হোম চিত্রকলা গুহাচিত্র আদ্যোপান্ত

গুহাচিত্র আদ্যোপান্ত

গুহাচিত্র আদ্যোপান্ত
274
0

গুহাচিত্র প্রাগৈতিহাসিক যুগের শিল্পকর্ম। প্রাগৈতিহাসিক বলতে সেই সময়কে বোঝানো হয় যে সময়ের দিন-তারিখ সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। মানুষের ইতিহাস সংরক্ষণের আগের কাল হলো প্রাগৈতিহাসিক কাল। গুহাচিত্রগুলো বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তে ছড়িয়ে আছে। প্রায় ৪০০টি গুহাচিত্রের স্থান খুঁজে পাওয়া গেছে। স্পেন এবং ফ্রান্সেই রয়েছে বেশিরভাগ গুহাচিত্র। এছাড়াও বুলগেরিয়া, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মঙ্গোলিয়া, মিয়ানমার, রাশিয়া, রোমানিয়া, ইংল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নানা প্রান্তে গুহাচিত্র ছড়িয়ে রয়েছে। সাধারণত মানুষ ঘর বানাতে শেখার আগে গুহা বা গুহার আশেপাশেই বসবাস করত। সেই বরফযুগেই বা প্যালিওলিথিক যুগের সূচনাতে আনুমানিক আজ থেকে ৪০ হাজার-১৪ হাজার বছর আগের সময়কালে এগুলো আঁকা হয়েছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুহাগুলিতে ম্যামথ, ঘোড়া, বলগা হরিণ, গণ্ডার, ষাঁড় ইত্যাদি প্রাণীর ছবি এঁকেছে মানুষ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের ছবিও পাওয়া যায়। তবে প্রাণীর ছবি যত বিস্তৃত এবং নিখুঁত মানুষের ছবি তেমন নয়। হয়তোবা যথাযথ মানুষের ছবি আঁকায় কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল। বরফ যুগের অধিকাংশ চিত্র আঁকা হয়েছে লাল আর কালো রঙে। লাল মাটি, হলুদ মাটি, কয়লা, খনিজ লোহা ইত্যাদি উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে এ সব ছবি আঁকতে। কোথাও কোথাও পাথর বা গুহার অংশ খোদাই করে করে ছবি আঁকা হয়েছে। প্রচুর হাতের ছাপও পাওয়া গেছে কোনো কোনো এলাকার গুহাচিত্রে। এমনকি কোথাও কোথাও জননাঙ্গের ছবিও আঁকা হয়েছে।


ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিওর লুবাং জের্জি সালেহ গুহায় আঁকা একটি ষাঁড়ের ছবিকে মানুষের আঁকা সবচেয়ে পুরনো প্রাণীর ছবি মনে করা হয়।


কেন গুহার গায়ে ছবি আঁকা হয়েছিল তার সঠিক কারণ আজ জানা মুশকিল। কারো মতে, এর পেছনে জাদু বিশ্বাস ছিল, কারো মতে মানুষের গল্প বলার আকাঙ্ক্ষা ছিল, কারো মতে এগুলো নানা সাংকেতিক তথ্য সংরক্ষণ করেছে, কেউবা এগুলো প্রাগৈতিহাসিক মানুষের ধর্ম চর্চার নমুনা হিশাবেও দেখেছেন। এমনকি কোনো কোনো গবেষক এইসব গুহাচিত্রের মধ্যে মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রমণ্ডলীর মানচিত্রের আদলও লক্ষ করেছেন। নানা মুনির নানা মত আছে, তাদের মতের নানা যুক্তি-প্রতিযুক্তিও আছে, কিন্তু সুনিশ্চিতভাবে কোনো মতই প্রমাণিত নয়। তবে এটাও ঠিক যে, অধিকাংশ গুহাচিত্র এমন অবস্থানে এমন জায়গায় আঁকা হয়েছে, যে জায়গায় মানুষের হাত পৌঁছায় না এমনকি আলোও পৌঁছায় না। অন্ধকার এই গুহাগুলোতে স্রেফ আপন মনের খেয়ালে ছবি আঁকা হয় নি সেটা অনুমান করা যায়। আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, যে সব গুহায় ছবি আঁকা হয়েছে নানা পরীক্ষায় দেখা গেছে সেখানে মানুষ বাস করত না। খুব স্বল্প সংখ্যক মানুষ এই গুহা ব্যবহার করত। হয়তো এইসব গুহা পবিত্র এবং গোপনীয় কোনো স্থান হিশাবেই ব্যবহৃত হতো।

