হোম নাটক বিষজয়ী সাধকের নন্দিত আত্মাহুতি

বিষজয়ী সাধকের নন্দিত আত্মাহুতি

বিষজয়ী সাধকের নন্দিত আত্মাহুতি
625
0

গত ২৩ মে ২০১৯ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’র পরীক্ষণ থিয়েটার হলে প্রদর্শিত হলো ‘নীলাখ্যান’ নাটকের পঞ্চাশতম প্রদর্শনী। মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজিত এ নাটকটি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাপুড়ে’ কাহিনি আশ্রয়ে রচনা করেছেন আনন জামান এবং নির্দেশনা দিয়েছেন ইউসুফ হাসান অর্ক। সাপের মন্ত্রে সিদ্ধকামলোভী ব্রতধারী সাধকের মর্মযন্ত্রণা ও নির্মম পরিণতির চিত্র ‘নীলাখ্যান’ নাটক। নাটকটির পঞ্চাশতম প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে. এম. খালিদ এম.পি.। এ নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন হয়েছিল ১৪ আগস্ট ২০১৫ এ পরীক্ষণ থিয়েটার হলেই। ওই পঞ্চাশতম প্রদর্শনীর উপর ভিত্তি করে কাজী নজরুল ইসলামের গল্প প্রসঙ্গ, নাট্যরূপ, উপস্থাপন কৌশল, বৈচিত্র্য, নাট্য উপাদানসমূহ, নান্দনিকতা ও দর্শকের উপযোগিতা অন্বেষণই লেখাটির মূল লক্ষ্য।

‘সাপুড়ে’ কাহিনিটি কাজী নজরুল ইসলামের প্রকাশিত কোনো গল্পগ্রন্থে পাওয়া যায় না। তার এ কাহিনিটি ‘সাপুড়ে’ সিনেমার গল্পসংক্ষেপ। কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালির জাতীয় কবি হিসেবে সমাদৃত। তিনি শুধু কবি নন; গীতিকার হিসেবে সমধিক সমাদৃত। সমাজের মানুষের অন্যায়, অত্যাচার ও শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার কণ্ঠ। তার কবিতায় বিদ্রোহী চেতনার কারণে তাকে বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তিনি একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ।

সৃষ্টিশীলতায় অনন্য, দ্রোহ ও প্রেমের অনবদ্য রূপকার কাজী নজরুল ইসলাম গত শতকের ত্রিশের দশকে সিনেমার দিকে বেশ ঝুঁকে পড়েন। সংগীত পরিচালনা, চিত্রনাট্য রচনা, অভিনয় ও পরিচালনাসহ নানা দিকে কাজ করেছেন তিনি। নানা তথ্যে পাওয়া যায় তিনি প্রায় একুশটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো : ধ্রুব (১৯৩৩, গান রচনা, সুর ও সংগীত পরিচালনা, অভিনয়), পাতালপুরী (১৯৩৫, গান রচনা, সুর ও সংগীত পরিচালক), গ্রহের ফের (সুর, সংগীত পরিচালনা), বিদ্যাপতি (কাহিনিকার, গান ও সুর), গোরা (১৯৩৮, গান রচনা, সুর, সংগীত পরিচালনা), সাপুড়ে (১৯৩৯, কাহিনি, গান, সুর, চিত্রনাট্য), সাপেড়া (১৯৩৯, হিন্দি, কাহিনি, গান রচনা, সুর), নন্দিনী (১৯৪১, গান রচনা, সুর), চৌরঙ্গী (হিন্দি, গান রচনা, সুর, সংগীত পরিচালনা) ইত্যাদি।


‘নীলাখ্যান’ নাট্য জহরের পরাণ আর চৈতন্যের গোপন পাত্রের রতি আর আরতির নাট্য।


‘সাপুুড়ে’ চলচ্চিত্রটি ১৯৩৯ সালে মুক্তি পায়। বেদে সম্প্রদায় নিয়ে খুব সম্ভবত এটিই ভারতবর্ষের প্রথম সিনেমা। সিনেমাটির কাহিনি তৈরি করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। নিউ থিয়েটার্স প্রযোজিত এ সিনেমার পরিচালক ছিলেন দেবকী বসু। কাহিনি ছাড়াও এ সিনেমার গান রচনা, গানের সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। যদিও সিনেমাটির কোনো প্রিন্ট বর্তমানে পাওয়া যায় না। নানা তথ্যে জানা যায়, এ সাপুড়ে সিনেমাটি সেসময় অত্যন্ত ব্যবসা সফল ছিল। একই বছর এ সিনেমাটি ‘সাপেড়া’ নামে হিন্দিতেও নির্মাণ করা হয়। এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন : মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, মেনকা, আলাউদ্দিন সরকার, আগা আলীসহ প্রমুখ। হিন্দি সিনেমাটিতেও প্রায় একই অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন।

