হোম নাটক আমাদের সংস্কৃতি আমাদের নাটক

আমাদের সংস্কৃতি আমাদের নাটক

আমাদের সংস্কৃতি আমাদের নাটক
505
0

সংস্কৃতি এমনিতেই বিদঘুটে এক প্রপঞ্চ; তার উপর এর আলোচনায় ভূগোল ও নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যকে খোঁজতে হয়। তারপরও রূপ-রূপান্তরের নানা প্রসঙ্গ তো আসেই যদি তা আবার উপনিবেশ শাসিত জনপদের সংস্কৃতি হয়। ফলে সংস্কৃতির মৌল শনাক্তকরণ যেমন কঠিন হয়ে পড়ে তেমনি বাইরের প্রলেপটা বের করাও কঠিন হয়। প্রলেপ এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রাখে যে, কাণ্ড-শিকড়কেই খুঁজে পাওয়া কঠিন। শিকড় আর ডাল—কোনটা প্রধান? তা নিয়েই তর্কাতর্কি তখন প্রধান হয়ে ওঠে। সাধারণত সংস্কৃতি বলতে কোনো জনপদের মানুষের আচার-আচরণ, বোধ-বিশ্বাস, প্রথা-রীতি, সংস্কার-নীতি ও তাদের সুকুমারী বৃত্তির বিকাশী ধারাকে নির্দেশ করে। এ প্রবন্ধে আমাদের সংস্কৃতি বলতে বুঝব হাজার বছরের বাঙালির সংস্কৃতিকে। আমরা এ আলোচনায় স্বল্প পরিসরে আমাদের সংস্কৃতি কেমন, আমাদের সংস্কৃতির নাটক কেমন—এ নিয়েই ব্যাপ্ত থাকব। আমাদের বহমান জীবন সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যসমূহ; এ বাঙলায় হাজার বছরের সংস্কৃতির পরিক্রমণে আমাদের নাট্যসংস্কৃতির ধারা এবং আজকের নাট্যচর্চায় আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির স্বরূপ-প্রতিরূপান্তরগুলো অনুসন্ধান-ই এ প্রবন্ধের অভীষ্ট।


সংস্কৃতি প্রথাবদ্ধ কিছু ধারণা সৃষ্টি বা ভ্রান্ত চেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। 


সাধারণ অর্থে সংস্কৃতি বলতে মানুষের সুকুমার বৃত্তিমূলক আচার-আচরণকে নির্দেশ করলেও সংস্কৃতি অত্যন্ত সুগভীর ব্যাখ্যান। উপনিবেশ শাসনামলে ১৯২২ সালে ইংরেজি ‘কালচার’ শব্দের প্রতিশব্দ হিশেবে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি গৃহীত হয়। কেউ কেউ আবার কৃষ্টি হিশেবে ব্যাখ্যা করেছেন। সাধারণত কোনো ভৌগোলিক পরিমণ্ডলের মানুষের জীবন চিন্তা, শিক্ষা-বিনোদন, বোধ-বিশ্বাস ইত্যাদি নানা কিছু যেসব আচরিত রূপ-রীতির মধ্য দিয়ে তাদের নিজস্ব জীবন অভিব্যক্তির পরিচয় পাওয়া যায় তাই তাদের সংস্কৃতি। আর সংস্কৃতির মূলে থাকে ব্যক্তিসত্তা কিংবা জনসত্তার প্রাণময়, গতিময় বিকাশ-অভীপ্সা। ফলে কোনো স্থানের মানুষের আচার-ব্যবহার, জীবন-জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি-নীতি, বোধ-বিশ্বাস, সংগীত-নৃত্য-সাহিত্য-নাট্য, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদির রূপই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত। সংস্কৃতি ব্যাখ্যানে মানুষের বোধ-বিশ্বাস, সাহিত্য ও সংগীত, নৃত্য, গণমাধ্যম, রন্ধন, পোশাক, সামাজিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রভৃতি নানা কিছু আলোচনার মধ্যে পড়ে। সাধারণত সংস্কৃতিকে তিনটি বিন্যাসে আলোচনা করতে দেখা যায়—দৃশ্যমান সংস্কৃতি, অনুষ্ঠানমূলক সংস্কৃতি ও অতীন্দ্রিয় সংস্কৃতি। সংস্কৃতি আবার ধর্মকেন্দ্রিকও বিভাজিত হতে পারে। সংস্কৃতি প্রপঞ্চটির নানা সমালোচনাও আছে। অনেকে মনে করেন, সংস্কৃতি প্রথাবদ্ধ কিছু ধারণা সৃষ্টি বা ভ্রান্ত চেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। যাতে কিছু মহল এর সুবিধা ভোগ করে।