সবচেয়ে পুরনো গুহাচিত্রর নিদর্শন যেটি পাওয়া গেছে ধারণা করা হয় তা ৬৫ হাজার বছরের পুরনো। স্পেন ও পর্তুগালের উপদ্বীপ ইবেরিয়া’র গুহায় পাওয়া গেছে এইসব চিত্রকলা। এইসব ছবি এঁকেছেন নিয়ানডারথাল মানুষেরা। আমরা হলাম হোমোসেপিয়ান্স মানুষ। নিয়ানডারথাল মানুষরা আজ আর পৃথিবীতে নেই। আমাদের বিলুপ্ত পূর্ব পুরুষদের আঁকা ছবি রয়ে গেছে তবু। এই ছবিগুলো অবশ্য কোনো প্রাণী বা মানুষের ছবি নয়, জ্যামিতিক নানা রকম আকৃতি। বলা যায়, এগুলো বিমূর্ত চিত্রকলা। ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিওর লুবাং জের্জি সালেহ গুহায় আঁকা একটি ষাঁড়ের ছবিকে মানুষের আঁকা সবচেয়ে পুরনো প্রাণীর ছবি মনে করা হয়। এই ষাঁড়টিকে আঁকা হয়েছে আজ থেকে ৪০ হাজার [কারো কারো মতে ৫২ হাজার] বছর আগে।

প্রত্নতাত্ত্বিক শিল্পকলার নির্দশন গুহাচিত্রগুলো মানব সভ্যতার বড় আবিষ্কার। এইসব গুহাচিত্রের কারণে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর সঙ্গে যেমন পরিচয় হওয়া যায় তেমনি প্রাগৈতিহাসিক মানুষ ও তাদের জীবন ধারণ সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।

1
গুহাচিত্র চর্চা এবং আলতামিরার চিত্রাবলী। Altamira Cave Paintings, Unknown Artist. আলতামিরা গুহাচিত্র, অজ্ঞাতনামা শিল্পী। আকার : বিবিধ। প্রাপ্তিস্থান : স্পেন। ধরন : গুহা চিত্র।

স্পেনের আলতামিরা গুহার কোনো কোনো ছবিকে সাড়ে ৩৫ হাজার বছরের পুরনোও মনে করা হয়। দক্ষিণ স্পেনের এই গুহা  চিত্রকলার ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটাই প্রথম আবিষ্কৃত গুহা জাদুঘর যেখানে মানুষের আঁকা হাজার বছরের পুরনো ছবি লুকিয়ে ছিল। ঊনবিংশ শতকে এর আবিষ্কারে প্রত্নতাত্ত্বিক, বিজ্ঞানী, শিল্পকলা বিশেষজ্ঞ সবার মধ্যেই আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এই ছবিগুলো এত নিখুঁত আর নান্দনিক আর পরিণত যে অনেকেই এগুলোকে গুহাযুগের মানুষের আঁকা বলে বিশ্বাস করে নি। এমনকি এর আবিষ্কার মার্সেলিনো সাঞ্চ দ্য সতোলাকে জালিয়াত ভেবে ছিলেন। অনেকেরই বিশ্বাস হয় নি যে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের এই পর্যায়ের শৈল্পিক দক্ষতা এবং বৌদ্ধিক উচ্চতা ছিল। ১৯০২ সালে রেডিও এক্টিভ পরীক্ষাসহ একাধিক নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে যথার্থই এগুলো প্রাচীনকালের চিত্রকলার নিদর্শন। আলতামিরার গুহাচিত্রগুলো আঁকা হয়েছে কয়লা আর হলুদ মাটি ও গিরিমাটি দিয়ে। ঘোড়া, বাইসন আর হাতের ছাপ যুক্ত এইসব চিত্র পৃথিবীর অন্যসব গুহাচিত্রের চেয়ে বেশি টেকসই ও নান্দনিক।