1

‘সাপুড়ে’ প্রদর্শনের পূর্বে সিনেমা হলে সিনেমাটির কাহিনি সংক্ষেপ ও গান দিয়ে ছাপা পুস্তিকা বিক্রি করা হতো। (নজরুল রচনাবলী, সপ্তম খণ্ড, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, সম্পাদনা পরিষদের সভাপতি— রফিকুল ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ২০১২, পৃষ্ঠা-৩৭১)। এ পুস্তিকায় বর্ণিত ‘সাপুড়ে’ সিনেমার কাহিনিই এ ‘নীলাখ্যান’ নাটকের মূল। নাট্যকার আনন জামান এ ‘সাপুড়ে’ সিনেমার কাহিনি সংক্ষেপকে নতুন মাত্রায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে নাট্য রূপায়ন করেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘হলুদ গাঁদার ফুল, রাঙ্গা পলাশ ফুল, এনে দে, এনে দে, নইলে বাঁধবো না বাঁধবো না চুল…’ এ গানটি এ সিনেমারই।

মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে প্রায় তিনযুগ পূর্ণ হতে চলল—বাংলাদেশে নাট্যাঙ্গনে উপহার দিয়ে চলেছে একের পর এক দর্শকনন্দিত নাটক। তারা বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির প্রতি অবিচল আনুগত্যে স্থিত।এ যাবৎ অবিরাম নাট্যচর্চায় মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় ৪০টি নাট্য প্রযোজনা মঞ্চে এনেছে ও ইতোমধ্যে প্রযোজনাগুলোর ১০১৯ টি প্রদর্শনী সম্পন্ন করেছে এবং ২টি নাট্য প্রযোজনার শতাধিক মঞ্চায়ন এবং ১টি প্রযোজনার দেড়শতম মঞ্চায়ন সম্পন্ন করেছে। মঞ্চে ৪টি প্রযোজনা নিয়মিতভাবে মঞ্চায়ন করে যাচ্ছে। দলীয় প্রচারপত্রে উল্লেখ, ‘‘মহাকাল’ চায় মানুষের স্বচ্ছ, সরল রৈখিক জীবনের চূড়ান্ত উত্তরণ। বীরগর্ভা মঞ্চে জেগে উঠুক সত্যনিষ্ঠ সাহসী মানুষ। মানুষ জেগে উঠুক তার মুক্তির প্রশ্নে, শিল্পের প্রশ্নে, সত্যের প্রশ্নে। ‘মহাকাল’ মঞ্চে আনবে জীবন শিল্পর কথা, বলবে, জীবন সংগ্রামে বিপর্যস্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ মেহনতি যোদ্ধাদের কথা। আঘাত করবে কলুষিত সমাজ ব্যবস্থাকে, খুঁজতে প্রয়াসী হবে মানুষের ভিতরের মানুষকে।’’ ‘নীলাখ্যান’ নাটকটি মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়ের ছত্রিশতম প্রযোজনা।

