হোম চিত্রকলা কাজমী’র প্রত্নস্তর ও স্বাধীনতার আকরিক

কাজমী’র প্রত্নস্তর ও স্বাধীনতার আকরিক

কাজমী’র প্রত্নস্তর ও স্বাধীনতার আকরিক
627
0

লেয়ার্স-মিক্সড মিডিয়া
আর্টিস্ট : ফাহাদ হাসান কাজমী
ভ্যানু : কলাকেন্দ্র, ১/১১, ইকবাল রোড, মোহম্মদপুর, ঢাকা ১২০৭
সময়কাল : ২৭ অক্টোবর—২২ নভেম্বর ২০১৭
সময় : বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা


ঘটনাচক্রে যাওয়া। ঘটনাস্থল কলাকেন্দ্র। ছোট্ট একটা আর্ট গ্যালারি। মোহম্মদপুরের আসাদ গেট এলাকায় বাসাবাড়ির একটি ফ্লোরে গড়ে ওঠা এই শিল্পাঙ্গনে আগেও গিয়েছি। কিন্তু এবার যাওয়াটা কাকতালীয়। আড্ডা দিতে দিতে কবি শিল্পী রাজীব দত্তের কথা উঠল। জানা গেল একটা এক্সিবিশন আছে কলাকেন্দ্রে, নতুন শিল্পী, সেটার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আছে, সেখানেই রাজীব আছে। আমারও একটু দেখা করা দরকার ছিল। আমার ইরাশা ভাষার জলমুক বইটির প্রচ্ছদ আর পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় কবিতা অবলম্বনে ড্রইং করে আমাকে কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করেছে সে। এবার একটা গল্পের বইসহ আরও দুয়েকটা বই বের হওয়ার প্রস্তুতি চলছে, ভাবলাম সেগুলোর প্রচ্ছদ নিয়ে একটু কথা বলে আসি। যা হোক, গিয়ে দেখি, ঝুলে গেছে পেইন্টিং, খুব বেশি নয় গোটা ৫-৬। তার ভেতরে কিছুটা লাজুক রীতিমতো গডবয় টাইপের শিল্পী ফাহাদ হাসান কাজমী। তার মতোই চুপচাপ ওর পেইন্টিংগুলো। কিন্তু একটু পরেই শিহরিত হওয়ার পালা। কারণ এগুলো পেইন্টিং নাকি ভাস্কর্য নাকি ইনস্টলেশন? ফ্রেম বাধার চলটাকেই হাপিশ করে দিয়েছে কাজমী। কোনো ফ্রেম নাই, শুধু তার শিল্প কর্ম।


কাজমীর কাজে রঙের ব্যবহার, মেটিরিয়ালের ব্যবহার, কম্পোজিশনের পারফেক্টনেস হয়তো ইউনিক নয়, হয়তো অনেকের কাছে আহামরি মনে হবে না, কিন্তু পেইন্টিং নির্মাণ ও উপস্থাপনে ওর আইডিয়াটি ইউনিক, উস্কানিমূলক।


ভাবলাম, ওয়েল, এমন একটা কথাই বলেছিল নবুয়্যোসি আরাকি, জাপানি ফটোগ্রাফি। জাপানের এই কামাশ্রয়ী ফটোগ্রাফার তার ছবির কোনো ফ্রেম ব্যবহার করেন না। আর এর যুক্তি হলো, ছবি তো অখণ্ড একটি দৃশ্যের অংশ বিশেষ, সেটা তো ফ্রেমবন্দি নয়। ফ্রেমে ফেললে ছবি খণ্ডিত হয়, মানুষ ফ্রেমের বাইরের কল্পনাটা করার সুযোগ পায় না। যা হোক কাজমীর এই ফ্রেম অস্বীকার ভালো লাগল।

এই ভালো লাগার রেশ কাটতে না কাটতে আবারও চমক। দেখি, ছবির ভেতর থেকে টেরাকোটার মতো ফুড়ে উঠছে দালানকোঠা, নানার বিস্মৃত স্মৃতি স্মারক। একটা ত্রিমাত্রিক ব্যাপার। পেইন্টিং যেমন দ্বিমাত্রিক একটি উপরিতলে পড়ে থাকা রঙের খেলা, এগুলো তেমন নয়। এগুলো স্তরের স্তরে সাজানো। যেন একটা কম্পোজিশন। এই কম্পোজিশন কেওয়াটিক হলেও একটা অন্তর্নিহিত যোগসূত্রতা আছে। আমি নিজেও কবিতা লিখেছি মব নিয়ে, কেওয়াস নিয়ে, যেখানে কোনো পূর্বনিয়ম ও পরম্পরা না মেনে হুল্লোড়ি চেতন প্রবাহকে ধরার চেষ্টা ছিল, দেখি ওরে বাবা এ তো তারই আরেকটি সংস্করণ। কাজমীর কাজে রঙের ব্যবহার, মেটিরিয়ালের ব্যবহার, কম্পোজিশনের পারফেক্টনেস হয়তো ইউনিক নয়, হয়তো অনেকের কাছে আহামরি মনে হবে না, কিন্তু পেইন্টিং নির্মাণ ও উপস্থাপনে ওর আইডিয়াটি ইউনিক, উস্কানিমূলক।

