হোম চলচ্চিত্র মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা
366
0

না খেয়ে তিনজন তিনটে কুণ্ডলী পাকিয়ে
ঘুমিয়ে পড়েছে।
আকাশ থেকে প্রজাপতির মনে হল তিনটে
নতুন গোবরের ঢিবি
গিয়ে বসল হয়, আরো অনেক প্রজাপতিদের :
ডেকে আনি তবে।

তিনটি বালক একটা প্রজাপতির পেছনে দু ঘণ্টা কাটিয়ে
ঘুমিয়ে পড়েছে। ধন্যবাদ, গরিবরা এখনো
প্রজাপতি ধরে খায় না।

তিনজন সেদিন দুপুরে একটাই স্বপ্ন দেখল
চোখে রোদচশমা, সারা গায়ে ঝুলছে
টেলিফোন, এক মাফিয়া যুবক :
তার হাতে একটা সোনার থালা
না, ভাত না, একথালা প্রজাপতি
সে বলছে, নে, খা।
[সুবোধ সরকার : গরিবের জন্য প্রজাপতি]

মানুষ বা যে কোনো প্রাণীরচোখ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে বিস্ময়ের, তা বলার দরকার পড়ে না। মানুষের দুটো চোখ নিয়ে অসামান্য যত গান, কবিতা, গদ্য ও পদ্যের পঙ্‌ক্তি রচিত হয়েছে। এ রচনা চলমান রয়েছে। কত ভাস্কর্য, শিল্পকর্ম নির্মিত হয়েছে, এর শেষ নেই। চমৎকার সব উপমার শেষ নেই মানুষের চোখের লাবণ্যে। ফলে ওই ব্যক্তির চোখ সুন্দর বললেই আবেগ শেষ হয় না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, চোখ ব্যতীত এ পৃথিবীর সৌন্দর্য আমরা দেখতেই পেতাম না। না দেখেই চলে যেতে হতো এ পৃথিবী থেকে। চোখের যে প্রয়োজনীয়তা, তা কোনো কিছু দিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয় না। মানুষ বা কোনো কোনো প্রাণীর চোখের মাঝে সত্যি এক অপার মাদকতা রয়েছে। অসামান্য সম্মোহন শক্তি এ চোখের মাঝে। তা ছাড়াও মানুষ কথা বলার সাথে সাথে কত কিছু বোঝায় চোখের ভাষায়। হয়তো অন্য প্রাণীও।


