হোম চিত্রকলা আদিম ভাষার ইতিহাস ও মূল্য

আদিম ভাষার ইতিহাস ও মূল্য

আদিম ভাষার ইতিহাস ও মূল্য
387
0

জ্যাকসন পোলাকের একটি ছবি ‘নাম্বার ৫’ বিক্রি হয়েছে ১৪ কোটি ডলারে। এটাই এই মুহূর্তে নিলামে বিক্রি হওয়া ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দামি। প্রশ্নটা খুবই যৌক্তিক, একটি চিত্রকর্ম কেন এমন অবিশ্বাস্য দামে বিক্রি হয়।

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, একটি নির্দিষ্ট চিত্রকর্ম কেন এত দামি? রং, তুলি, ক্যানভাসের কত টাকাই-বা দাম? তাছাড়া যে পেইন্টিং নিয়ে আলোচনা সেই ‘নাম্বার ফাইভ’ নামের চিত্রকর্মটি দেখতেও তেমন সুন্দর না। অধিকাংশ লোক যেমন আধুনিক এবং বিমূর্ত চিত্রকলা নিয়ে হাসি তামাশা করে বলে, এটা স্রেফ ছেলেমানুষি, আমিও আঁকতে, কিছু এলোপাথারি রং ছড়ানো ইত্যাদি ইত্যাদি… জ্যাকসন পোলাকের এই চিত্রকলাটি নিয়েও তেমন বলা যায়। এটা বলা খুব দোষের না। কারণ একটি চিত্রকর্মের গুরুত্ব বা মহত্ত্ব বুঝতে হলে চারুকলা ও শিল্পের ইতিহাসটা বোঝা দরকার। যা সাধারণত সাধারণ মানুষের সাধারণ জ্ঞানের মধ্যে পড়ে না। স্কুল কলেজে নিশ্চয়ই চিত্রকলার ইতিহাস, গুরুত্ব, প্রভাব পড়ানো হয় না। ফলত আমাদের অনেক শিক্ষিত লোকেরও ধারণা নেই একটি ছবি বা পেইন্টিংয়ের দাম সম্পর্কে।


ভিঞ্চির মোনালিসা যত জনই আঁকুক, যতভাবেই আঁকুক ওটি পৃথিবীতে একমাত্র চিত্রকলা। একমাত্র বলেই তার আলাদা মূল্য আছে।


অথচ মানুষের ভাবনা প্রকাশের আদিমতম মাধ্যম চিত্রকলা। মানুষ ভাষা আয়ত্ত করার আগে ইশারায় কথা বলত, কখনো-বা ছবি এঁকে মনের ভাব বোঝাত। প্রাচীন গুহার গায়ে আদিম মানুষের আঁকা যে সব ছবি পাওয়া যায় তার কার্যকারণ নিয়ে অনেক কথাই আছে, কিন্তু একটি কথা পরিষ্কার মানুষ কিছু বলতে চেয়েছে, সেই বলাটার প্রকাশ ছবিতে হয়েছে। এবং ছবি প্রাচীনতম ভাষা। সেই প্রাচীনতম ভাষা আজকের আধুনিক যুগে এসে কতটা গুরুত্ব বহন করে তা নিয়ে আমরা কমই ভাবি। তবু মাঝে মাঝে ভিনসেন্ট ভ্যান গগ, সালভাদর দালি, পাবলো পিকাসো, অঁরি মাতিস, পল সেজান, এডওয়ার্ড মাঁনে, এদগার মঁনে, জন মিরো কিংবা জ্যাকসন পোলাকের মতো আধুনিক শিল্পীর চিত্রকর্ম নিলামে বিক্রি হয় আকাশ চুম্বি দামে, তখন আমরা ভাবতে বসি কেন একটি ছবির এত দাম। আসুন সেই ভাবনাটা নিয়ে আমরা একটু গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করি তাতে হয়তো চিত্রকলার প্রয়োজনীয়তাটাও বেরিয়ে আসবে, মানুষের জীবনে ছবি আঁকা ও ছবি দেখার মূল্যটাও বোঝা যাবে।

