হোম চিত্রকলা ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ : সূর্যমুখী ও একটি প্রশ্নচিহ্ন

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ : সূর্যমুখী ও একটি প্রশ্নচিহ্ন

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ : সূর্যমুখী ও একটি প্রশ্নচিহ্ন
4
0

আমার জীবনের সেই সময়টা ছিল অস্থির আর বিপন্ন। আয়নায় নিজের মুখ দেখতে ভয় পেতাম। সংবেদনশীল মনটি বারবার আছড়ে পড়ত কোনো এক নিভৃত আশ্রয়ের জন্য। হাতের কাছে কবিতা কী ছিল না! ছিল, তবে আমার তীব্র শূন্যতার সাথে একাত্ম হয়ে তা তৈরি করে দিত আরও দীর্ঘতম বিষাদ। এই গভীর শূন্যতার মধ্যে আমি মহাজাগতিক যোগসূত্র তৈরির এক একান্ত প্রচেষ্টায় ছিলাম। সময়ের কাছে নতজানু হয়ে আত্মস্থ করতে চাইতাম সময়ের বহুমাত্রিক পরিচয়। এমন এক সময়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম কুরোসাওয়ার ড্রিম ছবিটি। সেখানে ভ্যান গঘের আঁকা ছবি হলুদ গমখেত আর উড়ন্ত কাকদের পরিক্রমণ। তার গভীর হলুদ রংটি আমি বারবার দেখি। তার ভিতরে নিমজ্জিত হই। যেন পেয়ে যাই রূপ সাগরে ডুব দিয়ে অরূপ রতন। গভীর শূন্যতার এক ক্রম অতিক্রম করতে করতে সেই হলুদ রং আমার আত্মায় এক অন্যবিস্তারে উত্তীর্ণ হয়। সেই রং এক তরঙ্গহীন শান্তির বিস্তার তৈরি করে আমার মনের প্রেক্ষাপটে। যেন পুনর্জন্ম ঘটে যায় নিজের ভিতর। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের জীবনের ভাঁজে ভাঁজে কাজ করেছে পার্থিব ও অপার্থিব শক্তির টানাপোড়েন। যে সময়ে আমি তাকে আবিষ্কার করেছিলাম, সে-সময়ে হাতের কাছে ইন্টারনেট ছিল না। আমাকে নির্ভর করতে হতো রাইফেল স্কয়ার মার্কেটের বিখ্যাত ভিডিও ছবির দোকান মুভিপ্লাসের উপর। একদিন সেখান থেকেই আর্ভি স্টোনের লেখা ভ্যান গঘের  কাহিনি নিয়ে ‘লাস্ট ফর লাইফ’ ছবিটি আবিষ্কার করলাম। এক নীরব সময়ে আমি ছবিটি অনেক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ নিয়ে দেখলাম। আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করল ভ্যান গঘ। ছবিটির পরতে পরতে রহস্যময়তা ছড়িয়ে ছিল। আক্রান্ত শিল্পী তার জীবনের হঠাৎ জ্বলে ওঠা, তারপর নিভে যাওয়া, বারবার প্রবল আক্রমণের মুখোমুখি হয়েও নিজের মধ্যে গড়ে তুলছেন তীব্র প্রতিরোধ। সেখানে প্রতিরোধের একমাত্র মাধ্যম তার তুলি, রং আর ক্যানভাস।

তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল খুব সাদামাটাভাবে। একটি চিত্র-ব্যবসায় সংস্থায় শিক্ষানবিশ হিসেবে। সে-সময় খুব পরিপাটি হবার জন্য তার নিজের মধ্যে খেয়াল ছিল। কিনে ফেলেন এক ফ্যাশেনেবেল টুপি। তারপর প্রেমের এক অনিবার্য টান। বাড়িওয়ালির মেয়ের প্রেমে পড়লেন গভীরভাবে, আর প্রত্যাখ্যাত হবার তীব্র বিষাদ নিয়ে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল হৃদয়। গভীরভাবে বেজে ওঠা বেদনার সুরটিকে ভাষা দেবার জন্য তিনি হাতে নিলেন রং আর তুলি। জীবনের বাইশটি বছর পার না হতেই তিনি উপলব্ধি করলেন, ‘এ জগতে ভালো কিছু করার জন্য নিজের যাবতীয় স্বার্থপর দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করতে হবে… নিছক সুখে থাকার জন্যই মানুষ এ পৃথিবীতে আসে নি, সে এসেছে মনুষ্যত্বের যা কিছু মহান তা উপলব্ধি করতে, যেদিকে অধিকাংশ ব্যক্তিই ধাবমান—সেই স্থূল মাঝারিয়ানাকে অতিক্রম করে নিজে বিশিষ্ট হয়ে উঠতে।’