মালয়েশিয়ানরা বাংলাদেশিদের পছন্দ করে না।


বাংসার ভিলেজে একজোড়া চোখ দৃষ্টিতে এসেছিল। কুয়ালালামপুর পৌঁছে প্রথম যেদিন বাংসার ভিলেজ-এ যাই, সেদিন শুধু শপিংমলটি দেখে এসেছিলাম। একজোড়া স্থির চোখ দেখেছি, দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ওই ব্যক্তিটি তাকিয়েছিল আমাদের দিকে। আরিফ এ দৃশ্য খেয়াল করেছে কী না জানি না। আমার ধারণা সে বুঝে নি বিষয়টি। তবে আমি নিশ্চিত এটা কোনো প্রেমের চাহনি নয়, বা ভালোলাগারও নয়। এটা ঠিক একটি উদাসীন চোখেরই অভিব্যক্তি মাত্র। সারাদিন একই ঘরে, একই স্থানে দাঁড়ানো, এবং এ নির্দিষ্ট সময় কাটানোতে বিরক্ত হয়ে এসব কর্মব্যস্ত মানুষেকে এভাবে লক্ষ্যহীন দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাতে হয়। ফলে, তার দৃষ্টি এমন হওয়াই স্বাভাবিক। আমরা যারা সামান্য সময়ের জন্য শপিং করতে যাই, হয়তো মুহূর্তের এ চাহনিতে আপ্লুত হই বা আনন্দ পেয়ে থাকি। এতে দোকানদারের লাভ হয়, সুন্দর চোখের মালিক ওই ব্যক্তির কিছু হয় না। বাংসার ভিলেজে লয়ফার মালয়েশিয়া [loyfar malaysia] নামে গিফট আইটেম ও শোপিসের একটি চমৎকার একটি দোকানে কাজ করা সুন্দর চোখের অধিকারী এক তরুণীর কথা বলছিলাম। আরিফ ও আমি প্রথম যেদিন গেছি, সেদিন লয়ফার মালয়েশিয়া নামের এ দোকানের দিকে বাইরে থেকে তাকিয়েছিলাম। মূলত, এর কারুকাজ করা শোপিসগুলো আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছে। আর সময়ও ছিল না খুব নিবিড়ভাবে দেখার। আজ আবারও বইয়ের সন্ধানে বাংসার ভিলেজে আমি উপস্থিত। কোথায় আছে বইয়ের হদিস, তা তো জানি না। না জানার ফলেই এত খোঁজাখুঁজি। বইয়ের দোকানগুলো তালাশ শেষে আরও কিছু পণ্যের দোকান ঘুরে দেখছিলাম। কয়েকবার চক্কর দিয়ে ভাবছি যে, আজ ওই লয়ফার ঘুরে যাব। এখানে এত মন কাড়া দ্রব্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। সামনে দিয়ে একবার যাবার সময় দু-টি মেয়ের মধ্যে একটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে।/ অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে॥/ ধরায় যখন দাও না ধরা, হৃদয় তখন তোমায় ভরা,/ এখন তোমার আপন আলোয় তোমায় চাহি রে॥/ তোমায় নিয়ে খেলেছিলেম খেলার ঘরেতে। খেলার পুতুল ভেঙে গেছে প্রলয় ঝড়েতে।/ থাক্‌ তবে সেই কেবল খেলা,  হোক-না এখন প্রাণের মেলা—/ তারের বীণা ভাঙল, হৃদয়-বীণায় গাহি রে॥’

82422579_2233880713584680_8166890273373159424_n
লয়ফার পণ্য : ১

82390683_2548208862170037_632788625620205568_n
লয়ফার পণ্য : ২

আমি নিজে অবাকই হলাম। জানি না কী কারণে সে হেসেছিল। এটি ব্যবসার সাধারণ এক পলিসি হতে পারে। আমি থেমে এগিয়ে যাই, ও দোকানে প্রবেশ করি। ঘুরে ঘুরে নানা বিষয় দেখছিলাম। অল্প সময়ের মধ্যে তারা আমার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে নিল। তারা জানতে চাইল—আমি কোথা হতে এসেছি? কোথায় কী কাজ করি? উত্তর দিলাম, কিন্তু আমি আমার পেশা না বলে বললাম—দেশে আমি এ ধরনের শোপিসের ব্যবসা করি। আমার একটি দোকানও আছে। একজন একটি ডায়েরি এগিয়ে দিল আমার দিকে এবং বলল—ওখানে তোমার নাম ঠিকানা, ই-মেইল লিখো। যখনই নতুন কোনো পণ্য তৈরি হয়ে আসবে, তখন আমরা তোমার ই-মেইলে পণ্যের ছবি ও বিবরণ জানিয়ে দিব। আমি আমার নাম, ঠিকানা ও ই-মেইল লিখে দিলাম। জানলাম, তারা মালিক নয়, দুজনেই ব্রিকয়কর্মী হিসেবে এখানে কাজ করে। আরও কিছু কথা হলো। ওদের মাঝে ওই সুন্দর চোখধারী মেয়েটি তাকাচ্ছিল আর হাসছিল; আর আছে তার উদাস দৃষ্টি।  সে নিজেই এক শোপিস। অসামান্য সৌন্দর্যময় চোখ তার। আমি কি কিছু বলব কি না তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমিও পণ্য দেখার ছলে তাকে দেখছিলাম। বিশেষত তার চোখজোড়াতেই আমার দৃষ্টি। জেনে নিলাম সে ভাষা ও জাতিতে মালয়েশিয়ান। আমার হাতে সময় নেই। ফলে, বিদায় নিয়ে চলে আসি। দেশে ফিরে আসার পর এখন পর্যন্ত লয়ফার থেকে কোনো পণ্যের মেইল আমার কাছে আসে নি।

