হোম নাটক ফিনিক্সের ডানা

ফিনিক্সের ডানা

ফিনিক্সের ডানা
397
0

রুমা মোদক রচিত ও সামিউন জাহান দোলা নির্দেশিত ‘ফিনিক্সের ডানা’ বা ‘ফিয়ারলেস’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়েছিল WOW Festival-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। তিনজন ভিন্নভাবে পারঙ্গম যাদের আমরা প্রচলিত শব্দবন্ধে বলি প্রতিবন্ধী, তাদের উপস্থাপনায় দর্শক জানল ভিন্ন এক জগতের ভিন্ন জীবন ও ভাষার কথা। এ নাট্যভাষ্য সম্পর্কে প্রখ্যাত নাট্যজন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, “…যার কথা বলতেই হবে, সে হচ্ছে নাট্যকার রুমা মোদক। তার রচনার চিত্রময়তা ও কাব্যিকতায় ‘ফিয়ারলেস’ বা ‘ফিনিক্সের ডানা’ একটি উল্লেখযোগ্য রচনা হিসাবে বিবেচিত হবে।…রুমার বর্ণনাত্মক সংলাপ ও কাব্যিক বর্ণনা রচনা কৌশল ক্রমশ তার প্রধানশক্তি হয়ে উঠেছে। সেলিম আল দীন বেঁচে থাকলে নিশ্চিত তার শিষ্যের এ শিল্পানুগামিতায় গৌরব বোধ করতেন”। নাটকের এ পাণ্ডুলিপিটি রইল পরস্পর ঈদ সংখ্যায়।

রংময় জীবন, আনন্দময় জীবন, বৈচিত্র্যময় জীবন, কাঙ্ক্ষিত মানব জনম। সুখে-দুখে প্রেমে-কামে অমূল্য বোধ এই জীবন।উপভোগ আর উদ্‌যাপনের এই জীবন। এই জীবন যেন এক বর্ণিল প্রজাপতি, অঙ্গময় নানা রং জীবনের নানা বাঁকের অনুরাগে রঙিন। আর সেই জীবনের চারপাশ ঘিরে স্বজন পরিজন বান্ধবদের মেলা…। হঠাৎ যদি বদলে যায় সেই জীবনের রং। লাল, নীল, সবুজ সহস্র রং অযাচিত কোনো কারণে ধূসর হয়ে যায়, আশ্চর্য অদ্ভুত বিমূঢ়তায় সমান্তরালে বদলে যায় চেনা পরিপার্শ্বের, চেনা মানুষদের চেহারা। থমকে যায় ক্রমাগত চলার হিসাব। যেমন গিয়েছিল রিনির। দৃষ্টিময় জীবন থেকে দৃষ্টিহীন জীবনে পতন, থেমে যাওয়া, থমকে যাওয়া…। কিন্তু কেউ কেউ পুরাণের ফিনিক্স, ধ্বংসস্তূপে দাঁড়ায় জীবনে বাঁচার তৃষ্ণায়। কিংবা স্পার্টাকাস, তীব্র স্পর্ধায় রুখে উঠে প্রবল প্রতিকূলতায়। এরা বাঁচে, বাঁচায়…..। ‘ফিনিক্সের ডানা’ এমন সহস্র রিনির তীব্র তুমুল বেঁচে থাকার নাট্যগাথা…


❑❑

ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো, খাট নেই পালঙ নেই পিঁড়ি পেতে বসো… আমার জীবনে একটা শৈশব ছিল, ঝুঁটি বাঁধা শৈশব, ফ্রক পরা শৈশব, অমূল্য মায়া মাখানো আগলে রাখা মায়ের আঁচলের মতো শৈশব। সেই শৈশবের অবুঝ দিনমান অনন্ত অশেষ আনন্দ মেখে মেখে পুতুলদের বিয়ে হতো, তোমাদের এইসব ত্রস্ত জীবনের দুর্ভাবনাগুলো তখনো পুরি নি মুঠোয়, পুরতে শিখি নি।

আমার রানি পুতুলের সাথে ওই কুমার পাড়ার রাজকুমার পুতুলের বিয়ে হতো অবসরের স্বস্তিমোড়া অম্লান বিকেলে, যে বিকেলে মায়েরা অবসন্ন ঘুমায় সূর্যোদয় পরবর্তী ক্লান্তি হাতের তালুতে মুছে নিয়ে।আমি তখন আমার সাত রাজার সম্পদের ভাণ্ডার খুলে বের করে নিতাম চৈত্র সংক্রান্তির বান্নি থেকে কেনা পোড়া মাটিতে লাল রঙের নকশা করা হাড়িপাতিল। বিশাল বিয়ের ভোজ যে আজ! মুঠো মুঠো বালি ঝেড়ে বেছে  চুলায় চাপাই, আহা কী সুবাস! ঘি ফোড়ন দেয়া পোলাও! আর, আর কুচুরিপানা ঝেড়ে বেছে খাসির মাংস… আহা! আমার অনতিদীর্ঘ জীবনের স্মৃতির খাতা ছিঁড়ে ফুঁড়ে ছুটে আসা সুবাস…! ওই যে ফাতেমাবুর বিয়ের দিন ম্মা রেঁধেছিল শিলপাটায় দারুচিনি আর এলাচ গুড়ো করতে করতে…। খেয়ে বরের বাড়ির লোকেদের সে কী তারিফ! আমার আম্মার রান্না! আম্মা! আম্মা!!