28740891_1593485690735562_1623341190_n

প্রথম কথাই হলো মেটেরিয়াল বা উপকরণের দাম দিয়ে শিল্পের দাম নির্ধারিত হয় না। মার্কেজ কত টাকা দামের কলমে তার উপন্যাস, গল্পগুলো লিখেছেন বা কত টাকা দামের কম্পিউটারে কম্পোজ করেছেন তা দিয়ে এই নোবেল বিজয়ী লেখকের সাহিত্য মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। কাজেই একটি ছবি আঁকতে যত টাকার কাগজ কালি লেগেছে তার সাথে শিল্পীর দৈনিক পারিশ্রমিক (!) ধরিয়ে দিলেই ছবিটির দাম নির্ধারিত হয়ে যায় না।

দ্বিতীয় কথা হলো, বোধগম্য হলেই শিল্প মহৎ হয় না। শিল্পকে জনপ্রিয়তা বা সহবোধ্যতা দিয়ে বিচার করা যায় না। জর্জ বার্নাড শ তো বলেই বসলেন :

যদি শতকরা দশ ভাগের বেশি জনগণ একটি চিত্রকলাকে পছন্দ করে তাহলে সেটিকে পুড়িয়ে ফেলা উচিত, কারণ এটা নিশ্চয় খারাপ।

কাজেই জনপ্রিয়তা শস্তা মোহও হতে পারে।

অন্যদিকে, যথার্থতা শিল্পের মাপকাঠি নয়। একজন চিত্রকর আপনার মুখের ছবি আঁকল তা কতটুকু আপনার চেহারার নিঁখুত অনুকরণ হলো তা দিয়ে ছবিটির মূল্য নির্ধারিত হয় না। একটি ডিজিটাল কিংবা মোবাইলের ক্যামেরাও এখন নিখুঁত ও বোধগ্রাহ্য একটি ছবি তুলতে পারে, কিন্তু সেই ছবি যে মহৎ শিল্পকর্ম হয়ে উঠবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সেজান একদা বলেছিলেন, একটা আপেল দিয়ে আমি প্যারিসকে স্তব্ধ করে দিবো। সেজানের কথা যথার্থই হয়েছিল। ইম্প্রেসনিস্ট এই শিল্পী একটা আপেলকে শতবার শতভাবে এঁকেছেন। আপনি ভেবে দেখুন জানালার পাশে একটা আপেল রাখলেন, দিনে-রাতে সেই আপেলটি আলো-ছায়ার বদলে কতভাবেই না বদলাবে! সেজান দেখালেন কী আঁকছি তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিভাবে আঁকছি, কেন আঁকছি। চিত্রশিল্পীর কাজ তো হুবুহু অনুকরণ করা নয়। এমনকি আজকের আধুনিক ফটোগ্রাফারও তার অতি সংবেদনশীল ক্যামেরায় বস্তুর রূপটিই শুধু ফুটিয়ে তোলে না। এ প্রসঙ্গে সেজানের আরেকটি বিখ্যাত উক্তি স্মর্তব্য, প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকা মানে বস্তুুটির নকল করা নয়। যে সেজান আমাদের একটি আপেলের হৃদয় কিংবা আত্মা কিংবা দেহকে তুলে ধরেছে তার পেইন্টিংয়ের দাম স্বাভাবিক বোধের ঊর্ধ্বেই তো হবে। সালভাদর দালির আঁকা ছবি যারা দেখেছেন তারা হয়তো লক্ষ করেছেন, এই সুরিয়ালিস্ট পেইন্টার চিত্রকলার নিয়ম নীতিকে অনেক ভেঙেছেন। বিদ্রোহী এই শিল্পী বাস্তবের চেয়ে গভীরতর কোনো বাস্তবকেই খুঁজতেন। তিনি বলেছিলেন :

আমি একটি প্রতিকৃতি সেই বিষয়টির মতো করে আঁকি না, বরং আমি চাই ব্যক্তিটি প্রতিকৃতিটির মতো হয়ে উঠুক।

সোজা করে বললে, শিল্পী যার ছবি আঁকছেন সে দেখতে কেমন সেটা বিষয় নয়, শিল্পী তাকে কেমন করে দেখছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এতক্ষণের আলোচনার সূত্র ধরে, দুটো জিনিস পরিষ্কার হওয়া দরকার, শিল্পের মহত্ত্ব বোঝা সবার কাজ না এবং বস্তুর যথার্থ অনুকরণই কেবল শিল্প না। এর সঙ্গে আরেকটি নন্দনতাত্ত্বিক ভাবনাও আমাদের মনে রাখতে হবে, সেটি হলো, দেখতে সুন্দর হলেই সেটি শিল্প হয়ে উঠবে এমন কোনো কথা নেই। জয়নুল আবেদিনের আঁকা দুর্ভিক্ষের ছবি দেখতে সুন্দর না, চোখকে তৃপ্তি দেয় না, কিন্তু তা নিজ গুণে ভাস্বর। রেখার সাবলীলতা, বিষয় বস্তুর ক্রুরতা, ঐ সময়ের দলিল এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের চিত্রকলায় নতুন ভাবনা সৃষ্টির জন্যে জয়নুলের ছবির গুরুত্ব ঐতিহাসিক।