ধারাল ক্ষুর নিয়ে হঠাৎ আক্রমণরত ভ্যান গঘ, বন্ধু ও চিত্রশিল্পী গোগ্যাঁর দিকে।


২০১৬-তে আমি ইউরোপে ঘুরতে যাই। প্রথম থেকেই অদম্য ইচ্ছা ছিল আমস্টারডামে ভ্যান গঘ মিউজিয়াম দেখব। জার্মানির মুনসেনগ্ল্যাডবার্গ শহরে আমার ছোট মামা থাকেন। সে-বাড়িতে দু একদিন কাটানোর পর আমাকে তার নিজের গাড়িতে করে নিয়ে গেল আমার প্রিয় মিউজিয়ামের সামনে। জার্মানি থেকে অল্প কিছুক্ষণের পথ আমস্টারডাম। পথের দুধারে সবুজ আর সবুজ। নানা ধরনের সবুজের সমারোহের ভিতর দাঁড়িয়ে আছে হাওয়া কল, ভেড়ার পাল, গমখেত, ছোট ছোট গ্রাম, টালির ছাদের বাংলো। গাড়ি চলছে দারুণ স্পিডে। আমি মুগ্ধ। জার্মানি থেকে বের হবার সময় সেখানে রোদ ছিল। তখন গ্রীষ্ম চলছে। অথচ আমস্টারডামে এসে পেলাম একেবারে বিপরীত আবহাওয়া। ঝিরঝিরে বৃষ্টি, ঠান্ডা। শহরের চতুর্দিকে খাল, তাতে নানা রকমের বোট আর স্টিমার। মোড়ে মোড়ে ক্যাফে, মানুষ নাচছে, গান গাইছে, উল্লাসে মেতে আছে। ছুটির দিন ছিল, তার উপর গ্রীষ্মকালীন পর্যটকদের ভিড়। মিউজিয়ামের সামনে লম্বা লাইন। সামনেটা ছোট। দেখে বোঝার উপায় নেই ভিতরের বিশালতা। টিকিট কাটলাম। ঢুকে পড়লাম মিউজিয়ামের অন্দরমহলে। নিচ থেকেই সব কটি তলা দেখা যায়। অনেক ভিড়ের মধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম।