2
শাশ্বত শিল্পী Sulawesi Cave Painting. Unknown Artist. সুলাবেসি গুহাচিত্র, অজ্ঞাত শিল্পী। আকার : বিবিধ। প্রাপ্তিস্থান : ইন্দোনেশিয়া। ধরন : গুহা চিত্র।

দক্ষিণ ইন্দোনেশিয়ার বান্টিমুরুঙ জেলার দক্ষিণ সুলাবেসি অঞ্চলের গুহাচিত্রগুলো পুরাতন প্রস্তর যুগের [Paleolithic]। অন্ততপক্ষে ৪০ হাজার বছরের পুরনো এই গুহাচিত্রের আবিষ্কার বিশ্ববাসীর কাছে এক বিরাট চমক ছিল। এর আগে অধিকাংশ গুহাচিত্রই আবিষ্কৃত হয়েছে ইউরোপে। বরফ যুগের এই গুহাচিত্রের আবিষ্কার গুহাচিত্রের ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছে। এর আগের আবিষ্কৃত গুহাচিত্রগুলোর কারণে ইউরোপকেই আদিম সৃষ্টিশীল মানুষের আবাসস্থল মনে করা হতো। অথচ এই আবিষ্কার প্রমাণ করেছে যে, একই সময়ে এশিয়াতেও সৃষ্টিশীল আদিম মানুষেরা বসবাস করেছে, রাজত্ব করেছে। চুনা পাথরের এই গুহাগুলোতে মানুষের হাতের ছাপের পাশাপাশি প্রাচীন জীবজন্তুর ছবিও আছে। ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর প্রাচীনতম আদলচিত্র [figurative art painting] হিশাবে সুলাবেসির গুহাচিত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। ম্যাক্সাইম আউবার্ট, এডাম ব্রাউম প্রমুখ প্রত্মতাত্ত্বিক-গবেষকগণ একাধিক চিত্র পর্যবেক্ষণ করে এই মতামত দিয়েছেন। এই গুহাচিত্রগুলো পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীনতম গুহাচিত্র। স্পেনের আলতামিরা পর্বতমালার এল কাসটিলো গুহার পর এই গুহাচিত্রগুলোই প্রাচীন।

3
অনুশীলন খাতা Chauvet Cave Paintings. Unknown Artist. সঁভে গুহাচিত্র, অজ্ঞাতনামা শিল্পী। আকার : বিবিধ। প্রাপ্তিস্থান : ফ্রান্স। ধরন : গুহা চিত্র।