আপনি নিউ মার্কেটে গেলে হয়তো ঘর সাজানোর জন্য কয়েক শ টাকা বা দুয়েক হাজারে পেইন্টিং পেয়ে যাবেন। সেটা কতটুকু পেইন্টিং কতটুকু শো পিস তা ভেবে দেখার দরকার আছে। জ্যাকসন পোলাকের চৌদ্দ কোটি ডলারের একটি ছবির দামে আপনি হয়তো একটি মিউজিয়ামই ছবি দিয়ে ভরে ফেলতে পারেন, কিন্তু তারপরও মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে ‘নাম্বার ৫’ একটিই মাত্র ছবি। এর কোনো কপি নেই, এর অনুকরণে কেউ যদি কোনো ছবি আঁকে সেটি কেবলই অনুকরণ। ভিঞ্চির মোনালিসা যত জনই আঁকুক, যতভাবেই আঁকুক ওটি পৃথিবীতে একমাত্র চিত্রকলা। একমাত্র বলেই তার আলাদা মূল্য আছে।

কিন্তু সেটাই কি সব? আপনি আমিও তো একটি ছবি আঁকলে সেটি একমাত্র হবে। কিন্তু আপনার আমার আঁকা একমাত্র ছবিটির কিই-বা মূল্য থাকবে! ভিঞ্চি, পিকাসো, পোলাকদের বিশ্ব মানের প্রতিভা নিয়ে তো কারো কোনো প্রশ্ন নেই। তারা মহৎ শিল্পী। আর মহৎ শিল্পীর আঁকা মহত্তম শিল্পকর্মটির পাশে আর কোনো কিছু কি ঠাঁই পায়!

মহৎ শিল্পী বলে সিল লাগিয়ে নিলেই তো শুধু হয় না। মহৎ শিল্পী হওয়ার পেছনে শিল্পকলার কার্যকারণ, ব্যাকরণ, নিয়ম-রীতি এবং তার সবকিছু ভেঙে ফেলা এবং সর্বোপরি নতুন করে সৃষ্টি করার ঐশ্বরিক শক্তিটা থাকে। যদি এই শিল্পীদের জীবনী এবং শিল্পকলা বা বিশ্বের ইতিহাস মিলিয়ে পড়ি তাহলে দেখতে পাব কোটি কোটি টাকায় যাদের চিত্রকলা বিক্রি হয় তারা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মধ্যে চিন্তায়, চেতনায়, প্রকাশে, প্রকরণে সম্পূর্ণই আলাদা। পিকাসো, দালি কিংবা পোলাক নিজেরাই এক একটি মতবাদ। তারা শুধু সুন্দর ছবি আঁকতে পারে, তাদের রং রেখার কাজ ভিন্ন সেটাই শুধু তাদের মহত্ত্ব নয়, বরং তারা তাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজের সময় থেকে তারা অনেকটাই এগিয়ে। বিশ্বকে তারা নতুনভাবে দেখেছেন, দেখিয়েছেন এবং দেখতে শিখিয়েছেন—এইখানেই চিত্রকলার আসল মূল্য। সেজান যেমন আপেলকে একটি ফল হিশাবে দেখে না, তার চিত্রকলায় আপেল অন্য কোনো মানে তৈরি করে, তেমনি মহৎ শিল্পীর আঁকা ছবি স্রেফ একটি ক্যানভাস, তুলির দাম নয়, তারচেয়েও অনেক অনেক গুণ বেশি। প্রসঙ্গত আরেকটি তথ্য দেয়া যেতে পারে, সম্প্রতি জন লেননের একটি চিঠি ৬০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছে। এই চিঠিটি কি দেখতে খুব সুন্দর, এটি কি গোপন কোনো কথা বলে, এটি কি দারুণ হাতের লেখা? না, এ সব কিছুই নয়, এটি জন লেলনের লেখা চিঠি। এই চিঠির মূল্যের পেছনে কাজ করছে জন লেলনের মহত্ত্ব ও মাহাত্ম।