বাংসার থেকে বের হওয়ার সময় ওই দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। চোখে চোখে দৃষ্টি পড়ে, মেয়েটি হাত নেড়ে আবারও বিদায় জানিয়েছিল। চোখের অনন্য স্মৃতি নিয়ে ফিরে আসি। বাংসার ভিলেজ থেকে বের হওয়ার সময় ফোন দেই শিহাবকে। শিহাবের প্রসঙ্গ আগে বলেছিলাম এ জন্য এখন আর বলার প্রয়োজন পড়ে না। তাকে জানাই যে, আমি হানিফার দিকে আসব, আপনি ওখানে থাকবেন কি না। সে বলল—আছি, আসেন। আবার এলাম হানিফা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সামনে। ওখানে পেয়ে যাই শিহাবকে, যথারীতি সে মোবাইল সিম বিক্রি করছে। তার কাছে জানতে চাই সে রোজা রেখেছে কি না। শিহাব কিছু দ্বিধাবোধ করছিল, সে আমাকে আসল কথা বলবে কি না এই ভেবে।


শ্রমিক বিষয়ে রক্ষণশীল নীতির কারণে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, কুয়েত ও মালয়েশিয়াতে শ্রমবাজার সংকোচিত হয়ে আসে।


যা হোক অবশেষে বলল—না সে আজ রোজা রাখতে পারে নি। তারপর বললাম—তা হলে আমরা আজ একসাথে ‍দুপুরের খাবার খাব—ঠিক আছে। এর মাঝে আমরা কিছু কেনাকাটা সেরে নিলাম আর কথা বলতে বলতে মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে কিছু তথ্য পেয়ে যাই। আমরা হানিফা থেকে সামান্য দূরে একটি মাদরাজি রোস্তোরাঁ বেটল লিফ-এ যাই খাবার খেতে। রেস্তোরাঁয় প্রথমে ভিড় ছিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। তারপর বসার জায়গা তৈরি হলে ওখানেই তৃপ্তির সাথে খাবার গ্রহণ করি। অসাধারণ পাপড় ভাজা আর বিভিন্ন ধরনের চাটনি ও সবজি। এর মাঝে রুটি, ভাত সবই দেয়। ইচ্ছেমতো পেট ভরে খাওয়া যায়। আর সত্যি কথা কী, এত উপাদান থাকে, এমনিতেই বেশি খাওয়ার রুচি ভেড়ে যায়। ভুঁড়িভোজন ইচ্ছে না হলেও রুচিতে পরিমিত ভোজন সম্পন্ন করা যায়, এটাই তৃপ্তি। এ ধরনের দক্ষিণ ভারতের খাবার আমার খুব পছন্দ। আবার সেই কলা পাতায় পরিবেশিত খাবার। খুব তৃপ্তি পেলাম এ খাবার খেয়ে।