হঠাৎ আম্মার আঁচল বাতাসে ওড়ে, নাটাইয়ের সুতোর মতো, অদৃশ্য কিন্তু কাচগুঁড়োর মাঞ্জামাখা, বড়ো শক্ত কঠিন… আর সেই আঁচলের গিঁটে বাঁধা ঘুড়ি আমি, মায়ের চোখের মণি, প্রশ্রয়ের স্নেহের মতো নাটাইয়ে বাঁধা। জানালার শিক গলে উড়ে আসে মায়ের গায়ের গন্ধ, আমাকে আকুল করে, উতালা করে যেন ঝড়ের আগমনবার্তায় ত্রস্ত পাখির ছানা। পরে থাকে লাল হাড়িপাতিল, কল্পনা আর আনন্দ মেশানো মাংস পোলাও—আমি দৌড়ে যাই আম্মার উমে। আম্মা… আম্মা… আম্মার আঁচলে পেঁয়াজ, রসুন আর হলুদ মরিচের চিরায়ত সংসারী গন্ধ। আম্মা নিজের বুকে আরো জড়িয়ে ধরেন আমাকে, হাতে তার পৃথিবীর তাবৎ অমঙ্গল অস্বীকার করা আমাকে আগলে রাখার স্পর্ধা। শাড়ির আঁচলে মুছে দিয়ে শ্রান্তির ঘাম, মা আমাকে দুহাতে উপরে তোলে ঘুরত বান্নিতে দেখা সেই নাগরদোলার মতো…, আজ আমাদের পুতুলরানির বিবাহ হইব, বিবাহ হইব… মা গাইত, আর তার নির্ভয় দৃঢ় দুহাতের বন্ধনে ঘুরতে ঘুরতে আমি দেখে নিতাম পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ ঈশান নৈঋত দশ দিক! কোথাও কোনো কোণে নেই ঝড়ের কোনো পূর্বাভাস। কোনো কোণ আঁধার হয় নি কালো মেঘে।

আম্মার হাত আগলে রাখলে মোটেই কোনো ঝড়ের আভাস দেয় না হানা সম্মুখগামী দৃষ্টিতে, আম্মার আঁচল শুষে নিলে শ্রান্তির ঘাম বদলায় না, মোটেই বদলায় না পুতুলের জরি, আঙরাখার ঝলমল, বদলায় না পোড়া মাটির হাড়ি পাতিলের লাল নকশা। কিচ্ছু বদলায় না মায়ের বাহুবন্ধনে, বরং বদলে দেয় রঙের অর্থ, অর্থের নেতিবাচকতা অস্বীকার করে।

এই যেমন সেদিন স্কুলের এসেম্বলিতে নতুন আসা বড় আপা খড়খড়ে গলায় বললেন, যেমন এক বন্ধ সিন্দুকের ভেতর থেকে ডাক পাঠাচ্ছে কোনো দৈত্য—কাল থেকে ইউনিফর্ম ছাড়া কেউ স্কুলে এলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভয়ার্ত এই হুঁশিয়ারি গমগম প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল স্কুলের মাঠ পেরিয়ে একেবারে প্রবেশ গেট পর্যন্ত।


তার হাত মাথা ডিঙিয়ে বিষাক্ত সাপের মতো নামে আমার নব অঙ্কুরিত যৌবন চিহ্নে। আমি টের পাই এর স্পর্শের কামুকতা।


আমি আর স্কুলে আসতে পারব না! মফস্বলের প্রাইমারি স্কুল, কিসের ইউনিফর্ম আর এত্ত নিয়ম কানুনের বালাই! দিব্যি আসতাম আর যেতাম, ইচ্ছে হলে পড়া নইলে প্রজাপতির পেছন পেছন ছোটা। আহা আনন্দ! প্রজাপতির বহুবর্ণিল পাখায় লেপ্টে থাকা ছোপ ছোপ আনন্দ। একটু খানি লাল মাথার নিচে, পেট বরাবর নীল আর হলদেটে ছোপ ছোপ ঢেউ পাখার এখানে সেখানে…। এই তো এই তো আমি ধরে ফেলেছি। আনন্দকে আটকে দিয়েছি দু আঙুলে, আবার উড়িয়ে দিয়েছি… ফু… ওই তো যাচ্ছে প্রজাপতি উড়ে, ওই তো যাচ্ছে…। আনন্দকে ধরা যায়, ধরা যায় বহুবর্ণিল আনন্দকে দু’আঙুলে। সে আনন্দের জন্ম আর বাস যে আসলে নিজেরই ভেতরে। খেলনা লাল হাঁড়িকুড়ি, নীল প্রজাপতি সব যে নিজেকেই খুঁড়ে নিতে হয় নিজের ভেতর থেকে…।

হ্যাঁ নীল প্রজাপতি, আমার স্কুলের ইউনিফর্মের রং নীল। তোমরা বলো বেদনার রং নীল, আমার সেই শৈশবের নিষ্পাপ বেলা ছুঁয়ে আনন্দ এসেছিল নীল রঙের ইউনিফর্ম পরে। আব্বার দু’পয়সার সরকারি চাকরি। গোনা টাকায় মাস চলা। সেই শৈশবেই আমি জানি আমি বৈশাখে সামান্য তরমুজ কিংবা শীতে কমলালেবুর বায়না ধরলেই আম্মা আগামী মাসে আগামী মাসে বলে কপোলে চুমু খান ঠিক, কিন্তু আগামী মাস আর আসে না! আমি ঠিক টের পাই আম্মার অক্ষমতা, আব্বার অর্থনৈতিক দীনতা আর বেদনার টানাপোড়েন। আর এখন মাসের মাঝখানে একটা আস্ত নীল ইউনিফর্ম! কোথায় পাবে মা? তবে কী স্কুল যাওয়া বন্ধ আমার?