মানুষের প্রথম চাঁদে পা দেয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সালভাদর দালি, পাবলো পিকাসো, জন মিরো বা জ্যাকসন পোলাকের ছবি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের ছবি দিয়ে তারাও বিশ্বে প্রথম এবং নতুন কিছু সংযোজন করেছে। তাদের কাজ শুধু চিত্রকলা ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সংযোজন নয় বরং মানব সভ্যতায় নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করাও।

সৃষ্টিশীলতার মূল্যের পাশাপাশি শিল্পের একটি বাজার দরও আছে। কিংবদন্তি শিল্পী আর তার শিল্পকর্ম পণ্য হিশাবেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে ব্যক্তি পিকাসো বা পোলাকের একটি বিশেষ শিল্পকর্ম কিনলেন পৃথিবীতে একমাত্র তার কাছেই সেটি রয়ে গেল। অন্যকেউ চাইলেও সেটির মালিকানার দাবিদার হতে পারছে না। কেউ যদি সেটি কিনতে চায় তাকে তেমন মূল্য দিয়েই কিনে নিতে হবে। এবং কেউ যদি বেঁচতে চায় সেও তেমন মূল্যেই বেঁচতে পারবে। বিশেষত চিত্রকলার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী একটি মার্কেট আছে। সোদবে, ক্রিস্টির মতো নিলাম ঘরগুলো কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করে শিল্পকর্ম নিয়েই। তাদের এজেন্ট আছে। বিশ্বের বড় বড় ব্যবসায়ীরাও এখন চিত্রকলায় কোটি কোটি ডলার লগ্নি করছে। সেক্ষেত্রে কখনো কখনো চিত্রকর্মটি যদি তেমন বিখ্যাত হয় তার দাম আসলে যে কোনো অঙ্কেরই হতে পারে। তবে টাকার অঙ্কের চেয়েও বড় কথা কোনো সাধারণ পণ্যের সঙ্গে শিল্পকর্মের দামের তুলনা চলে না। শিল্পের বাজার নির্ভর করে শিল্পের ইতিহাস, শিল্পীর নিজস্বতা-দক্ষতা, শিল্প রীতি, মতবাদ, ভাবনার নতুনত্ব ইত্যাদির উপর।


চিত্রকলার ইতিহাসে জ্যাকসন পোলাক যেন শিল্পী নন, এক ভয়াবহ প্রতিবাদ।


চিত্রকলার ইতিহাসটা এক নজরে একটু দেখে নিলে আধুনিক চিত্রকলা ও জ্যাকসন পোলাকসহ অন্যান্য আধুনিক শিল্পীদের কাজ বুঝতে সুবিধা হবে এবং তাদের মূল্যায়ন করতেও সুবিধা হবে। চিত্রকলার আদিম নির্দশন পাওয়া যায় ৩০ হাজার বছর আগে প্রাচীন গুহাচিত্রে। আদিম গুহাবাসী মানুষ যে ধরনের ছবি আঁকা দিয়ে চিত্রকলার শুরু করেছিল তা ছিল মূলতই প্রাণীর ছবি। বাইসন, হরিণ ইত্যাদির ছবি এঁকে চিত্রশিল্পের যাত্রা  শুরু।

28537550_1593486360735495_894070626_n

শুরুর একটি ছবি দেখা যাক। মানুষ কেন ছবি আঁকা শুরু করেছিল সেটা নিয়ে নানা মতবাদ আছে। কেউ বলছেন, শিকারি মানুষ তার শিকারের দৃশ্য এঁকে রাখতেন। কেউ বলছেন, এগুলো এঁকে শিকার করা প্রাণীর আত্মার প্রতি তারা অনুতাপ ও সহানুভূতি প্রকাশ করতেন। কারো মতে এই ছবিগুলো ধর্মীয় কৃত্যের অংশ। কিংবা হতে পারে মানুষ তার সুকুমার বৃত্তির কারণেই ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন। কারণটা যাই-ই হোক শুরুটা কিন্তু খারাপ ছিল না। মানুষ তখনো পরিপ্রেক্ষিত, কম্পোজিশন, রঙের বিন্যাস, এমনকি ছবি আঁকার তেমন সরঞ্জাম আবিষ্কার না করলেও এঁকেছেন আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে। পিকাসোর মতো বিশ্বসেরা শিল্পীরাও কিন্তু আদিম মানুষের ছবি আঁকার প্রশংসা করেছেন।