‘নীলাখ্যান’ নাটকটির কাহিনি বিন্যাসে দেখা যায়, বেদিয়ার সর্দার জহর। জহরের বিষজয় সাধনায় মনসা কর্তৃক কাম নিষিদ্ধ। জহরের স্ত্রী বিন্তী রানী আড়ালি বিলে রাশি রাশি শাদা শাপলার বনে আত্মহত্যা করে। জহর আত্মসংযম ধারণ করে থাকে। সাধনা সিদ্ধি পেতে চায়। একদিন সাপ ধরতে গিয়ে নদীর তীরে সাপেকাটা মৃতপ্রায় এক বালিকাকে দেখতে পায় জহর। মেয়েটিকে বাঁচিয়ে তুলে। নানা প্রতিকূলতায় জহরের সাধনায় নারী নিষিদ্ধ বলে স্মৃতিভ্রষ্টা বালিকা বালকের পরিচয়ে বেড়ে উঠে বহরে। বালিকা চন্দনের কাছে বিন্তীর সুরভীই যেন পায় জহর। ধীরে ধীরে ঋতুমতী হয়ে ওঠে চন্দন। চন্দনের নারীত্বের স্ফুরণে জহর যেন প্রেম, কামনায় পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। সাধনার সংযমের বাধ ভেঙে যেতে চাইলেও অতি কষ্টে তা সংবরণ করে। সাধনায় পুনঃআত্মনিয়োগ করে জহর। এদিকে বেদিয়ার দলে চন্দনকে ঘিরে তৈরি হয় নানা বিচিত্রমুখী সংকট। চন্দনকে পুরুষ জ্ঞানে দলের মৌটুসী প্রেম নিবেদন করে। একদিন বেদিয়াদের উৎসবে আকস্মাৎ চন্দনের নারীত্বের পরিচয় উন্মোচন হয়ে পড়ে। চন্দনকে নিয়ে দলের অতিবৃদ্ধ ঘণ্টাবুড়োর নানা সতর্ক কানে না নিলেও ঘটতে থাকে সেইসব অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ। দলের ঝুমরো ভালোবাসে চন্দনকে। চন্দন প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে। এমনকি একসময় সাধনার বাধ ভেঙে যায় সর্দার জহরের। নিজের পালিত কন্যাতুল্য চন্দনকে বিয়েও করতে চায়। কিন্তু চন্দনের বুদ্ধিমত্তায় নিজের ভুল বুঝতে পারে জহর। নানা দ্বন্দ্ব, নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে চন্দন বেদিয়ার যুবক ঝুমরোর সাথে পালিয়ে চলে যায়। প্রচণ্ড প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওঠে জহর। জহরের প্রেরিত সাপের দংশনে ঝুমরো মৃতুমুখী হয়ে পড়ে। কিন্তু চন্দনের অনুরোধে ঝুমরোর বিষ নামিয়ে দেয় সর্দার জহর। জহরের অন্তরে বাজে চন্দন চেয়েছিল গাঢ় নীল রঙের ফতুয়া। অবশেষে বিষজয়ের সাধনায় মত্ত জহর একশ একতম সাপের দংশন নেয়। বিষে নীল হয়ে ওঠে জহর। এভাবেই নাটকের কাহিনি এগিয়ে চলে।

কাজী নজরুল ইসলামের মূল ‘সাপুড়ে’ কাহিনিতে জহর ছিল সর্পবিষজয়ী ব্রতচারী। আজীবন চিরকুমার থেকে নিষ্কামভাবে সিদ্ধিলাভে উন্মত্ত ছিলেন। জহর নারীস্পর্শকে সম্পূর্ণ সাধনা বিধ্বংসী বলে মনে করতেন। নাট্যকার আনন জামান বলেন, ‘শব্দে সুরে ভাবের বিত্ত বৈভব বিনির্মাণে বাংলা সাহিত্যে কী সংগীতের ঐশ্চর্যকবি কাজী নজরুল ইসলাম। …‘সাপুড়ে’ গল্প পাঠের পর বেদিয়া জহর-ই আমার কাছে যা কিছু বেদনা বলবার—বলেছিল—আপনার চরিত্রের ভাবকথা আমি অনুলিপি করেছি মাত্র। সাপুড়ে গল্পের বেদিয়াদের ঝাঁপির ভেতর যা ছিল গোপন—সেই ঝাঁপি খুলে গোপন উন্মোচনের চেষ্টায় এ নবতর নাট্য আয়োজন। ঘুম অথবা জাগরণের ভেতর ভূবন থেকে মনসা বলেছিল অখণ্ড চাঁদের সাঁজক্ষণে যদি একশ সাপের দংশন শরীরে নেয় আর কাম রাখে আপন শরীরে বন্দক তবে বিষ বশ করতে পারবে জহর। একটি সাপের বিষ বুকে সয়ে—জহর হত হয় কাম আর প্রেমের দংশনে। “‘নীলাখ্যান’ নাট্য জহরের পরাণ আর চৈতন্যের গোপন পাত্রের রতি আর আরতির নাট্য।” (নাটকের সুভ্যিনিয়র)