81659439_762217360921814_8883399953464950784_n
বেটল লিফের দুপুরের খাবার

খাবার খেতে খেতে শিহাব বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনকে কষ্টের কথা বিনিময় করে। আমার পক্ষে সেগুলো বলা সম্ভব নয়। কারণ, এর সাথে কূটনীতি, দু-দেশের পররাষ্ট্রনীতি, ব্যবসার সম্পর্ক জড়িত। আলোর নিচে আঁধার এরকম একটি বিষয় সেখানে। শিহাবের একটি বাক্য আমাকে খুব যন্ত্রণাকাতর করে তোলে। সে যখন বলে—‘মালয়েশিয়ানরা বাংলাদেশিদের পছন্দ করে না।’ তখন আরিফের একটি কথার সাথে মিলিয়ে দেখি। আরিফ আমাকে জানিয়েছিল—বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বিদ্বান, পণ্ডিত, ছাত্র ও শ্রমিককে তারা এক নিক্তিতে মূল্যায়ন করে। লিগ্যাল মাইগ্রেশন হলেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের পুলিশ যেখানে সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করে ও অপমান করে। এসব কষ্ট সহ্য করেও অনেকে অনেকদিন থেকে মালয়েশিয়ায় কাজ করে যাচ্ছেন শুধু বাড়িতে কিছু বাড়তি টাকা পাঠানো ও সচ্ছল জীবনের টানে।

রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে আবার আমরা হানিফার সামনে চলে আসি। আমি যখন বলি—‘আজ আমার শেষ দিন, আমার কাজ না থাকলে আরও কিছুদিন থেকে আসতাম। মালয়েশিয়া ভ্রমণ, থাকা, খাওয়া আমার ভালো লেগেছে। আজ তো আমি দেশে ফিরে যাব।’  কথাগুলো বলার সময় লক্ষ করি শিহাবের চোখে মুখে বিচ্ছেদের প্রতিফলন। বুঝলাম তার মন খারাপ হয়েছে। কারণ, অল্প সময়ে আমরা কাছাকাছি গিয়েছিলাম। অনেকেই এভাবে বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে যায় কিন্তু কারও সাথেই তেমন কোনো আলাপ হয় না। শিহাব দেশের একজনকে পেয়েছে, আন্তরিকতার সাথে কথা হয়েছে, গল্প হয়েছে; স্বাভাবিকভাবেই তার মন বিষণ্ন হবেই।

বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ কর্মী বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তারা শ্রম ও কষ্টের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন। তা আমাদের রাজস্ব খাতকে শক্তিশালী করছে। এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। বিদেশে যারা কঠোর শ্রম দিয়ে আয় করে দেশে পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে খুবই সচেতন। সরকার বিভিন্ন নীতিমালাও তৈরি করেছে। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে আমাদের দেশের শ্রমী ও সাধারণ মানুষ মাঝে মাঝে অপমানের সম্মুখিন হচ্ছেন। অধিকাংশ মানুষই আইন, নীতিমালার খোঁজ খবর রাখেন না। এ ছাড়া সচেতন থেকেও সরকারকে ফাঁকি দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন অনেকে বা যেতে আগ্রহী। অবশেষে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হচ্ছে এবং বিদেশে আমাদের দেশের ভাবমূর্তিও বজায় থাকছে না। দায় টানতে হচ্ছে সরকারের। ফলে, যারা আইনানুগভাবে বিদেশ যাচ্ছেন, তারাও বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন বিদেশের মাটিতে।

বিদেশে যখনই মন্দা দেখা দিচ্ছে, তখনই এর প্রভাব পড়ছে দেশে। কারণ, স্বাভাবিক কারণেই বিদেশ থেকে পরিমাণ মতো মুদ্রা আসা কমে যায়। এগুলো বিচেনায় অবশ্যই রাখা প্রয়োজন আমাদের। ২০০৮ সালের পর মন্দা ও দক্ষতার প্রশ্নে বাংলাদেশের জনগণের বৈদেশিক কর্মক্ষেত্র সংকোচিত হয়েছে। বিদেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের যাবার পরিমাণ কমে যায়। একই সাথে বাংলাদেশ শ্রমিক বিষয়ে রক্ষণশীল নীতির কারণে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, কুয়েত ও মালয়েশিয়াতে শ্রমবাজার সংকোচিত হয়ে আসে। এসব দেশে অভিবাসী আইনেও পরিবর্তন আনা হয়। এর ফলে অনেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। আবার অনেককেই বিভিন্ন জটিলতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ২০০৯ সালের পর বিশ্বমন্দার কারণে ভিসা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শ্রমিককে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরত আসতে হয়। শিহাব ও অন্যদের কাছ থেকে জানা যায় যে, অনেককে তারা জোর করে বের করে দিয়েছে।