আকণ্ঠ জড়তা আর অপ্রাপ্তির প্রস্তুতি নিয়ে তবু আমি ভয়ে ভয়ে আম্মাকে বলি, আম্মা নতুন বড় আফা বলছে আগামী রবিবার থেকে ইউনিফর্ম ছাড়া স্কুলে ঢুকতে দেবে না। মা তখন ভাতের হাঁড়ি উল্টে মাড় ফেলছিলেন। হাঁড়িটা জায়গা মতো বসিয়ে দিয়ে দু’হাতে আমার দু’গাল ধরে সকল আশিস ঢেলে চুমু খেলেন কপালে, না মোটেই আমার মেয়ের পড়া বন্ধ হবে না। আমার মেয়ে ওই স্কুলের বড় আপা হবে। হতেই হবে।

তারপর কী হয়, দেখি তিনি ত্রস্তে খুঁজে আনেন মাটির ব্যাংক, আছড়ে ভাঙেন মেঝেতে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরা পয়সাগুলো গুনতে বসেন পা মেলে। পাঁচ… দশ…পনেরো…।

ঘরে খুঁটি আটকানো বাঁশের পাল্লা নানা কসরতে কেটে তার ভেতরে জমানো নোটগুলো গুনে আঁচলে বাঁধেন। তারপর মাস মাস খাবার হাঁড়ি থেকে মুঠো ভরে তুলে নেয়া জমানো চাল নিয়ে দৌড়ান করিমন চাচির বাড়ি।

আর এর দু’দিন পর এক শনিবারের সকালে যখন আকাশের রং একটু ধূসর, জমাট মেঘেরা অভিমানে থমকে আছে, রান্নাঘরে আম্মার মসুর ডাল বাগাড় দেয়ার গন্ধে পেটে চনমন করছে খিদে আর আমি বারান্দায় চাটাই পাতিয়ে ঝুলে ঝুলে পড়ছি, আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে… আমার বইয়ের পাতায় অভিমানী মেঘেদের ছায়া চুপটি মেরে বসে আছে। ঠিক তখন রৌদ্রকরোজ্জ্বল  ঝলমল আনন্দ নিয়ে বাসায় এলেন আব্বা, এক হাতে বাজারের ব্যাগ আর অন্য হাতে নীল ইউনিফর্ম। আহা নীল, আনন্দের নীল, নতুন জামার গন্ধের নীল, আহা কতদিন নতুন জামা পরি না। কত্ত দিন…।

তোমরা বলো বেদনার রং নীল, হয়তো। হয়তো। নইলে যে নীল গায়ে জড়িয়ে নীল প্রজাপতি আমি উড়েছি আনন্দে, চেতনার রঙে চুনি-পান্না আনন্দ পেয়েছি খুঁজে, সেই নীল গায়ে একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি আম্মা শুয়ে আছেন খাটিয়ায়, সাদা কাফনে মোড়া। গত তিনদিন জ্বর ছিল তার, মামুলি জ্বর।

বরই পাতা গরম জলে শোয়াইয়া মশারি তলে…।আমার আম্মা চলে গেলেন।এই নিষ্ঠুর নিদারুণ পৃথিবীর বিপরীত কোনো সত্য না শিখিয়ে চলে গেলেন! আম্মার গায়ে জড়ানো সাদা কাফন শুষে নিয়ে চলে গেল সকল রং, আমার জীবনের সকল রং…।

২.
আম্মা চলে গেলে আমি প্রথমবার টের পেলাম জীবন কেমন ছেয়ে যায় অচেনা অনিশ্চয় অন্ধকারে, কেমন নিজের ভেতরে আর জন্ম নেয় না কোনো আনন্দ। আব্বা যেন হয়ে যায় লক্ষ যোজন আলোকবর্ষ দূরের কোনো দয়ামায়াহীন অনাত্মীয়। আম্মা নাই, শূন্য নিরাপত্তাহীন ঘরে কত চেনা মুখ আসে আশ্রয় আর সান্ত্বনার মুখোশ পরে। নিরাপত্তার নামে, সহমর্মিতার ভণ্ডামিতে তারা আমার পাশে বসে। মাথায় হাত রাখে। যেন-বা কত নিষ্পাপ এই আশিসের ধারা।

আসে মনির মামা, আম্মার খালাত ভাই। আম্মা থাকতে কালেভদ্রে আসত এ বাড়িতে আমার জন্য পটেটো চিপস আর আম্মার প্রিয় জিলাপি নিয়ে। এবার আসে চিপস নিয়ে, আহারে মা মরা মাইয়াডা… তার হাত মাথা ডিঙিয়ে বিষাক্ত সাপের মতো নামে আমার নব অঙ্কুরিত যৌবন চিহ্নে। আমি টের পাই এর স্পর্শের কামুকতা। আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলে দেয়, এ স্পর্শ কেমন নোংরা! আমি ছিটকে সরে দাঁড়াই।

আসে করম আলী চাচা, আম্মার হাতে এককাপ গুড়জ্বালের চা আর তেলেমাখা মুড়ি না খেলে নাকি ভাত হজম হতো না তার। আমাকে জড়িয়ে ধরে চলে তার কুম্ভীরাশ্রু বর্ষণ। কেমনে তোর মা চলে গেল রে!! আমি টের পাই, ওই যে নারী হয়ে ওঠার ষষ্ঠেন্দ্রিয়, তাতে টের পাই আমি করম আলী চাচার জড়িয়ে ধরায় নেকড়ের শিকার ধরার লালা। তার অশ্রুর আড়ালে চকচক করে লোভী কামনা। অসহ্য অসহ্য এই জড়িয়ে ধরা! আমি এক ধাক্কায় সরিয়ে দেই তাকে।

হায় নারী জন্ম! আম্মার আগলে রাখা হাত সরে গেলে বুঝি এমনি উষর হয়ে ওঠে জীবন! আপনা মাংস বৈরি হয় হরিণীর!

অতঃপর আমার নিরাপত্তার খাতির আর আব্বার সংসার রক্ষার অজুহাতে বছর না ঘুরতেই সৎ মা আসে ঘরে। হা হা হা,  টলমল করে আমার নিজেরই টিকে থাকা।

আম্মার কবরের পাশে দিনরাত কাঁদি আমি, আম্মা… আম্মা…।

আম্মা কী শোনতে পান আমার আকুতি, মৃত্যুর মতো গহিন শূন্যতায় বুঝি সব আকুতি মিলিয়ে যায় নিঃশব্দ হয়ে…। ঘরে ময়লা জমতে জমতে ম্লান হয়ে যায় আমার নীল ইউনিফর্ম। স্কুলে যাওয়া হয় না আমার। আম্মা তুমি না চাইতে তোমার মেয়ে ওই স্কুলের বড় আফা হবে, আম্মা, আম্মা গো…।

আম্মা শোনেন কিনা জানি না, একদিন পেছন থেকে কাঁধে হাত রাখে যেন এক দেবদূত। প্রজাপতি…। প্রজাপতি, প্রজাপতি কে ডাকে আমাকে এই নামে? কে ডাকে এই পুষ্পহীন উষর মরুতে, কে ডাকে যখন জীবনের রং হারিয়ে বিষাদে বেদনায় বিপর্যস্ত আমি, তখন কে ডাকে আমাকে জীবনের রঙে? ডাকে প্রজাপতি পুষ্পকাননে?