ভূগোল আর নৃবৈশিষ্ট্য ছাড়া স্থানিক জনগোষ্ঠীর আচরণ ও বোধ-বিশ্বাস অনুুধাবন প্রায় অসম্ভব। নীহাররঞ্জন রায় তার বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদিপর্ব গ্রন্থে বাঙলার জীবন, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে—‘নদ-নদী পাহাড়প্রান্তর বনজনপদ আশ্রয় করিয়া ঐতিহাসিক কালের পূর্বেই যে সমস্ত বিভিন্ন কোম একসঙ্গে দানা বাঁধিয়া উঠিতেছিল তাহার বন্ধনসূত্র ছিল পূর্বভারতের ভাগীরথী-করতোয়া লৌহিত্য-বিধৌত বিন্ধ্য-বাহুবিধৃত ভূভাগ। এই সুবিস্তীর্ণ ভূভাগের জল ও বায়ু এই দেশের অধিবাসীদিগকে গড়িয়াছে; ইহার ভূমির উর্বরতা কৃষিকে ধনোৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপায় করিয়া রচনা করিয়াছে; ইহার অসংখ্য বৎস্যবহুল নদনদী, তাহাদের শাখা ও উপনদীগুলি অন্তর্বাণিজ্যের সাহায্য করিয়া ধনোৎপাদনের আর একটি উপায় সহজ ও সুগম করিয়াছে। …বাঙলার এই নদ-নদীগুলি, এই বন ও প্রান্তর, ইহার জলবায়ুর উষ্ণ জলীয়তা, ইহার ঋতু-পর্যায়, ইহার বিধৌত নিম্নভূমিগুলি, বনময় সমুদ্রোপকূল সমস্তই এই দেশের সমাজবিন্যাসকে কমবেশি প্রভাবিত করিয়াছে। [অষ্টম সংস্করণ, পৃষ্ঠা-১৪]

সামাজিক বিন্যাসের ধারায় প্রাচীন বিভিন্ন গ্রন্থে ‘বং’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। আঞ্চলিক শব্দ ‘বং‘। তবে ‘বং’ কিংবা ‘বঙ্গ’ শব্দটির সঠিক ব্যুৎপত্তি জানা যায় না। অনেকে মনে করেন দ্রাবিড় ভাষা থেকে ‘বং’ শব্দটি উদ্ভূত। ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে মগধের সাথে বঙ্গ নামক জনগোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এমনকি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে ‘বঙ্গ’ ভূমিতে পণ্য উৎপাদনের তথ্য পাওয়া যায়। কালিদাসের রঘুবংশম-এ গঙ্গার প্রধান স্রোতধারা ভাগীরথী ও পদ্মার তীরবর্তী জনপদ বা ভূখণ্ডকে বঙ্গ বা বঙ্গীয় হিশেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন লেখকগণ এ অঞ্চলকেই গঙ্গারিডাই হিশেবে চিহ্নিত করেছেন। বঙ্গের সঙ্গে ‘আইল’ কিংবা ‘আল’ যুক্ত হয়ে ‘বঙ্গাল’ শব্দটি গঠিত। জানা যায়, বঙ্গ ভূভাগটি দক্ষিণে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রাচীনকালে গৌড়, বরেন্দ্রী, রাঢ়, সমতট, বঙ্গ প্রভৃতি নিজস্ব জনপদের নামে অখণ্ড বঙ্গদেশ পরিচিত ছিল। চৌদ্দ শতকের প্রথম ভাগে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ প্রথম বিচ্ছিন্ন বা বিভক্ত জনপদগুলোকে একত্রিত করে ‘বাঙ্গালা’ নামটি প্রচলন করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের একত্রীকরণ জনপদগুলো হচ্ছে : গৌড়, বঙ্গ, রাঢ, পুণ্ড্র, হরিকেল, সমতট ইত্যাদি। একত্রিত এ অঞ্চলগুলোকে লিখিত রূপে ‘গৌড়’ হিশেবেও উল্লেখ পাওয়া যায়। এ ভৌগোলিক অংশটি চতুর্দশ শতাব্দীতে থেকেই ‘বাঙ্গালাহ’ নামে অত্যন্ত পরিচিত হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনে এ অঞ্চলের নামকরণ করা হয় ‘বেঙ্গল’। ভৌগোলিক রূপরেখা, রাজনীতির নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় আজকের বাংলাদেশ।