মালয়েশিয়াতে আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজার তৈরি হয় ১৯৯২ সালে। তবে তারা নানা সময়ে শ্রমবাজার হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছে কয়েকবার। অবশেষে ২০১৮ সালে আবার। দশ লাখেরও বেশি লোক মালয়েশিয়াতে বিভিন্ন কাজ করছে। ইতোমধ্যে এর মধ্যে ৪ লাখ লোককে বিধিভুক্ত করে নিয়েছে। বাকিদের তারা আইনগত কাজ করার অধিকার দিতে অস্বীকার করেছে। এর মধ্যে কয়েক হাজার শ্রমিককে মালয়েশিয়ার কারাগারে বিভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার অস্থির শ্রমবাজার প্রসঙ্গে ডেইলি স্টার, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক মানবজমিনসহ বিভিন্ন কাগজে প্রতিবেদন পড়েছি। এখনও ছাপা হচ্ছে। সেসব সংবাদে শ্রমিকদের কষ্টের কথা কিছুটা হলেও আমরা জানতে পারি। সাক্ষাতে শিহাব বলল সেসব বিবরণ। ফিরে এসে কয়েকদিন পর এ বিষয়ে যখন সাধারণ ভ্রমণকথা লিখছি, তখন ‘মালয়েশিয়ার জঙ্গলে ১৬ বাংলাদেশির দুর্বিষহ জীবন’ শিরোনামার একটি প্রতিবেদন পড়ি দৈনিক মানবজমিন [১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯] পত্রিকায়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়—‘উন্নত জীবনের আশায় মালয়েশিয়া পাড়ি দেয়া বাংলাদেশিরা আতঙ্কিত জীবন কাটাচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেকের কাজের পারমিট বাতিল করে দেয়া হয়েছে।’ এ প্রতিবেদনে মালয়েশিয়ার পত্রিকা মালয়েশিয়ানিকি ও মালয় মেইলের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় যে, এ শ্রমিকরা মূলত মেসের অধিবাসী। তারা চাকরিচ্যুত হলে নিরাপত্তার কারণে আশ্রয় নিয়েছেন জঙ্গলে। আরও বলা হয়, ‘মালয়েশিয়ায় গত এক বছরে প্রতিদিন গড়ে দুজন করে বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয়েছে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়ে। তাদের বেশিরভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩২ বছরের মধ্যে। সবমিলিয়ে গত এক বছরে এরকম মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৭৩৬ জন শ্রমিকের। আর ২০০৫ সাল এখন পর্যন্ত মারা গেছেন মোট ৪ হাজার ৩২১জন।’ শিহাবের কথায় বুঝে নিয়েছিলাম যে অনেক শ্রমিক মালয়েশিয়াতে নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছেন। কেন হচ্ছেন, তা জানতে চেয়েছিলাম শিহাবের কাছে। কেননা, যারা বিধিগতভাবে সেখানে বাস করছে, তাদের সমস্যা হচ্ছে না। কারণ, সেখানে ১৭-১৮ বছর ধরে কাজ করছেন এমন মানুষও আমি পেয়েছি। আমরা যতটুকু জানি দুই দেশের সরকারের মধ্যে চুক্তির বোঝাপড়ার মাধ্যমেই এসব শ্রমিক সেখানে যাতায়াতের সুযোগ পান।