১৮৫৩ থেকে ১৮৯০। মাত্র সাঁইত্রিশ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন ভিনসেন্টের। তার মধ্যে মাত্র দশ বছর শিল্পীজীবন। এক দরিদ্র, গর্বিত, জীবনে অসফল শিল্পী। শিল্পী হবেন এরকম কোনো ভাবনাও ছিল না। প্রেমের ব্যর্থতা, জীবনের ব্যর্থতা আর ক্রমাগত নিঃসঙ্গতর জীবন যাত্রায় তিনি ছবি এঁকে গেলেন। ভাই তেওর আন্তরিক ভালোবাসা আর অর্থ সাহায্যই ছিল একমাত্র ভরসা। শান্ত নিঃসঙ্গ বালক ভিনসেন্ট ছোট বেলায় গ্রামের মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন। প্যারিসের স্কুলেই লেখাপড়ার শুরু। ছাত্র হিসেবে মেধাবী ছিলেন না। বোর্ডিং  স্কুলে থেকে ফরাসি, ইংরেজি ও জার্মান ভাষার শিক্ষা। ছবি আঁকাও ওই বয়স থেকেই। বাবার আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়াতে লেখাপড়ার সমাপ্তি ঘটে আর ওই সময়ে তিনি কাজ করতে থাকেন গুপিল অ্যান্ড কোম্পানির ব্রুসেলস গ্যালারিতে। উৎসাহী সময়নিষ্ঠ দক্ষ কর্মচারী ভিনসেন্ট। এই ভিনসেন্ট নামটিই তার পছন্দ ছিল। কারণ ভ্যান গঘ শব্দটির সঠিক উচ্চারণ নিয়ে তিনি সংশয়ে ছিলেন। সেই সময় তিনি জীবনযযাত্রায় খুবই নিয়মনিষ্ঠ, সরল ও খুব বই পড়তে ভালোবাসেন। মিউজিয়ামে ঘুরে বেড়াতেও ভালোবাসেন প্রবলভাবে। ভাই তেও তার খুব প্রিয়জন। চিঠিতে তাকে জানান জীবন সর্ম্পকে তার নিজস্ব অনুভবগুলো। কোম্পানি থেকে কাজ দিয়ে তাকে লন্ডন গ্যালারিতে পাঠানো হলো। লন্ডনে এসে ইংরেজি চিত্রকলার জগতের পাশাপাশি তিনি ইংরেজি সাহিত্য পড়েন। কীটসকে ও চার্লস ডিকেন্সকে পড়েন গভীরভাবে। পার্কে বেড়ান। টেমস নদীতে নৌকা চালান আর কেবলি ছবি দেখেন। নিজে কিন্তু ছবি আঁকার কথা ভাবছেন না। কিন্তু ভাই তেওকে চিঠিতে লিখলেন, ‘যত পার পায়ে হেঁটে বেড়াও, আর প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা বজায় রাখার চেষ্টা কর, কারণ শিল্পকলাকে আরও বেশি বেশি করে বুঝতে শেখার এটাই যথার্থ পথ।’ তখন ভিনসেন্টের বয়স বিশ। নিজেকে অনুভব করছেন একজন পুরুষ হয়ে ওঠার রোমাঞ্চের মধ্যে দিয়ে। প্রেমে পড়লেন ভিনসেন্ট। দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে লন্ডনে আগত এক বিধবা মহিলার মেয়ে উরুসুলার । বিধবা মহিলাটি লন্ডনে ছোট একটি স্কুল চালান। কিন্তু উরুসুলা ভিনসেন্টকে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দেয় সে অন্য একজনের বাগদত্তা। সাথে সাথেই বদলে যায় ভিনসেন্ট। হতাশায় আক্রান্ত, উদ্ভ্রান্ত। সেই সময় কোনো একটি সাহিত্যের বইয়ের উদ্ধৃতি লিখে ভাইকে পাঠান, ‘স্বামী ও স্ত্রী যে এক হতে পারে, অর্থাৎ দুটি অর্ধ খণ্ড নয়, একটি অখণ্ড সামগ্রী হতে পারে সেকথা আমি বিশ্বাস করি।’ নিজস্ব অনুভব আর ভালোবাসা বিষয়ে ভ্যান গঘ যে ধারণা পোষণ করতেন তা হলো, ‘অনুভূতি একটি মস্ত ব্যাপার। একে বাদ দিয়ে কারো পক্ষে কোনো কিছু করাই অসম্ভব।’ আর এক জায়গায় ভাই তেওকে লিখেছেন, ‘তুই কি জানিস এই বন্দিত্ব থেকে কিসে আমাদের মুক্তি দেয়? প্রতিটি গভীর আন্তরিক ভালোবাসা। বন্ধু হয়ে, ভাই হয়ে, ভালোবাসা যা এক সর্বোচ্চ ক্ষমতায়, জাদু শক্তিতে বন্দিশালা খুলে দেয় । ভালোবাসা বিনা মানুষ বন্দিশালায় থেকে যায়।’ আর এক জায়গায় লিখেছেন, ‘ভালোবাসা এত স্পষ্ট, এত শক্তিমান, এত সত্য যে, ভালো যে বাসে তার পক্ষে এই অনুভূতি ফিরিয়ে নেওয়া, তার নিজের জীবন নষ্ট করার মতোই অসম্ভব।’