ঘুরে তাকিয়ে দেখি রিয়াদ ভাই। ওই মিয়া বাড়ির মাইজা ছেলে। আমাদের স্কুলেই পড়ে, কয়েক ক্লাস উপরে। স্কুলে যাস না কেন তুই, রিয়াদ ভাইয়ের কণ্ঠে কেমন নির্ভরতার আহবান, হঠাৎ তুলির পরশ ছড়িয়ে যায় ভেতরের ক্যানভাসে,  রঙের  ছোঁয়ায় যেন মুহূর্তে  উজ্জ্বল হয়ে উঠতে চায় ভেতরটা। আমি স্কুলে যেতে চাই রিয়াদ ভাই, আমি পড়তে চাই, আমি স্কুলের বড় আফা হতে চাই।

রিয়াদ ভাইয়ের ব্যবস্থাপনায় তার ছোট বোন বুশরারে সপ্তাহে ছয়দিন পড়াতে যাই আমি। রিয়াদ ভাইয়ের আম্মা আমাকে প্রতিমাসে পাঁচশত টাকা দেন। সেই টাকায় আমার খাতাকলম কেনা হয়, আমি নীল রঙের আনন্দ মুঠোয় নিয়ে আবার মায়ের কবরের পাশ ঘেঁষে সুপারি গাছের ছায়ায় ছায়ায় স্কুলে যেতে যেতে, সৎ মায়ের খোঁটা শুনতে শুনতে দিব্যি এসএসসির ঘর পার হয়ে যাই।

এর মাঝে কী হয়, এক উজ্জ্বল বিকেলে—হ্যাঁ খুব উজ্জ্বল ছিল সে-বিকেলটা। অস্তগামী যে রোদটার স্কুল মাঠের বাউন্ডারি লাগোয়া শিরিষ গাছের পাতায় ঝিমুতে থাকার কথা, সেই রোদটা সেদিন কেমন রহস্যময় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। আমি স্কুল ফিরতি পথে আনমনা হাঁটছিলাম, কি ভাবছিলাম? কী জানি কী ভাবছিলাম হয়তো ভুল হওয়া উপপাদ্য কিংবা নৌকাভ্রমণ রচনাটির কথা। আমার জীবনে তখন স্কুলের বড় আপা হওয়া ছাড়া আর কোনো লক্ষ্য ছিল না, স্বপ্ন ছিল না, ভাবনা ছিল না…। সেই  উজ্জ্বল বিকেলে সাইকেলে আমার পথ আটকায় রিয়াদ ভাই, প্রজাপতি…। সাত আসমান অতিক্রম করে সে ডাক পাড় ভাঙে আমার হৃদয় গাঙের। এমন আকুল ডাক আমি শুনি নাই আগে, কিন্তু আমি জানি এ ডাক আমার শৈশব কৈশোর পেরিয়ে যুবতীবেলায় ঝাঁপ দেয়ার ডাক, এ ডাক আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে সুখী করার ডাক।

তুই আমার হবি প্রজাপতি?

আমার নাম তো রিনি, তুমি আমাকে প্রজাপতি ডাকো কেন রিয়াদ ভাই?

তোর ভেতরের রং আমি দেখতে পাই। লাল, নীল, হলুদ ছোপ ছোপ রং…

মুহূর্তে আমার আম্মাকে মনে পড়ে। যতদিন আম্মা ছিলেন, আমার রংগুলো ছিল অমলিন।

তুই স্কুলে প্রজাপতির পেছন পেছন ছুটতি আমি দেখতাম তোকে। দেখতাম তুই একটা আস্ত প্রজাপতি। তোর ভেতর থেকে স্ফুরে বের হচ্ছে লাল, নীল, হলুদ সহস্র রং, রাঙিয়ে দিচ্ছে চারদিক।

কী বলো, শুধু তুমি দেখতে পেতে!

হ্যাঁ শুধু আমি দেখতে পেতাম, সে-রং দেখার জন্য অন্য চোখ চাই যে।

আমি টের পেতে থাকি আবার রং জন্ম নিচ্ছে আমার হৃদয়ের গহিনে।অনুরাগের আবির রং, সূর্যাস্তের আভার মতো, অপেক্ষার তীব্র লাল রং, সূর্যোদয়ের ভোরের মতো, অভিমানের হলদেটে রং শীতের শেষের পাতাগুলোর মতো। আমি নারী, আমি সামান্য  নারী পারি কি এড়াতে তারে! এইবার টের পাই পুরুষের ডাকও কখনো হয় কাঙ্ক্ষার মতো মায়াময়।

“এই যে তোমার প্রেম হৃদয়হরণ
এই যে মধুর আলসভরে মেঘ ভেসে যায় আকাশ পরে
এই যে বাতাস দেহে করে অমৃতক্ষরণ
হৃদয়হরণ… “

৩.
এসএসসি পাশের পর রিয়াদ ভাই আমাকে বলে, চল জেলা সদরে তোরে নিয়ে কলেজে ভর্তি করে দেই। আমি এক কথায় রাজি হয়ে যাই। আব্বা আমার থেকেও নাই, সৎ মা আমি গেলেই বাঁচে। পাঁচ সাত মাইলের মধ্যে কোনো কলেজ নেই, এসএসসি পাশের পর আমি কী করব আর জেলা সদরে না গিয়ে। আমি রিয়াদ ভাইয়ের হাতটা ধরি। আর এক অন্ধকার ভোরে, তখনো কাকগুলো ডেকে পাঠায় নি ভোরের বার্তা, করিমন চাচির খোঁয়াড় থেকে ডেকে উঠে নি মোরগের দল—আমি এক হাতে ধরি রিয়াদ ভাইয়ের হাত আর অন্য হাতে বাসের হ্যান্ডেল…।

আপাত ঠিকানা হয় রিয়াজ ভাইয়ের মেস। রুমমেটরা সব রিয়াজের বউয়ের জন্য সম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ায়, চাঁদা তুলে চা সিঙারা আনে। তারপর মুচকি হেসে জরুরি কাজের অজুহাতে একে একে বের হয়ে যায়। আমি বলি, তুমি না বলছ আমার জন্য লেডিস মেস ঠিক করেছ।

হ্যাঁ, করেছি তো।

এখানে এনে ওঠালে যে?