আমি যখন লেখাটা তৈরি করছি তখন কয়েকজন আমাকে বলেছিলেন যে, আমি যেন মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক ভাইবোনদের নিয়ে কিছু লিখি। আসলে এ বিষয়ে আমার তেমন কিছু জানা নেই। কিন্তু শিহাবের কথায় মনে হলো এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই কোনো ঝামেলা আছে। যে কারণেই মালয়েশিয়া সরকার কঠোর হতে বাধ্য হয়েছে। নিশ্চয়ই মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে গলদ আছে। বিভিন্ন পর্যায়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে আবার এসব সমস্যা নিয়ে মাঝে মাঝে দুই দেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও হয়েছে। এক্ষেত্রে মাহাথির মোহাম্মদ জোর দিয়ে চুক্তির শর্ত ও বিধি বিধান মেনে চলার ইংগিত দিয়েছেন। এখানে প্রশ্ন হতেই পারে—তাহলে আমাদের দেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো আইন বা শর্তসমমূহ না মেনেই লোক পাঠাচ্ছে? লক্ষণীয়, বিভিন্ন সময় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে মালয়েশিয়ান সরকারের কথায় তা-ই মনে হলো। বিভিন্ন অভিযোগ তুলে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে শ্রম, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মন্ত্রী মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশের শ্রম বাজারের ওপর নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে। পর্বে পর্বে মালয়েশিয়া সরকার কিছু অভিযোগও উত্থাপন করেছে। সেগুলো বেশিরভাগই রিক্রুটিং এজেন্সিকেন্দ্রিক। তবে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মাননীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী ও মালয়েশিয়া সরকারের প্রতিনিধিদলের মধ্যে বৈঠকের পর সেদেশের সরকার আবার শ্রমবাজার খুলে দিতে রাজি হয়েছে। সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও সেখানে ব্যাপক শিল্পায়নের কাজে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন।

বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থার বরাতে জানা যায় যে, বিশেষত বাংলাদেশ ও নেপালের শ্রমিকদের সাথে মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে খারাপ আচরণ করে থাকে। অনেক সময় জোর জবরদস্তির মাধ্যমে অপছন্দের কাজ কারনো হয়। না মানলে নির্যাতন করা হয়। শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত ৮ ঘণ্টারও অধিক কাজ করতে হয়। এমনকি অনেকেই যৌন নির্যাতনেরও শিকার হয়েছে। অনেক সময় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করতে বাধ্য করানো হয়। এমনকি অপরাধের ক্ষেত্রে ঢাল হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।


মালয়েশিয়ার ভেতরের দুনিয়াতে কী আছে জানি না, কিন্তু বহির্জগতে ভালোলাগার সবই রয়েছে।