কোম্পানির কাজে হল্যান্ড গেলেন, আবার ফিরেও এলেন লন্ডনে। কিন্তু বিষণ্নতা যেন কিছুতেই কাটে না। নিজের ভিতর থেকে এক বিশ্বাস পেলেন । বাপ দাদার মতো ভিনসেন্টও হবেন ধর্মযাজক। চার্চে গিয়ে ঈশ্বরতত্ত্ব ও বাগ্মিতা অভ্যাস করেন।  তবে এর জন্য আমস্টারডামের ফ্যাকাল্টি অব থিওলজির প্রবেশিকা পরীক্ষা দিতে হবে তাকে। ভারি সিলেবাস, পাঠ্য বিষয় প্রচুর। কিন্তু ভিনসেন্ট সুযোগ পেলেই ঘুরে ঘুরে রেমব্রান্টের ছবির কথা ভাবেন। আমস্টারডামের গলিতে গলিতে ঘুরে তিনি আরও ভাবেন গুস্তাব ব্রিয় ও দোবিনির ছবির কথা। লেখাপড়ার প্রবল চেষ্টা করেন, কিন্তু মাথায় ঢুকে না বীজগণিত আর জ্যামিতি। গ্রিস, এশিয়া মাইনর ও ইতালির ইতিহাস, ভূগোল পড়তে পড়তে সময় করতে পারেন না, ঈশ্বরতত্ত্ব ও বাগ্মিতা অভ্যাসের। শেষপর্যন্ত তিনি পরীক্ষায় অকৃতকার্যই হলেন, কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারলেন না। কিন্তু ভিতরে রইল ঈশ্বরতত্ত্বের ভাবনা। একদিন রেমব্রান্টের ছবি, ‘দ্য হাউস অব দ্য কার্পেন্টার’ দেখতে দেখতে ভাবলেন মহৎ শিল্পের সাথে ঈশ্বর ভাবনার পার্থক্য কোথায়? যেন এই সত্যটি আবিষ্কার করতেই, নিজের এক ব্যর্থতাময় জীবন নিয়ে বের হয়ে পড়লেন ভিনসেন্ট। ফ্রান্সের সীমান্তে এক খনি শ্রমিকদের এলাকায় থাকতে শুরু করলেন। সেখানে তার কাজ, অসুস্থ আঁতুড়দের সেবা করা আর কুলি মজুরদের কাছে ঈশ্বরের নাম প্রচার। ঝুপড়ির মধ্যে থাকেন, আর বিচালি পেতে ঘুমান। কখনও কখনও খনিতে কাজ করতে করতে ভাবেন, ‘সাধারণত একধরনের ধোঁয়াটে ভাব চারদিকে ছেয়ে আছে, হয়তো মেঘের ছায়ায় এক উদ্ভট আঁকিবুঁকি কাটা ভাব যা দেখে রেমব্রান্ট বা মিশেল বা রুইজডায়েলের ছবির কথা মনে পড়ে যায়।’ ভিনসেন্টের বাবা ও ভাই এসে এই অবস্থা দেখে খুব হতাশ ও চিন্তিত হলেন। ভাই তেও অনেক বোঝালেন। কিন্তু সবটাতেই ভ্যান গঘের মাথা গরম স্বভাব। নিজের গোঁ ধরে বসে রইলেন। বললেন, ‘এক জার্মান চাষির কাছে একবার একটা পাঠ পেয়েছি, গ্রিক ভাষার কোনো পাঠের থেকে তার মূল্য আমার কাছে অনেক বেশি।’ শেষে ভাইকে বোঝাতে না পেরে তেও কিছু টাকা, ছবি আঁকার সরঞ্জাম, আর কিছু চিত্রকলার বই পাঠালেন। একদিন তেও-কে লিখলেন : ‘একটা ড্রয়িং স্কেচ করেছি, খনিমজুরদের, মেয়ে পুরুষ সকালে বরফ পড়ার মধ্যেই চলেছে খনির দিকে কাঁটা ঝোপের বেড়ার পাশের পথ বেয়ে: গোধূলির আবছায়াতে যেন ছায়ার মতো যায়। পিছনে আকাশের পটভূমিতে বড়ো বড়ো খনিবাড়িগুলো অস্পষ্টভাবে দাঁড়িয়ে।’ সম্ভবত ছবি আঁকার মধ্যে দিয়ে সত্যের সন্ধান এখানেই।