ভয় পাচ্ছ?

মোটেই না, সবাই ভাবি ভাবি ডাকছে, বেশ লাগছে।

তাই! তবে থেকেই যাও।

বয়স ১৮ হতে আরো দুই মাস বাকি, পুলিশ কেসে পরবা কিন্তু।


আমি খুব আশ্বস্ত হই। আমি খুব গর্বিত হই, আমি ধন্য হই। আমি ঈর্ষা করি আপন ভাগ্যকেই আমার।


হা হা হা হাসতে হাসতে আমরা হাত রাখি একজন আরেকজনের হাতে, নির্ভরতার হাত। রিয়াজ ভাইয়ের একটা হাত, হাত ছেড়ে সাঁতরে বেড়ায় আমার চুলের গহিন অরণ্যে। আমরা ঠোঁট রাখি একে অপরের ঠোঁটে, সমর্পণের। স্পর্শের গভীরে আমরা ডুবে যাই, যেতে থাকি… হাত থেকে ঠোঁট, কাঁধ, চিবুক, ঘাড় ঠিক কোথায় গোপন হয়ে আছে নারীত্ব আমার জানা ছিল না মোটেই, জানা হয় নি সুযোগে কেমন নারী হয়ে উঠতে জানি আমিও। স্পর্শে কেমন শরীরের লোমকূপে লোমকূপে লাগে প্রলয় নাচন, তীব্র আত্মসমর্পণ আর উন্মত্ত সাড়া… আহা নারীজন্ম!  ধন্য নারীজনম! পূর্ণ নারীজনম!!

কী ভাবছেন, যা শুনেছেন এতকাল, পুণরাবৃত্ত সেই গল্প! আসলে কোনো এক প্রতারক পুরুষ রিয়াদ। প্রেমের ছলাকলায় ভুলিয়ে গ্রাম্য অবোধ যুবতীকে অতঃপর নিলামে তোলে ব্যবসার বাসনায়, বিক্রি করে দেয় অন্ধকার জগতে আর প্রতিরাতে হাতবদল হয় ভাগ্য আমার!

হা হা হা।না। ভুল ভেবেছেন। একদম ভুল ভেবেছেন। এর কিছুই ঘটে নি আমার জীবনে। বরং রিয়াদের বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরে প্রথম দিনেই শহর আমায় আপন করে নেয় নির্ভয় মমতায়, শিহরনে, সোহাগে। সেই বিকেলে  রিকশা চড়ে শহরের উটকো ব্যস্ত মানুষের ভিড় ঠেলে ঠেলে মেয়েদের মেসে যেতে যেতে আমি টের পাই আম্মার মৃত্যুতে হারিয়ে ফেলা রং আমার, আনন্দের রং আমার কেমন বিন্দু বিন্দু জমাট ঘনীভূত হয় বুকের ভেতরে, জন্ম নেয় পুনর্বার। যেমন ঘনীভূত হয় কার্তিকের নবীন শিশির ঘাসের বুকে কিংবা পিঁপড়ের দল সারিবেঁধে সঞ্চয় করে খাদ্য।

আমি দিব্যি মানিয়ে নেই শহরের জীবন। এর মাঝে আব্বার ফোন আসে, হ্যালো।

হ্যালো আব্বা।

গ্রামের মানুষ বলাবলি করছে তুমি রিয়াদের সাথে পালাইয়া গেছ।

পালাইয়া আসছি ঠিক, রিয়াদ ভাইয়ের সাথে আসছি এও ঠিক। কিন্তু অসৎ উদ্দেশ্যে আসি নাই আব্বা। পড়ালেখা শেষ করতে আসছি।

গ্রামের মানুষ এসব শুনবে, না বুঝবে? আমার মুখে কলঙ্ক মেখে ঘর ছেড়েছ তুমি আর ফিরবা না এ ঘরে।

আমি ফোন রেখে হাসি। ভেতরে দমকে উঠে বিষাদের গভীর কান্না। আম্মা ছাড়া সেই ঘর কী আর ঘর ছিল আমার নিরুপায় আশ্রয় ছাড়া? আমি জানি আব্বা, আমি আর না ফিরি ঘরে তাতে তোমারও শান্তি আমারও।

সকাল সকাল কলেজ আর কলেজ শেষে টিউশনি। অপেক্ষা আমার উন্মন আকুল হয়ে থাকে এক টুকরো সন্ধ্যার জন্যে। রিয়াদের পথপ্রদর্শক, ভরসার হাতে রেখে আমার ভবিষ্যৎ স্বপ্নের হাত আমি ভবিষ্যৎ দেখি, দেখি বিশাল আকাশ নত হয়ে কেমন সন্ধ্যা গ্রাস করে পৃথিবী আর আমি রিনি, নিযামপুর গ্রামের এক অখ্যাত, সুতো ছেঁড়া উড়ুক্কু ঘুড়ি কেমন খুঁজে পাই নিজেকে জড়ানোর নাটাই আবার। আমার ঘর হবে আবার, আমি ঘরের স্বপ্ন দেখি… এই তো আর বছর খানেক, রিয়াদের পড়াটা শেষ হলেই শেষ হবে আমারও মেস জীবন। পাখিরা দলবেঁধে কিচিরমিচির করতে করতে উড়ে নীড় অভিমুখী।

আর আমার নীড়ে প্রবেশের স্বপ্ন কেমন অজানা আশঙ্কায় কাঁপে থরো থরো। আমি পুনঃপুন নিশ্চিত হতে চাই, মাথা রাখি রিয়াদের কাঁধে।

তুমি সবসময় আমাকে এমনভাবে ভালোবাসবে?

