক্ষিত কৌতূহলের মতো কখনো কখনো মনে হয়েছে। হাছন রাজাকে সাধারণে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের তিন মরমী সাধকদের অন্যতম বলেই জানে। এমনকি লালন-বাউল বিকাশের সঙ্গে হাসন রাজার সংগীত সাধনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন অনেকে। এমন ধ্রুপদ বিষয়ের মধ্যেও কিছু কিছু হালকা বিষয় এসেছে। নাটকের শুরুতে ‘চাঁদনি পসার’-এর মতো হুমায়ূনী সস্তা শব্দ বা বিষয়ের অবতারণা না করেও বিষয়েরই নিজস্ব ক্ষমতায় নির্ভর করা যেত। নাটকের শেষে ক্যামেরায় ছবি চলে যাওয়া, মোবাইলে ছবি না থাকা, সবারই অবাক হওয়া, নাট্যে ফ্রেনলজি এসব প্রসঙ্গ অর্ধশিক্ষিত স্বস্তা আবেগেরই প্রতিনিধিত্ব করে। নাটকটি চাঁদনি রাতের আবর্তিত হলেও চাঁদ প্রথম ও শেষে ছাড়া ছিল না। মঞ্চে তরুণ যখন সংলাপে পূর্ণিমার নীল চাঁদ দেখাচ্ছিল তখন সায়াক্লোমায় রঙহীন চাঁদ দেখা যাচ্ছিল। সারাক্ষণই কেন মঞ্চে ভিডিও ক্যামেরা, জিপসি থাকে তার ব্যাখ্যাও স্পষ্ট নয়। হাছন রাজার সমস্ত সংলাপগুলোই প্রমিত ভাষায়। কোনো সুনামগঞ্জের আঞ্চলিকতা নেই। চরিত্রের সঠিক ভাব ও মেজাজ প্রকাশে ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে রামিজ রাজু কিছু শব্দ ব্যবহারে মাঝে মাঝে সিলেটি স্বর ও বাচনরীতির প্রয়োগে সচেষ্ট ছিলেন বলে লক্ষ করা গেছে। নাটক শেষে হাছন রাজার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের সঙ্গে কথা হলো। তাদের অভিমত এমন ছিল—নাটকে তাদের পূর্বপুরুষ হাছন রাজাকে খোঁজে পান নি। এ এক ভিন্ন হাছন রাজা। নির্দেশক ইতিহাস তৈরি করতে বসেন নাই; শিল্প তৈরি করবেন সত্য। কিন্তু সুবচনের ‘মহাজনের নাও’ বা নাট্যকেন্দ্রের আরজ চরিতামৃত; ঢাকা থিয়েটারের ‘বিনোদিনী’ কিংবা দৃশ্যপটের ‘সক্রেটিসের জবাববন্দি’সহ চরিত্রভিত্তিক নানা নাটকে কিন্তু তদীয় চরিত্রের ভাবাবেগে আমরা ভেসেছি। নাটকের টিমওয়ার্ক ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। অত্যন্ত কালারফুল উপস্থাপনা। এটি অত্যন্ত পরিশ্রমী কাজও বটে। যা হোক, হাছন রাজাকে নিয়ে এমন দুঃসাহসী প্রযোজনার জন্য প্রাঙ্গণেমোরকে সাধুবাদ। অভিনয়, সংগীত, নৃত্য, মঞ্চসজ্জা, মঞ্চমায়ায় প্রায় দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার প্রাণবন্ত উপস্থাপনা। বাঙালি সংস্কৃতির এমন মরমী সাধক নিয়ে নাট্য প্রযোজনা নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের। আমরা নাটকটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।

আবু সাঈদ তুলু

জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৯; জামালপুর । তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্য-শিল্পের প্রতি অনুরাগী। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখে আসছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

প্রকাশিত বই :

লিপির উদ্ভব, ক্রমবিবর্তন ও বাংলা লিপির পরিণত পর্যায় [প্রবন্ধ; অন্তরীপ পাবলিকেশন, ২০০৭]
বিপ্রলব্ধ [উপন্যাস; শিখা প্রকাশনী, ২০০৮]
রূপান্তরবাদ [শিখা প্রকাশনী, ২০০৯]
অনন্তপথের যাত্রী [ভাষাচিত্র, ২০১৪]
জলের আয়না [ভাষাচিত্র, ২০১৫]
পাতার বাঁশি [লিটলবিট, ২০১৭]
সেলিম আল দীনের সাহিত্য ভাবনা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮]

ই-মেইল : tuluart@yahoo.com