মিউজিয়ামে নানা দিক থেকে ছুটে আসা মানুষের ভিড়। তার মধ্যেই শিল্পীর সৃষ্টির গভীর, বহুমুখী ও বিচিত্র বিচ্ছুরণশীল রঙের পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াই। ছবিগুলোর ঔজ্জ্বলতা দেখে আমি বিস্মিত হই। একশত বছরেরও বেশি সময় আগের এই সব ছবি। কতটা যত্নে থাকলে মনে হতে পারে যে ছবির ক্যানভাসের রংগুলি যেন কয়েকদিন আগে আঁকা হয়েছে! ছবি তোলা নিষেধ। তাই যতটা পারি চোখ দিয়ে দেখে নেই। চোখে লাগে টাটকা সতেজ রঙের হাওয়া। ছবি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় লাস্ট ফর লাইফের সেই দৃশ্য। ধারাল ক্ষুর নিয়ে হঠাৎ আক্রমণরত ভ্যান গঘ, বন্ধু ও চিত্রশিল্পী গোগ্যাঁর দিকে। গোগ্যাঁ কোনোরকমে পালিয়ে গেলে ভ্যান গঘ এসে ক্ষুরের সাহায্যে কান কেটে ফেলেন। সেই ছবিটি দেখি—কানে মাথায় ব্যান্ডেজ জড়ানো, চোখেমুখে আতঙ্ক, তবুও তার দৃষ্টি স্থির, কোনো এক আত্মমগ্নতায় আচ্ছন্ন। ছবি দেখতে দেখতে মনে পড়ে সেই কথোপকথন—

গোগ্যাঁ : আমার মনে হয় তোমার কাজের মাঝে তোমার আবেগের বিষয় তুমি দ্রুত এঁকে যাও।

ভিনসেন্ট : তুমি দ্রুতই দেখছ বিষয়টা। আমি মানুষের দ্রুত ভেঙে পড়া, পাগল হয়ে যাওয়া, অপরাধ করার অবস্থাটাই দেখাতে চাই। তুমি যেও না। তুমি জানো না একাকিত্বের উপলব্ধি।

গোগ্যাঁ : আমি শুধু একাকিত্বই জানি। কিন্তু এ বিষয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি না।

ভিনসেন্ট : যদি চিত্রকর হিসেবে আমি কিছু হয়ে থাকি, তাহলে আমার অনুভূতি ও প্রকাশের মাঝখানের শক্ত দেয়ালটার বাধা অতিক্রম করতে পেরেছি। এটাই এখন আমার কাজ করার বড় জায়গা যেখানে আমার শেকড়… এই মানুষগুলো ও এই পৃথিবী যা আমি জানি।


শেষ পর্যন্ত নিজ বুকে গুলি করে আত্মহত্যা।


ছবি দেখতে দেখতে এইসব কথা মনে ভাসে। আপসহীন এক শিল্পীর নিরন্তর সংগ্রাম। জীবনব্যাপী দারিদ্র্য ও অবহেলার ইতিহাস। প্রেম, যৌনতাড়না, আবেগ ও ভালোবাসার প্রমাণ দিতেই নিজ হাতে কান কেটে ফেলা আর শেষ পর্যন্ত নিজ বুকে গুলি করে আত্মহত্যা। মিউজিয়ামের নিচের তলায় রাখা বনের দৃশ্যগুলো প্রথমেই চোখে পড়ে। মনে পড়ে পিটারসনের উপদেশ। প্রকৃতিকে শুধু অনুকরণ করবার জন্য শিল্পী উন্মাদের মতো যখনই তার পিছনে ছুটে, ততই সে ভুল করতে থাকে। প্রকৃতি দূরে সরে যায়। কিন্তু শিল্পী যখন তার সমস্ত উপলব্ধিকে সম্মিলিত করে রং আর রেখায় তার সমস্ত অনুভব মিশিয়ে আঁকে, প্রকৃতি তখনই হার মানে, কাছে এসে ধরা দেয়। দেখতে দেখতে মনে হয় ওই বড়ো বড়ো লম্বা গাছগুলির অরণ্যে ঢুকে পড়ি। ধীরে ধীরে ছবির গভীরের পথে যেতে যেতে দেখি শ্রমজীবী মানুষের ছবি। কেবলি প্রাণের প্রকাশ। সমুদ্রের ধারে সারিবদ্ধ নৌকা, ফুলদানিতে ফুল, প্রস্ফুটিত পিচ গাছ, অলস ঘোড়ার গাড়ি। গার্হস্থ্য জীবনের প্রকাশ কোনো কোনো ছবিতে, যেখানে প্রকট হয়ে উঠেছে দিন যাপনের লড়াই, সুখ-দুঃখ ও যন্ত্রণার প্রকাশ। অনন্ত যৌবনা সূর্যমুখী ফুলের সেই বিখ্যাত ছবির সামনে যেন দাঁড়িয়ে থাকি অনন্তকাল। সময় বয়ে যায়। হলুদ রংটা এতটাই আকর্ষণীয় যে মাতাল করে দেয়। যেন মুহূর্তেই পাঠিয়ে দেয় কোনো তীব্র সংকেত।