2

শুরুতেই দেখা যায়, তিন দিক দর্শকবেষ্টিত মাঝখানে মঞ্চ। আবহমান বাংলা নাট্যের মঞ্চ বিন্যাসে সাধারণত চারদিকে দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চ। এ মঞ্চটি ব্যতিক্রম। গ্রিক নাট্যমঞ্চের মতো তিন দিক বেষ্টিত দর্শক। মঞ্চের মাঝখান থেকে পিছন হয়ে উপর দিকে ঝুলানো এবং বাঁকা একটি সিঁড়ির সিম্বল। সিঁড়িটির গোড়ায় একটি ঘট। পাশেই একটি বাক্স। সিঁড়িটি দেখে কারও বুঝতে সমস্যা হয় না এটি সাধনার উচ্চ ধাপে পৌঁছানোর নৈর্ব্যক্তিক বিন্যাস।

প্রথমেই বাদকদলের বাদনের মধ্য দিয়ে উপস্থাপনাটিতে প্রবেশ করেন। তিন পাশে দর্শকদের সারিতে বিভিন্ন ধর্মের পুরোহিত চরিত্র এবং প্রত্যেক ধর্মের একসঙ্গে স্তব, প্রার্থনা বা বন্দনার ধর্মীয় কৃত্যের মধ্যদিয়ে নাটকটি শুরু হয়। অসাধারণ ধ্বনিমাধুর্য সৃষ্টি হয়। মিউজিক ও ধর্মীয় শ্লোকের বোলে অভিভূত করে তুলে দর্শককে। তবে ইসলাম ধর্মের সিম্বল ও প্রকাশটা অন্যান্যের মতো পরিপূর্ণ পরিস্ফুট মনে হয় নি শোতে। ধর্মীয় কৃত্য শেষ হলে দেবী মনসাকে পূজা দিয়ে শুরু গল্পের শুরু। এক বেদে বহর। তার সর্দার গল্পের প্রধান চরিত্র। সর্দার মনসার সাধনায় রপ্ত। বিষ জয় করতে চায়। চারজন নারী অখণ্ড মনসা দেবীরূপকে প্রকাশ করে। তখন মঞ্চটি হয়ে ওঠে মনসার মন্দির। এভাবেই কাহিনি উপস্থাপনে প্রবেশ করেন। বিষজয়ী সাধক জহর তখন বলে উঠে—

‘ভক্তের সম্মুখ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না দেবি—জগতের সকল বিষই তো তোমার বশ—তোমার বাঁকা ভ্রুর ইশারায় মাটির উপর শূন্যতার যে ছাঁদ—সেও বিষে হয়ে যায় নীল—কৃপা চোখে চাও দেবী—পূর্ণ করো ইচ্ছা।’


বাংলার আবহমান অভিনয়রীতির বৈশিষ্ট্যে বর্ণনাত্মক চরিত্রাভিনয়ে উপস্থাপিত হয়েছে নাট্যটি। 


সর্দার জহর চরিত্রে অভিনয় করেছেন মীর জাহিদ। চরিত্রের অসাধারণ বিশ্বাসযোগ্যতা ছুঁয়ে ছিল তার অভিনয়ে। ভান মনে হয় নি। সর্দার মনসার সাধনায় সিদ্ধি পেতে চাওয়াটার মধ্যে তীব্রতা লক্ষ করা গেছে। তবে উক্তি-প্রত্যুক্তির মড্যুলেশনে আরো ভাষিক উৎকর্ষে পৌঁছাতে পারত সংলাপগুলো। প্রত্যেকের পোশাকগুলো বহরের সাজেস্টিক। পোশাকে স্থান কালকে ফেলে জীবন চরিতটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে। নাটকের শুরু থেকেই পিছনে যন্ত্রীদল বসা ছিল। কখনো ঘটনার আবহ তৈরি করেছে যন্ত্রীদল; কখনো বৈচিত্র্যমুখী বোল ও সংগীতের দ্বারা নাটকটিকে করেছে প্রাণবন্ত। বিষজয়ী সাধনায় লোলুপ নারীসঙ্গ ত্যাগী জহর যখন বিন্তির চাওয়াকে অগ্রাহ্য করে তখন যেন অনবদ্য আরেক নাটকীয় সুর বেজে ওঠে—