সব নারী বুঝি প্রেমিকের কাছে গ্যারান্টি চায়?

হ্যাঁ চায়। বলো প্লিজ।

হ্যাঁ বাসব। ঠিক প্রথমদিনের মতোই চিরদিন তোমাকে ভালোবাসব আমি।

কী হয় আমার, আরো নিশ্চয়তা খুঁজে নিতে চাই, জীবনটাই অনিশ্চয় জেনেও। আচ্ছা আমার এই মুখ যদি কখনো ঝলসে যায় আগুনে, কুৎসিত দেখতে হই আমি।

তবু আমি তোমাকেই ভালোবাসব।

যদি আমি অতর্কিত দুর্ঘটনায় একটা পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ি?

তবু আমি তোমাকেই ভালোবাসব।

কেন?

কারণ আমি ভালোবাসি ভেতরের তোমাকে। ওই যে ভেতরটায় রং জন্ম নেয়। যে রং চারপাশে ছড়িয়ে ছড়িয়ে তুমি হয়ে যাও একটা প্রজাপতি। সেই স্কুলজীবন থেকে…।

আমি খুব আশ্বস্ত হই। আমি খুব গর্বিত হই, আমি ধন্য হই। আমি ঈর্ষা করি আপন ভাগ্যকেই আমার।

৪.
সেদিন আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার ফরম ফিলাপ। টিউশনির জমানো টাকার সাথে রিয়াদের টাকা মিলিয়ে আমি শেষবার রিয়াদকে ফোন দেই। শেষ হতে চলেছে আমার গন্তব্যমুখী দৌড়…

ডিপার্টমেন্টের দিকে এসো।

হ্যাঁ আসছি। তুমি কাগজপত্র সব ঠিকঠাক নিও।

সব গুছিয়ে নিয়েছি, ভেব না।

টাকা পয়সা?

তোমারটুকু আমারটুকু মিলে হয়ে গেছে।

তাহলে রিনি বিবি প্রজাপতি আমার, একধাপ পার হতে যাচ্ছ বড় আপা হবার দিকে।

হুম।আর আর রিয়াদের জীবনসঙ্গী হবার দিকে…

ফোনের দুপ্রান্তে সুখ আর আনন্দের জোয়ারে হাসতে হাসতে ভাসি দুজন…।

ফরমটা এনে যখন কাগজপত্র মেলে সব পূরণ করতে বসি, তখন হঠাৎ আমি টের পাই ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে আমার দৃষ্টির সামনে সবকিছু। ফরমের কাগজ, তার গায়ে গোটা গোটা লেখা, আমার কলম, আমার হাত… এমনকি সামনে বসে থাকা রিয়াদ। আমি কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না। কিচ্ছু না। হারমাদের মতো হঠাৎ আক্রমণ করা অন্ধকারে আমি ভয়ে সিঁটিয়ে যাই, আতঙ্কে চিৎকার করি, রিয়াদ…।

রিয়াদ জড়িয়ে ধরে আমাকে, এই তো আমি… রিয়াদ রিয়াদ আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না রিয়াদ।

পাবে রিনি পাবে। এই তো আমি আছি তোমার হাত ধরে। নিজের চোখে দেখতে না পেলে আমার চোখে দেখবে।

কয়েক মিনিট এক বিভীষিকার অন্ধকারে আমাকে ডুবিয়ে আবার আলো আসে দৃষ্টির সম্মুখে। কিন্তু তারপর থেকে সেই আতঙ্ক পিছু নিয়েছে আমার। কেন সত্যি অন্ধকার নেমে এল এমন হঠাৎ আমার দৃষ্টিজুড়ে।

রিয়াদ আশ্বস্ত করে আমাকে, দুর হয়তো একটু মাথা ঘুরেছিল।কিংবা কিংবা মনের ভুল।

মনের ভুল নয় রিয়াদ সত্যি সেদিন আলো হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি।

আচ্ছা হারালেই-বা, আমি তো আছি তোমার সাদা লাঠি…।

রিয়াদের আশ্বাসে আমি বিশ্বাস রাখি, নিজের বিশ্বাস খুঁজে নেই নিজের ভেতর থেকেই, যেমন করে রং খুঁজি, আলো খুঁজি।পরীক্ষার হলে যাই।

খাতা, প্রশ্ন হাতে নিয়ে আমি লিখতে যাব তখন আবার হঠাৎ করে এক সর্বগ্রাসী অন্ধকার নেমে আসে পরীক্ষার হলময়। আমি কিচ্ছু দেখতে পাই না কিচ্ছু না… তীব্র দিনের আলোয় আমি দেখি অমাবস্যার আঁধার… ম্যাম… চিৎকার করে আমি ম্যাডামকে ডাকি… আমি কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না, কিচ্ছু লিখতে পারছি না।

এবার বিষয়টি ভাবায় রিয়াদকে। সন্ধ্যায় চক্ষু ডাক্তারের অ্যাপয়েনমেন্ট করি দু’জন। ডাক্তার এ মেশিন ও মেশিন এ পরীক্ষা ও পরীক্ষার পর গম্ভীর মুখে রায় দেন, এ রোগের নাম রেটিনাস পিগমেন্টশন।চোখের পেছনে থাকে রেটিনা যেখানে থাকে আলোক সংবেদী কোষ। জিনগত সমস্যার কারণে এই কোষগুলো আর তৈরি হতে পারে না, ধীরে ধীরে কমে আসে রোগীর দৃষ্টিসীমা। রাতে কম দেখে, পার্শ্ব দৃষ্টি কমে আসে, একসময় অন্ধ হয়ে যেতে পারেন।