বৈদিক যুগে বঙ্গালরা বেদের ভাষা গ্রহণ করে নি বলে পক্ষি বলে তিরস্কার করছেন। পশ্চিমভারতের তথাকথিত আর্যগণ বাঙলার সভ্যতায় ঈর্ষাপরবশ হয়ে বঙ্গালিদের ধর্মশূন্য বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। অথচ বাঙলার সভ্যতা খ্রিস্টপূর্বাব্দ তিন থেকে পাঁচ হাজার বলে অনেকে উল্লেখ করে থাকেন। প্রাচীন বাঙলার জ্ঞানচর্চার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য পাওয়া পাওয়া। আজকের পৃথিবী আলোচিত শূন্যতত্ত্বের জন্ম হয়েছিল এই বাঙলায়। বাঙলার হস্তীবিদ্যা চিকিৎসা ছিল পৃথিবী বিখ্যাত। খ্রিস্টপূর্বাব্দ তিনশত শতকে মেগাস্থিনিসের ভারত বিবরণে এ অঞ্চলে দাস প্রথার প্রচলন ছিল না বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। অথচ যেসময় সভ্যতা সৃষ্টির অন্যতম অঙ্গী হিশেবে দাসপ্রথাকে সমস্ত পৃথিবী গুরুত্ব দিচ্ছিল। পেরিপ্লুস ও টলেমির বিবরণ এবং কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে জানা যায়—বাঙলার বস্ত্র, খনিজপণ্যসহ উৎপাদিত নানা দ্রব্যাদি সুদূর মিশর রোমসাম্রাজ্যসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যাপক ও সমৃদ্ধ বাণিজ্যের একচেটিয়া বাজার ছিল। পঞ্চম শতকে সমতট বা হরিকেলবাসী চন্দ্রগোমী ব্যাকরণ লিখেছিলেন। সুলতানী আমলে বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছিল পাঠ্য বিষয়। চীনা পর্যটক ই সিঙ-এর ভাষ্যমতে, এ অঞ্চলে শিশুর বয়স ছ বছর হলেই বর্ণ পরিচয় ও প্রথম পাঠ শুরু হতো। বঙ্গের শিল্পকলা—বাঙলার পটচিত্র, ঘটচিত্র, সরার চিত্র, শখের হাড়ি, পুতুল, নকশি কাঁথা, আল্পনা প্রভৃতি প্রাচীনকাল থেকেই জনপ্রিয় ছিল। মৃৎশিল্প, শোলা শিল্প, মাদুর শিল্প বাঙলার ঘরে ঘরে বিদ্যমান ছিল। সারা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল বাঙলার মসলিন। দশ গজ লম্বা একখণ্ড মসলিনের ওজন মাত্র তিন আউন্সের মতো ছিল এবং তা একটি বিয়ের আংটির মধ্য দিয়ে টেনে নেয়া যেত। মসলিন সুদূর পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশগুলোতে রপ্তানি হতো। আর এ ধরনের মসলিনের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় শবনম ও রাওয়ান।