তারপর হাজার হাজার বৎসর পার হয়ে গেল। মানুষ চেষ্টা করতে লাগল আঁকা ছবিতে সব কিছু নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে। তার চেষ্টার চূড়ান্ত একটি নমুনা হিশাবে এই ছবিটি দেখুন। উইলিয়াম ক্লায়েজ হেডার আঁকা ১৬৩৫ সালের এই চিত্রকর্মটি যেন একেবারে ক্যামেরায় তোলা ছবি। স্টিল লাইফ উইথ গিল্ট গবলেট শিরোনামের এই চিত্রটি ঠিক মতো পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় মানুষ এতদিনে নিখুঁত ছবি আঁকার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। চিত্রকলার সকল কলাকৌশলই এতে ব্যবহৃত হয়েছে। রং, রেখা, পরিপ্রেক্ষিত, বিন্যাস, বুনন—সবই নিখুঁত। যাকে আমরা বলি জীবন্ত ছবি, একদম হুবুহু আঁকা এই চিত্রটি ঠিক তেমনি। ঝিনুকের মধ্যে মুক্তা, পাউরুটি, লেবু, পানীয়, স্বচ্ছ কাচের পান পাত্র, রূপার চকচকে পানপাত্র, সোনালি পাত্র, শাদা সাটিনের কাপড়, কাপড়ের ভাঁজ—সবকিছুই সর্বোচ্চ মুন্সিয়ানায় আঁকা। একেবারে বাস্তবের মতোই জীবন্ত এক ছবি, যেন ফটোগ্রাফ।

এরপরই শিল্পীদের মধ্যে শুরু হলো নতুনের অন্বেষণ। কারণ হুবুহু বাস্তব এঁকে লাভ কী! চিত্রশিল্পী কি বাস্তবতার দাসত্ব করবে? হুবুহু আঁকলেই কি ভালো শিল্পী?

ক্লদ মনে সচেতনভাবেই তুলির আঁচড়গুলোকে রুক্ষ করে তুললেন। রংগুলোকে করে তুললেন আরো বেশি জ্বলজ্বলে করে। চোখের সামনে বাগানটিকে যেমন দেখছেন তেমন আঁকার চেয়ে তিনি গুরুত্ব দিলেন বাগানটি তার হৃদয়ে কী অনুভূতি ফুটিয়ে তোলে তা আঁকতে। ভ্যান গগ, পল গঁগ্যারা তুলির টানে আরো বেশি ভিন্ন হয়ে উঠলেন। ইম্প্রেসনিস্ট ঘরানার এই শিল্পীরা মোটা মোটা তুলির টান, ফোঁটা ফোঁটা রঙের ব্যবহারে ভিন্নতা আনলেন। প্রকৃতিকে তারা ভিন্ন চোখে দেখলেন। এদেরই একজন পল সেজান, যিনি আপেল নিয়ে রংতুলি হাতে খেললেন। ভ্যান গগ আঁকলেন অসংখ্য সূর্যমুখি ফুল আর গম ক্ষেত। ভ্যান গগ তুলি ছেড়ে হাতের মধ্যে রং লাগিয়ে আঁকা শুরু করলেন। মোদ্দাকথা এরা সবাই বাস্তবধর্মী ছবি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তবুও তারা বাস্তব বস্তুকেই দেখালেন আরো গভীরতর করে।

চিত্রশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগল ক্যামেরা নামের যন্ত্রের আবিষ্কারের পর। একজন শিল্পী বহু বছরের সাধনায় সব কিছু নিখুঁত করে আঁকতে শিখলেন আর একটি ক্যামেরার ক্লিকে নিখুঁতভাবে দৃশ্যটি ফুটে উঠল—তাহলে আর শিল্পীর বাহাদুরি থাকল কোথায়। চিত্রশিল্পী কি ক্যামেরার কাছে হেরে যাবে? ক্যামেরার আবিষ্কার যথার্থই ছবি আঁকার ধরনকে চ্যালেঞ্জ করল। আর সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে গিয়েই ছবি আঁকার ধরন ও ইতিহাসটা পাল্টে দিল। বছর বছরের সাধনায় যে নিখুঁত ছবি আঁকার পেছনে সময় দিল মানুষ, একটি শিশু তারচেয়ে নিখুঁত ছবি তুলে দিতে পারে ক্যামেরায়। ছবি হয়ে ওঠা, ছবি আঁকা—এই সবই পাল্টে গেল সময়ের প্রয়োজনেই।