সেই সময়ে প্যারিসে ইমপ্রেশনিজমের শিল্প আন্দোলনের একটি উত্তপ্ত পরিবেশ ছিল। সে-সময়ের বিখ্যাত রেনোয়া, দেগা, ক্লদমনে, সেজান, গোগ্যাঁ এদের চিন্তায় ভ্যান গঘ প্রভাবিত হন নি। তিনি তার সহজাত রেখা ,সতেজতা আর উজ্জ্বল রং ব্যবহারের নিজস্ব দক্ষতায় নিজস্ব উদ্ভাবনী ভাষা নিয়ে ছবির বুননে ঢুকে পড়েছিলেন। তবে জাপানি চিত্রকলার প্রভাব ছিল তার ছবিতে।  যেমন দ্য ট্রি এবং দ্য অ্যাক্টর সেই ধরনের ছবি।

প্যারিসে থাকার সময়টা কেমন কেটেছিল ভ্যান গঘের? মঁমার্ত্র পাহাড়ের কোলে ভাই তেও রূ লাভালে (পরে এর নাম হয়েছে রূ ভিক্তর মাসে) একটি ছোট্ট বাসায় তাকে নিয়ে যত্নে রাখেন। ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রকরদের সাথে আলাপ করিয়ে দিতে চান ভ্যান গঘকে। ভিনসেন্টের কয়েকজনের কাজ ভালো লাগল। ওদের বাসার কাছেই প্লাস পিগালের উপর ‘লা নুভেল আতেন তে’ তাদের আড্ডা। সেখানে তিনি পরিচিত হলেন এমিল বার্নেয়ার, লুই আঁকেত্যাঁ, জন রাসেল এদের সাথে। তিনি তাদের স্টুডিওতে যোগ দিলেন। কিন্তু মাত্র চার মাস পরেই সেখানে যাওয়া ছেড়ে দিলেন। যে জিনিসের সন্ধান তিনি করছিলেন, তা তিনি পেলেন না। নিজেই ভাইয়ের আর্থিক সাহায্যে একটি স্টুডিও করলেন। সে-সময়ের স্টিল লাইফ আর ল্যান্ডস্কেপ আঁকা কিছু ছবি নিয়ে তিনি একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘রঙের কাজওয়ালা এক থোক ছবি করেছি, শুধু ফুল, লাল পপি, নীল কর্নফ্লাওয়ার আর ফর্গেট-মি-নট, সাদা আর গোলাপি—গোলাপ, হলুদ ক্রিসেন্থিমাম—নীলের সঙ্গে কমলা, সবুজের সঙ্গে লাল, বেগুনির সঙ্গে হলুদের বিরোধের সংঘাত ঘটাতে চেয়েছি… ধূসর রঙের হার্মনি নয়, গাঢ় রং ফোটাতে চেষ্টা করেছি… ডজনখানেক ল্যান্ডস্কেপও করেছি। খোলাখুলি সবুজ, খোলাখুলি নীল রঙের।’ প্যারিসে আসার পর দেড় বছর যেতে না যেতেই প্যারিস যেন অসহ্য হয়ে উঠল ভ্যান গঘের কাছে। সকলের সঙ্গে খটাখটি বাঁধে। ভাই তেও খোলাখুলি বলতেও পারেন না, তাকে প্যারিস ছেড়ে যেতে। একদিন ভিনসেন্ট নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্যারিস ছেড়ে চলে গেলেন আর্লেতে। বরফে ঢাকা শহর। পরদিনই তেওকে চিঠি লিখলেন, ‘বিশ্রাম করার মতো এমন কোনো জায়গা যদি না থাকে, যেখানে গেলে মানুষ তার মনের সজীবতা প্রশান্তি ও ভারসাম্য ফিরে পেতে পারে,  তাহলে প্যারিসে বসে কাজ করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।’ আর্লের প্রকৃতিতে তিনি শান্তির বারতা পেয়েছিলেন। তেও-কে লেখা চিঠিতে সে-প্রত্যয় আছে। ‘বরফে ঢাকা এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য, বরফের মতোই উজ্জ্বল, আকাশের পটভূমিতে সাদা পাহাড়ের চূড়াগুলো, ঠিক যেন জাপানিদের আঁকা শীতকালের ভূচিত্র।’