অন্ধ হয়ে যেতে পারেন, অন্ধ হয়ে যেতে পারেন… আমি ভেঙে পড়ি পুনর্বার। যেমন ভেঙে পড়েছিলাম মায়ের কবরের কাছে, যেমন মায়ের সাদা কাফন শুষে নিয়েছিল আমার  জীবনের সকল রং। আমি টের পাই, এমনই এক রং শুষে নেয়া আঁধারের মতো রংহীন জীবন আমার দিকে আসছে ধেয়ে। আমি আকুল কাঁদতে কাঁদতে রিয়াদকে ফোন দেই, রিয়াদ রিয়াদ আমি অন্ধ হয়ে যাচ্ছি। পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা গলায় সঞ্চিত করে দরিদ্র পিতার সঞ্চয়ের মতো। আমি আছি রিনি, আমি আছি তোমার পাশে, আমি আছি প্রজাপতি তোমার জন্য।

৫.
ধীরে ধীরে একদিন আলো কমে যেতে যেতে সত্যি অন্ধ হয়ে যাই আমি। আমার ডিগ্রি আছে, আমার রিয়াদ আছে তবু ভীষণ একা হয়ে যাই, নিঃসঙ্গ, অসহায়, দিগ্‌ভ্রান্ত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই আমি। নিজেকে সামলাতে পারি না। রিয়াদের ফোন আসে।আমি হাতড়ে বেড়াই গোলাপি জামা… চিনি না, এই তো সেদিনও ঠিক প্রেমের গোলাপি রং খুঁজে নিতে পারতাম। খুঁজে নিতে পারতাম সূর্যোদয় সূর্যাস্তের রং… রিয়াদের চোখ চেয়ে পড়ে নিতে পারতাম অনুরাগ আর অনুভবের তীব্রতা। কিচ্ছু দেখতে পারি না এখন আর কিচ্ছু না…।

রিয়াদ, রিয়াদ আমি কী বড় আপা হতে পারব না? রিয়াদ চুপ করে থাকে। প্রথমবার আমি রিয়াদের নীরবতার ভাষা দেখতে পারি না, পড়তে পারি না। বুঝতে পারি না ওর ভেতরে কী উথালপাতাল পরিবর্তন নাকি আমার হঠাৎ রং মুছে যাওয়া জীবনের বেদনা সংক্রামিত করে ওকে আমি পড়তে পারি না।পড়তে পারি না। কী জানি হয়তো ভুল হয়তো ঠিক আমি টের পাই অচেনা লাগে রিয়াদকে।

মেসের ঘরে রাত গভীর হয়। আমি অনুভব করি জানালার গ্রিল ছুঁয়ে যায় শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ, আমি দেখি না তার নরম জোছনার রং… শুনতে পাই, শুনতে পাই চাঁদনি রাতের মোলায়েম বাতাসে মায়ের আকুতি, তুমি স্কুলের বড় আপা হবে বড় আপা…। কী করে হবো আমি কী করে? আমি হাতড়াই, ফোনটা কই রাখলাম, রিয়াদকে একটা ফোন করা দরকার। অন্ধদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে খোঁজ নেয়া দরকার। এই তো এই তো পেয়েছি। আমি আন্দাজে আঙুল টিপে নাম্বার ডায়াল করি জিরো ওয়ান সেভেন…। ফোন ধরে না রিয়াদ। আমি প্রথমবার টের পাই রিয়াদের উপেক্ষা। চোখের দৃষ্টিহীনতায় আমি প্রথমবার দেখতে পাই রিয়াদের বিরক্তি। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই…।

দৃষ্টিহীন দৃষ্টি সে রাতে আমার দৃষ্টি খুলে দেয়। আমি রুমমেট পরিকে ডাকি। পরি আমার দৃষ্টিহীন চোখের অশ্রু মুছে জানায় আমার ডায়াল করা নাম্বারটা ভুল নয়। রিয়াদেরই নাম্বার। নিজের কাছে নিজের আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণের শেষ আশাটিও মুছে যায় অবশেষে। আহা আহা আমার সাদা ছড়ি!

মায়ের কবর থেকে আমাকে তুলে আনা রিয়াদ, বড় আপা হবার স্বপ্ন উসকে দেয়া রিয়াদ আমার সাদা ছড়ি হতে চাওয়া রিয়াদ!  কী হয়, সে রাতে আমার ভেতরে জন্ম নেয় এক অন্য আমি। আমি হই আমার সাদা ছড়ি। পরিকে বলি, একটি বার একটি বার নিয়ে যাবে আমাকে ব্রেইল স্কুলে?

দুটি বছর লাগে আমার নিজেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে। রিয়াদের নাম্বারে এদুবছর আমি আর ডায়াল করি নি সে-রাতের পর! অবাক হই না একটুও, রিয়াদও আর খবর নেয় না আমার। যেন এ খুব স্বাভাবিক। যেভাবে জীবনের রং মুছে যায়, বর্ণিল প্রজাপতি মরে ধূসর হয়ে মিশে যায় মাটিতে, অন্ধকার ঢেকে দেয় জীবনের মোহময় আলো ঠিক তেমনই  সুসময়ের কথা দুঃসময়ে অর্থহীন হয়ে যায়… দৃষ্টি কিংবা সামর্থ্যময় জীবনের প্রতিশ্রুতিগুলো দৃষ্টিহীন অসহায় জীবনে মিথ্যে হয়ে যাওয়াতে কিচ্ছু নেই অবাক হবার। অবাক হবার কিচ্ছু নেই।

এই দুবছরে আবারও পদে পদে নারীত্বের অপমান! মাথার উপর ছাতাহীন নারী, সে দৃষ্টি নিয়ে হোক কিংবা দৃষ্টিহীন। চারপাশের বিপরীত জগৎ হা করে থাকে গিলে খাবার জন্য। হাত বাড়িয়ে থাকে সুযোগে এই নারীত্বকে ছিঁড়ে খুঁড়ে দেবে বলে।


আমিই কেবল আমার আত্মশক্তি, আমার আত্মবিশ্বাস, আমার সাদা ছড়ি। আর কিচ্ছু নয়।


চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে ডাকে বড়কর্তা। নাম কী আপনার। ততদিনে দৃষ্টিহীন আমি জেনে গেছি দরজা বন্ধ করে দেয়ার অসৎ উদ্দেশ্য। বড়কর্তা আমার কাছে আসেন। আমি ততদিনে চিনে গেছি ঘাড়ের উপর ফেলা গরম নিশ্বাসের মানে। বড়কর্তা হাত রাখে কাঁধে, আমি না দেখেও দেখতে পাই তার দৃষ্টি কী কামুক লোভে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার নারীচিহ্নের অলিগলিতে। বারবার জীবনের ধাক্কা আমাকে দৃঢ় হতে শিখিয়েছে। আমি চিৎকার করি, স্যার দরজাটা খুলে দিন। দরজাটা খুলে দিন স্যার নইলে আমি চিৎকার করব!

