হোম চলচ্চিত্র সিক্রেট সুপারস্টার : বলিউডের পরিবার ও পুরুষতন্ত্রের পরে

সিক্রেট সুপারস্টার : বলিউডের পরিবার ও পুরুষতন্ত্রের পরে

সিক্রেট সুপারস্টার : বলিউডের পরিবার ও পুরুষতন্ত্রের পরে
370
0

বলিউডের সিনেমাগুলোতে সবসময় ভারতীয় ধরনের পরিবার ও পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুদ্ধ দেখা যায়। পুঁজির বিকাশের পর্বান্তরে পরিবার এখন বিশ্বব্যাপী বিপন্ন। পেশার জন্য বা পেশার খোঁজে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে কর্মীবাহিনী। ব্যবসার স্বার্থে মানুষকে একা নিঃসঙ্গ করে ফেলছে কর্পোরেটোক্রেসি। যেন সে পণ্য নিয়ে বাঁচে, পণ্যই এখন তার পরিবার। বলিউডের সুদীর্ঘ ইতিহাসে অনেক নায়ক-নায়িকাকেই দেখা গেছে তারা পরিবার প্রথা ও পুরুষতন্ত্র মানে না। কিন্তু তারা দিল্লিহিল্লি ঘুরে, লন্ডন, বন, আমেরিকা ঘুরে ঠিকই পরম্পরা ধরে রাখা বিশাল পরিবারের কর্তা আর ভারতীয় ধরনের পরিবারের কাছে ফিরে এসে কনফেশন করে। বড় বড় বাজেটের অনেক ছবির মধ্যেই সেটা দেখা গেছে। ‘কাভি খুশি গাভি গাম’ নামের ব্লকবাস্টার সিনেমাটার কথাই ধরা যাক। নিচু ঘরের মেয়েকে বিয়ে করার দায়ে সামন্তীয় পরিবার থেকে স্বেচ্চানির্বাসনে যায় পরিবারের বড় ছেলে। ছোটছেলে বড় হয়ে বড় ভাইকে খুঁজে নিয়ে আসে পরিবারের কাছে। অনেক কান্নাকাটির পর আবার তারা ভারতীয় ধরনের পরিবারের সাথে মিলিত হয়। আধুনিক হওয়া ভারতীয়দের চোখে পাপ। শাড়ি ছেড়ে স্কার্ট পরা, ধুতি পাঞ্চাবি ছেড়ে কোটটাই পরাও প্রথার বিরোধীতা করা। নায়ক বা নায়িকা প্রথমে পাশ্চাত্য ধারার জীবন যাপন করবে, এরপর শেষের দিকে বুঝবে ভারতীয় পুরুষতান্ত্রিক প্রথাময় পরিবারতন্ত্রই চিরসত্য। এটা আসলে পরিচালক বা প্রযোজকদের দায় ও মূর্খতা। এরা রীতিমতো হিপোক্রেট। নায়িকা বা মেয়েদের স্বল্পবসনা করে তাদের বৃষ্টিতে ভিজিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্র সৈকতে তাদের স্বল্পবসনা করে অঙ্গ প্রদর্শন করে দর্শকদের মনে কামচেতনার জাগিয়ে তারা পরিবার প্রথা ও পুরুষতন্ত্রের জয়গান গায় সিনেমায়। এটাই হচ্ছে বলিউডের মূলধারা।

অন্য একটা প্যারালাল ধারাও গুটি গুটি পায় এগুচ্ছে বলিউডে বা ভারতীয় সিনেমায়। ‘সিক্রেট সুপারস্টার’ সেই ঘরানার ছবি। এই ছবি কি ব্যবসা সফল ছবি? এটা কি সুপারডুপার হিট সিনেমা? ইউকিপিডিয়ার হিসাব মতে এই সিনেমার বাজেট ছিল ১৫ কোটি রুপি। এটা আয় করেছে ৯৭৭ কোটি রুপি। হিসাব এধার-ওধার হতে পারে। যাই হোক এই ছবিতে যৌনতা নাই, নারীর স্তন আর ঊরু দেখানো হয় নাই। মসলা সিনেমার মতো মারামারিও নাই। নাই থ্রিল বা অ্যাকশন। এক আমির খানের নন গ্ল্যামার অ্যাক্টিং ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠিত অ্যাক্টর বা অ্যাক্ট্রেসও নাই। মসলা ছবির কোনো তরিকাই মানা হয় নাই এই ছবিতে। তাহলে?