আরও কিছুক্ষণ হানিফার সামনে ঘোরাঘুরির পর ফিরে এলাম হোটেলে। ওখানে আমার লাগেজ, জিনিসিপত্র রাখা ছিল। হোটেল আনকাসা ইন্টারন্যাশনাল-এ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। হোটেল ম্যানেজমেন্টকে বলা ছিল আমি যে আজ বিদায় নেব। হোটেল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আমাকে একটি গাড়ি ম্যানেজ করে দেয়। পাদু সেন্ট্রাল থেকে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অনেক দূর হলেও কখন যে এসে পৌঁছে যাই তা টের পাই নি। কারণ, গাড়ির ড্রাইভার ছিল বাচাল ও চলমান বিনোদন। বিমানবন্দরে না পৌঁছা পর্যন্ত তার গল্প ও অনভ্যস্ত কথা আমাকে শুনতে হয়েছে। একই সাথে এত গল্প আমার পছন্দ হচ্ছে না আবার তার গল্প শুনতে ইচ্ছে করছে। ফলে, এ জার্নির সময়টুকু বলা যায় আনন্দেই অতিবাহিত হয়েছে। মালয়ি এ ড্রাইভার আমার সাথে তার স্ত্রী, সন্তান ও সামাজিক বিষয় আশয় নিয়ে গল্প করে। সে জানায় তার মাত্র এক স্ত্রী নিয়ে সে খুব খুশি। আমি তার কাছে জানতে চাই এখানে বহুবিবাহের হার কেমন। সে বলল—তা কম। আমি জিজ্ঞাসা করি, আর বিয়ে করতে চাও কি না। সে উত্তরে জানায়—না। তার এখন সুখী জীবন, বর্তমান স্ত্রী নিয়েই সে তৃপ্ত। কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে প্রবেশ করে চেকইনের অপেক্ষা করতে হয়। কারণ, আমার যাত্রার সময় ছিল অনেক পরে। সময়ের অনেক আগে আমি চলে এসেছি এখানে। তবে সময় ভালোই কেটেছে। সংক্ষিপ্ত হলেও অসাধারণ এক ভ্রমণ আর কিছু স্মৃতি নিয়ে বিমানে উড়াল দিতে হলো। যদিও আমার দেশ নয়, আপনজন বলতে কেউ নেই, তারপরও আমার ভাবনায় কেন যেন এক বিষণ্নতা ভর করেছিল ফিরে আসার সময়। আরও কিছুদিন থাকতে ইচ্ছে হয়েছে। প্রকৃতি, চমৎকার আবহাওয়া, সুন্দর পরিবেশ থেকে আসতে ইচ্ছে করছিল না। মালয়েশিয়ার ভেতরের দুনিয়াতে কী আছে জানি না, কিন্তু বহির্জগতে ভালোলাগার সবই রয়েছে। এ জন্যে এ ক-দিনে মালয়েশিয়ার প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল। আবার মনে হলো, কবি জীবনানন্দে দাশের কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা :

আজকে অনেকদিনের পরে আমি বিকেলবেলায়,
তোমাকে পেলাম কাছে;
শেষ রোদ এখন মাঠের কোলে খেলা করে- নেভে;
এখন অব্যক্ত ঘুমে ভ’রে যায় কাঁচপোকা মাছির হৃদয়;
নদীর পাড়ের ভিজে মাটি চুপে ক্ষয়,

হ’য়ে যায় অক্ষান্ত ঢেউয়ের বুকে;
ঘাসে ঘুমে ক্লান্ত হয়ে আসে ঘুঘু শালিকের গতি;
নিবিড় ছায়ার বুকে ক্রমে ক্রমে পায় অব্যাহতি
মাঠের সমস্ত রেখা;
ঝাউফল ঝরে ঘাসে- সান্ত্বনার মতো এসে বাতাসের হাত
অশ্বত্থের বুক থেকে নিভিয়ে ফেলছে খাড়া সূর্যের আঘাত;
এখুনি সে সরে যাবে পশ্চিমের মেঘে।
গরুর গাড়িটি কার খড়ে সুসমাচার বুকে
লাল বটফলে থ্যাঁতা মেঠোফলে জারুল ছায়ার নিচে নদীর সুমুখে
কতক্ষণ থেমে আছে; চেয়ে দ্যাখো নদীতে পড়েছে তার ছায়া;
নিঃশব্দ মেঘের পাশে সমস্ত বিকেল ধ’রে সে-ও যেন মেঘ এক, আহা,
শান্ত জলে জুড়োচ্ছে;
এইসব নিস্তব্ধতা শান্তির ভিতর
তোমাকে পেয়েছি আজ এতদিন পৃথিবীর ’পর।
দু-জনে হাঁটছি ভরা প্রান্তরের কোল থেকে আরো দূর প্রান্তরের ঘাসে;
উশখুশু খোঁপা থেকে পায়ের নখটি আজ বিকেলের উৎসাহী বাতাসে
সচেতন হ’য়ে উঠে আবার নতুন করে চিনে নিতে থাকে
এই ব্যাপ্ত পটভূমি,- মহানিমে কোরালীর ডাকে
হঠাৎ বুকের কাছে সব খুঁজে পেয়ে।
‘তোমার পায়ের শব্দ,’ বললে সে, ‘যেদিন শুনিনি
মনে হতো ব্রহ্মাণ্ডের পরিশ্রম ধুলোর কণার কাছে তবু
কিছু ঋণী; ঋণী নয়?
সময় তা বুঝে নেবে…
সেইসব বাসনার দিনগুলো; ঘাস রোদ শিশিরের কণা
তারাও জাগিয়া গেছে আমাদের শরীরের ভেতর কামনা
সেই দিন;
মা-মরা শিশুর মতো আকাঙ্ক্ষার মুখখানা কি যে
ক্লান্তি আনে, ব্যথা আনে, তবুও বিরল কিছু নিয়ে আসে নিজে
স্পষ্ট চোখ তুলে সে সন্ধ্যার দিকে: ’কতো দিন অপেক্ষার পরে
আকাশের থেকে আজ শান্তি ঝরে- অবসাদ নেই আর শুন্যের ভিতরে।