১৯৯৪ সালেন সালের ১৮ ডিসেম্বর জ্যাঁ মারি সঁভে এবং তার দুই বন্ধু এলিট ব্রুনেল ও ক্রিস্টিয়ারন হিলারি ফ্রান্সের উত্তরাংশে আর্দেসে নদীর ধারে ঘুরছিলেন। পেশাদার গুহাপরিব্রাজক [speleology] এই তিন নদীর বাম তীর ঘেঁষে একটি গুহার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় একটা আলোর রেখা দেখেন। তারা এই আলোর রেখা ধরে এগুতে এগুতে খেয়াল করেন গুহার দেয়ালে লাল, কালো ছবিগুলো। ক্রমেই তারা শত ছবি আর খোদাই চিত্র আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে এই গুহার নামকরণ হয়ে যায় সঁভে গুহা। ধারণা করা যায়, এই গুহাচিত্রগুলো ৩০ থেকে ৩৩ হাজার বছরের পুরনো। এই তিন বন্ধু ত্রিশ হাজার পর মানুষের আঁকা প্রাচীনতম কিছু ছবি আবিষ্কার করে ফেললেন আর এই গুহাচিত্র আবিষ্কারের কারণে শিল্পকলার ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে হয়েছে। এই গুহাচিত্র আবিষ্কারের আগে লাসক্যু গুহাচিত্রকেই প্রাচীন মনে করা হতো। শুধু গুহাচিত্রই নয় সঁভে গুহায় খুঁজে পাওয়া গেছে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীর ফসিল, গুহার দেয়ালে তাদের আঁচড়ের ছাপ এবং বিবিধ পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন। এমনকি একটা গুহায় ভাল্লুকের কঙ্কালও পাওয়া গেছে। ২০১৬ সালের প্রায় ৮৮টি রেডিওকার্বন পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে সঁভে গুহার ছবিগুলো দুটো পর্যায়ে আঁকা। প্রথম পর্যায়ে ৩৩ হাজার থেকে ৩৭ হাজার আগে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩১ হাজার থেকে ২৮ হাজার বছর আগে এগুলো আঁকা হয়েছে। সংরক্ষণের প্রয়োজনেই এই গুহা আবিষ্কারের পরপরই সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কেবল সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা এ গুহায় যেতে পারেন।


লাসক্যু গুহাচিত্রের সাথে মহাকাশের নক্ষত্রমণ্ডলের মিল লক্ষ করেছেন সাঁতাল জ্যাঁন ভোকিভিয়াস নামের একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও প্রত্নবিদ।


বিশ্বখ্যাত জার্মান চলচ্চিত্রকার ভার্নার হার্জোগ ২০১০ সালে এই গুহা এবং এর চিত্রকলা নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। ‘কেইভ অব ফরগটেন ড্রিম’ শিরোনামের এই থ্রিডি চলচ্চিত্রে সঁভে গুহার চিত্রকলা সম্পর্কে বিস্তৃত তথ্যাদি পাওয়া যায়। ৮৯ মিনিটের এই সিনেমায় হার্জোগ বহু বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদের সাক্ষাৎকারও সংযুক্ত করেছেন। এই ছবি বানাতে হার্জোগকে যথেষ্ট সাধনা করতে হয়েছে। ফরাসি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তাকে একাধিক শর্তসাপেক্ষে এই গুহার ভেতরে দৃশ্যায়ণের অনুমতি দেয়। গুহার ভেতরের বিষাক্ত গ্যাসের কারণেই তিনি দিনে চার ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারেন নি। দিন বলতে অবশ্য তিনি ছয় দিন শুটিং করার অনুমতি পেয়েছিলেন। গুহার ভেতরে বেশি লোক প্রবেশের অনুমতিও দেয়া হয় নি। চিত্রগ্রাহক পিটার জেইটলিঙ্গার, শব্দগ্রাহক এরিক স্পিটজার-ম্যার্লেন এবং পরিচালক হার্জোগ স্বয়ং—এই তিনজনই মাত্র ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিলেন। হার্জোগ নিজে প্রয়োজনীয় আলোক সম্পাত করেছিলেন। অন্ধকার এই গুহাকে আলোকায়িত করতে তাকে কেবল ব্যাটারি চালিত আলো বহনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এই ছবি চিত্রায়ণের জন্যে এই গুহার উপযুক্ত করে থ্রিডি ক্যামেরা নির্মাণ করা হয়েছিল। তিনজনের এই শুটিং দল বিশেষ পোশাক পরেছিলেন এবং গুহার দেয়াল বা কোনো চিত্রকর্মে হাত দেয়ার অনুমতি পান নি। সরু, দুর্গম এই গুহায় কাজ করেও হার্গোজ প্রমাণ করেছেন কোনো বাধাই একজন চলচ্চিত্র পরিচালককে আটকাতে পারে না। তার এই ত্রিমাত্রিক চলচ্চিত্রটি দেখলে সঁভে গুহাচিত্র এবং তার পরিপার্শ্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