এই পাল্টানো সময়ের সবচেয়ে বড় কাণ্ডারি হয়ে হাজির হলেন পাবলো পিকাসো। পরিপ্রেক্ষিত এবং মানুষের চোখে দেখার যে বাস্তবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তা পাল্টে গেল পিকাসোর হাতে। তিনি সব অবয়বকে দুমড়ে-মুচড়ে দিলেন। এখানে একটু বলে রাখা দরকার, শুধু চিত্রকলার নয়, বিশ্ব শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ একটি বড় ঘটনা। হিরোশিমা নাগাসাকির বোমা হামলার পর পাশ্চাত্বের মানুষ ভাঙনের যে ভয়াবহ চিত্র দেখল তা ভুলতে পারে নি আজও। সাহিত্যে যেমন অস্তিত্ববাদ, কিমিতিবাদ এল, শিল্পকলায় তেমন এল কিউবিজম। পিকাসোর গোয়ের্নিকা স্পেনের গৃহযুদ্ধেরই ফসল। যুগে যুগে শিল্পীরা তার সময়, সমাজ ও নানা ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হলেন।

সালভাদর দালি আঁকলেন সুরিয়ালিস্ট চিত্র। সেখানে ঘড়ি গলে পড়তে শুরু করল। ছবিগুলো বাস্তব, কিন্তু বাস্তব নয়। এ যেন স্বপ্ন দৃশ্য। এখানে সব কিছুই সম্ভব। তার তুলিতে হাঁস, গাছ, ফুল, হাতি, ঘোড়া, মানুষ—সবই যেন বাস্তবতার ঊর্ধ্বের কোনো কাল্পনিক বা স্বাপ্নিক জগৎ থেকে ওঠে এসেছে।

আমরা ফিরে আসি জ্যাকসন পোলাকের কথায়। চিত্রকলার হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে দেখলাম বাস্তবতা, আকৃতির জগৎ নিয়েই সবাই কাজ করছেন। পিকাসো, দালিরা বাস্তবতাকে যতই ভাঙলেন তবু তাদের ছবিতে বাস্তব জগতের উপাদান রয়ে গেল। তাদের মানুষ, জন্তু-জানোয়ার ভিন্ন রকম দেখতে হলেও বোঝা যায় এটা মানুষ, এটা পাখি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই বাস্তবতা আর আকৃতির অনুকরণের পাশাপাশি চিত্রকররা তাদের ছবিতে একটা গল্প বলার চেষ্টা করলেন। তাদের ছবি একটা অর্থপূর্ণ ঘটনা বা বিষয়ের ইঙ্গিত দিতে থাকল। কিন্তু জ্যাকসন পোলাক এই সব কিছুকে অস্বীকার করলেন। চিত্রকলার ইতিহাসে জ্যাকসন পোলাক যেন শিল্পী নন, এক ভয়াবহ প্রতিবাদ। তিনি ছবিতে কিছুই বললেন না। তার ছবিতে কোনো মানুষ, জন্তু, বস্তু দেখা গেল না। তিনি সবার মুখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন : কেমন হবে আমার আঁকা ছবি যদি কোনো কিছুর কথাই না বলে? শুনতে কেমন অদ্ভুত লাগে। তবু বিষয়টা এমনই যে তিনি চিত্রকলায় আর কোনো বিষয়ের ধার ধারলেন না। এলোপাথারি রং আর রেখাই হলো তার ভাষা। কোনো আকৃতি, প্রকৃতির দাসত্ব তিনি করলেন না। তার ছবি বাস্তব বা অবাস্তব নয়, বিমূর্ত, এবস্ট্রাক্ট। অর্থাৎ এখানে কোনো কিছুই পরিষ্কারভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে না। এ যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতোই এক বিশৃঙ্খলতার জগৎ। তার কাছে শিল্প হলো কেবল রং-তুলি আর ক্যানভাস। শিল্প কোনো কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে না। শিল্প, বিশেষত চিত্রকলা নিজেই স্বয়ং সম্পূর্ণ। রং-তুলির নিজস্ব ভাষা নিয়েই চিত্রকলা মহিমান্বিত হলো জ্যাকসন পোলাকের ক্যানভাসে।