জহর-মনসা তবে সত্য ভাষণ কহে—নারীতে হয় সাধন বিনষ্ট। যা তুই সম্মুখ থিয়া আমার। বিষ জয়ের ব্রতে যা কিছু আছে জোড়— তোর ওিই দিঘি ডোবা চোখ সবখানি ধরে দেয় টান—যা।…

বিন্তি—তবে তাই তোর ইচ্ছা—ভগমান হবি তুই। বহরের সব লোকে কহে—ও সত্য নয় ও স্বপ্ন-রাতের শেষ প্রহরে মনসার প্রহেলিকা। মনে নাইরে বেদিয়া আসমান যখন মেঘে মেঘে কালো—আমার খোপা খুলে দিয়ে কয়েছিলি—তুই সুন্দর তার থিয়া—ও মেঘ বান্ধি দিমো তোর চুলে।

জহর—অনুনয় করি তুই যা—মনসা মুখ ফিরিয়ে নেবে। নয়টি দংশন নিয়াছি দেহে—দেখ আমি বাঁচা তোর থিয়া।

বিন্তি—বড় সাধক হয়েছে বেদিয়ার ওস্তাদ। বহরের সকলে বাহবা দেয় তোরে—সম্ভ্রমের চোখে চায়। যেন মন্ত্রবলে হাজার হাজার নগর জয় করে বগলের নীচে বন্দি করে থুয়েছিস। আমার চারপাশে যে চোখ—তাতে কী যে অনুকম্পা—ছি। এর থিয়া ভালো জলকাদা হয়ে জলকাদায় পড়ে থাকা। ছি মানুষ…

বিন্তি চিরতরে হারিয়ে যায়। কৃত্য, মনসার বন্দনা, বেদে দলের নাচের পরেই জহরের মৃতপ্রায় চন্দনকে প্রাপ্তি দিয়ে শুরু হয় ঘটনার অনুপ্রবেশ। বাংলার আবহমান অভিনয়রীতির বৈশিষ্ট্যে বর্ণনাত্মক চরিত্রাভিনয়ে উপস্থাপিত হয়েছে নাট্যটি। অভিনয়ে বাংলার আবহমান বর্ণনাত্মক ধারার সঙ্গে পাশ্চাত্যের চরিত্রাভিনয়ের মিশ্রণ ঘটেছে। ঘটনা বা গল্পের প্রয়োজনে শুধু বর্ণনা হয়েছে। সর্দারের নদীতে খুঁজতে যাওয়া লাশ প্রাপ্তিতে চমৎকার একটি নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি করেছেন নির্দেশক। যখন সর্দার কিছু একটা দেখতে পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে নদীর ধারে চলে যায়। তখন সমস্ত মঞ্চের আলো নিভে গিয়ে সর্দারকে ফোকাস করে লাইট। লাইট সর্দারকে অনুসরণ করতে থাকে। এ অন্ধকারের মধ্যে মঞ্চে এসে মৃতপ্রায় বালিকাটি মঞ্চে এসে শুয়ে থাকে। সর্দার খুঁজতে খুঁজতে মঞ্চে প্রবেশ করে তখনও লাইট অনুসরণ করছিল। নদীর তীরে মৃততুল্য এক বালিকা। দর্শকের মধ্যে এক জাদুকরী মোহ তৈরি করে। সমস্ত নাট্যটির মধ্যে কোরিওগ্রাফিও দর্শকে বৈচিত্র্যে ভাসিয়েছে। বেদেদের সাপ ধরতে যাওয়া, সাপ ধরাসহ নৃত্যগীত অসাধারণ ভালোলাগা তৈরি করেছে। চন্দনকে নিয়ে দলের মধ্যে যে কৌতূহল তা অত্যন্ত পরিমিত বিন্যাসে উপস্থাপিত। নির্দেশক অত্যন্ত দক্ষতায় চরিত্রগুলোর মাত্রা বিন্যস্ত করেছেন।