সঁভে গুহায় ৩০০ চিত্রকর্ম আছে। গুহার প্রবেশ পথের দিকের ছবিগুলো লাল, কালো। যত গভীরে যাওয়া যায় তত বেশি কালো ছবি পাওয়া যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঁভের গুহায় আঁকা ছবিগুলো দলবদ্ধ। একসাথে অনেকগুলো ঘোড়া বা সিংহ বা গণ্ডারকে দেখা যায়। শিল্পীর খাতার মতোই দেখে মনে হয় আদিম মানুষ এখানে ছবি আঁকা অনুশীলন করেছেন। একই গণ্ডার এঁকেছেন বারবার। কখনোবা একটা ছবির উপর আরেকটা ছবি আঁকা হয়েছে। সঁভেতে বেশি পাওয়া যায় গণ্ডার, সিংহ আর ম্যামথের ছবি। প্রাণীর আদল ছাড়াও সঁভেতে রয়েছে বিমূর্ত আকার। জ্যামিতিক এই সব চিত্র অনেকটাই সাংকেতিক।

4
পুরাকালের সিসটিন চ্যাপল Lascaux Cave Paintings. Unknown Artist. লাসক্যু গুহাচিত্র, অজ্ঞাতনামা শিল্পী। আকার : বিবিধ। প্রাপ্তিস্থান : ফ্রান্স। ধরন : গুহা চিত্র।

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের লাসক্যু গুহাচিত্রসমূহকে বলা হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগের সিসটিন চ্যাপেল। মিকেলেঞ্জেলো যেমন সিসটিন চ্যাপেলের ছাদ আর গম্ভুজগুলোতে এঁকেছেন অসংখ্য ছবি তেমনি আমাদের নাম-না-জানা পূর্বসূরীরা এঁকেছেন এইসব গুহার ছবি। এই গুহাচিত্রগুলো ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ বছরের পুরনো।

মানুষের শিল্পকলার এই প্রাচীনতম নিদর্শন আবিষ্কার করে মার্সেল রাভিদ্য, জ্যাকুয়াস মার্সাল, জর্জেস এগনে এভং সিমন কোয়েঙ্ক নামের চার বালক। রাভিদ্যর সঙ্গে তার পোষা কুকুরটিও ছিল। ১৯৪০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর খেলতে খেলতে একটি গুহার ভেতর এইসব ছবি আবিষ্কার করে তারা। প্রায় ৬০০ চিত্র আছে এই গুহাগুলোতে। অধিকাংশ ছবিই আঁকা হয়েছে লাল, হলুদ, কালো রঙে। রঙ তৈরি হয়েছে খনিজ উপাদান, কয়লা, খড়িমাটি ইত্যাদির সঙ্গে পশুর চর্বি মিশিয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাধারণ মানুষের প্রবেশ সহজতর হয়। দিনে হাজারের বেশি দর্শনার্থী আসে এ সব গুহাচিত্র দেখতে। আবদ্ধ এই গুহাগুলোর ভেতরে এত মানুষের নিঃসৃত কার্বন ডাই অক্সাইড ছবিগুলোর ক্ষতি করতে থাকে। ১৯৬৩ সালে এই গুহা একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয় চিত্রকলাসমূহ সংরক্ষণের প্রয়োজনেই। ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কো লাসক্যু এবং তার আশেপাশের গুহাগুলোকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিশাবে ঘোষণা করে এবং এর রক্ষণাবেক্ষণে ভূমিকা রাখে।  উল্লেখ্য, দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুবিধার জন্যে লাসক্যু’র গুহার প্রবেশ পথটি বড় করা হয়েছিল। এতে করে গুহার ভেতরে বাইরের উষ্ণ বাতাস প্রবেশ করেছে এবং দীর্ঘদিনের সংরক্ষিত এই গুহাচিত্রের ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে লাসক্যু গুহাতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। ১৯৮৩ সালে এই গুহাগুলোর কাছেই ফরাসি সরকার ‘লাসক্যু ২’ নামে আরেকটি জায়গা নির্মাণ করেছে যেখানে মূল লাসক্যু’র আদলে ছবি আঁকা হয়। দর্শনার্থীরা এখানে এসে মূল লাসক্যু’র চিত্রের হুবহু প্রতিরূপ দেখতে পায়। লাসক্যু গুহার একটি দেয়ালকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেট হল’ যেখানে ৩৬টি প্রাণীর ছবি আছে যার মধ্যে ষাঁড়, ঘোড়া আর হরিণের ছবিই প্রধান। এরমধ্যে একটি ষাঁড়ের ছবির আকার হলো শিং থেকে লেজ পর্যন্ত ১৭ ফুট। গুহাচিত্রের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় আকারের চিত্র।