এখান থেকে শুরু হলো আধুনিকতার সীমানা ছাড়িয়ে উত্তরাধুনিকতার যাত্রা। জ্যাকসন পোলাকের পথ ধরেই রথকো, জন মিরো, এন্ড্রু ওয়্যারহল’র মতো শিল্পীরা পথ খুঁজে পেল। চিত্রকলাও পেল নতুন ভাষা ও মূল্য।


বিমূর্তবাদের প্রতিক্রিয়া থেকেই এন্ড্রু ওয়্যারহল আমেরিকায় সৃষ্টি করলেন পপ আর্টের।


জ্যাকসন পোলাক কিংবা জন মিরো’র চিত্রকলা দেখে অনেকেই বলতে পারেন, এ আঁকা এমন কি কঠিন? তাদের জন্য উত্তর হলো, অন্য কেউ আঁকতে পারল না কেন? আসলে এরা সবাই পথ প্রদর্শক। আপাততভাবে তাদের চিত্রকলা দেখে যে মন্তব্যই আমরা করি না কেন, মনে রাখতে হবে তারা চিত্রকলার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সংযোজন করেছেন। এ প্রসঙ্গে পোলাকের ছবি আঁকার পদ্ধতি নিয়ে একটু বলা যেতে পারে। পোলাক নিজে তার ছবি আঁকাকে বলতেন ‘অ্যাকশন পেইন্টিং’ বা ‘গতিশীল চিত্রকলা’। নিবিড়ভাবে লক্ষ করলেই দেখতে পারবেন জ্যাকসন পোলাকের চিত্রতে গতি, শক্তি আর ছন্দের দুর্দান্ত মিলন আছে। পোলাকের ছবি আঁকার ধরনটিও ভিন্ন ছিল। তিনি মেঝেতে বিশাল ক্যানভাস বিছিয়ে তার উপর রং ছড়িয়ে দিতেন। দিনের পর দিন তিনি ক্যানভাসের উপর এক রঙের উপর আরেক রং ছড়িয়ে দিতেন। একের পর এক রং আর রেখার নানা স্তর তৈরি হতো তার ছবিতে। অনেকেই তাকে ছবি আঁকতে দেখার সময় তাকে পাগল কিংবা মাতাল ভাবতেন। কিন্তু আজকের বড় বড় শিল্প সমালোচক ও গবেষকরাও জ্যাকসন পোলাকের কাজের অসাধারণ শক্তি, গতি আর ছন্দ দেখে বিস্মিত হন। সত্যিকার অর্থে অনেকেই জ্যাকসন পোলাকের মতো করে আঁকার চেষ্টা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। জ্যাকসন পোলাকের ক্যানভাসে যে জটিল গতিময়তা তা কেউ ধারণ করতে পারেন নি।

রিচার্ড টেইলর একজন শিল্পী ও পদার্থবিদ। তিনি জ্যাকসন পোলাকের কাজ নিয়ে দীর্ঘ দিন গবেষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, জ্যাকসন পোলাকের একটি চিত্রকলার যে কোনো অংশের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে এটি কত গতিশীল আর জটিল। জ্যাকসন পোলাক বিস্ময়করভাবে একই মাপে একই রকম জটিল রেখা ও তুলির টান দিতে পারতেন পুরো ক্যানভাস জুড়ে। তার ‘নাম্বার ৫’ ছবিটির যেকোনো অংশে জুম করলে মনে হবে যেন পুরো চিত্রকর্মের টান, গতি ও ছন্দ যেন ওই অংশেও সমানভাবেই আছে। রিচার্ড টেইলরও একটা পাগলামি করেছেন। তিনি পোলাকের মতো ছবি আঁকার জন্য ‘দ্য পোলোকিসার’ নামে যন্ত্রও আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু পোলাকের মতো ছবি তিনি বা তার যন্ত্র আঁকতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি  সাম্প্রতিককালে নাসার স্পেসশিপ থেকে তোলা মহাবিশ্বের ছবি দেখে চিত্রসমালোচকদের মনে হয়েছে এ যেন জ্যাকসন পোলাকের চিত্রকর্ম। আপাতভাবে পোলাকের যে চিত্রকর্মটি খুবই বিশৃঙ্খল কিছু মনে হচ্ছে তার মধ্যেও রয়েছে মহাজাগতিক শৃৃঙ্খলা! জ্যাকসন পোলাকের চিত্রকর্মকে গণিত, জ্যামিতি এবং পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়।