3

চন্দন চরিত্রের অভিনয়ও অত্যন্ত প্রাণবন্ত। চন্দনের আকুতি দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়—যদি না কহ—তবে থাকি না—ঘরে না হয় ঠাই—উঠানেই না হয় থাকি। নাইরলের তেলে রক্ত চন্দন ভিজিয়ে তোমার বীণ লেপে দেবো—ঘন জালের দুগ্ধ দিব সাপে। শুভ্রকান্তি ফুল এ চন্দন এক ধরনের ইনারবিউটি ছড়িয়ে যায় দর্শকের মধ্যে। স্মৃতিভ্রষ্টা চন্দনের বুদ্ধিমত্তার উপস্থাপন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বয়সের মাত্রাও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত। মাথায় একটি পাগড়ি দিয়ে বালকের বেশ উপস্থাপন করেছেন। সাধনান্মুখ জহরের কামনা বাসনায় নীল পর্দার সিম্বল ব্যবহৃত হয়। নীল কাপড় টানায় একদিকে বিষের সাধনা এবং অন্যদিকে কামনা বাসনার উন্মুত্ততা কী প্রকাশ করে! তারপর উপর থেকে প্যাঁচানো নীল পর্দা নেমে আসে। বোঝা যায় জহর বিষ-নীল যন্ত্রণা জয়লাভের জন্য সাধনায় ঊর্ধ্বমুখী। চন্দনের ঋতুমতী ঘটনায় মিউজিক অসাধারণ। মূল কাহিনিতে এ অংশটুকু না থাকলেও নাট্যকার দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করতেই সম্ভবত এ দৃশ্যের অবতারণা করেছেন। সর্দার জহর বুঝতে পারে চন্দন পরিপূর্ণ নারী হতে চলেছে। চন্দন নিয়ে মৌটুসীর ভাবনাটি অত্যন্ত বিনোদিত করে দর্শককে। মৌটুসীর অভিনয়ও সংলাপ প্রাণবন্ততা উপভোগ্য। নিজ কন্যাতুল্য চন্দনকে নিয়ে সর্দার আজে বাজে স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পরক্ষণে ধৈর্যের বাধ রক্ষা করতে পারেন জহর।

চরিত্রাভিনয়ের সাথে বর্ণনাত্মক ধারায় কাহিনি উপস্থাপিত হতে থাকে। চন্দনের অনুভূতি বোঝাতে শাদা কাপড় টেনে অর্থাৎ পাশে একজন শাদা কাপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর কাপড়ের একপাশ টেনে চন্দনের বুকের উপর দিয়ে নিয়ে যায়। তবে নারীত্ব, স্পর্শকাতরতায় কাপড়টির টানকের আচরণ যেন মেকি মনে না হয়। সে সময় উপর থেকে জোছনা বল ঝরে পড়ে। নির্দেশক চাঁদ ঝরে পড়া বুঝাতে চেয়েছেন কী না তা স্পষ্ট নয়।

বহরের নৃত্যগীত অসাধারণ। সাধারণত যারা অভিনে তাদের নৃত্যে এত নমনীয়তা লক্ষ্য করা যায় না। নাচগুলোর মধ্যে সত্যিকারের নৃত্যশিল্পীদের মতোই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল। নাচতে নাচতে প্রকাশিত হয়ে পড়ে চন্দন ছেলে নয়; নারী। মিউজিকের সাথে অসাধারণ উপস্থাপিত হয়ে ওঠেছে দৃশ্যটি। তবে চরিত্রগুলোর পোশাকের রং ব্যবহার মাঝে মাঝেই বিষয়ের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে মনে হয়েছে। সর্দার জহর চন্দনকে বিয়ে করতে চায়। কথোকপথন, অভিনয়, আবহে অসাধারণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে দৃশ্যটিতে। কারো কারো বাচিক অভিনয়ে আর সুস্পষ্টতা প্রয়োজন। জহর সর্দার পুনরায় মনসার সাধনায় ব্যাপ্ত হয়ে ওঠেন।