36857633_1888690044503084_3641623034210549760_n


বহুদিন পর ছবি দেখা। এই ছবি নিতান্ত হেঁয়ালি করে ফেলে রাখা। দেখতে বসার পর এই ছবি দর্শকের মনে প্রশ্নের পর প্রশ্নের জন্ম দেয়। এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের একটা মেয়ের গান গাইতে চাওয়ার স্বপ্ন ও সেই স্বপ্নের হাত ধরে প্রথাগত পরিবার পুরুষতন্ত্র ও ভারতীয় ধরনের পরিবার থেকে মা-মেয়ের বেরিয়ে আসার গল্প। বলিউডের জন্য এটা নতুন গল্প। একটি পুরুষপ্রধান মধ্যবিত্ত ভারতীয় মুসলিম পরিবার। যে লোকটি ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক একটা পরিবার চালায়। যে নারী অর্থাৎ স্ত্রী আর কন্যাকে মানুষই মনে করে না। জাহিলিয়াত যুগের কথা মনে করায় যখন, শুনি এই পরিবারের কর্তা বড়টা মেয়ে হবার কারণে তাকে জন্মের সময় হত্যা করতে চেয়েছিল। আর তাই মা পালিয়ে গিয়ে নবজাতক মেয়েকে বাঁচিয়েছিল। বড় মেয়েকে নিজের মতো করে বড় করে তুলেছে এই মা-ই। কারণ এই মা যখন মেয়ে ছিল সে কখনো তার কোনো স্বপ্নস্বাদ পূর্ণ করতে পারে নাই। তাই স্বামীর মানিব্যাগ থেকে টাকা সরিয়ে মেয়েকে সে গিটার কিনে দেয়। মেয়ে গান গাইতে চায়। কিন্তু বাবার ভয়, পুরুষ ও ধর্মের ভয় তাকে ও তার মাকে তটস্থ করে রাখে।


সিনেমা খুবই শক্তিশালী একটা মিডিয়া। খুব সন্তর্পণে মানুষের মনোজগৎ দখল করে। 


শেষে তারা আইডিয়া বের করে। মায়ের সোনার হার বিক্রি করে কেনা ল্যাপটপে মানে ইউটিউবে বোরকা পরে গিটার বাজিয়ে গান ছেড়ে দেয়। এভাবেই এগোয় কাহিনি। কিন্তু একটা নিমন্ত্রণে যাবার সময় স্ত্রীর গলায় হার না দেখে স্বামী সবকিছুর সূত্র আবিষ্কার করে ফেলে। তারপর সে ইসলামি ধরনে স্বামীর অমতে স্বামীর অপছন্দের কাজ করার জন্য স্ত্রীকে প্রহার করে এবং নাপাক ল্যাপটপটা মেয়েকে দিয়ে ওপর থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়। স্ত্রী সবই নীরবে সহ্য করে। কারণ স্বামীর পায়ের নিচেই যে তার বেহেস্ত। এটাই সনাতন পরিবার প্রথা। কিন্তু তারুণ্য? যারা বিজ্ঞানের ছোঁয়া পেয়েছে তারা ঠিক হিসাব মিলাতে পারে না। প্রথা বা ধর্মকে তাদের বড্ড সেকেলে ও কমপ্লেক্সেবল মনে হয়। সে মেয়েটি হাইস্কুলে পড়ে বা কলেজে পড়ে। সে সংগীতকে ভালোবাসে, গিটার বাজায়, যার কণ্ঠ ভালো। যে কিনা ইন্টারনেটের ব্যবহার জানে। তার মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন পরিবার থেকে, প্রথা থেকে, ধর্মের নাগপাশ থেকে।

কিন্তু পরিবারের কর্তা আরও রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। এই ছোটমেয়েটির বিয়ে ঠিক করে ফেলে সে সৌদি আরবে। এবং সপরিবারে সে সৌদি আরবে চলে যেতে চায়। মেয়েটির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মাও যেতে চায় না। ইতিমধ্যে ইউটিউবে প্রকাশিত ভিডিওর সাহায্যে সে সিক্রেট সুপারস্টার পরিচিতি পায়। সে-সূত্রে সে যুক্ত হয় মিউজিক সুপারস্টার শক্তি কুমারের সাথে। সে শক্তি কুমারের জন্য হিন্দি সিনেমায় গান গায় এবং মাত করে।