লাসক্যু গুহাচিত্রের সাথে মহাকাশের নক্ষত্রমণ্ডলের মিল লক্ষ করেছেন সাঁতাল জ্যাঁন ভোকিভিয়াস নামের একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও প্রত্নবিদ। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ‘এনসাইয়েন্ট এসট্রোনমার্স’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছে। সে তথ্য চিত্রের দুটি স্লাইড :

5
পুরাণকালের চিত্র Bhimbetka Cave Paintings. Unknown Artist. ভীমবেটকা গুহাচিত্র, অজ্ঞাতনামা শিল্পী। আকার : বিবিধ। প্রাপ্তিস্থান : ভীমবেটকা, মধ্যপ্রদেশ, ভারত। ধরন : গুহা চিত্র।

পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন চিত্রকলার নিদর্শন রয়েছে ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভীমবেটকা নামক স্থানেও। পুরাতাত্ত্বিকদের মতে, পাণ্ডবদের বনবাসের সময় এখানে ভীম বসেছিলেন বলেই এ জায়গার নাম রাথা হয়েছে ভীমবেটকা। পুরাণের বয়স কত! কে জানে সত্যিই এখানে ভীম বসেছিলেন কিনা। পাণ্ডবরা কত আগে ছিলেন এই পৃথিবীতে তা তো ঠিক করে বলা মুশকিল। তবে ভীমবেটকা গুহার কোনো কোনো চিত্রকর্ম ১২ হাজার বছর আগের। মূলত লাল আর সাদা রঙে আঁকা বাইসন, বাঘ, সিংহ, কুমিরের ছবি আছে এই গুহাচিত্রগুলিতে, আছে সে সময়কার মানুষের জীবন ধারণের কিছু নমুনা চিত্রও। দুয়েক জায়গায় সবুজ ও হলুদ রঙের ব্যবহারও দেখা যায়। ছয় শ’র বেশি প্রাগৈতিহাসিক প্রস্তরচিত্র রয়েছে ভীমবেটকায়।

১৯৫৭ সালে ভারতীয় প্রত্নবিদ বিজ্ঞানী ভি এস ভাকান্ডার এই গুহাচিত্রের আবিষ্কারক। ভারতীয় উপমহাদেশে আদিম মানুষ ও তাদের শিল্প চর্চার নিদর্শন এই গুহাচিত্র। ভীমবেটকার গুহাগুলোতে নানা কালের চিত্রকলা রয়েছে। এখানে মিসোলেথিক যুগের [খ্রিস্টপূর্ব ১০০০০-৫০০০ সাল] পাথরচিত্রও আছে।  আবার মধ্যযুগের [৫ম থেকে পনের শ শতক] কিছু চিত্রকর্মও রয়েছে। গুহার ভেতরের দেয়াল ও পাথরে আঁকা হয়েছে বলে আবহাওয়া এই সব চিত্রকলার ক্ষতি করতে পারে নি। এমনকি গুহার ছাদেও কিছু কিছু চিত্র আঁকা রয়েছে। ভীমবেটকার ছবিগুলোতে অন্য গুহাচিত্রের মতো শিকারের দৃশ্য আছে, আবার কোনো কোনো পাথর এবং গুহা কেবল প্রাণীর ছবিতেও ভরপুর, আবার কোনো কোনো গুহায় সেকালের দৈনন্দিন জীবনচিত্রও পাওয়া যায়।

