হোম চলচ্চিত্র বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কালপুরুষ

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কালপুরুষ

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কালপুরুষ
690
0

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত’র সিনেমা দেখতে গিয়ে একটি নিমগ্নতা কাজ করে। ‘কালপুরুষ’ ছবির শুরুতে বোঝা যায় এটি কলকাতা—না, হাওড়া ব্রিজ নয়। রাতের আলোয় উঁচুতে প্যাঁচানো ইলেকট্রিক ওয়্যার লোক ভর্তি ট্রাম যাচ্ছে। শান্তনু ট্রাম থেকে নামে। তাকে ফলো করে অন্য একটি পুরুষ এগিয়ে যায়। দুই পুরুষ রাস্তার দুধারে পরস্পর হেঁটে চলে। দ্বিতীয় পুরুষ, যে প্রথম পুরুষকে গৃহে যেতে দেখল, সে প্রথম পুরুষটির বাবা। অশ্বিন তার নাম। ক্যামেরা এবার অশ্বিনকে চকচকে জুতো পায়ে হেঁটে যেতে দেখায়। তারপর দেখি অশ্বিন বলছে, ‘ওই যে গেল তার নাম শান্তনু, আমার ছেলে।’ বলার ভঙ্গিমা রহস্যময়। দেখি এরপর কী হতে পারে।


নারীবাদ অতিক্রম করে ব্যক্তি শান্তনুর জয় হয়েছে নীরবভাবে


শান্তনু ঘরে ঢুকে। স্ত্রী সুপ্রিয়া ঘুমে। শান্তনু নিজের ঘরে যায়। বাচ্চারা জেগে আছে বাবার জন্যে। শান্তনু ওদের নিয়ে ঘুম ঘুম খেলে। একটি সুর তার কানে আসে। যখনি শান্তনুর অন্যরকম বোধ হয়, ভালো লাগা কিংবা নতুন করে নিজেকে পাওয়া, তখনি কিশোর বয়সে শোনা একটি বাঁশির সুর কানে এসে লাগে তার। শান্তনুর সাথে এই সুরের একটি যোগ আছে, যা একান্ত শান্তনুর ভুবন।

শান্তনু অশ্বিন এবং পুতুলের ছেলে। যার কৈশোর তাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায় । বহরমপুরে তার কৈশোর কাটে। অশ্বিন ডাক্তার ছিলেন। সেখানে নিজ বাড়িতে তাদের সুখের সংসার ছিল। ওই সময় শান্তনু যেমন ছিল, পরে সে যখন তরুণ কিংবা মাঝ বয়সের যুবক, তখনও কিশোর বয়সের কৌতূহল তার মনে থেকে যায়। তাই দেখা যায় কখনো সে যেন অটিস্টিক মানুষের আচরণ করছে। কখনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে—সেই কিশোর বয়সে রেগে গেলে যেমনটি করত।


1.
ছেলে ও বাবা। শান্তনু (রাহুল বোস) ও অশ্বিন (মিঠুন চক্রবর্তী)

শান্তনু অফিস থেকে ঘরে ফিরছে। ওই ট্রামে তার বাবা তাকে ফলো করছে। বাবা পুত্রকে কিছু বলতে চাইছে। অথচ বারবার থমকে যাচ্ছে। শান্তনু ছেলে-মেয়ে দুজনকে ভীষণ ভালোবাসে। ওরাও বাবার সহচর্য পেয়ে বড় হচ্ছে। শান্তনু এও জানে ওরা তার ঔরসজাত নয়। সুপ্রিয়ার পরকীয়ার ফসল। শান্তনু কেন তার স্ত্রীর কাছে কোনো কৈফিয়ত চায় না? এখানে মনে হয় নারীবাদ অতিক্রম করে ব্যক্তি শান্তনুর জয় হয়েছে নীরবভাবে?

শান্তনু কিশোর বয়সে বাবাকে বন্দুক দিয়ে গুলি করে, অন্য নারীর সাথে বাবার ভালোবাসার সম্পর্কের কথা মায়ের কাছে শুনে। গুলিটি অশ্বিনের হাতে লাগে। তারপর ওই মহিলাকে মারতে যায়—যাকে তার বাবা ভালোবাসতো।

সুপ্রিয়ার ভাই আমেরিকা থাকে। স্কুল টিচার সুপ্রিয়া আমেরিকা যাবার স্বপ্ন দেখে। স্মার্ট সুখী লাইফ স্টাইল তার কাম্য। সারা দিন-রাত আমেরিকা তার মাথায় ঘুরে।

সুপ্রিয়ার ভাই সুপ্রিয়াকে আমেরিকায় বেড়াতে নিয়ে যায়। সেখানে তার তেমন বেড়ানো না-হলেও প্রচুর ভিডিও দেখে আমেরিকার উপর। লেখার নেশা পেয়ে বসে তার। আমেরিকা নিয়ে এত লিখে ফেলে যে গ্রিনিচ বুকে সুপ্রিয়ার নাম ওঠে, সর্বোচ্চ সংখ্যক শব্দে বইটি লেখার জন্যে। আবার আমেরিকা যায় সুপ্রিয়া প্রাইজ আনতে। বাচ্চারা বাবার কাছে রয়ে যায় বরাবরের মতো।


