হোম নাটক বই থেকে : নাট্য ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের নাটক

বই থেকে : নাট্য ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের নাটক

বই থেকে : নাট্য ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের নাটক
826
0

বাংলাদেশের নাটকে একটি প্রধানতম ইস্যু ‘জাতীয় নাট্য আঙ্গিক সমস্যা’। বাংলাদেশের জাতীয় নাট্য আঙ্গিক তৈরি হওয়া উচিত কি না? আর যদি জাতীয় নাট্য আঙ্গিক সুনির্দিষ্ট হয় তবে আঙ্গিকটি কেমন হবে বা হওয়া উচিত? এ দুটো প্রশ্নকে ঘিরেই সমস্যা আবর্তিত। বিশেষত বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য নাট্যকার ও নাট্যশিক্ষক ড. সেলিম আল দীন [১৯৪৯-২০০৮] এর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের মাধ্যমে প্রকাশ ও ঢাকা থিয়েটারের কর্ণধার নাসিরউদ্দীন ইউসুফের কর্মতৎপরতায় বিষয়টি একটি আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের নাট্যকর্মী ও শুভ্রকেশীদের মধ্যে এ প্রশ্নটি বারবার আলোড়িত হচ্ছে। গত ২০০৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের সেমিনারেও বাংলাদেশের জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নিয়ে বারবার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে উত্তীর্ণ হতে পারে নি। বিষয়টি জটিল থেকেই জটিলতর হয়ে চলছে ক্রমশ।


বাংলাদেশের নাট্যবৈশিষ্ট্য মূলত বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি, বর্ণনাত্মক নাট্য-অভিনয়রীতি, কথানাট্য, পাঁচালিরীতি ইত্যাদি।


খ. ১. কোনো দেশের শিল্পপরিচয়ে ওই দেশের স্থান, কাল, জীবনযাত্রা, জীবনবোধ প্রতিটি বিষয় নিহিত থাকে। শিল্পের মাধ্যমেই কোনো জাতির রুচি-আচারকে উপলব্ধি করা যায়। পৃথিবীর অনেক দেশেরই বর্তমান নাট্যাবস্থা তাদের মৌলিক ঐতিহ্য থেকে উৎসারিত। বাংলাদেশের নাট্যচর্চা বা থিয়েটার আন্দোলন আমাদের দেশের ঐতিহ্য থেকে উৎসারিত নয়। ইংরেজদের আমদানিকৃত একটি শিল্পক্রিয়া ধারণা। বিভিন্ন দেশের নাট্যগুলো তাদের সংস্কৃতির মূল থেকে উৎসারিত বলে একটি সুনির্দিষ্ট আঙ্গিক গঠন হয়েছে। কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট নয়। সময়ের স্রোতে মূল বিষয়টিই আধুনিক হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে শিল্প-সংস্কৃতির ধারায় দু শ বছরের একটি মধ্যখণ্ডন রয়েছে। অতীতের ঐতিহ্যবাহী বর্ণনাত্মক পরিবেশনারীতিই যে আজকের আধুনিক থিয়েটারের বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল হতো তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আবার বিশ্বনাট্য ধারায় বাংলাদেশি নাট্যকে আলাদা করার জন্য স্বকীয় সুনির্দিষ্ট আঙ্গিকের প্রয়োজনও অনুভূত হয়।

খ.২. জাতীয় নাট্য আঙ্গিক যদি নির্দিষ্ট করা হয় তবে সেটা কেমন হওয়া উচিত একাধিক মতাদর্শের পরিচয় মেলে। তার মধ্যে ‘পালা’ ‘জারি’ ‘যাত্রা’ অন্যতম। বাংলাদেশের ‘যাত্রা’ শিল্পচর্চায় নিবেদিত ও স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বগণ মনে করেন, বাংলাদেশের আজকের আধুনিক নাটকের মূল ‘যাত্রা’ পালা থেকে। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনেবিশক শাসনের কারণে কলকাতায় থিয়েটার প্রবর্তনের মাধ্যমে যাত্রার কিছুটা বিলোপ হয় বটে। গত রাজনৈতিক শাসনগুলোর কারণে এ বিকাশ সাধন আরও রুদ্ধ হয়ে যায়। ড. বৈদ্যনাথ শীলের ভাষায়, ‘বাংলা নাট্যসাহিত্যের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে আলোচনা করিতে হলে সর্বপ্রথম যাত্রা সাহিত্যের আলোচনা করা প্রয়োজন। কেননা বাংলা নাটক মিশ্র সাহিত্য। ঊনবিংশ শতকে ইংরেজি রঙ্গমঞ্চ এবং ইংরেজি নাট্যসাহিত্যের প্রভাবে আমাদের বাংলা নাট্যসাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছে বটে; কিন্তু তাহার পূর্বে আমাদের বাংলাদেশে যাত্রা নামে এক প্রকাশিত নিজস্ব জনপ্রিয় অভিনেয় সাহিত্য ছিল।’ [বৈদ্যনাথ শীল, বাংলা সাহিত্যে নাটকের ধারা, এ. কে. সরকা অ্যান্ড কোং, দ্বিসং, কলকাতা, ১৯৭০, পৃষ্ঠা-২]।