প্রাচীন বাঙালি সংস্কৃতিতে খাদ্যোপাদানের প্রধান ছিল ভাত-মাছ। প্রাচীন সাহিত্যে এ জাতিকে মেছুয়া জাতি হিশেবেও উল্লেখ পাওয়া যায়। সপ্তদশ শতকে এসে দুধ-ভাতে বাঙালির চিত্র পাওয়া যায়। কৃষিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মাছের ঝোল, নলিতা শাক প্রভৃতি ছিল নিত্য দিনের খাবার। প্রাচীন কাল থেকেই দই, পায়েস, ক্ষীর ইত্যাদি দুগ্ধজাত পণ্য ছিল বাঙালির অত্যন্ত পছন্দের খাবার। চৌদ্দশত শতকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে বাঙালির দুধ-ক্ষীর খাদ্যোপাদান হিশেবে প্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন বাঙলায় হরিণের মাংস পাওয়া যেতে প্রচুর। চর্যাপদের নানা উপমায় হরিণের মাংসের প্রসঙ্গ এসেছে। মাছের মধ্যে শোল, ইলিশ ছিল বাঙালির প্রিয়। গুড়, খই, চিড়া, মুড়ি, নারিকেল, পান খাওয়াসহ নানা খাদ্যোপাদানের সন্ধান পাওয়া যায়। ফলের মধ্যে কলা, তাল, আম, কাঁঠাল, নারিকেল ইত্যাদির উল্লেখ পাওয়া পায়। বাঙলার প্রাচীন সময়ে আখের নানা ব্যবহারের চিত্র পাওয়া যায়। এমনকি জনপদের নামকরণও হয়ে উঠেছিল আখচাষকে কেন্দ্র করে।


উপনিবেশ জ্ঞানতত্ত্ব ‘ফোক’ তত্ত্বের আড়ালে দেশীয় শিল্পগুলোর বিকাশে এক ধরনের প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করে রাখে সর্বত্র।


প্রাচীন বাংলায় নৃত্য-গীত বা পরিবেশনা সংস্কৃতির অসংখ্য প্রমাণ মেলে। ঐসময়ে গান গাওয়া, নৃত্য করা এবং অভিনয়ের ভিত্তিতে জীবিকা নির্ভর করতেও দেখা যায়। নানা বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে কাঁসর, করতাল, ঢাক, বীণা, বাঁশি, মৃদঙ্গ, মৃৎভাণ্ড ইত্যাদি ব্যবহারের চিত্র পাওয়া যায়। নৃত্য এবং গীতের সাহায্যে নাট্যাভিনয়ের প্রচলনও প্রাচীন বাঙলায় ছিল। প্রাচীন বাঙলা ছিল অরণ্যভূমি আর নদীমাত্রিকতার আধিক্য। ফলে যাতায়াতের জন্য নৌকাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হতো। নৌকা ছাড়াও যাতায়াতের ক্ষেত্রে হস্তিযান, অশ্বযান; পালকি কিংবা শকট যাতায়াতের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে পালকির ব্যবহার ছিল অধিক। চৌদ্দশক শতকে মুসলিম শাসনে ইসলামী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে। প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত দ্রব্যের মধ্যে ফুলদানি, মাটির খেলনা, খাট, নানা আকৃতির কলস, বাটি, পান ও ভোজনপাত্র, মাটির জালা, লোটা, দোয়াত, দীপাধার, ঘড়া, জলচৌকি, পুস্তকাধার ইত্যাদি ছিল প্রধান। সংস্কৃতির এ ধারাবাহিকতা ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসনের পূর্বপর্যন্ত পূর্ণোদ্যমে বিদ্যমান ছিল। উপনিবেশ শাসনে বাঙলায় নিজস্ব সংস্কৃতির নানা রূপ-রূপান্তর ঘটতে থাকে; ঐতিহ্য হারাতে বসে।