6
সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন Magura Cave Paintings. Unknown Artist. মাগুরা গুহাচিত্র, অজ্ঞাতনামা শিল্পী। আকার : বিবিধ। প্রাপ্তিস্থান : বুলগেরিয়া। ধরন : গুহা চিত্র।

বুলগেরিয়ার রাবিসা গ্রামে অবস্থিত মাগুরা গুহা সরকারিভাবে মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে আবিষ্কৃত হয়েছে। গুহাটি প্রায় দেড় মাইল দীর্ঘ। এই গুহা পর্যটকদের জন্যে উন্মুক্ত। পর্যটকদের কথা ভেবে এমনকি এখানে বৈদ্যুতিক আলোর সরবরাহও করা হয়েছে, একাধিক সিঁড়ি তৈরি করে দেয়া হয়েছে। এমনকি এর ভেতরে কনসার্টের আয়োজনও করা হয়। মাগুরা গুহা বেলজিয়ামের আধুনিক ও প্রাচীন সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের স্থান।


প্রতীকী এইসব ছবিকে অনেকে পৃথিবীর প্রাচীনতম সৌর ক্যালেন্ডারও বলেছেন।


ধারণা করা হয়, খ্রীস্টপূর্ব ৬৩০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সময়কালের মধ্যে এ গুহার ছবিগুলো আঁকা হয়েছে। জীবজন্তু ছাড়ায় এ গুহায় শিকারি মানুষ, নৃত্যরত মানুষ, নারীর অবয়ব, মুখোশ পরা মানুষ, গাছপালা, নক্ষত্র, সৌরদিনলিপি, এমনকি সেকালের মানুষের ব্যবহার করা নানা যন্ত্রপাতি’র ছবি এখানে আঁকা হয়েছে। চেনা আদলের বাইরেও এই গুহাতে জ্যামিতিক বিমূর্ত চিত্র আঁকা হয়েছে। এখানে প্রায় ৭০০ রেখাচিত্র রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মাগুরা গুহাচিত্রের ছবিগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমত প্রতীকী ছবি [symbolic]। নানা ধরনের প্রতীকী ছবি এখানে আঁকা হয়েছে যার অর্থ উদ্ধার করা আজ প্রায় দুরূহ। দ্বিতীয় জ্যামিতিক [geometric] আকৃতি। আদিকালের মানুষেরা কেন জ্যামিতিক আকার আঁকতেন তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যেও মত-বিভাজন আছে। মাগুরা গুহায় জ্যামিতিক আকারে একাধিক গ্রহ-নক্ষত্রের ইঙ্গিতও আছে। তৃতীয়ত প্রাণসমন্ধীয় [zoomorphic]। এক অর্থে প্রাচীন গুহাগুলো স্থিরচিত্রের চিড়িয়াখানাও বলা যায়। প্রাচীনকালের বহু প্রাণীর চিত্র নিদর্শন আমরা এখানে পাই। অন্যঅর্থে প্রাচীন মানুষ ও তাদের জীবন ধারণ সম্পর্কেও আমরা ধারণা পাই গুহাচিত্রগুলোতে। মাগুরা গুহাচিত্রের চতুর্থত মানবসন্ধনীয় [anthropomorphic] চিত্রগুলো তার প্রমাণ। মাগুরা গুহাতে একাধিক রহস্যময় চিত্র রয়েছে। প্রতীকী এইসব ছবিকে অনেকে পৃথিবীর প্রাচীনতম সৌর ক্যালেন্ডারও বলেছেন

download
হাত বাড়িয়ে দাও The Cueva de las Manos Paintings. Unknown Artist. হস্তগুহার চিত্র। অজ্ঞাতনামা শিল্পী। আকার : বিবিধ। প্রাপ্তিস্থান : আর্জেন্টিনা। ধরন : গুহা চিত্র।