তুমি আমাকে নয়, আমাদের সম্পর্ককে বড় করে দেখেছ।


কলকাতার বাতাবরণ সমস্ত সিনেমা জুড়ে। কলকাতার জীবন আর আমেরিকান জীবনের হাতছানির মুখামুখি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। বহরমপুর কলকাতা তারপর আমেরিকা। কলকাতার জীবনে আমেরিকা স্বপ্নের দোলাচলে ঘুরতে থাকে। সুপ্রিয়া হলো উচ্চাকাঙ্ক্ষী বর্তমান আমেরিকার স্বপ্নে বিভোর একটি সিম্বলিক ক্যারেক্টার। কলকাতার নিজস্ব একটি সুর আছে। সঙ্গম আছে। সব ছাপিয়ে কলকাতা বড় মায়াময় নেশা ছডিয়ে রাখে। কলকাতার নিজস্ব চরিত্র ট্রাম, বাস আর মানুষের অসম্ভব ভিড়ের মাঝে নিজস্ব একটি রূপ আছে। নিজের কথা, নিজের সুর। শান্তনুরা সেই সুর শুনতে পায়।


3
অশ্বিনের (মিঠুন চক্রবর্তী) অবৈধ প্রেম লক্ষ করছে স্ত্রী পুতুল (লাবনী সরকার)

শান্তনুর দেখা হয় বাবার সাথে। বাবাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে বসে খায়। বাবাকে শার্ট কিনে দেয়—যে শার্ট সে সবসময় পড়তে দেখত। আসলেও কী তার বাবাকে সত্যি দেখে? না তার কল্পনায় এসব ঘটে যায়। বাবাকে খুঁজে পায় না। থমকে যায়। আবার কিশোর বয়সে শোনা ইদ্রিসের বাঁশির সুর। শান্তনু যখনি থমকে যায়, কিংবা কোনো উত্তর খুঁজে পায় না, তখনি কৈশোরের শোনা বাঁশির সুর তার কানে বাজে। এক ধরনের প্রশান্তি তার দেহমনে খেলে যায়। সে কি সুরের মাঝে বাবাকে পেয়ে যায়?

মাঝে মাঝে স্ত্রীকে দেখতে যায়। দুজনে অনেক কথা বলে। অশ্বিন পুতুলকে বলে, ‘তুমি আমাকে নয়, আমাদের সম্পর্ককে বড় করে দেখেছ।’ এরপর ক্যামেরা শান্তনুকে ক্লোজ করে। শান্তনুর কল্পনায় সবটুকু বর্ণিত হতে থাকে। হিংসার ক্লেদ পেরিয়ে শান্তনু স্বপ্নে বাবাকে ক্ষমা করে দেয়। আবার অন্য শট। বাবা ছেলের সাথে সমুদ্র তীর ধরে পাশাপাশি হাঁটে, কথা বলে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সাগরকে কেন বেছে নিলেন দুই পুরুষ যখন পাশাপাশি আলাপ করে? সাগরের বিশালতার কাছে শান্তনু তার বাবার সাথে কী আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের কথা বলে যায়!


শুধু টিকে থাকার ক্ষুদ্রতা থেকে শান্তনুর মতো মানুষরা বেরিয়ে আসে। যৌন, ঈর্ষা, ক্রোধ থেকে সরে ঋষির মতো হয়ে ওঠে।


অশ্বিন বলে শান্তনুকে, ‘তুমি অন্যরকম’। শান্তনু সুখী, কারণ শান্তনু গণ্ডিবদ্ধ চিন্তায় ডুবে যায় না। সে পৃথিবীর সন্তান। এই পৃথিবীর যে-দিকে তার চোখ পড়ে, চাইলে সে সুখ খুঁজে নিতে পারে। তা শিশুর হাসিতে হোক, বৃষ্টির জলে ভিজে হোক কিংবা কারো প্রেমলীলা দেখে হোক। শান্তনু ইগোইস্টিক মানুষ নয়। সে সুখী হতে পারে, কারণ তার মন বলে তাকে সুখী হতে। শুধু টিকে থাকার ক্ষুদ্রতা থেকে শান্তনুর মতো মানুষরা বেরিয়ে আসে। যৌন, ঈর্ষা, ক্রোধ থেকে সরে ঋষির মতো হয়ে ওঠে।

ছবিতে সবার অভিনয় ভালো হয়েছে। একটি ভালো সিনেমায় যা হওয়া জরুরি। শান্তনুর ভূমিকায় রাহুল বোস কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছে। রাহুলের চোখে পুরো সিনেমার ক্যামেরা চলেছে। যেমন ‘পথের পাঁচালী’র অপুর চোখে নিশ্চিন্তিপুর, গ্রামের মানুষগুলো সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরায় চলে আসে। রাহুল অত্যন্ত সাবলীলভাবে শান্তনু চরিত্রটি বিশ্বাসযোগ্যতায় তুলে ধরেছেন—যদিও চরিত্রটি চ্যালেঞ্জিং ছিল। অশ্বিনের ভূমিকায় মিঠুন চক্রবর্তীর অভিনয় বলার অপেক্ষা রাখে না। চরিত্রটির জন্য যে রহস্য বা প্রশ্ন দর্শকের ভাবনায় রাখা দরকার তা অনায়াসে পারফর্ম করেছেন মিঠুন চক্রবর্তী।


4
নাতি-নাতনিদের সাথে পুতুল (লাবনী সরকার), পাশে শান্তনু (রাহুল বোস)

সিনেমার মন্থর-ভাব দর্শকদের অনেক সময় ক্লান্ত করে। ভালো এডিটিং সিনেমার গতিশীল ছন্দ এনে দিতে পারে। সিনেমার সৌন্দর্যে ছন্দকে কি উপেক্ষা করা যায়? ছবিটি দেখতে দেখতে মনে হয় শান্তনুর মতো করে পৃথিবীর বুকে যারা বাস করে তারাই সুখী হতে পারে।

Shirin Osman

শিরিন ওসমান

জন্ম ৩১ মে, সিলেট। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা : বি এ। পেশা ব্যবসা।

ই-মেইল : shirin.osman31@gmail.com
Shirin Osman