সমুদ্র উপকূলবর্তী নদ-নদী বেষ্টিত ভূভাগ এ বাঙলা। ভারতের নানা অঞ্চল থেকে এ অঞ্চল স্বতন্ত্রবৈশিষ্ট্যমণ্ডিত প্রাচীনকাল থেকেই। ফলে এ অঞ্চলের মানসিক গঠনে এক ধরনের কোমনীয়তা বিদ্যমান। যার প্রভাব সাংস্কৃতিক নানা আচরণের মধ্য লক্ষণীয়। গীতপ্রবণতা এ অঞ্চলের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন ভরতমুণির নাট্যশাস্ত্রে এ অঞ্চলের নাট্যসংস্কৃতির প্রবণতায় নৃত্য-গীত নির্ভরতার প্রাবল্যই বিধৃত করে। প্রাচীন বাঙলার তম্বরু নাটক নামে প্রাপ্ত ধারাটিও ছিল নৃত্য-গীত নির্ভর। নদী তীরবর্তী ভূভাগের মনস্তত্ত্ব প্রতিভাত। বাঙলার প্রাচীন কালের সাহিত্য-সংস্কৃতি-নাট্য সমস্তটাই ছিল স্মৃতির্নিভর। সংস্কৃত সাহিত্যরীতি বাঙলায় খুব প্রভাব বিস্তার করতে পারে নি প্রাচীন কালে। এ অঞ্চলে গৌড়ীয় সাহিত্যরীতি নামে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ধারা হিশেবে চিহ্নিত হতো। চন্দ্রগোমী ‘লোকানন্দ’ প্রাচীন বাঙলার অত্যন্ত জনপ্রিয় নাটক। পালযুগের নাটকের অস্তিত্ব নানাভাবেই পাওয়া যায়। তারমধ্যে বাংলা ভাষার প্রাচীন সাহিত্য নির্দশন হিশেবে পরিচিত ‘চর্যাপদ’-এর সমকালীন বৃহত্তর বঙ্গ সংস্কৃতির নাট্য পরিবেশনার নানা উপাদান ও উপকরণ বিবৃত করে। প্রাচীন বাঙলার নাটকে পেশাদারি অভিনেতা-অভিনেত্রীও ছিল। গায়েন কর্তৃক দর্শকের সামনে আসরকেন্দ্রিক পরিবেশনাই মূলত নাটক। প্রাচীন বাঙলায় ‘শূন্যপুরাণ’ ‘সেক শুভোদয়া’ ‘হর্ষচরিত’ ‘নাথগীতিকা’ প্রভৃতি ছিল নাট্যমূলক পরিবেশনা। যা নৃত্য-গীত-অভিনয় সহযোগে উপস্থাপিত হতো। এগুলোতে গানের ধুয়া থাকত এবং আজকের পালাগানের মতো ছিল পরিবেশনা আঙ্গিক। ঢাক, ঢোল, নাকাড়া, শিঙ্গা নানা বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হতো।

বাঙলা সংস্কৃতির মধ্যযুগে উপস্থাপনের-পাঁচালী, কীর্তন, কথা, কথকতা, লীলা, হাস্তর প্রভৃতি নাট্য আঙ্গিকগুলো ছিল নানাভাবে গুরুত্ববহ। পাঁচজন গায়েন-দোহার মিলে কাহিনি পরিবেশিত হতো বলে অনেকে পাঁচালী হিশেবে উল্লেখ করত। পাঁচালী গঠনগত কয়েকটি পরিভাষা রয়েছে—কথা, বোলাম, দিশা, নাচাড়ি। মধ্যযুগে পাঁচালী আঙ্গিকটি এত জনপ্রিয় ছিল যে নাট্য উপস্থাপনার সিংহভাগই এ রীতিতে হতো। অষ্টাদশ শতকে এসে এর নানা মাত্রার বিস্তার ঘটে—ধুয়া, পয়ার, ত্রিপদী বা নাচাড়ি বা শিকলি। পালানাট্যও অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল সেসময়। নানা নাট্য আঙ্গিক, নানা বিষয়ে, নানা বৈচিত্র্যে মধ্যযুগের বাংলা নাট্যসংস্কৃতি প্রবহমান ছিল। নৃত্য-গীত ও অভিনয়সহ অদ্বৈত মাধুর্যে উপস্থাপিত হতো। সেলিম আল দীনের বাঙলা নাট্যকোষ গ্রন্থে বাঙালির প্রাচীন ও মধ্যযুগের নাট্যসংস্কৃতির প্রায় ছয় শ-এর অধিক অন্তর্ভুক্তি পাওয়া যায়। রামায়নী গান, ‘ইউসুফ জুলেখা’ ‘রসুল বিজয়’ শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের নানা ধারাগুলো পাঁচালী আঙ্গিকে পরিবেশিত হতো। এমনকি অন্তমধ্যযুগে এসেও জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ মানিকদত্তের ‘চণ্ডীমণ্ডল’ উপস্থাপনা পাঁচালী নাট্য আঙ্গিকেই উপস্থাপিত হতো। মধ্যযুগের শিল্প-সাহিত্যের আরেকটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে ছিল কীর্তন ও লীলা। এ লীলাকীর্তনে গীত, সংলাপ, বর্ণনা প্রভৃতি নাট্যগুণে উজ্জ্বল। কথা, তুক, ছুট, ঝুমুর ও আখর প্রভৃতি ছিল কীর্তনের গঠনভাগ। মধ্যযুগের নাট্য প্রধানত উপস্থাপিত হতো আসরকেন্দ্রিক চারদিকের দর্শকবেষ্টিত অস্থায়ী মঞ্চে। বর্ণনাত্মক আশ্রয়ে পরিবেশিত হতো আখ্যানভাগ। নৃত্য-গীত-অভিনয়সহ শিল্পের সমস্ত কিছুই অদ্বৈতমার্গতায় উপস্থাপিত হতো এক ঐকতানিক ব্যঞ্জনায়।