নাটকটি দেখতে দেখতে প্রশ্ন জাগে নারীসঙ্গ সত্যিই সাধনাকে নষ্ট করে দেয় কি। শেষ পর্যন্ত চন্দনের আগ্রহেই ঝুমরোর সাথে পালিয়ে যায় চন্দন। বনে চলে যায় যেখানে শুধু দুজন দুজনকে ঘিরেই বাঁচবে বলে। গান, বর্ণনা, নৃত্য, কথোপকথনের এক ঐকতানিক সূরে একীভূত হয়ে উঠেছে নাট্যটি। নাট্যটি উপস্থাপনে অত্যন্ত পরিমিতিবোধের পরিচয় পাওয়া গেছে। এ সময় উপজাতির কাঠি নৃত্য পরিবেশিত হয়। নাচের সময় উপর থেকে শাদা পলিথিন পড়ে। জহর সর্দারের পোষা সাপ এসে ঝুমরোকে দংশন করে। জহর যেন প্রতিহিংসার আগুনে আত্মহারা হয়ে উঠেছে। কিন্তু চন্দন পিতৃতুল্য ও ওস্তাদ জহরকে অনুরোধ করে ঝুমরোকে বাঁচাতে। পা বেধে সর্দার বীণ বাজায়। সাপ এসে বিষ শুষে নিয়ে চলে যায়। জীয়ন্ত হয়ে ওঠে ঝুমরো। একে একে জড় হতে থাকে বেদে বহরের লোকজন। এ সময় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয় সর্দার জহর। সর্দার নিজেই সাপের বিষের ছোবল নিয়ে বিষের যন্ত্রণায় নীল হয়ে ওঠে।

‘মৃত্যু জেনেই নিয়েছি দংশন। পূর্বেই সাঙ্গ হয়েছে সাধনা মনসার ছলে।… খুব যতনে লালন করেছি তোরে—প্রতি ভোরে ঝাঁপি খুলে নিরীখিয়া দেখিয়াছি সাপে—বিষ দাঁত ভাঙা আছে কিনা তার। মনে সংশয় যদি ঝাঁপি থিয়া এসে কাটে তোরে।… প্রাণ দিয়াছে বলে পূজা না দিলে প্রাণসংহার করে দেবী। আমি জল কাঁদায় গড়া—তাতে মন আছে মায়া আছে—প্রাণ দিয়ে প্রেম করলাম জয়, সাধন করলাম পূর্ণ।’

মৃত্যু যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে ওঠে জহর। আর নেপথ্যে নজরুলের সেই বিখ্যাত গান বাজতে থাকে—‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব দেব না আমারে ভুলিতে।’ এক অসাধারণ বিয়োগান্তক পরিবেশের মধ্য দিয়ে নাট্যটির পরিসমাপ্তি ঘটে।

নাটকটির নামকরণ করা হয়েছে ‘নীলাখ্যান’। দীনবন্ধু মিত্রের নাটক ‘নীলদর্পণ’-এর অসাধারণ জনপ্রিয়তায় নীল বলতে প্রথমতই নীলকরদের নীল চাষের চিত্র চোখে ভেসে ওঠে। সনাতন ধর্মীয় পুরাণে বিষে শিবের নীলকণ্ঠ হয়েছিল বটে। কিন্তু বিষক্রিয়ায় নীল হওয়া কী বাস্তবে দেখা যায়! এ বিষয়ে নাট্যকারের আরও ভাবনার প্রয়োজন ছিল। দলীয় সুভ্যিনিয়রে উল্লেখ আছে এ নাটকটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাপুড়ে’ গল্প অবলম্বনে। এ প্রবন্ধে কাহিনির উৎসমূল পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। এক্ষেত্রে নাট্যকার, নিদের্শক ও দলীয় প্রচারপত্রে বিভ্রান্তি না রেখে সঠিক ও সহজতর তথ্য সংযোজন প্রয়োজন ছিল।


নির্দেশকের বিশ্বাস, ‘বর্ণনাত্মক’ এমন একটি শিল্প আঙ্গিক যেখানে শ্রুতিময়তা দিয়েই দৃশ্যময়তা তৈরি হয় দর্শক চিত্তে।


নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্ক বলেন, ‘কাহিনিটির প্রেক্ষাপট বেদে বহর হলেও কবি নজরুল এর অন্তঃস্রোতে এমন একটি সার্বজনীন বীজ ভাসিয়ে দিয়েছেন যা স্পষ্টতই গোটা মানবকূলের সর্বকালকে ছুঁয়ে যায়। … এ নাট্যে অভিনেতা নিজেই চরিত্র ও পরিস্থিতির বিবরণ উপস্থাপন করেন মঞ্চক্রিয়া সহযোগে। একে শুদ্ধ চরিত্রাভিনয় না বলে আমরা ‘বর্ণনাত্মক চরিত্রাভিনয়’ বলছি। এ অভিনয় আমাদের আবিষ্কার নয়। আমাদের ঐতিহ্যে পালাকার-গায়েন-বয়াতিগণ এভাবেই অভিনয় করেন। তাতে কাহিনির রসাস্বাদনে কোনো অসুবিধা হয় না। পার্থক্য শুধু এইটুকু যে, সেখানে একজনই কাহিনি বয়ান করেন আর এখানে সকলে মিলে একটি গল্প বলার চেষ্টা। প্রযোজনাতে খুব বেশি ইমেজ তৈরি করবার চেষ্টা নেই এই কারণে যে নির্দেশকের বিশ্বাস, ‘বর্ণনাত্মক’ এমন একটি শিল্প আঙ্গিক যেখানে শ্রুতিময়তা দিয়েই দৃশ্যময়তা তৈরি হয় দর্শক চিত্তে। আর সে কারণে নাটকটির নামকরণেও ‘আখ্যান’ শব্দটি জুড়ে দেয়া হয়েছে।’ (নাটকের সুভ্যিনিয়র)