আমি চিৎকার করব, চিৎকার করব!!

দরজাটা খুলে যায়, আমি ছিটকে বেরিয়ে আসি… বেরিয়ে আসি প্রতারণা থেকে, প্রতিনিয়ত বিপরীত অভিজ্ঞতা থেকে। আমি দাঁড়াই আমার মুখোমুখি। আমার টিকালো নাকে লেগে আছে যে শ্রান্তির ঘাম, একসময় দেখেছি মুক্তোর মতো চমকাতো, আজ হাত দিয়ে স্পর্শ করি, সেই ঘাম বদলায় নি, শুধু আমি দেখি না তার ক্লান্ত রং। এই না দেখার বেদনায় আমি কী বেরিয়ে আসতে চাই স্বপ্ন দেখা থেকে, প্রত্যাশা থেকে, সংগ্রাম থেকে বেরিয়ে আসতে চাই লড়াই থেকে? না, না।। আবার উঠে দাঁড়াই নিজেকে তৈরি করতে থাকি একটা দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য। যে যুদ্ধে পরাজয় নামে কোনো পক্ষ থাকে না।

ব্রেইলে লিখিত পরীক্ষা ভালোই হয়েছিল। না খুব আশা ছিল না। সব পরীক্ষাই কমবেশি এমন ভালো হয়। ভাইভায় যারা ছিলেন, আমি তাদের ভ্রুর ভাঁজ দেখি না,দেখি না তাদের ঠোঁটের কোণে কী লেগে আছে অবজ্ঞা নাকি সত্যি শুভাশিস। তারা বলেন, দারুন তো আপনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। আপনি প্রতিযোগীদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো করেছেন। আপনি ইতিহাস হয়ে যাবেন। কথাগুলো ঘূর্ণির মতো আমাকে ঘিরে ঘুরতে থাকে… ঘুরতে থাকে।

তারপর, তারপর… একদিন সত্যি আমাকে অবাক করে দিয়ে, আমার আত্মবিশ্বাস আর স্বপ্ন সত্যি করে দিয়ে আমার বড় আপা হবার নিয়োগপত্র আসে। সরকারি কলেজে নিয়োগ পেয়েছি আমি। পরি আমাকে পড়ে শোনায় আর সারা ঘরময় ঘুরে ঘূর্ণির মতো আমার দু’হাত ধরে। আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে…। আমার আম্মাকে মনে পড়ে। আম্মা আমি বড় আপা হয়েছি… আমি বড় আপা হয়েছি আম্মা। পরদিন পত্রিকাওয়ালারা ভিড় করে বাড়িতে।

আপনি অন্ধ হয়েও কী করে এই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এত ভালো ফলাফল করলেন?

আপনার এই এগিয়ে চলার পেছনে অনুপ্রেরণা কার?

আপনাকে কী কী প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে?

আপনি কি জানেন কত বড় আদর্শ আপনি স্থাপন করলেন!

আমি কী উত্তর দিয়েছি কী দেই নি মনে করতে পারি না।পরদিন সব পত্রিকায় নাকি আমার বড় বড় ছবি। পরি আমাকে জড়িয়ে ধরে চোখ মুছে… রিনি, রিনিরে তুই বলেই পারলি। আমি হলে পারতাম না। মোটেই পারতাম না।

আমি বলি, পারতি অবশ্যই পারতি। যখন জেনে নিতি তুই নিজেই নিজের শক্তি তখন অবশ্যই পারতি।

ঠিক তখন, কেমন করুণ কান্নার সুরে বেজে উঠে মোবাইলটা। পরি হাতে নিয়ে চেঁচায়, রিনি রিয়াদের ফোন, রিয়াদের ফোন রিনি। পাক্কা দু’বছর পর রিয়াদ ফোন দিল আমাকে। আনন্দের এই মুহূর্ত আমাকে কেমন অলক্ষ্যে এক শক্তি দেয় অপরিমেয়। আমি ফোনটা উপেক্ষা করি। আমি জেনে গেছি কেবল আমিই আমার সাদা ছড়ি। আমিই কেবল আমার আত্মশক্তি, আমার আত্মবিশ্বাস, আমার সাদা ছড়ি। আর কিচ্ছু নয়।

আমি ফিরেও তাকাই না ফোনটার দিকে। দুসঃময়ে যে ছেড়ে যায় সুসময়ে তাকে ক্ষমা করায় মহত্ত্ব আছে বটে, আত্মসম্মান নেই। আর আমার জীবনে নেমে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিবন্ধকতার জন্য এই আত্মসম্মানকেই বারবার আক্রমণ করেছ তোমরা।


ঈদসংখ্যা ২০১৯
Ruma Modak

রুমা মোদক

জন্ম ৭ মে ১৯৭০, হবিগঞ্জ। এমএ (বাংলা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বি.এড.।

প্রকাশিত বই—

নির্বিশঙ্ক অভিলাষ [বিশাকা, ২০০০]
ব্যবচ্ছেদের গল্পগুলি [ঐতিহ্য, ২০১৫]
প্রসঙ্গটি বিব্রতকর [অনুপ্রাণন, ২০১৬]
গোল [জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]
মুক্তিযুদ্ধের তিনটি নাটক [চৈতন্য, ২০১৮]
অন্তর্গত [দেশ, ২০১৯]

ই-মেইল : kabbyapaddya@gmail.com
Ruma Modak

Latest posts by রুমা মোদক (see all)