উপনিবেশিত শাসনের সময় ইউরোপীয় নাট্যরীতি এ বাঙলায় প্রবেশ করে। থিয়েটার নামে নতুন এক পরিভাষায় হাজার বছরের নাট্যসংস্কৃতিকে মেলানোর এক প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে স্থাপত্যনির্ভর, ইউরোপীয় তত্ত্বনির্ভর থিয়েটারচর্চার আদলে শহর পর্যায়ে শুরু হয় ব্যাপক চর্চা। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে ধুকে ধুকে টিকে থাকে হাজার বছরের বহমান বাঙলার নিজস্ব নাট্য সংস্কৃতি। এখনো গ্রাম পর্যায়ে পরিবেশিত নাট্যগুলো হলো : পালা; যা বাঙালির মধ্যযুগ ও তার শেষ পর্যায়েও অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। পালা সঙ্গে সংগীত নির্ভর আঙ্গিক হিশেবে পালাগান শব্দটির প্রচলন দেখা যায়। এগুলোর আখ্যানভাগ বর্ণনা ও অভিনয় নির্ভর। নৃত্য-গীত-অভিনয়ের অদ্বৈত বিন্যাসে উপস্থাপিত হয়। ‘গান’ স্বতন্ত্র সংগীত মনে হলেও সংগীত প্রাধান্যে পালাকেও কখনো কখনো ‘গান’ হিশেবে গ্রামে উল্লেখ পাওয়া যায়। নানা বৈচিত্র্যের গান রয়েছে যেমন : কুশান গান, গাজীর গান, কবিগান, জারিগান প্রভৃতি। এগুলো পরিবেশনায় বেহালা, সারিন্দা, দোতারা বা ডুগডুগি বাজায় এবং যন্ত্রীরা ঢোলক, একতারা, দোতারা, সারিন্দা, বেহালা, বাঁশি, জুড়ি বা ঘুঙুর, খঞ্জনি, হারমোনিয়াম, কাঁসা ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। গ্রাম বাংলায় ‘যাত্রা’ অত্যন্ত জনপ্রিয় নাট্য। ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মাশ্রিত, সমকালীন ও সাহিত্যনির্ভর নানা বিষয় আশ্রিত যাত্রা পরিবেশিত হতে দেখা যায়। তাছাড়াও আলকাপ, গাজন, গম্ভীরা, সঙ নানা নাট্য আঙ্গিকগুলো দেখা যায়। উপনিবেশ জ্ঞানতত্ত্ব ‘ফোক’ তত্ত্বের আড়ালে দেশীয় শিল্পগুলোর বিকাশে এক ধরনের প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি করে রাখে সর্বত্র।