তবে কী যাত্রার আধুনিকায়নই জাতীয় নাট্য আঙ্গিক হওয়া উচিত? ড. সেলিম আল দীন মনে করেন, বাংলাদেশের নাট্যবৈশিষ্ট্য মূলত বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি, বর্ণনাত্মক নাট্য-অভিনয়রীতি, কথানাট্য, পাঁচালিরীতি ইত্যাদি। ড. সেলিম আল দীনের ভাষায়, ‘বাঙলা নাটকের প্রাচীন ও মধ্যযুগে ‘নাটক’ কথাটি প্রায় দুর্লভ। ‘বুদ্ধনাটক’কে নাটক বলা হলেও তা নৃত্যগীতেরই আঙ্গিক। আমাদের নাটক পাশ্চাত্যের মতো ‘ন্যারেটিভ’ ও ‘রিচুয়্যাল থেকে পৃথকীকৃত সুনির্দিষ্ট চরিত্রাভিনয় রীতির সীমায় আবদ্ধ নয়। তা গান, পাঁচালি, লীলা, গীত, গীতনাট, পালা, পাট, যাত্রা, গম্ভীরা, আলকাপ, ঘাটু, হাস্তর, মঙ্গলনাট, গাজীর গান ইত্যাদি বিষয় ও রীতিকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে।’ [সেলিম আল দীন, মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা-৪]।


বাঙালির ইতিহাস মাত্রই নানা জাতির সংস্পর্শে আসা এবং মিশ্রিত হওয়ার ইতিহাস।


সেলিম আল দীনের এ ধারণার সঙ্গে একাত্ম হয়ে অন্য এক প্রবন্ধকার বলেন, ‘সমকালীন সাহিত্যে, বিশেষত নাটকে তার পাণ্ডিত্য, জীবনবোধের গভীরতায়, আঙ্গিক সচেতনতা সর্বোপরি নাট্য-নিরীক্ষা ঈর্ষণীয়। সেলিম আল দীন বাংলা নাটকের শেকড় সন্ধান করেছেন, বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ভেতর। তিনি খুঁজে পেয়েছেন বাঙালির স্বীয় নাট্যকৌশল।’ [সেলিম আল দীন-এর নাটকে প্রান্তিক মানুষ ও সমাজ-জীবন, অনুপম হাসান, থিয়েটার ওয়ালা, ১০বর্ষ, ১-২ যৌথ সংখ্যা, পৃষ্ঠা-১৩০]।

খ.৩. জাতীয় নাট্য আঙ্গিক সমস্যা প্রসঙ্গে নাট্যকলা বিষয়ক অধ্যাপক ড. ইস্রাফিল শাহিন বলেন, ‘যে কোনো জাতিরই একটি আত্মপরিচয় আছে, থাকে এবং থাকবে। মিশ্রিত বা অবিমিশ্রিত সেটা বড় নয়। বাঙালির ইতিহাস মাত্রই নানা জাতির সংস্পর্শে আসা এবং মিশ্রিত হওয়ার ইতিহাস। নৃতাত্ত্বিকভাবে তাই আমরা শংকর জাতি। ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সূত্রে আমাদের আত্মপরিচয়কে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, আত্তীকরণের মধ্য দিয়ে, বর্জনের মধ্য দিয়ে তৈরি করেছি। জাতির নাট্যকলাও সেই সূত্রেই বিচার্য। ফ্রেঞ্চ একাডেমির বেধে দেওয়া নিয়মে যেমন চিরকাল নাটক লিখিত হয় নি। ঠিক তেমনি আমাদের বেধে দেওয়া জাতীয় আঙ্গিকেই যে যুগের পর যুগ নাট্যশিল্প সৃষ্টি হবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই। শিল্প কখনো বেধে দেওয়া নিয়মে হয় না। শিল্প যেমন সার্বজনীন তেমনি স্থানিক। একটি স্থানের ইতিহাস-ভূগোল ও মনস্তত্ত্বকে অবলম্বন করে নাট্যকলা, কবিতা, চিত্রকলার মতো বিভিন্ন আঙ্গিকের সৃষ্টি হয়। মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের কবিতা স্বকীয় কিন্তু বাঙালি ও বাংলাদেশেরই কবিতা। সেখানে কিন্তু আমরা জাতীয় কোনো কাব্য আঙ্গিকের কথা বলছি না। ঠিক তেমনি জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের কথা বলতে গিয়ে আমাদের নাট্যচর্চার শতধারা নিরীক্ষা ও সম্ভাবনাকে সীমিত করার ফরমান জারি করছি না তো—সেই তীব্র ভয় কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।’ [ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার]

আবু সাঈদ তুলু

জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৯; জামালপুর । তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্য-শিল্পের প্রতি অনুরাগী। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখে আসছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

প্রকাশিত বই :

লিপির উদ্ভব, ক্রমবিবর্তন ও বাংলা লিপির পরিণত পর্যায় [প্রবন্ধ; অন্তরীপ পাবলিকেশন, ২০০৭]
বিপ্রলব্ধ [উপন্যাস; শিখা প্রকাশনী, ২০০৮]
রূপান্তরবাদ [শিখা প্রকাশনী, ২০০৯]
অনন্তপথের যাত্রী [ভাষাচিত্র, ২০১৪]
জলের আয়না [ভাষাচিত্র, ২০১৫]
পাতার বাঁশি [লিটলবিট, ২০১৭]
সেলিম আল দীনের সাহিত্য ভাবনা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮]

ই-মেইল : tuluart@yahoo.com