আর্লেতে আসার পরই তিনি বুঝে নিলেন এখানে তাকে থাকতে হবে। শহরটা একটু নোংরা হলেও প্যারিসের মতো প্রকৃতিবিরুদ্ধ নয়। ভাইয়ের টাকায় হলুদ রঙের রং করা সুন্দর একটি বাসা নিলেন। একটি টেবিল আর দুটো চেয়ারের ব্যবস্থার পর, স্যুপ আর কফির ব্যবস্থাও হলো। কিন্তু বিছানা নাই, বিছানা ছাড়াই ঘুমান। এই সময়টায় মানুষের মুখ আঁকার খুব ইচ্ছে হলো। শহরে ঘুরে খুব সুন্দর সুন্দর পোশাক পরা মিষ্টি মেয়েদের দেখেন। জিয়োত্তর ছবিতে আঁকা স্ত্রীলোকদের কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু মডেল হবার জন্য কেউ রাজি নয়। পরে রাস্তার একটি মেয়েকে রাজি করালেন। হঠাৎ একদিন ভাইয়ের চিঠিতে জানলেন গোগ্যাঁ খুব অসুস্থ। প্রচুর ধার কর্যের মধ্যে পড়ে ছবি আঁকাও বন্ধ। ভ্যান গঘ খুব উৎসাহিত বোধ করলেন গোগ্যাঁকে নিজের কাছে রাখার বিষয়ে। দুটো খাট কেনা হলো, খরচাপাতি গোগ্যাঁর ছবি বিক্রি হবার পর দেয়া হবে। নিজেই সাজালেন গোগ্যাঁর ঘরটি নানা রকম সুন্দর সূর্যমুখী ফুল আঁকা পোর্ট্রেট দিয়ে। অথচ নিজের ঘরটি যেন একটা খুপরির মতো দেখতে। কিন্তু ভিনসেন্টের যেন আনন্দের সীমা নেই। দুজনে একত্রে থাকেন, ছবি নিয়ে কথা বলেন দীর্ঘক্ষণ, জুভদের পতিতালয়ে একসঙ্গে যান স্কেচ করতে। কিন্তু মাসখানেকের মধ্যেই আলোচনা গিয়ে দাঁড়ায় তর্কাতর্কিতে। গোগ্যাঁ চলে যেতে চান। ভিনসেন্ট বিশ্বাস করতে পারেন না। গোগ্যাঁ ডিনারের পর একলা বেরিয়েছেন শহরটাকে ঘুরে দেখবেন। হঠাৎ পিছনে পায়ের শব্দ। দেখেন খোলা ক্ষুর হাতে ভিনসেন্ট তেড়ে আসছেন তার দিকে। তারপর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে, আবার ফিরে গেলেন নিজের হলুদ বাড়িতে। গোগ্যাঁ ভয় পেয়ে সেই রাতটা হোটেলেই কাটালেন। পরদিন হলুদ বাড়িতে ফিরে দেখেন বাড়ির সামনে লোকে লোকারণ্য। পুলিশ গিজগিজ করছে। ইন্সপেক্টর না বুঝেই বললেন, প্রচুর রক্তপাতের কারণে ভিনসেন্ট মারা গেছেন। গোগ্যাঁ জরুরি টেলিগ্রাম করলেন প্যারিসে, ভিনসেন্টের ভাইকে। ভাই এসে অতি সত্বর প্রথমে হাসপাতালে, পরে কিছুটা সুস্থ হবার পর অ্যাসাইলামে নিয়ে গেলেন।

সেখানে ডাক্তাররাই তার ছবি আঁকার স্টুডিওর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এঁকেছেনও কিছু ছবি। কিন্তু তখন মাঝেমাঝেই পাগলামি বাড়ে। আবার সুস্থ হন চিকিৎসায়। কিন্তু অ্যাসাইলামের বিধি নিষেধের চার দেয়ালে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। শেষে ভাইকে কোনোরকমে রাজি করিয়ে অ্যাসাইলাম ছাড়েন। ভাই ততদিনে বিয়ে করেছেন। ফুটফুটে একটি ছেলেও হয়েছে। দুজনে একসাথে দাঁড়িয়ে শিশু সন্তানটিকে দেখেন। দুজনের চোখেই তখন আনন্দের অশ্রু।