রাত্রি হয়ে গেলে তার উৎসারিত অন্ধকার জলের মতন
কী এক শান্তির মতো স্নিগ্ধ হয়ে আছে এই মহিলার মন।
হেঁটে চলি তার পাশে, আমিও বলি না কিছু,কিছুই বলে না সে;
প্রেম ও উদ্বেগ ছাড়া অন্য- এক স্থির আলোচনা
তার মনে;- আমরা অনেক দূর চলে গেছি প্রান্তরের ঘাসে,
দ্রোণফুল লেগে আছে মেরুণ শাড়িতে তার- নিম- আমলকিপাতা
হালকা বাতাসে
চুলের উপরে উড়ে উড়ে পড়ে- মুখে চোখে শরীরের সর্বস্বতা
কঠিন এ সামাজিক মেয়েটিকে দ্বিতীয় প্রকৃতি মনে করে।
অন্ধকার থেকে খুঁজে কখন আমার হাত একবার কোলে তুলে নিয়ে

গালে রেখে দিলো তার: ‘ রোগা হ’য়ে গেছ এত- চাপা প’ড়ে
গেছ যে হারিয়ে
পৃথিবীর ভিড়ে তুমি- ব’লে সে খিন্ন হাত ছেড়ে দিলো ধীরে;
শান্ত মুখে- সময়ের মুখপাত্রীর মতো সেই অপূর্ব শরীরে
নদী নেই- হৃদয়ে কামনা ব্যথা শেষ হ’য়ে গেছে কবে তার;
নক্ষত্রেরা চুরি করে নিয়ে গেছে, ফিরিয়ে দেবে না তাকে আর।

[জীবনানন্দ দাশ : জর্নাল : ১৩৪৬ ]

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এমফিল, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষকতা; উপপরিচালক (গবেষণা ও তথ্যায়ন), নায়েম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত বই :
প্রবন্ধ—
চিন্তা ও জগৎ : সাহিত্য সংস্কৃতি [প্রবাস প্রকাশনী, যুক্তরাজ্য ২০০৭]
কবিতার নন্দনবিশ্ব [অনিন্দ্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৭]
কথার বুনন [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]
ছিন্ন কথামালা [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

কবিতা—
রৌদ্র ও বৃষ্টিতে মায়াহরিণ [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০০৭]
জলৌকা চোখের চাতাল [ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা ২০১০]
নির্জন বিচালির ডানা [কবি প্রকাশনী, ঢাকা ২০১৩]
নখের আউঠা [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৪]
নানকার ধানবীজ [উৎস প্রকাশন, ঢাকা ২০১৫]
একলব্যের ছিন্ন আঙুল [নাগরী, সিলেট ২০১৬]
সংশয়ের বসতি [নাগরী, সিলেট ২০১৭]
গ্রাম বজ্রযোগিনী [জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ঢাকা ২০১৯]

ই-মেইল : rudro71@gmail.com