ডিভোর্স এখন কমন বিষয়। মেয়েটি স্কুলে কলেজে অন্য অনেক মেয়ের মায়ের মতো বাবাকে ডিভোর্স করার পরামর্শ দেয়। সে শক্তিকুমারের সহায়তায় ল’ইয়ারের সাথে কথা বলে ফাইল তৈরি করে নিয়ে আসে। মেয়েটিকে দিয়ে শক্তি কুমার যে গান করায় সেটা বর্ষসেরা পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয় ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডের জন্য। তবুও পরিবারের কর্তার ইচ্ছায় তারা সৌদি যাত্রা করে। যেদিন তারা সপরিবারে সৌদি চলে যাবে সেদিনই ফিল্মফেয়ার পুরস্কার দেয়া হবে। এয়ারপোর্টে গিটার নিয়ে যাওয়া নিয়ে গোল বাধে। পরিবারের কর্তার কথা হচ্ছে সৌদি আরব পবিত্র জায়গা ওখানে গিটার-ফিটার এগুলো নেওয়া যাবে না। গিটারটা সে এয়ারপোর্টে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আসে। এরপরই সনাতন পরিবারের কর্ত্রী ঘুরে দাঁড়ায়। সে ব্যাগ থেকে ল’ইয়ারের  ফাইল বের করে সিগনেচার করে কর্তাকে পড়তে দেয়। কর্তা ক্ষেপে গিয়ে তাকে মারতে আসে। মহিলা স্বামীকে হাত দিয়ে থামায়। ডিভোর্স আর পুলিশে দেওয়া, সিসিটিভির ফুটেজে মারামরি ইউটিউবে ছেড়ে তার বিচার করার ভয় দেখায়। মহিলা মেয়ে আর ছেলেকে নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আসে এবং ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে যোগ দেয়।


maxresdefault


সিনেমার কাহিনিটা খুবই সাদামাটা। এই ধরনের কাহিনি সব ধর্মেই সব প্রথাতে সব পরিবারেই বিদ্যমান। বিজ্ঞান এগিয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা বেড়েছে। মানুষকে তার সব ধরনের স্বপ্ন পূরণ করতে এখন খুব বেগ পেতে হচ্ছে না। এখন প্রগতি এগিয়ে যাওয়া স্বপ্ন বাস্তবায়নের সাথে বা নতুন নতুন তৈরি হওয়া পেশার সাথে পুরানো ধ্যানধারণা ধর্মীয় অনুশাসন প্রাচীন প্রথা ইত্যাদি আর একসাথে চলতে পারছে না। এটা তারই সংকেত। প্রায় পরিবারই এখন এই সমস্যার মুখোমুখি। পরিবার, ধর্ম প্রথা তাদের আকর্ষণ হারিয়ে এখন টিকে থাকার চেষ্টা করছে হম্বিতম্বির মাধ্যমে। আমাদের না মানলে মেরে ফেলব টাইপের হুমকি ধামকির মাধ্যমে। এসব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে আবার পুরুষতন্ত্র। কারণ নারীরাও সমানে সমানে এগিয়ে এলে তাদের আর কতৃত্ব থাকছে না। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জে পুরুষ বা ধর্ম বা প্রথা তো টিকবে না। বিজ্ঞান সবাইকে সমানভাবে এগিয়ে যাবার বিভিন্ন সুযোগ করে দিয়েছে। ভারতীয় সিনেমাতেও এই পদচারণা নতুন। যেন সিক্রেট সুপারস্টারের ভেতর দিয়ে এখানেও পুরুষতন্ত্র ও পরিবার তন্ত্রের পতনের পথ সূচিত হলো। সে ক্ষেত্রে সিক্রেট সুপারস্টার নতুন ঘরানার সিনেমা। অভিনেতা আমির খান খুব বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ। এর আগে তিনি পিকু ছবিতে অভিনয় করেছেন। পিকু ছবিটিও নতুন করে ভাবতে শেখায় দর্শককে। গতানুগতিক ভারতীয় সিনেমা নয় পিকুও। এই সিনেমাটার প্রযোজকও আমির খান। সিনেমা খুবই শক্তিশালী একটা মিডিয়া। খুব সন্তর্পণে মানুষের মনোজগৎ দখল করে। সিক্রেট সুপারস্টারের মতো সিনেমাগুলো বহুল প্রচার ও প্রসার মানুষের মনে স্বপ্ন দেখার ও তা বাস্তবায়নের প্রথাগত, পারিবারিক, পুরুষতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতাগুলোকে উপেক্ষা বা যুদ্ধে পরাজিত করতে সাহস জোগাবে এমন আশা করা অমূলক নয়।

জাহেদ সরওয়ার

জন্ম ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৭৬; মহেশখালী দ্বীপে। স্নাতকোত্তর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ফ্রিল্যান্সার।

প্রকাশিত বই—

এই মিছা কবি জীবন [কবিতা]
আততায়ী একটি কবর [কবিতা]
বিকালের দাসবাজার [কবিতা]
আরো একটি কবিতা শোনাও কবি [কবিতা]
সূর্যের নিচে শুধু ভয় [কবিতা]
পায়ুবাসনার জনগণ [উপন্যাস]
দস্তইয়েভস্কির বই ও কোটিপতির সকাল [গল্প]
সম্পর্কের সন্ত্রাস ও অন্যান্য গল্প [গল্প]
রাজ্য ও সাম্রাজ্য [রাজ্যচিন্তার কারখানা-১]
সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ [রাজ্যচিন্তার কারখানা-২]
কবিতা পড়ুয়ার নোটবই [কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধের বই] ফিদেল কাস্ত্রো [জীবনী গ্রন্থ]


ই-মেইল : sjahedpoet@gmail.com