গ্রাম বাংলার পাশাপাশি শহর পর্যায়ে থিয়েটার চর্চা বাংলাদেশে ব্যাপক। গ্রুপ থিয়েটার কেন্দ্রিক নাট্যচর্চা, পথনাট্যচর্চা, গ্রাম থিয়েটার চর্চা, রেপার্টরি নাট্যচর্চা, আঞ্চলিকভাবে নাট্যচর্চা, প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যচর্চা, উন্নয়ন নাট্যচর্চা, সৌখিন নাট্যচর্চা ইত্যাদি নানা ধারায় নাট্যচর্চা সমকালে বিদ্যমান। তবে হাজার বছরের বাঙালির ঐতিহ্যকে নির্ভর করে বেড়ে উঠা নাটকগুলোই গত আশির দশক থেকে অদ্যবদি অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পেয়ে যাচ্ছে।


আমাদের নাটক চর্চিত হবে আমাদেরই ঐতিহ্য আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ঘিরে।


হাজার বছরের বহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে নাট্যনির্মাণ সমকালের নাট্যচর্চায় গুরুত্ববহ। নানাধারার নাট্যচর্চার মধ্যে উপনিবেশের দ্বন্দ্বনির্ভর নাট্যতত্ত্বের বিপরীতে বাংলা বর্ণনাত্মকরীতির নাট্যপরিবেশনাগুলো অত্যন্ত দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। বিষয়, অভিনয়, মঞ্চবিন্যাস, উপস্থাপনারীতি নানা ক্ষেত্রেই ঐতিহ্যকে আশ্রয় করেছে নাট্যপ্রযোজনাগুলো। প্রাচীন রূপ-রীতিগুলো যেন নতুন ধারায়; নতুন বিন্যাসে দীপ্যমান হয়ে উঠছে নানা নাট্যে। বাঙলার মধ্যযুগের পাঁচালী ও কথকতার ধারায় ঢাকা থিয়েটারের ‘চাকা’ ‘বনপাংশুল’ কিংবা ‘ধাবমান’ গত দেড়যুগ ধরে নাট্যজগৎকে আলোড়িত করে বেড়াচ্ছে। এমন বৈশ্বিক প্রযুক্তির সময়ে এসেও এধারার নাট্য উপস্থাপনার জনপ্রিয়তা কোনোভাবেই কমে নি বরং উল্টো বৃদ্ধি পেয়েই যাচ্ছে। সম্প্রতি দলটির ‘পুত্র’ প্রযোজনাও আবহমান বাঙলার দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্প বৈশিষ্ট্যে প্রত্যুজ্জ্বল। পরিবেশনায় আবহমান রীতির নৃত্য-গীত-অভিনয়ের অদ্বৈত বিন্যাসে উপস্থাপিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বেহুলার ভাসান’ এ ধারার নাট্য উপস্থাপনার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিশেবে তুলে ধরা যেতে পারে। এ যেন মধ্যযুগের বাইশা কবির গান বা মনসামঙ্গলের নবনিরীক্ষা। সমকালীন বিশ্ব আলোয় নাট্য ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ। নৃত্য-গীত-বর্ণনা-উক্তি-প্রত্যুক্তির মধ্যদিয়ে চারদিকের দর্শকপরিবেষ্টিত মঞ্চে উপস্থাপিত। একইভাবে বটতলার প্রযোজনা ‘খনা’ হাজার বছরের নাট্যধারাকেই যেন আধুনিকতায় উদ্ভাসন করেছেন। আবহমান রীতির দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চ, নৃত্য-গীত-অভিনয় ও বিষয় যেন প্রত্যুজ্জ্বল করে তুলেছে হাজার বছরের অতীতকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক বিভাগ একের পর এক ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার আধুনিক উপস্থাপন উপহার দিয়ে যাচ্ছে। নাগরিক নাট্যাঙ্গন, মহাকাল নাট্যসম্প্রদায় প্রমুখ দলও বারবার ঐতিহ্যের ধারার নাট্য নিয়ে মঞ্চে উপস্থিত হচ্ছে। সম্প্রতি মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের ‘নীলাখ্যান’ প্রযোজনা জনপ্রিয়তার তুঙ্গে বিরাজ করছে। নানাভাবেই বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কিংবা ঐতিহ্যবাহী রীতির নানা নিরীক্ষা বিদ্যমান। ‘বাংলাদেশ’ ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে এগিয়ে গেলেও পশ্চিম বাংলার নাট্যচর্চা এখনও তা পারে নি। ঐতিহ্যবাহী ধারাকে আশ্রয় করে প্রায় শতাধিক নাটক নিয়মিত বাংলাদেশের মঞ্চে প্রদর্শিত হয়ে চলছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য : ‘কমলারানীর সাগরদিঘি’, ‘বিষাদসিন্ধু’ ‘আরজচরিতামৃত’ ‘নিত্যপুরাণ’ ‘নারীগণ’ ‘চিত্রাঙ্গদা’ ‘কীর্তনখোলা’, ‘সার্কাস সার্কাস’, ‘উত্তর খনা’ ‘সোনাই মাধব’, ‘মহাজনের নাও’ ‘রাঢাঙ’ ‘চম্পাবতী’, ‘ভেলুয়া’ ‘আমিনা সুন্দরী’ ‘গহর বাদশা ও বানেছা পরী’ ‘শিবানী সুন্দরী’, ‘আয়না বিবির পালা’, ‘ভানু সুন্দরীর পালা’ ‘মাতব্রিং’ ‘চন্দ্রাবতী কথা’, ‘গ্রন্থিকগণ কহে’ ‘রহু চণ্ডালের হাড়’ প্রভৃতি। এসব প্রযোজনায় বিষয়-উপস্থাপনরীতিসহ নানা বৈশিষ্ট্যেই ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বিকাশী রূপ পরিগ্রহ লাভ করেছে।