জীবদ্দশায় একটি মাত্র ছবি বিক্রি হয়েছিল।


প্যারিসের কাছাকাছি একটি ছোট্ট শহর ওভার। সেখানে ডাক্তার গাসের তত্ত্বাবধানে রাভুখ পরিবারের সাথে ভিনসেন্টের বসবাসের ব্যবস্থা স্থির হলো। খুবই সস্তায়। ওই সময়ে তিনি ডাক্তার গাসের মেয়ে মার্গরিটের পোর্ট্রেট এঁকেছেন, এঁকেছেন ‘বিখ্যাত গমখেত’ ও ‘উড়ন্ত কাকের ঝাঁক’ ইত্যাদি। ২৭ জুলাই ১৮৯০ সালে রাভুখ পরিবারের সদস্যরা ডিনারের টেবিলে ভিনসেন্টকে নির্দিষ্ট সময়ে আসতে না দেখে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। চিলেকোঠায় তার ঘরে গিয়ে দেখা গেল বিছানার উপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছেন ভিনসেন্ট, রক্তে ভেসে গেছে বিছানা। গুলিটা সরাসরি হৃৎপিণ্ডে গিয়ে ঢুকেছে। ডাক্তার চেষ্টা করলেন গুলিটা বের করতে। ভিনসেন্ট রাজি হলেন না। ২৯ জুলাই ভোরবেলায় মারা গেলেন।

ভিনসেন্টের ছবিগুলো দেখতে দেখতে কিছুটা জানতে পারলাম ‘আলুভোজীরা’ ছবিটি সম্বন্ধে। ছবিটি পাঁচবার রূপান্তরিত করেছেন তিনি। কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। যতদূর জানা যায়, স্মৃতি থেকেই এঁকেছিলেন এই ছবিটি। ছবিটির রং গাঢ় সবুজ। যেখানে ঘেরাটোপ দেয়া বাতির আলো পড়েছে, সেখানে রংটি হালকা। একটু সাদা। একটি টেবিল। তাকে ঘিরে বসে আছে পাঁচজন। চারজনের মুখ দেখা যায়। আরেকজন বসে আছে পিছন ফিরে। বাঁ পাশে চেয়ারে বসে কেটলি থেকে কফি ঢালছে এক রমণী। রমণীদের মাথায় টুপি। আলুসেদ্ধ ভর্তি প্লেট আলোয় উদ্ভাসিত। কফি ভরা বাটির ছায়া পড়েছে টেবিলে। ছবিটি যেন চলচ্চিত্রের ফ্রিজ শট। ছবির চরিত্রগুলো যেন এখনই কথা বলবে। মানুষগুলো খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের হাত-মুখ-চোখ যেন এক গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত। তা যেন দেখতে দেখতে আমাদেরকেও স্পর্শ করে। উঠে আসে মাটির গন্ধ। একেবারে মাটি ঘেঁষেই শিল্পের দরজা খুলেছিলেন তিনি।

ভিনসেন্ট তার অন্তর্জগতের অস্তিত্বের কিছু কথা শুধু ভাইকেই জানিয়েছিলেন চিঠিতে। চিঠিগুলিও সংরক্ষিত আছে মিউজিয়ামে। সেসব চিঠিতে গুরুত্ব দিয়েছেন সরলতা, সত্য আর প্রকৃতির প্রতি। নিজেকে নিয়ে তার আঁকা ছবিতে বিষাদ আর রং একত্রেই চোখে পড়ে। শিল্পীকে দেখতে পাই অনেকটাই ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মতোই। জীবদ্দশায় একটি মাত্র ছবি বিক্রি হয়েছিল। যথার্থ সৎভাবে বেঁচে থাকা আর সুখস্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের সমীকরণটিকে মেলাতে পারেন নি। এইসব দুঃসহ দুঃখকে বোঝার ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু এটি সত্যি, দুঃখী ভিনসেন্ট হৃদয়ের দিক থেকে অপার ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিলেন।

(4)