The Cueva de las Manos শব্দটির অর্থ হলো Cave of the Hands বা হাতের গুহা। এখানে প্রাচীনকালের মানুষের অসংখ্য হাতের ছাপ রয়েছে। তবে শুধু হাতের ছাপ নয়, অন্য গুহাচিত্রের মতো এখানেও নানা রকম প্রাণী, শিকারের দৃশ্য, বিচিত্র প্রতীক, সংকেত অঙ্কিত হয়েছে।  ৯৫০০ থেকে ১৩০০ বছরের পুরনো এই গুহাচিত্র আর্জেন্টিনার রিও পিন্টুরাসে অবস্থিত।

লা ম্যানোস গুহাচিত্রের হাতের ছাপগুলো সব বাম হাতের। ধারণা করা হয়, গুহার দেয়ালে বাম হাত রেখে ডানহাতের মাধ্যমে রঙ ছিটানো হয়েছে, যার ফলে হাতের ছাপগুলো অঙ্কিত হয়েছে। কেন প্রাচীন গুহাশিল্পীরা তাদের হাতের ছাপ বসিয়ে ছিলেন গুহার দেয়ালে তা সুনিশ্চিত করে বলা মুশকিল। পুরাতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ বলে, খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ বছর আগেও এই গুহায় এবং পাশ্ববর্তী অঞ্চলে মানুষ বসবাস করত। এরা ছিল পাতাগোনিয়া অঞ্চলের তেগুয়েলচে শিকারিগোষ্ঠী। বিশ্বের নানা দেশের নৃতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানীদের কাছে এই গুহা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিকটস্থ শিকারি মানুষকে অধ্যয়ন করার অনেক উপাদান এই গুহাচিত্রে রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম দুর্গম অঞ্চল পাতাগোনিয়ার শিকারিগোষ্ঠীর মানুষদের স্বভাব-প্রকৃতি জানার ক্ষেত্রে এই গুহাচিত্রের ভূমিকা অগ্রগণ্য। উল্লেখ্য, এ অঞ্চলে এখনও কথিত আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে নি। ফলে এই গুহার চিত্রগুলো সুরক্ষিত এবং এর আশেপাশের নিসর্গও উল্লেখ করার মতো নান্দনিক। অন্যান্য গুহাচিত্রের মতো এখানেও প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। আশেপাশে প্রাপ্য আয়রন অক্সাইড [লাল ও বেগুনি], চীনা মাটি [সাদা], ম্যাগানিজ অক্সাইড [কালো] এবং নেট্রোজারোসাইট [হলুদ]) ইত্যাদি খনিজ উপাদানকে রঙ হিশাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :

উপন্যাস—
মায়াবি মুখোশ
কমৎকার

ছোটগল্প—
অন্ধকারের গল্পগুচ্ছ
ছোট ছোট ছোটগল্প
শতগল্প
হয়তো প্রেমের গল্প

কবিতা—
চার লাইন

চলচ্চিত্র বিষয়ক—
বিশ্বসেরা ৫০ চলচ্চিত্র
বিশ্বসেরা আরো ৫০ চলচ্চিত্র
১০ রকম ১০০ চলচ্চিত্র
বিচিত্র চলচ্চিত্র
বিশ্বসেরা চলচ্চিত্র সমগ্র
বিশ্বসেরা শত সিনেমা
অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র

নাটক—
দুইটি ব্রিটিশ নাটক
তিনটি মঞ্চ নাটক

অনুবাদ—
সাদাকো ও সহস্র সারস
বব ডিলান গীতিকা
কাফকা : অণুগল্প
সাফোর কবিতা

শিশুতোষ—
মজার প্রাণীকূল

চিত্রকলা বিষয়ক—
বেদনার রং তুলিতে একটি জীবন

প্রবন্ধ—
বই কেনা, বই পড়া
বই বিশ্ব
কিতাবি কথা

অন্যান্য—
তিতা কথা

সম্পাদনা—
অনির্ণীত হুমায়ূন

ই-মেইল : moomrahaman@gmail.com