সে জটিল আলোচনায় না গিয়ে আমরা বরং পোলাকের চিত্রকর্মের গুরুত্ব নিয়ে আরেকটি তথ্য জেনে রাখি। আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে ফ্রান্স আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ভ্যান গগ, সেজান, তুলোজ লোত্রেক, গঁগ্যা, মঁনে, মাঁনে, দেগা, পিসেরো, মাতিস—এরা সবাই মিলে ফ্রান্সকে চিত্রকলার পুণ্যভূমিতে পরিণত করেছিল। আকস্মিক সব বদলে দিলেন পোলাক একাই। এই মার্কিন শিল্পী চিত্রকলার রাজধানীকে প্যারিস থেকে নিউইয়র্কে বদলে দিলেন। পোলাকের কাজ সারা বিশ্বে চিত্রকলায় বিমূর্ততাকে প্রতিষ্ঠিত করল। তার বিমূর্ত চিত্রকলার পথ ধরেই মিরো, রথকো’র মতো মার্কিন শিল্পীরা রং ও রেখার নতুন মূল্যায়ন সৃষ্টি করলেন। এতদিন ধরে চিত্রকলা যে আকৃতি আর মূর্ত বস্তুর পূজা করে এসেছে তা বাদ দিয়ে চিত্রকলার বিশুদ্ধ ধর্ম হয়ে উঠল রং, রেখা ও কম্পোজিশন। বিমূর্তবাদের প্রতিক্রিয়া থেকেই এন্ড্রু ওয়্যারহল আমেরিকায় সৃষ্টি করলেন পপ আর্টের। চিত্রকলায় উঠে এল স্যুপের ক্যান, কোকের বোতলে। পপুলার আর্ট বা পপ আর্ট চিত্রকলাকে ক্যানভাসের খাঁচা ছিঁড়ে আরো দূর উড়তে শেখাল। সে এক অন্য ইতিহাস। শুরুটা করেছিলাম জ্যাকসন পোলাককে দিয়ে, তাকে দিয়ে শেষ করি। কেন পোলাক এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ তিনি একাই বিশ শতকে মানুষের নন্দন ও চিত্র ভাবনাকে যতটা বদলে দিয়েছেন অন্য কোনো শিল্পীই ততটা পারেন নি। জ্যাকসন পোলাক একাই একটি বিদ্রোহ, বিপ্লব ও প্রতিবাদ এবং সম্পূর্ণতই নতুন মতবাদের জনক। তার বিমূর্তবাদের হাত ধরে এখনও বিশ্বচিত্রকলা হেঁটে যাচ্ছে।

28537407_1593486514068813_1353334971_n

মুম রহমান

জন্ম ২৭ মার্চ, ময়মনসিংহ। এমফিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :

উপন্যাস—
মায়াবি মুখোশ
কমৎকার

ছোটগল্প—
অন্ধকারের গল্পগুচ্ছ
ছোট ছোট ছোটগল্প
শতগল্প
হয়তো প্রেমের গল্প

কবিতা—
চার লাইন

চলচ্চিত্র বিষয়ক—
বিশ্বসেরা ৫০ চলচ্চিত্র
বিশ্বসেরা আরো ৫০ চলচ্চিত্র
১০ রকম ১০০ চলচ্চিত্র
বিচিত্র চলচ্চিত্র
বিশ্বসেরা চলচ্চিত্র সমগ্র
বিশ্বসেরা শত সিনেমা
অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র

নাটক—
দুইটি ব্রিটিশ নাটক
তিনটি মঞ্চ নাটক

অনুবাদ—
সাদাকো ও সহস্র সারস
বব ডিলান গীতিকা
কাফকা : অণুগল্প
সাফোর কবিতা

শিশুতোষ—
মজার প্রাণীকূল

চিত্রকলা বিষয়ক—
বেদনার রং তুলিতে একটি জীবন

প্রবন্ধ—
বই কেনা, বই পড়া
বই বিশ্ব
কিতাবি কথা

অন্যান্য—
তিতা কথা

সম্পাদনা—
অনির্ণীত হুমায়ূন

ই-মেইল : moomrahaman@gmail.com