4

‘নীলাখ্যান’ নাটকের অভিনয় শিল্পীরা হলেন : পলি বিশ্বাস, কোনাল আলী, চৈতী সাথী, মনামী ইসলাম কনক, লিঠু মন্ডল, জেরিন তাসনীম এশা, তনু ঘোষ, মামুনুর রশীদ, আমিনুল আশরাফ, আসাদুজ্জামান রাফিন, মোহাম্মদ আহাদ, শিবলী সরকার, শাহরিয়ার হোসেন পলিন, ইয়াছির আরাফাত, তৌহিদুর রহমান শিশির, ইকবাল চৌধুরী, জাহিদুল কামাল চৌধুরী দিপু, মো. শাহনেওয়াজ এবং মীর জাহিদ হাসান। নেপথ্য : মঞ্চ, সুর সংযোজন ও আবহ সংগীত পরিকল্পনায় ইউসুফ হাসান অর্ক, আলোক পরিকল্পনায় ঠান্ডু রায়হান, পোশাক পরিকল্পনায় ড. সোমা মুমতাজ, কোরিওগ্রাফি জেরিন তাসনিম এশা, প্রপস পরিকল্পনা ও নির্মাণ হাসনাত রিপন, রূপসজ্জায় শুভাশীষ দত্ত তন্ময়, পোস্টার ও স্মরণিকা ডিজাইন পংকজ নিনাদ, মঞ্চ ব্যবস্থাপক জাহিদ কামাল চৌধুরী এবং প্রযোজনা অধিকর্তা মীর জাহিদ হাসান।

সবমিলিয়ে পরিমিতিবোধ সম্পন্ন শৈল্পিক প্রযোজনা ‘নীলাখ্যান’ নাটকটি। বিষয়বস্তু, উপস্থাপন চিন্তন, অভিনয়, আবহ ও কর্মদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। নাটকটির উপস্থাপন সুখ দর্শন অনুভূতি তৈরি করেছে তা নিঃসন্দেহে কৃতিত্বের সাক্ষর বহন করে। অত্যন্ত তারুণ্যদীপ্ত প্রাণবন্ত উপস্থাপনা। আমরা নাটকটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি। এমন নান্দনিক উপস্থাপনার জন্য নাট্যকার, নির্দেশক, শিল্পীবৃন্দ এবং মহাকাল নাট্যসম্প্রদায় নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারায় বাংলা নাট্য বিশ্ব নাট্যসমারোহে স্বমর্যাদায় সুমহিমান্বিত হোক তা আমরা সবাই প্রত্যাশা করি।


ঈদসংখ্যা ২০১৯

আবু সাঈদ তুলু

জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৯; জামালপুর । তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্য-শিল্পের প্রতি অনুরাগী। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখে আসছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

প্রকাশিত বই :

লিপির উদ্ভব, ক্রমবিবর্তন ও বাংলা লিপির পরিণত পর্যায় [প্রবন্ধ; অন্তরীপ পাবলিকেশন, ২০০৭]
বিপ্রলব্ধ [উপন্যাস; শিখা প্রকাশনী, ২০০৮]
রূপান্তরবাদ [শিখা প্রকাশনী, ২০০৯]
অনন্তপথের যাত্রী [ভাষাচিত্র, ২০১৪]
জলের আয়না [ভাষাচিত্র, ২০১৫]
পাতার বাঁশি [লিটলবিট, ২০১৭]
সেলিম আল দীনের সাহিত্য ভাবনা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮]

ই-মেইল : tuluart@yahoo.com