দীর্ঘ ইতিহাসের পথ-পরিক্রমায় বাংলাদেশ আজ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। যার রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত নাট্য সংস্কৃতি; রয়েছে গৌরবান্বিত ইতিহাস; জাতিসত্তার পরিচয়। উপনিবেশ শাসন এদেশের নিজস্ব আত্মপরিচয়কে সমূলে উৎপাটন করে চলে গেছে। আত্মমর্যাদাহীন বিদেশি অন্ধ অনুকরণে আমাদেরকে প্রবৃত্ত করেছে। এই অন্ধজালকে ছিঁড়ে ফেলে মুক্ত স্বাধীন স্বতন্ত্র পরিচয়ে উদ্ভাসিত হতে হবে। এর জন্যই প্রয়োজন ঐতিহ্যের ধারার সমকালীন মূল্যবোধের নাট্যচর্চা। আমাদের নাটক চর্চিত হবে আমাদেরই ঐতিহ্য আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ঘিরে। আমাদের শেকড় মেলবে পাখা বিশ্বের আকাশে। উপনিবেশের তাঁবেদারি নয়। বাংলাদেশ বিশ্বের মাঝে আত্মপরিচয়ের মর্যাদায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক—এ আমাদের সবার প্রত্যাশা।

আবু সাঈদ তুলু

জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৯; জামালপুর । তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্য-শিল্পের প্রতি অনুরাগী। দীর্ঘদিন ধরে নাটক, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্য বিষয়ক সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লিখে আসছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি কলেজে বাংলা বিষয়ে শিক্ষকতা করছেন।

প্রকাশিত বই :

লিপির উদ্ভব, ক্রমবিবর্তন ও বাংলা লিপির পরিণত পর্যায় [প্রবন্ধ; অন্তরীপ পাবলিকেশন, ২০০৭]
বিপ্রলব্ধ [উপন্যাস; শিখা প্রকাশনী, ২০০৮]
রূপান্তরবাদ [শিখা প্রকাশনী, ২০০৯]
অনন্তপথের যাত্রী [ভাষাচিত্র, ২০১৪]
জলের আয়না [ভাষাচিত্র, ২০১৫]
পাতার বাঁশি [লিটলবিট, ২০১৭]
সেলিম আল দীনের সাহিত্য ভাবনা [মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮]

ই-মেইল : tuluart@yahoo.com