আর কে না জানে, ইঞ্জিনিয়ারের নকশা একদিকে আর হাজার হাজার শ্রমিকের চুনসুড়কি একদিকে, তবু ইঞ্জিনিয়ারের বরাবর হতে পারে না তারা। কাজমী সেই ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, আমি রিলেট করেছি আমার মব পোয়েট্রি থেকে, অন্য কেউ হয়তো তার কাজকে রিলেট করবে অন্য পার্সপেক্টিভ থেকে, হয়তো খুঁজে পাবে স্মৃতি-বিস্মৃতির তল, লুকানো কোনো ডিকোড, রাজনীতি, হয়তো শিল্পীর এডিটরিয়াল বক্তব্যও। এটাই কাজমীর ইউনিকনেস, ওপেননেস। ও শুরুতেই যে স্বাধীনতাটুকু নিলো, যেভাবে প্রচলিত ক্যানভাস ভেঙে বিস্তৃত করল স্পেস, তাতে মুগ্ধ হতে হয়। এই মুগ্ধতাই শোনা গেল কলাকেন্দ্রের কিউরেটর শিল্পী ওয়াকিলুর রহমানের কাছ থেকে। আসুন আমরা বরং তার মুখবন্ধটি পড়ে নিই :

মানব ইতিহাসের একেকটি সময় নির্দিষ্ট ধরনের অভিজ্ঞতা দ্বারা সমৃদ্ধ, আর স্তরে স্তরে জমে থাকা এই অভিজ্ঞতার অধীনে আমাদের অগ্রগতি। অভিজ্ঞতার উপর অভিজ্ঞতা, ইমেজের উপর ইমেজ, শব্দের উপর শব্দ, সময়ের উপর সময়, তথ্যের উপর তথ্য-সংযুক্ত করতে ওভারল্যাপিং বা স্তরের ব্যবহার। চিত্রকলায় স্তরবিন্যাসে ইমেজ নিজেই নিজের তৈরি একটি প্রত্নতত্ত্ব হয়ে ওঠে। স্তর-সমূহ চিত্রটিকে চিত্রের সম্পদ হিশেবে উদ্‌ঘাটন করার সুযোগ তৈরি করে দেয়, প্রবাহমান সময়কে ধারণ করে সার্বজনীন হয়ে ওঠে।

ফাহাদ হাসান কাজমী-র কাজের মূল সুর স্তর বিন্যাসে। বিভিন্ন আকারের ক্যানভাসে, কাঠে, বোর্ডে, বাঁশে, কাগজে, প্লাস্টিক-এ—তেল রং, এক্রেলিক, জলরং, কোলাজে ইমেজ তৈরি করে স্তরে সাজান। যুক্ত হয় বিভিন্ন উপাদানের রেডিমেড অবজেক্ট। ভেঙে, আকার পরিবর্তন করে, তলের উপর তল, সমতল থেকে ত্রিমাত্রিক হয়ে ওঠে চিত্র। স্তরের উপর স্তরে—সময়, অভিজ্ঞতা, ভাবনা। শহর, স্থাপত্য, মানুষ, যানবাহন, পরিপার্শ্ব উঠে আসে ইমেজে। বিমূর্তধর্মী, প্রকাশবাদী তার চিত্রগুলি একাডেমিক চর্চার শেষ দিকের কাজ।

সাধারণত চিত্রের জন্য ক্যানভাস দ্বিমাত্রিক ও আয়তক্ষেত্রাকার। নান্দনিক বিবেচনার পাশাপাশি ক্যানভাস-এর উপকরণ, বৈশিষ্ট্য ও প্রযুক্তিগত কারণে এরকম। আয়তক্ষেত্র নিজেই একটি আকৃতি এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তা নির্ধারণ করে বা সীমাবদ্ধ করে। স্তর ভাবনা উপস্থাপনে চিত্রের আনুষ্ঠানিক- আয়তকার আকৃতি ও ফ্রেম প্রত্যাখ্যান এবং দ্বিমাত্রিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্য, চিত্র ও ভাস্কর্যের মধ্যে পার্থক্যকরণের প্রশ্ন উপস্থাপন করে। দৃশ্যশিল্পে স্তরে চিত্র বিন্যাস প্রচেষ্টা পরীক্ষামূলক।

কাজমী-র শিল্প পরীক্ষামূলক ও অস্থির। যা এগিয়ে যাওয়ার জন্য অতীব প্রয়োজন।

-ওয়াকিলুর রহমান, শিল্পী, কিউরেটর


কাজমী আপনাকে সেই সব অপশনই দেবে তার ওয়াই এঙ্গেল ও ট্রিমিন্ডাস ফ্রিডমনেসের ফিলিংটুকু দেবে। মগজের স্তর থেকে উঠে আসুক কাজমীর কম্পোজিশনগুলো—এই কামনা।


আসলে, শিল্পকর্মের কোনো ধরাবাধা নিয়ম নাই, ভালো লাগার কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম নাই, কারণ নাই। এগুলো খুব সুক্ষ্ম ব্যাপার। আজ বৃষ্টি হচ্ছে, আপনার পেইন্টিংটি, ভাস্কর্যটি, ইনস্টলেশনটি ভালো লাগতে পারে, স্পট লাইটটি চকচক আলো ফেলছে একটা বোতামে আপনার ভালো লাগতে পারে, আবার কোনো কারণ ছাড়াই কেটে যেতে পারে মুগ্ধতার রেশ। কাজমী আপনাকে সেই সব অপশনই দেবে তার ওয়াই এঙ্গেল ও ট্রিমিন্ডাস ফ্রিডমনেসের ফিলিংটুকু দেবে। মগজের স্তর থেকে উঠে আসুক কাজমীর কম্পোজিশনগুলো—এই কামনা।

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান